লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬
লিজা মনি
দুই দিন কেটে যায়। এনি একইভাবে শিকলে বাধা অবস্থায়। কাল শাওয়ার নেওয়ার সময় যাস্ট খুলা হয়েছিলো বাঁধন কিন্তু বের হওয়ার সাথে সাথে আবারও লাগিয়ে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ইজ্জতের চিন্তা সব মিলিয়ে মুখটা মলিন হয়ে গিয়েছে। তার কাছে নিককে মনে হয় কার্টুনের সেই দানব যে সবাইকে বন্দী করে রাখে। এরপর ফুটন্ত গরম তেলে পুড়িয়ে নিজের ভোজন তৈরি করে। কিন্তু মানুষরুপী পিশাচটা তো তাকে আঘাত করছে না, টর্চার করছে না কিন্তু মানসিক আঘাতে মেরে ফেলছে। বন্ধী করে রেখেছে শিকলের মাধ্যমে। টানা দিন রাত শিকলে বাঁধা থাকার কারনে তার ভেতরে অস্থির করে উঠে। আর পারছে না এইভাবে থাকতে। তৃষ্ণার্ত কাকের মত ভেতরটা ছটফট করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য। এই বন্দি দশা তার কাছে মৃত্যু সমতুল্য মনে হচ্ছে। এইভাবে আতঙ্ক নিয়ে বন্ধী থাকার চেয়ে মরন শ্রেয় ছিলো। এনি নিশ্বাস টানে বড় বড়।
কান্না করতে করতে চোখের পানিও যেন শুকিয়ে আসছে। আর কত কাঁদবে সে? কান্না এখন তার প্রতি দিনের সঙ্গী। তবে এনি আগের মত আর নরম নেই। কেমন এক উন্মাদ হয়ে উঠেছে। প্রথমত সে নিককে দেখলেই কাঁপা শুরু করত। ভয় হত প্রচুর, কথা বলতে পারত না। যে নিত্যান্তই কোমল মনের এক বাচ্চা ছিলো। কিন্ত এই কয়কদিনের মানসিক চাপ তাকে নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। সে নিককে প্রচুর ভয় পায় তবে সেটা এখন আর প্রকাশ করে না। একদম চুপচাপ আর শক্ত থাকার চেষ্টা করে। এখন সকাল প্রায় দশটার কাছা- কাছি। একজন মেইড সার্ভিং ট্রলিতে কিছু খাবার নিয়ে আসে। এনি সেদিকে তাকিয়ে রাগে নাক ছিটকায়। মেইড রুমে ডুকার সাথে সাথে পিছন দিয়ে প্রবেশ করে নিক। গম্ভীর হয়ে ডিভানে গিয়ে এনির মুখো- মুখি হয়ে বসে। এনি তাকায় না নিকের দিকে। তাকালেই কেনো জানি ঘিন ঘিন করে। লোকটা অসম্ভব সুন্দর। হাজার ও মেয়ের সপ্নের রাজকুমার এমন ছেলে। তার সৌন্দর্যে প্রতিটি মেয়েই মোহিত হতে বাধ্য। কিন্তু বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে অভ্যন্তরিন যে কুৎসিত রুপ সেটা দেখলে শুধু ঘৃনায় আসবে। এনিকে অন্যদিকে ফিরে থাকতে দেখে নিক আরও গম্ভীর হয়ে উঠে। একটা সিগারেটে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝ খানে রাখে। এরপর এনির দিকে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে সিগারেটে টান দিয়ে পুরোটা ধোঁয়া এনির মুখের দিকে ছুঁড়ে দেয়।
সিগারেটের ধোঁয়া নাকে – মুখে প্রবেশ করতেই এনি কেঁশে উঠে। সে সিগারেট একদম সহ্য করতে পারে না। আর এইদিকে পুরোটা তার নাক- মুখে ঢুকে গিয়েছে মুহূর্তেই গা গুলিয়ে আসে। যে কোনো সময় বমি চলে আসার উপক্রম । চোখ দিয়ে পানি চলে এসেছে। তবুও এনি নিজেকে শক্ত করে রাখে। রাগান্বিত হয়ে নিকের দিকে তাকাতেই নিক বাঁকা হেসে বলে,
” আমি আসলে কখনো মুখ ঘুরিয়ে অন্য পাশে রাখবে না।
— কোন পাশে রাখব তাহলে? আমি তো আপনার গোলাম, আপনার রক্ষিতা! যেভাবে বলবেন সেভাবেই থাকব।
— উফফ বেবিগার্ল রক্ষিতা হলে এতক্ষনে তুমি মাটির নিচে থাকতে। নিক জেভরানের বেডে গিয়ে তাকে ক্যারি করার ক্ষমতা তোমার মত পিচ্চির নেই। দুই হাত দুরে থাকি এরপর ও এত ভয় তোমার। কাছে আসলে তো স্পর্শ করার আগেই সেন্সল্যাস!
