লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৯ (২)
অহনা রহমান
সুখ প্রথমে ভালেভাবেই মধ্যবয়সী রিক্সা ওয়ালাকে বলল,
“আঙ্কেল কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? এটা তো আমারা বাসার রাস্তা নয়।”
রিক্সা ওয়ালা হিয়ার কথার জবাব দেয় না। বরং রিক্সার গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হিয়ার মাঝে। হিয়া ভয় পায়। কাঁদো কাঁদো হয়ে পরে।
“আ..আ..ঙ্কেল আ..আ..পনি র.রিক্সা থ..থা..মা..ন।”
রিক্সা ওয়ালা এবারেও হিয়ার কথা শোনে না। বরং আগের চেয়েও দ্রুত চালাতে শুরু করে রিক্সা। এইবারে হিয়া পুরোপুরি কেঁদে ফেললো। এই চলন্ত রিক্সা থেকে ঝাঁপ দিতেও তার ভয় করছে। হিয়া চিৎকার করতে শুরু করলো এবারে। রিক্সাওয়ালাকে বলতে লাগলো,
“রিক্সা থামান বলছি, ভালো হবে না কিন্তু।”
হিয়ার ননস্টপ কান্না আর চিৎকার শুনে রিক্সা ওয়ালা বোধহয় ঘাবড়ে গেল। হঠাৎ করেই সে রিক্সা ধীরে ধীরে চালাতে লাগলো। হিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“একটা সারের (স্যারের) আদেশ আছে। আপনারে নিয়া যাইতে কইছে। এইভাবে চিল্লায়েন না।”
হিয়া স্তব্ধ হয়ে কান্না থামায়। সাথে অবাকও হয় সে। কোন স্যার তাকে নিয়ে যেতে বলেছে? হিয়া ভাবলো মনে মনে, কি গ্যারান্টি আছে যে এই লোক মিথ্যা বলছে না? হিয়া বলল,
“আমি যাবো না কোথাও। আপনি প্লিজ রিক্সা থামান। আমি কিন্তু পুলিশে কল করবো।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
রিক্সাওয়ালা হিয়ার কথার জবাব দেয় না। সে রিক্সা থামায় ও না। নির্বিকার হয়ে তার কাজ করতে থাকে। পুনরায় সে রিকশার গতি বাড়িয়েছে। ওদিকে হিয়ার দম বন্ধ লাগছে। সে আরও কয়েকবার মধ্যবয়সী লোকটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হলো। লোকটি তার সাথে আর একটা কথাও বলল না। হিয়া দেখলো, আশেপাশে মানুষ তো দুর একটা কাকপক্ষী ও নেই৷ এখান থেকে ঝাপ দিলে তার ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না। যদি আহত হয়? এখানে তো কেউ নেই বাঁচানোর মতো। আহত হলে বরং তার পালানোর রাস্তা টাও বন্ধ হয়ে যাবে। হিয়ার হাত’পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ভয়ে মেয়েটা শিটিয়ে গেছে পুরো। মনে মনে দোয়া-কালাম পড়তে লাগলো মেয়েটা। এখন তার হাতে কিছুই নেই অপেক্ষা করা ছাড়া। কিভাবে এখান থেকে পালাবে সেটাই ভাববার বিষয় এখন। হিয়া আশেপাশে খুব খেয়াল করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। যদি কারো দেখা পাওয়া যায়। এমন সময় মেয়েটা দেখলো কিছু দুরেই একটা গাড়ি পার্ক করা। হিয়ার মনে আশার আলো দেখা দিলো৷ আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকলো সে যাতে ওখানে লোক থাকে। যার কাছ থেকে সাহায্য নিতে পারবে মেয়েটা।
