শেহেজাদার আদর পর্ব ১৭
সুমাইয়া ইসলাম নূর
পুরো বাগান তখনও স্তব্ধ…
সবার চোখ শুধু ইনায়ার দিকে তাকিয়ে স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলছে সবাই
কেউ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না— এতক্ষণ যার জন্য পুরো চৌধুরী ভিলা তোলপাড় হয়ে গেল, সে কিনা হাতে আইসক্রিম নিয়ে নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
নুসরাত চৌধুরী ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে…
পিয়াসা রাগে বকছে। আর এতো সময় যা কিছু হইছে সব বললো পিয়াসা ইনায়া কে ইনায়া যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ইউভি তার জন্য এতো পাগলামি করবে।
তুবা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে…
আর ইউভি…?
সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ দুটো অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগছে
চোয়াল শক্ত হয়ে আছে
হাতের রগ রাগে ফুলে আছে এখনো।
ইনায়া একবার তাকাতেই বুক ধক করে উঠল
ইউভি চুপ আছে—
আর তার এই চুপ থাকাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর লাগছে ইনায়ার কাছে।
হঠাৎ ইউভি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।
এক মুহূর্তও কিছু না বলে ইনায়ার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
ইনায়া চমকে উঠল—
“ইউভি ভাইয়া…?”
কোনো উত্তর দিল না ইউভি
পরের মুহূর্তেই সবার সামনে তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল গেটের দিকে… যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার বাইক টি
রেশমা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন—
কই নিয়ে যাচ্ছিস মেয়েটাকে?
ইউভি পেছনে না তাকিয়েই ঠান্ডা গলায় বলল—
কাজ আছে মা।
একটু থেমে আবার বলল—
তোমরা আবিরের প্রোগ্রাম শুরু করো… আমি আসছি।
চারপাশে সবাই হতভম্ব।
ইনায়া ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল—
ছাড়েন সবাই দেখছে…
ইউভি এবার তার দিকে তাকাল।
চোখে জমাট রাগ।
সবাই দেখুক।
তাতে শেহেজাদ ইউভির বা*ল ও ছেরা যাবে না।
এই বলে এক টানে তাকে বাইকে বসিয়ে দিল।
ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল…
সে ভয়ে আস্তে বলল—
কোথায় নিচ্ছেন আমাকে…?
ইউভি দাঁত চেপে বলল—
চুপচাপ বসে থাক।
তোকে বলতে বাধ্য নয় আমি
আজ তোকে নিয়ে আমার অনেক হিসাব আছে, আদর।
বাইকটা ঝড়ের বেগে ছুটে চললো।
হাওয়ায় ইনায়ার শাড়ির আঁচল উড়ছে, বুকের ভেতর ধকধক করছে ইনায়ার ।
সে পিছন থেকে আস্তে বলল—
ইউভি ভাইয়া। আস্তে চালান আমার ভয় করছে অনেক
ইউভি ঠান্ডা গলায় বলল—
কেন? তুই তো বাইকার।
তোর আবার ভয় কিসের?
আরও জোরে গতি বাড়িয়ে দিয়ে বলল—
নিজেকে বড় নায়িকা ভাবিস?
গেলি যখন আসলি কেন?
তুই যে আইসক্রিম কিনতে যাস নি এইটা কেউ বুঝুক বা না বুঝুক আমি ভালো করে বুঝেছি।
ইনায়া মনে মনে বললো এই ডেভিল টা কেমনে বুঝলো।
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল মুখে আর কিছু বললো না ।
কিছুক্ষণ পর বাইক এসে থামল একটা নিরিবিলি লেকের ধারে।
চারপাশে শুধু হাওয়ার শব্দ পানির
ইনায়া ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল।
চুলগুলো মুখে এসে পড়েছে… চোখে অদ্ভুত জেদ।
সে ইউভির দিকে তাকিয়ে বলল—
নায়িকা না
ভিলেন আমি।
একটু ইউভির সামনে এগিয়ে এসে বলল।
ভালোবাসার ক্ষেত্রে নায়িকা হতে চাই না…”
ভিলেন হতে চাই।
ইউভি ভ্রু তুলে তাকাল।
ইনায়া এবার বুক সোজা করে বলল—
আমার শেহেজাদা কে চেয়ে নিতে চাই না…
বরং কেড়ে নিতে চাই।
ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির আরো সামনে এসে দাঁড়াল।
আর আমি আজ এসেছি শুধু একটাই কারণে…”
ওই পেকাটির নানির কাছ থেকে…
আমার শেহেজাদাকে ছিনিয়ে নেব।
ইনায়ার কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল…
লেকের পানিতে হাওয়ার ঢেউ উঠছে, আর ইউভি স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে বুঝে গেছে…
ইনায়া কাকে “শেহেজাদা” বলছে।
কার কাছ থেকে কাকে ছিনিয়ে নিতে এসেছে।
কিন্তু মুখে কিছুই বোঝাল না।
ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টেনে বলল—
ওহ… তাই নাকি?