নিকের এমন কটূ কথায় এনি চোখ বন্ধ করে থাকে। যে এনির দিকে কোনো পুরুষ সামান্য চোখ তুলে তাকালেও ভয়ে কপোকাত হয়ে থাকত। সে আজ জ্যান্ত একটা জানোয়ারের সামনে বসে আছে। তবে লজ্জা নয় ঘৃনা নিয়ে। কত চঞ্চল ছিলো সে আজ কোথায় গেলো সবকিছু? আপাকে কত জ্বালাতন করতাম আমি কিন্তু আজ আপাকে পাচ্ছি না পাশে। আমার বোনটা নিশ্চয় আমার চিন্তায় মরে যাচ্ছে। সে তো আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না। এনি চিন্তায় বিভোর থেকেই নিককে অজান্তেই প্রশ্ন করে,
” আপনার পরিবার নেই? আপনি এত অমানুষ কেনো? আপনার মা কি কখনো শিক্ষা দেয় নি মেয়েদের কিভাবে সম্মান করতে হয়। লজ্জা করে না তাদের পাচার করেন , তাদেরকে নিলামে তোলে দেহ নিয়ে উল্লস করেন ? কেমন মায়ের পেট থেকে জন্ম নিয়েছেন আপনারা? আপনাদের তো….
এনি আর বলতে পারে নি। এক বিকট শব্দ চারপাশে স্তব্দ হয়ে যায়। আতঙ্কে থমথমে হয়ে যায় পরিবেশ। নিক এক হিংস্র হায়েনার মত এনির গাল চেপে ধরে। অন্য হাতে গলায় সর্ব শক্তি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে অতি রাগে কিড়মিড়িয়ে বলে,
‘ খবরদার মা নিয়ে শব্দ উচ্চারন করবি না । আমার কোনো মা নেই। নিক জেভরান কারোর পেট থেকে জন্ম নেই নি। সে শুধু তার বাবার ছেলে ছিলো। পরের বার এমন কথা উচ্চারন করলে জিহ্বা টেনে নিয়ে আসব।
নিকের কপালের রগগুলো ফুলে উঠে নীল হয়ে আছে। ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই কারোর। এনির জান বেরিয়ে আসার অবস্থা। শ্বাস নিতে না পেরে ছটফটিয়ে উঠে। নিকের শক্ত হাতটা গলা ছাড়ানোর জন্য অধৈর্য হয়ে পড়ে। যে কোনো সময় জীবন বেরিয়ে আসব। এনির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এই বুঝি রুহটা বেরিয়ে আসছে। নিস্তেজ হয়ে পড়ে এনি। শেষ সময়টাতে আপনজনের স্মরন করে নেয়। আপনজন বলতে তো তার বোন নাজলী আর নাবিদ। দুইজন তাকে ছোট থেকে আগলে রেখেছে। এনির চোখ বুঝে আসে। আচমকা গলায় শীতলতা অনুভব করে। গলায় এখন আর শক্ত হাতের বাঁধন নয় যেন আইস ছুঁয়ে দিচ্ছে কেউ। এনির কিছুক্ষন কাঁশি থামিয়ে দুর্বল চোখ নিয়ে তাকায় নিকের দিকে। নিক এনির গলায় আর গালে সামান্য বরফ লাগিয়ে দিচ্ছে। এনি একদম ফর্সা হওয়ার কারনে আঙ্গুলের ছাপ ভেসে উঠেছে উভয় জায়গায়।
নিককে এমন সেবা করতে দেখে এনি ঠাট্টা করে বলে,
” মেরেই তো ফেলছিলেন বাঁচিয়ে দিলেন কেনো? গিরগিটিও আপনাকে দেখে লজ্জা পাবে নিক জেভরান।
নিক আইসটা মেইডের কাছে দিয়ে এনির দিকে না তাকিয়ে গম্ভীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। এরপর কিছুক্ষন ঠোঁট চেপে বলে,
” আমি শুধু গিরগিটি না গিরগিটির থেকে ও খারাপ। প্রয়োজনে নিজেকে এমন ভাবে পরিবর্তন করে ফেলি যে নিজের জন্মদাত্রী মা ও আমাকে চিনতে পারি নি।
নিকের কথায় এনি চমকায়। কি বুঝাতে চেয়েছে উনি? জন্মদাত্রী মা চিনতে পারি নি মানে? এনি কন্ঠস্বর টেনে আওয়াজ দিয়ে বলে,
” অর্থাৎ?
