রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৩১
মহাসিন
শাপলা ভয়ে ভয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল,
“আহ! আপনি?”
সিয়াম শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে সেই কখন থেকে খুঁজছি। কোথায় ছিলি তুই?”
শাপলা মৃদু অভিমানে বলল,
“আমিও তো সেই কখন থেকে আপনাকে খুঁজছি!”
সিয়ামের চোখে উদ্বেগের ছায়া। গলা নামিয়ে বলল,
“যখন দেখলাম সব ছাত্রছাত্রী ‘লা**শ! লা**শ!’ বলে চিৎকার করতে করতে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন থেকেই তোকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেছি।”
শাপলা আর দাঁড়াতে পারল না। গলা কেঁপে উঠল তার,
“চলুন, বাড়ি চলুন। আর ভালো লাগছে না। আমার খুব ভয় করছে।”
সিয়াম কিছু না বলে শাপলার হাতটা নিজের হাতে নিল। ধীর পায়ে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিল।
শাপলা চুপচাপ বসে পড়ল। সিয়াম ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল।
নিঃশব্দ রাস্তা ধরে গাড়িটা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে ছুটে চলল, পেছনে ফেলে এলো ভয় আর অস্থিরতায় ভরা সেই স্কুলপ্রাঙ্গণ।
দুপুর বারোটা। রোদ এখন ঠিক মাথার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। আলো-ছায়ার খেলা ভেঙে গিয়ে চারদিক ঝলমল করছে। স্কুলের ঘণ্টা পড়তেই ছুটির কোলাহলে ভরে উঠল চারপাশ।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীলাঞ্জনা। মেয়ে আলো বেরিয়ে আসতেই হাত ধরে বাসে তুলে দিল। ভিড় এড়িয়ে একদম পেছনের সিটে গিয়ে বসল মা মেয়ে।
বাস চলতে শুরু করতেই পাশের সিটে বসা মানুষটার দিকে চোখ পড়ল নীলাঞ্জনার। চমকে উঠে ফিসফিস করে ডাকল,
“রাকেশ স্যার?”
রাকেশ ঘুরে তাকাল। চোখের সামনে নীলাঞ্জনাকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে পুরনো হাসি।
“নীলাঞ্জনা! তুমি?”
নীলাঞ্জনা একটু ঝুঁকে বলল,
“স্যার, ভালো আছেন তো?”
“হ্যাঁ, মোটামুটি ভালো আছি,” রাকেশ ধীরে জবাব দিল।
“অনেক বছর পর দেখা হয়ে গেল। আপনি কিন্তু একদম আগের মতোই আছেন,” নীলাঞ্জনার গলায় বিস্ময়।
রাকেশ শুধু হালকা মাথা নাড়ল। তারপর আলোর দিকে তাকিয়ে হাসল,
“এই বুঝি তোমার মেয়ে?”
“হ্যাঁ স্যার, আমার আলো।”
“বাহ, নামটাও ভারী সুন্দর।”
একটু থেমে নীলাঞ্জনা ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“স্যার, লিমার কথা মনে আছে আপনার?”
রাকেশ কিছু বলার আগেই হঠাৎ বাসটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল,
“আমার গন্তব্য এসে গেছে। এবার নামতে হবে।”
বলেই তাড়াতাড়ি নেমে গেল। বাস আবার চলতে শুরু করল।
রাস্তার ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে রাকেশের ঠোঁটে ভেসে এলো পুরনো একটা গান—
“যখন খোলা চুলে, হয়তো মনের ভুলে,
তাকাত সে অবহেলে…
দু’চোখ মেলে হাজার কবিতা,
বেকার সবই তা, হাজার কবিতা বেকার সবই তা…
তার কথা কেউ বলে না।
সে প্রথম প্রেম আমার, নীলাঞ্জনা…
সে প্রথম প্রেম আমার, নীলাঞ্জনা।”_
দুপুরের তপ্ত রোদে গানের সুরটা মিলিয়ে গেল ধুলোয়। ঠিক এমনি কিছু প্রেম মিলিয়ে যায় তা কেউ জানে না।
বিকেল গড়িয়ে এসেছে।
সিয়াম ব্যালকনির এক কোণে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। মৃদু বাতাস এসে তার মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। কিন্তু সিয়ামের মন আজ কাজে বসছে না। হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল জেরিনের দেওয়া সেই চিরকুটটার কথা।
সে ধীর পায়ে ব্যালকনি ছেড়ে ঘরে ফিরে এসে ড্রয়ারটা খুলে ভাঁজ করা কাগজটা বের করল। হাতটা একটু কাঁপছে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে জানালাটা খুলে দিল। বাইরে থেকে আসা হালকা আলোয় কাগজটার ওপর চোখ রাখল। তারপর ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল—
