লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৩
লিজা মনি
১৫ মে ২০১৬, রোজ শনিবার।
তানজানিয়ার দার এস সালাম উপকূলে আজ সকালে এক বীভৎস দৃশ্য সাক্ষাৎ করলো। সমুদ্রতটে জোয়ারের তাণ্ডবে ভেসে এলো এক ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহাবশেষ। পরে নিশ্চিত হওয়া যায় এ মৃতদেহ আফ্রিকার অন্যতম বিত্তশালী ব্যবসায়ী, নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত শিল্পপতি মোজেস ওকোনকো’র।
দেহটি কংক্রিটের মতো ভারী করে গাঁথা ছিল কাঁচের টুকরো কাঁটাতার ও সীসার বলের সঙ্গে। মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন।একটি হাত সম্পূর্ণ উধাও,। আর বুকের ওপর খোদাই করে লেখা অদ্ভুত সংকেতময় কিছু অক্ষর যা এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
এই মৃত্যু ছিলো না কোনো দুর্ঘটনা, ছিলো না কোনো আবেগের হঠাৎ বিস্ফোরণ। এটি ছিল নির্মম পরিকল্পনার নিঃশব্দ ফলাফল যার অদৃশ্য রচয়িতা এখনো অধরা, অজ্ঞাত, এবং সম্ভবত অতি ক্ষমতাধর।
“কে করেছিল এই হিংস্র নরকীয়তা? কারা ছিন্ন করেছে এই দেহের অন্তঃস্থ আত্মাকে?
এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে গোটা মহাদেশের প্রতিটি বুদ্ধিজীবী মহলে। প্রশাসনের শীতল বিবৃতি জানায় “এখনো হত্যার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সন্দেহভাজনের খোঁজ মেলেনি। তদন্ত চলমান।”
তবে স্থানীয় মহল বলছে,
“মোজেস ওকোনকোকে যারা মেরেছে, তারা কেবল একজন মানুষকে হত্যা করেনি তারা হত্যা করেছে আফ্রিকার সম্ভাবনার প্রতীককে।
তারা রক্তাক্ত করেছে এই মহাদেশের আত্মবিশ্বাস।
সমুদ্র জানে, সূর্য দেখেছে, বাতাস সাক্ষী – তবু মানুষ জানে না কে নিলে এই প্রাণ।
গোটা আফ্রিকা দাঁড়িয়ে আছে এক অনুচ্চারিত আতঙ্ক ও প্রশ্নের মুখোমুখি
“আমরা কি সত্যিই নিরাপদ?
নাকি এই ব্যবসায়িক রাজনীতির আড়ালে রচিত হচ্ছে নীরব মৃত্যু-নাট্য?”
প্রতিটি চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়েছে এই সংবাদ। সে সংবাদ খানা দেখে গ্যাংস্টার বস নিষ্ঠুরভাবে হাসলেন।
দক্ষিন আফ্রিকায় অন্ধকার রাতের অন্তিম প্রহরে ” Blackglass Hall”
যে স্থাপত্য নির্মাণে শুধুমাত্র স্থিরতার রাজত্বই নয় বরং নিঃশব্দ শাসনের ধারাও আবদ্ধ।তাঁর অক্ষরে অক্ষরে টলটলে গন্ধ মিশে আছে রক্তের, বিষের, আর অশ্রুসিক্ত নীরবতার। কালো কাচের অভেদ্য দেয়ালগুলি আচ্ছন্ন যেখানে প্রত্যেকটি প্রতিফলন মনে করায় বঞ্চনা ও ভয়ঙ্কর মৃত্যুর অদৃশ্য প্রতিবিম্ব।
এই দুর্গে স্বাভাবিক সময় প্রবাহমান নয়।এখানে প্রতিটি শ্বাস প্রতিটি পদক্ষেপই বুকে আঘাত করে যেন শেকড় গর্তে ডুবছে। আন্ডারগ্রাউন্ডের প্রশিক্ষণ কক্ষে যেখানে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুকাবিলায় প্রহরী আত্মবলিদানের অঙ্গীকার বহন করে সেখানে হাড়ভাঙ্গা নীরবতা ভেঙে দেয় ভাঙা কাচের মতো নিঃশ্বাস। যুদ্ধের জটিল নৃত্য, অসংখ্য রক্ত ঝরানো মুহূর্ত, অনবরত ধাতব অস্ত্রের গর্জন যেন ছাপ রেখে যায় অন্তরে অমোঘ ও অব্যক্ত।