এনি উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে প্রশ্নের উত্তরের আসায়। কিন্তু নিক নিজের কাজে ব্যাস্ত। মুখে আবার ও গম্ভীরতা টেনে মেইডকে আদেশ করে খাবারগুলো সামনে নিয়ে আসার জন্য। মেইড খাবারের ট্রে সামনে নিয়ে আসলে এনি বলে,
” কতদিন এইভাবে চলবে?
— আজীবন।
— আমাকে কেনো এই নরক যন্ত্রনা দেওয়া হচ্ছে জানতে পারি?
— প্রশ্নের উত্তর চাওয়া বোকামি। আমি কখনো উত্তর দেয় না।
— আমার অপরাধ কি ছিলো? কেনো আমাকে এমন শাস্থি দেওয়া হচ্ছে?
— সেদিন রাতে আমার সামনে আসা একদম উচিত হয় নি তোমার। এক রাত আমি ঘুমাতে পারি নি। তোমার কারনে আমি নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি, ছটফট করেছি সেই কারনের জন্য ওই শাস্তি পাচ্ছো তুমি। আর এইটা যুগ যুগ ধরে চলে আসবে।
— সেদিন রাতে আমি ইচ্ছে করে যায় নি। ভুলবশত চলে গিয়েছিলাম সুন্দর লাইটিং দেখে। সপ্নে ও ভাবি নি ওইটা আপনার বেলকনি ছিলো। নাহলে জীবন চলে গেলেও আমার পা সেখানে স্পর্শ করত না।
— আই ডোন্ট কেয়ার।
— আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই শিকলগুলোকে জাহান্নামের শাস্তি মনে হচ্ছে। তিলে তিলে না মেরে একবারে কেনো মেরে ফেলছেন না?
নিক এনির করুন মুখটার দিকে তাকায়। এরপর রিমোটের সাহায্য এক এক করে সব বাঁধন খুলে দেয়। এনি নিজেকে মুক্ত দেখে অবাক হয় প্রচুর। তাকে এত সহজে খুলে দিয়েছে এই অভদ্রটা! হাত পা কেমন লাল হয়ে আছে। এনি নিজের হাতটাকে ভালোভাবে নাড়া – চাড়া করে নেয়। কেমন ব্যাথা হয়ে গিয়েছে পুরো শরীরে। সারাদিন নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকলে ব্যাথা পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
এনি নিজের ভাবনায় প্রহর ঘটে নিকের তিরিক্ষি হুশিয়ারি আওয়াজ শুনে,
” খুলে দিয়েছি কিন্তু খবরদার বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। কারন আমি ছলনাময়ীদের ঠিক কতটা ঘৃনা করি তোমার ধারনা নেই । নিজের খুব কাছের মানুষের বুককে ছিদ্র করেছি অসংখ্যবার যাস্ট বিশ্বাস ঘাতকতার কারনে। খুলে দিয়েছি তবে সুসাইড করার চিন্তা করলে তোমার ঠিক কেমন অবস্থা হবে সেটা তোমার ধারনা করার ও কষ্টকর বেবিগার্ল। তাছাড়া তুমি আমার চোখের সামনেই থাকো সবসময়।
এনি নিচের দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন। নিক খাবার এনে এনির সামনে রাখে। এনি বিলম্ব না করে নিকের ভয়ে অল্প অল্প খেতে থাকে। খাবার নিয়ে বিরোধ করলে জানোয়ারটা জোর করে হলেও খাওয়াবে। এনি চাচ্ছে না এই মুহূর্তে কোনোরকম রক্তপাত হোক। কোনো জোর জবর্দস্তি হোক। এনিকে খেতে দেখে নিক বেরিয়ে যায়। এনি ধীরে ধীরে চামচ দিয়ে খাবার তুলছে আর কিছু একটা ভাবছে। হঠাৎ তার চোখ চলে যায় ডিভানের কাছে। কেমন তাজা রক্ত জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে আছে আবার ফোটা, ফোটাও।
