শেহেজাদার আদর পর্ব ১৭ (২)
সুমাইয়া ইসলাম নূর
সন্ধ্যার আলোটা পুরোপুরি নেমে আসার আগেই চৌধুরী ভিলার ছাদ যেন অন্য এক জগতে রূপ নিল…
খোলা আকাশের নিচে বিশাল ছাদটা সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যেন কোনো রূপকথার রাজপ্রাসাদের এক টুকরো অংশ এনে বসানো হয়েছে এখানে।
চারপাশে ঝুলছে নরম হলুদ ফেয়ারি লাইট—
প্রতিটা বাতির আলো হাওয়ার সাথে দুলে দুলে যেন গল্প বলছে।
ছাদের একপাশ জুড়ে গোল করে বসার ব্যবস্থা—
সাদা আর প্যাস্টেল রঙের নরম কুশন, কারুকাজ করা লো টেবিল…
তার উপর রাখা কাঁচের বাটিতে গোলাপের পাপড়ি আর ভাসমান মোমবাতি।
মাঝখানে বড় করে তৈরি করা হয়েছে মেহেদি কর্নার—
গাঢ় সবুজ আর সোনালি কাপড়ে ঢাকা ব্যাকড্রপ,
তার সামনে আরামদায়ক সোফা…
যেখানে বসে হাত রাঙাবে মেয়েরা।
হালকা আতরের গন্ধ মিশে আছে রাতের হাওয়ায়…
মনে হচ্ছে প্রতিটা নিশ্বাসেই মিষ্টি একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে।
একপাশে ছোট্ট স্টেজ—
সেখানে সাজানো সাউন্ড সিস্টেম, লাইভ মিউজিকের আয়োজন।
তবলা, গিটার, আর নরম সুরে বাজতে থাকা সানাইয়ের মেলোডি পুরো পরিবেশটাকে আরও স্বপ্নময় করে তুলেছে।
টেবিল ভর্তি নানা রকম ডেজার্ট—
রঙিন জেলি, কেক, ফিরনি, ফলের প্ল্যাটার…
সবকিছু এত সুন্দর করে সাজানো, যেন চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না।
ছাদের চারপাশে কাঁচের লণ্ঠন জ্বলছে…
আর ওপরে অসংখ্য তারা—
মনে হচ্ছে আকাশটাও যেন আজ এই অনুষ্ঠানের অংশ হতে নেমে এসেছে।
মেয়েরা ও বাড়ির গিন্নি রা একে একে উঠে আসছে ছাদে
আজ ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা—তিনজনেই হালকা সবুজ রঙের লেহেঙ্গা পরে আছে…
তিনজনকে একসাথে দেখলে মনে হচ্ছে যেন তিনটা নরম বসন্তের হাওয়া এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আর রানি আর সাম্মিগাঢ় সবুজ রঙের লেহেঙ্গায় পরেছে একদম রাজকীয় লাগছে তাদের।
রিমঝিমকে আজ পরানো হয়েছে হালকা সবুজ শাড়ি…
গলায়, হাতে, চুলে কাঁচা ফুল দিয়ে বানানো গহনা।
সোনার গয়না পরাতে অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল…
কিন্তু সে এক কথায় না করে দিয়েছে—
বিয়ের দিন পরবো আজ না।
তার সেই জেদের কাছে সবাই হার মেনে গেছে।
এইদিকে
পিয়াসা পুরো রেডি
বাড়ির চারপাশে।
কাউকে খুঁজছে সে।
পুরো বাড়ি একবার, দুইবার, তিনবার—
খুঁজেও রেদোয়ানের কোনো খোঁজ পেলো না পিয়াসা
হঠাৎ—
ইনায়া এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল—
বেবি…
পিয়াসা একটু চমকে তাকাল—
হুম, বল।
ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
তোর ভাইয়া কোথায় রে?
যার জন্য এত কষ্ট করে সাজলাম তাকেই তো দেখতে পাচ্ছি না।
পিয়াসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল
তারপর অন্যমনস্ক হয়ে আস্তে বলল—
আমিও তো সেটাই ভাবছি…
তোর ভাইটা গেল কোথায়…
ইনায়া যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না।
সে যেমন ইউভিকে মিস করছে…
ঠিক তেমনি পিয়াসাও রেদোয়ানকে খুঁজছে।
তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল—
ওহ কেসটা তাহলে সিরিয়াস।
ঠিক তখনই—
তুবা হঠাৎ এসে দুজনের সামনে টুড়ি বাজাল—
এইই কী রে তোরা!
কতক্ষণ ধরে খুঁজছি কোথায় ছিলি তোরা?