সেই বিশাল War Command Room-এ, যেখানকার নীল আলো ও ডিজিটাল ম্যাপের গাঢ় আভায় গোপন পরিকল্পনা আঁকা হয় সেখানে দাতা এক অদম্য সেনানায়ক। যে শুধুমাত্র নিজ হাতে নয়, চিন্তার প্রখর তীর দিয়ে শত্রুদের বিনাশ করে। তার চোখগুলো কালো কাঁচের মতো স্বচ্ছ অথচ কেউই তার অন্তরের গভীরতা জানে না।যেখানে বিরল মানবীয় দয়া নাড়িয়ে দেয় একাকার অন্ধকার।
গার্ড কোয়ার্টারগুলি স্থির, কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত।প্রতিটি যোদ্ধার চোখে ঝলমল করে অদম্য অগ্নি আর দেহে কাঁপন ধরে শত্রুর নাম শুনলেই। অস্ত্রাগার যা যেন মৃত্যুর মন্দির হাতিয়ার তীক্ষ্ণ ধার, গাঢ় বিষাক্ত রেশ, আর যুদ্ধের ঘাম।সবকিছু মিলেমিশে এক অভেদ্য প্রতিরক্ষা দেয়াল গড়ে তোলে।
নীরবতা এখানে প্রতিটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে মৃত্যুর ভাষা। Silence Room, সেই ভয়াবহ ঘর, যেখানে আলো ও শব্দ সর্বদা অনুপস্থিত।প্রতিটি নিঃশ্বাসই হয় মৃত্যুর পূর্বাভাস। সেখানে প্রবেশ করা মানে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
এছাড়া Medical Bay যেখানে জীবন বাঁচানো হয় না বরং ক্ষত সেলাই করা হয়। দ্রুত ফিরে এসে আবারও হত্যার রঙ্গমঞ্চে নামা যায়। শত্রুর যন্ত্রণার সাক্ষী হয়ে ওঠে নিঃস্ব রক্তাক্ত দেয়াল।
প্রতিটি করিডোরের কড়া সিকিউরিটি ও আধুনিক নজরদারি সিস্টেম। গভীর অন্ধকারে ঘেরা এক দুর্গের মতো। যার প্রতিটি কোণে জেগে আছে মৃত্যু। শাসক, ব্ল্যাক ভাইপার সর্বোচ্চ তলায় বিরাজমান। তার নিঃশ্বাস থেমে গেলে এই সাম্রাজ্যের হৃদয়ও বন্ধ হয়ে যাবে।
এই হলের প্রতি কোণে আর প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে একটি একক সঙ্কটের প্রতীক একটি অবিরাম যুদ্ধের গল্প যার পরিণাম লুকিয়ে আছে নিরবতার গভীরে।
হলের এক কোণে আছে একটি বিশাল আয়তাকার গ্লাসচেম্বার। যার ছাদ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া কাচে ঢাকা। সেই কক্ষে বসে আছে গ্যাংস্টার বস । তার সিংহাসনের পেছনের দেয়ালে টাঙানো অজস্র কালো মুখোশ। শত মুখ, হাজার শত্রুর আত্মা এখন তার শোভা। গ্যাংস্টার বস দুই ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট চেপে ধরে জিপ্পো লাইটার দিয়ে আগুন ধরায়। এরপর সামান্য ফুঁ দিয়ে ধোঁয়া উড়াতেই অধিররাজ এগিয়ে এসে বলে,
” বস মি, কায়াত সাথে রাশিয়ান মাফিয়া ইগর কাঞ্জেভস্কি, ইতালি মাফিয়া মার্কো স্পেনেল্লি, মেক্সিকান মাফিয়া ফ্যালকন তারা চারজন এসেছে। আর চারজন’ই সেদিন নিলাম কেন্দ্রে ছিলো। আর মেয়েটাকে নেওয়ার জন্য বেশি দেওয়ানা ছিলো। তাদেরকে ভিতরে আসার জন্য অনুমতি দিব?
