Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ৬

শিউলি ফুল পর্ব ৬

শিউলি ফুল পর্ব ৬
তাজরীন ফাতিহা

বিকেল নাগাদ হামিদের ছোট বোন হালিমা এল। কোলে দুই বছরের ছেলে। স্বামী সাথে আসেনি। চোখ মুখ অস্বাভাবিক রকম ফুলো আর কালো। মনে হয় কতরাত যেন ঘুমায় না সে। চেহারায় বিধুর রজনীর ন্যায় দুঃখ কষ্টরা ছিটকে বেরোতে চাইছে। বোরকা খুলে খোলা উঠোনের মাঝে পিঁড়ি পেতে বসল। ছেলেকে হেলেনা পারভীনের কাছে দিয়ে এসেছে। শিউলি মেয়েকে ঘুম পাড়িয়েছে একটু আগেই। তাই তার কোনো টুশব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা। ননদের জন্য চা বিস্কুট ট্রেতে সাজিয়ে উঠোনে এল।

“মন কি ভালা নাই তোমার?”
হালিমা চোখের পানি আড়াল করে ফ্যাকাশে হাসল,
“না ঠিক আছি ভাবি। আপনের খবর কন? আমার ভাতিজি কই?”
“ঘুমায়। আমি আল্লাহর রহমতে খারাপ নাই। তোমার চেহারা এমন দেহায় ক্যান?”
“এমনি। ভাইজান কহন আইব?”
“আইব সন্ধ্যার পরে। ক্যান কুনু দরকার?”
হালিমা ইতস্ততবোধ করতে লাগল।
“না, ভাইজান আহুক।” অস্তমিত কণ্ঠ।
শিউলি চায়ের কাপ এগিয়ে দিতেই হালিমা সেটা সরিয়ে বলল,
“ভাবি কয়ডা ভাত হইব? হেই দুফুরে ঘরেত্তে বাইর হইছি পোলাডা আর আমার পেডে দানাপানি কিছুই পড়ে নাই।” করুণ স্বর।

শিউলির বুক খামচে ধরল কে যেন? মেয়েটাকে দেখলে তার এত খারাপ লাগে। তার থেকে বছর তিনেকের ছোট। শিউলি এবাড়িতে বউ হয়ে আসার পরে বাকি ননদদের না পেলেও এই ননদকে সে দুইবছর কাছে পেয়েছিল। মেয়েটা এত্ত মিশুক আর কাজে সাহায্য করত শিউলিকে। হালিমার বিয়ের বয়স সাড়ে তিন বছর। হামিদ দেখেশুনে ব্যবসায়িক ছেলের হাতে বোনকে তুলে দিয়েছিল। চৌহদ্দিপুর বাজারে কাপড়ের বিশাল ব্যবসা ছেলের বাপের। ছেলেও বংশপরম্পরায় কাপড়ের ব্যবসায় বসেছে। ছেলে দেখতে শুনতে খারাপ না। উঁচা ডাঙ্গি, গাত্রবর্ণ শ্যামলা। শিউলি দেখতো হালিমা একটা ছবি বালিশের তলায় রেখে কি লাজুক হাসি হাসত। বিয়ের কথা শুনেই যেন সেই ছেলেকে মন প্রাণ উজাড় করে দিয়েছিল। বিয়ে হওয়ার পরে মেয়েটা বাবার বাড়ি এই নিয়ে মোটে চারবার এলো। বিয়ের পরে ফিরতি নাইওরে একবার। জামাই অ্যাপায়নে একবার আরেকবার সোবহান পেটে থাকতে আর আজ একবার।

