লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৯
লিজা মনি
প্রায় রাত হয়ে এসেছে। অধিরাজ বাহিরাঙ্গনে গার্ডদের কাছে যায়। সমস্ত গার্ড ভয়ে কাঁপছে। জানা নেই আজ তাদের সাথে ঠিক কি হবে। অধিরাজ সবার দিকে তাকিয়ে কপাল কুচকে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই থেমে যায়। দুইজন গার্ড হন্তদন্ত হয়ে ভিতরে প্রবেশ করে।
এতক্ষনে আরিশ ও চলে এসেছে। গার্ড দুইটার ভয়াতুর চেহারা দেখে প্রশ্ন করে,
” হুয়াট হ্যাপেন্ড? হাঁপাচ্ছো কেনো?
একজন গার্ড খুবই অধৈর্যের ন্যায় বলে,
” একটা বিকৃত লাশ পাওয়া গিয়েছে স্যার!
গার্ডের কথায় আরিশ খুব বিরক্ত হলো। যারা প্রতিনিয়ত বিকৃত লাশ দেখে তাদের এমন হাঁপিয়ে উঠাটা শোভা পায় না। গার্ডদের উপর সামান্য চটে যায়। ভেবেছিলো সিরিয়াস কেইস।
এনি আর নিকের খবর পেয়েছে হয়ত । কিন্তু এখানে এসে অযথা ন্যাকামো করছে। অধিরাজ বিরক্ত নিয়ে বলে,
” সো, হুয়াট? লাশ বিকৃত হয়েছে তাতে কি? আগে কখনো লাশ দেখো নি?
গার্ড মনোবল শক্ত করে আতঙ্কিত সুরে বলে,
” স্যার লাশ দেখে ভয় পাচ্ছি না। লাশকে টা চিত্রা মাসির ছিলো।
এই কথাটা যেন সকলের হৃদয়ে ঝংকার তুললো। অধিরাজ হতভম্ভের ন্যায় তাকিয়ে থাকে।
আরিশ আচমকা চেঁচিয়ে উঠে,
” হুয়াট! চিত্রা মাসির লাশ মানে?
গার্ড ঠোঁটগুলো ভিজিয়ে নিলো। তীব্র জড়তা নিয়ে কোনোরকম বলল,
” আমরা বসের গ্লাস মিনার-এ বসের আদেশ অনুসারে রাশিয়ান মাফিয়া ইগর, কায়াত তাদের সাথে গেছিলাম। বসের অনুপস্থিতিতে তাদের উপর নজর রাখার দায়িত্ব ছিলো। মিটিং শেষে কারোর মুখ থেকে শুনতে পেলাম একটা বিকৃত লাশ পাওয়া গিয়েছে।
আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে নিচের।।গ্রিবাদেশ খানিকটা নাড়িয়ে বলে,
” তোমরা কিভাবে বুঝলে এইটা চিত্রা মাসির লাশ। এমনটা – তো না ও হতে পারে।
” লাশটা চিত্রা মাসির বাড়ির পাশের জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছে। আর মেনশন থেকে বের হওয়ার সময় যে শাড়ি ছিলো এইটা পাওয়া গিয়েছে পাশে। আর সব থেকে বড় কথা…..
গার্ড থেমে যায়। ঘন- ঘন নিশ্বাস ফেলে আতঙ্কে। আরিশ কপাল কুচকে বলে,
” হুয়াট?
গার্ড একই ভঙ্গিতে জড়তা নিয়ে বলে,
” আসলে স… স্যার..
গার্ডদের এমন অবস্থা দেখে আরিশ নিজেকে হারিয়ে ফেলে। কপাট রাগ দেখিয়ে ধমকে উঠে,
” হুয়াট রাবিশ! গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের দেহরক্ষী হয়ে চোখে – মুখে এত জড়তা কেনো? এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তোমাদের? দিন – রাত এক করে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়েছে, ভয়ে, ভিতুর মত কথা বলার জন্য? রিডিউকুলাস!
আরিশের হৃদয় কাঁপানো গর্জনে গার্ডরা মাথা নিচু করে ফেলে। ঠোঁট ভিজিয়ে কন্ঠে খাদ নামিয়ে বলে,
” সরি স্যার। চিত্রা মাসিকে খুন করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে নি। উনাকে মারার পর বাজেভাবে রে**প করা হয়েছে। তাও খুব বিকৃতভাবে। উনার মৃত দেহের অবস্থাটা খুব খারাপ ছিলো। রে**প করার ফলে…
গার্ড কিছুক্ষনের জন্য থেমে যায়। পুনরায় আহত কন্ঠে বলে,
” উনাকে আমরা মায়ের মত মর্যাদা দিয়েছি স্যার। তাই রে**প নিয়ে কিছু কন্ঠনালি দিয়ে বের হবে না। তবে একবার খুনীকে হাতের নাগালে পেলে নেকড়ে দিয়ে ছিঁড়ে খাওয়াব।
আরিশ মুখের কাঠিন্যতা বজায় রেখে নিচের ঠোঁট কামড়ে রেখেছে। অধিরাজ রেগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,
” কোন শুয়রের বাচ্চার শাও** মধ্যে এত চুলকানি উঠেছিলো।
আরিশ ঘড়ির কাটার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলে,
” লাশটার কি করা হয়েছে এখন? পুলিশ তদন্ত করে কিছু জেনেছে?
গার্ড মাথা নাড়িয়ে বলে,
” না স্যার। প্রতিবারের মত এখনও কোনো প্রমান মিলে নি। কিন্তু ওই শালা অফিস্যার প্রতিটা খুনের পিছনে বসকে সন্দেহ করে। গোপনে অনেক তথ্য বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
আরিশ ভ্রুঁ নাচায়। এই সংবাদ তার অজানা ছিলো। মুখের গম্ভীরতা বজায় রেখে বলে,
” অফিস্যারের নাম?
