Home রুপুর বিয়ে রুপুর বিয়ে পর্ব ১১

রুপুর বিয়ে পর্ব ১১

রুপুর বিয়ে পর্ব ১১
Bobita Ray

ইতিমধ্যে বিনয় রুপুকে বেশ কয়েকবার ডেকেছে। রুপু সারা দেয়নি। আর না ঘরের দরজা খুলেছে। হঠাৎ রুপুটা এমন করছে কেন? বিনয় ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ভাগ্যিস অয়নটা বাড়ি এসেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নাহলে লজ্জায় পড়তে হতো। বিনয় ঘড়ি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেক রাত হয়েছে। এখন ঘুমানো প্রয়োজন। রুপু তো দরজায় খুলছে না। মাও স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। এতক্ষণ দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে কী করছে রুপু? বিনয়ের একটু একটু ভয়ও করছে।
বিনয় দরজায় কান পাতল। চাপা কণ্ঠে বলল,

“রুপু.. এই রুপু দরজা খুলো?”
“(নিশ্চুপ।)”
“তুমি কী ঘুমিয়েছ রুপু? জেগে থাকলে দরজা খুলো প্লিজ।”
“(নিশ্চুপ।)”
বিনয় চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে গেল। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ছটফট করছে। বিনয়ের ডাকাডাকির অনেকক্ষণ পর রুপু দরজা খুলল। দরজা খুলে বিনয়কে দেখে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“ও তুমি এসে গেছো?”
বিনয় ঘরের ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। রুপুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রুপুর চোখে চোখ রাখল। বলল,
“কী হয়েছে তোমার? এত ডাকাডাকির পরও দরজা খুললে না কেন?”
“আমার কী হয়েছে, তা জেনে তুমি কী করবে?”
“প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করবে না রুপু।”
“তো কী করব? এই রাতদুপুরে না ঘুমিয়ে দুজনে প্রশ্ন উত্তর খেলা খেলব?”
বিনয় হতাশ হয়ে বলল,

“মা বলল, তুমি নাকি কাজ করার ভয়ে সেই দুপুর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছো।”
“যদি বসে থাকি তাতে কী তোমার কোন সমস্যা আছে?”
“তুমি তো জানো, মায়ের শরীর ভালো না। একটু মায়ের হাতে হাতে কাজ করলে কী এমন ক্ষতি হতো।”
রুপু খুব কড়া কণ্ঠে বলল,
“আমি তো আর জানি না তোমার গুণধর ভাই আজ আসছে। তুমি যদি আমাকে একটু কষ্ট করে বলে যেতে তাহলে আমি অবশ্যই দাসী বান্দিদের মতো সবকাজ করে রাখতাম। তুমি বললে, তোমার ভাইয়ের সেবাযত্নও করতাম।”
এর থেকেও কড়া কথা এইমুহূর্তে বিনয়কে বলতে ইচ্ছে করছিল। বহুকষ্টে নিজের ইচ্ছেকে দমন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল রুপু। অসহ্য লাগছে। এইমুহূর্তে বিনয়কে একদম অসহ্য লাগছে।
রুপু ছাদে গিয়ে দেখল, বাবা রাতের অন্ধকারে ছাদের এক কোণে বসে একমনে সিগারেট খাচ্ছে। রুপু বাবার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। বিধান বাবু হাতের অর্ধখাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে লজ্জিত কণ্ঠে বলল,
“বসো মা। আসলে তোমার শাশুড়ীমা সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না। বহুদিনের পুরোনো অভ্যাস। ঘুমানোর আগে একটা সিগারেট খাওয়া। আমিও ছাড়তে পারি না। তাই রোজ রাতে ছাদে বসে একটা সিগারেট খাই।”