শিউলি ভাত তরকারি বেড়ে হালিমাকে ডাকল। হালিমা ছেলেকে কোলে নিয়ে পাকঘরের দাওয়ার উপরে বিছানো হোগলায় বসল। আজকে শোল মাছের ঝোল, লাউ শাক ভাজি, লইট্যা শুঁটকি ভুনা করা হয়েছিল। হালিমা পাতে হাত দিয়ে গপাগপ খেয়েই চলল। সোবহান মায়ের দিকে চেয়ে আছে গোলগোল চোখে। বাচ্চাটার চোখ কেমন মায়ায় ভরা। চোখ দুটো সবসময় পানিতে টলটল করে। এই বুঝি কেঁদে ফেলবে কিন্তু আদতে কাঁদে না। শিউলির মনে হয় বাচ্চাটা সম্পূর্ণ বাপের আদল পেলেও চোখদুটো হালিমার পেয়েছে। হালিমার চোখ দুটোও এমন টলটলে ভাসা ভাসা। হালিমা নিজে অল্প উদরপূর্তি করে ছেলের দিকে লোকমা বাড়িয়ে ধরল। বাচ্চাটা মুখ ঘুরিয়ে নিল। হালিমা শিউলিকে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে লজ্জিত হাসি হাসল।
“আসলে পেডে মেলা খিদা লাগছিল তো তাই এমন কইরা খাইছি। সোবহান আসার আগে দুধভাত খাইছিল।”

কৈফিয়ত দেয়ার সামান্য চেষ্টা মাত্র। ছেলেকে না খাইয়ে কোনো মা এভাবে খেতে পারে কিনা। শিউলি এসব ভাবছিল না মোটেও। মেয়েটাকে দেখে মনে হয় কত বছরের যেন অভুক্ত। তার বুকটা ক্ষণে ক্ষণে কেউ খামচে ধরছে। আল্লাহ্ তাকে কষ্ট দিলেও কোনোদিন ভাতের কষ্ট দেয়নি। হামিদ কোনোদিন তাকে খাবারের খোটা দেয়নি। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর চোখের ভাষা বোঝা কি এত কষ্টের? মেয়ের কান্নার আওয়াজ পেতেই পাকঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে ঘরে গেল। হালিমা ভাবি বেরিয়ে যেতেই চোখের পানি মুছে আবারও গপাগপ ভাত গিলতে লাগল। অসম্ভব ক্ষিদে তার। ছেলেকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে শোল মাছের ঝোল নিল। আবারও বড় বড় লোকমা তুলে মুখে পুড়তে লাগল। সোবহানের দিকে কয়েক লোকমা বাড়িয়ে ধরলেও বাচ্চাটা মুখ সরিয়ে নিল। কয়েকবার এমন করায় শেষে হালিমা রাগে মুখ চেপে খাওয়াতে চাইল। সোবহান খেলোই না, মাথা ঘুরিয়ে ফেলল। বাচ্চাটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কেঁদে উঠল।

“আব্বা যাব, আব্বা যাব।” দুহাত বাড়িয়ে।
হালিমা খেয়ে থালায় হাত ধুয়ে পানি পান করল। ওড়নায় হাত মুছে থালা ধুতে কলপাড়ে গেল। সোবহান মাকে পাত্তা দিতে না দেখে আবারও গলা ছেড়ে কাঁদতে লাগল। শিউলি মেয়েকে দুধ খাওয়াচ্ছিল। সোবহানের কান্না শুনে তাকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাচ্চাটা পায়ের পিছু পিছু ওড়নার কোণা ধরে শুধু বলে যাচ্ছে,
“আব্বা যাব, আব্বা যাব।”
শিউলি দেখল হালিমা নির্লিপ্ত। একমনে থালা ধুয়ে পাকঘরে রেখে এল। সব ভাত তরকারি ঢেকে রাখল। উঠোনে মেলে দেয়া শুকনো গামছায় হাত মুছে শিউলির দিকে এগিয়ে এল। ভাইঝিকে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে ঘুমাতে দেখে কোলে নিতে চাইল। শিউলি সাবধানে কোলে দিল। ফুপির কোলে যেতেই বাচ্চাটা নড়ে ওঠে চোখ মেলে আবারও চোখ বুজল। হালিমা ভাইঝিকে ছোট্ট ছোট্ট আদরে ভরিয়ে দিতে লাগল। কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। প্রাণ ভরে বাচ্চাটার গায়ের ঘ্রাণ টানল।
“ভাবি গায়ের গন্ধডা কি সুন্দর! এক্কেরে আমার ভাইজানের লাহান। ভাইজান এই ময়না পাখিরে হারাদিন আদর করে তাইনা?”

