রুপুর বিয়ে পর্ব ১২
Bobita Ray
“কে তুমি?”
“আমি কে, তা জেনে তুই কী করবি? তুই আগে বল, এত জায়গা রেখে তুই দানবের মতো আমার কোলে বসলি কেন?”
“এই মেয়ে এই, সাধারণ জ্ঞান নেই তোমার? আমি কী ইচ্ছে করে তোমার কোলে বসেছি। আর তখন থেকে দানব দাবন করছ কেন? আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখো। আমি মোটেও দানবের মতো দেখতে না। তবে তুমি আমাকে বাংলার রাজপুত্রর বলতে পারো।”
“ওলে বাবা.. আইছে আমার বাংলার রাজপুত্রর। ভালো করে আয়নায় নিজের চেহারা দেখিস। তোকে তো ধলা বিলাইয়ের মতো দেখা যায়। উজবুক কোথাকার।”
“এই মেয়ে এই, তুমি তখন থেকে আমাকে তুইতোকারি করছ কেন? আর ধলা বিলাই কী?”
“ওলে বাবালে বাবা.. বাংলার রাজপুত্রর থুক্কু ধলা বিলাই নিজেই নিজেকে চেনে না।”
এই মেয়েটার কথার ভঙ্গিমা দেখে অয়নের রাগে গা চিড়বিড় করছে। ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় মেরে দিতে। অসভ্য মেয়ে।
অয়ন অথৈয়ের মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে রাগ রাগ কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে আমি দেখে নেব মেয়ে।”
অথৈ কিছু বলার আগেই অয়ন গটগট করে চলে গেল।
অথৈ আবারও দোলনায় গিয়ে আরাম করে বসল। ওই মাথামোটা ছেলেটাকে প্রথম দেখায় কী ভয়ংকর ক্রাশ খেয়েছে অথৈ। তা যদি সে ভুল করেও কোনভাবে জানতো!
“কিরে একা একা হাসছিস কেন?”
রুপুকে দেখে অথৈয়ের মুখের হাসি বিস্তৃত হলো। রুপুকে টেনে ধরে অথৈয়ের পাশে বসিয়ে দিয়ে বলল,
“হাসতে আবার দুজন লাগে নাকি দিদি?”
“দুজন লাগে না। তবে কারণ লাগে।”
“অকারণে হাসা যাবে না?”
“অকারণে সুস্থ মানুষ হাসে নাকি!”
“তাহলে কে হাসে?”
“অকারণে পাগল হাসে পাগল।”
অথৈ আমুদে কণ্ঠে বলল,
“তাহলে আমি বোধহয় পাগলই হয়ে যাচ্ছিরে দিদি।”
“অনেক পাগল হয়েছিস। এবার চল। তোর জামাইবাবু এসেছে। দেখা করবি।”
বিনয় অথৈকে দেখে বলল,
“কী অবস্থা? প্রিপারেশন কেমন?”
“আর প্রিপারেশন। আপনার কী অবস্থা? কেমন আছেন?”
বিনয়ের হয়ে রুপুই হাসিমুখে উত্তর দিয়ে দিল।
“তোর জামাইবাবু বিয়ে করে পুরোপুরি ফেঁসে গেছে রে অথৈ। না পারছে শক্ত করে ধরতে আর না পারছে ছাড়তে।”
রুপুর কথাশুনে বিয়নের মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল।
রুপুটার সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি। এত বাড়াবাড়ি আর ভালো লাগছে না। খুব কী দরকার ছিল আলাদা শোবার? না দরকার ছিল নাতো। তারপরও বোনের সাথে শোবার বাহানায় দিব্যি আলাদা ঘরে শুয়ে পড়ল। আর বিনয়কে ঘুমাতে পাঠাল অয়নের ঘরে। রুপুর বোন কী কচি খুকী। যে একা ঘুমাতে ভয় পাবে। নাতো।
বিনয়ের এখন অসহ্য লাগছে। মহারাণী যা বলবে তাই তো বিনয়কে শুতে হবে। নাহলে তো মুখে মুখে তর্ক করা শুরু করে দেবে।
ওর বউ যে ওর সাথে ঘুমাতে চাচ্ছে না। এই নিয়ে যেন এ বাড়ির কারো মাথাব্যথা নেই। রুপুর সাথে এক বিছানায় ঘুমিয়ে অভ্যাস পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে।
অয়ন বিনয়ের মতিগতি বুঝতে পারছে না। অতিরিক্ত রেগে গেলে বিনয়ের নাকের পাটা ফুলে যায়। আর হাত ঘষাঘষি করতে করতে সারাঘর পায়চারী করে।
“তুই এত রেগে আছিস কেন দাদা?”