রুপু বিধান বাবুর পাশে খানিক দূরত্ব বজায় রেখে বসতে বসতে বলল,
“ভালোই হলো এখানে আপনাকে পেয়ে বাবা। আমার একটা আবদার বলেন আর অনুরোধ বলেন। আপনাকে কিন্তু রাখতে হবে বাবা।”
“অনুরোধ বলছ কেন মা? তুমি শুধু এই অধম ছেলের কাছে আদেশ করো।”
এত এত মন খারাপের মাঝেও রুপু হেসে ফেলল। সেই হাসি অন্ধকারে বিধান বাবু দেখতে পেল না। রুপু বলল,
“আপনি তো জানেন আমাদের ঢাকায় কাছের আত্মীয় নেই। আমার ছোটবোন অথৈ এবার এডমিশন টেস্ট দেবে। আপনি যদি অনুমতি দেন। তাহলে ও এখানে এসে কিছুদিন থাকবে। আর আমি মাস্টার্সে ভর্তি হতে চাই বাবা।”
“আগামীকালকেই গাড়ি পাঠিয়ে দেব। তুমি শুধু অথৈ মামণিকে ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে বলো। ছোটবোন বড়বোনের কাছে আসবে। এখানে আবার এত অনুমতি নেবার কী আছে। আর অবশ্যই তুমি ভর্তি হবে। ভর্তির জন্য কী কী করতে হয় আমি তো আর জানি না। বিনয়কে বললেই ও তোমাকে ভর্তি করিয়ে আনবে।”
“আপাতত আপনার ছেলেকে বলতে ইচ্ছে করছে না বাবা। আপনি অনুমতি দিলে আমি একা একাই ভর্তি হতে চাই।”
“সে তোমার ইচ্ছে। তবে যেখানেই যাও। গাড়িটা সঙ্গে করে নিয়ে যেও মা। দিন কালের যে অবস্থা। অনেক রাত হলো। এবার ঘুমাতে যাও।”
এই মানুষটার আন্তরিক ব্যবহারে সবসময় রুপুর মন শ্রদ্ধায় ভরে যায়। মানুষটাকে সত্যিকার অর্থে মন থেকে সম্মান করে রুপু। রুপু অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করল। ‘বাবার মন যেন কোনদিন পরিবর্তন নাহয় ঠাকুর।’

“এতরাতে কোথায় গিয়েছিলে তুমি?”
রুপু বিনয়কে পাশ কাটিয়ে ঘরে চলে গেল। বিনয় বিড়বিড় করে বলল,
“মা ঠিকই বলে, মেয়ে মানুষের এত তেজ ভালো না।”
রুপু কঠিন চোখে বিনয়ের দিকে তাকাল। বলল,
“তোমার মা কী ছেলেমানুষ?”
বিনয় চমকে উঠে রুপুর দিকে তাকাল। রুপু বলল,
“তোমার মা নিজে একজন মেয়ে হয়ে সবসময় আমাকে ইঙ্গিত করে মেয়েদের নিয়ে কুটচাল করতে লজ্জা লাগে না তোমার মায়ের? তোমাদের মা-ছেলের যখন আমাকে নিয়ে এতই সমস্যা। দয়া করে, আমাকে আমার বাবার বাড়িতে রেখে এসো। যার ফলাফল তোমরাও শান্তিতে বাঁচো আর আমিও শান্তিতে বাঁচি। আমার সবকিছুতে এত দোষ ধরো কেন তোমরা? এত দোষ নিয়ে আমি তোমার সংসার করতে চাই না। এতই যদি বাপের ব্যাটা হয়ে থাকো। নিজেও মুক্ত হও। আর আমাকেও মুক্তি দাও।”
সামান্য কথার জন্য রুপু এমনভাবে কথা শোনাবে। বিনয় স্বপ্নেও ভাবেনি। রুপুর সব কথাই যেন বিনয়ের মাথার উপর দিয়ে গেল। হতভম্ব বিনয়কে পাশ কাটিয়ে বিছানায় শুতে গেল রুপু এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হলো; রাতে ওর খুব ভালো ঘুম হলো।