শিউলির হাসিমুখ নিমিষেই চুপসে গেল। হামিদ যদি সত্যি মেয়েকে এমন আদর করতো শিউলির তো তাহলে আর কোনো দুঃখ থাকত না। শাশুড়ি তো তার মেয়ের দিকে তাকায়ও না। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিরে। ভাইঝির যেন ঘুম না ভাঙে এজন্য ফিসফিস কণ্ঠে শুধাল,
“এই ময়না পাখিরে নাম কি রাখছ ভাবি?”
শিউলি অন্যমনস্ক গলায় জবাব দিল,
“রাখছি মোসাম্মৎ হামিদা খানম। তোমার ভাইয়ের নামের লগে মিলাইয়া। তোমার ভাইরে কইছিলাম হেয় কুনু কতা কয়নাই।”
“নামডা ভারী মিষ্টি তো! আকীকা করছ?”
“না, তোমার ভাইজানের হাতে টান এহন। ঋণের বোঝায় রাইতে ঘুমায় না। টেকার লাইগ্গা হন্যে হইয়া ঘুরে।” উদাস গলা।
হালিমা নিজেও মুষড়ে গেল। চেহারায় নেমে এল অন্ধকার। ভাইয়ের এই টানাপোড়নের সংসারে খালি হাতে ছেলেকে নিয়ে উঠেছে। ভাইঝির জন্য কিছু আনতেও পারেনি সে। কষ্টে বুক ভারী হয় শুধু। বিষণ্ন গলায় শুধাল,

“আম্মায় হামিদারে আদর করেনা ভাবি?”
লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে,
“আর আদর, মাইয়ার পাও খান অচল দেইখা ফিইরাও চায় না কেউ। আমার এইটুকু মাইয়া কি দোষ করছিল? বাপ, দাদির আদর সোহাগ থেইকা এই মাসুম বাইচ্চাডা ক্যান বঞ্চিত হইতাছে হালিমা কইতে পারো?” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ।
হালিমা ভাইঝির দিকে বুক ভার করা নজরে চায়। এই সুন্দর বাচ্চাটাকে সবাই অবহেলা কীভাবে করতে পারে? হালিমার তো মন চাচ্ছে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে। ভাইজান কবে থেকে এমন পাষাণ হলো তার বুঝে আসেনা। ভাইজান তো এমন না। হালিমার এখনো মনে আছে, হেলেনা পারভীন অসুস্থ হয়ে যেবার বিছানায় পড়লেন সেবার ছোট্ট হালিমাকে কোলে নিয়ে খাওয়ানো, গোসল করানো, ঘুম পাড়ানো, পুস্তক পড়ানো সবই ভাইজান করতো। তার মেঝ আর সেঝ বোনের দেখভালও ভাইজান নিজ হাতে করেছে। সেই ভাইজানের নিজের অংশের প্রতি অবহেলার আসল কারণ কি হালিমা ভেবে পায়না। তাদের তিনবোনের প্রিয় বড় ভাইজান নিজের দুঃখ খুব ভালোভাবেই আড়াল করতে জানে, বুকের ভেতর পুষে রাখতে জানে। কাকপক্ষীও সেই দুঃখ, কষ্টের হদিশ জানতে পারেনা।
সোবহান এতক্ষণ আস্তে আস্তে মায়ের ওড়না ধরে কাঁদছিল। কাউকে পাত্তা দিতে না দেখে আর মাকে কথায় ব্যস্ত দেখে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল,