ইনায়া আর পিয়াসা একসাথে তাকাল।
তুবা আবার বলল—
ফুপিমনিকে মেহেদি দেওয়া শুরু হয়ে গেছে!
চল, চল!”
তারপর হঠাৎ থেমে দুজনের দিকে চোখ ছোট করে তাকাল এই… কী কেস বেবি?
তোদের এমন অবস্থা কেন?
কী হয়েছে বল তো?”
পিয়াসা তাড়াতাড়ি বলল—
কিছু না রে…
ভাইয়াদের খুঁজছি।
তুবা সাথে সাথে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে
ভাইয়া নাকি সাইয়া?
হুমম হুমম
এই বলে সে দুইজনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে
দুজনের কান টেনে ধরল—
বল বল কেসটা কী।
ইনায়া লজ্জা পেয়ে বলল—
উফফ ছাড় না
তুবা হাসতে হাসতে বলল—
তোর সাইয়া আর পিয়াসার সাইয়া—
দুজনেই কিন্তু বাড়িতে নাই
দুজন একসাথে চমকে উঠল—
মানে?
তুবা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—
অফিসে গেছে…
কি একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ পড়েছে নাকি।
একটু থেমে চোখ টিপে বলল—
আর সাথে গেছে ওই পেকাটির নানিও গেছে
কথাটা শুনতেই—
ইনায়ার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
মনে মনে বলল—
সিরিয়াসলি?
এই সময়েও কাজ?
আর ওই তিয়াকে নিয়েই যেতে হলো?
তার ভেতরে ভেতরে রাগ জমতে লাগল।
ডেভিল একটা…
আরেকটা গালি দিতে গিয়েও নিজেকে থামাল।
চোখে রাগ, ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে রইল ইনায়া
পিয়াসার অবস্থাও খুব একটা ভালো না…
সে নিচু গলায় বলল—
এত সাজলাম আর আমার ময়েন মিসিং বালের কপাল
তুবা আবার হেসে বলল—
ওরে আমার দুটো লাভ বার্ডস
চল এখন মেহেদি দিতে হবে
সাইয়া তো পালায় নাই, আবার আসবেই!
ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে হাঁটতে লাগল…
কিন্তু মনে মনে বলতে লাগলো
আমার শেহেজাদা তুমি কোথায়?
পিয়াসা, তুবা সবাই মেহেদি নিচ্ছে
যার যার পছন্দ অনুযায়ী পার্লারের মেয়েরা মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে।
ইনায়া ছাদের এক কোণে মনমরা হয়ে বসে আছে।
হঠাৎ লিখন চৌধুরী বিষয়টা লক্ষ্য করে ইনায়ার মাথায় ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে বললেন—
কি হয়েছে আমার মা? মন খারাপ?
মেহেদি নিবা না?ইনায়া নিচু গলায় বলল—ভালো লাগছে না, চাচ্চু লিখন চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন—
চল, আমি দেখে দিচ্ছি কোন ডিজাইনটা তোমার হাতে ভালো লাগবে। চলো
এরপর ইনায়া তার চাচ্চুর কথামতো মেহেদি নিল।
কিন্তু মুখে এখনো কোনো হাসি নেই।
হঠাৎ মাইক থেকে ভেসে এল—
রাজ্জো কন্ঠ এখনই আমাদের মেইন প্রোগ্রাম শুরু হবে মা চাচি রা একটু ছোবুর করো থুক্কু অপেক্ষা করো
ঠিক তখনই—
ছাদের সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল ইউভি, রেদোয়ান আর তিয়া।
তিয়া ইউভির হাত ধরে আছে দেখে মনে।হচ্ছে পায়ে আঘাত পেয়েছে অনেক।
কিছুক্ষণ আগে ছাদে ওঠার সময় তিয়া পড়ে যাওয়ার এমন নাটক করেছিল—
যেন তাকে না ধরলে সে হাঁটতেই পারবে না।
ইউভি
“হাঁটতে না পারলে আমার হাত ধর
তিয়া যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল।
ইনায়াকে জ্বালানোর জন্য।তার এই প্ল্যানটাই যথেষ্ট ছিল।
আর তার প্ল্যানটা কাজও করেছে।
ইনায়া রাগে, কষ্টে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে।
ইউভি ছাদে উঠে তিয়া কে রেশমা চৌধুরির কাছে দিয়ে সবার মাঝে ইনায়াকে খুঁজছে।
হঠাৎ ইনায়ার ওপর চোখ পড়তেই তার বুক কেঁপে উঠল।
তার আদরের একি অবস্থা মন খারাপ কেন…?
চোখে পানি কেন…?
