শেহেজাদার আদর পর্ব ১২
সুমাইয়া ইসলাম নূর
কেটে গেছে মাঝের সাত দিন
এই সাত দিনে। ইনায়া আর ইউভির মধ্যে কোনো যোগাযোগই হয়নি।
না কোনো ফোন না কোনো মেসেজ
যেন দুজন দুজনের জীবন থেকে হঠাৎ করেই হারিয়ে গেছে।
কিন্তু এটা শুধু ইনায়ার দিক থেকেই হয়েছে
ইউভি একটুও দূরে যাই নি।
প্রতিটা মুহূর্তে ইনায়াকেই ঘিরে আছে তার পৃথিবী।
লন্ডনে বসে— সে শুধু বাড়িতে ফোন করে নিজের মায়ের সাথে টুকটাক কথা বলে… আর রেদোয়ানের সাথে— শুধু বিজনেস নিয়ে আলোচনা করে মাঝে মাঝে বাবার কথা ও শোনে ইউভির বাবার উপর জমে আছে অনেক অভিযোগ কিন্তু মানুষ টাকে অনেক ভালোবাসে।
কাজের ফাকে ইউভির সময় কাটে ল্যাপটপের সামনে।
স্ক্রিনে ভেসে থাকে চৌধুরী বাড়ির প্রতিটা কোণা…
ইনায়ার রুম… বারান্দা… ডাইনিং… এমনকি বাগান পর্যন্ত…
ইনায়া কখন ঘুম থেকে ওঠে… কখন পড়তে বসে কখন চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
সব কিছু জানে সে। আর বাড়ির বাহিরে সব কিছু সেকেন্ড বাই সেকেন্ড এর খবর জানে ইউভি।
আর এই পুরো দায়িত্বটা পালন করছে— তার একমাত্র বোন, পিয়াসা চৌধুরী।
পিয়াসা নিজেও জানে না— সে আসলে কত বড় একটা গোপন খেলায় অংশ হয়ে গেছে।
ইনায়া শুধু ভাবছে ইউভি হয়তো তাকে ভুলে গেছে।
আবার মনে মনে নিজেকেই গালি দিচ্ছে কেনোই বা আমাকে মনে রাখবে ওই বালের শেহেজাদা।
বাল ভাবছি আমি ওই রাত নিয়েই পরে আছি আমি।
ওনার ও কুরকুরি কম না বাল রাত দুপুরে আসে চুমু খাতি লুচ্চা বেডা।
মনে করছে আমি কিছু জানি না।
এইদিকে— চৌধুরী বাড়ি পুরোপুরি বদলে গেছে।
কারণ— রিমঝিমের বিয়ের আর মাত্র সাত দিন বাকি।
পুরো বাড়ি এখন উৎসবের আলোয় ভাসছে…
হাসি, গল্প, কাজ— সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা।
বাড়ির সবাই মিলে— রিমঝিমকে বুঝিয়ে শুনিয়ে অবশেষে রাজি করিয়েছে—
১৫ দিনের ছুটি নিতে।
প্রথমে সে রাজি হচ্ছিল না… কাজের কথা বলে এড়িয়ে যাচ্ছিল…
কিন্তু— শেষ পর্যন্ত সবার জোরাজুরিতে, ভালোবাসার চাপে, সে হাল ছেড়ে দিয়েছে।
এখন— চৌধুরী বাড়ির প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত— শুধু একটাই প্রস্তুতি…
রিমঝিমের বিয়ে।
এতো আনন্দ মাঝেও একটা শূন্যইস্থান কুরে কুরে খাচ্ছে রিমঝিম এর।
আজ তার জন্য ভিষণ খারাপ লাগছে রিমঝিম এর। বড্ড মনে পরছে যে তার ছোট ভাই কে। বড় তিন ভাই কে ও অনেক ভালোবাসতো এবং এখোনো বাসে কিন্তু তার। ছোট ভাই টিকে বেশি ভালোবাসে ছোট ভাইয়ের থেকে রিমঝিম মাএ ৫ বছরের ছোট পিঠেপিঠি ভাই বোন হওয়াই দুজনের মধ্যে অনেক ঝগড়া মারা* মারি হতো আবার দুজন দুজন কে ছারা একটি মূহুর্ত ও থাকতে পারতো না।