প্রিয় সিয়াম,
জানি না আপনি এই চিঠি টা পড়বেন কিনা। তবু লিখছি, কারণ না লিখলে বুকের ভেতরটা ফেটে যাবে।
আমি আপনাকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছি, সিয়াম। এত বেশি যে নিজেকে সামলাতে পারি না। আপনার হাসি, আপনার কথা বলার ভঙ্গি, এমনকি আপনার নীরবতাও আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ মনে হয়।
কিন্তু আমি বুঝে গেছি—আপনাকে আমি কখনো পাব না। আমার ভালোবাসা শুরু থেকেই একতরফা ছিল, শেষ পর্যন্তও তাই রয়ে গেল।
জীবনে একটাই আফসোস থেকে যাবে আমার। সেটা হলো, আপনি আমাকে ভালোবাসলেন না। কখনো বোঝার চেষ্টাও করলেন না যে, এই পৃথিবীতে কেউ একজন নিঃশব্দে শুধু আপনার জন্য কাঁদে।
তবু অভিযোগ নেই। আমি আমার কল্পনার জগতে আপনাকে সারাজীবন ভালোবেসে যাব। সেই জগতে আপনি শুধু আমার। সেখানে শাপলা নেই, বাস্তবের কোনো বাধা নেই। বাস্তবের দুনিয়ায় হয়তো শাপলার জয় হলো, কিন্তু আমার কল্পনার রাজ্যে আমরা দুজন জিতে যাব—চিরকাল।
আমি কথা দিচ্ছি, আর কখনো আপনার আর শাপলার জীবনে কাঁটা হয়ে দাঁড়াব না। বরং দূর থেকে শুধু এই দোয়া করব, আপনারা যেন সারাজীবন সুখে থাকেন। আপনাদের হাসি দেখলেই আমার শান্তি হবে।
আমার বাকি জীবনটা শুধু আপনাকে ভালোবেসেই কাটিয়ে দেব। নিঃশব্দে, নিঃস্বার্থে, একতরফা।
ইতি,
‘আপনাকে একতরফা ভালোবেসে যাওয়া
জেরিন’
চিঠিটা পড়তে পড়তে সিয়ামের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। বাইরে থেকে আসা বাতাসটা হঠাৎ করেই ভারী লাগল। কাগজের ভাঁজে যেন জমে আছে।
শাপলা চুপচাপ নিজের রুমে বসে আছে। বাইরে বিকেলের নরম আলো জানালার ফাঁক গলে এসে মেঝেতে পড়ছে, কিন্তু তার মন পড়ে আছে অন্যখানে।
হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল নিরবের ভালোবাসার মানুষ চুমকির কথা। একটা অজানা কৌতূহল মনের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
ধীরে ধীরে শাপলা ফোনটা হাতে নিল। সেদিন ভালো করে দেখে রাখা নাম্বারটা মনে করে টিপে টিপে ডায়াল করল।
টু… টু… টু…
প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল, কেউ ধরল না। দ্বিতীয়বার কল দিতেই ওপাশ থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো—
“হ্যালো? কে আপনি?”
শাপলা একটু দম নিয়ে বলল, “আমি শাপলা। চিনতে পারছেন?”
ওপাশ থেকে হালকা বিস্ময়ের সুরে জবাব এলো, “ওহ, তুমি! কেমন আছো?”
“জি, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো আছি। তা… কিছু বলবে নাকি?”
শাপলা গলা নামিয়ে বলল, “হ্যাঁ, তবে আমি যে আপনার সাথে কথা বলতেছি, এটা যেন নিরব ভাইয়া না জানে।”
চুমকি হালকা হেসে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, বলো।”
“আপনি কি নিরব ভাইয়াকে ভালোবাসেন?” শাপলার প্রশ্নটা সরাসরি ছিল।
চুমকি একটু থেমে বলল, “এমন প্রশ্ন করার কারণ?”
“এমনি তো আর একটা ছেলের সাথে কেউ কথা বলে না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। তাই জিজ্ঞেস করলাম,” শাপলা ধীর গলায় বলল।
আর কিছু বলার আগেই ঘরের বাইরে থেকে সিয়ামের ডাক ভেসে এলো— “শাপলা!”
শাপলা ব্যস্ত হয়ে বলল, “আচ্ছা, আপনার সাথে পরে কথা বলি,” বলেই কল কেটে দিল।
তড়িঘড়ি করে দরজার কাছে গিয়ে সে দরজাটা খুলে দিল।
সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে একধরনের গম্ভীরতা।
“তোকে এক জায়গায় যেতে হবে,” সে ছোট করে বলল।
শাপলা ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন? এখন আবার কোথায় যাব?”
“তোর চাচার বাড়ি,” সিয়াম উত্তর দিল।
“কেন? এখন কেন যেতে হবে?”