অয়নের সাথে রুপুর দেখা হলো খুব ভোরে। অয়ন ছাদে হাঁটাহাঁটি করছিল। আর রুপু রান্না করার জন্য সবে ছাদে এসেছে। তখনই দেখল, রাজপুত্রর মতো একটা ছেলে এককানে হেডফোন গুঁজে গুনগুন করছে আর হাঁটাহাঁটি করছে। রুপুকে দেখে অয়ন হাসিমুখে এগিয়ে এলো। বলল,
“আমি যদি কোন ভুল না করে থাকি। তুমি আমার বউদি রাইট?”
রুপু কী বলবে বুঝতে পারল না। অয়ন ভাবুক হয়ে বলল,
“হাই হ্যালো করব। নাকি কেমন আছো দিয়ে কথা শুরু করব ঠিক বুঝতে পারছি না। আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ একটু ইউনিক নাহলে হয় বলো?”
অয়নের বলার ভঙ্গিতে রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“চা খাবেন না কফি খাবেন?”
“তুমি কী খাবে?”
রুপু বলল,
“আমি চা খাব।”

“তাহলে আমিও চা খাব। তবে আমার চায়ে মিষ্টি খুব কম দেবে। আর বউদি আমাকে প্লিজ আপনি আপনি করে বলো না। কেমন পর পর লাগে শুনতে।”
রুপু চা করতে রান্নাঘরে চলে গেল। চা করতে গিয়ে দেখল সাত-সকালে ময়নার মা খুব সেজেগুজে কাজ করছে। রুপু বেশ অবাক হলো। রুপুর দিকে তাকিয়ে ময়নার মা লাজুক হাসল। অয়নও রান্নাঘরে চলে এসেছে। একটা চেয়ার টেনে বসে বলল,
“বউদি?”
“হুঁ?”
“হানিমুনে কোথায় যাবার ইচ্ছে তোমার? নাকি গিয়েছিলে?”
অয়নের এত সহজভাবে কথা বলা রুপুর ঠিক হজম হচ্ছে না। রুপু সে কথার উত্তর না দিয়ে একমনে চা বানাতে লাগল।
চায়ের কাপ অয়নের সামনে রেখে রুপু ছাদে চলে গেল। অয়নও চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রুপুর পেছন পেছন গেল। বলল,

“তোমার কী ঘুম থেকে ভোরে উঠা পুরোনো অভ্যাস নাকি শ্বশুরবাড়ি এসে তৈরি হয়েছে?”
“পুরোনো অভ্যাস।”
“তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ আমি কেমন না কেমন। একটু ওয়েট আমি তোমার সন্দেহ দূর করে দিচ্ছি। বউদি আমার দিকে ভালো করে তাকাও। দেখো তো আমি দেখতে কার মতো হয়েছি?”
রুপু শান্ত চোখে একপলক অয়নের দিকে তাকাল। তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,
“বাবার মতো।”
“তাহলে নিশ্চিন্তে থাকো। আমার সামনে এত জড়তার কিছু নেই। আমি দেখতে যেমন বাবার মতো হয়েছি। আমার বিচার বুদ্ধিও হুবুহু বাবার মতো। তবে একটা ব্যাপারে বাবার সাথে আমার ম্যাচ করেনি। বাবা যেমন সবার সুখকে নিজের সুখ ভাবে। আমি তা ভাবতে পারি না। আমি আমার সুখকে সবচেয়ে বেশি প্রধান্য দেই। চা’টা খেতে খুব ভালো হয়েছে বউদি। যদি কিছু মনে না করো। প্রতিদিন সকালে তোমার হাতের বানানো এককাপ স্পেশাল চা আমার চাই-ই চাই।”

