লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৫
লিজা মনি
উত্তপ্ত দুপুর । ব্ল্যাক গ্লাস মিনারের কাচে প্রতিফলিত চাঁদের রূপালি রেখা। মিনারের নিচে নীরবতার গহ্বরে দাঁড়িয়ে আছে এক ভয়াল উপস্থিতি—গ্যাংস্টার বস। নিকেত ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা। ধূসর চোখে মৃত্যুর নীল আগুন জ্বলে উঠে।পাশে দুই বিশ্বস্ত সঙ্গী—আরিশ ও অধিরাজ।দু’জনেই কালো কোটে মোড়া। অস্ত্রের ভারে হাত শক্ত হয়ে আছে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই বর্তমানে। শুধু দৃষ্টি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে জেটের দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রাইভেট জেটটা রানওয়ের ধারে স্থির হয়ে আছে।কালো দেহরেখায় এক ভাসমান ছায়া। রবাতাসে জ্বালানি আর গ্রীসের গন্ধ মিশে গেছে। ছয়জন দেহরক্ষী নিঃশব্দে অস্ত্রগুলো জেটের ভেতর তুলছে। প্রতিটি অস্ত্র যেন একেকটি মৃত্যুর প্রতিশ্রুতি।Heckler & Koch MP7, FN SCAR-H, Beretta M9, AK-103, আর সেই কালো বক্সের গভীরে রাখা আছে এক ভয়ানক জিনিস—Dragunov sniper। এর নিঃশব্দ গর্জন একেক সময় শহরের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।
অস্ত্রগুলো সাজানোর সময় বাতাসে একটা ধাতব গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অধিরাজ নিচু স্বরে বলে ওঠে,
“সবকিছু নির্দিষ্ট রুটেই যাবে, বস। এক সেকেন্ডেরও বিলম্ব হবে না।”
আরিশ শুধু একবার ঘড়ির দিকে তাকায়। তারপর গ্যাংস্টার বসের দিকে চোখ তোলে। ভিতরে লুকিয়ে আছে রক্তের উন্মাদনা।
নিক সিগারেটটা জ্বালিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে দেয় ধীর গতিতে। সেই ধোঁয়ার রেখা মিলিয়ে যায় রাতের কালো শূন্যতায়। নিক হাত দিয়ে ইশারা করে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে ওঠে,
“দ্রুত শেষ করা হোক। আর জানিয়ে দিবে, দুই দিনের ভিতর কোনো অস্ত্র যাবে না।
নিক কথাটা বলে গাড়ির দিকে চলে যায়। উদ্দেশ্যে নিজের গ্লাস মিনারে পৌঁছানো। হাত দিয়ে অধিরাজ আর আরিশকে ইশারা করে চলে আসার জন্য। তিন জন গাড়িতে গিয়ে বসে পড়ে।
নিকের চালিত কালো লাক্সারি গাড়ি তার ধীরে ধীরে মিনারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছনের আসনে বসা গ্যাংস্টার বস।
রাস্তার বাঁক আর মিনারের ধাতব প্রতিফলিত আলোতে হঠাৎ গাড়ির পিছন পিছন এক ছায়া নেমে আসে।কালো মুখোশে ঢাকা আগন্তুক।হাতে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল।চোখে অদ্ভুত অগ্নি। লোকটা হিংসাত্নকভাবে তাকায় অগ্নির দিকে।
হঠাৎ আগন্তুকেরা পিছন থেকে বুলেট ছুঁড়ে। অধিরাজ গাড়িটা সামলাতে পারে নি। তাই কিছুটা গাড়ি বাঁক খায়।চাকা কংক্রিটে চেপে ফিসফিস করছে। নিক রাগে চোয়াল শক্ত করে ফেলে। বুলটা একদম অধিরাজের হাত ঘেষে গিয়েছে। অধিরাজ অশান্ত গলায় বলে,
” বস কেউ একজন পিছন থেকে আ্যটাক করছে। প্রতিহত না করলে বুলেট গায়ে লেগে যাবে। আপনাকে অন্তত আজ সুস্থ থাকতে হবে। আজ রাতে সব থেকে বড় কাজ আপনার।
গ্যাংস্টার বস গ্রিবাদেশ নাড়ায়। গম্ভীরতা নিয়ে বলে,
” কে মরতে এসেছে আবার?
