লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৯
অহনা রহমান
সময় ও স্রোত কারো জন্য বসে থাকে না। চলতে থাকে আপন গতিতে। পেরিয়েছে দুইদিন। অর্থাৎ হিয়ার বিবাহের দ্বিতীয় দিন আজ। কালকে নাকি নাফিরা ওকে নিতে আসবে। কি অদ্ভুত না? কিছুদিনের ভেতরেই কিভাবে হিয়ার জীবনটা পাল্টে গেল৷ প্রথমে রাজের ধোঁকা তারপর রুহির পাল্টে যাওয়া। এখন আবার বিয়ে। কিভাবে কি হয়ে গেল হিয়া কিছুই বুঝতে পারে না। তখন মাঝরাত। হিয়া বিষন্ন মনে বসে আছে জানালার পাশে। বাতাসের মৃদু হাওয়ায় জানালার সফেদ রঙা পর্দা গুলো উড়ছে। লম্বা চুল গুলো ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেদিকে মেয়েটার কোনো খেয়ালই নেই। সবকিছুর উপর সে মহা বিরক্ত হয়ে গেছে। হাহ! কালকে সকালে নাকি তাকে চলে যেতে হবে। যে মেয়েটার বিশ্বাসই হচ্ছে না তার বিয়ে হয়েছে তাকে নাকি কালকে শশুরবাড়ি যেতে হবে। হিয়া কিছুই বুঝতে পারছে না।
মায়ের কাছথেকে হিয়া জেনেছে রুহি তার বিয়ের বিষয়ে জানে না। এটাও চিন্তার বিষয়। কেন রুহি বা রাজকে জানানো হয়নি তার বিয়ের কথা? শুধুই কি সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য? নাকি এর ভেতরে কোনো গল্প আছে, যা হিয়া জানে না। তারপর, নাফিকে সে প্রপোজ করলো অথচ নাফি তাকে রিজেক্ট করলো। আবার হুট করেই নাফির সাথে তার কিভাবে বিয়ে হলো? সবকিছু হিয়ার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে সবকিছু।
হ্যাঁ এটা ঠিক, সে নাফিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো এবং যেচে পড়ে প্রপোজ ও করেছিলো। কিন্তু তারপর তো সে ডিসিশন পাল্টে ফেলেছিলো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
নাফিকে তো সে ভালোবাসেনি। শুধুই ব্যবহার করতে চেয়েছিলো। যেই মানুষটার কাছে সে রিজেক্ট হয়েছে, তার সাথে কিভাবে সংসার করবে মেয়েটা? এমনিতেই ওদের বিয়ের পরে নাফির সঙ্গে একবারও কথা হয়নি হিয়ার। যদিও নাফি বহুত বার কল করেছিলো। কিন্তু হিয়া রিসিভ করেনি। কি বলবে সে কল রিসিভ করে? হিয়ার মন খারাপের আরেকটা কারন হলো, মাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে। হিয়ার যে মা ছাড়া এই দুনিয়ায় কেউ নেই। আর হিয়ার মায়েরও নেই। মাকে ছাড়া হিয়া খুব বেশিদিন কোথাও থাকেনি।
ওই বাড়িতে কিভাবে থাকবে হিয়া? আরও বিয়েটা যদি স্বাভাবিক ভাবে হতো তাহলে কোনো কথা ছিলো না। এভাবে হঠাৎ বিয়ে, হঠাৎ শশুরবাড়ি! এভাবে কারো বিয়ে হয়? তাও তো হিয়ার ভাগ্য ভালো বড় চাচ্চুর কথায় তাকে তিনদিন সময় দেওয়া হয়েছে রেডি হওয়ার জন্য। বাস্তবতা মেনে নেওয়ার জন্য। নাহলে তো নাফি সেদিনই তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। সেদিন নাফিদের বাড়িতে নিয়ে গেলে, হিয়ার কি হতো! সেদিনের কথা ভাবতেই হিয়া নড়েচড়ে বসলো। নাফির কথা মনে পড়তেই মেয়েটা বিরক্ত হলো। নাকমুখ কুঁচকে বিরবির করে বলল,
“ফাউল লোক কোথাকার!”
হিয়ার মনে পড়ে দুইদিন আগে, তার বিয়ের পরের মুহুর্তের কথা।
নাসিমার চুরি পড়ানো শেষ হয়েছে। যেহেতু নাফির বিয়ে হয়েছে তাই হিয়াদের বাড়িতে তো আর আজ রাত থাকা যাবে না। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর নাসিমা কামরুল সাহেবকে বললেন,
“তাহলে আজ আমরা উঠি ভাই সাহেব। আমাদের নতুন বৌমাকে খুব শীঘ্রই নিয়ে যাবো আমরা।”
সবাই সহমত পোষণ করলেও নাফির বাচ্চা নাফি বলে উঠলো,
“সে’কি! ওকে নিয়ে যাবো না? বিয়ে তো হয়ে গেছে এখন আবার কি সমস্যা?”
