লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩২
লিজা মনি
অবসন্ন সন্ধ্যার গভীর ম্লানতায় যখন শহরের বহমান কোলাহল নিঃশব্দে গলে গিয়ে অদৃশ্য হতে থাকে। তখন সেই সমৃদ্ধশালী বারটির ভারি কাঁচের দরজাটি এক অজ্ঞাত সুরের মতো ধীর স্থিরতায় খুলে যায়। এখানে আগত প্রতিটি পথিককে এক অচেনা মায়াবী জগতের অন্তর্গত শ্বাস নিতে আহ্বান জানাচ্ছে।
অভ্যন্তরে প্রবেশমাত্রই চোখে পড়ে উঁচুতর সিলিংয়ের কেন্দ্রীয় গম্বুজ থেকে ঝুলে থাকা বহুমুখ কাচখচিত ঝাড়বাতির স্বর্ণাভ জ্যোৎস্না। এইটা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে পালিশকৃত ওক-কাঠের বারকাউন্টারে এমন এক রাজকীয় দীপ্তি প্রক্ষেপণ করে যেন সেটি কোনো বিস্মৃত ইউরোপীয় প্রাসাদের পরিত্যক্ত সিংহাসনেরই আধুনিক প্রতিরূপ। দেয়ালজুড়ে সারিবদ্ধভাবে সংরক্ষিত প্রাচীন ওয়াইন-ভল্টগুলো। তাদের ধুলোছোঁয়া লেবেলের নীরবতা নিয়েই বহু শতাব্দী পার করে আসা অভিজাত সভ্যতার সুগভীর স্মৃতি বহন করে। এইটা সেই নিস্তব্ধতার মধ্যেই মৃদু জ্যাজ সুরের ধারালো তানগুলি বাতাসের সুরেলা স্তরকে ছিন্নভিন্ন করে পরিবেশকে এমন এক অনিবার্য রহস্যঘনতায় আবদ্ধ করে। এখানে যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি উপস্থিত প্রতিটি আত্মাকে নিজের অভ্যন্তরের গোপন অস্থিরতার মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করছে।
বারটেন্ডারের নিখুঁত দক্ষতায় নির্মিত প্রতিটি ককটেল, তার স্বচ্ছ বাষ্পমাখা কুয়াশা ও সুগন্ধি তীব্রতার সমন্বয়ে, এমনভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে যেন কোনো প্রাচীন রসায়নবিদের রচিত মায়াবী মদ, যা স্বাদ গ্রহণের মুহূর্তেই অনুভূতির গভীরতম স্তরকে জাগ্রত করে তোলার ক্ষমতা রাখে।
নরম অ্যাম্বার-আলোয় টেবিলের ওপর নাচতে থাকা ছায়াগুলো ধীরে ধীরে প্রসারিত ও সঙ্কুচিত হয়ে বারটিকে এমন এক অচেনা, তবুও অদ্ভুতভাবে মনোহর আবেশে সম্পৃক্ত করে, যার কারণে এখানে প্রবেশমাত্রই সময়ের স্বাভাবিক প্রবাহ থমকে গিয়ে সমস্ত অস্তিত্ব যেন সাময়িকভাবে এক চিরন্তন নিঃশব্দতায় রুদ্ধ হয়ে যায়।
আর সেই নিস্তরঙ্গ নীরবতার ভিতর, এখানে আগত মানুষগুলো তাদের ব্যক্তিগত একাকিত্ব বা অস্থিরতার ভার যতই বহন করুক না কেন, মুহূর্তের জন্য এই বারটির মায়াবী অন্ধকারে আশ্রয় খুঁজে পায়—যেন এটি কোনো বিদেশি নগরীর হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা গোপন অভিজাত আশ্রম, যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসও রহস্যে মোড়ানো থাকে। এই বারে কোনো নগ্ন নারী অবয়ব নেই। নারী সান্নিধ্য গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের পছন্দ নয়। কোনো নারী এসে ঢলে পড়লে রক্তপাত হতে পারে। তাই তার উপস্থিতি যেখানে থাকবে সেখানে নারীদের কোনো চিহ্ন থাকা যাবে না। গোলাকৃতির একটা টেবিলের। সামনা সামনি বসে আছে নিক আর নাভিদ। টেবিলের উপর সাজানো আছে ভিবিন্ন ধরনের নেশাদ্রব্য।
কোকেইন, হেরোইন, মেথ্যামফেটামিন / ক্রিস্টাল মেথ, এলএসডি, এমডিএমএ / একস্ট্যাসি, কেটামিন, জিএইচবি,ফেন্টানিল, আফিম, পিসিপি, হাশিশ / হ্যাশ, অ্যামফেটামিন, সাইলোসাইবিন, মাশরুম / ম্যাজিক মাশরুম, সিনথেটিক ক্যানাবিনয়েডস আরও ভিবিন্ন ধরনের দ্রব্য। নিক হাফ গ্লাস কোকেইন নাভিদের দিকে এগিয়ে দেয়। নাভিদ সেদিকে এক পলক তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে,
” তোমার মত হারাম জিনিসে অভ্যস্ত নয় আমি।
নিক ভ্রুঁ নাচালো। গ্লাসটা নিজের দিকে এনে ঠোঁট কামড়ে ধরে। গ্লাসটা নাড়া-চড়া করতে করতে বলে,
” ফা**ক অফ ভিকি।আমি পুরোটাই হারাম এক ব্যক্তি। আমি হারাম কাজ করব না’তো মসজিদে ইমামতি করব?