কিছুক্ষনের মধ্যেই হিয়ারা সেই গাড়ির কাছে পৌঁছালো। হিয়া কিছু করার আগেই আশ্চর্যজনক ভাবে রিক্সাওয়ালা উক্ত গাড়ির কাছেই রিক্সা থামালো। এতে অবাকের বদলে চমকে যায় হিয়া। এখানে থামালো কেন? কে আছে গাড়িতে? এইভাবেই তো কিড ন্যাপ করা হয় মেয়েদের। হিয়া ভীত হয়। রিক্সা থামাতেই সে এক সেকেন্ড ও বসে থাকে না সেখানে। দ্রুত নেমে যায় সে। এবং কোনো কিছু না দেখেই যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলো সেদিকে দৌড়াতে থাকে। কয়েক কদম দৌঁড়ানোর পরই একটা পরিচিত ডাকে হিয়ার পা জোড়া থেমে যায়। অবাকের চরম সীমান্তে পৌঁছে পিছনে তাকায় সে। মুহুর্তেই চক্ষু কপালে ওঠে মেয়েটার। পিছনে নাফি দাঁড়িয়ে। নাফিই ডেকেছে হিয়াকে। নাফিকে এখন এই অবস্থায় কোন ভাবেই কল্পনা করেনি হিয়া। হিয়ার পুরো স্ট্যাচু হয়ে গেছে। তার সাথে আসলে কি হচ্ছে এটা কিছুতেই বুঝতে পারলো না মেয়েটা। হিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ফরমাল ড্রেসআপে থাকা নাফির দিকে। ওদিকে নাফি ততক্ষণে হিয়ার কাছাকাছি চলে এসেছে। নাফি হিয়ার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। আলতোভাবে দু’হাত রাখলো হিয়ার গালে। আদুরে স্বরে বলল,
“ভয় পেয়েছো? আমি আছি না? বিয়ের দিনই তো বললাম তোমার সকল কিছুর দায়িত্ব আমার। বিপদে আগলে রাখবো আমি! আমি থাকতে কোন বিপদ তোমাকে ছুঁতে পারবে মনেহয়?”
হিয়া নিজের মধ্যে নেই আপাতত। বলদা মেয়েটা কিছুই বুঝে না যেন৷ এখন নাফিকে দেখে সে অন্যমনস্ক হয়ে হিসেব মেলাচ্ছে। হিয়ার নীরাবতা দেখে হাসলো নাফি। সে খেয়াল করলো তাদের থেকে সামান্য দুরত্বে একটা কালো গাড়ি দাঁড় করানো হয়েছে। এখানের পরিবেশটা খানিকটা জঙ্গলের মতো। এইখানে এইভাবে গাড়ি দাঁড় করানোর কোনো মানে হয় না। তবে নাফি আপাতত এইসব দেখতে গেল না। মানুষ আজকাল, তিলকে তাল বানাতে সময় নেয় না। কিছু একটা ভেবে নাফি হিয়ার হাত ধরে নিয়ে গেল গাড়ির কাছে। নিজেই গাড়ির দরজা খুলে দিলো। সে হিয়াকে ডাকলো কয়েকবার। কিন্তু হিয়া তখনও মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে আছে নাফির দিকে। সে কি আর এসব শোনে? একপ্রকার বাধ্য হয়ে নাফি হিয়ার বাহু ধরে হালকা ঝাঁকি দিলো।
“এই যে মিসেস নাফি, নিজের মধ্যে এসেছেন?”
হিয়া হকচকালো। অপ্রস্তুত হয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো চারিদিকে। হিয়ার বেসামাল অবস্থা দেখে নাফি খুব হাসলো মনে মনে। মুখে বলল,
“গাড়িতে ওঠো তারপর সব বলছি।”
হিয়ার আর কি করার! রোবটের মতো সে উঠলো গাড়িতে। ড্রাইভিং সিটের পাশে। হিয়াকে বসিয়ে নাফি নিজে বসলো ড্রাইভিং সিটে। এরপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলল অজানার উদ্দেশ্যে।
কিছুক্ষণ কাটলো নীরাবতায়। হিয়া বেচারি অতিরিক্ত শক খেলে জ্ঞান হারায়। যেমন হারিয়েছিলো রাজের বিয়ের দিন। আর তার বিয়ের দিন। আজও এরকমই হতো। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন নিজেকে সামলে নিয়েছে হিয়া। এখন নাফির সঙ্গে কি বলবে সে? তার কি মনে নেই নাফি তাকে রিজেক্ট করেছিলো? যদিও এখন সে নাফির বউ তবুও তো এটা তার জন্য অপমানের। ভবিষ্যতে নাতি নাতনিদের সামনে যখন নাফি গল্প করবে এসব কথা, তখন হিয়ার মানসম্মান কোথায় যাবে? হিয়া জানালার দিকে মুখ দিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখতে লাগলো।
নাফি একটা ফাঁকা জায়গা দেখে গাড়ি থামালো। গাড়ি হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় হিয়া অবাক হলো বৈকি! তবুও সে নাকির দিকে ফিরে তাকালো না। বাধ্য হয়ে কথা শুরু করলো নাফি নিজেই।
“আমার কল মেসেজ কেন ইগনোর করছো মিসেস নাফি?”
