লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৪ (২)
লিজা মনি
রজনী তখন প্রায় শেষ প্রহরে উপনীত। ঘড়ির কাঁটা তখন তিনটা। চারপাশের প্রকৃতি কেমন এক অশুভ ও নিস্পন্দ নীরবতায় আচ্ছন্ন। বায়ুমণ্ডলে এক শ্বাসরোধকারী, থমথমে হিংস্রতার পূর্বাভাস। স্থানটি একাকী, অন্ধকারাচ্ছন্ন এক কবরস্থানে। এই গা-ছমছমে নিস্তব্ধতার বুক চিরে সেখানে স্থাণুর মতো বসে আছেন এক অনাহুত মানুষ, যার উপস্থিতি বাতাসের হিমেল স্রোতকেও জমিয়ে দেয়। সুদূরে অপেক্ষমাণ গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো এসে পড়েছে তার আননে। সেই আলোয় উন্মোচিত হয়েছে তার পাথরের মতো নিস্পৃহ, ধূসর চোখজোড়া।
পরিধানে চিরচেনা সেই কুচকুচে কালো ওভারকোট। মস্তকের হুডিটি আজ অপসারিত হয়ে আছে। মুখাবরণীটিও অবহেলায় পড়ে আছে পাশে। স্কন্ধদেশ ছুঁয়ে যাওয়া অবিন্যস্ত চুলগুলো নিশাচর বাতাসে উড়ছে। ইস্পাতকঠিন পেশিবহুল অবয়ব, চওড়া বক্ষপট আর হিংস্র অবয়ব দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে —তিনি পাতালপুরীর কোনো অন্ধকার জগতের ত্রাস, এক নৃশংস সন্ত্রাসী। আন্ডারগ্রাউন্ড টেরোরিস্ট! যে হাত অজস্রবার অস্ত্রের ট্রিগার চেপেছে, আজ সেই হাত দুটো কাঁপছে এক অদৃশ্য যন্ত্রণায়।
বহু বছর পূর্বে এই কর্দমাক্ত মাটির গহ্বরেই সমাহিত করা হয়েছিল তার একমাত্র আশ্রয়, তার পিতাকে। আজ সুদীর্ঘকাল পর, সমস্ত পৃথিবীর বুকে ত্রাস সৃষ্টিকারী সেই হিংস্র মানবটি দ্বিতীয়বারের মতো এখানে পদার্পণ করলেন। যে মানুষটা পুরো দুনিয়ার কাছে এক জীবন্ত যমদূত সে কেমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে কবরের দিকে। নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের। কিঞ্চিত গা-ছাড়া ভাব নিয়ে হেসে বলল,
” তুমি অবাক হয়েছো ড্যাড? আমি আসলাম তোমার কবরের পাশে। দ্বিতীয়বারের মত তোমার কবরের কাছে তোমার ছেলে এসে বসেছে। রাগ করোনি তুমি? প্লিজ ড্যাড রাগ করো না। তোমার পাশেই আমার মেয়েটাকে রেখেছি। তুমি রাগ করে থাকলে ওকে দেখে রাখবে কে? তোমার বংশধরকে তোমার আমানতে রেখে গেলাম। হাহহহ! তাছাড়া কোনটা নিয়ে রাগ করবে বলোতো? তোমার কবরের পাশে কেনো এত বছরে একবার ও আসলাম না? তোমার ছেলে কেনো এক নৃশংস ব্লাডি বিচে পরিনত হয়েছে? নাকি তোমার প্রান-প্রিয় স্ত্রীকে কেনো হত্যা করলাম সেই অপরাধে? অনেকগুলো অভিযোগ আমার উপর তোমার। তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? তোমার অভিযোগ গুলো খুলে বলো। তোমার আওয়াজ শুনতে ইচ্ছে করছে। কথা বলবে না আমার সাথে? ওকে! আমি’ই উত্তর দিচ্ছি। তোমার কবরের পাশে আসার মত উপযোক্ত ছিলাম না আমি। তুমি নিশ্চই এই ধ্বংসাত্নক, পাপিষ্ঠ অবয়ব দেখে রুষ্ঠ হতে। আমার হৃদয়ে মায়া – মহাব্বত বলতে কিছু নেই। সব কেমন ঝং ধরে গিয়েছে।
পাথরের মত শক্ত প্রলেপ পড়ে গিয়েছে বুকে। তোমার সেকেন্ড প্রশ্নের উত্তর, ওই মহিলাকে মেরে নিজের হাত রক্তাক্ত করতে চাইনি। তুমি যে রুমে থাকার কথা ছিলে সেই রুমে পর – পুরুষকে দেখে, ছেলে হয়ে সহ্য করতে পারে নি। মাঝে মাঝে ঘৃনা আসে তার বুকের দুধ খেয়েছি। তার গর্ভে ছিলাম নয়টা মাস। তার দৌলতে কথায় – কথায় চরিত্রহীন বলতে পারি না, খারাপ শব্দ উচ্চারন করতে পারি না। তুমি কেনো চলে গেলে ড্যাড? আমাকে এমন নরকের শাস্তি কেনো দিলে? জন্মদাত্রী জন্ম দিলো কিন্তু আদর -মমতা দিলো না। জন্মদাতাও একই কাজ করলো। আদর – মমতা দিয়েও ছেড়ে চলে গেলো। আমার কি অপরাধ ছিলো বলতে পারো? তোমরা দুনিয়াতে এনেছিলে বলে আমি এসেছিলাম। আগলে রাখলে না। একটু আগলে রাখলে কি বেশি ক্ষতি হয়ে যেত? সবার মত তো আমিও স্বাভাবিক বাঁচতে পারতাম। আমারও আপনজন থাকত। এই বিশাল সম্রাজ্যে একা থাকতে হত না। মরে গেলে কাঁদার মত ও কেউ ছিলো না। এমন জঘন্য জীবন ও কারোর হতে পারে? কিন্তু আমার হয়েছে। এমন রাস্তায় ফেলে দিয়েছো যে জীবন্ত লাশ হয়ে ফিরেছি। পিশাচের রাজ্যে ছেড়ে দিয়েছো। যুদ্ধ করতে করতে সত্যিকারের পিশাচ হয়ে গিয়েছি।
নিক থেমে সামান্য ঠোঁট ভেজালো। চোখ দুইটা লালচে হয়ে আছে। হাতে কাটা – ছেড়া আঘাতের চিহ্ন। মনের যন্ত্রনা আর শারিরীক যন্ত্রনায় নিশ্বাস টানলেন। নিক শুকনো রক্তের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