এনি ভয়ে নড়ে- চড়ে উঠে। রক্ত কোথা থেকে আসলো এখানে? কার রক্ত এইগুলো? এনি অস্থির হয়ে উঠে। হুট করে মনে পড়লো নিকের রাগের কথা। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙ্গা কাচ গুলোর দিকে তাকায়। টেবিলটা যখন ফেলে দিয়েছিলো তখন মনে হয় উনার হাতে কাউচ গেঁথে গিয়েছিলো। এনি কেমন জানি শান্ত চোখে রক্ত গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তার খারাপ লাগছে নাকি খুশি হয়েছে বুঝার উপায় নেই। এনি খুব নরম মনের মানুষ। লোকের আঘাত সে সহ্য করতে পারে না। নিজেই কান্না – কাটি করে বুক ভাসিয়ে দেয়। তবে আজ সামনে তরতাজা রক্ত দেখেও নিকের জন্য খারাপ লাগাটা প্রকাশ করে নি। ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে এনি ছুটে যেত ক্ষত বেশি গভীর কি না দেখার জন্য। কিন্ত এই পিশাচটা আঘাত পেতে পেতে মরে যাক তবুও এনির খারাপ লাগা কাজ করবে না।
এনি নিজের মনে বিরবির করে বলে,
” যে হাজারও লোকের রক্ত জড়ায় তার শরীর থেকে এমন রক্ত জড়লে কিছুই হবে না। বরং ভালো হয়েছে।
নিক ড্রয়িং রুমে বসে রক্ত পরিষ্কার করে হাত ড্রসিং করে নেয়। এইসব ড্রেসিং তার কাছে বিরক্ত লাগে। যত রক্ত যাওয়ার সেটা চলে যাক। আদেক্ষেতা করে মেডিসিন নেওয়ার কি প্রয়োজন। তবে এখন তাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে করতে হচ্ছে। সে এখন বাহিরে যাবে। এমন রক্তাক্ত হয়ে থাকলে গা ঘিন ঘিন করে উঠে। প্রচুর খুঁতখুঁতে স্বভাবের সে। লোকেদের পচনশীল মাংস খাইয়ে শাস্তি দেয় অথচ সে সামান্য ধুলোকণা শরীরে সহ্য করতে পারে না। হাস্যকর লাগে তার কাছে নিজেকে মাঝে মাঝে। নিক নিজের হাত ঠিকঠাক করে উঠতে যাবে এমন সময় অধিরাজ মেইন করিডর পেরিয়ে প্রবেশ করে,
” বস কোনো লোক আপনার সাথে দেখা করার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। কাল সারাদিন দাড়িয়ে ছিলো কিন্তু আপনি ভাইপার মেনশনে ছিলেন না। আজ আবার এসেছে শুধু একবার দেখা করার জন্য।
নিক পুনরায় গম্ভীর হয়ে বসে। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছুক্ষন ভেবে রহস্যময় হাসি দেয়। নিজের ব্লেজার ঠিক করে অধিরাজকে বলে,
” হুম আসতে বল এই মুহূর্তে। ভেবেছিলাম এখন বাহিরে যাব বাট একটু খেলা খেলে যাক।