নাভিদ রক্ত চক্ষু দিয়ে তাকিয়ে বলে,
” মসজিদে ইমামতি করতে না পারলে ওর দিকে হাত বাড়িয়েছিস কেনো নিক? যুদ্ধ দিয়ে ভালোবাসা যায় না। আমি তর সামনে অস্ত্র তুলতে পারব না। তকে আঘাত করে রক্তাক্ত হয়ত করতে পারব কিন্তু তকে জানে মারত পারব না। অতীত ভুলে যায় নি। যুদ্ধ ক্ষেত্র আরম্ভ হওয়ার আগে আমাকে আমার ভালোবাসা ফিরিয়ে দে।
” যুদ্ধ করতে আমার বরাবর এই পছন্দ। রক্ত দিয়ে যখন জমিন ভাসবে তবেই না ছিনিয়ে নিয়ে আসা সার্থক হবে।
” অন্যের ভালোবাসা ছিনিয়ে নিয়ে আসা কাপুরুষতা।
নিক গ্রিবাদেশ নাড়ালো,
” অন্যের বউয়ের দিকে নজর দেওয়াটা চরিত্রহীনতা।
নাভিদের শরীরে কাটা দিয়ে উঠে। মনে হচ্ছে যেন কেউ বিষাক্ত সূচ ডুকিয়ে দিয়েছে তার শরীরে। পুরুষদের অসহায় হতে নেই। ভালোবাসার জন্য ধ্বংসের অস্ত্র সর্বাঙ্গে বহন করতেও রাজি সে।
” তর বউ হওয়ার আগে সে আমার একজন ছিলো। ইভেন এখনও আছে নিক। ভুলে যাস না এই মেয়েটার জন্য ভিকি থেকে আজ আমি নাভিদে পরিনত হয়েছে।
নিক ভ্রু নাচিয়ে হেসে বলে,
‘ তর তো গর্ব করা উচিত ভিকি। আমার বউয়ের জন্য তুই মানুষ খেকো রেপিস্ট জানোয়ার থেকে একজন আদর্শ মানুষে পরিনত হয়েছিস। আমার বউ ছিলো বলেই তুই অধর্ম থেকে ধর্মের পথ বেছে নিয়েছিস। অবৈধ থেকে বৈধতা হাতে তুলে নিয়েছিস। আদ’ও সত্যি কি -না সন্দেহ হয়।
নাভিদ টেভিলের উপর আঘাত করে চেঁচিয়ে উঠে,
” স্টপ দিস ফাকিং ডিসকাশন। আই ক্যান্ট টলারেট ইট।”ল
বউ কাকে বলছিস? জোর করে বিয়ে করলেই বিয়ে হয়ে যায় না। মেয়েটাকে জোর করে বদ্ধ রুমে আটকে রেখেছিস। তর মনে হয় কোনোদিন তুই ওর ভালোবাসা পাবি। দেহের পাগল যখন হবি’ই তখন আমার নিষ্পাপ পাখির উপর কেনো হাত বাড়িয়েছিস? তর পাচার কেন্দ্রে তো সুন্দরী নারীদের অভাব নেই। তাদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করে নিতি। ওকে কেনো ছিনিয়ে নিয়েছিস শু ** বাচ্চা।
নিক শক্তভাবে ঠোঁটের নরম অংশটা কামড়ে ধরে রাখে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বারের লাল-নীল লাইটের আলোতে স্পষ্ট বুঝা না গেলেও গ্যাংস্টার বসের রাগ আন্দাজ করার মত। ঘাড়ে আঙ্গুল ঘেষে দাঁত কট মট করে উঠে। ধূসর মনি গুলো তীব্র ক্ষুভে ঝলঝল করছে। হিংস্র হায়েনার ন্যায় এক ঝটকায় নাভিদের শার্ট চেপে ধরে। এরপর ক্ষুব্দ নয়নে তাকিয়ে বলে,
” দেহের পাগল হলে বিয়ে ছাড়াই রক্ষিতা বানিয়ে রাখতাম দিনের পর দিন। আল্লাহর কালাম পাঠ করার আগে ওর সতিত্ব ছিনিয়ে নিতাম। আমার ব্লাড রোজ খুব বোকা ভিকি। পুরো দুনিয়া জানে আমার রাগের নিয়ন্ত্রন নেই। একজন হার্ট ছাড়া সাইকোপ্যাথ। সামনে দাঁড়িয়ে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। অথচ সে এমন এমন কথা বলে যেসব কথা অন্য কেউ বললে তার সামান্য রক্ত বিন্দু ও কেউ খুঁজে পেত না। আমার সঙ্গী হান্টার আর শ্যাডোর আহার হত। ওর বোকা বোকা কথার জন্য শুধু মাইর খায়। যদি আমার কথামত চলত ট্রাস্ট মি সামান্য আঘাত ও আমি ওকে করতাম না। ওকে আঘাত করলে আমার কলিজায় গিয়ে আঘাত লাগে। তবে তাকে মানসিক কষ্ট দিতে আনন্দ অনুভব করি। সবাই যদি বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখত তাহলে রাস্তাঘাটে এত এত প্রস্টিউট দেখা যেত না। হোটেলে পরুষ নিয়ে রং-তামাসায় মেতে উঠতেও দেখা যেত না। সে আমার বউ হওয়ার যোগ্যতা রাখে বলেই পুরু মাফিয়া সম্রাজ্যের মালকিন হতে পেরেছে। ওকে আঘাত করে ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন করব আমি। আবার সেই জায়গায় মলমটাও আমি’ই লাগাব। মলম লাগিয়ে দেওয়ার ভাগটাও আমি কাউকে দিব না । প্রস্টিটিউটের অর্থটা তুই খুব ভালোভাবে বুঝবি ভিকি। অবশ্য তুই তো ছোট থেকেই চরিত্রহীন।
ভিকি চোয়াল শক্ত করে ফেলে,
” চরিত্রহীন ছিলাম আমি। তবে সেটা অতীত ছিলো আমার।
নিক অদ্ভুতভাবে হেসে বলে,
” বর্তমানে জুহ্বা পড়লেই অতীতের ল্যা*** ছবি ঢাকা যায় না। মেমোরির কোনো এক প্রান্তে সেটা থেকে যায়।
” আমি তো অতীতে ছিলাম। তুই তো বর্তমানেই হয়ে আছিস।
” পর নারীর সামনে নগ্ন হয় নি। নিজের বউয়ের সামনেই হয়েছি।
নাভিদ রাগ নিয়ন্ত্রন করতে পুরো বোতল ওয়াইন গিলে ফেলে। ভালোবাসার মানুষটার পাশে অন্য পুরুষকে সহ্য করার ক্ষমতা কোনো প্রেমিক পুরুষের থাকে না। নিক সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে। নাভিদ বড় বড় নিশ্বাস টেনে বলে,
” পুরো জীবনটাই আমি উৎসর্গ করেছি ভালোবাসার নামে। তুই কতটুকু উৎসর্গ করতে পারবি।