অথৈকে নিয়ে যেতে রুপুর শ্বশুরবাড়ি থেকে গাড়ি পাঠিয়েছে। গাড়ি দেখে রুপুর বাবা-মা খুব খুশি হয়েছে। রুপুর বাবারও খুব ইচ্ছে ছিল অথৈকে দিতে যাওয়ার বাহানায় রুপুর শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার। সেদিন হুড়মুড় করে রুপুর অসুস্থ শাশুড়ীর কথা শুনে রুপুকে দিতে গেল। তাড়াহুড়োয় রুপু কিছুই কিনতে দিল না। নতুন কুটুমবাড়িতে একদম খালি হাতে যাওয়া ভালো দেখায় না। রুপুর না করা সত্বেও কিছু ফলমূল নিয়ে গিয়েছিল অবশ্য।
রুপু নাকি রুপুর মাকে স্পষ্ট মানা করে দিয়েছে। এখন বাবাকে পাঠানোর দরকার নেই। গাড়ি পাঠানো হচ্ছে। শুধু অথৈ যেন যায়। কথাটা শুনে রুপুর মায়ের সেকি মন খারাপ। রুপুর বাবা-মা যদি ভুলেও জানতো, ওনারা যেন কোনভাবে রুপুর শাশুড়ীর কাছে অপমানিত নাহয় সেইজন্য রুপু যেতে বারণ করেছে। এই পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতি হলো। মেয়ে হয়ে নিজের বাবা-মাকে শ্বশুরবাড়ির লোকের কাছে অপমানিত হতে দেখা। এরজন্য আত্মীয় করতে হয় সমানে সমানে।
অথৈয়ের আসার কথাশুনে রুপুর শাশুড়ী একচোট রুপুর শ্বশুরের সাথে ঝগড়া করেছে। ভদ্রলোক যতই স্ত্রীকে শান্ত করতে চেষ্টা করছে। ভদ্রমহিলা ততই উচ্চস্বরে কথা বলছে। রুপুর শ্বশুর অধৈর্য হয়ে রুপুর শাশুড়ীকে শেষবার বলেছে,

“আমি খুব বড়মুখ করে বিয়নের বউকে বলেছি। এখন যদি রুপুর বোনকে এই বাড়িতে আসতে মানা করে দাও। তাহলে বউমার সামনে আমার মুখ থাকবে? আমার সম্মানের ভার আমি তোমাকে দিলাম বীথি। এখন তোমার বিবেচনায় কী বলে, তুমি দেখো।”
কথাটা শোনার পর থেকে বীথি রানী কিছুটা শান্ত হয়েছে। তবে ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়ছে। ফকিন্নিদের সাথে আত্মীয় করাই উচিত হয়নি। এখন যার যত সমস্যা হবে। সব এই বাড়িতে এসে উঠবে। রুপুকে ইচ্ছেমতো কিছু কড়া কথা শোনাতে পারলে মনে শান্তি ফিরে আসতো। ও মেয়ের যে চোপা। একটা বললে দশটা শুনিয়ে দেবে। তারজন্য সরাসরি কিছু বলতেও পারছে না। আবার সহ্য করাও যাচ্ছে না।
অথৈয়ের এতবড় গাড়িতে একা যেতে ভয় লাগছে। আবার ভালোও লাগছে। বাবা সাথে এলে আরও ভালো লাগতো। বাবার সাথে সারা রাস্তা গল্প করতে করতে যাওয়া যেত। অথৈ যদিও পেছনের সিটে বসেছে। তারপরও ওর কেমন অস্থির লাগছে। অস্থিরতা কাটাতে দিদিকে ফোন দিল অথৈ। দিদির সাথে কথা বললে যদি মনের গুমোট বাঁধা ভাব একটু কমে। রুপু ফোন রিসিভ করে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,

“কিরে কতদূর?”
“গাড়িটা ঝড়ের বেগে ছুটছে দিদি। এখন কোথায় আছি। কিছুই তো বুঝতে পারছি না। সবচেয়ে বড় কথা এদিকের রাস্তাঘাট আমি তেমন চিনি না।”
“তুই কী ভয় পাচ্ছিস অথৈ?”
“একটু একটু পাচ্ছি।”
“ভয় নেই। শান্ত হয়ে বসে থাক।”
“দিদি..”
“বল?”
“আমার এখন তোদের বাড়ি যেতেও ইচ্ছে করছে না। বাড়ি ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে।”
“তুই অল্পতেই অধৈর্য হয়ে যাস।”
“ঠিক অধৈর্য না। তোর শ্বশুরবাড়ির লোক আমার দরকারে যাওয়াটা তো পছন্দ না-ও করতে পারে।”
“ অথৈ শোন, তুই কোন চিন্তা করবি না। তোর দিদি আছে তো। তোর দিদি সবটা সামলে নেবে। আর গাড়ি থেকে নেমে আমাকে অবশ্যই একটা ফোন দিবি।”
“আচ্ছা।”