“আগে চল, গেলেই দেখতে পারবি। মা-ও ওখানে গেছে। এখন তোকে নিয়ে যেতে বলেছে,” সিয়াম বলল।
শাপলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“কেন? ফুপ্পির কিছু হয়েছে নাকি?”
সিয়ামের মুখটা মুহূর্তের জন্য বেজার হয়ে গেল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “এত প্রশ্ন কেন করিস? আগে চল তো।”
এরপর দুজনে চুপচাপ ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
নীলাঞ্জনা আগেই তৈরি হয়ে ড্রয়িংরুমে বসে ছিল। তার পাশে কবিতা।
যাওয়ার আগে নীলাঞ্জনা কবিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “আলোকে দেখে রেখো। আমাদের আসতে দেরি হতে পারে।”
কবিতা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।
তারপর নীলাঞ্জনা, শাপলা আর সিয়াম— তিনজন নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল।
শাপলা, সিয়াম আর নীলাঞ্জনা এসে পৌঁছাল শাপলার চাচার বাড়িতে।
বাড়িটা কেমন নিঃশব্দ। পাখির ডাক নেই, মানুষের কোলাহল নেই। শুধু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে একটা ভারী, দমবন্ধ করা নীরবতা।
রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই শাপলার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
বসার ঘরের মেঝেতে সাদা কা*ফ*নের কাপড়ে মোড়ানো তিনটি নি*থ*র দে*হ।
শাপলার বাবা… তার মা… আর তার ফুপ্পি।
মায়ের নি*থ*র দে*হ*টার পাশে বসে মহুয়া ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চাচা আর চাচী বসে আছেন বাবা আর ফুপ্পির পাশে, দুজনেই নিঃশব্দে অশ্রু ফেলছেন। তাদের সান্তনা দিচ্ছে তাদের মেয়ে ঐশী, অথচ তার নিজের চোখও ভিজে আছে।
আরিফ এক কোণে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। ঘরে আরও কিছু মানুষ।
দৃশ্যটা দেখামাত্র শাপলার পা দুটো আর তাকে ধরে রাখতে পারল না।
“মা!”
একটা তীব্র আ*র্ত*নাদ করে সে ছুটে গেল মায়ের কাছে। মায়ের বুকের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“মা… ও মা… কী হয়েছে তোমার? তুমি আর বাবা কবে দেশে ফিরলে? মা কথা বলো… একবার কথা বলো না কেন? চুপ করে আছো কেন মা?”
তারপর বাবার মাথাটা কোলে তুলে নিল। দুই হাতে বাবার মুখ ছুঁয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল—
“বাবা… ও বাবা রে… তুমি চুপ করে আছো কেন? একবার তাকাও বাবা। আমাকে দেখো না বাবা?”
হঠাৎ করেই সে চিৎকার করে উঠল,
“কেউ কিছু বলছো না কেন? কী হয়েছে? কেউ বলো আমাকে! কী হয়েছে আমার বাবা মায়ের?”
কথা শেষ করেই সে পাগলের মতো মাকে জড়িয়ে ধরল।
“মা… ও মা… তুমি কথা বলছো না কেন? এভাবে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছো কেন? একবার উঠে বসো না মা। আমি যে ভয় পাচ্ছি!”
তারপর ছুটে গেল ফুপ্পির কাছে। ফুপ্পিকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ফুপ্পি… তুমি কবে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলে? একটু কথা বলো ফুপ্পি। আমাকে একবার ডাকো না?”
ঘরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে গেল।
হঠাৎ ঐশী ছুটে এসে শাপলার দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“চুপ কর শাপলা! চুপ কর!”
তার গলা কেঁপে উঠল, চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে।
“ওরা সবাই ম*রে গেছে শাপলা। আর কোনোদিন কথা বলবে না। চিরদিনের জন্য তাদের গল্পটা ফুরিয়ে গেছে। আর কখনো তোর সাথে, আমাদের সাথে, কারও সাথে কথা বলবে না ওরা।”
শাপলার পৃথিবীটা মুহূর্তে থমকে গেল।
“না!”
একটা বুকফাটা চিৎকার বেরিয়ে এলো তার গলা চিরে।
“না! তুই মিথ্যা বলছিস ঐশী! মিথ্যা বলছিস! এমন হতে পারে না। আমার মা… আমার বাবা… আমার ফুপ্পি… ওরা ম*র*তে পারে না। কখনো না!”