” এই যে রক্ত দেখতে পাচ্ছো প্রতিনয়ত এমন রক্তাক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছি। বড় অট্টালিকা, অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সেই রক্তাক্ত শরীরে অসহ্য যন্ত্রনায় মরে আছি নাকি বেঁচে আছি দেখার জন্য কেউ ছিলো না। ইয়েস ড্যাড, এইটাই তোমার ছেলের অভিশপ্ত রক্তাক্ত জীবন। যন্ত্রনা গুলো একদিন, একমাস, এক বছর, চার বছর সহ্য করতে করতে এখন আর কোনো যন্ত্রনা অনুভব হয় না। ভেতর থেকে কোনো অনুভুতি আসে না। আমি অভস্ত হয়ে আছি এই শারিরীক কষ্টে। সবাই ভাবে এমন কাটা -ছেঁড়া নিয়ে কিভাবে চুপচাপ থাকি। কিভাবে শরীরের তাজা ক্ষতে নিজেই সেলাই করি? তারা আমার ভয়াভহ দিনগুলো দেখলে কি করত মাঝে মাঝে ভেবে পায় না। যখন জীবন্ত কতগুলো নেকড়ের সাথে ছোট্ট একটা গুহার ভেতরে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো সেখান থেকে বেঁচে ফেরার লড়াই তারা শুনে নি। তারা শুনে নি কেমন কেটেছিলো অন্ধকার আর নোংরা পচনশীল স্থানে আমার জীবন।
কিভাবে বছরের পর বছর কাটিয়েছিলাম সেই অন্ধকার নরকময় স্থানে। মাটির নিচে, যেখানে দাড়ানোর মত ও জায়গা ছিলো না। চারদিকে নোংরা, পানির অভাব, খাদ্যের অভাব। ক্ষুধার যন্ত্রনা কেমন হয় অনেকে আমাকে শিখাতে আসে। অথচ আমি একটানা ছয় বছর ক্ষুধার যন্ত্রনা কি তা তিলে তিলে অনুভব করেছি, ছটফট করেছি। সহ্য করতে না পেরে কত জীবন্ত পোকামাকড় খেয়েছি, ভেজা নোংরা মাটি খেয়েছি। চারপাশ কেমন বিষাক্ত আর নোংরা ছিলো। চামড়ায় ক্ষত হয়ে পচন ধরতে শুরু করে। সেই ক্ষতে আবার পোকামাকড় বাসা বাঁধতে আসে। যন্ত্রনা, অসহ্য ব্যাথায় জীবন বের হয়ে আসত। কত গলা ফাটানো চিৎকার আমি করেছি তার রেকর্ড করা থাকলে আজ আমেরিকার মাটি অব্দি কাঁপত। ক্ষুধার যন্ত্রনা আর নিতে পারছিলাম না। মরে যাচ্ছিলাম প্রায়। আমাকে সবাই বলে আমি কেনো এমন জানোয়ারে পরিনত হয়েছি? কেনো আমার ভেতরে দয়া- মায়ার লেশমাত্র নেই। রক্তে – মাংসের মানুষ হয়েও মনস্টার কেনো!
তারা আমার জানোয়ার হওয়ার পিছনে ইতিহাস খুলে দেখে নি। দেখে নি ইতিহাসের পাতায় ঠিক কত বর্বরতা, পাশপবিকতা লেখা আছে। সেই অন্ধকার মাটির নিচে এক মাস পর একজন খাবার নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য। এতটা হিংস্র হয়েছিলাম যে আস্ত একটা মানুষকে মেরে নরখাদকের মত তার মাংস চিবিয়ে খেয়েছি দুই দিন। কতজনকেই চিবিয়ে খেয়েছি হিসেব নেই। মানুষের মাংস খেলেও একটা তৃপ্তি আসত ভেতরে। এমন আনন্দ পেতাম যেটা বাস্তবিকতার উর্ধ্বে। বুঝলে ড্যাড, তোমার ছেলে নরখাদকের থেকে কম নয়।
নিক মৃদু হেসে হুট করেই পৈশাচিক ভাবে হেসে উঠে। চারপাশের গুমোট পরিবেশ আরও গুমোট হয়ে পড়ে। ঘুমন্ত পাখিগুলো নড়ে- চড়ে উঠে সামান্য। এই হাসিতে ঠিক কতটুকু যন্ত্রনা মিশে আছে এইটা যদি কেউ একটু অনুভব করত তবে অনেক কিছু বদলাতে সক্ষম হত। কিন্তু এই ভুবনে কে আছে এমন? কেউ নেই। নিক খামছে ধরলো নিজের চুল। হাসির মধ্যেই হুট করে থেমে যায় তার পৈশসচিকতা। চোখ দুইটা বন্ধ করে গভীর শ্বাস টানে,
” তোমার ছেলের এমন ভয়ানক জীবন দেখে কেমন ফিল হচ্ছে ড্যাড? আরও আছে, কয়টা শুনবে তুমি? থাক আজ! তুমি জানো তোমার আদরের কন্যাকে খুঁজে পেয়েছি। অনেকটা বড় হয়ে গিয়েছে। জানানো উচিত ছিলো তাই জানালাম। আগের মত আর ভালোবাসা কাজ করে না। প্রকাশ করতে পারি না। একটা ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে যাব। অভিযোগ তুলার সুযোগ দিব না তোমাকে। তবে তোমার উপর অনেক অভিযোগ রেখে দিলাম। সময় হলে সবটা তুলে ধরব।
নিক অনুভব করছে তার শরীরটা হালকা কাঁপছে। প্রথমবারের মত অতীত স্মরণ করতেই অস্থির লাগছে। শার্টের বোতাম দুইটা টেনে খুলতে গিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে কিছুক্ষণ নিরব বসে থাকে। এনির মুখটা ভেসে আসতেই এলোমেলো চোখে তাকায় গ্যাংস্টার বস।
” আমার নরকের জীবনেও এক টুকরো সুখ আছে। একটা নারী, আমার স্ত্রী! তোমার স্ত্রীকে হত্যা করে নারী জাতি ছিলো সব থেকে বড় দুশমন। তারা ছলনাময়ী হয়, ভালোবাসা- আদর, আহ্লাদের দাম দিতে জানে না। অন্যত্র মুখ দেয় অচিরেই। যেমনটা তোমার সাথে হয়েছে। আমার ভাবনা ভুল ছিলো। পৃথিবীর সব নারী কেমন জানি না। জানার আগ্রহ ও নেই। আমার বিষাক্ত জীবনেও একজন নারী আছে। যার পবিত্রতায় আমি রাস্তা খুঁজে পায়। তার সরলতায় কেঁপে উঠি। তার নীল চোখ – সোনালি চুলে বাজেভাবে আসক্ত। আমার খারাপ জীবনে এমন পবিত্র জিনিস কিভাবে জুঁটলো বলোতো? উচিত হয় নি জড়ানো। শূণ্য জীবনে যখন তাদের আগমন ঘটলো ঠিক ওই সময় আবারও শূণ্য করে দিলো আমাকে। আমার অতীত আর বর্তমানকে এত খারাপ করে কেনো লিখলো? আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে পারিনি ড্যাড। সমস্ত যন্ত্রনা তুচ্ছ মনে হয় যখন নিজের এই রক্তের নিথর দেহটার কথা মনে করি। কি মায়াবী, কি স্নিগ্ধ, কি কোমল ছিলো তার চেহারা। কিভাবে ভুলব তার অস্তিত্ব, তার স্পর্শ, তার হাসি, তার কান্না?
গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের রক্ত ছিলো সে। আমার সমস্ত পাপের হিসেব বিধাতা হৃৎপিনন্ড ছি*ড়ে হিঁচড়ে নিয়েছে। আফসোস লাগে একটা জিনিস ভেবে। তার সাথে আমার সাক্ষাত ছিলো ক্ষনিকের জন্য। আমার মত পাপী আর খারাপের স্থান হবে জাহান্নামের কোনো এক স্থানে। পরকালেও মেয়েটার সাথে দেখা করত পারব না। আমার এরিক আর নীড় অনেকটা বড় হয়ে উঠেছে। কোনো সময় হ্যালুসিনেশন ভেবে তাকিয়ে থাকি দুইটা প্রানের দিকে। এই পাপীর ঘরে এমন ফুটফটে বাচ্চা জন্মালো কিভাবে? তুমি ও আশ্চর্য তাই না ড্যাড? পুরো আমেরিকা আর আফ্রিকা আশ্চর্য হয়ে আছে। আমি কিভাবে বাচ্চার বাবা হলাম। যার ভেতরে সামান্য মায়া -মমতা নেই।
নিক হাসলো আবার ও। শার্ট বুকের অংশ থেকে সরিয়ে ফেলে আঙ্গুল ছোঁয়ায় সেখানে। বাম দিকে তিনটা তুলতুলে পায়ের ছাপ ট্যাটু করে রাখা। আর ডান দিকে কোনো এক নারীর মুখ খোঁদাই করে ট্যাটু করে রাখা। যার চোখ দুইটা নীলচে! নিক প্রথমে বাম বুকে ইশারা করে বলে,
” এখানে আমার এরিক, নিভ্রিতা আর নীর আছে।
পর – পর ডান বুকে ইশারা করে বলে,
” আর এখানে তাদের মা আছে।আমার নিশ্বাস, আমার জীবন, আমার পৃথিবী।
নিক থামলো কিছুক্ষোনের জন্য। দুর থেকে কোনো একটা পশু-পাখির আওয়াজ ভেসে আসে। মুহূর্তেই গ্যাংস্টার বস বাস্তবতায় ফিরে আসে। নিজের ভেতরের চাপা অনুভুতিহীন কথাগুলো আওড়াচ্ছিলো এতক্ষণ ধরে অথচ খেয়াল নেই। নিক শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলে,
” তুমি আসলেই জাদু জানো ড্যাড। এই বয়সে এসেও আমার সেটা স্বীকার করতে হচ্ছে। ছোট কালে যেভাবে ভুলিয়ে সব কথা আদায় করে ফেলতে আজও তার ব্যতিক্রম করো নি। উচিত হয় নি তোমার এমন করা। খুবই অন্যায় করলে তুমি এইটা। ভেবে নাও যা বলেছি সব ভুয়া। আমার মত যান্ত্রিক মানবের কোনো অতীত নেই। কোনো যন্ত্রনা নেই আর না আবেগ আছে। ভুলে যাও সব।
নিক ছোট্ট কবরের উপর চুমু খায়। বিরবির করে আওয়াজ তুলে,
” মা আমার। দেখা হবে কোনো এক সময়। আমার বাবাকে বেশি জ্বালিও না। পাপার গুড গার্ল হয়ে থাকবে।
নিক উঠে দাঁড়ায়। সামনে এগিয়ে গিয়ে আবার ও থেমে যায়। পিছনে ঘুরে ঠোঁট নাড়িয়ে আবার ও বলে,
” আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো ড্যাড। তোমার আমানতে রেখে গেলাম।
নিক বাড়ি মিনারে গিয়েছে একদম সকালের দিকে। কবরের কাছ থেকে এসেই ড্রাগস পুশ করতে হয়েছে শরীরে। এই ড্রাগস এই তার সব থেকে বড় বন্ধু। তার সব রকম ব্যাথার উপশম! ড্রাগসের নেশা কাটতে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে। জিম শেষ করে রুমে ডুকে দেখে এরিক আর নীর ঘুমিয়ে বুদ হয়ে আছে। এনিকে রুমে দেখতে না পেয়ে সে ভ্রুঁ কুচকে ফেলে। ভেতরে – ভেতরে ফুঁশলেও সংযত রাখে নিজেকে। ঘার্মাক্ত শরীরটা নিয়ে একদম ওয়াশরুমে ডুকে যায়। অনেক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখে ছেলে- মেয়ে দুইটাই উঠে গিয়েছে৷ নিক টাওয়াল ডিভানের উপর রেখে চারদিকে চোখ বুলালো। এনিকে রুমের ভেতরে এখনও আসতে না দেখে ক্ষোভ হচ্ছে ভেতরে। চোখ-মুখ শক্ত করে শরীরে একটা টি- শার্ট জড়িয়ে নেয়। এরিক একদম শান্ত হলেও নীর তার ঠিক উল্টো প্রোডাক্ট। এরিক ফ্যাল – ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। নীড় হাত – পা নাড়িয়ে হেসে উঠে,
” আ.আয়া… ইইইইইইই…মমম…
নিক সামান্য হেসে ছেলে – মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে তাদের শরীরে চাদর টেনে দেয়,
” আমার চড়ুইপাখিদের ঘুম শেষ? আজ এত দ্রুত যে! ঘুমকাতুর মায়ের কবলে পড়ে এত দ্রুত কিভাবে উঠে গেলে শুনি? ডিডন’ট ইউ মিস পাপা, মাই হার্টবিটস?