“এখন রাখি। আমার হাতে একটু কাজ আছে।”
রুপু রান্না করায় মনোযোগ দিল। বীথি রানী রান্নাঘরে এসে বলল,
“এত কী কী রান্না করছ?”
রুপু উত্তর দিল না। একমনে কাজ করতে লাগল।
“কী হলো কথা বলছ না কেন? বোন আসবে দেখে কী ফ্রিজের সব মাছ, মাংস একদিনেই খাবে নাকি?”
“শুধু আমার বোন খাবে কেন? গুষ্টি শুদ্ধো সবাই খাবে। একসাথে তো খেতে বসব। তখন ভালো করে দেখবেন। কাকে কী খেতে দেই।”
“এত বড় বড় কথা বলো না। সেই তো বিপদে পড়ে এখানেই আসছে। অন্যজায়গা তো থাকার ব্যবস্থা করতে পারল না তোমার বাবা। আর করবে বা কেন! মেয়েকে তো আর এমনি এমনি বড়লোক বাড়িতে গছিয়ে দেয়নি। ফায়দা লুটতেই দিয়েছে।”
“যেভাবে কথাটা বললেন, মনে হলো আমি আপনার ছেলের হাত ধরে একা একা হেঁটে এসেছি। বরং আপনারাই গুষ্টি শুদ্ধো আমাকে দেখেশুনে আপনার ভাষায় এতবড় ঘরের বউ করে নিয়ে এসেছেন।”
বাবারে চোপা.. এই মেয়ের সাথে কিছুতেই কথায় পারা যায় না। বীথি রানীও কম না। শুধু তক্কে তক্কে আছে। এই মেয়ের দুর্বল জায়গা শুধু মানে মানে খুঁজে পেলেই হলো। তখন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ইচ্ছেমতো ঘা করা যাবে।
বীথি রানী গজগজ করতে করতে চলে গেল। অয়ন তখনই এসে রুপুর পাশে দাঁড়াল। বলল,

“কী রান্না করছ বউদি?”
“ইলিশ মাছের পাতলা ঝোল, খাসির মাংস, ঝরঝরে আলু ভাজা, মসুর ডাল ও চাটনি।”
“হঠাৎ এত আয়োজন। কেউ আসবে নাকি?”
“হুঁ।”
“কে আসবে?”
“আমার ছোটবোন।”
“বেড়াতে আসছে?”
“একটু দরকারে আসছে।”
“যদি কিছু মনে না করো দরকারটা কী আমাকে বলা যাবে?”
“ওর এডমিশন টেস্ট।”
“ও আচ্ছা.. আচ্ছা।”
রুপু রান্নায় মনোযোগ দিল। অয়ন ছাদে চলে গেল। ছাদে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখছে।
তার কিছুক্ষণ পরই রুপুর ফোনটা বেজে উঠল। অথৈ বলল,
“আমি এসে পড়েছি দিদি। তুই প্লিজ আমাকে একটু নিচে এসে নিয়ে যা। আমার একা একা যেতে ভীষণ লজ্জা লাগছে।”