আজ রিমঝিম এর একটি ভুলের জন্য তার ভাই টা আজ তাকে ছারা পরিবার ছারা কতো দূরে। মনে মনে নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হয় রিমঝিম এর কিন্তু তাকে ইউভি কথা দিয়েছে। রিমঝিম এর বিয়ের আগে তাকে ফিরিয়ে আনবে।
রিমঝিম এই টাও মনে প্রানে বিশ্বাস করে ইউভির সাথে তার ছোট চাচ্চুর যোগাযোগ আছে। আর কারো সাথে যোগাযোগ না থাকলে ও ইউভির সাথে যোগাযোগ থাকবেই।
ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা—
আজ কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছে রিমঝিমের বিয়ে উপলক্ষে।
ইনায়া আর পিয়াসার করা হুকুম—
তুবা এই সাত টা দিন তাদের সাথে থাকবে।
অনেক মজা করবে সবাই…
মেহেদি, হলুদ—সব অনুষ্ঠানে তারা নাচ-গান করবে।
ইনায়ার বরাবরি গানের গলা খুব ভালো—
এই কথা চৌধুরী বাড়ির সবাই জানে।
এমনকি তুবাও তুবা বলল—
বেবি তুই কিন্তু গানও করবি।
ইনায়া মুচকি হেসে বলল—
ওকে জানু করবো কিন্তু তোকে সাত দিন থাকতে হবে!”
আমার বাবা কে বলে দিবো তোর আব্বু কে ফোন দিয়ে বলবে!”
তুবা খুশিতে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল—
ওকে জানু, ঠিক আছে।
এরপর পিয়াসা বলল—
চল আজ আর ক্লাস করবো না।
আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো
আজ আকাশটা কেমন মেঘলা মেঘলা মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে বছরের প্রথম বৃষ্টি… চল না ভিজি আজ।
ইনায়া হেসে বলল—
আগে বৃষ্টি হোক।
তারপর আবার বলল—
চল আজ ছোট ফুচকা খাই।
এই বলে তিন বান্ধবী ফুচকা খেতে চলে গেল।
ফুচকার দোকানে গিয়ে—
তিনজন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে…
আর গল্প করছে—
বিয়েতে কে কি করবে, কে কি পরবে…
হঠাৎ—
পিয়াসা দূরে তাকিয়ে বলল—
এই দেখ রুদ্র যাচ্ছে কলেজে… বেবি তোর ক্রাশ।
ইনায়া ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এনে বলল—
ও আমার কোনো ক্রাশ ছিল না পিহু এই বয়সে এমন একটু হয় বুঝলি।
ফুপি মণি আমাকে বুঝিয়েছে ভালোবাসার মানে কি।
আর আমি এখন বুঝতে পারছি।
পিয়াসা হঠাৎ চিৎকার করে বলল—
বুঝতে পারছিস মানে?তুই কি সত্যি কাউকে ভালোবেসে ফেলেছিস?
মনে মনে পিয়াসা বললো
তাহলে আমার ভাইয়ার কি হবে…?
ইনায়া ধীরে বলল জানি না রে
তবে একজনের কথা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছি না।
তাকে অনেক মনে পড়ছে।
তার শাসন করা আমাকে কেয়ার করা
আবার মাঝে মাঝে আমার উপর অধিকার দেখানো।
আমাকে আঘাত করার পর
আবার রাতে চুপি চুপি এসে
আমাকে আদর করা।
আমার ব্যথা পাওয়া জায়গায় চুমু দেয় যেন আমার ব্যথা কমে যাই।
আমাকে আঘাত করার পর সে পাগল হয়ে গিয়েছিল জানিস
একটু থেমে
চোখ ভিজে গেল ইনায়ার।
আমি এই মানুষটাকে খুব মিস করছি।
কেন করছি জানি না।
সে তো অন্য কাউকে ভালোবাসে।
তাহলে আমি কেন এমন ভাবছি বল তো পিহু?