গ্যাংস্টার বস সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে আকাশে ধোঁয়া উড়িয়ে দেয়। এরপর নিচে ফেলে দিয়ে অধিরাজের উদ্দেশ্যে বলে,
” এনটার নাও।
অধিরাজ আদেশ পেয়ে তাদের কাছে চলে যায়।
নিক সুইভেল চেয়ারটাকে এদিক – সেদিক ঘুড়াচ্ছে। কপালে বৃদ্ধ আঙ্গুল ঘেষে গম্ভীরতা নিয়ে বসে থাকে।
ঘরের নিরবতা হঠাৎ ছিন্ন করল জুতার মৃদু কড়াঘাত। গাঢ় কালো চামড়ার সুইভেল চেয়ারে বসে থাকা সেই ব্যক্তি গ্যাংস্টার সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি নিঃশব্দে চোখ তুললেন। চোখজোড়া কেমন বরফমণ্ডিত কোনো পর্বতের গভীর খাদ। চিবুক নিচু কিন্তু ঠোঁট দুটো সোজা দাগে শক্ত হয়ে থেমে আছে। চোখের সামনে সবাইকে দেখে নিক ঠোঁট কামড়ে হাসলেন। মি, কায়াত হিংসাত্বাক চোখে নিকের বাঁকা হাসি পরখ করে। এরপর গম্ভীরতা নিয়ে সামনে থাকা চেয়ারে বসে পড়ে। নিক সদিকে না তাকিয়ে নিজের সুজের উপর দৃষ্টি তাক করে বলে,
” জিজ্ঞাসা না করে বসাটা বেড ম্যানার্স।
নিকের মুখ থেকে প্রচলিত বাক্যটা সবার ইগোতে গিয়ে টাচ করে। রাগে ফুঁসে উঠে কিন্তু নির্বিকার। মি. কায়াত হাসি উপহার দিয়ে বলে,
” আমরা তো একই জলের মাছ মি, নিক জেভরান। বন্ধুদের কাছে আবার কোনো কিছুর পারমিশন নিতে হয় না কি?
নিক কুটিল হেসে বলে,
” এত ভুল কথা বলে মাফিয়া হলেন কিভাবে মি, কায়াত? আমি আর আপনি একই জলের মাছ নয়। আমি সম্রাজ্যের রাজা আর আপনারা প্রজা।
মি কায়াত অপমানে চুপসে যায়। চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধমিয়ে রাখে। এখন কিছু বললে নিজের ওই বিপদ। সবার সামনে গলা উচিয়ে কথা বলা যায় না। অনেকে মৃত্যুর টিকিট ধরিয়ে দেয়। মি কায়াত চুপসানো হয়ে ব্লেজার ঠিক করে বলে,
” সব বাদ দিন মি, নিক। কাজের কথায় আসি। আমরা এখানে কেনো এসেছি সেটা নিশ্চয় আন্দাজ করে ফেলেছেন। আমরা মেয়েটাকে চাই। শুনেছি আপনি মেয়েটাকে মি, আরিশের বাড়িতে রেখেছেন? যখন নিজের রক্ষিতা হিসেবে কিনে এনেছেন তখন বন্ধুর বাড়িতে কেনো জানতে পারি?
নিক ঠোঁট উল্টায়। এরপর কিছুক্ষন দাঁত দিয়ে চেপে ধরে বলেন,
” কখনো দেখেছেন নিক জেভরান কখনো কারোর প্রশ্নের উত্তর দিতে? নিজের টাকা খরচ করে রক্ষিতা কিনেছি এখন তাকে আমি কি করব সেটা নিজের ব্যাপার। আপনাকে কে বলেছে বাম হাত ডুকাতে?
মি, কায়াত কিছুটা ক্ষেপে উঠে বলে,
” একশত কোটি টাকার বিনিময়ে আপনি মেয়েটাকে কিনেছেন। আমি আপনাকে পুনরায় একশত কোটি টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছি। মেয়েটাকে আমায় ফিরত দিন।
নিক মাথা তুলে তাকয় মি, কায়াতের দিকে। এরপর অস্বাভাবিক সুরে বলে,
” নেশা কেটে গেলে আবার আসবেন। আমার ব্লেক গ্লাস মিনারের দরজা সবসময় খোলা থাকবে। আপনি হয়ত ভুলে গিয়েছেন মি, কায়াত নিলাম কেন্দ্র থেকে কোনো জিনিস ক্রয় করা হয়ে গেলে সেটাকে অন্য কোনো মাফিয়ার হাতে ক্রয় করা যায় না। মাফিয়া ট্রেনিং আবার দিয়ে আসুন। নাহলে নিজের মস্তিষ্ক হারাবেন।
মি, কায়াত কিড়মিড়িয়ে তাকায় নিকের দিকে। রাশিয়ান মাফিয়া ইগর কাঞ্জেভস্কি এতক্ষনে মুখ খুলে,
” মি, নিক আপনি আমাদের লিডার ঠিক আছে কিন্তু আমাদের সামনে থাকা খাবার ক্ষমতা দিয়ে কিনে নিতে পারেন না। নিজের দাপট, আধিপত্য, টাকা সব দিয়ে নিজের জেদ পুরনে মেয়েটাকে কিনে নিলেন অথচ ফেলে রাখলেন অযত্ন আর অবহেলায়। মেয়েটাকে আমাকে দিয়ে দিন আমি রাশিয়া নিয়ে চলে যাচ্ছি।
নিক সামান্য হেসে বলে,
” বুড়ো হয়ে গিয়েছেন এখনও নারী সঙ্গ লাগে মি, ইগর? বউটা কি এখনও বেঁচে আছে নাকি আপনার অত্যাচার মরে গয়েছে। অতিরিক্ত উত্তেজিত আপনি!
