Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৯

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৯

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৯
মহাসিন

শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, জরাজীর্ণ এক পুরনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল শাপলা। বাড়ির চারপাশটা বেশ নির্জন, যেন অনেক বছর ধরেই মানুষজনের আনাগোনা নেই। শাপলা আসতেই ছায়ার মতো অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল মুখোশধারী এক তরুণী। পরনে কালো শার্ট আর প্যান্ট, মুখটা পুরোপুরি ঢাকা।
তরুণীটি কাছে এসে মৃদু স্বরে বলল,
_”কখন থেকে তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, আর তুই এখন এলি?”
শাপলা একটু বিরক্তি নিয়ে হাত নেড়ে বলল,
_ “থাক ওসব কথা। আপাতত বল, সব কিছু ঠিকঠাক আছে তো?”
তরুণীটি মাথা নাড়িয়ে নিশ্চিত করল,

“হ্যাঁ, সব একদম পরিকল্পনা মতো চলছে।”
শাপলা নিজের ব্যাগ থেকে দুটি টাকার বান্ডিল বের করে মেয়েটির হাতে তুলে দিল। টাকাগুলো দেখে তরুণীটি কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”এত টাকা কোথায় পেলি?”
শাপলা তার কথার উত্তর এড়িয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
_”কেমন করে পেয়েছি তা জেনে তোর দরকার নেই। তুই বরং নিজের কাজের দিকে মন দে।”
তরুণীটি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
_”তুই কি একবার দেখবি না?”
শাপলা এক মুহূর্ত ভেবে উদাসীনভাবে জানাল, _”না, এখন আর ইচ্ছা করছে না।”
কিন্তু মেয়েটি জোর দিয়ে বলল,
_”এসেছিস যখন, দেখে যা। আমার মনে হয় দেখাটা জরুরি।”
শাপলার আর কোনো উপায় না থাকায় সে সম্মতি জানাল। দুজনে মিলে সাবধানে এই পুরনো বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর তারা বাইরে বেরিয়ে এলো । শাপলার চোখেমুখে এক ধরনের উদ্বেগের ছাপ।
যাওয়ার আগে শাপলা সতর্ক করে দিয়ে বলল,
_ “যা করার খুব সাবধানে করবি, কোনো ভুল যেন না হয়।”
তরুণীটি আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করিস না, আমি সব সামলে নেব।”
শাপলা আর কথা বাড়াল না। নিঃশব্দে সে হাঁটতে শুরু করল মেইন রোডের দিকে। কিছুক্ষণ পর একটা অটো থামিয়ে সে উঠে পড়ল, আর ধীরে ধীরে শহরতলীর সেই রহস্যময় এলাকা থেকে হারিয়ে গেল।

বিকেলের নরম আলোয় চারপাশটা এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। মৃদু বাতাসে গাছের পাতাগুলো যেন একে অপরের সাথে গল্প করছে, আর পাখির দল নীড়ে ফেরার ব্যস্ততায় আকাশ চিরে উড়ে চলেছে। এই মনোরম বিকেলে বাড়ির পেছনের বাগানে বসে সময় কাটাচ্ছে নীলাঞ্জনা, কবিতা আর কলি।
তবে তাদের আড্ডায় আজ কিছুটা উদ্বেগের ছোঁয়া। শাপলার কথা ভেবেই নীলাঞ্জনা বেশ কিছুক্ষণ ধরে অস্থির হয়ে আছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”শাপলা তো সেই কখন গেল, অথচ এখনো ফেরার নাম নেই!”
কবিতা তার পাশে বসে আলতো করে ঘাসগুলো স্পর্শ করছে। সে মাথা নেড়ে বলল,
_ “একদম ঠিক বলেছ। ওর অন্তত কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু শুনলই না কারো কথা।”
কলি একটু অভিমানের সুরেই যোগ করল,
_”আর বলো না, আমি তো ওকে কতবার বললাম যাবো, কিন্তু আমায় একদম পাত্তা দিল না! একা একাই চলে গেল।”
চিন্তিত হয়ে কবিতা পরামর্শ দিল,