” নাম এখনও জানা যায় নি স্যার। নতুন জয়েন করেছে। আর যখন জানতে পেরেছে আন্ডাগ্রাউন্ড এর গ্যাংস্টার হচ্ছে বস। ঠিক সেদিন থেকে পিছনে পরে আছে। বসকে বলেছিলাম মেরে ফেলার কথা। কিন্তু বস নিষেধ করে দিয়েছে। তাই অফিস্যার এখনও জীবিত আছে।
আরিশ নিশ্বাস ফেলে বড় বড় পা ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। অধিরাজ ও পিছন পিছন যায়,
” স্যার রাত গভীর হচ্ছে। বস এখনও আসছে না কেনো? আমাদের এইভাবে বসে থাকা উচিত মনে হচ্ছে না।
আরিশ কপাল কুচকে বলে,
” তর বস কি ছোট বাচ্চা অধিরাজ? আগুনের উপর হেটে চলে আসা যুবকটাকে নিয়ে চিন্তা করা নিত্যান্ত বোকামি। হাজারও কালসাপের সাথে হেটে চলে আসছে।অথচ কেউ এখনও ছোবল দিতে পারি নি গভীরভাবে। তাই আপাযত চিন্তামুক্ত হয়ে পানি খা।
অধিরাজ গাড়ির সিটে বসে বলে,
” আপনি বসকে এতটা ভালোভাবে কিভাবে চিনেন স্যার?
আরিশ সামান্য হেসে বলে,
” আমি ওর হার্টবিটের আওয়াজ ও মাঝে মাঝে অনুভব করতে পারি অধিরাজ। আমাদের হৃদয়ে হয়ত ভালোভাসা, আকাঙ্খা কিছু নেই। হার্টটা ও যান্তিক। কারোর জন্য তিল পরিমান দয়া হয় না। কিন্তু নিক ছাড়া আরিশ অস্তিত্বহীন। নিক যদি শরীর হয় আরিশ তার ছায়া। শরীর থেকে কখনো ছায়াকে আলাদা করা যায় না অধিরাজ। মৃত্যুর মুখ থেকে হাজার -বার বাঁচিয়েছে আমাকে। আমাকে বাঁচাতে নিজে বন্ধুকের গুলি খেয়ে বুক ঝাঁঝরা করে ফেলেছে। অনেক পথ এগিয়ে এসেছি।
অধিরাজ মনযোগ দিয়ে শুনে প্রতিটা কথা। আচমকা কৌতূহলবশত প্রশ্ন করে,
” বস আর আপনার মধ্যে কি কোনো রক্তের সম্পর্ক আছে স্যার ? মাফিয়াদের মত যান্ত্রিক হার্ট নিয়ে চলা ব্যক্তিদের মধ্যে এত বিশ্বাস আর ভরসা বোধগাম্য হচ্ছে না।
আরিশ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” উহুম, রক্তের কেউ নয়।
” আপনার আর স্যারের পরিচয় কিভাবে হয়েছিলো?
আরিশ কপালে ভাঁজ ফেলে তাকায়। অধিরাজ অধৈর্য হয়ে বলে,
” প্লিজ স্যার। আজ অন্তত স্ট্রোরিটা শুনান।খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনার আর বসের দেখা কিভাবে হয়েছিলো। কিভাবে এতটা বিশ্বস্ত দুইজন।
আরিশ কিছুক্ষন নিশ্চুপ থাকে। সামনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলে,
‘ আমার বয়স মাত্র দশ বছর। নিকের ও হয়ত সেইম ছিলো। নিক আর আমাকে একটা গোপন আস্তানায় রাখা হয়েছিলো শরীরের ভিবিন্ন অংশ কেটে নিব বলে। আমি ভয়ে কান্না করছিলাম। কিন্তু নিকের চোখে ছিলো এক প্রকার হিংস্রতা। ভয়ের ছিটেফুটাও নেই চোখ- মুখে। আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। নিক বিরক্তি নিয়ে আমাকে ধমকে উঠে,
” উফফ এইভাবে কান্না করছো কেনো? বিরক্ত লাগছে। কান্না অফ করো।
আমি সেদিন নিকের ধমকটাকে প্রচুর ভয় পেয়েছি। আমি বাংলাদেশের খুব সহজ – সরল একটা ছেলে ছিলাম। অল্পতেই কেঁদে দেওয়া ছিলো আমার স্বভাব। বাড়িতে সৎ মা ছিলো। অত্যাচারে নিপীরনে বেড়ে উঠেছি আমি। আমি সেদিন ভাঙ্গা গলায় বলি,
” তোমার ভয় হচ্ছে না? আমাদের দুইজনকে এই ভয়ানক লোকগুলো প্রচুর মারবে। ভয় করছে আমার।
নিক কেমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে বলে,
” এতক্ষন তোমাকে আঘাত করে নি? মার খাও নি তুমি?
আমি মাথা নাড়িয়ে বলি,
” খুব মেরেছে। দেখো শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে।খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।
আমি খুব দুর্বল চোখে তাকালাম নিকের দিকে। নিক আমার প্রতিটা ক্ষতে নজর দিয়ে বলে,
” বেশি ব্যাথা করছে?
আমি নিকের দিকে তাকিয়ে বলি,
‘ হ্যা। তবে তোমার শরীরে তো আমার থেকেও বেশি যখম হয়ে আছে। তোমার কষ্ট লাগছে না?