নিকের কথা তারা কি বুঝলো বুঝা গেলো না। ঘুম থেকে উঠে ছেলেটা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। এইবার ও হয়েছে তাই। কিন্তু ছটফটে নীড় টেনে দেওয়া চাঁদরটা আবার ও ফেলে দেয়। হাত – পা নাড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে। আচমকা নিকের ফোনের মেসেজ শব্দ করে উঠে। নিক ফোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে ল্যাপটপ অন করে তাদের শিউরে বসে।
” আ.. ইউউউ…উউউউ
নিক ল্যাপটপে কাজ করা অবস্থায় মেয়ের কথায় উত্তর দেয়,
“জি মা।
” আইইউউঊউ.. আয়ায়ায়া
“আম্মু!
” প.প….আয়ায়ায়া…
নিক শীতল চোখে তাকায় মেয়ের দিকে। নির হাত – পা নাড়িয়ে খেলে যাচ্ছে। এরিক খুব চেষ্টা চালাচ্ছে পা নিয়ে মুখে ডুকানোর। কিন্ত কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কষ্ট করে বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলটা মুখের ভেতর ডুকিয়ে দেয়। নিচের মাড়ির এইদিকে দাঁতের সামান্য অংশ দৃশ্যমান হয়ে আছে। খুশিতে আঙ্গুলে কামড় দিতেই গলা ফাটিয়ে কেঁদে উঠে। হতভম্ভ হয়ে উঠেন গ্যাংস্টার বস। এরিকের ফর্সা মুখটা একদম লাল টুকটুকে হয়ে গিয়েছে। পা মুখ থেকে সরায় নি। একইভাবে কামড় দিয়ে রেখে কেঁদেই যাচ্ছে। এরিকের গলা ফাটানো কান্না শুনে এনি বেলকনি থেকে দ্রুত আসে। চোখের পানি মুছে বিছানার কাছে এগিয়ে যায়। নিক জোর করে মুখ থেকে পায়ের আঙ্গুল সরিয়ে দেয়। আঙ্গুল সরিয়ে দেওয়ার ফলে ঠোঁট ভেঙ্গে আরও কেঁদে ওঠে। নিক ছেলের কান্ড দেখে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে,
” নিজের পায়ে কামড় দিয়ে নিজেই কেঁদে যাচ্ছে। আবার পা মুখ থেকে সরানোর ফলেও কাঁদছে। তাহলে করবটা কি বাপ!
এর ফাঁকে এনির দিকে তাকাতে ভুলে নি। এনি ঝুঁকে থাকার ফলে নিক তার মুখটা দেখতে পাচ্ছে না। নিজের উপর এই রাগ হচ্ছে। এনি নিকের হাতের ভাঁজ থেকে এরিককে নিয়ে কপালে চুমু খায়।
” কিচ্ছু হয় নি বাবা। এইতো সব ঠিক হয়ে যাবে।
শরীরের ওড়না দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে এরিককে ব্রেস্ট ফিডিং করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিকের দিকে ভুলেও তাকায় নি। ভেতরটা তার যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছে। কান্না আটকানোর জন্য ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখে। ওড়না দিয়ে ঢেকে এনি নিকের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করছে বিষয়টা ভেবেই তার মস্তিষ্কের রক্ত গরম হয়ে যায়। রাগে ল্যাপটপটা আছাড় মারতে গিয়েও আটকে যায়। শব্দে বাচ্চারা ভয় পাবে। নিক নিশ্বাস ছাড়লো। অবহেলায় ল্যাপটপটা রেখে বলে,
” স্বাধীনতা দিয়েছি বলে যে একদম দৃষ্টির আড়াল করে ফেলেছি ভেবে থাকলে ভুল।
নিকের শক্ত গলায় এনি মৃদু কেঁপে উঠে। রক্তিম হয়ে উঠা চোখ দুইটা হিংস্র দেখাচ্ছে খুব। এনি নিজেকে সামলে নেয়। ভাঙ্গা কন্ঠ, এরপরও স্বাভাবিকভাবে বলে,
” যে স্বাধীনতা দিয়েছেন এতে দৃষ্টির আড়াল হতেও বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে নাকি নিজের কাছ থেকে দুরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে? প্রশ্নগুলো নিজেকে নিজে কোনোদিন করলে উত্তর আপনি পেয়ে যাবেন গ্যাংস্টার বস। চার মাস ধরে স্বাধীনতা ভোগ করছি। অনেক স……
এনি থেমে যায়। বেরিয়ে আসা কান্নাটা গিলে নেয় আচমকা। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। বিষাক্ত লাগছে সব কিছু। কিসের স্বাধীনতা এইটা? মেয়ে মারা যাওয়ার পর একদিন তাকে বুকে টেনে নিয়ে ঘুমায় নি। অথচ আগে থাপড়ে – ধমকে, জোর করে বাহু বন্ধী করে রাখত। সে নিজে কিছু জিজ্ঞাসা করলে হু- হা কিছু বলে নয়ত না। প্রতিটা স্বামী – স্ত্রীর সম্পর্কে একটা জৈবিক সম্পর্ক থাকে। যে লোক সামান্য না দেখলে ঘূর্নিঝড় চালিয়ে দিত সে এখন ঘন্টার পর ঘন্টা না দেখে থাকছে। এই চার মাসে একদিনের জন্য তার কাছে ঘেষে নি। কোথাও যেতে চাইলে আটকাচ্ছে না। কেনো আটকায় না? কেনো আগের মত জোর করে না? কেনো রাগে চোখ রাঙ্গায় না, কেনো ধমক দিয়ে উঠে না? সেই সাইকোপ্যাথ রুপী, উন্মাদ – বেপোরোয়া স্বভাব কেনো দেখায় না?