অধিরাজ কিছুটা অবাক হয়। নিকের রিয়্যাকশন দেখে এইটুকু বুঝেছে বাহিরে দাড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটাকে তার বস চিনে। অধিরাজ সম্মতি দিয়ে বেরিয়ে যায়। নিকের হালকা বাদামী চোখের গভীরতা ধীরে ধীরে প্রখঢ় হতে থাকে। কিছুক্ষন কপাল কুচকে তাকিয়ে থাকে মেঝের দিকে । গম্ভীরতা নিয়ে ভাবছে অনেক কিছু। যেটা ধরার ক্ষমতা কারোর নেই। নিকের ভাবানার মধ্যেই কারোর উপস্থিতিত অনুভব করে চোখ তুলে তাকায়। নিক বাঁকা হেসে ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে,
” আরে বসুন ইরানের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মি, নাবিদ। উফফ আপনার পুরো নাম জানি না তাই নাবিদ ওই সম্মোধন করলাম।
— জানার কথাও না। গ্যাংস্টার বস আমাকে নাবিদ নামেই চিনে।
নিক ঠোঁট কামড়ে হাস। নাবিদ কিছুক্ষন চুপ থেকে নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,।
” এমনটা কেনো করলে নিক? তুমি এনিকে কেনো কিনেছো? ওকে কিনেছো ভালো কথা। তবে ওকে ফিরিয়ে দাও।
— মেইন দরজা খুলা আছে বেরিয়ে যেতে পারো নাবিদ। ডেইট অভার ওয়াইন নিয়ে এসে নিক জেভরানের সামনে কথা বলছো। হাউ ফানি।
— সিরিয়াস কথা নিক। ভুলে যেও না এক সময় আমিও তোমার বন্ধু ছিলাম।
— সেটা আজ থেকে আরও দশ বছর আগে।
— সো হুয়াট, কি যায় আসে তাতে? তোমার সাথে মাফিয়া প্রশিক্ষন তো আমিও দিয়েছি। ইভেন হয়েও গিয়েছলাম। কিন্তু উপর ওয়ালার রহমত ছিলো বলে সব পাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।
— অতীত শুনতে ইচ্ছুক নয় মি. নাবিদ।
— বললাম না কিছু। কিন্তু তুমি আমার এনিকে ফিরত দাও?
নিক মুখের কঠোরতা নিয়ে বলে,
” আমার এনি!
— হ্যা ও আমার এনি । ওকে আমি ছোট থেকে পেলে – পুষে বড় করেছি। ছোট এনিকে সবসময় আগলে রেখেছি। যখন তারা পুরো পৃথিবীর সামনে একা ছিলো তখন আমি নাবিদ তাদের দুই বোনকে হেফাযতে রেখেছি। আর এনিকে নিজের হৃদয়ে স্থান দিয়েছি।
— গুড জব। এত কষ্ট করেছো বলেই তো আমি পেয়েছি।
— তুমি পাও নি। আমি ওকে ভালোবাসি। আর আমি আমার ভালোবাসাকে যে কোনো মুল্যেই নিয়ে যাব।
নিক নিজের ধৈর্য হারাচ্ছে ধীরে ধীরে। কপালে অনামিকা আঙ্গুলে ঘেষে গম্ভীর আওয়াজে বলে,
” ভালোবাসা শব্দটা আর উচ্চারন করবি না নাবিদ। নাহলে অসময়ে নিজের জাবান হারাবি।
নাবিদ উঠে দাঁড়ায়।
— যাকে ভালোবাসি তাকে ভালোবাসি একশত বার বলতে পারি। সত্যি কর বলো তুমি এনির সাথে খারাপ কিছু করেছো?
— করলেই বা কি? রক্ষিতা ও আমার।
নাবিদ ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে। চোখ বন্ধ করে ফেলে নিজের। অনেক কষ্টে উচ্চারন করে,
” মেয়েটা বেঁচে আছে নিক?