“তো কী করব। খুশি হবো? খুশি হতে বলছিস আমাকে?”
“না না তা বলব কেন! রাগের কারণটা জানতে চাচ্ছি।”
বিনয় অয়নের পাশে বসে বলল,
“দেখলি, দেখলি তো তোর বউদির কাণ্ডটা। বোন এসেছে দেখে বোনকে নিয়ে ঘুমাতে হবে। কেন ওর বোন কী কচি খুকী। যে সারারাত জেগে জেগে ফিডার খাওয়াবে।”
“এই কথা বউদি শুনলে তোর খবর আছে রে দাদা। তাছাড়া অনেকদিন পরে দুই বোন একসাথে হয়েছে। ঘুমালে ক্ষতি কী!”
“তোর বউদিকে ছাড়া আমার রাতে ঘুম হয় না।”
অয়ন হেসে ফেলল। বলল,
“তুই তো দেখি বউদির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিসরে দাদা।”
“আর প্রেম। ও কখনো বুঝতে চায় আমার মনের ব্যাকুলতা। সব সময় জেদ করে দূরে দূরে সরে থাকে।”
“দূরে সরে যেতে দিচ্ছিস কেন? জোর করে কাছে টান।”
“ভয়েই তো কাছে টানতে পারি না। মহারাণীর যে রাগ। রেগে গেলে কী সব ভয়ংকর ভয়ংকর কথা বলে। তোর কোন ধারণাও নেই অয়ন।”
অয়ন বলল,
“শুয়ে পড় দাদা। বউদির জন্য কত বছর পর আমরা দুইভাই একসাথে ঘুমাচ্ছি। তোর তো খুশি হওয়ার কথা।”
বিনয় হতাশ হয়ে বলল,
“বিয়ে তো করিসনি। আগে বিয়ে কর। তখন দেখবি বউ ছাড়া কারো সাথে ঘুমাতে ভালো লাগে না।”
“তাহলে এককাজ কর। তোর শালীকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দে। আর তুই বউদির কাছে ঘুমাতে চলে যা..”
বিনয় হতভম্ব হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে বলল,
“তোর কী মাথা ঠিক আছে? তোর বউদি জানতে পারলে আমাদের দুজনকেই জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।”
অয়ন হেসে ফেলল। বলল,
“তুই কী রসিকতাও বুঝিস না দাদা।”
অথৈ রুপুকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। রুপু বলল,
“কী করছিস ছাড়। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
“আসুক। তবুও ছাড়ব না। তুই চলে আসার পর আমার কতদিন রাতে ঘুম হয়নি। তোর কোন ধারণাও নেই দিদি। অবশ্য আজ আরও একজনের ঘুম হবে না।”
“কার ঘুম হবে না?”
“কার আবার তোর বরের। তুই যখন জামাইবাবুকে
বললি, অনেক রাত হলো। তুমি এখন অয়নের ঘরে ঘুমাতে যাও। আমি আর অথৈ এইঘরে ঘুমাব। তখন জামাইবাবুর মুখটা দেখার মতো হয়েছিল রে দিদি।”
রুপুর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। বলল,
“ঘুমো এখন।”
“ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। আজ সারারাত জেগে গল্প করব।”
“আমার এখন গল্প করতে ইচ্ছে করছে না। সকালে কাজ আছে।”
অথৈ আবদার করে বলল,
“একদিন রাত জাগলে কিছুই হবে না। দিদি প্লিজ..
তোর দেবর কী বদমায়েশের বদমায়েশ। অন্ধকারে বলা নেই কওয়া নেই সরাসরি আমার কোলের মধ্যেখানে এসে বসেছে।”
রুপু চমকে উঠে বলল,
“তোর কোলে বসেছে মানে?”