নিক কেমন ভাবে আমার দিকে তাকালো। দৃষ্টিতে ঘোলাটে হলো কিছুক্ষনের জন্য। আচমকা পাগলের মত হেসে উঠে আওয়াজ করে। এই বন্ধ কূপভবনে নিকের হাসি দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সে নিজের হাসিটাকে থামিয়ে আবার ও শান্ত হয়ে আসে। এইবার ওর চোখে পানি দেখতে পায়। খুব অবাক হয়েছিলাম সেদিন আমি। নিক ছন্নছাড়ার মত এদিক সেদিক তাকিয়ে নিজের কাটা হাত চেপে ধরে। সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। লাল তরল রক্ত দেখে আমি অধৈর্য হয়ে আরও কেঁদে উঠি। নিকের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলি,
‘ তুমি ব্যাথা পাচ্ছো। প্লিজ হাত সরিয়ে নাও নিজের।
নিক সরালো না। একসময় আমার কান্না দেখে হাত সরিয়ে ফেলে। আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে বলে,
” তুমি কাঁদছো কেনো?
” তুমি ব্যাথা পাচ্ছিলে।
” আমি ব্যাথা পাচ্ছিলাম তাতে তোমার কি?
” জানি না। খুব মায়া কাজ করেছে তোমার প্রতি।
নিক সামান্য শব্দ করে হেসে বলে,
‘ একজন খুনির জন্য মায়া দেখাচ্ছো? মায়া দেখানো উচিত নয় ছেলে।
আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। শিরশির করে উঠে পুরো শরীর। সামনে থাকা ছেলেটা খুনী ভাবতেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে। কিন্তু কেনো জানি মানতে কষ্ট হচ্ছিলো, ও একটা খুনী। তাই সাহস সঞ্চয় করে প্রশ্ন করেছিলাম,
” তুমি কাকে খুন করেছো?
” নিজের জন্মদাত্রীকে। যে আমাকে জন্ম দিয়েছিলো তাকে নিজ হাতে মেরে ফেলেছি।
খুব নির্লিপ্ত ভাবে নিক উত্তর দিয়েছিলো। মুখে কোনো অনুতাপ, ভয়ের লেশ- মাত্র ছিলো না। দেয়ালের সাথে ঘেষে, দুই হাটু কিছুটা ভেঙ্গে, মাথা নিচু করে বসে ছিলো সে। ফর্সা শরীরটা অন্ধকারেও তখন চিকচিক করছিলো। আমি ভয়ে প্রশ্ন করতেও ভয় পাচ্ছিলাম। নিম্ন আওয়াজে বলি,
” কেনো মেরেছো?
নিক কোনো উত্তর দিলো না। শুধু আনমনে বলে,
” বিশ্বাসঘাতকদের কোনো স্থান নেই আমার হৃদয়ে। যার জন্য আমার দাদা- দাদী, ডেড -কে মরতে হয়েছে তার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। যে নিজের ছেলেকে বদ্ধ রুমে আটকে রেখে দিনের পর দিন পর- পুরুষের সাথে রঙ্গ- তামাসায় মেতে উঠতে পারে সে মা-বেঁচে থাকার কোনো রাইট নেই। এই মহিলার জন্য আমার ডেড মরেছে। তার জন্য আমার নিষ্পাপ বোনটাকে হারিয়েছি। ঘৃনা করি আমি তাকে।ঘৃনা করি নিজের জন্মদাত্রীকে। আমি শুধু আমার ডেডের ছেলে। মেরেও শান্তি পাচ্ছি না। এই মহিলার আরও শাস্থি হওয়া উচিত ছিলো। হাত রক্তাক্ত করেছি। গলাটা একদম দেহ থেকে আলাদা করে ফেলেছি। আমার ও বেঁচে থাকার কোনো রাইট নেই। কিন্তু আমি তো মরতে চাই নি। একজন ভালো গায়ক হয়ে চেয়েছিলাম। ওই মহিলা সব কেড়ে নিয়েছে। ঘৃনা করি। ঘৃনা করি খুব এই মহিলাকে। আমার বাবা, দাদা – দাদু, বোন সবার খুনী। তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
নিক সেদিন কথাগুলো আনমনে আওড়িয়ে নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়েছিলো। আমি অবাক হয়েছিলাম সেদিন প্রচুর। আমার তো মা নেই। সৎ মায়ের লাঞ্চনা নিয়ে বড় হচ্ছিলাম। মায়ের মমতা কি জানা নেই। বাবা কাজের জন্য বাহিরে ছিলো। সময় দিত না বেশি। ধুকে ধুকে মরছিলাম বাজেভাবে। মরার আগেই স্কুল থেকে ফেরার পথে একদল কন্ট্রাক কিলারদের হাতে কিডন্যাপ হয়। নিকের কথাগুলো খুব কষ্ট লাগলো। মনে মনে ভাবলাম, মা ও এমন হয়। শুনেছি নিজের সন্তানের জন্য মায়েরা সর্বস্ব ত্যাগ করে। নিক তার মাকে খুন করেছে মাথা থেকে বেরিয়ে যায়। সেদিন রাতে চারজন ব্যক্তি আসে আমাদেরকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবে বলে। আমি ভয়ে নিশ্বব্দে ফুপাচ্ছিলাম। কিন্তু নিক একদম শক্ত হয়ে বসে ছিলো। আমি ওকে চেপে ধরি শক্তভাবে। নিক আমার কানে হিসহিসিয়ে বলে,
” ভয় পেয়েও না। আছি আমি সাথে। যাস্ট দেখো এখন কি হয়।
আমি কথাটা মস্তিষ্কেও ডুকাতে পারলাম না। একটা লোক আমার ধরতে আসবে ঠিক এমনসময় অন্ধকারের মধ্যে লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চিৎকার দিয়ে। সাথে সাথে বাকি তিনজন ক্ষ্যাপা বাঘের মত এগিয়ে আসে। নিককে যাস্ট হাত নাড়াতে দেখলাম। সাথে সাথে তিন-জন ও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
আমি ভয়ে দেয়ালের সাথে ঘেষে আছি। কান চেপে ধরে আছি। নিশ্বাস নিতেও ভয় পাচ্ছিলাম। আবছা আলোতে দেখলাম নিকের হাতে একটা রক্তাক্ত ছুঁড়ি। আমি কথা বলার অবস্থাতে নেই। নিক আমার হাত শক্তভাবে চেপে ধরে সামনে এগিয়ে যায়। ছোট্ট কুঠুরি থেকে বের হয় আমরা দুজন। কত শিশুকে আটকে রেখেছে তার কোনো হিসেবে নেই। আমি ভয়ে নিকের হাতটা শক্ত ভাবে চেপে ধরে আছি। ঠিক তখন আমাদের সামনে ভয়নক এক মানব এসে দাঁড়ায়। দেখতে একদম কুচকুচে কালো ছিলো। হয়ত তদের মত নিগ্রো প্রজাতির। নিকের হাতের রক্তাক্ত ছুঁড়িটার দিকে তাকিয়ে লোকটা গম্ভীর হয়ে উঠে। সামান্য উকিঁ দিয়ে লাইট জ্বালালো। সেখানেই মাটিতে পড়ে আছে চারটা লাশ।
লোকটা ঝাঁঝালো সুরে বলে,
” এত পরিমান কি হতে পারে ধারনা আছে? ঠিক কি করব তদের?