আরিশ চোয়াল শক্ত করে কিছু বিশ্রি গালি দেয়। নিক স্থির চোখে লক্ষ্য স্থির করে পিছনে এক পলক তাকায়। মুহূর্তে’ই আরেকটা বুলেট আসে। বুলেটটা অধিরাজের মাথা বরাবর আসে। নিক হাত দিয়ে আটকে ফেলে। ফলে পুরোটা বুলেট হাতে গেঁথে যায়। সাথে সাথে চোখ খিঁচে ফেলে। আরিশ অধৈর্য হয়ে গাড়ি থেকে একটা রুমাল বের করে। এরপর শক্তভাবে পেঁচিয়ে বেঁধে দেয়। আরিশের রাগে শরীর জ্বলে উঠে। রিভলভারটা হাতে নিয়ে এক নিশ্বাসে সব গুলো বুলেট পিছনে ছুঁড়ে দেয়। জানা নেই কোথায় মেরেছে, কার শরীরে লেগেছে। তবে বিকট দুইটা আর্তচিৎকার বেরিয়ে আসে। তার মানে প্রতিটা বুলেট নিশানা অনুযায়ী লেগেছে। আরিশ অধর বাকায়। অধিরাজ গাড়ি থামিয়ে দেয়। গাড়িটা সামান্য এগিয়ে গিয়ে ব্রেক কষে। নিক গাড়ি থেকে নেমে দাঁত কটমট করতে থাকে। অধিরাজকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলে,
” টর্চার সেলে নিয়ে যা। কাল সন্ধ্যায় এদের ব্যবস্থা হবে। জঘন্য মৃত্যুর সম্মুখীন করাব দুইটা বীচ-কে।
দিনের আলোটা তখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি।তবুও সূর্যের দীপ্তি যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো সারাদিনের পরিশ্রমে। আকাশে মেঘের আস্তর।হালকা ধূসর আভা ছড়িয়ে আছে চারদিক জুড়ে। নদীর জলটা শান্ত কিন্তু সেই শান্তির ভিতরে লুকিয়ে আছে একরাশ অদ্ভুত অস্থিরতা।যেন গভীরের কোথাও কিছু একটা অচেনা আলোড়ন চলছে।
ব্রিজের ধারে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী—নিস্তব্ধ ও স্থির। তার চোখে এক অজানা প্রতীক্ষার তীব্রতা। হাওয়ায় উড়ছে তার চুল ও নরম শাড়ির আঁচল নদীর বাতাসে কেঁপে উঠছে বারবার।
তার দু’হাত রেলিংয়ের উপর আলতোভাবে রাখা। আঙুলের ডগাগুলোতে কাঁপন লেগেছে কিন্তু দৃষ্টি নিবদ্ধ দূর দিগন্তে।
পায়ের নিচে ব্রিজের লোহার তলায় নদীর ঢেউ আছড়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। তাল মিলিয়ে মেয়েটির নিঃশ্বাসও যেন ভারী হয়ে উঠছে।
আকাশে তখন কাক উড়ছে নীরবে।দূরে নৌকার ছায়া দুলছে নদীর বুকের উপর। তবুও মেয়েটির দৃষ্টি অটল একটানা গভীর। তানভীর চোখে এক ধরনের ক্লান্ত আলো। চারপাশের আলো নিস্তব্ধ।বাতাস কেবল তার শাড়ির আঁচলে খেলা করছে। নদীর গন্ধে ভেসে আসছে বিকেলের বিষণ্ণতা।
তানভী একবার ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলে,
“ও আসবে… নিশ্চয়ই আসবে।”
কিন্তু সেই শব্দটুকুও বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।নদীর ঢেউয়ের শব্দে হারিয়ে।সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।আর সে নিজেই হয়ে উঠেছে অপেক্ষার প্রতিমূর্তি।এক তরুণী যে ভালোবাসা আর প্রতীক্ষার মধ্যবর্তী এক সীমারেখায় দাঁড়িয়ে আছে।
তানভী বার বার হাত ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। সমুদ্রের নীল পানির মত তার চোখেও দুই ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। ঠোঁট কামড়ে মলিন হেসে বলে,
” এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি। তুমি কি আসবে না রাজ? মরে যাওয়ার কথা বলেছি এর পরও এলে না। তার মানে আমার বাঁচা- মরা নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। আমি মরে গেলে কি একটু কষ্ট পাবে না? হয়ত পাবে না। তাই – তো মৃত্যুর মত এমন একটা কথা শুনে ও তুমি আসো না। তার মানে এতদিন সত্যি কোনো এক মরিচীকার পিছনে ঘুরেছি। আমার জন্য তোমার মনে কি এক বিন্দু ভালোবাসা ও নেই। আমাকে নিঃস্ব করো না রাজ। সে আমাকে ভালোবাসে নি কিন্তু আমি তাকে পাগলের মত ভালোবাসি। আমি ফেরারী হয়ে তোমার মরিচীকা দুর করে দিতাম। সামান্য ভালোবাসা-ই তো চেয়েছিলাম। কেনো দিলে না? কেনো এলে না আজ? ভেবেছিলাম হয়ত তোমার পাথর মনের কোনো এক জায়গায় আমার জন্য এক বিন্দু হলেও ভালোবাসা আছে। তাই তো বার বার উপেক্ষার পরও বেহায়ার মত তোমার সন্নিকটে গিয়েছি। বার বার তুচ্ছ- তাচ্ছিল্য পেয়েও হাসি মুখে চেয়ে থাকতাম। মরে যাব শুনে ও যেহেতু তুমি আসো নি, তার মানে তুমি আমার মরন চাও রাজ? যদি এইটা তোমার ইচ্ছে থাকে তাহলে আমি ইচ্ছে পুরন করব। ভালোবাসি আমি তোমাকে। তোমার ইচ্ছেকে কিভাবে অপূর্ন রাখি বলো?