” কারোর জন্য নিজের কিছু উৎসর্গ করে দেওয়ার মত বোকা আমি নয়। তবে নিজের বউয়ের দিকে যদি কোনো শকুন বা চিলের নজর পরে তাহলে পুরো ধরনীতে ধ্বংসের বন্যা নিয়ে আসতে বেশিক্ষন সময় লাগবে না।
” ধ্বংস তুই হবি এইটা নিশ্চিত নিক। যত বড় ক্ষমতাধর গ্যাংস্টার বস হস না কেনো। তর বিরুদ্ধে এখন আঠারো জন গ্যাংস্টার। তারাও তদের থেকে কম নয়। তর মাফিয়া জীবনে শুধু কায়াত শত্রু ছিলো। কিন্তু এখন ইগর, রাফায়েল, মার্কো সবাই তর শত্রু পক্ষের দল। সবটাই কিন্তু এনিকে ঘিরে। তারা একসময় তর সব থেকে বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলো। তুই তাদের কাছ থেকে তাদের শিকার কেড়ে নিয়েছিস। মিটিং এ রাফায়েলকে গলা টিপে ধরে রক্তাক্ত করে দিয়েছিস। তারা সবাই এখন পাগলা কুকুরের মত হয়ে আছে। বর্তমানে দশ জন তর শত্রু। বাকি আটজন এই চাওয়া থেকে সরে গিয়েছে। কয়দিন লড়াই করবি? আমার পাখিকে আমার কাছে দিয়ে দে। এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব যেখানে কারোর নজরে যাবে না। কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না।
” শেয়ালের কাছে মুরগী দান করার অফার দিচ্ছিস শালা মা*দার্ফাক। তর কাছে দিব। যাতে তুই বিয়ে করে বাচ্চার বাপ হতে পারিস। এই নারীর দিকে কেউ তাকালে ও আমার সহ্য হয় না। ইচ্ছে করে কলিজাটা টেনে নিয়ে আসি। হোক সেটা নারী অথবা পুরুষ। শত্রুদলের সাথে লড়াই করতে গ্যাংস্টার বস একটু বেশিই এক্সপার্ট। প্রয়োজনে এই নারীকে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখে জমিন রক্ত দিয়ে রাঙ্গাব। তবুও কোনো পুরুষের নজরে পড়তে দিব না।
থেমে…
” আঠারো জন মাফিয়ার মধ্য থেকে যদি ভুলেও কেউ কোনোদিন এই নারীকে কলঙ্কিত করতে পারে তাহলে আমি গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান সেদিন নিজ হাতে নিজের কলিজা কেটে কুকুরকে খাওয়াব।
নাভিদ শক্ত হয়ে বসে থাকে। নিকের রাগের মাত্রা এখন নিয়ত্রনের বাহিরে চলে যাচ্ছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে চেয়ার থেকে। নাভিদের দিকে ঝুঁকে হিসহিসিয়ে বলে,
” আর বললি না, তর ভালোবাসা ছিনিয়ে নিয়ে এসেছি। ভালোবাসা ছিনিয়ে নেয় নি বরং তুই অন্যের জিনিসের প্রতি এতদিন নজর দিয়ে রেখেছিলি।
হাওয়া যেমন আদমের পাঁজরের নিকটস্থ স্থান থেকে সৃষ্টি হয়েছিলো,ঠিক তেমনি এই নারী আমার অস্তিত্বের সবচেয়ে কাছের জায়গা থেকেই জন্ম নিয়ছে। আমার জিনিসের দিকে হাত বাড়াস কত বড় কলিজা নিয়ে। যেদিন ধৈর্য ভঙ্গ হয়ে যাবে সেদিন তর গলায় ছুঁড়ি বসাতেও হাত কাঁপবে না। আই রিপিট একটুও হাত কাঁপবে না।
নাভিদ নিকের চোখে চোখ রেখে বলে,
” ও যদি তকে ভালোবাসত তাহলে আমি সব কিছু বিসর্জন দিতে পারতাম। খোদার কসম একবারের জন্য ও তর কাছে হাত বিছাতাম না। কিন্তু সে তকে চায় না। ঘৃনা করে তকে। এমন ঘৃনা যে তর ছটফট দেখলেও হয়ত শান্তি অনুভব করবে।
নিক নাভিদের চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলে,
” সেই ঘৃনার ভাগটাও আমি কাউকে দিতে চাই না।।ওকে আঘাত করতে করতে এমন ভাবে তৈরি করব যাতে একজন গ্যাংস্টারের সাথে বাস করার সপ্ন দেখতে পারে। নরম আর দুর্বল মেয়ে আমার সাথে টিকতে পারবে না।
” কিন্তু সে দুর্বল।
নিক বাঁকা হেসে বলে,
” কে বলেছে সে দুর্বল? গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের ভার্জিনিটি ধ্বংস করেছে এই মেয়ে। আমাকে সামলানোর ক্ষমতা যার আছে সে দুর্বল ভাবার মত বোকামি করিস না। আঘাত করলে অসহায়ত্ব নয় সাহস দেখতে পায়। এই নারীকে অসহায় ভাবার মত বোকামি করিস না।
নাভিদ বাক্য হারা হয়ে পড়ে। চেয়ারের মধ্যে ধপ করে বসে যায়। চোখ বন্ধ করে দুই ফুটা অশ্রু বিসর্জন দেয়। এতদিনে আগলে রাখা ভালোবাসাকে কেউ ছুঁয়েছে। ভাবতেই যেন হৃদয়টা তার ছিন্ন -বিচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। মাথার চুল খামছে ধরে শক্তভাবে। ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে স্তব্দ হয়ে বসে থাকে। নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে বার থেকে প্রস্থান করার জন্য পা বাড়ায়। নাভিদ রাগে গর্জে উঠে,
” আমাকে আমার ভালোবাসা না দিলে অতীতের সেই ভিকি হতে বাধ্য করিস না নিক।
নিক কিছুক্ষনের থেমে যায়। দৃষ্টি সামনের দিকে রেখে শক্ত গলায় বলে,
” অপেক্ষাই থাকব। তবে এই মুহূর্তে ওকে তর অতীত জানানো প্রয়োজন। তর আসল পরিচয়? কে তুই? তর পাপের গভীরতা ঠিক কতটুকু। কি বলিস?