সবুজ পরিটার কী হলো…?
আমার দিলরুবা। ইউ আর ওকে?
রবিউল চৌধুরী মাইক নিয়ে বললেন—
আমরা প্রথমেই শুরু করবো আমাদের বাড়ির একমাত্র বড় ছেলে
শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী আমার নূর মার গান দিয়ে।
এই প্ল্যানটা আসলে ছিল রিমঝিমের।
ইউভি রাজি হলেও—
ইনায়াকে রাজি করানো যাচ্ছিল না।
মনে মনে ইনায়া ইউভিকে হাজারটা গালি দিচ্ছে—
লুচ্চা… সয়তান… এক নম্বর সয়তান!
এইবার আসিস আমার কাছে…
বালের শেহেজাদা!
কেউ যখন তাকে রাজি করাতে পারল না—
তখন ইউভি নিজেই এগিয়ে গেল।
সে ইনায়ার হাত ধরে টেনে তুলল।
নিজের হাতের মুঠোয় নিল তার হাত।
সবার সামনেই হাতে একটি চুমু খেল
ইনায়া জেন লজ্জাতে পুরো লাল হয়ে যাচ্ছে
আজ ইউভির পরনে হালকা সবুজ পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা…
হাতে দামী ঘড়ি, পায়ে কালো প্রিমিয়াম জুতো
একদম অনেক সুন্দর লাগছে তাকে।
দুজনকে একসাথে দেখে বাড়ির সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল—
মাশাআল্লাহ কারো নজর না লাগুক।
পাশ থেকে তিয়া মনে মনে বলে নজর তো আমার লাগছে বড় মা এই তিয়া চৌধুরীর নজর
গান শুরু হলো
ইউভি:
এতো কাছে আছো তুমি, তবু দূরে মনে হয়
আরও কাছে এসে তুমি ছুঁয়ে দাও এ হৃদয়
ইনায়া:
এতো কাছে আছো তুমি, তবু দূরে মনে হয়
আরও কাছে এসে তুমি ছুঁয়ে দাও এ হৃদয়
দুজন একসাথে:
আজ এ দিনটা হোক দুজনার ভালোবাসাতে
আরও মধুময়, ভালোবাসাতে আরও মধুময়
ইনায়া:
ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাতটা তোমার হয়ে যাবো হাওয়া
ইউভি:
হ্যাঁ, চুপিসারে করবো পূরণ
মনেরই যত চাওয়া
ইনায়া:
ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাতটা তোমার হয়ে যাবো হাওয়া
ইউভি:
হ্যাঁ, চুপিসারে করবো পূরণ
মনেরই যত আশা
দুজন একসাথে:
অনুভবে হারিয়ে যাওয়া, এই তো সময়, এই তো সময়
ইনায়া:
চেয়ে চেয়ে তোমার পানে
খুঁজবো প্রেমেরই মানে
ইউভি:
ভালোবাসার অথই জলে
ভিজবো যে গোপনে
ইনায়া:
চেয়ে চেয়ে তোমার পানে
খুঁজবো প্রেমেরই মানে
ইউভি:
ভালোবাসার অথই জলে
ভিজবো যে গোপনে
দুজন একসাথে:
অনুভবে হারিয়ে যাওয়া, এই তো সময়, এই তো সময়
গানের মাঝেই ইনায়ার অভিমান ফুটে উঠল—
চোখে জমল হালকা পানি চলেআসলো
গানের শেষ লাইনটা মিলিয়ে যেতেই যেন পুরো ছাদটা কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল…
এক মুহূর্ত
তারপর হঠাৎ করেই চারপাশে হাততালির শব্দে ভরে উঠল পরিবেশ। সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।সবাই বলছে মাশাআল্লাহ কি সুন্দর জুটি একদম একে অপরের জন্যই বানানো…
রেশমা চৌধুরী চোখে হালকা পানি নিয়ে তাকিয়ে আছেন দুজনের দিকে মুখে গর্বের হাসি।
অবশেষে আমার ছেলেটার সুখের দিন ফিরে পেলো।
লিখন চৌধুরী মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন আমার মেয়েটা বড় হয়ে গেছে…
পিয়াসা আর তুবা একে অপরের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি দিল কেসটা অনেক আগেই সিরিয়াস ছিল বালের মাথামোটা আমরা কিছু বুঝতে পারি নি।
রেদোয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে তাকিয়ে রইল ইনায়ার দিকে…
কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও…
ইনায়ার চোখ এখনো ভেজা।
তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। গান শেষ হয়েছে কিন্তু অভিমানটা শেষ হয়নি।
ইউভি তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে—
ঠিক তখনই ইনায়া হঠাৎ তার হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল।
একবারও পিছনে না তাকিয়ে।ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