কার কথা বলছিস শুনি?
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলল—
আপনি খুব ভালো করেই জানেন।
ইউভি কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল—
না তো আমি বুঝলাম না।
এই পেকাটির নানি কে?
আর তোর শেহেজাদা আবার কোন রাজ্যের রাজপুত্র?
ইনায়া রাগে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
ন্যাকামি করবেন না।
আমি সিরিয়াস।
কারে ছিনিয়ে নিতে এসেছিস, নাম বল।
ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে নিল।
দূরে তাকিয়ে বললো
দূরে ওই হাজার সাদা শাপলার মাঝে যে লাল পদ্মটা ফুটে আছে, ওইটা আমার সেই কিশোরী মনে তাণ্ডব চালানো।
আমার শেহেজাদা
ইউভি একটু দুষ্টু হাসি দিয়ে বললো হিন্দি সিরিয়াল কম করে দেখ
ইউভি এবার আরও কাছে এসে নিচু গলায় বলল—
ইনায়ার চোখে চোখ রেখে বলল—
যদি সে আমি হই…
তাহলে তোকে ছিনিয়ে নিতে কষ্ট করতে হবে না আদর।
ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল।
ইউভি আবারও না বোঝার ভান করে হাসল—
কিন্তু যদি আমি না হই।
তাহলে যার কথা ভাবছিস, তাকে আজই গিয়ে তুলে এনে দিব।
ইনায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল ইউভির দিকে…
তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
তুলে আনতে হবে না…
কারণ সে তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
ইউভির চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল…
কিন্তু পরের সেকেন্ডেই আবার স্বাভাবিক মুখ করে বলল—
সত্যি?
কোথায়? আমি তো কাউকে দেখছি না।
ইনায়া রাগে পা ঠুকল।
আপনি একটা অসহ্য মানুষ!
ইউভি হেসে আরও কাছে এল।
আর তুই বিপদজনক।
ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে বলল—
আমি চলে যাচ্ছি।
সে ঘুরতেই ইউভি তার হাত ধরে টেনে আবার সামনে দাঁড় করাল।
এত কথা বলে এখন পালাবি?
ভিলেনরা পালায় না।
ইনায়া কাঁপা গলায় বলল—
ছাড়ুন…
ইউভি নিচু হয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলল—
একটা কথা মনে রাখিস…
যাকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিস…
সে যদি নিজেই তোর কাছে আসে?
ইনায়ার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ইউভি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল—
তখন কিন্তু খেলাটা উল্টো হয়ে যাবে, আদর…।
না এমন টা হবে না আমার শেহেজাদার একদমই নিরামিষ লোক তার মাঝে কোনো আমিষ নাই একদম আন রোমান্টিক।
ইউভির ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও গাঢ় হলো…
সে এক সেকেন্ড চুপ করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
নিরামিষ?
এক পা এগিয়ে এসে আবার বলল—
একদম আনরোমান্টিক তাই না ?
ইনায়া বুক সোজা করে বলল—
হ্যাঁ।
আমার শেহেজাদা ভদ্র, শান্ত…
আপনার মতো ডেভিল না।
ইউভি মাথা নাড়ল।
চোখে অদ্ভুত ঝিলিক এনে বললো।
তাই নাকি, আদর?
সে হঠাৎ ইনায়ার কবজি ধরে নিজের দিকে টেনে নিল।
ইনায়া হকচকিয়ে তার বুকে এসে ধাক্কা খেল।
ইউভি নিচু হয়ে তার কানের পাশে ফিসফিস করে বলল—
তোর ওই নিরামিষ শেহেজাদা…
এই মুহূর্তে তোকে এভাবে নিজের কাছে টানতে পারত? আমি ডেভিল বলেই পেরেছি।
ইনায়ার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল।
মুখ লাল হয়ে গেল।
ইউভি আবার বলল—
আর আনরোমান্টিক লোকেরা…
কারও চোখে চোখ রেখে তার হার্টবিট বাড়াতে পারে বল তুই?