— বেঁচেই তো আছে। তবে যদি সত্যি কিছু করতাম তাহলে হয়ত বাঁচত না।
নাবিদ নিজের প্রান ফিরে পায়। তার মানে নিক এনির সাথে বাজে কিছু করে নি। নিক খারাপ বাট মেয়েলি জিনিসে সে প্রচুর নাক ছিটকায়। জানা নেই কেনো সে মেয়েদের দু – চোখে সহ্য করতে পারে না। শত্রুদের থেকেও বেশি ঘৃনা করে সে মেয়েদের। নাবিদ উঠে দাঁড়ায়।
এরপর নিকের সামনা – সামনে এসে বলে,
” একশত কোটি টাকা তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। তুমি আমার ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দাও।
নিক এইবার ধৈর্য হারায়। নাবিদের মুখে বার বার উচ্চারিত ভালোবাসার শব্দ শুনে তার শরীর জ্বলে উঠছে। রাগে নাবিদের কলার চেপে ধরে কপালে বন্ধুক ঠেকিয়ে হুংকার ছেড়ে বলে,
” ইউ বাস্ট্রাড! বারন করছি না ভালোবাসি শব্দটা উচ্চারন করবি না। আমার কথা কানে যা না?
নাবিদ নিজেকে ছাড়ায় না। ঠাঁইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষন। নিক বন্ধুকটা কপালে ভালোভাবে চেপে ধরতেই কারোর আতঙ্কিত মেয়েলী সুর ভেসে আসে,
” নাবিদ ভাই! প্লিজ কিছু করবেন না ওনাকে!
নিক চমকায়। ভ্রুঁ কুচকে পিছনে তাকাতেই চোয়াল শক্ত করে ফেলে। নাবিদ যেন খুশিতে আত্নহারা। কতদিন পর সে তার পাখিটাকে দেখছে। এনির চোখে পানি। চির- চেনা কাউকে দেখতে মেয়েটা আবেগে চারপাশে না তাকিয়ে ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না করে উঠে। এতদিনে নিজেকে শক্ত করা রাখা এনি পরিচিতদের দেখে সেই বাচ্চা এনিতে পরিনত হয়ে যায়। জীবনের তোয়াক্কা না করে সিঁড়ি দিয়ে ছুঁটে আসে নাবিদের উদ্দেশ্যে। নাবিদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। চোখের পাতা ফেললেই যেন সে হারিয়ে যাবে। এনি নাবিদের কাছাকাছি আসতেই কারোর শক্ত হাতের থাবার ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠে। ব্যাথাটা অনুভব করার আগেই কারোর শক্তপক্ত বুকের সাথে ল্যাপ্টে যায়। এনি ছটফট করে উঠে। চোখ তুলে তাকায় ছয় ফুট লম্বা , চওরা সুদর্শন পুরুষটার দিকে।
নিকের রাগান্বিত মুখটার দিকে তাকিয়ে এনি আরও ছটফট করে উঠে,
” যেতে দিন আমাকে। নাহলে আপনাকে আমি খুন করব নিক জেভরান!
নিক নিজের সাথে আরও চেপে ধরে। এনির শরীর ঘিন ঘিন করে উঠে। নাবিদ নিকের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বলে,
” দিয়ে দাও নিক। প্লিজ এনিকে আমার কাছে দিয়ে দে। ওর বোন পাগল হয়ে গিয়েছে এনির কারনে। মেয়েটা কান্না করতে করতে মারে যাচ্ছে। প্লিজ দিয়ে দাও। এনি খুব সরল একটা মেয়ে। তোমাদের কাছে ও বাঁচতে পারবে না ।
— আই ডোন্ট কেয়ার! মরে গেলেও সে আমার কাছেই থাকবে।
এনি কাঁন্না করছে ছুটার জন্য। উপায় না পেয়ে নিকের বাহুর এক অংশ দাঁত দিয়ে শক্ত করে কাঁমড় দিয়ে রাখে। নিক এনির দিকে তাকিয়ে দাঁত কটমট করে বলে,
” নিজের হাতে তাজা ক্ষত সেলাই করেছি তাও নিজের শরীরের । তোমার সামান্য নরম দাঁতের স্পর্শ আমার বাল ও ছিড়তে পারবে না।
এনি ও জেদ ধরে বলে,
” আর সেই বাল আমিও ছিঁড়ে দেখাব।
এনির এহেন কথায় নিক ঠোঁট কামড়ে হাসে।
— এমন কাজ করলে তো তোমাকে আমার সাথে বেডরুমে যেতে হবে। তবে এখানে ও আমার সমস্যা নেই। বাট তুমি লজ্জা পাবে বেবিগার্ল।
নিকের এমন কথা শুনে এনি আরও ছটপফট করে উঠে। কতটা অশ্লিল এই লোক!