ইগর থতমত হয়ে যায়। রাগের বশে একদিন নিজ হাতে গলা টিপে মেরে ফেলেছিলো। বউ দিয়ে কে কি করে। টাকা থাকলে নারী প্রতি রাতে দশটা পাওয়া যায়। এখন দশটাকে হ্যান্ডেল করতে নিজের শক্তির প্রয়োজন শুধু। ইগরকে থতমত মুখে বসে থাকতে দেখে নিক গভীর নিশ্বাস ফেলে বলে,
‘ আমার এখন যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। আসছি আমি।
এরপর অধিরাজের উদ্দেশ্যে ডাক দিয়ে বলে,
” অধিরাজ ওদেরকে ওয়াইন এগিয়ে দে। নিজের মত করে মস্তি করে যাক। সবার মাথা বর্তমানে গরম হয়ে আছে বাট তারা কিছু বলতে পারছে না।
মেহের স্টাডি রুমে বসে বসে আর্ট করছে। চোখের সামনে রাখা আছে একটা ল্যাপটপ। ল্যাপটপে কারোর গম্ভীর ছবি দৃশ্যমান। কোলো কোর্টে আবৃত , ঠোঁটে বাঁকা হাসি, রহস্যে ঘেরা দুটি হালকা বাদামি রঙ্গের চোখ। মেহেরের কাছে এই ব্যাক্তিটা শুধু একজন পুরুষ ওই নয় তার জীবনের সবচেয়ে মুল্যবান একজন ব্যক্তি। যাকে নিয়ে সে সপ্ন দেখে দিন – রাত। কিন্তু জানা নেই সেই সপ্ন আদ’ও পুরন হবে কি না। উপর ওয়ালা চাইলে সব সম্ভব। মেহের সেই আত্নবিশ্বাস থেকেই তো প্রতি মুহূর্ত অপেক্ষা করে। মেহেরের ভাগ্যে কি সেই ভয়ানক পুরুষটার নাম লেখা নেই? হয়ত আছে। সে জন্য’ত সে ক্ষনে ক্ষনে সপ্ন দেখে। মেহের রং আর তুলি দিয়ে সেই ছবি অনুযায়ী ক্যানভাসে আর্ট করে যাচ্ছে। একদম নিখুত ভাবে। যেন কত অনুভুতি মিশিয়ে রেখেছে সে এই ছবিটাতে। মেহের তুলি দিয়ে চোখ আর্ট। করতে করতে লাজুক হেসে বলে,,
” আপনার এই হালকা বাদামী চোখে আমি শতবার ঘায়েল হয়ে যায়। সেটা কি আপনি জানেন গ্যাংস্টার বস? যেদিন আমার ভালোবাসা পূর্নতা পাবে সেদিন আমার আর্ট করা প্রতিটি ছবি আপনাকে দিব। ততদিন অপেক্ষা করবেন তো?
আরিশ নিজের গাড়িটাকে পার্কিং এড়িয়াতে পার্ক করে লিভিং রুমে প্রবেশ করে। ডিভানে বসে মোবাইল বের করে কাউকে মেসেজ দিয়ে বলে,
” গাড়িতে কিছু ব্যাগ আছে। খুব দ্রুত নিয়ে আমার কাছে আসো।
মেসেজটা দিয়ে আরিশ গম্ভীর হয়ে বসে। লম্বা শ্বাস নিয়ে মাথা হেলান দেয়। হুট করে কারোর কথা মনে পড়ায় কোমরটাকে সোজা করে এক পলক চারপাশে তাকায়। কিছুক্ষন ঠোঁট চেপে রেখে উপরের রুমে দৃষ্টি রাখে। হালকা হেসে মনে মনে আওড়ায়,
” নীল- কুমারী!