এমন দমবন্ধ করা স্বাধীনতা কখনো চেয়েছি আমি? আরে ভাই স্বাধীনতা যদি চাইতাম তবে এই কয়টা বছর এভাবে নিজেকে একটা রুমে বন্ধী রাখতাম না। নিজেকে এইভাবে সমাজ, মানুষ থেকে গুঁটিয়ে ফেলতাম না। আমি তো স্বাধীনতা চাই নি। তবে কেনো দিবে আমাকে এমন কষ্টকর স্বাধীনতা? ফা* কিং স্বাধীনতা।
এনি কান্নার মধ্যেও আড় চোখে তাকায় নিকের দিকে। নিক নিচের ঠোঁট চেপে ধরে ডিভানে বসে আছে মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে তার বাবার গলা ধরে পেটের উপরে বসে আছে। এনি নিকের মুখটা দেখলো। রাগে – চোখ মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। সে তো এই ব্যক্তিটার সব রিয়্যাকশনের সাথেই পরিচিত। খুব বুঝতে পারছে রেগে নিজেকে শান্ত করার জন্য বসে আছে। আচমকা এনি একটা ঘটনা মনে করে। তিন – চারদিন আগে অচেনা নাম্বার থেকে দশ – বারোটা ছবি এসেছে। একটা মেয়ের সাথে নিকের ঘনিষ্ট মুহূর্তের কিছু ছবি। প্রথমে এনির দুনিয়া ঘুরে আসলেও পরে ভালোভাবে ছবিগুলো পরখ করে। কোনো রকম কম্পিউটার সিস্টেমে এডিট করা ছবি বুঝা যাচ্ছে না। তবে এইটা নিক নয় সে সিউর। আর যায় হোক মেয়েতে যার এলার্জি সে অন্তত কোনো প্রস্টিউটের কাছে যাবে না। এতটুকু বিশ্বাস নিকের উপর এনির আছে। নিক যদি এনির থেকে বছরের পর পর বছর ও দুরে থাকে এরপরও সে যাবে না। সেই বিশ্বাস নিয়েই দুদিন পার করেছে। কাউকে কিছু জানায় নি সে। হয়ত বিরোধী দলের কোনো ফাঁদ এইটা। এনি ছেলেকে সুইঁয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলে,
” আজকাল শুনলাম বাহিরে যাচ্ছেন?
নিক কোনো উত্তর করলো না। এনি বাঁকা হাসলো। ফের বলে,
” মেয়েটা কে শুনি? হুট করে পরকীয়াতে লিপ্ত হতে মন চাইলো কেনো?
নিক চোখের উপর থেকে হাত সরায়। ভ্রুঁ কুচকে আসে অনেকটা। অবাক হয়ে বলে,
” মানে? ভুলভাল বকছো কেনো? পরকীয়া? ইচ্ছে হয়েছে তাই করেছি তোমার কি তাতে?
এনির শরীরটা সামান্য দুলে উঠে। উপহাস করে বলা লাইনটাও এনির সহ্য হলো না। মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কপাট রাগ দেখিয়ে বলে,
” কতদিন ধরে যাওয়া হচ্ছে শুনি? চার মাস ধরে নাকি এর আগের থেকেই?
” কোথায় যাব??
এনি ভণিতা না করে সোজাসাপ্টা বলে,
” পরকীয়া যে করছেন মেয়ে ছাড়া করছেন না নিশ্চই? এখন মেয়েটার কাছে কত মাস ধরে যাচ্ছেন? এক মেয়ে নাকি অনেকগুল?
নিকের মুখের উপর থেকে যেন রক্ত সরে যায়। অবাকের সপ্তম পর্যায়ে সে। হাত নিশপিশ করে উঠে। গ্রিবাদেশ শক্ত করে চিবিয়ে উঠে,
” লিমিট ক্রস করবে না। বাচ্চাদের সামলাও।
এনির কেনো জানি রাগ হচ্ছে প্রচুর। এত বড় মিথ্যা কথা বলছে এরপরও লোকটা এমন শান্ত বসে আছে! তার মানে কি ছবিগুলো সত্যি? ভেতরে – ভেতরে ক্ষেপছে প্রচুর। এরিককে বুকে টেনে নিয়ে সামান্য উচু গলায় বলে,
” বাচ্চাদের এই সামলাচ্ছি। এইদিকে বাচ্চার বাপ পর নারীতে আসক্ত হয়ে পড়েছে।
নীর ফ্যালফ্যাল করে তাকায় মাম্মামের দিকে। এনি নিজেও কিছুটা হতভম্ভ এত জোরে কথা বলে। এরিক সামান্য কেঁপে উঠেছে। কেউ না বুঝলেও এনি অনুভব করেছে। ছেলেটা তার বুকের সাথে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। নিক চোখ বন্ধ করে শ্বাস টানলো। আর কত কন্ট্রোলে রাখবে নিজেকে? মেয়েকে বুকের সাথে মিশিয়ে বারান্দায় যেতে যেতে ধমকে যায় সামান্য,
” নেক্সট টাইম এমন অহেতুক কথা বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব। লাস্ট ওয়ার্নিং!