নিক একই শক্তিতে মাথা উচু করে কাঠিন্য গলায় বলে,
” আমাকে কেউ আঘাত করতে আসলে তাকে ভালোবাসা দেখাব ভাবলে কিভাবে? হিসেব বরাবর। আমি ভুল করিনি।
লোকটা কিছুক্ষন নিশ্চুপ থাকে। রাগে ফুঁশ- ফুঁশ করছিলো। হঠাৎ কিছু লোককে আদেশ দিয়ে হুংকার দিয়ে উঠে,
‘ এই দুইটা পুচকে – কে বিশটা- বিশটা করে চল্লিশটা চাবুকের আঘাত কর। কিংগ্রাসিফের সাথে উচু গলায় কথা বলার শাস্তি পাবে এখন।
নিক আমার ভয়াতুর মুখের দিকে তাকায়। এরপর কিং এর দিকে তাকিয়ে বলে,
” ওর পাওনা বিশটা চাবুকের আঘাত ও আমাকে দেওয়া হোক। ওর কোনো অপরাধ নেই। যা করেছি আমি করেছি। তাই ওকে কোনো আঘাত করো না।
লোকটা আরও রেগে যায় নিকের ভালোবাসা দেখে। তীব্র রাগে কক্ষ থকে প্রস্থান করে। আমি বারন করি সবাইক। আমার সামনে নিককে টেনে- হিচড়ে একটা বদ্ধ রুমের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। আমি চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। বার বার একটা বাক্য উচ্চারন করছিলাম,
” প্লিজ ছেড়ে দাও ওকে। আমার বন্ধুকে কেউ মেরো না।
আমার বার বার উচ্চারিত শব্দ গুলো নিক শুনছিলো। একবারের জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে ঠোঁট নাড়িয়েছিলো,
” বন্ধু ”
এই শব্দটা আমি বুঝেছি। নিক নিজের ঘাড় সামনে নিয়ে যায়। এরপর থেকে একইভাবে প্রচুর বর্বরতার স্বীকার হয়েছি। সেদিনের পর থেকে আমি আর নিক বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। ধীরে ধীরে এক আত্নাতে পরিনত হয়।
আরিশ থামে। চোখে পানি চিকচিক করছে। কোনোরকম নিশ্বাস টেনে পাশ থেকে পানির বোতল হাতে নেয়। এরপর ঢক- ঢক করে সবটা পানি এক শ্বাসে গিলে ফেলে।
অধিরাজ প্রায় কেঁদে দেয়। সে নিজেও কবে কেঁদেছে জানা নেই। অজান্তেই পানি চলে এসেছে। আরিশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়। পনেরো বছর ধরে সে এখানে আছে। কখনো নিক আর আরিশকে কাঁদতে দেখে নি। কিন্তু আজ কাঁদছে কেনো?
অধিরাজ মৌনতা নিয়ে বলে,
” স্যার আপনি কাঁদছেন?
” নিজের জন্য কাঁদছি না আরিশ।নিকের কষ্ট অনুভব করে কাঁদছি। যান্ত্রিকতার আড়ালেও আমরা একটা মানুষ। দিনশেষে আমাদের ও হৃদয় আছে। নিক প্রচুর হিংস্র। অশুভের রাজা সে। সমস্ত কালো বাজারের বাদশাহ সে। কিন্তু এসব হওয়ার পিছনের ইতিহাস কেউ জানতে আসবে না অধিরাজ।
অধিরাজ নিম্ন সুরে বলে,
” আপনাদের অতীত অনেক ভয়ানক স্যার। সামান্য শুনেই রুহ কেঁপে উঠেছে।
আরিশ সামান্য হেসে বলে,
” সংক্ষিপ্ত বলেছি। এরপরও শরীর কেঁপে উঠেছে তর অধিরাজ।
” সংক্ষীপ্ত হলেও কথাগুলো অনুমান করলে পরিস্থিতি ভয়ংকর স্যার। একবার আপনাদের জায়গায় নিজেকে অনুমান করলেই বুঝতে পারব ঠিক কিসের মধ্যে ছিলেন। বস একজন গায়ক হতে চেয়েছিলো তাই না স্যার?