দরজার সামনে কারোর অনুমতি সুর শুনে আরিশ ভাবনা থেকে সেদিকে তাকায়। এরপর চোখ দিয়ে ইশারা করে ভেতরে আসার জন্য। দুইজন গার্ড ব্যাগগুলো স্বযত্নে ডিভানের উপর রেখে পুনরায় বেরিয়ে যায়। আরিশ ব্যাগগুলোর দিকে এক পলক তাকিয়ে নিজের দুই হাতে তোলে নেয় । এরপর ধীর পেয়ে হেঁটে যায় উপরের কোনো এক রুমটার দিকে। মেয়েটাকে দেখার জন্য হৃদয়টা ছটফট করছিলো কিন্তু আর দেখা হয় নি। আরিশ দরজার সামনে গিয়ে হালকা শব্দ করে। জীবনের প্রথম হয়ত কারোর রুমের সামনে গিয়ে সে অনুমতি নিয়ে ডুকছে। কারোর অনুমতি শুনার মত সময় তাদের কাছে নেই। যা করে খুব দ্রুত, একদম নিখুতভাবে, সময় – স্বাপেক্ষে। আরিশ দরজা ধ্বাক্কা দিতেই খুলে যায়। সামান্য কপাল কুচকে রুমের ভেতরে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। এনি গুটিশুটি হয়ে ফ্লোরে হেলান দিয়ে বসে আছে। শরীরকে এমনভাবে চেপে রেখেছে যেন সে ভয়ে কাঁপছে। আরিশ ব্যাগগুলোকে বিছানার উপরে রেখে এনির সামনে গিয়ে বসে। আরিশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলে,
” কি হয়েছে এনি? ভয় পাচ্ছো তুমি?
এনি কাঁপছে আর বিরবির করছে,
” এখান থেকে আমি যেতে চাই। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আলো- বাতাস দেখতে পারছি না। মরে যাচ্ছি আমি। আমি কারোর রক্ষিতা হয়ে বাঁচতে চাই না।
আরিশ মনযোগ দিয়ে এনির বিরবির করা কথাগুলো শুনার চেষ্টা চালায়। আর শুনতে অনেকটা সফল ও হয়। আরিশ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। জীবনে তো কারোর জন্য এক ফুঁটা মায়া কাজ করে নি। বর্বরতার সাথে মস্তিষ্ক আলাদা করে ফেলেছে অনেকের কিন্তু একটুও অনুশুচনা হয় না। কিন্তু এই মেয়ের জন্য মায়া কাজ করছে কেনো? আরিশ এনির ভিতু মুখটার দিকে তাকায়। ইশ কতটা স্নিগ্ধ আর কোমল এই মেয়েটা। হয়ত তার দেখা সবচেয়ে সুন্দর এই মেয়ে। নীল চোখের অধিকারী নিল- কুমারী! হঠাৎ আরিশের চোখ আটকে যায় এনির চুলে। কোমর ছাড়িয়ে গিয়ে ফ্লোরে ভাঁজ হয়ে পড়ে আছে ! আরিশ থমকে যায়। এই মেয়েকে সবার থেকে আলাদা করে বিধাতা তৈরি করেছেন। একই সাথে এতগুলো জিনিস নিজের মধ্যে ধারন করে বসে আছে। আরিশ চুলের দিকে তাকিয়েই এনিকে জিজ্ঞাসা করে,
” এইগুলো কি তোমার রিয়েল চুল এনি?
এনি পিটপিট চোখে আরিশের দিকে তাকায়। এখানকার লোকগুলোকে এনির কাছে অন্যরকম লাগে। সবার মুখে কেমন ভয়ানক। হাসলে তার মনে ভয় কাজ করে। সেই পাচার কেন্দ্রে কিসব বিশ্রি হাসি ছিলো! মনে হতেই এনির গা ঘিনঘিন করে উঠে। আরিশ উৎসুক হয়ে মোলায়েম গলায় বলে,
” বলো এনি?
এনি কাঁপা গলায় বলে,
” হ. হ্যা।
— এত লম্বা চুল কিভাবে হয়েছে?
— আল্লাহ দিয়েছেন।
আরিশ গম্ভীর হয়ে উঠে। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বলে,
” তুমি মুসলমান?