তানভী- চোখের পানি মুছে মুচকি হাসলো। এই হাসিতে লুকিয়ে আছে কত- শত ব্যাথা আর ভালোবাসা অপূর্নতার গল্প। তানভী-র শরীরের শক্তি কমে আসছে। চোখের পানি মুছে ও শান্তি পাচ্ছে না। যেন সমুদ্রের সব পানি আজ তার চোখ থেকে পড়ছে। শক্তিহীন শরীরটাকে কোনোরকম টেনে – টুনে ব্রিজের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ থেমে যায়। চোখ বন্ধ করে বড় করে নিশ্বাস টানে। অধরে এক তৃপ্তির হাসি ফুটি উঠে। এই গন্ধটা কোনো একজনের শরীরের। খুব পরিচিত এই সুঘ্রান। মুরুভূমিতে এক ফোটা পানি পড়লে যেমন সব কিছু জীবন্ত হয়ে উঠে তেমন তাহ্বীর তৃষ্ণার্ত মন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
সামান্য হেসে সামনে তাকয়ে বলে,
” তুমি এসেছো রাজ? তুমি সত্যি এসেছো? পাশে তাকাতে সাহস পাচ্ছি না। যদি কোনো ভ্রম হয়।
কিছুক্ষন পিন পিন নিরবতা। একটা ভারী গম্ভীর আওয়াজের পুরুষনালী কন্ঠে ভেসে আসে,
” না তাকিয়ে কিভাবে বুঝলে, এইটা আমি? ভ্রম নয়। বাস্তবে এসেছি।
তানভী চোখ বন্ধ করে ফেললো। খুশিতে আবার কেঁদে দিলো মেয়েটা। তবে এইট ছিলো নিঃশ্বব্দ কান্না। নিজেকে স্বাভাবিক করে নাক টেনে ফিচেল হাসি দিয়ে বলে,
” আমাকে অন্ধ করে দিয়ে যদি হাজার জন পুরুষের মধ্যে তোমাকে যাচাই করতে বলে তাহলে নিশ্বঃন্দেহে আমি তোমাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরব। ঠিক ততটা অনুমান করতে পারি তোমাকে। এই পারফিউম, এই শরীরের গন্ধ আমার খুব আপন। আমার একান্ত জিনিস।
অধিরাজ এক দৃষ্টিতে তাকায় তানহ্বীর ফোলা ফোলা লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুইটার দিকে। কিছুক্ষন দৃষ্টি রেখে নিম্ন আওয়াজে বলে,
— কেনো ডেকেছো? দ্রুত বলো, কাজ আছে।
তানভী মলিন মুখে বলে,
” প্রতিদিন খুন করে শরীর টুকরো টুকরো তো করো। আজ না হয় আমার সাথে দশটা মিনিট কাটাও। ভালো লাগবে আমার।
অধিরাজ কপাট রাগ দেখিয়ে বলে,
” অযথা সময় নষ্ট করতে আমি আগ্রহী নয় তানভী। তোমার মত এদিক- সেদিক ঘুরে বেড়ানো আমার কাজ নয়। আমার প্রচুর কাজ আছে।
তানভী মৃদু হেসে বলে,
” আমার সাথে সময় কাটানো তোমার জন্য অযথা? মানুষ মনে হয় না আমাকে রাজ। বার বার তোমার কাছে হাত পাতি বলে দুর্বল ভেবে নিয়েছো। তাই বার বার এইভাবে অপমান করে খালি হাতে ফিরিয়ে দাও?
আচ্ছা রাজ আমাকে কি ভালোবাসা যায় না?
অধিরাজ কাট কাট গলায় জবাব দেয়,
” নাহ! যায় না।
তানভী- ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে রেখে বলে,
” এতটা অবহেলা করছো?
— করছি।
— আই রিপিট আমি তোমাকে ভালোবাসি রাজ।
অধিরাজ চোয়াল শক্ত করে বলে,
” আমি তোমাকে ভালোবাসি না।
— কেনো ভালোবাসো না? আমরা দুইজনের গায়ের রং এক। দুইজনের ধর্ম এক। তাহলে কেনো ভালোবাসো না?
অধিরাজ গম্ভীর গলায় বলে,
— কারন আমাদের প্রফেশন আলাদা তানভী। আমি মাফিয়া জগতের অংশ। বেঁচে থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে কোনো সময় আক্রমন হয়। সেই আক্রমনে হয়ত একদিন মরেও যেতে পারি। দুর্বলতা রেখে দুনিয়া ত্যাগ করতে চাই না।
তানভী দুই পা এগিয়ে আসে। অধিরাজের সামনে দাঁড়িয় মাথা উচু করে বলে,
” চিন্তা করো না।।তুমি মরলে এমনিতেও আমি বাঁচব না। তবুও কেনো এত বাঁধা।
— পাগলামী করছো তানভী।
— প্রথম থেকেই করছি সেটা।
— ভুল করছো।
তানভী ফিচেল হাসি দিয়ে বলে,
” মানলাম আমি ভুল করেছি।।সমস্ত কাজ ফেলে রেখে তুমি কেনো এসেছো? মরে যাব সেই ভয়ে ? আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় কাজ করে তোমার মনে?
অধিরাজ এদিক- সেদিক তাকায়। তানভী-র লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুইটার দিকে তাকিয়ে বলে,
” কান্না করছিলে?
তানভী মুচকি হেসে বলে,
” কিভাবে বুঝলে?
— তোমার চোখ দুইটা লাল হয়ে আছে। এমনটা কান্নার কারনেই হয়ে থাকে।
— এতটা খেয়াল করেছো?
অধিরাজ বিরক্তির দৃষ্টি দিয়ে বলে,
” তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম তাই চোখে পড়েছে। প্রশ্নের উত্তর কিন্তু পায় নি।
তানভী নাক টেনে সামান্য শ্বাস ছেড়ে বলে,
” করছিলাম কান্না।
অধিরাজের ভ্রুঁ ভাঁজ পড়ে,
” কেনো? কেনো কান্না করছিলে?