এনি গায়ে মাখলো না এইসব কথা। নিকের কথা শেষ হতেই বলে,
” তার মানে ছবিগুলো সত্যি! আর আমি ভেবে বসে আছি বিরোধী দলের চক্রান্ত। অনেক সুন্দর করেই চুমু খাওয়ার ছবি। দুইজন এই অর্ধনগ্ন। বাচ্চাদের বুকে নিয়ে এমন ছবি দেখছি। ওদের বাবার অথেন্টিক পিকচার। উফফস ভাবতেই ভালো লাগছে। আমি আর থেকে কি করব? যা আমার তা পুরোটা এই আমার। এর থেকে ০.১% ও কাউকে দেয় না । ভাগাভাগি করা খুবই অশুভ লক্ষণ। তাই মেয়েটাকে পুরোটা দান করে দিলাম।। নাভিদ ভাই অপেক্ষা করছে আমার জন্য। আমি বরং তার কাছে চলে যায়। এমনিতেও আমাকে কারাদন্ড জীবন থেকে এখন সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতা ভোগ করতে হবে তো নাকি?
এনি বাক্যটি সম্পূর্ণ করার নিমিত্তে শ্বাস গ্রহণের সুযোগটুকুও পেল না। তৎপূর্বেই প্রচণ্ড ঝড়ের বেগে কেউ একজন তীব্র ক্রোধে তার কণ্ঠনালি চেপে ধরল। আকস্মিক এই আক্রমণে এনি ছটফট করে উঠল। নিকের তপ্ত ও ঘন শ্বাস তখন এনির মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে। এনি কম্পিত দৃষ্টিতে তাকাল নিকের চোখের দিকে। মুহূর্তেই ধূসর মণির সাথে সমুদ্রের ন্যায় নীলচে চোখের এক তীব্র সংঘাত ঘটল। নিক নিজের চোয়াল শক্ত করে তার হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় করে এক প্রকার চাপা গর্জে উঠে,
” বান্দীর বাচ্চা, আমাকে না রাগালে শান্তি আসে না তর? কিসের পরকীয়া! ছবি ? এই জীবনে তকে ছাড়া কোনো নারীর দিকে তাকিয়েছি আমি? সেখানে চুমু, অর্ধ নগ্ন ! হুয়াট কাইন্ড অফ ফাকিং টক ইজ দিস? এতটা বিশ্বাস নিয়ে সংসার করতে চলে এসেছিস? কসম, তর জন্য বাচ্চারা যদি একটুও ভয় পায় তবে ঠিক এভাবেই দম বন্ধ করে মেরে ফেলব। স্টুপিড!
এনি আচমকা হাসে শব্দ করে। এনির চোখে – মুখে আনন্দ দেখে নিক অবাক হয়। ক্ষীপ্ত চোখে বলে,
” হাসছিস কেনো? সাহস এতটা বেড়ে গেলে কিভাবে? এই জবান দিয়ে নাভিদের কথা উচ্চারন করার স্পর্ধা দেখালি কিভাবে? অহহ গড, এই মেয়ে আমাকে কিছুতেই শান্ত থাকতে দিবে না।
এনি জোর করে নিজের গলা থেকে নিকের হাতটা সরিয়ে ফেলে। নিজের নরম ছোট – ছোট আঙ্গুলের ভাঁজে নিকের শক্তপোক্ত আঙ্গুল ডুকিয়ে নেয়। নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
” এই নিক জেভরানকে মিস করছিলাম। তাকে পেয়ে গিয়েছে তাই হাসছি। বাচ্চারা বলছিলো তাদের পাপা এতটা শান্ত হয়ে গেলো কিভাবে? কেনো আগের মত নয়? তার মিস করছিলো অনেক। তাই ওদের আবদার পূরন করতে মজা করলাম। ছবিটার পুরুষ আপনি নন খুব ভালো করে জানি। আপনার বডি আমার থেকে ভালো আর কে জানে! আমার থেকে ভালো আর কে চেনে আপনাকে? আছে এই ভুবনে এমন কেউ?
নিক হাত ছেড়ে দেয় আচমকা। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,
” তোমার তো স্বাধীনতা চাই। আমি তোমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছি। তোমাকে তিলে – তিলে মারছি। একটা রুমে বছরের পর বছর বন্ধী রেখেছে। মানসিক নির্যাতন করেছি তোমাকে। আর পাঁচজনের মত না বেঁচে আমার ইশারাতে থাকতে হয়েছে। তোমার তো বাকি সবার মত বাঁচতে ইচ্ছে হয়েছিলো। তাই দিলাম তো সব।
এনি ঠোঁট ভেঙ্গে ফুঁপিয়ে উঠে। নিকের বুকে মাথা রাখতে চাইলে নিক সরে যায়। এনি অসহায় গলায় বলে,
” ভুল করেছিলাম এইসব বলে। মেয়েকে হারিয়ে মাথা ঠিক ছিলো না। এর আগে যে কত কি বলেছি সেসব তো মনে রাখেন নি। তবে সেদিনকার কথা কেনো মনে রাখলেন?
” বিচ্ছেদ শব্দটা আমি সহ্য করতে পারি না জানা সত্তেও সেদিন উচ্চারন করলে। তুমি জানতে না….
নিক আর কিছু উচ্চারন করলো না। রাগে কাঁপছে তার শরীর। এক মুহূর্তের জন্য টেকা যাবে না এখানে। রুমে থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে এনি শক্ত করে চেপে ধরে নিকের হাত। ভেতরে কান্না গুলো দলা পাকিয়ে আসছে। অবাক হয়ে কোনোরকম বলে,
” তোমার ও অভিমান হয় নিক? তুমি অভিমান করতে জানো? সেদিনের কথাতে এখনও অভিমান পুষে রেখে দুরে সরিয়ে রেখেছিলে?