— জ..জি।
আরিশ নিশ্বাস টানে কিছুক্ষন। এরপর নড়ে- চড়ে উঠে বলে,
” উঠে আসো এনি। তোমার জন্য কাপড় এনেছি। যদি পছন্দ হয় তাহলে স্টাফ এসে কাবার্ডে গুছিয়ে রেখে দিয়ে যাবে।
এনি নীল চোখ দিয়ে তাকায় আরিশের দিকে। আরিশ দুই ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” আমাকে একদম ভয় পাবে না। বন্ধু ভাবতে পারো আমাকে। চলো দুইজনে পরিচিত হয়। আমি জেভান আরিশ। আন্ডারগ্রাউন্ডের কিলার কথাটা প্রকাশ না করে বলে, আমি নিকের বেস্ট ফ্রেন্ড। নিককে তো চিনো?
এনি দুই পাশে না বোধক মাথা নাড়ায়। যার অর্থ সে চিনে না। আরিশ অবাক হয়ে বলে,
” তুমি নিককে চিনো না?
— না।
— কেনো ও তোমার সাথে কথা বলে নি?
— না।
আরিশ চমকায় অনেকটা। আবার নিকের কথা মনে পড়ে সে তো বলেছিলো’ই যে এনিকে দেখেনি। আরিশ চাপা হেস বলে,
” আচ্ছা না চেনাটাই ব্যাটার। ফুল , কাটাকে না চিনলেও চলবে। তোমাকে যে কিনে এনেছে সেই হচ্ছে নিক।
— সেটা আমি জানি। কিন্তু ঘৃন্য লোকটাকে কখনো দেখিনি।
এনির মুখে নিকের জন্য ঘৃনা দেখতে পেয়ে কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠে। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
” কোনো ব্যাপার নয় এনি। আপাযত তুমি এখান থেকে একটা ড্রেস পড়ে নিচে নেমে আসো।
এনি হাত কচলাতে থাকে। আরিশ হাসি দিয়ে বলে,
” বন্ধু হয়েছি তো আজ। তাহলে বন্ধুকে ভয় পাচ্ছো কেনো? নিচে নেমে আসো কিছু হবে না।
আরিশ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। শ্বাস বের হয়ে যাচ্ছিলো তার কিছু মুহূর্তের জন্য। এই মেয়ের সাথে কথা বলতে গেলেও হৃদস্পন্দন উঠা- নামা শুরু করে। নিচে গিয়ে সোজা ডিভানে বসে পড়ে। বড় বড় নিশ্বাস টেনে নিকের গাড়ির লোকেশন দেখে। গাড়ি পার্কিং এড়িয়াতে চলে এসেছে। আরিশ কিছুক্ষন পর দরজার দিকে তাকাতেই নিকের আগমন ঘটে। আরিশ নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” শাওয়ার নিবি?
” বউ কাছে নেই যে বার বার শাওয়ার নিব। মাত্র শাওয়ার নিয়ে এসেছি।
আরিশ হেসে উঠে,
” সেটা জীবনে হবে ও না। হার্টল্যাসদের কাছে মেয়ে থাকে না। আর তর বউ বিয়ের দিন রাতেই টাটা – বাই -বাই । মেয়েদের স্পর্শ একদম পছন্দ করিস না। রোমান্স টাইমে স্পর্শ করাতে তো তুই মেয়েটাকে গলা টিপে মেরে ফেলিছিস। বেচারী! ভাই স্পর্শ ছাড়া রোমান্স হয় না।
নিক ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
” নিক জেভরানের এইসব ফা*কিং কান্ডের দরকার পড়ে না।
— বংশের বাতি কিভাবে জ্বালাবি তাহলে?
— যার অন্ধকার সবচেয়ে বেশি পছন্দ সে বাতি দিয়ে কি করবে। জীবনে না কোনোদিন সংসার করব আর না কোনোদিন নিজের অংশ কারোর পেটে রাখব। নিক জেভরান একজন ওই যথেষ্ট।
আরিশ ভ্রু নাচিয়ে বলে,
” আর ইউ সিউর নিক?
— হুম।
— তাহলে মেয়েটাকে আমায় দিয়ে দে।
— কোন মেয়ে?
— নীল- কুমারী!
আরিশের শূন্যহীন বাক্যে নিক অবাক হয়ে বলে,
” হুয়াট কুমারী?