— ভেবেছিলাম তুমি হয়ত আসবে না।
— এখন যদি না আসতাম?
— মরতাম। আরেকটু পর আসলে হয়ত আমার চোখ বন্ধ, নিশ্বাস আটকে রাখা দেহটা পেতে তুমি।
অধিরাজ রক্তলাল চোখে তাকায় তানভী-র দিকে তাকায়। তনভী তৃষ্ণার্ত কাকের মত অধিরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। অধিরাজ রাগ কন্ট্রোল করার জন্য দাঁত পিষে বলে,
” এখানে না আসাটাই উচিৎ ছিলো । মরে গেলে অন্তত তোমার মত একটা পাগলের হাত থেকে রেহায় পেতাম।
অধিরাজ কথাটা বলে দাঁড়ায় না। উল্টে ঘুরে গাড়ির দিকে হাটা শুরু করে দেয়। রাগে শরীর কাঁপছে তার। কিন্তু কেনো রাগে কাঁপছে হয়ত নিজেও জানে না। গাড়ির কাছে গিয়ে গাড়ির উপর হাত দিয়ে সজোরে আঘাত বসায়।।চোখ বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস টানে।
দিন ছিলো মেঘলা নিস্তেজ এক বিকেল। সূর্যের আলোটা শহরের কোলাহলে হারিয়ে গিয়ে ধূসর হয়ে গিয়েছিলো। বাতাসে একরকম ভারী নীরবতা।
নদীর ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সামন্য হাসলো তানভী।
চোখে লালচে ক্লান্তি। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গিয়েছে বাতাসে। ওর সামনে ছিলো বিশাল নদীর দিকে এক পলক তাকায়। নদীটা অসীম ও শান্ত কিন্তু ভয়ংকর গভীর।
সে দুই হাত ব্রিজের রেলিংয়ে দাঁড়ায়। ঠোঁটগুলো কাঁপছে অসম্ভব ভাবে। বুকের ভেতর থরথর করছে একটা নিঃশেষ হাহাকার।
“সব শেষ, মুক্তি দিলাম তোমাকে রাজ। শেষ পর্যায়ে এসেও বলছি, ভালোবাসি তোমাকে। বড্ড ভালোবাসি।
নিঃশব্দে উচ্চারণ করল তানভী। সেই উচ্চারণে কোনো কান্না ছিলো না আজ। ছিলো শুধু এক অদ্ভুত শান্তি। যেটা মুলত মৃত্যুর আগের শান্তি হয়ে থাকে।
এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল ফেলে। তারপর ঝটকা দিয়ে নিজের শরীরটা ছেড়ে দিলো শূন্যের দিকে।
জলের দিকে নামার সময় পৃথিবীটা যেন পেছনে মিলিয়ে গেলো।কোনো আওয়াজ নেই। শুধু বাতাসের কাঁপুনি আর এক ফোঁটা মুক্তির অনুভব।
কিন্তু সেই নিস্তব্ধতাকে চিরে এক ভয়ংকর শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে—ছপাৎ!
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অধিরাজ কপাল কুচকে ফেলে।
দরজা খুলে সিটে বসতে যাবে হঠাৎ থমকে যায়। কিছু একটা পড়ার শব্দে বুকটা আৎকে উঠে। গলা শুকিয়ে আসে ধীরে ধীরে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হতে থাকে। শরীরটা নাড়িয়ে পিছনে ফিরতেও ভয় হচ্ছে। তবুও অনেক যুদ্ধে পিছনে ফিরে তাকায়।।তানভী- কে কোথাও দেখতে না পেয়ে পুরো শরীর ভেঙ্গে আসছে
সাহস নিয়ে ঘুরে তাকালো। তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে হৃদয় যেন বুক ফাটিয়ে উঠেছে।
“তানভী!”—বলে এক চিৎকার দিয়ে উঠে। কিন্তু আফসোস কোনো জবাব এলো না।
এক পলকের জন্য স্থির হয়ে গেলো সবকিছু।তারপর পরের মুহূর্তেই অধিরাজ ছুটে গেলো পাগলের মতো। জুতো খুলে, ফোন ফেলে, কোট ছুঁড়ে সে দৌড়াচ্ছে। যেন পৃথিবীর শেষ মানুষটি ওর সামনে থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ব্রিজের মাঝখানে পৌঁছে যায়। কোনো চিন্তা না করেই সে লাফ দিলো নিচে।
ঠান্ডা নদীর জল শরীরে আছড়ে পড়লো শরীরে। বুকের মধ্যে কেটে যায় বিদ্যুৎসম এক যন্ত্রণা। কিন্তু অধিরাজ থামলো না। চোখ খুলে খুঁজে বেড়াচ্ছে চারপাশে।কোথাও একটা ক্ষীণ অবয়ব ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। জলের নিচে চুলগুলো ভেসে উঠেছে। মুখটা নিস্তেজ হয়ে আছে। যেন কোনো দুঃখও আর নেই তাতে।
অধিরাজ ডুব দিয়ে এগিয়ে যায় । এক হাত দিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে টেনে নিয়ে আসে।
“তানভী, চোখ খোলো! প্লিজ জান ! এই পাগলী চোখ খুল। ভালোবাসি তো আমি তকে। ”—জলভেজা কণ্ঠে কাঁপা চিৎকার দিয়ে উঠে।
ওকে বুকে চেপে সাঁতরাতে লাগল তীরের দিকে। ঢেউগুলো যেন তখন শত্রুর মতো আঘাত করছে বারবার।তবুও অধিরাজের চোখে একরাশ ভয়ংকর জেদ। তীরে উঠে এলে ওরা দুজনেই জবুথবু ভেজা। তানভী নিথর আর নিঃশ্বাসহীন ভাবে শুয়ে আছে। অধিরাজ হাঁপাতে হাঁপাতে তার মুখের জল মুছে দিয়ে বুকের উপর চাপ দিতে শুরু করল।
“না, না তানভী… তুমি এমন করে চলে যেতে পারো না…”
অধিরাজ তানভী-কে বুকের সাথে আগলে নেয়। মেয়েটার শ্বাস খুব ধীর গতিতে চলছে।অধিরাজের মনে হচ্ছিলো দুনিয়াটা এই বুঝি থমকে গেছে। তার কলিজাটা কেউ হয়ত কুড়াল দিয়ে ইচ্ছেমত কুপাচ্ছে। এই মেয়ের নিস্তাজ শরীরটা তার ভিতরটা রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। বুঝতে পারছে কি এই বেহায়া মেয়ে? এই তাহলে ভালোবাসার লড়াই ছিলো? এই ক্ষমতা নিয়ে তার সাথে ভালোবাসার খেলা দেখাতে এসেছে। এই সামান্য কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্নহত্যার মত এমন এক জঘন্য কাজ বেছে নিলো। বাকিটা জীবন কিভাবে কাটাবে তাহলে?