নিক তপ্ত মেজাজে তাকায় এনির দিকে। চোয়াল শক্ত করে বলে,
” নরপশু, জানোয়ার বলতে – বলতে সত্যিকারের জানোয়ার ভেবে নিয়েছো নাকি ? কিসব অহেতুক কথাবার্তা?অভিমান আমার সাথে মানায় না।
এনি ফিচেল হাসলো। ব্যাটা ভাঙবে তবুও মচকাবে না। এই একটা কথার কারনে এতদিন এইভাবে এড়িয়ে গিয়েছে। আর সে কত কিছু ভেবে নিয়েছিলো। এই এড়িয়ে চলা সহ্য করতে না পেরে ভেবেছিলো চলে যাবে এখন থেকে। কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে পড়েছিলো মহা ঝামেলায়।যে বাপ, ঠিক খুঁজে বের করে ফেলত নিজের প্রোডাক্ট। তার উপর মেয়ে তার অর্ধেক ফটোকপি। কোন গর্তে লুকিয়ে থাকত সে? শক্তি, সামর্থ্য কোনোটা এই ছিলো না। হতাশ এনি আর চলে যায় নি। আগে একা ছিলো তাই ছদ্মবেশ ধরে, কত নাটক করে পালাতে পেরেছে। এখন চাইলেও সেই কাজ সম্ভব নয়। একজনকে হারিয়ে দুই মাস নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারে নি। স্যালাইন চলেছে হাতে দিনের পর দিন। আবার আরেকজনের সাথে কিছু ঘটলে মরেই যাবে সে। আর যে বাপ, এমনিতেই মেরে ফেলবে তাকে গলা টিপে। এনি ফুঁশ করে শ্বাস টানলো। নিক এনির হাত সরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এনি মেঝের সাথে পায়ের আঙ্গুল খামছে ধরে রাখে। টলমল চোখে তাকায় নিকের দিকে। ভাঙ্গা গলায় বলে,
” তুমি আমাকে কষ্ট দিচ্ছো। হুট করে এমন তিলে তিলে মারছো কেনো? অতীতের কোনো রাগ ঝাড়ছো? অতীতকে পিষে ফেলে, তোমার সেই বর্বর অত্যাচার ভুলে যদি তোমার সাথে সংসার করতে পারি তবে তুমি কেনো অতীতের কথা নিয়ে পড়ে আছো? তুমি নিজেই তো বললে চলে যাওয়ার কথা। তাই তো আমি বলেছিলাম।
নিক এনির সামনেই ড্রেস চেইঞ্জ করে নিলো। কেনো যেন এই মুহূর্তে ট্রায়াল রুমে যেতে ইচ্ছে করছে না। পারফিউম লাগিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
” তোমার জন্য মঙ্গলজনক। আমার কাছে আসা তোমার জন্য যন্ত্রনাদায়ক। রক্তাক্ত হয়ে যাও, জ্ঞান হারিয়ে ফেলো। যন্ত্রনায় ছটফট করলেও আমার ভেতরে মায়া জেগে উঠে না। তাই দুরত্ব ভালো।
এনি হেচকি তুলে বলে,
” আমি অভিযোগ তুলেছি এই নিয়ে কোনোদিন? সেই যন্ত্রনাদায়ক কাছে আসাটা আমার জন্য শুভকর। নরম কিছুর স্বাদ আমাকে গ্রহন করাও নি তুমি। তাই নরমে আমি অভ্যস্ত নয়।
যন্ত্রনাদায়ক সব কিছুই গ্রহন করে নিয়েছি আমি। আমার মুখ থেকে ‘তুমি ‘ সম্মোধন শুনেও তোমার রাগ কমছে না?এতটা মুখ ফিরিয়ে নিলে ?
নিক শান্তভাবে ঘড়ি পড়লো। এনি সামান্য দুরত্ব মিটিয়ে নেয়। নিকের ঘনিষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিগত পুরুষণালি শরীরের গন্ধে শরীর ঝিমঝিম করে উঠে। এনির পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে মেয়েটা এক অপ্রাত্যাশিত কাজ করে বসে। নিকের সুজের উপর পা রেখে গ্যাংস্টার বসের কলার চেপে ধরে। নিক অবাক হয়ে তাকাতেই তার গোলাপি ঠোঁট দুইটা আকড়ে ধরে। এত দিন পর চিরচেনা উন্মাদ হওয়া ঠোঁটের স্পর্শে সামান্য পিছিয়ে যায় সে। এরিক আর নীর দুইজন এই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বাবা – মায়ের দিকে। তারা আপাতত বুঝার চেষ্টা করছে সামনে কি চলছে এইসব! তাদের সমস্ত আদর কেনো অন্যকে দেওয়া হচ্ছে। নিক শক্ত হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। এনির কষ্ট হচ্ছে এত উঁচুতে চুমু খেতে। তার উপর নিক মাথা তুলে ফেলে। নিকের রেসপন্স না পেয়ে লজ্জায়, অপমানে মাথা গরম হয়ে আসে। নিজ থেকে কাছে আসার পরও এমন ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে? আর কিভাবে রাগ ভাঙ্গাবে? নিকের কলার ছেড়ে দিয়ে পায়ের উপর থেকে নেমে যায়। অপমানে থমথমে মুখে বলে,
” আমাকে এতটা নিচে না নামালেও পারতেন।
এনি সরে আসতেই খপ করে তার হাত ধরে ফেলে নিক। নিজের শার্টের বোতাম এক হাত খুলতে খুলতে এনিকে পাজা কোলে তুলে নেয়। এনি বুঝে উঠছে না কি হচ্ছে তার সাথে। নিক মুখ খুলতে যাবে কিছু বলার জন্য তার আগেই নিক ঠোঁটে শক্ত করে কামড় দেয়। এনি ব্যাথায় গোঙ্গিয়ে উঠে। নিক রক্তটা মুছে বলে,
” যাকে সৃষ্টিকর্তা স্বয়ং আমার উপরে স্থান দিয়েছে তাকে নিচে নামানো কার সাধ্য ?