“আমি তো রান্না করছি। একটু অপেক্ষা কর। চুলা অফ করে আসছি।”
অয়ন রুপুকে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে যেতে দেখে পেছন থেকে বলল,
“ তুমি এত ব্যস্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছ বউদি?”
রুপু যেতে যেতে বলল,
“অথৈ এসেছে।”
অয়ন রুপুর অস্পষ্ট কথা শুনতে পেল না। ফোন দেখায় মনোযোগ দিল।
রুপুর বিয়ের পর রুপুর সাথে অথৈয়ের আর দেখা হয়নি। অথৈ রুপুকে দেখে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। আবেগে অথৈয়ের চোখে জল এসে গেল। অনুরাগী কণ্ঠে বলল,
“আমি তোর সাথে ভীষণ রাগ করেছি দিদি। তুই সেদিন কেন আমার সাথে দেখা না করে চলে এলি?”
“ইচ্ছে করে আসিনি রে.. এবার আমাকে ছাড়।”
অথৈ রুপুকে ছেড়ে দিল। দুই বোন হাত ধরাধরি করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। রুপু বলল,
“বাবা মা কেমন আছে?”
“ভালো আছে। বাবার আসার খুব ইচ্ছে ছিল। তুই মানা করলি দেখে সাহস পেল না।”
রুপু অন্যদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করল।
অথৈ বলল,

“কাউকে দেখছি না কেন? বাড়িটা এত নীরব নীরব লাগছে কেন?”
“বাবা আর তোর জামাইবাবু শোরুমে। ওদের আসতে রাত হবে। আমার শাশুড়ী নিজের ঘরে শুয়ে আছে। আমি আর ময়নার মা রান্না করছিলাম। আর বিদেশ থেকে আবার দেবর এসেছে। সে ছাদে আছে। এসেছিস যখন সবার সাথেই দেখা হবে। তুই এক কাজ কর। ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নে। আমি বাকি রান্নাটা সেরে আসছি।”
অথৈ বাঁধা দিল না। রুপুকে যেতে দিল। ওর খুব ক্লান্ত লাগছিল। নরম বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমে দুচোখ বুঁজে এলো।
অথৈয়ের যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। অথৈ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। রুপুকে ওর পাশে বসে থাকতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বলল,
“কখন ঘুমিয়েছি আমি? তুই আমাকে একটু ডাক দিবি না?”
“তুই এত আরাম করে ঘুমাচ্ছিলি তোর ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছে করল না। উঠ.. উঠে হাত-মুখ ধুয়ে নে। খাবি চল।”
“ইশ..আমার খুব লজ্জা লাগছে দিদি। তোদের বাড়িতে এই প্রথমবার এলাম। তোর শাশুড়ীর সাথে দেখা না করেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ওনারা শুনলে কী ভাববে।”
“যে যা খুশি ভাবুক। তুই দয়া করে এবার উঠ। আমার প্রচণ্ড খিদে লেগেছে।”
“তুই এখনো খাসনি কেন দিদি?”
“একসাথে খাব বলে খাইনি।”

ভালোলাগায় অথৈয়ের চোখে জল এসে গেল। এই পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা দিদিটা অথৈয়ের।
অনেকগুলো দিনপর দুইবোন একসাথে খেতে বসল। খাওয়ার আগে অথৈ অবশ্য রুপুর শাশুড়ীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। বীথি রানী অথৈয়ের সাথে খুব বেশি কথা বলেনি।
রুপু অথৈয়ের পাতে ইলিশ মাছের কাটা বেছে দিচ্ছে। অথৈ খেতে খেতে বলল,
“তোর শাশুড়ী মনে হয় আমার এখানে আসা পছন্দ করেনি।”
“ওনার পছন্দে তোর আমার কী এসে যায়। সবার পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই।”
“আচ্ছা।”
ওরা দুইবোন খাওয়ার পর্ব শেষ করে রুপু এঁটো থালাবাটি গুছাতে লাগল। আর অথৈ ছাদে গিয়ে দাঁড়াল। ছাদটা বেশ খোলামেলা। অথৈয়ের ভীষণ পছন্দ হলো। এবং মনে মনে ঠিক করে ফেলল। পরীক্ষার আগ পর্যন্ত ছাদে বসে বসেই পড়া রিভিশন দেবে অথৈ।
রুপু কাজ শেষ করে এসে বলল,