” কথা দিয়েছিস তুই। তুই বলেছিলি আমার অতীত নিয়ে এনিকে কিছু বলবি না।
” তুই নিজেও কথা দিয়েছিলি আমাদের মাঝে আর আসবি না। কথা দিয়েছিস বলেই আমি এই নারীকে কিছু জানায় নি। তাহলে কেনো বার বার আসছিস?
” দুর্বল জায়গায় আঘাত করছিস?
” এই নারীর দিকে চোখ দিলে তর দুর্বল জায়গাটাও কেটে ফেলতে পারি। সময় আসলে দেখিয়ে দিব। আপাযত অন্য নারীর সাথে চিল কর।
নিক আর দাড়ালো না। বড় বড় পা ফেলে নিষিদ্ধ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। নিকের কথাটা বুঝতে নিকের অনেক্ষন সময় লাগলো। মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তীব্র ক্ষোভে টেবিলের উপরে রাখা সব কিছু এক ঝটকায় ফেলে দেয়। ভাঙ্গা কাচের আঘাতে হাত কেটে রক্তাক্ত হয়ে যায়। তরল রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে হাত থেকে। লাল রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো টেবিল। নাভিদের চোখ দুই যেন সেই রক্ত থেকে ও লাল হয়ে আছে। কন্ঠে বিষ ঢেলে বলে,
” সময় আসতে দে নিক। প্রথম ছুঁড়িটা আমি’ই চালাব। আমিও দেখব কে জিতে। গল্পের ভিলেন নাকি গল্পের নায়ক।
বাগান বাড়িতে থাকার জন্য মাত্র তিনটা রুম। এই বাগান বাড়ি মুলত নিক আর আরিশের। প্রয়োজনে এখানে আসলে একটা রুমে আরিশ, অপর রুমে নিক, অন্যটার মধ্যে অধিরাজ নিদ্রা যাপন করে। কিন্তু বর্তমানে দুইটা রুম থাকার যোগ্য। অপর রুমটার মধ্যে কিছু গোপনীয় জিনিস রাখা হয়েছে। বাকি যে বড় বড় রুম রয়েছে সব কিছুর মধ্যেই গোপন মাল। যে রুমের তালা এক মাত্র গ্যাংস্টার বস ছাড়া কেউ খুলতে পারবে না। নাজলী নিজের রুম ছেড়ে আরিশের রুমের মধ্যে প্রবেশ করে। আরিশ এই মুহূর্তে ল্যাপটপের মধ্যে কাজে ব্যস্ত। কপাল কুচকানো আর মুখ তুলনার থেকে বেশি গম্ভীর। নাজলী রুমে প্রবেশ করতেই আরিশ চোখ তুলে তাকায়। চোখে পড়ে হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমনীর দিকে। আরিশ চোয়াল শক্ত করে ধমক দিয়ে বলে,
” হাউ ডিয়ার ইউ ফা*কিং গার্ল। অনুমতি ছাড়া রুমে প্রবেশ করার সাহস পেলে কিভাবে?
নাজলী রেগে গেলেও অত্যন্ত বিনয়ীর সাথে বলে,
” নিজের স্বামীর রুমে আসতে অনুমতির প্রয়োজন হয় না।
আরিশ এই স্বামী নামক শব্দটা সহ্য করতে পারে না। রাগ তার নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যায়। নাজলী যেন রাগাতে আরও বেশি মজা পায়। সে খুব ভালো করেই জানে আর যায় হোক তার সাথে স্বামীর অধিকার খাটাবে না। কারন রুমের প্রতিটা জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো। আর ক্রিমিনাল লিডার জেনে -বুঝে এইসব করতে আসবে না। এই বিষয়ে নাজলী একদম বিশ্বাসী। ইজ্জত নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। যখন এইসব নিয়ে চিন্তা নেই তখন ক্রিমিনালের বাচ্চাকে রাগাতে পিছু -পা হবে কেনো?
আরিশ রেগেও যেন প্রকাশ করলো না। শক্ত গলায় বলে,
” মাইর খেতে না চাইলে রুম থেকে বের হও।
নাজলী চোখ ছোট ছোট করে ফেলে,
” আপনি আমাকে মারবেন আর আমি বসে বসে কি সিনারি দেখব?
আরিশ তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে বলে ,
” ক্ষমতা আছে আমাকে কিছু করার?
নাজলী ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
” একবার যে চেপে ধরেছিলাম সেটা -কি ভুলে গিয়েছেন ক্রিমিনাল বস।
আরিশ আচমকা কেঁশে উঠে। নাজলী ঠোঁট কামড়ে হেসে আরিশের দিকে তাকায়।একজন আদর্শ স্ত্রীর মত আরিশের কাছে এগিয়ে যায়। পিঠে হাত রাখতেই আরিশ এক টানে বিছানায় ফেলে দেয়। নাজলী বুঝে উঠার আগেই নাজলীর উপরে উঠে আসে। বিছানার সাথে দুই হাত চেপে ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
” জ্বালাচ্ছো কেনো এইভাবে? শান্তিতে থাকতে ভালো লাগে না? ইজ্জতের ভয় নেই?
নাজলী ছুটার জন্য ছটফট করে উঠে। আরিশ আরও শক্তভাবে চেপে ধরে। নাজলী শান্ত হয়ে আসে। মিহি আওয়াজ অথচ শক্ত গলায় বলে ,
” ছাড়ুন। ব্যাথা পাচ্ছি।
আরিশ নাজলীর দিকে আরও একটু ঝুঁকে বলে,
” কিছুই তো করলাম না। ব্যাথা পাচ্ছো কেনো?
আরিশের কথায় নাজলী তেলে -বেগুনে জ্বলে উঠে। আরিশকে সরাতে সরাতে চেঁচিয়ে উঠে,
” অসভ্য পুরুষ। এইসব লাগামহীন কথাতে ভবিষ্যতে ঠাডা পড়ুক।
নাজলীর চেঁচানোতে যেন আরিশের রাগটা আরও দ্বিগুন বৃদ্ধি পায়। চোয়ালটা শক্তবাবে চেপে ধরে বলে,
” গলাও আওয়াজ আসে কোথা থেকে এত? আমার ভবিষ্যতের উপর শত্রুতা কি তর? বার বার এইটাকে টানিস কেনো?