“আব্বা যাব, আব্বা যাব।”
সোবহানের চিৎকারে হামিদা ঘুমের ভেতর আঁতকে উঠে কেঁদে ফেলল। শিউলি ঝটপট মেয়েকে কোলে নিতেই হালিমা হাত খালি হতেই ছেলের পিঠে দুমদাম কয়েকটা মারল।
“তোর আব্বা যাব আইজকা ছুটাইতাছি, বেয়াদবের বাচ্ছা। গলা পাড়াইয়া একদম ছিইড়া ফালামু। মাইয়াডার ঘুমডা ভাইঙ্গা ফালাইছে অজাতের বাচ্ছায়। আওয়ার পড়েত্তে এক দণ্ড শান্তি দেয় নাই। বাপটার মতো হইছে। আমার শান্তি এডির হজম হয়না। বিষ রক্ত কোনহানের।”
শিউলি মেয়েকে কোলে নিয়েই হালিমাকে একহাতে ধরে রেখেছে। সোবহান পিঠে দুমদাম কিল খেয়ে কান্না করতে করতে দৌড় দিয়ে নানুর ঘরে ঢুকেছে। শিউলির সেই মুহূর্তে বাচ্চাটাকে এত আদর করতে মন চাইল। প্যান্ট শার্ট পরিয়ে বাবু সাহেব বানিয়ে এনেছে হালিমা এটাকে। গুলুমুলু শরীর নাড়িয়ে যখন দৌড়াচ্ছিল পুরো হাঁসের পিছু পিছু ঘোরা ছানাদের মতো লাগছিল। ছানাই তো হালিমার ছানা। শিউলি নিজের কোলে শায়িত পিটপিট চোখ খুলে রাখা মেয়ের দিকে চেয়ে বলল,
“আর এইডা আমার ছানা।”

হেলেনা পারভীনের হাত ধরে উঠোনে এনেছে সোবহান। বুঝাই যাচ্ছে কড়া অভিযোগ জানানো হয়েছে। হেলেনা পারভীন হালিমার দিকে এগিয়ে এসে চোখ রাঙিয়ে চাইল।
“তুই আমার নাতির গায়ে হাত উডাইছোস ক্যান? হাত এক্কেরে ভাইঙ্গা দিমু। বেশি মাতবর হইছস? আমার নাতির গায়ে হাত উডাস কত্তবড় কলিজা তোর?”
“ওরে আরও কয়ডা দেয়ার দরকার আছিল। এই বয়সে বিষবুদ্ধি নিয়া চলে। নানির কাছে নালিশ দেয়া সারা। তোরে হাতের কাছে পাইলে একদম ছেইচ্চা ফালামু।” ছেলের দিকে চোখ কিড়মিড় করে চেয়ে।
সোবহান মায়ের চোখ রাঙানিতে ভয়ে দাদির আঁচলের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফেলল। হেলেনা পারভীন নাতিকে এক হাতে আগলে ধরলেন।
“তোরে কিন্তুক পাড়াইয়া মাইরা ফালামু হালিমা। আমার সামনে দাঁড়াইয়া তুই আমার নাতিরে চোখ রাঙ্গাস!”

“আরও রাঙ্গামু, বেয়াদবের বাচ্ছা একটা।” বলে আবারও চোখ রাঙালো।
“ওর বাপে হুনলে তোরে কোরবান দিয়া হালাইব কইলাম হালিমা।” সতর্ক কণ্ঠ।
এ পর্যায়ে হালিমা ধুপধাপ পা ফেলে ঘরে চলে গেল। লোকটা আসুক তাকে কুরবানি করতে এবার হালিমাই নিজেকে কুরবানী করে ফেলবে। শিউলি মেয়েকে বুকে আগলে উঠোনেই দাঁড়িয়ে রইল। হেলেনা পারভীন তার দিকে চেয়ে ক্যাটক্যাটে গলায় বলল,
“নাতিডারে যহন মারে তুই তহন দাঁড়ায় দাঁড়ায় তামশা দেখছস? মাইরা পিডডা এক্কেরে ফুলাইয়া ফালাইছে। একেকটা বিনাশিনি আনছি ঘরে। এমনে বলে কোনো পাষাণও মারে।”
বলেই সোবহানকে কোলে নিল। সোবহান নানির কোলে উঠে আবার শুধরে দিল,
“চুদু পিতে না, পাচায়ও থাস থাস কলি মাচ্ছে।” পিছনে হাত দিয়ে।
হেলেনা পারভীন নাতিকে আদুরে আদুরে কথা বলে আদর করে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। শিউলির এই মুহূর্তটা এতো ভালো লাগল! নিজের মেয়ের দিকে চেয়ে এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে আসমানের দিকে চাইল।
“আল্লাহ! আমার মাইয়া তো কুনুদিন নানির আদর পাইতো না, তুমি ওরে দাদির আদর থেইকাও বঞ্চিত কইরো না।”