আরিশ গম্ভীরতা নিয়ে বলে,
” গায়ক শব্দটা কোনকদিন ওর সামনে উচ্চারন করিস না। তকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলতেও পিছু- পা হবে না। কিন্তু নিক অনেক ভালো গিটার বাজাতে পারে। কোনো এক পরিস্থিতির চাপে বাজিয়েছিলো। আর কখনো স্পর্শ করতে দেখিনি।
অধিরাজ শান্ত ভাবে শ্রবণ করে সব কিছু।
” আপনি কি বাংলাদেশী স্যার?
” হুম”
” বাংলাদেশের কোন জায়গা?
” সিলেট। সিলেট আমার মাতৃভূমি”
” বসের তাহলে ছোট একটা বোন ছিলো?
” হ্যা। তবে এখন আর জীবিত নেই।
” তাহলে জেড কে? আর জেড বসের রক্ত কিভাবে হলো?
আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে। কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে বলে,
” জেড নিকের রক্তের কেউ নয়।
অধিরাজ আশ্চর্য হয়ে বলে,
” কিন্তু বস জেডকে নিয়ে প্রচুর পজেসিভ। পুরো দুনিয়া থেকে আগলে রেখেছে। মানুষ খেঁকো নরখাদক জানার পর ও সব দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। আর জেড ও বসকে বাঘের মত ভয় পায়। ভাই না হলে এত কেয়ার কেনো দেখায়?
” কিছু সম্পর্ক আছে যেগুলোতো শুধু রহস্য। তবে এইটা জেনে রাখ জেড নিকের ভাই নয়। তবে নিক তাকে একটানা দশ- বার রক্ত দান করেছে। এখনও রক্ত দেয়। জেডের একটা রোগ আছে। রক্তশূন্যতা হয় প্রচুর। আর নিকের রক্তদানে জেড উপরওয়ালার কৃপায় বেঁচে আছে। জেড কারোর গচ্ছিদ সম্পদ। এই রহস্য আমি নিজেও জানি না। প্রশ্ন করলে উত্তর মেলে নি। তাই প্রশ্ন আমি নিজেও করি না। এই সম্পর্কের পিছনে অনেক বড় একটা রহস্য আছে। সেটা সময় হলে আমি নিজেও জানব।
অধিরাজ নিতে পারছে না এত কথা। নিকের মত জানোয়ারও কাউকে রক্ত দিচ্ছে ভাবতেই যেন অবাক হয়ে গিয়েছে। প্রশ্নবোধক চাহনি দিয়ে বলে,
” নাভিদ কে স্যার? ম্যামের দিকে তাকানোর পরও বস নাভিদকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে কেনো?
” নাভিদ জেডের আপন ভাই ”
একদম শান্তভাবে উত্তর করলো আরিশ। অধিরাজ অবাকের এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে নিশ্বাস নিতেও ভুলে যাচ্ছে। এত সম্পর্কের মারপ্যাচ বুঝতে পারছে না। অদ্ভুত গলায় আওড়ালো,
” ভ… ভাই! কিন্তু নাভিদ তো একদম সাধারন বংশের ছেলে। চালচলন ও সাধারন ছিলো। জেডের ভাই কিভাবে হয় স্যার?
আরিশ অধরে হাসি ফুটিয়ে বলে,
” নাভিদ নিজেও নরখাদক ছিলো অধিরাজ। নাভিদ এমন এক নরখাদক রুপী জানোয়ার ছিলো যে দুধের বাচ্চাকেও ছাড় দিত না। মেয়েদের নগ্ন শরীর নিয়ে দিনের পর দিন উল্লাস করেছে। যেমনটা আগে জেড করত।কুকুরের মত পুরো শরীর চুষে নিত। রে***পিস্ট ছিলো একজন। শতশত মেয়েকে রে**প করে ফেলে রাখত। খুব ভয়ানক ছিলো সে। আমি নিজেও ভয় পেতাম মাঝে মাঝে। বাট নিকের সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব ছিলো। নিককে খুব ভয় পেত। নিক ধমক দিলে চুপ হয়ে যেত। কাচা মাংস চিবিয়ে খাওয়া এক জানোয়ার হলো নাভিদ ওরফে ভিকি।
অধিরাজ অস্ফুর্তভাবে বলে,
” ভিকি!
” হুম ভিকি। নাভিদের রিয়েল নাম ভিকি। জেড আর ভিকি দুই ভাই। দুইজন এই জমজ। কিন্তু চেহারার কোনো মিল নেই। তবে স্বাভাবের খুব মিল। একদিন জানতে পারি ভিকি মেয়ে খুঁজতে বাহিরে গিয়েছে। সেদিন এক মেয়েকে দেখে সে উন্মাদ হয়ে উঠে। তাকে নিয়ে আসে নি। আঘাত করে নি। রে***প করে নি। সামান্য স্পর্শ ও করে নি। ওকে দেখার জন্য ভোর সকালে সমুদ্রের কাছে চলে যেত। একটানা দুই মাস এমন চলতে থাকে। বুঝতে পারি সে এখন নারীদের সান্নিদ্ধ্যে যায় না। কোনো মেয়ে পাশে আসলে রেগে যায়। কাচা মাংস ছেড়ে দিয়ে আমাদের মত হালাল মাংস খেতে থাকে। প্রচুর অবাক হয়েছিলাম আমি আর নিক। দুই মাসে একদম পাল্টে যায়। আগের ভিকি আর নেই। যে এক মুহূর্ত মেয়ে ছাড়া থাকলে উন্মাদ হয়ে উঠত সে সামান্য মেয়েদের ছায়ায় ও যেত না। ধর্মে সে একজন বৌদ্ধ ছিলো। কারন তার বাবা ছিলো আমেরিকার নাগরিক। একজন ড্রাগস সাপ্লাইয়ার। কিন্তু জেড আর ভিকি কোনো ধর্ম’ই পালন করত না। একদিন জানতে পারি ভিকি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করার জন্য হুজুরের সন্ধান করছে। আশ্চর্যের পর আশ্চর্য হচ্ছিলাম। আদ’ও সম্ভব এইগুলো। তিনটা মাসে ভিকি একদম চেইঞ্জ। সেই নরখাদক ভিকি আর নাই। সবাই মিলে ছোট একটা পার্টি করি। ওইদিন রাতে ভিকি বাহিরে গিয়েছিলো। ভোর সকালে একদম উন্মাদ হয়ে আমাদের গ্লাস মিনারে চলে আসে। নিক খুব অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করে,
” কি হয়েছে ভিকি? তুই এমন করছিস কেনো?