নাজলী সামান্য লজ্জায় হাঁশ-ফাঁশ করে উঠে।গাল এমন শক্তভাবে চেপে ধরাতে ব্যাথা ও পাচ্ছে প্রচন্ড। লজ্জাটা ভুলে গিয়ে আরিশকে সরানোর চেষ্টা করে বলে,
” গাল ছাড়ুন ব্যাথা পাচ্ছি আমি। আর একদম তুই-তুইকারি করবেন না। যখন বউ মানেন না তখন তুই সম্মোধন করেন কোন অধিরাকে?
আরিশ আরও শক্তভাবে চেপে ধরে ,
” তদের মত মেয়েদেরকে বউ নয় বিছানাতেই মানায়। আর আরিশ ইলহামের রুচিতে এতটাও দুর্ভিক্ষ নামে নি যে তকে বউ হিসেবে গ্রহন করবে। আর বিছানায় তো আরও আগে নিবে না।
তীব্র অপমানে নাজলীর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। ব্যাথায় ছটফট করতে থাকা রমনী শান্ত হয়ে যায়। চোখে পানি নিয়ে তাকায় আরিশের দিকে। হাসার চেষ্টা করে বলে,
” কারন আমাদের মত মেয়েদের বউ বানানোর জন্য যোগ্যতা নেই আপনাদের। আমাদের মত মেয়েদের কাছে আপনারা ডিজার্ব করেন না। আপনারা ডিজার্ব করেন রাস্তার প্রস্টিটিউড আর পতিতালয়ের নারীদের। পবীত্র নারীদের সান্নিধ্য পেলে আবার সহ্য হবে না আপনাদের। কথায় আছে কুকুরের পেটে ঘি হজম হয় না।
আরিশ হিংস্র চোখে তাকায় নাজলীর দিকে। ক্ষেপা বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে নাজলীর উপর। তীব্র ঘর্ষনে ওষ্ঠের সাথে ওষ্ঠ মিলিত করে ফেলে। নাজলী ব্যাথায় আরিশের বুকে ধ্বাক্কা দেয়। একজন পুরুষের কাছে একজন নারীর শক্তি বরাবর এই তুচ্ছ। আরিশ এক হাতে নাজলীর পেটের নরম অংশে খামছে দিয়ে ধরে।নাজলী আরিশের বুকে একাধারে আঘাত করতে থাকে। আরিশ পুনরায় নাজলীর হাত দুইটা এক হাতে শক্তভাবে চেপে ধরে। ঠোঁট ছেড়ে গলায় নেমে আসে। নাজলী শান্ত কন্ঠে বলে,
” কালসাপের রুপে বেরিয়ে আসলেন তাহলে? যখন সব কেড়ে নেওয়ার ইচ্ছে ছিলো এতদিন ভালো হওয়ার নাটক কেনো করেছেন?
আরিশ গলায় নিচের অংশে কামড় বসিয়ে নাজলীর চোখে চোখ রাখে। গলায় চেপে ধরে বলে,
” একজন পুরুষকে রাগাতে চলে আসো কোন সাহসে? এখন ভয় পাচ্ছো কেনো?
নাজলী তেজী কন্ঠে বলে,
” আমাকে এখানে আটকে রেখেছেন কোন অধিকারে? শান্তিতে থাকবেন, ভেবেছেন ? ক্ষনে ক্ষনে জ্বালিয়ে মারব। জানি একদিন সব হারাতে হবে। তবে আপনাদের হারিয়ে আমি শান্ত হব।
আরিশ নাজলীর রক্তাক্ত ঠোঁট-টার দিকে তাকায়। কেটে গিয়েছে অনেক জায়গায়। কাটা জায়গায় শক্তভাবে আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে। নাজলী ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। আরিশ আঙ্গুল সরায় না। একইভাবে চেপে ধরে বলে,
” এত তেজ কেনো তোমার? ভয় করে না?
” কাপুরুষকে ভয় করতে নেই। বাঁচতে হলে মাথা উচু করে বাঁচো। নচেৎ বাঁচার প্রয়োজন নেই। কারোর পায়ের নিচে পড়ে থাকার মত মেয়ে আমি নয়।
আরিশ নাজলীর চোখে চোখ রেখে চোয়াল শক্ত করে বলে,
” তোমার অতিরিক্ত সাহসিকতা তোমার বিপদ ডেকে আনবে। তোমার কল্পনাতেও নেই আমি কেমন।
নাজলী সুযোগ বুঝে লম্বা নখ দিয়ে আরিশের হাত খামছে ধরে। কিছুক্ষনের ব্যবধানে নখ গেথে যায় মাংশের ভেতর। লাল রক্ত বেরিয়ে আসে। আরিশ কপাল কুচকে তাকায় সেদিকে। নাজলী ও সেদিকে তাকিয়ে বলে,
” আমাকে রক্তাক্ত করেছেন তাই আমিও রক্তাক্ত করলাম। প্রতিশোধ! যাস্ট জায়গা ভিন্ন। আপনি ঠিক কতটা খারাপ সেটার পূর্ন জ্ঞান না থাকলে ও যতটুকু জানি সেটা দিয়ে আপনাকে ঘৃনা করার জন্য যথেষ্ট। আপনার মুখে থু-থু ফেলার জন্য ও যথেষ্ট। তাই আর অতিরিক্ত জানতে আগ্রহী নয়।
আরিশ আঘাত করতে গিয়ে ও থেমে যায়। এক ঝটকায় নাজলীকে ধ্বাক্কা মেরে সরিয়ে উঠে বসে। নাজলী ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে। এই হেরে যাওয়াটা দেখলে সে শান্তি অনুভব করতে পারে। আরিশ নিকের উদ্দেশ্যে কিছু বিশ্রি গালি প্রয়োগ করে।।তবে সেটা নাজলী শুনতে পায় না। নাজলী সেদিকে পাত্তা না দিয়ে শান্ত গলায় বলে,
” আমার বোন কেমন আছে?
” যেমন থাকার তেমন আছে।
” সুস্থ নাকি অসুস্থ।
” পরের বউ সম্পর্কে জানতে আমি ইচ্ছুক নয়।
” একসময় তো ভালোবাসতেন? নাকি সেই ভালোবাসাটাও মিথ্যা ছিলো?
” সৌন্দর্যের মোহে পড়েছিলাম। ভালোবাসা নয়। এখন নিকের ওয়াইফ । তাই এই ভালোবাসা নিয়ে পরের বার কথা তুলবে না
” ওয়াইফ মাই ফুট। আমার বোনকে নাভিদ ভালোবাসে। এনির জন্য নাভিদ আছে। আপনাদের মত নর পশুর সাথে কখনো রাখব না।
আরিশ ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” নাভিদ-কে ভালোভাবে চিনো?