নিজের কথায় আরিশ নিজেই ফেঁসে যায়। আমতা আমতা করে বলে,
” আব.. আরে তেমন কিছুই নয়। আমি তো ওই মেয়েটার কথা বলছিলাম। যাকে তুই কিনে এনেছিস।
নিক ডিভান থেকে উঠে গম্ভীরতা নিয়ে বলে,
” জীবনের প্রথম তকে তোঁতলাতে দেখছি আরিশ। তুই কোন জগতে আছিস জানি না। তবে সেই দুর্বল জগতে থাকা তর উচিত নয়। আন্ডারগ্রাউন্ড কিলার জেভান আরিশের কন্ঠে জড়তা মানায় না। এখন খেতে চল।
আরিশ সামান্য মাথা নাড়িয়ে নিকের পিছু পিছু চলে যায়। ডাইনিং – এ বসে নিকের দিকে এক পলক তাকিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে কারোর জন্য অপেক্ষা করে। নিকের সামনে রাখা হয় প্রতিটা কালো পেয়ালা। আরিশ একজন স্টাফকে উদ্দেশ্য করে বলে,
” খাবার গুলোকে কালো করতে পারো না তোমরা? নিকের কালো জিনিস সবচেয়ে বেশি পছন্দ।
স্টাফ ভয়ে আর থতমত মুখে বলে,
” কালো কিভাবে করব স্যার?
— পুড়ে ফেলবে একদম।
স্টাফ মনে মনে নাক ছিটকায়। নিক নিজের মত করে খেয়ে চলছে। আরিশ মুখে খাবার তুলে হুট করে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই চোখ আটকে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে কোনো এক লাল পরী। হটুর নিচ অব্দি একটা গাউন। স্লিম, ফর্সা মেদহীন কোমরে এমন ভাবে মানিয়েছে যেন গাউনটা এনির জন্য তৈরি করা হয়েছে। এনি ভয়ে ভয়ে গুঁটি- শুটি পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। স্টাফরা সবাই অদ্ভুত দৃষ্টিতে সিঁড়ির দিকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে। লম্বা চুলগুলো বাতাসের সাথে দুল খাচ্ছে বার বার। মুখে ক্লান্তি আর ভয়ের ছাপ। এ যে স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো লাল পরী! সবার চোখের পাতা যেন থমকে গিয়েছে। আরিশ খাওয়া বাদ দিয়ে সেদিকে এক নজর তাকায়। নিক নিজের মত করে খেয়ে চলছে। চারপাশে তার কোনো ধ্যান – ধারনা নেই। এনি নিচে নেমে ডাইনিং – এ সবাইকে দেখতে পেয়ে ঘাবরে যায়। সকল অপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে আরিশকে দেখে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করে। চোখ আটকে যায় আরিশের সামনে গম্ভীর হয়ে বসা পুরুষটার দিকে।
লোকটাকে তার চেনা – চেনা লাগছে। কোথাও একটা দেখেছে। কিন্তু কোথায়? গাড়িতে! হ্যা উনি তো গ্যাংস্টার বস নিক! উনি যদি আমাকে দেখে ফেলে তখন কি হবে? আতঙ্কে ভরপুর হয়ে যায় এনির সরল মনটা। বোকা এনির মাথায় এইটা ডুকে নি যদি নিক চায় তাহলে রুমে ডুকে ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। কারন সে তার কোটি টাকার রক্ষিতা। এই বাড়ি, এই সম্রাজ্য তাদের। এনির মাথা থেকে সব বেরিয়ে যায়। শুধু এইটুকু বুঝতে পারে তার সামনে যমরাজ বসে আছে। এনিকে অসম্ভব রকম কাঁপতে দেখে আরিশের হুস আসে। চেয়ার থেকে উঠে এনির কাছে যেতেই এনি ভোঁ দৌড়। আরিশ ভেঁবাচেঁকা খেয়ে এনির দৌঁড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে এনির ভয়ের কারন অনুভব করতে পেরে গভীর নিশ্বাস ফেলে। আরিশ একজন স্টাফকে আদেশ করে এনির জন্য খাবার নিয়ে রুমে যেতে। নিজের চেয়ারে বসে খাবার পুনরায় মুখে দিতেই নিকের ভারী কন্ঠে,
” এত দেরী হচ্ছে কেনো তর খেতে?
আরিশ নিকের কথায় একটুও অবাক হয় না। কারন সে নিকের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবগত। নিক খুন আর খাওয়ার সময় কোনোদিন দিয়ে খেয়াল করে না। আরিশ আনমনে বলে,
” এনি এসেছিলো বাট ভয়ে চলে গিয়েছে।
— এনি কে?