ভিকি কোনোমতে উচ্চারন করে বলে,
” ওকে আমি ভালোবাসি নিক। ও ইরান চলে গিয়েছে নিজের দেশে। আমিও আর থাকব না। আমি ওর কাছে যাব।
সেদিন আমি আর নিক শত চেষ্টার পরও আটকাতে পারে নি। আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি ভিকির। অনেক খুঁজেছি আমরা। কিন্তু পায় নি। নিজের ভাইকে না পেয়ে জেড আরও হিংস্র হয়ে উঠে। তাই নিক নিজের গ্লাস মিনারে খুব গোপন কক্ষে তাকে আটকে রখেছে। এইভাবে কাটে অনেক দিন। দেড় বছর আগে আমি আর নিক ইরান যায় অস্ত্রের জন্য। ইরানের সব থেকে বড় অস্ত্রের ব্যবসায়ীর সাথে সামনা – সামনি কথা বলার জন্য। ভিকির সাথে আমাদের আচমকা দেখা হয়। কিন্তু সেদিন ভিকির সাথে নয়। ইরানের শিল্পপতী সাধারন মানুষ নাভিদের সাথে দেখা হয়। কিন্তু ভাগ্যের চাকা অন্যদিকে ঘুরে যায়।
ভিকি যে মেয়ের জন্য সব ত্যাগ করেছে নিক তার প্রতি বাজেভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে। দেড় বছর ধরে চলছে এই আন্দোলন। সর্বশেষ নিজের কাছে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে। নিয়ে আসার প্রতিটা পদক্ষেপ ছিলো এক রহস্যের চাদরে মোরা। আর সেই রহস্য এখন ও ঝলঝল করছে। এনিকে বিয়ে করার পর নিক জানতে পারে এই সেই মেয়ে যার জন্য ভিকি নিজেরকে পরিবর্তন করেছে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। এনি নিকের নামে হালাল হয়ে গিয়েছিলো। বাজেভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে মেয়েটা উপর। নিকের ভালোবাসা হচ্ছে কাফনের কাপড়ের মত। যেটা একবার এনির শরীরে জড়িয়ে গিয়েছে। আর সেই কাপড় খুলার সামর্থ উপর ওয়ালা ছাড়া আর কারোর নেই। এখন দেখা যাবে তিনটা জীবনের সমাপ্তি কোথায়? তবে নিক কোনোদিন নাভিদকে প্রানে মারবে না। কারন জেড আর ভিকি- কে আগলে রাখবে সে একজনকে কথা দিয়েছিলো। আর গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান নিজের কথার খেলাপ কোনোদিন করে নি।
অধিরাজ জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে এমন উপক্রম। গলা শুকিয়ে আসছে তার। দ্রুত ছিপি খুলে ঢকঢক করে পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নেয়। আরিশ সামান্য হাসলো অধিরাজের দিকে তাকিয়ে। অধিরাজ নিশ্বাস টেনে বলে,
” প্রতিটা জীবন রহসের চাঁদরে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। অতীত খুব ভয়ানক প্রতিটা চরিত্রের। আজ আপাযত আর শুনতে চাচ্ছি না। সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি ধীরে ধীরে।
রাত তখন একেবারে গভীর হয়ে উঠে তখন অন্ধকার এত ঘন যে, মনে হয় যেন আকাশ নিজেই মাটির উপর নেমে এসে সমস্ত দিগন্ত ঢেকে ফেলেছে। বাতাসে এক অচেনা গন্ধ। পচা পাতার, ভেজা মাটির, আর দূর থেকে আসা কোনো অজানা প্রাণীর শ্বাসের মতো ভারী ও আর্দ্র এক ঘ্রাণ।
গাছগুলির কাণ্ড অন্ধকারে একে অপরের দিকে ঝুঁকে আছে।যেন মন্ত্রপাঠে নিমগ্ন কোনো ছায়ামূর্তি।
পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢোকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ কোনো এক অদৃশ্য শক্তি। জঙ্গলের বুক জুড়ে এক গভীর নিস্তব্ধতা।যে নিস্তব্ধতা শব্দের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর। মনে হয় যেন সমস্ত প্রকৃতি কোনো প্রাচীন অভিশাপের ভারে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। দূরে কোথাও এক শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ।টুকরো করে ভেঙে নীরবতায় বিলীন। তারপর আবার নিস্তব্ধতা।
বাতাস থেমে গেছে। জঙ্গল এখন নিজেই কোনো দুঃস্বপ্নে ডুবে গেছে। গা ছমছমে পরিবেশ।
বিরাট গাছের তলে এক পুরনো শালগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্যাংস্টার বস।
চোখ দু’টো যেন গলিত লোহার মতো জ্বলছে রক্তিম,দহনময়।
চোয়াল শক্ত করে চেপে রেখেছে।যেন রাগের চাপা বিস্ফোরণ শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে থরথর করে উঠছে।