” না চিনার কথা ছিলো? ভালো ব্যক্তিদের সবাই চিনে।
” নাভিদ আসলে কে জানো সেটা?
” ম… মানে?
” মানে তোমাদের আদর্শবাদ নাভিদের অতীত জানো? কে ছিলো সে? তার পরিচয়?
নাজলী শান্ত থেকে বলে,
” নাভিদের আসল পরিচয় কি?
” নিজেই খুঁজে নাও।
” আপনাকে প্রশ্ন করছি আমি।
” উত্তর দিব ভাবলে কিভাবে?
নাজলী চোয়াল শক্ত করে বলে,
” যখন উত্তর দিবেন না তখন এই প্রসঙ্গ টেনেছেন কেনো?
” আমার ইচ্ছে।
নাজলী বিরক্ত হয় এমন ত্যারা উত্তরে।
” সবাই যে উজ্জল অতীত নিয়ে বাঁচবে তার তো কোনো মানে নেই? পৃথিবীর অধিকাংশ ব্যক্তির অতীত ঘাটলে ঘোলাটে আসবে। অতীত দেখে নভিদকে বিচার করা হয় নি। তবে তার বর্তমানে খুব সুন্দর। সে আগলে রাখতে জানে। আমি আমার বোনের সাথে দেখা করতে চাই।
” যেখানে আমার দেখার অনুমতি নেই সেখানে তোমার দেখা করাটা বিলাসিতা।।
নাজলী অবাক হয়ে বলে,
” ম… মানে?
আরিশের সাবলীল উত্তর,
” নিক ছাড়া একটা পাখিও তাকে দেখার অনুমতি নেই।
নাজলীর ভিতরটা কেঁপে উঠে। ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে। অসহায় দুর্বল কন্ঠে বলে,
” তার মানে কারাদন্ড জীবন।।
” কিছুটা। তবে স্বামীর আদর-সোহাগ আছে এই জীবনে।
নাজলী তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” আদর -সোহাগ নাকি অত্যাচার?
” স্বামী -স্ত্রীর ব্যাপারে আমি কেনো জানতে যাব?
” আপনি না জানলেও আমি জানব।
আরিশ কপাল কুচকে বলে,
” তোমার লজ্জা করছে না নিজের বোনের ব্যক্তিগত রুম দেখার চিন্তা-ভাবনা করছো।
নাজলী থমথমে খেয়ে যায়। নাজলীর থমথমে মুখ দেখে আরিশ শান্ত কন্ঠে বলে,
” যে মিনারে মাফিয়ারা ডুকতে পারছে না সেখানে ডুকার চিন্তা করো কিভাবে? জান নিয়ে ফিরবে ভেবেছো?
নাজলী শক্ত হয়ে বসে থাকে। কোনো রেসপন্স নেই। আরিশ ধমক দিয়ে বলে,
“ক্ষমতা শেষ? আর ঝগড়া করবে না? বের হও রুম থেকে।
নাজলী কোনো বাক্য খরচ করলো না। এনির চিন্তায় মাথা হ্যাং হয়ে আসছে। এই লোককে পরে জ্বালানো যাবে।
রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়র কাছে আসতেই অধিরাজের সম্মুখীন হয়। চোখের সামনে কাউকে দেখে ঠোঁট ঢেকে ফেলে। অধিরাজকে দেখে বিরিক্তির নিশ্বাস ছাড়ে। নাজলী সিঁড়ির মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে। অধিরাজ কন্ঠ শক্ত করে বলে,
” সাইট দিন।
নাজলী ছোট ছোট চোখ করে বলে,
” কেনো?
” স্যার কাছে যাব।
” এদের মত দবল রোগীর সাথে আপনি অমবশ্যা কিভাবে যোগ হলেন?
অধিরাজ চোয়াল শক্ত করে বলে,
” আফ্রিকার যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি সেই মাটির ছেলে। আপনার মত দুই দিনের অথিতি নয়।
” তাই বলে এত কালো হবেন?. অন্ধকারে কেউ তাকালে তো ভয় পেয়ে যাবে?
” ভাগ্যিস কালো হয়েছি। আপনার মত দবল রোগী আর ঘোড়ার লেজের মত লাল চুল হয় নি।
নাজলী কটমট চোখে তাকায়। অধিরাজ দাঁত বের করে হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। অধিরাজ চলে যেতেই নাজলী বিরবির করে উঠে,
” দুই- টাই হাফ লেডিস। মেয়েদের মত ঝগড়াতে এক্সপার্ট। বাকিটার কথা জানা নেই।
রাতের অনন্তময় অন্ধকার যখন পৃথিবীর প্রান্তরজুড়ে নিঃশব্দতার গভীরতর স্তর স্থাপন করে তখন সমগ্র পরিবেশ যেন এক অদৃশ্য চাপের আওতায় স্তব্ধ হয়ে পড়ে। সেই স্তব্ধতার অন্তর্গত ক্ষুদ্রতম নড়াচড়া ও বাতাসের হালকা স্পর্শ বিরাজ করে। পাতার অতি সূক্ষ্ম কম্পন পর্যন্ত মনে হয় এক ব্যাঘাতময় প্রতিফলন সৃষ্টি করে যা অনাকাঙ্ক্ষিত আতঙ্ক এবং নীরব রোমাঞ্চের সমন্বয়ে মানুষের মনকে অনির্ণেয় উত্তেজনায় আবদ্ধ করে।
চাঁদের ক্ষীণ রূপালি আলো যখন অন্ধকারের অতল স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ঘন ও দুর্লভ ছায়াগুলি এমন এক জটিল প্রক্ষেপ তৈরি করে।যা দেয়াল, মেঝে, কাঠের আসবাবপত্র এবং বাতাসের অদৃশ্য অণুসমূহকেও যেন জীবন্ত এক মহাসংগঠন হিসেবে উপস্থিতি স্বীকার করতে বাধ্য করে। দূরবর্তী জনপদ থেকে ভেসে আসা যান্ত্রিক বা প্রাণিসত্তার সৃষ্ট অপ্রত্যাশিত শব্দও সেই নিস্তব্ধতার বিশাল কাঠামোতে মুহূর্তের জন্য প্রবেশ করলেও, শীঘ্রই তা আবার অদৃশ্যতর হয়ে যায়।