আমি ডেভিল বলেই পেরেছি।
ইনায়া দ্রুত সরে যেতে চাইল—
ছাড়ুন…
ইউভি ছাড়ল না।
বরং আরও গভীর চোখে তাকিয়ে বলল—
সমস্যা কী জানিস?
তুই আমাকে যেমন ভাবিস…
আমি তার থেকেও খারাপ।
ইনায়ার বুক ধক করে উঠল।
ইউভি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
আর তোর শেহেজাদা যদি সত্যিই আমি হই…
তাহলে নিরামিষ না, পুরো আগুনে পুড়বি তুই, আদর।
চারপাশের হাওয়া যেন হঠাৎ থেমে গেল…
ইনায়া শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তোর তো নিরামিষ পছন্দ না তাই তো? তাহলে তোর শেহেজাদার জাইগাই আমাকে ভালোবাস আমি বড্ড রোমান্টিক বিশ্বাস কর।
একবার শুধু বিয়েটা খালি করি দিনে তিন বেলা ভাত না খায়ে তোকে খাবো প্রমিস ।
আপনার মত সয়তান লুচ্চা বেডা কে কেন ভালোবাসবো আমি আমার শেহেজাদার পবিত্র বুঝতে পারছেন।
এই দিকে মনে মনে বললো বালের শেহেজাদা।
ইউভি হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর একটু নরম গলায় বলল—
ডোন্ট, আদর… অনেক দেরি হয়ে গেছে।
তোকে এখানে আনার একটাই উদ্দেশ্য ছিল।
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল—
কি উদ্দেশ্য?
ইউভি বাইকের হ্যান্ডেলে হাত রেখে বলল—
নেক্সট টাইম থেকে একা কোথাও যাবি না।
তোর যা ইচ্ছা হবে, আমাকে বলবি।
রেদোয়ান আছে তোর বাবা, চাচ্চুরা আছে আমরা সবাই আছি।
আমরা পূরণ করব।
একটু থেমে গভীর গলায় বলল—
তুই নিজেও জানিস না আজ তোকে না পেয়ে বাড়ির সবাই কেমন পাগলামি করছিল।
ইনায়ার চোখ নরম হয়ে গেল।
সে আস্তে বলল—
ওকে ভাইয়া… সরি।
আর এমন করব না।
তারপর একটু নিচু গলায় বললো
তবে আমি যখন কষ্ট পাই…
তখন বাইকের মাঝেই সুখ খুঁজি।
এই বাইকে রাস্তায় হাওয়ায় আমার সব দুঃখ কষ্ট চলে যায়
ইউভি তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
আর কীসে সুখ খুঁজিস?
ইনায়া ঠোঁট টেনে হেসে বলল—
সময় হলে জানতে পারবেন।
ইউভি মাথা নাড়ল।
ওকে ম্যাডাম।
এখন চলেন… আবির খেলার সময় হয়ে গেছে। শোন
আর কোনো ছেলে যেন তোকে রং না লাগায়… শুধু আমি বাদে।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল—
কেন?
ইউভি বাইকের চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে বলল
কারণ আমি চাই না।
ইনায়া জেদি গলায় বলল—
কেন চান না, ইউভি ভাইয়া?
ইউভি তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল—
সময় হলে জানতে পারবি।
ইনায়া মনে মনে বলল—
আমি এখন একশো ভাগ শিওর…
আপনি আমায় ভালোবাসেন, শুধু বলছেন না।
কিন্তু আমি ন্যাকা মেয়ে না… সব বুঝি।
সে অন্যমনস্ক হয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে ছিল।
ইউভি সেটা দেখে হাত তুলে তার মুখের সামনে টুড়ি মারল।
কী হলো?
মানছি আমি দেখতে সুন্দর তাই বলে এভাবে চোখ দিয়ে খেয়ে ফেলবি?
ইনায়া লজ্জায় রেগে গেল।
ইউভি আরও দুষ্টু গলায় বলল—
এতই যখন খাওয়ার ইচ্ছা…
মুখ দিয়েও খেতে পারিস, আমি একটুও রাগ করব না।
ইনায়া তৎক্ষণাৎ বলল—
ছি! অসভ্য!