অধিরাজ তানভী-র গালে হাত দিয়ে বলে,
” এই জান, উঠ না। চোখ খুল প্লিজ। এত সহজে হেরে গেলে। এই ছিলো তর লড়াই? ফাজিল মেয়ে এতদিন জ্বালিয়ে এখন ছেড়ে যাওয়ার ধান্দা করছে।
নিস্তেজ তানভী-র দিকে এক পলক তাকিয়ে অধিরাজ বড় একটা নিশ্বাস টানে।
একবার, দু’বার, তিনবার বুকে চাপ প্রয়োগ করে। তারপর হঠাৎ তানভীর বুক নড়ে উঠে। ঠোঁট কেঁপে উঠে সামান্য।কাশতে কাশতে কিছুটা পানি বের হলো মুখ দিয়ে।
অধিরাজের চোখ ভিজে উঠল।সে নিঃশব্দে ওর কপালে মাথা রাখল।
“তুমি যদি না থাকো, আমার বাঁচার মানে কি বলো …”
তানভী চোখ খুলে ধীরে ধীরে তাকায় অধিরাজের দিকে। ক্লান্ত ও ভিজে চোখে মিশে আছে অবাক ভালোবাসা। কিন্তু এই লোকটা তো তাকে ভালোবাসে না। চারপাশে তখন নদীর গন্ধ। শীতল বাতাস বইছে।আর এক নীরব বিকেল যা সাক্ষী হয়ে রইলো এক ভালোবাসার যা মৃত্যুকেও হার মানাতে পারে না। অধিরাজ বড় বড় শ্বাস টেনে বলে,
” তর কিছু হলে আমি কিভাবে বাঁচব? রাগে বলেছিলাম। দুরে রাখতে চাই তাই এইসব কথা বলেছি। এমন কাজ কিভাবে করতে পারলি?
তানভী নিস্তেজ শরীরটা অধিরাজ বুকের সাথে চেপে রেখেছে। তানভী বিড়ালের মত মুখে বের করে অধিরাজের গলে কাঁপা- কাঁপা হাত রাখে,
” বাঁচিয়েছো কেনো? তুমি তো আমাকে ভালোবাসো না। তাহলে এতটা ডেম্পারেট কেনো হচ্ছো? যদি মরে ও যায় তাহলে কি যায় আসে? তুমি তো বলেছো যাতে মরে যায়। তোমার কথা অমান্য কিভাবে করি বলো।
অধিরাজ তানভীর মুখটা নিজের মুখের কাছে নিয়ে আসে। সামান্য সময় ব্যয় না করে সাথে সাথে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দেয়। অধিরাজের ভালোবাসার স্পর্শ পেতেই তানভী- চোখ বন্ধ করে ফেলে।।শক্ত করে অধিরাজের শার্ট খামছে ধরে। অধিরাজ তানভীকে আরও শক্তভাবে মিশিয়ে মেয়। উন্মাদের মত আচরন করতে থাকে। তানভী নাক – মুখ খিঁচে ফেলে। পাগলের মত চুমু খেতে থাকে।অধিরাজের হাত তানভী-র শার্টের বোতামে পড়তেই তানভী চোখ বড় বড় করে ফেলে।।সে ভালোবাসা চেয়েছিলো কিন্তু এই লোক তো রাস্তার মধ্যে পাগলামো শুরু করে দিয়েছে। তানভী শক্তভাবে অধিরাজের হাতটা চেপে ধরে। কিন্তু অধিরাজের শক্তির সাথে কিছুতেই পেরে উঠে না। কোনো কিছু না ভেবে শক্তি দিয়ে ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দেয়। সাথে সাথে অধিরাজ ঠোঁট ছেড়ে দেয়। তানভী দ্রুত অধিরাজের কোল থেকে উঠে সামনে গিয়ে বসে। দুইজনে ভিজে একাকার অবস্থা।
অধিরাজ কপাল কুচকে তাকায় তানভী-র দিকে,
” সরে গেলে কেনো?