মাগরিব পড়ে তসবিহ গুণছে হেলেনা পারভীন। হালিমা নামাজ পড়ে মায়ের ঘরে এল। সোবহান বিছানায় মুখ হা করে ঘুমাচ্ছে। পুরো বাপের মতো ঘুমায় ছেলেটা। লোকটার ছায়া পিছু ছাড়ছে না। হালিমা ছেলের গায়ে কাঁথা টেনে দিল। এই সময় মশার উৎপাত শুরু হয়। হেলেনা পারভীন তসবিহ গুণে হাত উঠিয়ে দোয়া করে জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে চৌকিতে এসে বসল। হালিমা মায়ের কোলে মাথা রেখে চুল টেনে দিতে বলল। হেলেনা পারভীন মেয়ের চুল টেনে দিয়ে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলেন।
“কী দোয়া করলা আম্মা?”
“আল্লাহরে কইলাম তোর মাতাডা জানি ঠান্ডা কইরা দেয়। স্বামী, সন্তান লইয়া ভালা থাক।”
হালিমা চোখ বুজে বলল,

“নামাজের পরে কী দোয়া করলা?”
“করছি তোর ভাইজানের লাইগা। পোলাডার চিন্তা যেন আল্লাহ কমায় দেয়। তোগো তিন বইনের লাইগাও করছি। স্বামী, সন্তান লইয়া যেন ভালা থাকতে পারোস।”
“আর তোমার আরেকটা মাইয়া আর নাতিনের লাইগা দোয়া করো নাই?”
“আমার তো তিনডাই মাইয়া। আরেকটা কেডা আবার?”
“ভাবি তোমার মাইয়া না? তোমার পোলার বউ আর নাতিন তোমার পোলার মাইয়া।”
হেলেনা পারভীন মুখ থমথমে করে ফেললেন। কথাটা এড়িয়ে যেতে নিলেই হালিমা উঠে বসল। নিজের পরনের থ্রিপিসের কুনুই গুটিয়ে কালো কালসিটে দাগটা দেখিয়ে জানতে চাইল,
“কইতে পারবা এই দাগ কেমনে হইছে?”
হেলেনা বেগম অবাক হয়ে চাইলেন।
“শাউড়ির দেয়া তোফা। পিডে একবার খুন্তি দিয়া মারছিল রান্ধনে লবণ বেশি হইছিল দেইখা। আর কথায় কথায় গালাগাল তো আছেই। ননাসেরা সংসারে নাক গলায়, মায়ের কানে বিষ ঢালে। হেরপর শুরু হয় আরও অশান্তি।”
“তাই বইলা এমন জানোয়ারের মতো কেডা মারে? তোর জামাই কিছু কয়না?”
“কী কইব? মায়ের কতা হুইনা উল্টা আমারে বকাবাদ্য করে, সব আমার দোষ। মানাইয়া গুছাইয়া চলতে না পারলে সোজা রাস্তা মাপতে কইছে। আমিও এবার সোজা রাস্তা মাপলাম। মাইর খাওয়ার লাইগা বিয়া বইনাই।” শক্ত কণ্ঠ।

“এমন কতা কইতে হয়না। বিয়া হওয়ার পরে স্বামী সংসারই সব। হামিদরে কইয়া তোর জামাইরে ডাকামুনি।”
“ডাকাইলেও আমি যামু না। এত হস্তা না আমি।”
“তোর জিদ কুনুদিন কমতো না?”
“ঐ কতা বাদ দাও। আমার তো তুমি আছ, আইয়া দুঃখের কতা কইতে পারি। আর ভাবি? ভাবি হের দুঃখের কথা কারে কইব আম্মা? ভাবির মা নাই দেইখা যা ইচ্ছা তাই করতে পারো।”
হেলেনা পারভীন মুখ ঘুরিয়ে বললেন,
“তোর ভাবিরে কুনুদিন আমি মারছি জিগাইস তো।”
“না মারো বকাবাদ্য তো কম করো না। হেরপর বাচ্ছাডারে কোলেও বলে নাও নাই। হের কষ্ট লাগেনা আম্মা? তোমার যদি এমন ল্যাংড়া বাচ্ছা হইতো তুমি কি তারে অবহেলা করতে পারতা? তোমার শাউড়ি এমন করলে তোমার কেমন লাগতো আম্মা?”