“আর বলিস না। ছাদে যখন কারেন্ট ছিল না। গাধাটা বসার আর জায়গা পায়নি। ডাইরেক্ট আমার কোলে বসেছে।”
“তুই ব্যথা পাসনি তো?”
“তো ব্যথা পাব না? দানবের মতো শরীর নিয়ে আমার মতো পিচ্চি একটা মেয়ের কোলে বসলে ব্যথা পাব না। তবে ব্যথার থেকে ভয় বেশি পেয়েছি। আমি তো ভেবেছি ভূতের কাণ্ড।”
রুপু হেসে ফেলল। অথৈ বলল,
“তোর দেবর নিজেকে কী মনে করে জানিস দিদি?”
“কী মনে করে?”
“বাংলার রাজপুত্র। আমিও কম না। বলেছি, তোকে তো দেখা যায় পুরোপুরি ধলা বিলাইয়ের মতো।”
“অয়নের সাথে তুই তুই করে কথা বলেছিস?”
“ভূত ভেবে প্রচুর ভয় পেয়েছিলাম। যখন দেখলাম এ-তো ভূত না। মানুষ। তখন ভয় ভয়ংকর রাগে পরিণত হলো। রাগের মাথায় অনেককিছু বলেছি।”
“অয়নের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবি।”
“কেন, তোর দেবরের চরিত্র খারাপ নাকি?”
“জানি না। তবে আমি চাই না। আমার শাশুড়ী তোকে খারাপ বলুক। সামান্য একটা ঘটনাকে মুহূর্তেই সিরিয়াস ইস্যু বানিয়ে তোকে অপমান করুক।”
দুইবোন গল্প করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে গেল।
রুপু রান্না করছে। অয়ন বিরক্তমুখে রুপুর পাশে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল। বলল,
“কড়া এককাপ চা দাওতো বউদি।”
“মেজাজ এত চড়ে আছে কেন? রাতে ভালো ঘুম হয়নি?”
“ঘুমাব কীভাবে! তোমার বর তো তোমার শোকে রাতে একফোঁটা ঘুমায়নি। আর আমাকেও জ্বালিয়ে মেরেছে।”
“তোমার দাদা আবার আমার জন্য শোকও করে নাকি।”
“শুধু কী শোক। দুদিন পর তোমার প্রেমে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাবে। আমি তোমার দুটি পায়ে পড়ি বউদি। আজ রাতে দয়া করে তোমার বরকে আমার ঘরে ভুলেও পাঠাবে না। আর পাঠালেও কোন লাভ হবে না। আমি দরজা খুলব না।”
রুপু অয়নের সামনে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বলল,
“তোমার দাদার চোখে আমার জন্য প্রেম থাকলেও আমার হয়ে মুখে কোন কথা নেই।”
অয়ন রুপুর কথার গভীরতা বুঝতে পেরে চা খাওয়ায় মনোযোগ দিল।
বীথি রানী ভয়ংকর রেগে আছে। রাগটা কোনভাবেই রুপুর উপরে উগরে দিতে পারছে না। বোনটা সারাক্ষণ রুপুর গায়ের সাথে লেগে থাকছে। বোনের সামনে রুপুকে কিছু বলা যাবে না। বলতে হবে আড়ালে। রুপুকে পুরোপুরি একা পাওয়া গেল রান্নাঘরে। একা না। পাশে অবশ্য ময়নার মা-ও ছিল।
বীথি রানী বলল,
“কী রান্না করছ আজ?”
