লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২২ (২)
অহনা রহমান
বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য সাজুগুজু করছিলো হিয়া। হঠাৎ নাফি তার পেছনে এসে দাঁড়ালো। আলতো হাতে ছুঁয়ে দিলো হিয়ার ঘাড়ের কাছটা। হঠাৎ এহেন স্পর্শে কেঁপে উঠলো হিয়া। শিউরে উঠলো তার সমস্ত শরীর। অচেনা উত্তেজনায় কাঁপতে লাগলো তনুমন। সামনে আয়নায় দেখতে পেল নাফি তারই লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে আছে৷ এটা দেখে যেন হিয়ার লজ্জা শতগুন বেড়ে গেল। রমনী মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে ফেললো দ্রুত। দুহাতে খামচে ধরলো, পরনের গোলাপি শাড়িটা। হিয়ার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। যেকোনো সময় পরে যাবে ধপাস করে। নাফি আয়নায় স্পষ্ট দেখতে পারছে হিয়ার ভাবমূর্তি। হিয়ার লজ্জা, হিয়ার ভয়। নাফি হিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এখনই যদি কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়, এরপরে কি করবে তুমি? নাহ! বুঝেছি! এ জীবনে আর বউয়ের ভালোবাসা পাওয়া হবে না আমার।”
এটুকু কথা বলায় নাফির ঠোঁট বারবার ছুঁয়েছে হিয়ার কান। উষ্ণ শিহরণে হিয়া হাশফাশ করতে লাগলো। এটা কেমন অনুভুতি? হিয়া জানে না। মেয়েটির সমস্ত শরীর হালকা হয়ে এলো। আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। ঠিক তখনই নাফি হিয়ার পিঠ ছুঁয়ে দিলো। ব্লাউজের ফিতা টা বেঁধে দিলো খুব যতনে। মূলত ব্লাউজের ফিতা বাঁধার জন্যই এতো কাহিনি। ফিতা বাঁধা হয়ে গেলেই নাফি সরে গেল হিয়ার কাছ থেকে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সাদা ট্রাউজার ও কালো টিশার্ট পড়া সে। নাফি হিয়ার কাছে থেকে সরে গিয়ে নির্দিষ্ট দুরত্বে পাশে দাঁড়ালো। গলা খাঁকারি দিয়ে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো সে৷ হিয়ার সবকিছুই এখন উল্টাপাল্টা ছন্নছাড়া। মনটা তো আরও আগে। এজন্য নাফির উদ্দেশ্য খুব একটা সফল হলো না৷ তাই নাফি আবারও সেই একই অবস্থানে ফিরে গেল। অর্থাৎ হিয়ার পেছনে। তবে সে এইবার আর হিয়াকে স্পর্শ করলো না। শুধু গিয়ে দাঁড়ালো। হিয়াও ততক্ষণে নিজেকে অনেকটাই স্বাভাবিক করে নিয়েছে। তবে সে মাথা তোলেনি এখনো। ঠিক তখনই নাফি বলে উঠলো,
“প্রিয় জীবনসঙ্গিনী, তুমি শুধু কারো ভালোবাসায় সংজ্ঞায়িত নও। তুমি নিজেই একটি সম্পূর্ণ বিশ্ব, নিজের আলোয় উজ্জ্বল। তোমার যে ক্ষমতা আছে ক্ষমা করার! সেটা অনেক মানুষের মধ্যে থাকে না। তুমি যে জটিলতা মেনে নিলে, শান্তিতে থাকতে শিখলে, এটা তোমার অসাধারণ মনের শক্তি। তুমি দুর্বল নও, তুমি ভীষণ শক্তিশালী হিয়া।
আমি যখন তোমাকে বেছে নিয়েছি, তখন আমি শুধু তোমার সেই দিনগুলোকে দেখিনি। দেখেছি একটি সাহসী নারীকে, যে আঘাত পেয়েও মানুষকে ঘৃণা করতে শেখেনি। দেখেছি একটি হৃদয়কে, যে আবার বিশ্বাস করতে পারে। সেই হৃদয়টিকেই আমি ভালোবাসি হিয়া। ভিষন রকমের ভালোবাসি।”
নাফির বলা কথাগুলোর অর্থ হিয়া সাথেসাথেই ধরতে পারলো না। কেননা সে তো নাফিকে তার অতীতের বিষয়ে কিছুই জানায়নি। জানাতে পারেনি আরকি! তাহলে নাফি এগুলো কেন বলছে? নাফির কোনভাবেই জানার কথা নয় হিয়ার অতীত। তাহলে এসবের অর্থ কি? হিয়া চট করে তাকালো সামনে আয়নায় দিকে। নাফিও তাকিয়ে আছে, তাই দুজনের চোখে চোখ মিললো। হিয়া এবারে লজ্জা আড়ষ্টতা সব কাটিয়ে চেয়ে রইলো ওই চোখে। যে চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার প্রতি অগাধ ভালোবাসা। কিন্তু হিয়া তখনো সন্দিহান।
এখনো বেশি বেলা হয়নি। ওরা একটু আগেই এসেছে রুমে। এসে হিয়া ফ্রেশ হয়ে নতুন শাড়ি পরে তৈরি হচ্ছিল। আর নাফি আবারও শুয়ে ছিলো৷ কিন্তু শাড়ি পরে চুলটা বাঁধার সময়ে হঠাৎ এসে উদয় হয় নাফি। আর তারপর থেকে তো এসব…..!