_”এক কাজ কর না, ওকে একটা ফোন করে দেখ না কী অবস্থা?”
নীলাঞ্জনা ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুটা অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
_”অনেকবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ও তো ফোন ধরছেই না!”
_”আর একবার চেষ্টা করে দেখ না,” কবিতার অনুরোধে নীলাঞ্জনা পুনরায় শাপলার নাম্বারে কল দিল। এবার ওপাশ থেকে সাড়া পাওয়া গেল, _”হ্যালো।”
নীলাঞ্জনা কিছুটা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,
_ “শাপলা! তুমি কখন গেছো, তোমার কি সময়ের কোনো খেয়াল আছে?”
শাপলার শান্ত উত্তর এল,
_ “হ্যাঁ, খেয়াল আছে।”
নীলাঞ্জনা ঝংকার দিয়ে উঠল,
_ “খেয়াল থাকলে তো এতক্ষণে ফিরে আসতে! আর আমি এতবার কল দিলাম, একবারও রিসিভ করলে না কেন?”
শাপলা হালকা গলায় জবাব দিল,
_ “ফোনটা সাইলেন্ট ছিল, তাই বুঝতে পারিনি।”
নীলাঞ্জনা বিরক্তি চেপে জিজ্ঞেস করল,

_ “আচ্ছা, কখন ফিরবে?”
“আমি আসতেছি।”
_”ঠিক আছে, দ্রুত চলে এসো,” এইটুকু বলেই নীলাঞ্জনা ফোনটা রেখে দিল।
কবিতা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
_ “দেখেছিস? শাপলা কেমন যেন অদ্ভুত সব কথা বলছে!”
নীলাঞ্জনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”যাক হোক, ওর কথা বাদ দাও। ও আসবে খন।”
পরিবেশটা একটু হালকা করতে কলি উৎসাহের সাথে বলল,
_”আরে এসব চিন্তা বাদ দাও তো! তার চেয়ে বরং ধাঁধা খেলা যাক।”
নীলাঞ্জনা কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
_”আমি তো ধাঁধা তেমন একটা পারি না।”
কবিতা হাসিমুখে বলল,
_”কোনো সমস্যা নেই। কলি, তুইই শুরু কর না একটা ধাঁধা দিয়ে।”
কলি বুদ্ধিদীপ্ত মুখে বলল,
_ “আচ্ছা, বলো তো, (এক খুডার ঘর) বল দেখি এটা কী?”
নীলাঞ্জনা আর কবিতা একে অপরের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। কবিতা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
_”কী বললি? খুডা মানে কী? কিছুই তো বুঝলাম না!”
কলি খিলখিল করে হেসে উঠল,

_ “ঠিক আছে, ওটা বাদ দিলাম। অন্যটা শোনো, (হাত নেই অথচ দেয়াল ঘড়ি ধরে রাখে, পা নেই অথচ সবসময় দৌড়ায়।) বল তো সেটা কে?”
নীলাঞ্জনা একটু ভেবে বলল,
_ “এটা কি পানি?”
কলি মাথা নেড়ে বলল,
_ “উঁহু, হলো না।”
কবিতা আন্দাজ করার চেষ্টা করল,
_”মাটি?”
কলিও তা নাকচ করে দিল।
এবার কবিতা একটা ধাঁধা ধরল,
_”বল দেখি, (কোন জিনিসটি সবসময় আমাদের সামনে থাকে কিন্তু আমরা তাকে দেখতে পাই না)?”
কলি সাথে সাথে উত্তর দিল,
_”এটা তো একদম সহজ! নাক।”
কবিতা মুচকি হেসে বলল,
_”না, হলো না।”
নীলাঞ্জনা চেষ্টা করল,

_ “চোখের পাপড়ি?”
কবিতা আবারও বলল,
_ “না, ওটাও নয়।”
হাল ছাড়ার পাত্রী নয় তারা। এবার নীলাঞ্জনা বলল,
_”আচ্ছা, আমি একটা ধরছি শোনো,(কার কোনো ভাষা নেই, কিন্তু সে পৃথিবীর সবকিছু বলে দিতে পারে?”)
কলি কিছুটা সময় ভেবে উজ্জ্বল মুখে বলে উঠল,
_”আমি জানি! এটা নিশ্চয়ই বই।”
কবিতা উৎসাহের সাথে সায় দিয়ে বলল,
_ “হ্যাঁ, একদম ঠিক! এটা বইই হবে, আমি শিওর।”
নীলাঞ্জনা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, “হ্যাঁ, একদম ঠিক , উত্তরটা বইই।”
বিকেলের এই মায়াবী আবহে তাদের আড্ডাটা বেশ জমজমাট হয়ে উঠে। শাপলা ফেরার অপেক্ষার মাঝে ধাঁধার এই খেলা তাদের উদ্বেগ অনেকটা কমিয়ে দিল।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ড্রয়িং রুমের স্নিগ্ধ আলোয় বসে আছে নীলাঞ্জনা, কবিতা আর কলি। বাইরে গোধূলির বিদায়লগ্নে চারপাশটা ক্রমশ নিস্তব্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু তাদের আড্ডার আমেজ এখনো কাটেনি। তবে শাপলার ফেরার অপেক্ষায় সবার নজর দরজার দিকে। সময়ের কাঁটা পেরিয়ে গেলেও শাপলার কোনো সাড়া না থাকায় চাপা উত্তেজনা কাজ করছে সবার মাঝে।
হঠাৎ করেই ড্রয়িং রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে বেজে উঠল কলিং বেল। দ্রুত পায়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল কলি। শাপলা ঘরে প্রবেশ করতেই কলি তড়িঘড়ি করে সদর দরজাটি আটকে দিল। যেন বাইরে থেকে কোনো অস্বস্তি ভেতরে না আসে।
ভ্রু কুঁচকে তাকাল কবিতা। শাপলার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল,
_”তোর সমস্যাটা কী বল তো? এত দেরি করে আসার কারণটা কী? কোনো হুঁশ আছে?”
শাপলা ক্লান্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
_”রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম ছিল, তাই দেরি হয়ে গেল।”
কথাটা বলেই কাউকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে শাপলা সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। তার এমন আচরণে অবাক হয়ে কবিতা বিড়বিড় করে বলল,
_”কী একটা অদ্ভুত স্বভাব! কাউকে তো পাত্তা দেওয়ার নামগন্ধ নেই।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ওপরের ঘর থেকে কলিকে ডাক দিলেন বিরাজ। ডাক শোনার সাথে সাথে কলি সব কাজ ফেলে দ্রুত চলে গেল তার কাছে। ঘরের ভেতরে এসে ঈষৎ সংকোচে জিজ্ঞেস করল,