— তুই যাকে কিনে এনেছিস তার কথা বলছিলাম।
— অহহহ।
ইথিওপিয়া-মাল্টা গ্যাং জোন | প্রকাশকাল: ১৬ মে জুলাই, ২০১৬
রক্ত, আগুন আর বারুদের রাজত্বে যখন নৈতিকতা মৃতপ্রায়। তখনই ছায়ার রাজ্যের এক অভিজাত চক্রে ঘটল বিস্ময়কর এক ঘটনা।
আধা-আলোকিত আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলো-আঁধারির ভেতর দিয়ে সম্প্রতি এক গোপন নিলামে অপরাধজগতের কিংবদন্তি গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারীকে রক্ষিতা হিসেবে ক্রয় করেন।যার সৌন্দর্য শুধুমাত্র দেহে সীমাবদ্ধ নয় বরং তার দৃষ্টি-নিক্ষেপেই ঝলসে ওঠে অন্ধকার কুঠুরির প্রাচীন ইট।
এই রমণীর পরিচয় আজও এক রহস্যে মোড়া, কিন্তু যেটি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় সেটি হচ্ছে,
” মেয়েটির তার চোখের মণি নীল আর তাক লাগানো সুন্দরী।
না তবে নিছক নীল নয় তা যেন কোনও অজানা সমুদ্রের গহীন তরঙ্গ। যেখানে একবার ডুবে গেলে ফেরার আর পথ নেই।
“কে এই নারী, যার চাহনিতে স্তব্ধ গোটা মাফিয়া সাম্রাজ্য?
অজস্র গ্যাংলর্ড, কার্টেল প্রধান, ও অপরাধ-ব্যবসায়ীরা যেখানে অস্ত্রের ভাষা বোঝে সেখানে তারা যেন হঠাৎই নিরস্ত্র হয়ে গেছে এক জোড়া চোখ আর সৌন্দর্যের সম্মুখে। গোপন সূত্রে জানা গিয়েছে যখন নারীটিকে মঞ্চে তোলা হয় তখন পুরো কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে এমন এক অস্বাভাবিক নিঃশব্দতা। মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সহিংসতা তার চাহনিতে থমকে দাঁড়িয়েছে।
আন্ডারগ্রাউন্ড এর বস কোনো মেয়েকে ক্রয় করেছেন! এই কি প্রেম, নাকি আরও এক নতুন বন্দিত্ব?
যে নারী কিনা রক্তের বাজারে বসে হল নিলামের পণ্য। তার সৌন্দর্য আর নীল চোখে কি আজও স্বপ্নের ঠাঁই আছে?
নাকি সে চোখ এখন শুধুই এক অলিখিত যন্ত্রণার নীলাভ গহ্বর?
খবরটি প্রতিটি চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়ে। নিক গম্ভীর হয়ে বসে আছে একটা চেয়ারে। রাগে ফুলে উঠে কপালের প্রতিটি রেখে। তার একটা হুংকারে প্রতিটি দেয়াল কম্পমান হয়ে উঠে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২
” এই সংবাদ কে রটিয়েছে? কার বুকের পাঠা হয়েছে আমার পিছনে লাগার। নিলাম কেন্দ্রে ঘটে যাওয়া ঘটনা আজ নিউজে কেনো দেখানো হচ্ছে? এই টা একটা জেদ ছিলো যাস্ট। আর আরা ছড়াচ্ছে আমি প্রেমে পড়ে ক্রয় করেছি। লাইক সিরিয়াসলি! নিক জেভরান কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছে! হাস্যকর।
সবাই কম্পমান হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নিক ঠান্ডা গলায় অধিরাজের উদ্দেশ্যে বলে,
” অধিরাজ প্রতিটি চ্যানেলকে বলে দে নিউজটা যাতে কেটে দেওয়া হয়। আগামী এক ঘন্টার ভেতরে আমি এইসব পরিষ্কার চাই। নাহলে প্রতিটি নিউজ চ্যানেল বুঝবে নিক গ্যাংস্টার বস কি করতে পারে।
অধিরাজ সম্মতি দিয়ে বেরিয়ে যায় গার্ডদের নিয়ে। নিক গম্ভীর হয়ে বসে আছে। তার মনে কি চলছে জানার উপায় নেই।