হিয়া বিচলিত হয়ে গেছে। নাফি বুঝতে পারছে তার কথার অর্থ হিয়া বোঝেনি। এজন্য নাফি ফের বলল,
“বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারন নেই প্রিয়তমা। তোমার এতো চিন্তারও কিছু নেই। তুমি আমার স্ত্রী এটাই বড় সত্য এখন। তাছাড়া আর সব ভুলে যাও।”
হিয়াকে আর কিছু বলতে না দিয়ে নাফি একটা চেয়ার টেনে আনলো। আস্তেধীরে নাফি চেয়ারে বসিয়ে দেয় হিয়াকে। নিজে হাঁটু গেঁড়ে বসলো হিয়ার সামনে৷ ডেসিন টেবিলের উপর থেকে, কাল রাতের দেওয়া সেই সোনার নুপুর জোড়া হাতে নিলো। হিয়াকে অবাক করে দিয়ে নাফি নিজে হাতে নুপুর জোড়া পরিয়ে দিলো হিয়াকে। হিয়া তো হতবাক। ও হা করে নাফির কাজকর্ম দেখে যাচ্ছে। একটা কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছে না। সবকিছু কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে ঘটে যাচ্ছে তার সাথে৷ আর যা ঘটছে তা হিয়া থামাতেও পারছে না, কিছু বলতেও পারছে না। শুধু মেনে নিতে হচ্ছে।
হিয়া স্বভাবতই লক্ষি মেয়ে। মায়ের আদুরে মেয়ে হলেও সবসময় মাকে সংসারের কাজে সাহায্য করেছে। এটা বলা যায় হিয়ার অভ্যাস। স্কুল কলেজে পড়াকালীন সময়ে ছুটির দিনে ঘুমাতো সে। বাদবাকি সবসময় ভোরে উঠতো। আর মায়ের কাজে সাহায্য করতো৷ এজন্য কাজে সাহায্য করার অভিজ্ঞতা তার বেশ। আর সেই অভিজ্ঞতারই পরীক্ষা দিলো আজ৷ রুম থেকে বের হয়ে দেখলো নাসিমা রান্নাঘরে থালাবাটি পরিষ্কার করছে। গৃহকর্মী রাবেয়া অসুস্থ থাকায় আসবে না। তাই নাসিমা একাই সবকিছু করছেন।
হিয়া ভাবলো, বাড়িতে তো কোনো মেহমান নেই, তাই ওনার কাজে হেল্প করাই যায়। নাসিমার সাথে তার আগে থেকেই সম্পর্ক ভালো হওয়ায়, ভালোই মিলবে দু-জনের। তবুও কোথাও না কোথাও হিয়ার একটা জড়তা কাজ করছে। তার কারন সম্পর্কের পরিবর্তন। হিয়া গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল নাসিমার কাছে। নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়ালো নাসিমার পাশে। নতজানু হয়ে বলল,
“আম্মু আমি হেল্প করি?”