এনিকে এমন ছটফট করতে দেখে নিক ডিভানে বসে যায়। এরপর এনিকে নিজের কোলের উপর বসিয়ে শক্ত করে পেচিয়ে ধরে। পা দুটি নিজের পা দিয়ে আটকে দেয়। এনি এখন সম্পূর্ন নিকের কাছে বন্ধী। নাবিদ ঘন ঘন শ্বাস টানছে। ভালোবাসার মানুষকে অন্য কেউ স্পর্শ করছে তার ভেতরে আগুনে দগ্ধ হচ্ছে।
এনি নাবিদের দিকে তাকিয়ে কান্না করে উঠে,
” ভাইয়া এখান থেকে নিয়ে চলো আমাকে? এই লোকটা ভীষন খারাপ। দুই দিন ধরে আমাকে শিকলে বেঁধে রেখেছে। আমি আপার কাছে যাব। প্লিজ ভাইয়া বাঁচাও আমাকে।
এনি অন্যের কাছে প্রান ভিক্ষে চাইছে নিকের মোটেও পছন্দ হয় নি। রক্ত টগবগ করে উঠে মাথার। এনিকে সর্বশক্তি দিয়ে নিজের সাথে আর ও চেপে ধরে। এনি ব্যাথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠে। মনে হচ্ছে হাড়গুলো ভেঙ্গে যাবে।
নাবিদ অধৈর্য হয়ে এনির হাত ধরে টান দিয়ে বলে,
” চলে আয় এনি। আমি তকে নিয়ে যাব।
নিক এক পলক তাকায় সেদিকে। শেষ, গ্যাংস্টার বসের ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যায়। ধীরে ধীরে আগের রুপে ফিরতে থাকে। রাগে কাঁপছে অসম্ভভাবে। স্পর্শ করে থাকা জায়গায় এক পলক তাকিয়ে সামান্য ঘাড় বাঁকায়। প্যান্টের পকেট থেকে মিনি ছুঁড়িটা নিয়ে সাথে সাথে নাবিদের হাতে টেনে ধরে। এমন আক্রমনে নাবিদ এনির হাত ছেড়ে দেয়। তরল রক্ত গড়গড় করে পড়তে থাকে। নাবিদ হাতে ধরে চেঁচিয়ে উঠে সামান্য। রক্ত দেখে এনি ভড়কে যায়। মেয়েটা আবার কেঁদে উঠে,
” নাবিদ ভাই!
এনি নিকের কোল থেকে উঠতে চায়। নিক এনির কোমরে চাপ প্রয়োগ করে বলে,
” এখন তো হাত কেটেছি পুনরায় ওকে স্পর্শ করার চেষ্টা করলে কলিজা কেটে আনব। আই রিপিট পুরো কলিজা কেটে আনব।
নাবিদ কাটা হাত ধরে ব্যাথায় চোখ- মুখ খিঁচে ফেলে। এনি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য প্রান দিয়ে চেষ্টা করছে। নিক অধিরাজকে ডাক দিয়ে বলে,
” এইটাকে বাহিরে বের করে দে। আর বেশি এদিক- সেদিক করলে জানে মেরে ফেল।
” জানে মেরে ফেল” কথাটা এনির কানে যেতেই সে স্তব্দ হয়ে যায়। নাবিদকে এক প্রকার জোর করে নিয়ে যায় অধিরাজ। নাবিদ দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। বাক্য চোখে তাকায় এনির দিকে। এনি ও সেইম ভাবে তাকায় নাবিদের দিকে। এক সেকেন্ডের জন্য চোখা- চোখি হয় দুজনার। নাবিদ চোখ আর হাত দিয়ে শান্ত একটা ইশারা করে। ব্যাস নাবিদের সামান্য ইশারাটা এনির ছটফটানি থেমে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো। কান্না থামিয়ে দেয় সে। নাবিদকে টেনে – হিচরে বাহিরে নিয়ে চলে যায়। এনি অনুভুতিহীন ভাবে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে মেঝের দিকে। এনিকে শান্ত দেখে নিক ঠোঁট কামড়ে বলে,
” পুরুষ এমন এক কন্ট্রোলল্যাস জাতি। এদের কোলে মেয়ে মানুষ বসলেই এরা বেসামাল হয়ে পড়ে।
এনি কোনো রিয়্যাক্ট করে না। শুধু ঘৃনিত কন্ঠে বলে,
” অতিরিক্ত অশ্লিল আপনি।
— গ্যাংস্টাররা ঠিক কতটা অশ্লিল সেটা তোমার ধারনার বাহিরে। বাট আজকের ফার্স্ট টাইম ছিলো তাই মুক্তি দিচ্ছি। পরের বার কোনো পুরুষের স্পর্শ লাগলে খোদার কসম সে জায়গাটা জ্বালিয়ে দেব।
— ধর্মহীন হয়ে কসম কাটছেন?