এনি এখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিকের দিকে। চার মাস পর এমন ব্যবহারে সে সত্যি আশ্চর্য। নিক বাম হাতে ফোন দেয় আরিশকে। আরিশ দুই মিনিটের মধ্যে রুমে ডুকে। নিক এনিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হতবুদ্ধির মত তাকিয়ে থাকে। নিকের উদ্দেশ্যে বলে,
” বউ কিভাবে কোলে নিতে হয় সেটা দেখানোর জন্য ডেকেছিস? তর কি মনে হয় আমি বউ কোলে নিতে পারি না? তুই হয়ত ভুলে যাচ্ছিস আমার বউয়ের প্র্যাগনেন্সির তিন মাস চলে। কোলে নেওয়া ছাড়া নিশ্চই হয়ে যায় নি।
এনি লজ্জা আরষ্ট হয়ে যায়। এইসব ঠোঁট কাটা লোকদের মধ্যে তারা দুই বোন এই পড়লো! আরিশের অহেতুক কথায় নিক চোয়াল পিষলো। ধমকে বলে,
” রাবিশ! বাচ্চাদের নিয়ে যা। প্রাইভেসি লাগবে আমার। দুই ঘন্টার ভেতরে দরজা ধক্কাবি না। খুলা সম্ভব হবে না।
আরিশ ঠোঁট টিপে হাসলো। ঝগড়ার মিটমাট তবে হয়েছে। এই ঘারত্যারাকে একমাত্র এনিই পারে সোজা করতে। নয়ত এত সহজে আয়ত্তে আনার সামর্থ্য আছে কার? আরিশ দুই হাতের মাধ্যমে এরিক আর নীরকে কোলে তুলে নিলো। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
” চলো আমরা এখন যায়। তোমার বাবার প্রাইভেসি লাগবে। এরিক, এখন কাঁদলে তোমাকেও বউয়ের সাথে থাকতে দিবে না। আপাতত সর্বনিম্ন দুই ঘন্টা আমরা অপেক্ষা করি। তার বেশিও হতে পারে। তোমার বাপ তো আবার অজ্ঞান না করা অব্দি শান্তি পায় না।
নিক কটমট চোখে তাকালো আরিশের দিকে। আরিশ চোখ টিপে যেতে -যেতে বলে,
” সূর্য মামাকে তবে আটকাতে পারলেন না বস? সে আবার সঠিক উদয় হলো! দুই ঘন্টার বেশি নয় কিন্তু।
নিক পারছে না আরিশকে চিবিয়ে খেতে। রাগে রিমোটের মাধ্যমে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। এনি লজ্জায় চোখ-মুখ খিঁচে আছে। এদেরকে আল্লাহ কি দিয়ে বানিয়েছে! নিক আচমকা এনিকে বিছানায় ফেলে দেয়। এনি চোখ-মুখ খিঁচে ফেলে সামান্য। নিক শার্ট খুলে অবহেলায় কোথায় ফেলে দেয়। এনির উপর চড়ে গালে গাল ঘেষে বলে,
” শান্ত ছিলাম শান্ত থাকতে দিলে না।
এনি শুকনো ঢোক গিললো। এই বেপোরোয়া, উন্মাদ ভঙ্গি তাকে কাঁপিয়ে তুলছে। এই মাতাল চোখ দুইটা তাকে পানি শূন্যতায় ভুগাচ্ছে। ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
” আপনি ড্রাগস নিতেন।
” তো?
” ড্রাগস শরীরের জন্য ভালো নয়।
নিক খুলে ফেলল এনির টপ। গলায় মুখ গুঁজে
হাতে হ্যান্ড কাফ লাগাতে লাগাতে বলে,
” ড্রাগস ছিলো বলেই তোমার থেকে দুরে থাকতে পেরেছি । যন্ত্রনা দেয় নি। উস্কেছো তুমি। এইবার সবটা গ্রহন করো।
এনি ভয়ে কাঁপছে রিতীমত। এই লোককে সে ভয় পায় অতিরিক্ত। নিশ্বাস আটকে এসেছে তার। এই মুহূর্তে অক্সিজের অভাবে মারা যাবে! এনিকে এমন স্তব্দ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে নিক গলায় কামড় বসায়। এনি ব্যাথায় শব্দ করে উঠতেই নিক মিথ্যে ধমক দেয়,
” উস্কেছো তুমি, এখন যদি রেসপন্স না করো তবে বেলকনি থেকে সোজা নিচে ফেলে দিব। সহজ হও! নিশ্বাস ছাড়ো। আশ্চর্য বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছো এখনও এত লজ্জা কোথা থেকে আসে? সহজ হতে পারো না কেনো?
নিকের ধমকে এনি নিশ্বাস ছাড়ে। চোখ বন্ধ করে আস্ফূর্ত আওয়াজে বলে,
” জানা নেই। লজ্জা লাগে অতিরিক্ত। কি করব আমি?
নিক অবাক হলো। ঠোঁট কামটে হেসে বলে,
” কতবার লজ্জা ভাঙব তোমার ব্লাডরোজ?
পূর্বের সেই তীব্র ক্ষোভ মুহূর্তেই এক চরম ব্যাকুলতায় রূপ নেয়। নিকের মুখে ‘ব্লাডরোজ’ সম্বোধনটি শোনামাত্রই এনির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কত দীর্ঘকাল, কত বিনিদ্র রজনী সে এই চেনা ডাকটি থেকে বঞ্চিত ছিল! সময় যেন আচমকা থমকে দাঁড়িয়েও দ্রুতবেগে ধাবিত হতে থাকে। নিকের ভেতরের ছন্নছাড়া পাগলামি আর ব্যাকুলতা তখন নিয়ন্ত্রণহীন, আরও তীব্রতর হয়ে উঠছে। সেই চিরপরিচিত, তীব্র ও রক্তাক্ত স্পর্শের ব্যাকুলতা সমস্ত বাস্তবতাকে স্লান করে দিচ্ছে। ক্ষুধার্ত বাঘ যেন নিজের শিকারীকে পেয়েছে এতদিন পর। হঠাৎ করেই ঘরের আলো নিভে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়।
লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৭৪
এই গাঢ় অন্ধকারে, সুদীর্ঘকাল পর তাদের বিচ্ছিন্ন ভুবন দুটি পুনরায় এক বিন্দুতে এসে মিলল। তপ্ত মরুভূমির বুকে নেমে আসে শান্তির এক পশলা আকস্মিক বৃষ্টি। এনি তীব্র আবেগে নিকের চওড়া পিঠ খামচে ধরে।নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করতে চাচ্ছে প্রতিটা মুহূর্তটাকে। এনির নাড়াচড়া করার শক্তি নেই। সবটা এই নিকের কবলে। যন্ত্রনায় চোখ-মুখ খিঁচে নেয় রমণী প্রতিনারের মত। নিকের সেই ঘন ও তপ্ত নিশ্বাসের আড়ালে, হৃদয়ের গভীর থেকে নিঃসৃত হওয়া একটি চেনা বাক্য এনির কানে এসে আছড়ে পড়ে,
“কলিজা আমার!”