তানভী মাথা নিচু করে মিনমিন সুরে বলে,
” তোমাকে ভালোবাসতে চাই রাজ। অশ্লীলতামি নয়। বিয়ে করো। পুরো আমিটা’ই তোমার হয়ে যাব।
অধিরাজ তানভী-র দিকে এক পলক তাকায়। এরপর নিজের শার্ট-টা খুলে তানভী-র শরীরে জড়িয়ে দেয়। কপালে চুম্বন দিয়ে বলে,
” আজ যা করেছো তার জন্য শাস্তি পাবে প্রচুর। আজ খুব গুরুত্বপূর্ন কাজ আছে। রাতেও আসব না। তাই বেঁচে গেলে। এর হিসেব আমি প্রতিটা অক্ষরে অক্ষরে নিব।
তানভী মুচকি হেসে বলে,
” তোমার সাথে অনেকটা পথ হাটা বাকি। মৃত্যু ছাড়া সব চেয়ে নিও, হাসিমুখে দিয়ে দিব।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে নিঃশব্দে। আকাশের শেষ রঙগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে ধূসর অন্ধকারে। ঘরের জানালা দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ম্লান আলো আর সেই আলোতে এনির মুখটা যেন ফ্যাকাশে ছায়ায় ঢেকে গেছে।
চারপাশ নিস্তব্ধ কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই একটা ভয়ার্ত প্রতিধ্বনি ঘুরে বেড়াচ্ছে হৃদয়ের তীব্র কম্পন।
এনি রুমের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়চারী করছে।তার পায়ের শব্দ টালমাটাল হয়ে আসছে।নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।বুকের ভেতর কেমন একটা দমচাপা কাঁপুনি। হাতে ধরা গ্লাসটা কাঁপছে সামান্য। তাতে থাকা পানি ঢেউ খেয়ে উঠছে। এনি কাঁপার জন্য ভালোভাবে পানিটাও গিলতে পারছে না। ভিতরের ভয়টা ছড়িয়ে পড়ছে বাইরের জগতে।
চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক।এমন এক ভয় যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এই ভয় মৃত্যু থেকেও গভীর।
এনি খুব ভালো করেই জানে এই ঘরের প্রতিটি কোণ।প্রতিটি নিঃশ্বাস ও প্রতিটি শব্দের খবর পৌঁছে যাবে এক ব্যক্তির কাছে—গ্যাংস্টার বস।
হয়ত সে এখন মিটিং রুমে কিন্তু অল্প পরেই সব কিছু দেখে ফেলবে।এনির প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি দৃষ্টি, এমনকি তার শ্বাসের গতি পর্যন্ত। এই ঘর থেকে পালানো মানে কেবল দৌড় নয় মানে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেওয়া। এনির বুকের ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সোনালি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে ভয় আর অনিশ্চয়তায়।
এনি জানালার দিকে তাকায় এক পলক।বাইরে হালকা আলো আছে এখনও। দূরে শহরের অস্পষ্ট শব্দ কিন্তু সেই মুক্তির দৃশ্যটাও এখন মনে হয় অচেনা ও নিষিদ্ধ। এনি মাথায় হাত দিয়ে বিরবির করে উঠে,
“যদি জানোয়ারটা জানতে পারে? যদি ভুলেও সন্ধান পেয়ে যায় …”
এই কথাটা মনে হতেই শরীর কেঁপে ওঠে। গলার কাছে শব্দ আটকে যায়। এনির চোখে অন্ধকার জমে আবার ও।এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা।যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত সময়ের ধারালো ছুরির উপর হাঁটা। এনি চুল খামছে ধরে বলে,
” আপনি থাকবেন তো নাবিদ ভাই? এই নরক থেকে বাঁচতে চাই। এই বদ্ধ, আলো- বাতাসহীন রুমে আজীবন বন্ধী থাকতে পারব না। আমি বাহিরের জগত দেখতে চাই। এই সাইকো উন্মাদের থেকে চিরতরে মুক্তি চাই।
এনি বিরবির করে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। আজ কেউ আটকাচ্ছে না তাকে। সে পুরো বাড়ি ঘুরতে পারবে কিন্তু মেইন ডোর খুলে বাহিরে যেতে পারবে না। চিত্রা মাসি ভয়ে এক পলক তাকায় এনির দিকে। পুরো বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকায় মেয়েটাকে সাহায্য ও করতে পারছে না।
এনি চিত্রার থেকে শান্ত ভাবে দৃষ্টি ঘুরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে। কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়। কমপক্ষে দশ জন স্টাফ কাজ করছে। কিচেনের এক পাশে দেড় হাজার লাড্ডু দেখে বাঁকা হাসে। দুইজন স্টাফ মনের ভুলে এনির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পিছন থেকে একজন গার্ড খুঁচা মেরে বলে,
” তাকাস না ভাই। উনি বসের ওয়াইফ। দেখতে পারলে গলা চেপে ধরবে। চোখ তুলে নিবে। উনার দিকে মানুষ বাদে সামান্য প্রানী ও তাকাতে পারে না। চোখ নামা।
স্টাফ দুইটার মস্তিষ্ক নড়ে উঠে। সাথে সাথে ভয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। একজন স্টাফ মাথা নিচু করে এসে বলে,
” ম্যাডাম আপনি কিচেনে এসেছেন দেখলে বস রাগ করবে প্রচুর। আমাদেরকে মেরে ফেলবে।
এনি সামান্য হেসে বলে,
” আমি সামলে নিব সব কিছু। আপাযত সবাই কিচেন থেকে বের হও। আমি তোমাদের স্যারের জন্য কিছু স্পেসাল রান্না করব। উনাকে সারপ্রাইজ দিতে চাই।
সমস্ত স্টাফ প্রচুর অবাক হয় এনির নরমাল আচরনে। জানামতে স্যারের আন্ডারে বন্ধী উনি। হঠাৎ এত ভালোবাসা? স্টাফদের মনে প্রশ্ন জাগলেও প্রশ্ন করার সাহস হয় না কারোর। সবাইকে দৃষ্টি নত করে তাকিয়ে থাকতে দেখে এনি মলিন মুখে বলে,
” সবার দৃষ্টি এমন নত কেনো? আমার দিকে কেনো তাকাচ্ছো না।
একজন স্টাফ মিনমিন সুরে বলে,
” প্রানে বাঁচতে চাই ম্যাডাম। আপনি যান। আমরা রান্না করে দিচ্ছি।
এনি তপ্ত শ্বাস নিয়ে বলে,
” আমার স্বামীর রান্না আমি করব। তোমরা কেনো করবে?