নাসিমা বিস্ফোরিত নয়নে তাকালেন ছেলের পানে। তার সন্দেহ হলো, এটা কি তার ছেলে নাফি? নাকি অন্যকেউ? নাফি তো এমন নয়। সবে বিয়ে হলো। তার নাম শুনে মেয়েটা জ্ঞান হারালো। মেয়েটা তো বিশ্বাসই করতে পারছে না তার বিয়ের কথা। আর এখনই নাকি ওকে বাড়ি নিয়ে যাবে। নাসিমা কিছু বলবেন তার আগে কামরুল হাসান বললেন,
“রুহিরা ফিরলে না-হয় একবারে যাক। তখন তো এমনিতেই বড় করে বিয়ে হবে।”
নাফি নাকচ করে বলল,
“না না আঙ্কেল আমি চাইছি, ওরা দুজন এসে আমার স্ত্রীকে আমার বাড়িতে দেখুক। তাহলে ওরা আরও বেশি অবাক হবে। আমি চাই আজই আমার ওকে নিয়ে যেতে।”
নাফির কথা শুনে হিয়া আবারও কেঁদে উঠলো। হেলেনার বুকে মাথা গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আম্মু আমি যাবো না শশুরবাড়ি। আমি যাবো না ওনাদের বাড়ি।”
কামরুল হাসান বললেন,
“বাবা বিয়ে যখন হয়ে গেছে বউ তো তোমারই। যেহেতু সব হঠাৎ হয়েছে আমাদের মেয়েটা তো এখনোও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। দুইটা দিন সময় দাও মেয়েটাকে। ধীরেসুস্থে তারপর না-হয় নিয়ে যেও।”
নাফির অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মেনে নিতে হলো কামরুল হাসানের কথা। কথা হলো তিনদিন পরে নাফি ও নাফির কিছু কাছের মানুষরা এসে হিয়াকে নিয়ে যাবে। আর যেহেতু বিয়েটা একপ্রকার চুরি করে হচ্ছে তাই কেউ জানবে না এখন। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে হিয়াকে আবারও উঠিয়ে নেওয়া হবে।
সেদিনের কথা ভেবে হিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মনে পরলো নাঈমের কথা। এই কয়েকদিনে হিয়ার একটুও কথা হয়নি নাঈমের সাথে। এতো সব যে ঘটে গেল নাঈমকে তো জানাতে হবে। হিয়া ঠিক করলো কাল সকালে নাঈমের সাথে দেখা করবে সে। তারপর না-হয় নাফির সঙ্গে চলে যাবে।
নাঈমের কথা মাথায় আসতেই হিয়া উঠে বসলো। আর বসে থাকা যাবে না। এখন না ঘুমালে কালকে সকালে উঠতে পারবে না সে। হিয়া নিজের ফোন থেকে নাঈমকে একটা মেসেজ দিয়ে রাখলো। কালকে কোথায় দেখা করবে আর কয়টার সময় আসবে। সকালে উঠে নাঈম মেসেজ দেখে যেন সেখানে চলে যায়।
সকাল তখন সাতটা। জিহাদ নিজের অগোছালো ঘরটাতে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ ফোনের উচ্চশব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। ধরফরিয়ে উঠে বসলো সে। বালিশের পাশ থেকে ফোন হাতে নিলো জিহাদ। দেখলো স্ক্রিনে রাজের কল। জিহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো ফোনের দিকে। সময়ও সেখানে স্পষ্ট___সবে সাতটা। রাজ না হানিমুনে গেছে? এতো সকালে ঘুম ভাঙলো কিভাবে ওর? জিহাদ অত আর সাতপাঁচ ভাবলো না। কল রিসিভ করলো সে। জিহাদ কল রিসিভ করার সাথে সাথে শুনতে পেল, রাজের কর্কশ গলার স্বর।
“কিরে বাই**** তোর কি কথা ছিলো। তোর সময় ছিলো তিনদিন। দুইদিন অলরেডি কেটে গেছে। তোর তো কোনো রেসপন্সই নেই। তুই কি করতে পারবি কাজটা?”
জিহাদ থতমত খেয়ে গেল রাজের কথা শুনে। রাজ তো তার সাথে কখনোই এমন আচরণ করে না। কিছু হলো নাকি! জিহাদ কোনোমতে বলল,
“ভাই আমি তো তপকে তপকে ছিলাম, কখন হিয়াকে একা পাবো। কিন্তু ও তো বাড়ি থেকেই বের হয়নি। এখন কি আমি ওর বাড়ি গিয়ে রে ই প করে আসবো নাকি?”