রুপু উত্তর দিল না।
“মুখে কী কুলুপ এঁটেছ? কথা বলছ না কেন? আর রান্না করার আগে কী আমাকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছ। আজ কী রান্না হবে।”
“সবসময় আপনাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে কেন? আপনার কিছু খেতে ইচ্ছে করলে বলুন আমি রান্না করে দিচ্ছি।”
“দুদিনের বউ হয়ে এই সংসারটা তুমি পুরোপুরি তোমার দখলে নিয়ে নিতে চাচ্ছ নাকি? এই আশা ভুলেও করো না। এর পরিণাম ভয়ংকর হবে। এই সংসার আমার তিলে তিলে গড়া।”
“বেশ তো। আমাকে আর আপনার ছেলেকে আলাদা সংসার করে দিন। আমিও আমার সংসারটা তিলে তিলে গড়ে নেই। প্রত্যেকটা মেয়েই তো নিজের একটা সংসার চায় মা।”
“কী বললে তুমি? বিয়ে হতে না হতেই তুমি আলাদা সংসার করার কথা ভাবছ।”
“আপাতত ভাবছি না। আপনার কথার পৃষ্টে
বললাম।”
“এই ভাবনা মাথায়ও এনো না তুমি। তাহলে সংসার আলাদা গড়ার স্বপ্ন তো বহুদূরের কথা। আমার ছেলের সাথে সংসার করতে পারবে কি-না..
“মা আমি আগেও একবার বলেছি। এসব দুপয়সার ভয় আমাকে দেখাতে আসবেন না।”
“শোনলাম তুমি নাকি পড়াশোনা করতে চাচ্ছ?”
“হ্যাঁ।”
“কোন পড়াশোনা করার দরকার নেই।”
“আপনি বললে তো হবে না মা।”
“আমি বললে হবে না মানে, তুমি আমার বাড়িতে থাকছো, খাচ্ছো আবার আমার ছেলের সংসার করছ। অথচ আমার কোন কথা রাখবে না। এটা তো মানব না।”
“সে আপনার মানা না মানায় আমার কিছু এসে যায় না।”
“পড়াশোনা করে কী করবে তুমি? যতটুকু পড়েছ। বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করার জন্য যথেষ্ট। আর পড়াশোনা করে অযথা একগাদা টাকা নষ্ট করার দরকার নেই।”
“নষ্ট হলে আপনার ছেলের টাকা নষ্ট হবে। আপনি এত প্যারা নিচ্ছেন কেন?”
“বাপের তো মুরোদ নেই। মেয়েকে পড়ানোর। সেই তো আমার ছেলের টাকায় পড়তে চাচ্ছ। আবার এত বড় বড় কথা। এতই পড়ার শখ যখন বাপকে বলো পড়ার খরচ দিতে। আমার ছেলেকে আমি একটা পয়সাও দিতে দেব না।”
“তামাশা করতে ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন নাকি? শুনুন মা, আপনি যেমন আপনার বরের টাকা দাপটের সাথে খরচা করেন। আমিও আমার বরের টাকা দাপটের সাথেই খরচা করব। দেখি আমাকে কে বাঁধা দেয়।”
“চোপা করে কতদিন টিকবে এই সংসারে তুমি?”
“যতদিন আপনি টিকে আছেন।”
“আসুক বিনয় বাড়িতে। তোমার বিষদাঁত আজ আমি ভাঙব। আমিও দেখব, তুমি কী করে পড়াশোনা করো।”
“দেখে নিয়েন। চ্যালেঞ্জ রইল..
বীথি রানী অতিরিক্ত রাগে কাঁপতে কাঁপতে রুপুর সামনে থেকে চায়ের কাপ টেনে নিয়ে আছড়ে ভেঙে ফেলল। তারপর ঘরে চলে গেল।
রুপুর বিয়ে পর্ব ১১
সারাদিন বীথি রানী একটাও কাজ করে না। সারাক্ষণ শুয়ে-বসে থাকে। বয়স হয়েছে শুয়ে-বসে থাকুক রুপুর কোন আপত্তি নেই। কিন্তু রুপু যখন সব কাজকর্ম শেষ করে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেয়। তখনই ওনি রুপুর শ্বশুর আর ছেলেদের সামনে দেখিয়ে দেখিয়ে কাজ করা শুরু করে। এমন ভাব-ভঙ্গি করে মনে হয়, ওনি না রুপুই সারাদিন কাজকর্ম বাদ দিয়ে শুয়ে-বসে ছিল আর ওনিই সবকাজ একা হাতে করেছে। ওনাদের সামনে বীথি রানীকে উন্মাদের মতো কাজ করতে দেখলে রুপুরই ভীষণ লজ্জা লাগে।