লজ্জা-শরম কিছু নাই?
ভুলে যাবেন না, আপনি আমার থেকে গুনে গুনে নয় বছরের বড়!
এই বলে সে রাগ দেখিয়ে বাইকের কাছে চলে গেল।
ইউভি চাবির রিং আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে তার পেছনে গেল।
মনে মনে হাসল—
বড় বলেই তোকে সামলাই…
না হলে এতক্ষণে এই লেকপাড়েই তোর সব জেদ হারিয়ে যেত, আদর।
বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বলল
চল, উঠ।
নইলে সবাই ভাববে আমি তোকে নিয়ে পালিয়ে গেছি…
আর সত্যি বলতে—
ভাবনাটা খুব খারাপও না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের নরম আলো নেমেছে…
চৌধুরী ভিলার বাগান তখন উৎসবের রঙে সরগরম।
বাড়ির সব ছেলে-মেয়েরা একই রকম সাদা টি-শার্ট পরে একে একে নেমে এসেছে বাগানে।
কারও হাতে আবিরের থালা, কারও হাতে রঙের প্যাকেট, কেউ আবার আগে থেকেই টার্গেট ঠিক করে রেখেছে কাকে বেশি রং দিবে।
সবাই রং খেলার জন্য পুরো প্রস্তুত।
ইনায়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে…
সাদা টি-শার্ট, ঢোলা জিন্স, মাথায় ক্যাপ—চোখে দুষ্টু হাসি নিয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে আছে
আর ইউভি দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছে।
ঠিক তখনই রেদোয়ান তৈরি হয়ে বাগানে ঢুকল।
সাদা টি-শার্টে একদম পরিপাটি, মুখে হালকা হাসি নিয়ে ধিরে ধিরে হেটে বাগানের দিকে আসছে।
পিয়াসা দূর থেকে তাকে দেখেই চুপিচুপি কিছু লাল আবির হাতে নিল।
তারপর পেছন দিক থেকে এসে এক ঝটকায় রেদোয়ানের গালে মেখে দিল।
রেদোয়ান চমকে তাকাল।
তারপর ভান করে রাগী মুখ বানিয়ে এক টানে পিয়াসার হাত ধরে ফেলল।
এতই যখন রং মাখানোর শখ…
চোরের মতো পেছন থেকে মাখাচ্ছিস কেন, পিহু?
সামনে থেকে দেওয়ার সাহস নাই বুঝি?
পিয়াসা বিন্দুমাত্র না ঘাবড়ে বলল—
আমার তো নাই…
আপনার তো আছে, ভাইয়া।
তাহলে আপনি সামনে থেকে দেন।
রেদোয়ান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল…
তারপর থালা থেকে এক মুঠো পার্পল আবির হাতে নিল।
ধীরে ধীরে পিয়াসার সামনে এসে দাঁড়াল।
এক হাত দিয়ে এখনো তার কবজি ধরা…
আরেক হাত তুলে খুব আস্তে তার গালে আবির ছুঁইয়ে দিল।
বড্ড উরছিস তোর ব্যাবস্থা করছি দারা।
পিয়াসার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার।
রেদোয়ান এবার আরেকটু ঝুঁকে অন্য গালেও হালকা রং লাগিয়ে দিল।
সাহস কেমন দেখলি?
পিয়াসা লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলল।
তার গাল রঙের থেকেও বেশি লাল।
ইনায়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল—
ওই পিহু।
চোরের মতো রং দিতে গিয়ে নিজেই ধরা পরে গেলি !
পিয়াসা রাগ দেখিয়ে বলল—
তুই!
ঠিক তখনই ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল।
তার হাতে আবিরের প্যাকেট।
নিচু গলায় বলল—
খুব মজা লাগছে?
অন্যদের নাটক দেখতে
ইনায়া ভ্রু তুলে তাকাল—
হ্যাঁ। কেন?
ইউভি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
কারণ এখন তোর পালা ইনায়ার হাসিটা এক সেকেন্ডেই থেমে গেল।
সে চোখ বড় বড় করে ইউভির দিকে তাকাল—
আমার পালা মানে?