“শোন জিহাদ আমি এতো কথা শুনতে চাই না। যে করেই হোক ওর একটা কিছু করেতেই হবে। নাহলে ভাই আমা…..!”
থেমে গেল রাজ। কথা আঁটকে গেল তার। কিছু কিছু সমস্যা থাকে যেগুলো শত কাছের বন্ধু হলেও তাদের সাথে শেয়ার করা যায় না।
“কিছু হয়েছে তোর দোস্ত? খুলে বল আমাকে। তোর কথাবার্তায় মনে হচ্ছে তুই ঠিক নেই।”
রাজ উত্তর দেয় না। নিঃশব্দে কল কেটে দেয়। তার যে কিছু বলার নেই। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যে সে খুব বড় ভুল কাজ করে ফেলেছে। যেই ভুলের কোনো মাশুল নেই। ভুলের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে সারাজীবন। জীবনে বেঁচে থাকতে প্রয়োজন শান্তির। প্রতিটি মানুষ তার জীবনসঙ্গীর কাছে প্রথমে চায় একটু শান্তি। সেই জীবনসঙ্গীই যদি হয় অশান্তির মুল কারন। তাহলে জীবন আর জীবন থাকে না__হয়ে যায় জাহান্নাম। হয়তো রাজের পরিস্থিতি এমন।
রাজ কল কেটে জিহাদ আর শোয় না। দ্রুত শার্ট পড়ে নেয় সে। এতো গুলো টাকা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। জিহাদ শহরের বস্তি থেকে কিছু গুন্ডা ভাড়া করেছে। সে তাদের কাছে কল দিলো প্রথমে। হিয়ার বাড়ির সামনে গিয়ে নজর রাখতে হবে। কে কি করছে, কোথায় যাচ্ছে সবকিছু নজরে রাখবে হবে। তারপর ঝোপ বুঝে কোপ মারতে হবে!
হিয়ার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেজে গেল নয়টা। আজকে যেহেতু মেয়েটা চলে যাবে তাই আর কেউ ডাকলো না হিয়াকে। হিয়া নয়টার সময় উঠে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নিলো। কোনো রকমে জামাকাপড় বদলে সাধারণ একটা থ্রিপিস পড়লো সে। মাথায় হিজা বেঁধে, বেড়িয়ে পরলো নাঈমের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে। নাঈমকে সে আসতে বলেছিলো একটা পার্কে। সেখানের উদ্দেশ্যে হিয়া রওনা হলো।
মাঝখানে কাটলো কিছুট সময়। যথাযথ স্থানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হিয়ার বেজে গেল দশটা। খুব আশা নিয়ে হিয়া এসেছিলো, কিন্তু পার্কে আসার পর হিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল। নাঈম আসেনি এখানে। বাসা থেকে তাড়াহুড়ো করে আসায় ফোনটাও আনা হয়নি তার। এখন কি করবে মেয়েটা? হিয়া মনঃক্ষুণ্ন হলো ভিষন। তার কপালে কোন কুফা লাগলো কে জানে! এসব অঘঠন তার সাথেই কেন হচ্ছে? হিয়া সারা পার্ক খুঁজলো নাঈমকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোথাও খুঁজে পেল না । অর্থাৎ নাঈম আসেনি। হিয়া পার্কে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। অনেকটা সময় কাটার পরও নাঈম এলো না। প্রায় বারোটার দিকে হিয়া মন খারাপ করে বাসার দিকে রওনা হলো। বিকেলেই তো তাকে নিতে আসবে। আর দেরি করলে চলবে না।
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৮
হিয়া পার্ক থেকে বেড়িয়ে রিক্সার জন্য দাঁড়ালো রাস্তায়। আজ তার সাথে সবকিছুই খারাপ হচ্ছে। অনেকটা সময় কাটার পরও রিক্সা পেল না মেয়েটা। হয়তো দুপুরের সময় বলে পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া জায়গাটা বেশ নির্জন। হিয়া যখন বিরক্ত হয়ে হাঁটা শুরু করলো ঠিক তখনই একটা রিক্সা এলো। রিক্সাটা দেখে হিয়া যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। অবশেষে সে বাড়ি ফিরতে পারবে। সে রিক্সায় চড়ে বসলো। এরপর রিক্সা চলতে শুরু করলো আপন গতিতে। অনেকটা পথ আসার পর হিয়া টের পেল, এটা তো তার বাড়ির রাস্তা নয়। রিক্সা তো অন্য রাস্তায় যাচ্ছে।