হেলেনা পারভীন মুখ শক্ত করে বললেন,
“আওয়ার পরেই তোর কানে সব ঢুকায় দিছে? ঘর সংসারের সব ধ্বংস করব এই ছেমড়ি। আওয়ার লগে লগে ননদের কানে শাশুড়ির নামে বিষ ঢালা শ্যাষ। এমনে এমনে কই অলক্ষ্মী?”
“কতা ঘুরাইও না আম্মা। ভাবি আমারে কিছুই কয় নাই। আইজকা বিকালে উডানে খাড়াইয়া ভাবিরে কী কী কইছ সব হুনছি। তাই কতা ঘুরানের চেষ্টা কইরো না। যেডা জিগাইছি হেইডা কও?”
“ওর মাইয়ারে কোলে নেইনা রাগে, কষ্টে। ওরে কতবার মানা করছিলাম রাইতে হামিদরে ছাড়া কোথাও বাইর হইবি না। হেই ছেমড়ি আমার কতা অমান্য কইরা বাইর হইয়া এহন বাচ্ছাডারে পঙ্গু বানাইছে। তার উপ্রে বংশের প্রদীপের আশা করছিলাম, হইছে যাইয়া মাইয়া। কার রাগ উডবো না ক?”
“হুদা ভাবির মাইয়া? ভাইজানের কিছু না? আর বাচ্ছা মাইয়া না পোলা হইব হেইডা কি ভাবির হাতে আম্মা? আল্লাহ দিছে এহানে ভাবির কী দোষ?”
“হইছে রাখ তোর এইসব নীতি কতা। হুনতে মন চায়না।”
হালিমা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। এই শাশুড়ি জাতিদের বোঝানো আর না বোঝানো একই কথা।

হামিদ বাড়ি ফিরে বোনকে দেখে খুশি হলো। সোবহান মামাকে দেখেই কোলে উঠে গেছে। মামাকে দুইবার দেখেছে সে। হামিদ মিষ্টি, বাজারসদাই, খেলনা, চিপস নিয়ে গিয়েছিল হালিমার শ্বশুরবাড়ি। সেই সময় মামার সাথে তার ভালো সখ্যতা হয়েছিল। ছোট বাচ্চা এক দেখায় চিনে ফেলেছে। তাকে কেউ চিপস, খেলনা আর আদর দিলেই তাকে সে অনেকদিন মনে রাখে। হামিদ সোবহানকে বসিয়ে রেখে কলপাড়ে লাক্স সাবান দিয়ে ডলে ডলে গোসল করল আগে। শিউলি গামছা আর লুঙ্গি দিয়ে গেছে। হালিমা এসেছে দেখে সন্ধ্যায় হেলেনা পারভীন গোশত রান্না করতে বলেছেন। শিউলি পাশের বাড়ির ফ্রিজ থেকে এক পোটলা গোশত ছিল সেটা নিয়ে এসে রান্না করেছে।
দুই ভাই-বোন একসাথে খেতে বসেছে হোগলায়। সোবহান মামার কোলে বসা। একটু পর পর আদুরে গলায় মামাকে ডাকছে। হামিদ ভাগ্নেকে আদর করে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। বাচ্চাটা মাথা নাড়িয়ে মজা করে খাচ্ছে। ভাত খেতে খেতে হামিদের প্রশ্ন,

“সেকেন্দার আইলো না?”
“হের কাম আছে।” সংক্ষিপ্ত উত্তর।
“কী কাম এত? একদিনের লাইগা হউরবাড়ি আইব কাম শ্যাষ হয়না?” ভাত চিবোতে চিবোতে।
হালিমা থালায় ভাত নাড়াচ্ছে। খেতে পারছে না কেন যেন। শিউলি হাতপাখা ঘুরাতে ঘুরাতে সেটা লক্ষ্য করল।
“খাওনা ক্যান হালিমা?”
হালিমা চমকে উঠে অল্প খেল।