সে আবার ছুটে গেল মায়ের কাছে, বাবার কাছে, ফুপ্পির কাছে। একবার এখানে, একবার সেখানে—যেন কেউ একজন উঠে বসে বলবে, “কাঁদিস না মা, আমি আছি তো।”
কিন্তু কেউ উঠল না।
কেউ ডাকল না।
সবাই চিরনিদ্রায়।
শাপলা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। দুই হাতে মাটি আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমাকে একা করে চলে গেলে কেন? আমি যে তোমাদের ছাড়া কিছুই না মা… কিছুই না বাবা…”
ঘরভর্তি মানুষের কান্নার শব্দ, আর শাপলার বুকফাটা আ*র্ত*নাদ মিলে একটা শোকের সাগর তৈরি হলো।
শাপলা কাঁপতে কাঁপতে ঐশীকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না প্রায়।
“কীভাবে… কীভাবে এমন হলো ঐশী? আমাকে বল… একটু বল না। এই ঐশী, চুপ করে থাকিস না। কিছু বল!”
ঐশীর চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। সে শাপলার মাথায় হাত রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“তোর বাবা-মা… বিদেশে থাকা অবস্থায় গাড়ি এ*ক্সি*ডে*ন্টে মা*রা গেছে শাপলা। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল।”
শাপলার শ্বাস আটকে এলো।
ঐশী আবার বলল, “আর ফুপ্পিকে… ফুপ্পিকে টাকার অভাবে বাঁ*চা*নো গেল না রে। যারা এতদিন টাকা দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, তারা চলে যাওয়ার পর ফুপ্পি আর টিকতে পারল না।”
কথাটা বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল শাপলার।
“না!”
একটা বুকফাটা চিৎকার করে সে ছিটকে সরে গেল ঐশীর কাছ থেকে।
মহুয়া ছুটে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। “শান্ত হ শাপলা… শান্ত হ মা…”
কিন্তু শাপলা কারও কথা শুনতে পাচ্ছে না। তার কানে এখন শুধু বাজছে— _মা*রা গেছে… টাকার অভাবে বাঁ*চানো যায়নি… চিরদিনের জন্য শেষ…_
সে ছুটে গেল মায়ের নিথর দেহটার কাছে। মায়ের বুকের ওপর মুখ গুঁজে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।
“মা… ও মা… আমাকে একা রেখে কেন চলে গেলে? এখন আমি কাকে মা বলে ডাকবো? কে আমাকে বুকে জড়িয়ে বলবে, ভয় নেই মা, আমি আছি?”
তার গলা ভেঙে আসছে, প্রতিটা শব্দের সাথে বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
“ও মা… একবার কথা বলো না… একবার চোখ খুলে দেখো না। আমি যে আর পারছি না মা। তোমরা সবাই আমাকে রেখে চলে গেলে কেন? আমি তো তোমাদের ছাড়া কিছুই না!”
শাপলার করুন আ*র্ত*নাদে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেছে ।
মহুয়া তাকে বুকের সাথে চেপে ধরে নিজেও কাঁদছে। ঐশীর চোখের পানি থামছে না। আরিফ দেয়ালে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে চোখ মুছছে। নীলাঞ্জনা সিয়াম এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সিয়াম শাপলা কে একটু সান্তনা দিতে পারছে না যদি কেউ সন্দেহ করে।
ঘরভর্তি মানুষ, অথচ চারপাশে শুধু শূন্যতা।
শাপলার মনে হচ্ছে, তার পৃথিবীটা এক ঝটকায় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আর সেই টুকরোগুলো কুড়িয়ে জোড়া লাগানোর মতো কেউ নেই।
সে মায়ের কা*প*নের কাপড় খামচে ধরে ফিসফিস করে বলল,
“আমি যে বড্ড একা হয়ে গেলাম মা… বড্ড একা…”
রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৩০
দেখতে দেখতে কেটে গেল সতেরোটা দিন।
সেই ভয়ংকর শোকের ছায়া এখনও শাপলার চোখে লেগে আছে, তবু সময়ের নিয়মে মানুষকে একটু একটু করে নিজেকে সামলাতে হয়। শাপলাও ধীরে ধীরে বাবা মায়ের মৃ*ত্যুর শোকটাকে বুকের গভীরে চেপে রেখে বাঁচতে শিখছে।
ঘড়ির কাঁটা বলছে বেলা এগারোটা।
ড্রয়িংরুমে শাপলা বসে টিভি দেখছে। পর্দায় চলছে কোনো পুরনো সিনেমা, কিন্তু শাপলার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। তার চোখে সেই পুরনো শূন্যতা, শুধু চোখের নিচের কালি একটু হালকা হয়েছে।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে মশলার মিষ্টি গন্ধ। নীলাঞ্জনা রাঁধছে। দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছে।
হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা চিরে বেজে উঠল কলিং বেলের শব্দ— _টিং টং!_
শাপলা চমকে তাকাল দরজার দিকে।
ধীর পায়ে উঠে গিয়ে সে সদর দরজার কাছে এগিয়ে গেল। বুকের ভেতর অজানা এক কাঁপন।
দরজা খুলতেই দেখল, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে। হাতে একটা লাগেজ।