নক্ষত্রময় আকাশের নীরব স্নিগ্ধতা, এবং তার প্রতিটি জ্যোৎস্নার ক্ষুদ্রতম প্রতিফলন, যেন এক অদৃশ্য আদালতের মতো মানব মনকে পরীক্ষার জন্য দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড দীর্ঘায়িত হয়ে অনন্তকাল হয়ে ওঠে, এবং বাতাসের প্রতিটি নরম দোলা এমন তীক্ষ্ণভাবে অনুভূত হয়, যেন তা কোনো গোপন, অলৌকিক নিঃশ্বাসের পরিচায়ক।
রাতের নিস্তব্দয় বদ্ধ রুমে বসে ফুঁপিয়ে কান্না করছে অষ্টদশী কন্যা। লাল -কালোর মিশ্রনে বেড সিটে বসে আছে। ভয়, অন্ধকার সব কিছুর সাথে নিরবে যুদ্ধ করছে। ঠিক সে সময়ে আঘমন ঘটে গ্যাংস্টার বসের। রাত তখন হয়ত একটার কাছা-কাছি। এনি কান্না বন্ধ করে দেয়। থম মেরে বসে থাকে একই জায়গায়। বুকের ভেতরে ধুক-ধুক করছে। মেডিসিনের প্রভাবে আজ সারাদিন ঘুমিয়েছে। নিক ধীরে ধীরে এনির দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। পায়ের শব্দ যত এগিয়ে আসতে থাকে এনির ভয়টা ও ঠিক ততটা তীব্র হতে থাকে। ভয়ে নিজের জামা ভালোভাবে চেপে ধরে। গলা শুকিয়ে আসছে তার। পানি পিপাসায় ছটফট করে ওঠে মন। আচমকা শূন্যে ভেসে যায়। ভয়ে কারোর শার্টের অংশ চেপে ধরে। নাক -মুখ খিঁচে ফেলেছে। নিক এনিকে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। সে নিজেও ভালোভাবে তাকাতে পারছে না। এদিক -সেদিকে ঢলে পড়ছে মাতালদের মত। ডিভানের উপর বসে পকেট থেকে কিছু একটা বের করে। এরপর এইটার সাহায্যে বারান্দার সমস্ত কাউচ খুলে দেয়। সাথে সাথে রাতের ঠান্ডা বাতাস তাদের দুজনের শরীরে এসে আছড়ে পড়ে। এনি ভয়ে এখনও নিকের বুকে মুখ লুকিয়ে আসে। শরীরে বাতাসের স্পর্শ অনুভব করতেই বুক থেকে মাথা তুলে। কাউচ খোলা দেখে অবাক হয়ে যায়। দুর আকাশে রাতের তাঁরা গুলো চিক চিক করছে। পূর্নিমার চাঁদের আলো যেন সব টুকু বারান্দায় চলে আসতে চাইছে । এতদিন পর চির-চেনা প্রকৃতি দেখে স্তব্দ হয়ে তাকিয়ে থাকে।।হ্যা, এইটার তো তার জীবন। খোলা আকাশের নিচে মুক্ত পাখির মত ডানা ঝাপ্টানো। বদ্ধ রুমে আটকে থাকা তো নরকবাস। এইটা কোনো জীবন নয়। এনি মন শান্ত করতে চোখ বন্ধ করে ফেলে। বাতাসের মিষ্টি গন্ধ অনুভব করতে লম্বা একটা শ্বাস টানে। নিকের উড়ুর উপর বসে আছে সে খেয়াল তার নেই। গলায় কারোর স্পর্শ অনুভব করতেই কেঁপে উঠে। নিককে এমন বেপোরোয়াভাবে স্পর্শ করতে দেখে ভড়কে যায়।নিকের কোল থেকে নামার জন্য ছটফটিয়ে উঠে। নিক শক্তভাবে এনির কোমরটা চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। এরপর গলায় মাদকতা মিশিয়ে বলে
” নড়ে না ব্লাড রোজ। আমাকে শান্তিতে নিশ্বাস নিতে দাও।
নিকের এমন নরম কন্ঠে অবাক হয়ে যায়। আজ তো কোনো ওয়াইনের গন্ধ সে পায় নি। যখন মদ খায় নি তখন মাতলামো করছে কেনো? এনি নিম্ন আওয়াজে বলে,
” ছাড়ুন আমাকে।
নিক এনির তিলে ছোট্ট করে চুমু খেয়ে বলে,
” এইভাবে বসে থাকো। অশান্ত মনটাকে শান্ত হতে দাও। আমাকে ভয় পাও জান ?
এনি চমকে উঠ নিকের মুখে নতুন সম্মোধন শুনে। আর এত নরম ব্যবহার ও সহ্য হচ্ছে না।
” কি খেয়েছেন আজ?
নিক নেশালো গলায় বলে,
” ড্রাগস নিয়েছি। শান্তি পাচ্ছি না কোনো কিছুতেই। আমার মানসিক শান্তির প্রয়োজন ব্লাড রোজ। একটু শান্তি দাও আমাকে।
” আমি শান্তি কিভাবে দিব? ড্রাগস নিয়েছেন কেনো?
নিক শব্দ করে হাসলো। এনিকে বুকের সাথে আরও ভালোভাবে মিশিয়ে বলে,
” আমাকে ভয় পাও রোজ?
এনি টলমলে চোখ তাকায় চার-পাশে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকাতে থাকে। এনিকে রেসপন্স করতে না দেখে নিক গলায় কামড় বসায়,
” কথা বলছো না কেনো? ভয় পাও আমাকে?
” ভয় পাওয়াটাকি স্বাভাবিক নয়?