“ঘরে চল।”
“তুই কিছু মনে না করলে আমি কী কিছুক্ষণ ছাদে বসে থাকতে পারি?”
“আমি এখন নিচে যাব। আমার একটু কাজ আছে। তুই একা ভয় পাবি।”
“না ভয় পাব না। প্লিজ দিদি আমি খুব বেশি সময় থাকব না।”
“আচ্ছা থাক।”
অথৈয়ের আজ পড়তে ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষণ দোলনায় দোল খাওয়া যাক। অথৈ দোলনায় গিয়ে বসল।
হঠাৎ লোডশেডিং হলো। এখন বোধহয় কৃষ্ণপক্ষ চলছে। আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডাকা। এতক্ষণ ভয় না পেলেও এই অন্ধকারে একটু একটু ভয় লাগছে। হাতে ফোনও নেই। আন্দাজে কোথায় যাবে ও?
ঠিক তখনই গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অন্ধকারে ধুমধাম পা ফেলে অয়ন ছাদে উঠে এলো। অয়ন ছাদে এসেই দোলনায় ধপ করে বসে পড়ল। দোলনাটা তো তুলতুলে নরম ছিল। দোলনার কী ডানপালা গজিয়েছে নাকি? বসে আরাম পাওয়া যাচ্ছে না।

ঘুটঘুটে অন্ধকারে এক দানব এসে অথৈয়ের কোলে বসেছে। অতিরিক্ত ভয়ে অথৈয়ের জ্ঞান হারাবার জোগাড় হলো। অতিরিক্ত ভয়ে অথৈয়ের মুখের রক্ত সরে গেল। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আকাশ পাতাল ফাটিয়ে গগনবিহারী চিৎকার দিল অথৈ। অয়ন ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল। তাড়াহুড়ো করে ফোনের লাইট জ্বেলে দেখল, একজন অত্যন্ত সুন্দরী কিশোরী দুইকানে হাত চেপে ধরে চোখদুটো বুঁজে শব্দ করে কাঁদছে। মেয়েটা বোধহয় প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। মুখটা লাল টকটকে হয়ে গেছে। এত জোরে কাঁদলে তো বাড়ির মানুষ আসবেই। আশেপাশের মানুষও চলে আসবে। অয়ন মেয়েটির সামনে হাঁটু মুড়ে বসল। কোমল কণ্ঠে বলল,
“প্লিজ ভয় পেও না। চোখে খুলে দেখো.. আমি.. আমি মানুষ।”

অথৈয়ের পাদু’টো জমে আছে। নাহলে একদৌড়ে নিচে চলে যেত। একটা আলো এসে চোখের উপরে পড়েছে। কিন্তু চোখ খোলার সাহস পাচ্ছে না অথৈ। তখনই কারেন্ট চলে এলো। অথৈ চোখ খুলে দেখল, ও যা ভেবে ভয় পেয়েছিল। তা নয়। এ-তো জলজ্যান্ত একটা মানুষ। অথৈ বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলল। অথৈয়ের ভয় তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ছেলেটার হাসি হাসি মুখের তাকিয়ে অথৈয়ের সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। রাগী কণ্ঠে বলল,
“এই দানবের বাচ্চা দানব। এত এত জায়গা রেখে তুই আর বসার জায়গা পাইলি না। আমার কোলের মধ্যে উঠে আমাকে মারতে চেয়েছিলি নাকি?”

রুপুর বিয়ে পর্ব ১০

এত সুন্দর মেয়েটার মুখে এত কুৎসিত কথাশুনে হতভম্ব হয়ে গেল অয়ন। মেয়েটার কী মাথা ঠিক আছে? মেয়েটা কাকে দানব বলছে? অয়নকে। ছোটবেলা থেকে সবার মুখে এত এত প্রংশসা শুনতে শুনতে অয়নের ধারণা হয়ে গিয়েছিল। ও সত্যি সত্যি রাজপুত্রর মতো দেখতে। বাংলার রাজপুত্রকে এই মেয়েটা মুহূর্তেই দানব বানিয়ে দিল। আশ্চর্য তো!

রুপুর বিয়ে পর্ব ১২