— বসের আদেশ আছে ম্যাডা। আপনাকে যাতে কখনো কিচেনে ডুকতে না দেওয়া হয়।
এনি কপাল কুচকে ফেলে। কিছুক্ষন ভেবে গম্ভীর হয়ে বলে,
” আর আমি মিসেস নিক জেভরান তোমাদের আদেশ করছি, এই মুহূর্তে কিচেন পরিষ্কার করো। কেউ যাতে আমার কাছে না আসে। একা রান্না করতে চাই নিরব জায়গায়। একজন গ্যাংস্টারের ওয়াইফ তোমাদের সবাইকে আদেশ করছে। গেট আউট অব দা কিচেন রুম কুইকলি।
এনির শক্ত গলা শুনে সবাই সামান্য ভয় পেয়ে যায়। নিঃ শ্বব্দে বেরিয়ে যায় কিচেন থেকে। সবাই চলে যেতেই ইয়ানা বাঁকা হাসে। চুলগুলো সরিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে ছোট একটা কৌটা বের করে। এরপর ডান হাতের মাধ্যমে কৌটা থেকে কিছু পাউডার প্রতিটা লাড্ডুতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে থাকে। হাত কাঁপছে তার অসম্ভবভাবে। প্রায় দশ মিনিট ব্যয় করে এই কাজে। নিজের কাজে সফলতা অর্জন করে বাহিরে তাকায়। কিচেন থেকে বেরিয়ে এসে স্টাফদের উদ্দেশ্যে মুচকি হেসে বলে,
” তোমাদের মনে প্রাশ্ন জাগে না কেনো আমি এতগুলো লাড্ডু বানাতে বলেছি?
স্টাফরা নিম্ন আওয়াজে বলে,
” সেই সব প্রশ্ন করার মত সাহস আমাদের নেই ম্যাম। তবে কেনো বানিয়েছেন এতগুলো লাড্ডু?
এনি স্পষ্ট ভাবে জবাব দেয়,
” আপনাদের সবার জন্য।
স্টাফরা অবাক হয়ে যায়,
” আমাদের জন্য কেনো ম্যাডাম? আজ কি বিশেষ দিন?
ইয়ানা গম্ভীর হয়ে বলে,
” আজ আমার জীবনে প্রচুর বিশেষ দিন। আপনাদের বসের জন্য রান্না ও করব। এখন কি বিশেষ দিন সেটা বলতে পারব না।
ইয়ানা পর মুহূর্তে লাজুক হেসে বলে,
” স্বামী – স্ত্রীর ঘটনা বলতে হয় না। তবে মনে রাখবেন আজ আমার অনেক খুশির দিন। তাই সেই খুশি উপলক্ষে সবার জন্য লাড্ডু বানিয়েছি। আমি এখানে প্রায় চার মাসের মত আছি। অথচ দেখো কাউকেই তেমনভাবে চিনি না। আজ যেহেতু রুম থেকে বের হয়েছি তাই ভাবলাম সবাইকে নিয়ে সামান্য আয়োজন হোক। বেশি কিছু তো করতে পারব না। তাই মিষ্টি মুখ করাচ্ছি।
প্রতিটা সটাফ অবাক হয়ে যায় এনির এত সুন্দর অমায়িক ব্যবহারে। নিকের মত এমন হিংস্র ব্যক্তির সাথে এইরকম একটা নরম মনের মেয়ের বসবাস ভাবতেই সবার খারাপ লাগলো। কেউ এনির জন্য কান্না ও করে দেয়। এনি নিজের কাজে সফল হয়ে মুচকি হাসে। সবার উদ্দেশ্যে আবার বলে,
” আপাযত প্রতিটা লাড্ডু প্রতিটা গার্ডকে খাইয়ে দিন। কেউ ভুলেও যদি খেতে নাঁখোজ করে তাহলে সেটা আমার অপমান। আর আমার অপমান মানে গ্যাংসার বস নিক জেভরানের অপমান। সবাইকে জানিয়ে দিও। একজন ও যাতে বাদ না পড়ে।
স্টাফ বিনয় সুরে বলে,
” আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। সবাই আপনাকে সম্মান দিবে। কেউ না করবে না।
এনি মুচকি হেসে বলে,
” তাই যেন হয়।
এনি দুইটা লাড্ডু নিয়ে চিত্রার রুমের দিকে যায়। চিত্রা এনিকে দেখে অধৈর্য হয়ে বলে,
” ভুল করছো মা। জীবনের সব থেকে বড় ভুল করছো। একবার চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছো। এখন হাতের নাগালে পেলে কি করবে কে জানে। তোমার আঘাত আমি সহ্য করতে পারি না। মেয়ে বলেছি তো তোমাকে। মা হয়ে মেয়ের আঘাত কিভাবে সহ্য করি বলো।
এনি চিত্রার হাতের উপর হাত রাখে। চোখে টলমল করছে মেয়েটার। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে বলে,