নিক বাচ্চাদের মত এনির গলায় নাক ঘেষে। এরপর গালে চুমু খেয়ে বলে,
” তুমি আমাকে ভয় পাবে না ব্লাড রোজ। আমি রেগে গেলে তুই ছাড়া আর কে সামলাবে? কেউ নেই আমার। এই পৃথিবীতে আমি একদম একা। যন্ত্রনায় ছটফট করলে অধিকার দেখিয়ে মলম লাগিয়ে দেওয়ার মত কেউ নেই। জ্বরে মরে গেলেও হাত বুলিয়ে দেওয়ার মত কেউ নেই। তকে আমার পাশে চাই। আমার শূন্য পৃথিবীতে তকে চাই বেবিগার্ল।
এনি কান্নায় ফুঁপিয়ে উঠে,
” মনের অজান্তে এইসব বলছেন। যখন নেশা কেটে যাবে তখন আমাকে আবার ও আঘাত করবেন। বিকৃত দৃশ্য দেখিয়ে মানসিক যন্ত্রনা দিবেন। আপনি সাধারন মানুষ নন। আপনার ভেতরে ভালোবাসা, হার্ট কিছু নেই। রোবটের মত এমন একটা সাইকোর সাথে আমি কিভাবে থাকব? বাঁচব মনে করেন?
নিক গলা থেকে মুখ তুলে। এনির মুখটা দুই হাতের মাধ্যমে আগলে নেয়। চোখের পানি মুছে দিয়ে দুই চোখে চুমু খায়। এরপর কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখে কিছুক্ষন। পিনপিন নিরবতা চারপাশে। দুইজনের গরম নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে একে -অপরের কাছে। নিক এনির নাকে নাক ঘেষে বলে,
” এই যান্ত্রিক হার্ট-টা প্রতিবার তর উপস্থিতিতে কম্পিত হয়ে উঠে। এই হৃদয়টা তর অনুপস্থিতে রক্তাক্ত হয়ে উঠে। তর সমস্ত ঘৃনা আমার হোক। এই ঘৃনার মধ্যে একটু ভালোবাসা চাই। একটু ভালোবসা নিয়ে তাকালে ঘৃনার দৃষ্টি ভুলে যেতে পারব।
এনি স্তব্দ হয়ে যায়। নিক তার কাছ থেকে ভালোবাসা চাইছে! এনি কান্না আটকে রেখে বলে,
” আপনি স্বাভাবিক নন। আমাকে একটা বদ্ধ রুমে বন্ধী করে রাখেন। কারোর সান্নিধ্যে যেতে দেন না।
নিক এনির গালে গাল ঘেষে বলে,
” এতে কষ্ট পাও তুমি?
অনেক দিন পর এমন কোমল আচরনে এনির কান্নার বেগ আরও বেড়ে যায়। তবে সে কান্না শব্দ হয় না। বাচ্চাদের মত ঠোঁট ভেঙ্গে বলে,
” কষ্ট লাগে।অশান্তি অনুভব করি । দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।
নিক এনির গালে গাল ঘেষে বলে,
” তোমার দিকে কেউ তাকালে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।।তোমার এত সুন্দর হওয়া উচিত হয় নি ব্লাড রোজ। যে দেখে সেই কেনো মোহিত হয়ে যায়? তোমার দিকে কেউ তাকালে আমি সহ্য করতে পারি না। হৃদয়ে রক্তক্ষরন হয়ে যায়। হাত নিশ-পিশ করে উঠে কলিজাটা টেনে নিয়ে আসতে। মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে যায়।
এনি কেঁপে উঠে নিকের স্পর্শে। নিককে সরিয়ে দিয়ে বলে,
” আপনি তাকান না কারোর দিকে?
” গড প্রমিস তুমি সেই নারী যাকে দেখে গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান প্রথম মোহিত হয়ে দেখেছে।
” আপনি আমার দিকে মোহিত হয়েছেন? কি দেখে মোহিত হয়েছেন?
নিক এনির দুই গালে হাত রেখে বলে,
” তোমার নীল চোখ, সোনালি লম্বা কেশ, দুই গালের
টোল। তিনটা জিনিসে আমি মাদকের থেকেও বেশি আসক্ত হয়ে পড়ি।
এনি মলিন হেসে বলে,
” আপনি যখন আমার জীবনে এসেছেন তখন কাল বৈশাখি ঝড় হয়ে কেনো এসেছেন? কেনো আমার গুছানো জীবনটাকে তছ-নছ করে দিলেন? একজন মানুষরুপী পাপাচারে লিপ্ত জানোয়ার হয়ে কেনো আসলেন? একজন আদর্শ প্রেমিক হয়ে আসলে কি এমন ক্ষতি হত? আপনার ঠোঁটের নিচের তিলটা আমাকে খুব টানে। তবে আপনাকে দেখে থেমে যায়। ঘৃনা চলে আসে হৃদয়ে। সব কিছু থেকে আমাকে আগলে নিয়েছেন ঠিক কিন্তু আগলে রাখতে জানেন নি। তছ-নছ করে দিয়েছেন আমার সব কিছু। সাজানো জীবনটাকে নরক বানিয়ে দিয়েছেন। কখনো ভালোবাসতে পারব না আপনাকে। আই হেইট ইউ গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান।
” কাকে ভালোবাসো? নাভিদকে? নাভিদকে ভালোবাসো তুমি?
এনি নিকের চোখে চোখ রাখে। শান্ত গলায় বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩১ (৩)
” সেই সুযোগটা দেন নি। ভালোবাসার আগেই ছিনিয়ে নিয়েছেন?
নিক যেন শান্তি পেলো। এনির ঠোঁটে শক্তভাবে চুমু খেয়ে সোজা হয়ে বসে। অতিরিক্ত ড্রাগস নেওয়ার ফলে এখন সে নিজের মধ্যে নেই। আচমকা কিছুর শব্দ নিক কপাল কুচকে ফেলে। দুর থেকে দেখা যাচ্ছে কোনো একটা আলো। একদম এনির মাথা বরাবর আলোটা এসে ঠেকেছে। নেশায় চেপে থাকা মাথাটা যেন সচল হয়ে উঠতে চাইছে। সময় ব্যয় না করে বাম হাতের সাহায্যে এনিকে ধ্বাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয়। সেকেন্ডের ব্যবধানে এক বিকট শব্দে চারপাশ স্তব্দ হয়ে যায়। এনি মাঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় দুই কান চেপে ধরে। রক্ত গিয়ে ছিটকে পড়ে তার চোখ -মুখে। মুখে ভেজা কিছু অনুভব করতেই হাত দিয়ে স্পর্শ করে। হাতে পায়ে লাল রক্ত দেখে নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে। কাঁপা-কাঁপা দৃষ্টিতে সামনে তাকাতেই দু কদম পিছিয়ে যায়।