মাঝরাতে ঘুম ছুটতেই হামিদ লক্ষ্য করল তার পিঠের নিচে মেয়ের অচল পা’টা ঢুকে গেছে। বাচ্চাটার যেহেতু এই পায়ে কোনো অনুভূতি হয়না সেজন্য হামিদের ভারেও ব্যথা পায়নি। নিশ্চিন্তে বাপের খোলা পিঠের সঙ্গে ছোট্ট তুলতুলে শরীরটা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। হামিদ খুব সাবধানে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। শিউলি খাটের বেড়ার দিকে মুখ করে বেহুশের মতো ঘুমাচ্ছে। মেয়ে কেঁদে উঠলে আবার সঙ্গে সঙ্গে উঠে যাবে। কি সংযোগ মা, সন্তানের! মেয়েকে সন্তপর্নে মাঝে রাখতে গেলে দেখল কাঁথা ভেজা। ভাগ্যিস কাঁথার নিচে শিউলি পাটি বিছিয়েছিল নয়তো মেয়ের এমন মিনিটে মিনিটে বন্যায় হামিদ, শিউলি দুজনই ভেসে যেত। মাত্রই বোধহয় প্রস্রাব করেছে আরেকটু পরেই গলা উঁচিয়ে কেঁদে কেঁদে সেটা মাকে জানান দিত। বাচ্চাটা ভেজা লাগলেই কেঁদে ওঠে।

হামিদ মাথার পাশ হাতড়ে দেখল কয়েকটা ধোঁয়া কাপড় রাখা। সবগুলোই হামিদের পুরোনো লুঙ্গি থেকে বানানো। শিউলি সবসময় এগুলো এখানে রেখে দেয়। রাতে মেয়ে প্রস্রাব করলেই উঠে বদলায়। হামিদ সেখান থেকে একটা পরিষ্কার কাপড় নিয়ে খুব সাবধানে মেয়েকে বুকে আঁকড়ে ধরল। বাচ্চাটা নড়ে উঠল মুহূর্তেই। অন্ধকারে একবার চোখ খুলে আবারও ওম পেয়ে চোখ বুজল। হামিদ মেয়ের নড়াচড়া কমতেই ভেজা কাঁথা সরিয়ে কোমরে ত্রিভুজের মতো পেঁচিয়ে রাখা ভেজা নিমা ধীর হস্তে খুলল। হাতের পরিষ্কার কাপড়টা দিয়ে মেয়েকে আনাড়ি হাতে কোনোমতে মুড়িয়ে দিল। শিউলি কীভাবে যেন পেঁচিয়ে পরায়। হামিদ সেভাবে পারল না। কোনোরকম ভাবে মেয়েকে পরাতে পেরে রাজ্য জয় করা হাসি দিল। এরপর মেয়েকে বুকের সঙ্গে ঠেকিয়ে রেখেই ধীরে ধীরে খাটে শুইয়ে দিল। বাচ্চাটা ওম ছুটতেই ফের আঁতকে উঠে হামিদের হাত আঁকড়ে ধরল। মেয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত হাত না ছাড়ল হামিদ এভাবেই থাকল।

শিউলি ফুল পর্ব ৫

খাটের নিচে রাখা বোলে ভেজা কাঁথা আর নিমা ঢিল মেরে ফেলল। হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে মেয়ের ঘর্মাক্ত শরীর মুছে দিল পরনের লুঙ্গি দিয়ে। বাচ্চাটা আরাম পেয়ে নড়ে উঠে ঠোঁটের দুপাশ ছড়িয়ে ফেলল। হামিদের মনে হলো যেন এক মাসের ঘুমন্ত শিশু হেসে উঠেছে। বুকের উপরে হাত ওঠানামা করতেই বাচ্চাটা ঘুমের ঘোরে সেই হাতের মোটা আঙুল আঁকড়ে ধরল নিশ্চিন্তে। পিতৃহৃদয়ে দোলা দিল মুহূর্তেই। হামিদের মনে হচ্ছে সে জীবন্ত হাসনাহেনার ঘ্রাণ তীব্রভাবে পাচ্ছে। তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে মেয়ের ছোট্ট নমনীয় হাতে পড়ল।

শিউলি ফুল পর্ব ৭