” খুব মিস করব আপনাকে মাসি। আমার সব থেকে খারাপ সময়ে আপনি আমাকে পদে পদে পদে সাহস দিয়েছেন। তাই হয়ত আজও আপনার সামনে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি। মায়ের মত যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে। আঘাত গুলোর যন্ত্রনায় যখন আমি কাতরাচ্ছিলাম আপনি আমাকে যত্ন করেছেন। জ্বরের ঘোরে যখন মা- মা করছিলাম তখন আপনি আমার শিউরে বসে জলপট্টি দিয়েছেন। নিজের বিপদ হবে জেনেও বাহিরের সংবাদ দিয়েছেন আমাকে। আজকে আমি পালাতে পারছি একমত্র আপনার কারনে। আপনি যদি আমাকে না জানাতেন, আজ মাফিয়া প্যালসের সব থেকে বড় মিটিং। আর গ্যাংস্টার বস সেখানে থাকবে।। জায়গাটা এমন যেন দুনিয়ার বাহিরে। সামান্য কাকও ডুকার সাহস নেই।।নেটওয়ার্কের বাহিরে। যদি এইসব না জানাতেন তাহলে হয়ত আজ এমন পদক্ষেপ নিতে পারতাম না। চিন্তা করবেন না আমার জন্য। একবার বের হতে পারলে আর খুঁজে পাবে না। প্রয়োজনে জীবন ত্যাগ করে দিব। তবুও এই নরকে আর পৌঁছাব না। আপনার আচলের গন্ধ আজীবন মনে রাখব। যতদিন বাঁচব ঠিক ততদিন হৃদয়ে রাখব আমার আরও একটা মা ছিলো। যে আমাকে আগলে রাখব। এই আচলের গন্ধ কখনো ভুলব না।
চিত্রা আচমকা এনিকে জড়িয়ে ধরে। কান্না করে দিয়ে বলে,
” তোমাকেও খুব মনে রাখব মা। সামান্য মেইডকে তুমি যেভাবে ভালোবেসে মায়ের সম্মানে বসিয়েছো কখনো ভুলব না। আমিও মনে রখব আমার একটা মেয়ে ছিলো। সাবধানে থাকবে। নিজেত যত্ন নিবে ভালোভাবে।
এনি চিত্রার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,
‘ আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন। আমার জীবনের কাহিনী, পাচার কেন্দ্রে কিভাবে এসছি এইটা আপনাকে শুনাতে পারলাম না।
চিত্রা হেসে বলে,
” কোনো ব্যাপার না। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে দেখা হলে পুনরায় শুনা হবে।
এনিও মুচকি হাসলো,
” আশা রাখলাম। আপাযত এই লাড্ডুটা আপনি খান। আমি চলে যাওয়ার পর আপনাকে সজ্ঞানে দেখলে সন্দেহ করবে। তাই সবার মত আপনিও অজ্ঞান হয়ে পড়ুন।
চিত্রা লাড্ডুটা হাতে নিলো। চোখ থেকে পানি পড়ছে। এনির কপালে চুমু খেয়ে বলে,
” গন্তব্য শুভকর হোক। আশির্বাদ রইলো প্রচুর। দ্রুত যাও সময় ব্যয় না করে। এতক্ষনে হয়ত সবাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
এনি সম্মতি জানিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।সিঁড়ির কাছে আরও বিশ মিনিট ব্যয় করে অপেক্ষা করে। এরপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে পুনরায় কিচেনের দিকে যায়। কিচেনে সাতজন সটাফকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায়।এতক্ষনে সবাই এইভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো? সিডেটিভ ড্রাগের তাহলে অনেক পাওয়ার! এনি অধরে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে করিডরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। বুকটা তুলনার চেয় বেশি ধরফর করছে। মেনশন থেকে বের হয়ে মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়ায়। লম্বা করে শ্বাস টেনে দুই হাত আকাশে মেলে ধরে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৪
” এইটাই তো আমার জীবন? মুক্ত পাখির মত ছুটে বেড়ানো। অথচ নিয়তি আমাকে পোষা প্রানী বানিয়ে রেখেছে একজনের।
এনি চারপাশে তাকায়। সবাই ঘুমন্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কেউ অর্ধ শুয়ে আছে কিছুর সাথে হেলান দিয়ে। কেউ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এনি চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে ধীর পায়ে মেইন দরজায় হাত রাখে। যে দরজার সামনে শতশত গার্ড থাকে।।আজ সে দরজার সামনে কেউ নেই।।সে এখন মুক্ত। এনি নরম হাতে চোখ বন্ধ করে দরজাটা খুলে ফেলে। জুতাহীন ডান পা- টা মেঝেতে স্পর্শ করতেই বিরবির করে উঠে,
” বিসমিল্লাহ! আল্লাহ রক্ষা করো আমাকে।