প্রথম দফাতে নাসিমা চমকে গেলেন হিয়াকে দেখে। নতুন বউ এখন উঠেছে কেন? তিনি ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,
“এই না না! তুমি এখানে এসেছো কেন মা? যাও রুমে যাও।”
হিয়া বলল,
“আমি পারবো আম্মু। আপনি বলুন কি করতে হবে।”
নাসিমা মৃদু হেঁসে বললেন,
“পাগলী মেয়ে এখন রুমে যাও। কিচ্ছু করতে হবে না তোমার। এই সংসার তোমার! কিছুদিন পর এমনিতেই তোমাকে সামলাতে হবে সব। আমি আর কতদিনই বা বাঁচবো বলো? তখন নাহয় কাজ করো। এখন যাও।”
হিয়া আর কিই’বা বলবে! সে কোনো কাজ না করলেও সেখান থেকে প্রস্থান করলো না। সেখানে দাঁড়িয়ে রইলো ঠাঁই। নাসিমা আরও কয়েকবার বললেন হিয়াকে যেতে৷ কিন্তু হিয়া গেল না। সময় গড়ালো এভাবে। হিয়া অল্পস্বল্প কিছু করলো নাসিমার সঙ্গে। সকাল তখন আটটা! নাসিমা সকল রান্নাবান্না করে দিয়েছে আর হিয়া সবকিছু টেবিলে নিলো।
নাফি এসে বসেছে টেবিলে। তুবাও এসে বসলো। নাসিমা তখন হিয়াকে তাড়া দিলেন নাফির পাশে গিয়ে বসতে৷ হিয়া গিয়ে বসলো নাফির পাশে। ঠিক তখনই এলো রাজযোটক রাজ ও রুহি। নাসিমা ওদের হঠাৎ দেখে থতমত খেয়ে গেলেন৷ বিস্ময়ের সাথে বললেন,
“কিরে তোরা কখন এলি? আমি তো কিছুই জানি না।”
রুহিকে বললেন,
“বউমা কখন এলে? আমাকে তো জানালেও না।”
রুহি গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আপনিও তো আমাদের থেকে কতকিছু লুকিয়েছেন আম্মু। ইভেন, শুধু আপনি না সকলেই আমাদের ঠকিয়েছেন।”
রাজ সহমত প্রকাশ করে বলল,
“জানি না আমি কার কেমন ভাই, বা কার কেমন সন্তান। এতোকিছু হয়ে গেল অথচ আমরা জানতেই পারলাম না।”
নাফি ওদের কথা পাত্তা না দিয়ে হিয়ার প্লেটে খাবার তুলে দিলো। নিজেও প্লেটে খাবার তুলে নিলো। খেতে শুরু করলো নাফি৷ নাসিমা বেগম উত্তর খুঁজতে লাগলেন। কি বলবেন রাজকে? তিনি এখন বুঝতে পারছেন নাফির কথায় এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া তার মোটেও উচিৎ হয়নি৷ শুধুমাত্র সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য, ওদের কাছ থেকে এতো বড় কথা লুকানো তো একদমই উচিৎ হয়নি৷ রাজ ও রুহির অভিমান করা একদমই স্বাভাবিক। ঠিক তখনই তুবা বলল,
“আরে রুহি আপা, কখন এলে? রাগ করো না, তোমাদের জানানো হয়নি সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। সবাই ভেবেছে তোমাদেরকে চমকে দেবে বুঝছো। রাগ করো না। তুমি খুশি হওনি?”
রুহি রাগী চোখে তাকালো তুবার দিকে। তুবা বুঝলো না রুহির রাগের কারন। সে ঠোঁট ভেঙিয়ে খাওয়ায় মন দিলো। নাসিমা ওদেরকে বললেন,
“আয় খেতে বোস বাবা। তোকে সব বলছি আমি।”
রুহি বা রাজ কেউই গ্রাহ্য করলো না নাসিমার কথা। নিজেরাই এসে বসলো টেবিলে। রাজ বসলো হিয়ার মুখোমুখি। ও বারবার তাকাতে থাকল হিয়ার দিকে। আজ ও হিয়ার অন্য রকম সৌন্দর্য দেখছে। এতো সুন্দর মেয়েটা? কই কখনো তো চোখে পরেনি তার। ওদিকে রুহি খেয়াল করছে রাজের অস্থিরতা। রাগে গা পিত্তি জ্বলে উঠলো তার। হিংসায় জ্বলে পুড়ে যেতে লাগলো রুহি।
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ২২
নাফি খাওয়ার সময় বারবার এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে হিয়ার দিকে। কখনো কখনো তো গালে তুলেও খাইয়ে দিচ্ছে। ব্যাপারটা রাজ রুহির কাটা গায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো হয়ে গেছে। ওরা দুজন না পারছে কিছু বলতে আর না পারছে সহ্য করতে। আড়চোখে গিলে খেতে লাগলো দুজন নবদম্পতিকে৷