ইউভি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু হাতে ধরা আবিরের প্যাকেটটা আলতো ঝাঁকাল।
তার চোখে সেই চেনা দুষ্টু ঝিলিক।
ইনায়া দুই পা পেছনে সরে গেল।
না… একদম না।
আমার মাথায় রং দিবেন না।
ইউভি ধীরে ধীরে এক পা এগোল।
মাথায় কে বলল দিব?
ইনায়া আরও পিছিয়ে গেল।
তাহলে কোথায় দিবেন?
ইউভি ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল—
যেখানে দিলে সবচেয়ে বেশি রাগ করবি।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দৌড় দিল।
ধরতে পারলে দেন!
চারপাশে সবাই হেসে উঠল।
বাগানের একপাশ থেকে আরেকপাশে ইনায়া দৌড়াচ্ছে, আর ইউভি ধীর পায়ে তার পেছনে যাচ্ছে—
ইনায়া জানে শেষ পর্যন্ত ইউভি ওকে ধরবেই।
তুবা চিৎকার করে বলল—
ইউভি ভাইয়া! ধরেন ধরেন!
পিয়াসা হাসতে হাসতে বলল—
ইনায়া, বাঁচবি না আজ!
ইনায়া ফুলের টবের আড়ালে লুকাতেই ইউভি সোজা সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বের হ।
না!
নিজে আসবি, না আমি নিয়ে যাব?
ইনায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল—
আপনি জোর করেন সবসময়!
ইউভি শান্ত গলায় বলল—
কিছু ক্ষেত্রে করতে হয়।
এরপর এক টানে তাকে সামনে নিয়ে এল।
ইনায়া চমকে উঠল—
ছাড়ুন! সবাই দেখছে!
ইউভি নিচু হয়ে বলল—
দেখুক।
তারপর খুব ধীরে, যত্ন করে এক মুঠো হালকা গোলাপি আবির ইনায়ার দুই গালে মেখে দিল।
চারপাশ মুহূর্তে চুপ হয়ে গেল…
যেন সবাই এই দৃশ্যটাই দেখার অপেক্ষায় ছিল।
ইনায়ার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল।
সে স্থির হয়ে শুধু ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।
ইউভি তার ক্যাপটা একটু ঠিক করে দিয়ে বলল—
এখন ঠিক লাগছে।
ইনায়া ফিসফিস করে বলল—
এত হালকা রং দিলেন কেন?
ইউভি খুব আস্তে উত্তর দিল—
কারণ তোকে কষ্ট দিয়ে রং মাখাতে চাই না।
একটু থেমে আরও নিচু গলায় বলল—
তোর গায়ে যে রং টা মানায় আমি সেটাই যত্ন করে দিয়েছি আদর।
চারপাশে আবার হইচই শুরু হলো।
আর ইনায়ার গাল—আবিরে না, লজ্জায় আরও লাল হয়ে উঠল।
সবাই যখন রঙ খেলায় ব্যস্ত…
হঠাৎ বাগানের গেটের দিক থেকে রিমঝিম আর বাড়ির তিন গিন্নি একসাথে ভেতরে এলেন।
রিমঝিমের চোখ ভেজা… মুখে কষ্টের ছাপ।
সাজগোজ করা মুখটাও কান্নায় এলোমেলো হয়ে গেছে।
এটা দেখে ইউভি, রেদোয়ান, পিয়াসা আর ইনায়া দ্রুত তার কাছে এগিয়ে গেল।
ইউভি চিন্তিত গলায় বলল—
— পি… তোমার কী হয়েছে?
রিমঝিম ঠোঁট কাঁপিয়ে বলল—
— মা… বাবা… আর
কথা শেষ করার আগেই আবার কান্না ভেঙে পড়ল সে।
ইউভি তার কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলল—
— আর কে…? বলো।
রিমঝিম অনেকক্ষণ চুপ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
— ছোট ভাইয়ার কথা খুব মনে পড়ছে…
আজ যদি ও থাকত…
চারপাশ হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।
রেদোয়ান এগিয়ে এসে রিমঝিমের হাত ধরল।
— ফুপিমনি… তুমি কাঁদো না।
দাদাভাই আর দাদিকে হয়তো ফিরিয়ে আনতে পারব না…
কিন্তু ছোট চাচ্চুকে তোমার কবুল বলার আগেই এই চৌধুরী বাড়িতে হাজির করবে ভাইয়া।
তারপর হেসে ইউভির দিকে তাকিয়ে বলল—
— কি ভাইয়া… তাই না?