নিক গম্ভীর হয়ে যায়। এনির হাত চেপে ধরে উপরে যাওয়ার জন্য পা রাখে। এনির চোখ- মুখ জুড়ে ছিলো অন্য কিছু। নাবিদের ইশারা তার বুকে এক আলো জেগে তুলে। এনি সামান্য মুচকি হাসে। কিন্তু সেই হাসি গ্যাংস্টার বস দেখে নি। দেখলে হয়ত অনেক কিছুই বুঝে যেত।
আরিশ আজ নিজের বাড়িতে যায় না। নিকের কাছে ও যায় নি। গাড়ি নিয়ে চলে যায় একদম দাদামশাইয়ের বাড়ির সামনে। গাড়ি পার্ক করে করিডর পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। আরিশ ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই কেউ একজন এসে জড়িয়ে ধরে। আরিশ হাসি- মনে নিজের সাথে আগলে নেয়।
— কেমন আছো ভাইয়া?
— এইতো আছি। তর কি অবস্থা মেহের?
— আমার অবস্থা জেনে কি করবে? কতদিন পরে এসেছো বলোতো?
আরিশ এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
” কাজের চাপ ছিলো প্রচুর তাই আসতে পারি নি। রাগ করিস না বোন।
— নিক ভাইয়া আজ আসবে না আরিশ ভাই?
আরিশ তাকায় বোনের সরল মুখটার দিকে। শ্বাস টেনে বলে,
” উহুম আজ আসবে না। হয়ত কাল আসবে।
— অহহহ। তোমাকে অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে। দাদামশাইয়ের সাথে কথা বলে রেস্ট নাও।
আরিশ মুচকি হাসি দিয়ে মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মেহের ও প্রান – বন্ত হাসি দিয়ে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে উপরে চলে যায়। মেহের চলে যেতেই আরিশ গিয়ে দাদামশাইয়ের পাশে বসে। মি, রিভান আরিশের দিকে তাকিয়ে বলে,
” কেমন আছো তাহলে?
— এই তো আছি। যেভাবে সবসময় থাকি সেভাবেই।
— নিকের সাথের মেয়েটার কি খবর?
আরিশ ভ্রুঁ নাচিয়ে তাকায় দাদামশাইয়ের দিকে। গম্ভীরতা টেনে বলে,
” দেখা করি নি আর মেয়েটার সাথে।
— তুমি পছন্দ করতে রাইট?
আরিশ চমকায়। অবাক হয়ে তাকায় মি, রিভানের দিকে। শুকনো ঢোক গিলে বলে,
” আপনি কিভাবে জানলেন? আমি তো কাউকে বলি নি।
মি, রিভান আরিশের পিঠ চাপড়ে বলে,
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৫
” তুমি এখন যে সময়টা দিয়ে যাচ্ছো সে সময়টা আমি বহু বছর আগেই পার করে ফেলেছি। তবে প্রাউড ফিল করি এই অনুভুতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছো। তোমাদের বন্ধুত্ব যাতে কখনো না ভাঙ্গে। পুরো বিশ্ব যাতে নিক আর আরিশের বন্ধুত্বের দৃঢ় বন্ধন দেখতে পারে। কাউকে হতাশ করো না কখনো।
আরিশ হাসে।
— দুনিয়া উল্টে গেলেও জেভান আরিশ আর নিক জেভরানের বন্ধুত্ব ভাঙ্গার ক্ষমতা কারোর নেই। একসাথে ছিলাম, আছি আর সারাজীবন থাকব।