পিয়াসা আর তুবা
আজ যেন এক নতুন ইনায়াকে দেখছে
দুজন একে অপরের দিকে তাকালো অবাক হয়ে
আর ইনায়া মাথা নিচু করে বসে আছে চোখ থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে।
পিয়াসা আর তুবা বুঝে গেছে
ইনায়া কার কথা বলছে।
ইউভির কথা…
পিয়াসা মনে মনে বলল—
তুই বড্ড বোকা রে বেবি।
তুই যা বলছিস আমি সব বুঝতে পারছি।
তোরও ভাইয়ার প্রতি ফিলিংস হচ্ছে।
কিন্তু তুই নিশ্চিত থাক
আমার ভাইয়া শুধু তোর
শুধু তার ‘আদর’-এর
তুবা আর পিয়াসা আর কিছু বলল না কিছুক্ষণ পর
ফুচকার দোকানদার তাদের ফুচকা দিয়ে গেল।
তিনজন মজা করে ফুচকা খেতে লাগল…
ইনায়া একটু মনমরা ছিল—
কিন্তু তার দুই সয়তান বান্ধবী থাকতে
সে কি আর মন খারাপ করে থাকতে পারে?
তুবা হঠাৎ বলল—
চল মন্টুর দোকান থেকে বেস্ট ব্যথার ওষুধ কিনে দিই একদিনে তোর মনের ব্যাথা শেষ হয়ে যাবে
এই কথা শুনে—
তিনজন একসাথে হেসে উঠল…
চৈত্র মাসের দুপুর এ
আকাশটা অনেকক্ষণ ধরেই মেঘলা ছিল
হালকা হাওয়া বইছিল…
মনে হচ্ছিল বৃষ্টি হবে
হঠাৎ—
ঝমঝম করে নেমে এলো বছরের প্রথম বৃষ্টি…
কলেজের মাঠটা মুহূর্তেই ভিজে গেল…
মাটির গন্ধে চারপাশ ভরে উঠল…
ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা—
এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের দিকে তাকাল…
তারপর—
চল
এই বলে কলেজের সামনে রাস্তায় চলে আসলো
তিনজন একসাথে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বৃষ্টির মাঝে সাদা ইউনিফর্ম আর
পায়ের সাদা জুতা ভিজে গেল মূহুর্তে
চুল ভিজে গাল বেয়ে পানি পড়ছে…
তারা একদম বাচ্চাদের মতো—
হাসতে হাসতে, চিৎকার করতে করতে ভিজছে
পায়ে পানি জমে গেছে ইনায়ার
ইনায়া হঠাৎ পা দিয়ে পানি ছিটিয়ে দিল পিয়াসার দিকে—
“এইইই!”
পিয়াসা পাল্টা পানি ছিটিয়ে দিল—
“দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি কিন্তু পানি গিয়ে লাগলো তুবার গায়ে।
তুবাও যোগ দিল—
“আজ তোদের ছাড়বো না!”
তিনজন একসাথে—
পানি ছিটাচ্ছে…
হাসছে তিনজন হাত ধরে গোল গোল ঘুরছে বৃষ্টির নিচে নিজের মতো করে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে তিন জন
ইনায়া হাত দুটো ছড়িয়ে দাঁড়াল…
চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ফোঁটা মুখে পড়ছে
একটা অদ্ভুত শান্তি লাগছে আজ
একটা মুক্তির অনুভূতি…
এই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য—
সে সব কিছু ভুলে গেল…
ইউভিকেও…
কিন্তু—
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা কালো গাড়ির ভেতরে কারো এক জোরা চোখ ইনায়ার উপর থেকে এক মূহুর্তের জন্য ও সোরছে না।
ইউভি…
গাড়ির ভেতরে বসে—
নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে…
আজ সকালেই সে দেশে ফিরেছে…
তিয়াকে নিজের ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিয়ে—
সোজা চলে এসেছে এখানে…
শুধু একবার—
ইনায়াকে দেখবে বলে…
গাড়ির কাচে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে…