ইউভি এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে রেদোয়ানকে জড়িয়ে ধরল।
— Yes bro.
তার গলায় দৃঢ়তা।
এরপর দুজন একপাশে সরে গিয়ে নিচু গলায় কী যেন আলোচনা করতে লাগল।
এইদিকে পরিবেশ হালকা করতে বাড়ির সবাই আবার রঙ খেলা শুরু করলো
ঠিক তখনই পিয়াসার চোখ গিয়ে আটকাল তিয়ার দিকে
পাতলা সাদা শাড়ি পরে, হাতে লাল আবির নিয়ে ধীরে ধীরে ইউভির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তিয়া সবাই যখন রঙ খেলায় ব্যস্ত…
চারপাশে হাসি, চিৎকার, গান আর আবিরের রঙে পুরো বাগান জমে উঠেছে।
বড়রা একটু দূরে বসে গল্প করছে, ছোটরা একে অপরকে রঙে ভরিয়ে দিচ্ছে।
টেবিল ভরা নানান ডেজার্ট, আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয়—সব মিলিয়ে উৎসবের উচ্ছ্বাস।
ঠিক তখনই পিয়াসার চোখ গিয়ে আটকাল তিয়ার দিকে…
পাতলা সাদা শাড়ি পরে, হাতে লাল আবির নিয়ে ধীরে ধীরে ইউভির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তিয়া।
মুখে হালকা হাসি… চোখে অন্যরকম ইঙ্গিত।
পিয়াসা তাড়াতাড়ি ইনায়ার হাত চেপে ধরে বলল—
— বেবি… তিয়া মনে হয় ভাইয়াকে তোর আগে আবির দিয়ে দিবে!
আর আমি জানি তুই ভাইয়াকে কতটা ভালোবাসিস… আমি চাই না তোর আগে ওই তিয়া-ফিয়া ভাইয়াকে রঙ দিক!
ইনায়া এক সেকেন্ডও দেরি করল না।
ঝট করে পিয়াসার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল—
— বেবি, দাঁড়া… আমি দেখছি ওই পেকাটির নানিকে! আজ ছাড়ব না!
এই বলে সে দৌড়ে গেল তিয়ার আগেই।
ইউভি তখন কয়েকজনের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
হঠাৎই ইনায়া গিয়ে সোজা ইউভির সামনে দাঁড়াল।
কেউ কিছু বোঝার আগেই—
ইনায়া দুহাতে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল।
চারপাশ মুহূর্তে থমকে গেল।
ইউভি অবাক হয়ে নিচে তাকাল…
তার বুকের সাথে লেগে আছে ইনায়া।
মুখে দুষ্টু হাসি, চোখে জেদ নিয়ে বললো আমার শেহেজাদা কে শুধু আমি আবির দিব
তারপর নিজের গাল থেকে মুঠো ভরা গোলাপি আবির নিয়ে খুব আস্তে ইউভির ডান গালে মেখে দিল।
ইউভির চোখ স্থির হয়ে গেল তার মুখে।
ইনায়া এবার একটু উঁচু হয়ে বাঁ পাশের গালেও রঙ ছুঁইয়ে দিল।
তার আঙুলের নরম ছোঁয়ায় ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
তিয়া দাঁড়িয়ে রইল, মুখ শক্ত করে।
ইনায়া ইউভির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় বলল—
— এখন ঠিক লাগছে… আমার শেহেজাদা।
ইউভি ঠোঁটের কোণে ধীর হাসি টেনে নিচু গলায় বলল—
— সাহস তো কম না তোর।
ইনায়া চোখ টিপে বলল—
— নিজের জিনিসে অধিকার দেখাতে সাহস লাগে না।
ইউভির চোখে সেই পরিচিত আগুন জ্বলে উঠল।
সে ধীরে ইনায়ার কানের কাছে ঝুঁকে বলল—
— খেলা শুরু করলি যখন… শেষও আমি করব, আদর।
শেহেজাদার আদর পর্ব ১৬
ইনায়ার বুক ধক করে উঠল।
আর দূরে দাঁড়িয়ে তিয়া…
হাতে আবির চেপে শুধু তাকিয়ে রইল।
মনে মনে বললো শেষ করে দিব আমি চেনো না আমাকে ইনায়া।
আমাকে অপমান করা তাই না এর শোধ আমি নেবো তোমাকে দিগুন অপমান করে।