তার আঙুলের ফাঁকে আধপোড়া সিগারেট। বার বর ঠোঁটের ভাঁযে নিচ্ছে। ধোঁয়া কুণ্ডলীর মতো ঘুরে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে মুহূর্তেই। তবু সেই ধোঁয়াতেও ক্ষোভের গন্ধ লেগে আছে। ঠোঁটের কোণে এক হালকা বাঁকা হাসি খেলে যায়।নৃশংস সেই হাসি। সেই হাসির ভিতরেই লুকিয়ে আছে মৃত্যুর হুকুম।গ্যাংস্টার বস অদ্ভুতভাবে তাকালো সামনে। এনি মাটির গর্তে আধা-পোঁতা। মাথার সামান্য অংশ বাহির করে রকাহা শুধু। বাকি শরীর মাটির কালো আঁধারে লীন।
কপালের সোনালী চুলগুলো ধুলো আর ঘামে লেপ্টে আছে। নীলাভ সুমদ্রের ন্যায় চোখদুটো আতঙ্কে কাঁপছে। ভয়ে ঠোঁট কামড়ে রেখেছে। চোখে ভেসে উঠছে একটুখানি বাঁচার আকুতি। এনির ঠোঁট কাঁপছে কিন্তু শব্দ বেরোয় না।কণ্ঠ যেন মাটির ভারে স্তব্ধ হয়ে গেছে। শ্বাস নিতে নিতে সে গলার ভেতর থেকে শুকনো হাহাকার ছাড়ছে। আর বস নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে সেই কাঁপনটা উপভোগ করছে।
রাতের নীরবতা ভেঙে মাঝে মাঝে দূর থেকে পাখির আর্তনাদ শোনা যায়। আর সেই আওয়াজের ফাঁকে গ্যাংস্টার বসের ভারী নিশ্বাস ধীরে, পরিমিত, কিন্তু শিকারীর মতো হিসেবি। তার চোখে কোনো দয়া নেই। শুধু এক ঠান্ডা হিসেবি হিংস্রতা।যে হিংস্রতা মানুষের নয়, প্রায় পশুরও নয় বরং এক প্রকার নিঃস্পৃহ ক্রোধ। যা কেবল ক্ষমতা আর প্রতিশোধের অন্ধ প্রয়োজনে জন্মায়। গ্যাংস্টার বস এনির দিকে তাকালো। মেয়েটা নিভু নিভু ভাবে চোখ মেলে তাকাচ্ছে। নিক ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলে।
মাটির অন্ধকার গভীরতায় পুঁতে রাখা অবস্থায় এনির নিভু নিভু চোখ চাপা পড়ে। চোখ খুলতেই সামনে জেগে ওঠে এক অভিশপ্ত দৃশ্য—ভয়ঙ্কর দুটি প্রাণী। যাদের উপস্থিতিই অন্ধকারকে আরও ঘন করে তুলেছে। প্রথমটি বাঘ। যার পেশিবহুল শরীর শিকলের দখলে বন্দী।তবুও তার গলার শক্ত লোহার শৃঙ্খল ভয়ঙ্কর গর্জনের পূর্বাভাস বহন করছে। চোখের প্রজ্বলিত দীপ্তি দেখলেই মনে হয়। কোন মুহূর্তেই সে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। পাশে দাঁড়ানো একটা ভয়ানক কুকুর। দেখতে একদম নেকড়ের মতো ভয়ঙ্কর প্রাণী। শুনা যায় কুকুর আর নেকড়ে হচ্ছে পূর্ব পুরুষ। কুকুরের গলায়ও শিকল।কিন্তু চামড়ার আঁচড় আর চোখের বুনো দীপ্তি থেকে বোঝা যায় এটি এক বন্যপ্রাণী যা মানুষকে চিনতে পারে না।
এনির ভয়ে কপালে ঘাম ছুটে পড়ছে।নীরব অন্ধকারে সে যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর উপস্থিতি অনুভব করছে। হৃদয় তাড়া খেয়ে বেড়াচ্ছে। এবং শ্বাস আটকে যাওয়ার মতো তীব্র ভয় তাকে নিঃসঙ্গ করে রাখছে। শিকলবদ্ধ এই প্রাণীদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে মৃত্যু নেমে আসছে। চোখ বন্ধ করে ভয়ে আচমকা চিৎকার করতে যাবে তার আগেই কারোর পায়ের শব্দে থেমে যায়। ভয়ে কাঁপতে থাকা মেয়েটা দুর্বল হিরিণীর মত নীলাভ চোখ দুইটা দিয়ে সামনে তাকায়। সাথে সাথে মুখ প্রসারিত হয়ে যায়। তার সামনে কুকুর আর বাঘের থেকে সব থেকে বড় জানোয়ার দাঁড়িয়ে আছে- গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। এনি নিজের অবস্থান এতক্ষণে খেয়াল করেছে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। রক্ত চলা-চল মনে হয় কছুক্ষনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। এই বুঝি নিশ্বাসটা আটকে আসছে। লোকটা এত নিকৃষ্ট এনির এতটাও ধারনা ছিলো না। হিংস্র পশুদের মাঝখানে রেখে কি প্রমান করতে চাইছে? আমাকে ওদের হাতে ছেড়ে দিবে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য, তাইতো? ভয়ে এনির অন্তরাত্না পর্যন্ত কেঁপে উঠে। চার- পাশে ছোট্ট দেহটা চাপা পড়ে আছে। ব্যাথায় কলিজা পর্যন্ত ছিঁড়ে যাচ্ছে। মাথা ফেটে যাচ্ছে ব্যাথা কারনে। দুর্বল আওয়াজে বলে,
” এত কষ্ট কেনো দিচ্ছেন?