ভেতরে হালকা অন্ধকার…
আর ইউভির চোখ শুধু ইনায়ার উপর স্থির…
হঠাৎ—
নিচু গলায়, নিজের অজান্তেই গুনগুন করে উঠল সে—
আগে কত বৃষ্টি যে দেখেছি শ্রাবণে
যাগে নি তো এতো আশা ভালোবাসা
এ মনে।
তার গলায় এক অদ্ভুত ব্যথা মিশে আছে…
চোখে ভেসে উঠছে—
শুধু ইনায়া…
ইউভির ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল…
নিচু গলায় বলল
পাগলী একটা
ইউভি ধীরে গাড়ির সিটে হেলান দিল…
চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য…
আর কয়টা দিন
তারপর তোকে আর এভাবে দূর থেকে দেখতে হবে না।
বাইরে—
বৃষ্টি পড়ছে…
তিন বান্ধবীর হাসি ভেসে আসছে গায়ে কাদা মাটি ছুরা ছুরি করছে
আর গারির ভেতরে ইউভি
নিঃশব্দে নিজের পুরো পৃথিবীটা দেখছে।
তার ছোট বোন এবং তার প্রিয়তমা আদর কে মন ভরে দেখছে।
হঠাৎ ইউভির কী যেন মনে পড়ে গেল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে সে পিয়াসাদের কাছে চলে গেল।
নিজেও ভিজে গেল কাদা-পানিতে, ভিজে টলমল হয়ে গেল
পিয়াসাকে দেখে বলল—
“বোনু, তুই বৃষ্টিতে ভিজছিস কেন? তুই জানিস না, তোর এজমার সমস্যা আছে, ইনেহলারও নিয়ে আসিস নি, I’m sure
এই বলে ইউভি পিয়াসার দুই গালের ওপর আদুরে হাত বুলিয়ে দিল।
আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে হবে না।
ইউভি তুবা কে বলল—
“তোমাকে কি বাড়ি থেকে নিতে আসবে?”তুবা বললো
না ভাইয়া, আমরা ঠিক করেছি, এখন থেকেই
রিকশায় যাব।
ইউভি বলল—
“ওকে, পরে যাও। আজ চলো, গাড়িতে আমি দিয়ে আসব সবগুলোর জর হবে।”
পিয়াসা বলল—
“সরি ভাইয়া, আর হবে না।
হঠাৎ পিয়াসা চিৎকার করে বলল—
তুমি কখন আসছ দেশে?
ইউভি আধুরে গলায় বলল—
সকালে তিয়াকে আমার ফ্ল্যাটে দিয়ে অফিস যাওয়ার পথে দেখলাম, তিন বান্ধর লাফালাফি করছে। পরে দেখলাম এরা অন্য বাদর না একজেন আমার বোন আর একজেন আমার আদ বলে থেমে গেল ইউভি।
হঠাৎ পিয়াসা ইউভির হাতের চিমটি কেটে ইনায়ার দিকে ইশারা করে ইউভি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে কিছু সময়ের জন্য স্থির হয়ে গেল
“আমার আদর, তুই বড্ড অভিমানী।”
ইনায়া তখন নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, মনে মনে বলছে—
“ইউভি ভাইয়া, আমাকে কিছু বলল না কেন? একবারও দেখল না।”
ইউভি বলল—
“তোরা গাড়িতে গিয়ে বস।”
ইনায়া বলার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে গিয়ে বসলো, পেছনের ছিট এ
পিয়াসা ইউভির পাশে বসলো তুবা ইনায়ার পাশে বসলো।
ইনায়ার চোখ দিয়ে পানি পড়তেই আছে, কিছুতেই থামাতে পারছে না।
এ সবকিছু ইউভির চোখের আড়াল হলো না
মনে মনে ইউভি বলল—
শেহেজাদার আদর পর্ব ১১
“মাত্র এক মাসেই এত বড় হয়ে গেছিস, তুই। হটাৎ কী হলো? তোকে এমন লাগছে কেন? তুই ঠিক আছিস তো, আদর?”
ইনায়া যেন নিঃশ্বাসও নিতে পারছে না, কেমন যেন লাগছে।
ইনায়া মনে মনে বলল—
“সে তো আমার না… তুবুও কেন এতো কষ্ট হচ্ছে আমার? তিয়ার পাশে কেন ইউভি ভাইয়া কে সজ্জো হচ্ছে না?”