অপরিচিত নামের ডাক শুনে থমকালো হিয়া। কি আশ্চর্য, এখন এটাই তার পরিচয়! হিয়া কোনমতে আওরালো,
“এমনি।”
“এমনি কেন?”
হিয়া তখনও অন্য দিকে তাকিয়ে। নাফির দিকে তাকাতে যে লজ্জা লাগছে তার।
“এমনিই।”
“কি এমনি?”
হিয়া ফের বলল,
“এমনিই।”
নাফি তপ্ত শ্বাস ফেললো। এই মেয়ের মাথা নিশ্চিত খারাপ আছে। নাফি নিজের সিটবেল্ট খুলে একটু এগিয়ে গেল হিয়ার দিকে। নাফির নড়াচড়া বুঝতে পারলো সে। ঘুরে দেখতে গেল ব্যাপারটা। সাথেসাথেই দুজনের দুরত্ব কমে আসে। হিয়ার নাক ছুঁয়ে যায় নাফির নাকে। বিনিময় হয় দু’জনের মোহিত দৃষ্টি। কেউ কিছু বলে না, কোনো টু শব্দ পর্যন্ত হয় না। শুধু চোখে চোখে বিনিময় হয় না বলা কিছু কথা। এভাবেই কাটে কিয়ৎক্ষন।
“বেশি ভয় পেয়েছো?”
হঠাৎ নাফির কথাতে চকিতে ওঠে হিয়া৷ ঘাড় নেড়ে জানায় ভয় পায়নি। নাফি হিয়ার গাল স্পর্ষ করে আবার। যে স্পর্শে কেঁপে ওঠে হিয়া। এর পরপরই নাফি বলে ওঠে,
“স্যরি প্রিয়তমা। আমি জানি তুমি ভয় পেয়েছো। জাস্ট একটা সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। বুঝতেই পারিনি এতটা ভয় পাবে।”
হিয়া কোনো উত্তর দেয় না। দৃষ্টি নিচে নামিয়ে রাখে।
“তুমি কল রিসিভ করছো না বিধায় আজকে আম্মুকে কল করেছিলাম। তোমার খবর জানতে চাইলাম। বললো, তুমি তোমার ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গেছো। তখনই ভাবলাম একটু দেখা করা যাক। আমি এসে দেখলাম তুমি একা একা বসে আছো। আর তখনই এই পরিকল্পনা করলাম।”
হিয়ার মনে পরে আসার সময়ে মাকে বলে এসেছিলো কোথায় দেখা করবে তারা। মা নিশ্চয়ই নাফিকে বলে দিয়েছে। হিয়া কিছু বলে না। নাফির স্পর্শে সে লজ্জা পাচ্ছে। যার হিয়ার মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে। নাফি এই ব্যাপারটাই ইনজয় করছে আপাতত। হিয়ার চুপ থাকা দেখে নাফি বুঝলো, মেয়েটা আজকে নিশ্চয়ই চুপচাপ থাকার ব্রত করে এসেছে। নাহলে হ্যাঁ হু কিছু তো একটা বলবে। নাফি এবারেও ব্যর্থ শ্বাস ফেললো। গাড়ি স্টার্ট করলো ফের। এইবার গাড়ি সোজা গিয়ে থামলো হিয়াদের বাড়ির সামনে। বাড়ির সামনে আসতে পেরে হিয়া তো মহা খুশি। নাফু গাড়ি থামাতেই হিয়া নামতে উদ্ধত হলো। এতে বাঁধ সাধলো নাফি।
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৯
“এতো ব্যস্ত কেন মিসেস?”
আর কিছু না বলে ব্যাক সিট থেকে কয়েকটি প্যাকেট আনলো সে। কয়েকটি বলতে বেশ কয়েকটি। হিয়া এতক্ষণ খেয়াল করেনি এসব। নাফি কোন কথা না বলে হিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলো সে’সব। ফের হিয়ার অনেকটা কাছাকাছি এসে বলল,
“এখানে যা যা আছে তাই দিয়ে সাজবে আজ। আমি খুব শীঘ্রই আসছি।”

Plz next part taratari den