নিক এগিয়ে আসলো এনির নিকটে। শ্যাডোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
” মাত্র পাঁচ মাস এই দুইটাকে পোষ মানিয়েছি। এমনভাবে পুষ মেনেছে যে হাজার ও লোককে ছিঁড়ে খেয়েছে আমার এক ইশারাতে। কিন্তু তোমাকে কেনো পোষ মানাতে পারলাম না বেবিগার্ল।
এনি ঘৃণায় কান্না করে উঠে। শক্ত গলায় বলে,
” কিসের এত অহংকার নিক জেভরান। সেই তো সূচনা হয়েছিলো দুর্গন্ধময় বীর্য থেকে আর সমাপ্তি ঘটবে পচনশীল গলিত লাশে। দুইটা চতুষ্পদী প্রানীর সাথে আমাকে তুলনা করছেন?
গ্যাংস্টার বস অদ্ভুতভাবে তাকাল।। তার দীর্ঘনখ কুঁচকানো আঙুল এবং শক্ত মাংসযুক্ত ভুরু প্রতিটি স্পর্শেই মনে হয় শিকলবদ্ধ প্রাণীও ভয় পাবে। গাঢ় দাগানো চামড়ার রেখা। শক্তিশালী পেশি আর ভাজে ভাজে শ্বাসনালি একত্রে তৈরি করেছে এমন এক ভয়ানক প্রতিমূর্তি যা সরাসরি প্রাণিকূলের বন্যতাকে ছাপিয়ে যায়। মুখের অর্ধ খোলা ঠোঁট থেকে বের হওয়া নিঃশ্বাস।গলায় লেগে থাকা নীচু রক্তাভ রস। শরীরের এই দিক-দিকের স্পন্দন, অস্থিরতা ও অদ্ভুত কাঁপুনি এমন এক উত্তেজনা সৃষ্টি করে যে চারপাশের অন্ধকার ও শিকলবদ্ধ প্রাণী আর মৃত্তিকার গন্ধ সব মিলিয়ে প্রাণিকূলের অবস্থা যেন কম্পিত হয়ে উঠেছে। নিক রাগলো না। বাজপাখির ন্যায় তাকিয়ে বলে,
” তুমি আমার জন্য ঠিক কি সেটা একবার অনুভব করতে পারলে তুমি উন্মাদ হয়ে যেতে ব্লাড – রোজ।
এনি শুনলো কথাটা। কিন্তু তার সমস্ত ভয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুইটা পশু- কে নিয়ে। এনি নিশ্বাস টেনে বলে,
” আমাকে মারার জন্য নিশ্চই নিয়ে এসেছেন? নিজে মারুন। তবুও এই প্রানীগুলোর কাছে দিয়েন না প্লিজ। ওরা অনেক ভয়ানক। আপনার কাছে মিনতি করছি।
নিক ভ্রুঁ ভাঁজ করে তাকালো। শক্ত গলায় বলে,
” পুরো রাত একা-কী এখানে থাকবে বেবিগার্ল। আর তোমার সামনে থাকবে আমার সব থেকে বিশ্বস্ত দুইটা জিনিস। পালাতে চাইলে দুইজনের কবলে পড়বে। মনে রেখো বড় বড় শক্তিশালী গ্যাংস্টাররও এদের হাত থেকে রেহায় পায় নি। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গেলেও দৌঁড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই তুমি এই ভুল করো না। গভীর অরন্যে, দুইটা হিংস্র সঙ্গীর সাথে, মাটির নিচে অর্ধেক চাপা পরে একা- কী থাকবে। আর এইটা হলো নিক জেভরানের সাথে ছলনা করার শাস্তি।
এনি চোখ বন্ধ করে নিশ্বব্দে ফুঁপিয়ে উঠে। এখানে ভয় প্রকাশ করা নিত্যান্তই বোকামি। নিক সামনের দিকে পা বাড়ায়। চলে যাচ্ছে সে এনিকে রেখে। এনি ভাঙ্গা গলায় বললো,
” সত্যি চলে যাচ্ছেন? খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।
এনির কন্ঠে ছিলো অসহায়ত্ব।নিক দাঁড়িয়ে যায় কিছুক্ষনের জন্য। মুহূর্তেই কন্ঠ শক্ত করে বলে,
” কষ্ট পাওয়ার জন্য ‘ই এইখানে তোমার অবস্থান। পরিবর্তে পালিয়ে যাওয়ার আগে দশবার ভাববে।
” মরে গেলে আমার লাশটাকে একটু দাফনের ব্যবস্থা করে দিয়েন প্লিজ। আর আমার আপাকে দেখার সুযোগ করে দিয়েন। সামান্য মাংস – পিন্ডও যদি থাকে তবুও সেটাকে দাফন করাবেন।
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৮
দুইটা আবদার রাখবেন আমার? নিক আবার ও হাটা থামিয়ে দেয়। এনির জন্য দুইটা আবদার ছিলো। কিন্তু গ্যাংস্টার বসের জন্য কি আদ’ও দুইটা আবদার ছিলো? নিকের নিশ্বাস দ্রুত চলতে থাকে। কলিজায় মনে হচ্ছে কেউ ছুঁরি-ঘাত করছে। হাত মুষ্টি করে ফেলছে। দুইটা আবদার তার প্রতিটা রক্তবিন্দুকে শীতল করে দিচ্ছে। নিক যেন দুর্বল হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। কোনোরকম ঘাড় ঘুরিয়ে এনির দিকে তাকায়।