_”বলুন, আমাকে ডেকেছেন কেন?”
বিরাজ শান্ত অথচ গভীর স্বরে বললেন,
_ “আমার কাছে এসো।”
কলির কণ্ঠে কিছুটা দ্বিধা ,
_ “কেন বলুন তো?”
বিরাজ মৃদু হাসলেন,
_ “কেন, সেটা কি এখনো বুঝতে পারছো না?”
কলি মাথা নিচু করে রইল,
_”আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”
বিরাজ ইশারায় তাকে আরো কাছে ডাকলো। কলি দ্বিধা কাটিয়ে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলো বিরাজের দিকে। কাছে যেতেই বিরাজ তাকে পরম আদরে জড়িয়ে ধরলেন। স্পর্শের উষ্ণতায় কলির সারা শরীর এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল।
বিরাজ ফিসফিস করে বলল,

_”এখন বুঝতে পারলে, কেন ডেকেছি?”
কলি লজ্জায় মাথা নেড়ে সায় দিল। বিরাজ আবার জিজ্ঞেস করলো ,
_”তাহলে আমি কি শুরু করতে পারি?”
কলি কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে বলল,
_”কী শুরু করবেন?”
বিরাজ মুচকি হেসে বললেন,
_ “তুমি কি সত্যিই জানো না?”
কলি আবারও সরলভাবে উত্তর দিল,
_”না, আমি সত্যি জানি না।”
বিরাজ পরম মমতায় তার দিকে তাকিয়ে বলল, _”ঠিক আছে, না জানলেও চলবে।”
বাইরে এখন অন্ধকারের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে রাত, আর ঘরের ভেতরের এই নিভৃত কোণে তারা দুজনে যেন এক গভীর অনুভূতির সাগরে হারিয়ে গেছে।
এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন বিরাজ কলির কাছ থেকে সরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে এখন রে /শ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কলি ছখনো আড়ষ্ট, তার দুচোখ জুড়ে এক গভীর লজ্জার আবেশ। এই দৃষ্টি নামিয়ে চুপ করে রইল।
বিরাজ কলির খুব কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

_ “কী, কেমন লাগছে?”
কলি কোনো কথা বলল না, শুধু নিস্তব্ধতায় আরও একটু গুটিয়ে নিল নিজেকে। তার এই নীরবতাই যেন হাজারটা অনুভূতির কথা বলে দিচ্ছে।
বিরাজ মৃদু হেসে, আবার কলির দিকে ঝুঁকে পড়ল। নিচু স্বরে বলল,
_ “আমার তো মনে হচ্ছে এই ভালো লাগার রে/ শ কাটেনি। আবারও ইচ্ছে করছে।”
কলি চঞ্চল হয়ে বলে উঠল,

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৫৮

_”না, এ/ কদম না! এখন আর একেবারেই নয়।”
বিরাজ তার চোখে চোখ রেখে দুষ্টুমির হাসি হাসল,
_”না? কিন্তু আমার মন যে কিছুতেই মানছে না। আমি যে আবার সবটুকু নতুন করে অনু/ ভব ক/রতে চা/ই।”
কথার শেষ হওয়ার আগেই ভালোবাসার সেই বাঁধন আবার নতুন করে দানা বাঁধল।

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here