চারপাশের হাসি, আলো, শব্দ সব যেন তার কাছে সব কিছু বিরক্ত লাগছে
ইনায়ার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল গালে ছাদের আলো পেরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে, নিচে নেমে গেল ইনায়া
নিজের রুমের দরজা বন্ধ করেই ইনায়া ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল।
হাতের মেহেদির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ…
তারপর ফিসফিস করে বলল আমার জিনিসে চোখ দিছো ছারবো না আমি
চোখের পানি এবার আর আটকে রাখতে পারল না।
এক এক করে গড়িয়ে পড়তে লাগল…
ইউভি আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
তার চোখ শুধু সিঁড়ির দিকেই ছিল…
“ইনায়া…”
ধীরে ধীরে সেও নেমে গেল নিচে।
ইনায়ার রুমের দরজার সামনে এসে থামল সে।
ভিতর থেকে হালকা কান্নার শব্দ ভেসে আসছে…
ইউভির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে ধীরে দরজায় নক করল আদর দরজা খোল প্লিজ
কোনো উত্তর নেই একবার কথা শোনো আদর
ভিতরটা নিস্তব্ধ।
ইউভি আর অপেক্ষা না করে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের এক কোণে বিছানায় মুখ গুঁজে কাঁদছে ইনায়া।
ইনায়ার কাঁধটা কাঁপছে…
ইউভি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে এগিয়ে গেল ইনায়ার কাছে
বিছানার পাশে বসে নরম গলায় বললএভাবে কাঁদছিস কেন?
ইনায়া মুখ তুলল না বরং আরও চুপ করে রইল।
ইউভি হাত বাড়িয়ে তার কাঁধে আলতো ছোঁয়া দিল
আমার দিকে তাকা
ইনায়া এবার মুখ তুলে তাকাল।
চোখ লাল হয়ে গেছে গাল ভেজে গেছে চোখের পানিতে
ভাঙা গলায় বলল কেন এসেছেন ? ওই তিয়ার হাত ছেড়ে আসতে কষ্ট হলো না?
কথাটা শুনে ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল…
তারপর হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল সত্যিই কি মনে করিস আমি ইচ্ছা করে ওর হাত ধরেছি
ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে নিল আমি কিছু মনে করি না।
ইউভি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল মনে করিস বলেই তো এত অভিমান…”
এই বলে সে ধীরে ইনায়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
ইনায়া সরাতে গেল কিন্তু ইউভি শক্ত করে ধরে রাখল আটকে রাখল নিজের বুকের মাঝে
শোন তিয়া পায়ে বেথা পেয়েছিল এই জন্য আমার হাত ধরে এসেছিল আমি ওকে জাস্ট বোন এর নজরে দেখি তুই বাদে সবার আমার বোন
জানিস আমি সবসময় তোকেই খুঁজছিলাম…”
ইনায়ার চোখ আবার ভিজে উঠল তাহলে এত দেরি করলেন কেন।
ইউভি ইনায়াকে নিজের দিকে টেনে নিল।
ইনায়া অবাক হয়ে গেল ইউভির বুকের সাথে ধাক্কা খেল।
ইউভি ইনায়া কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তারপর ধীরে ধীরে ইনায়া ইউভির শার্টটা মুঠো করে ধরল।
চোখ বন্ধ করে ফেললো
ইউভি ইনায়ার মাথায় আলতো করে চুমু খেল…
আমার রাগী আদর
তারপর কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো
আমার অভিমানী আদর
ইনায়ার গাল ধরে আলতো করে উপরে তুলল
আর আমার একমাত্র দিলরুবা
ইনায়ার চোখ থেকে আবার পানি গড়িয়ে পড়ল— কিন্তু এবার সেই কান্নার ভেতরেও একটুখানি শান্তি আছে।
সে আস্তে বলল আপনি খুব খারাপ ইউভি ভাইয়া
ইউভি হেসে বলল শুধু তোর জন্য তোর কাছে আমি সবসময় খারাপ থাকতে চাই। সারাজীবন আই রিপিট সারাজীবন
তারপর আবার ইনায়া কে বুকে জড়িয়ে নিল।
ঘরের নিঃশব্দতায় দুজনের নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল বাইরে এখনো মেহেদির গান বাজছে…
কিন্তু এই ছোট্ট রুমের ভেতর ভালোবাসার একটা আলাদা দুনিয়া তৈরি হয়ে গেছে
হটাৎ ইউভি খেয়াল করলো।ইনায়া এখোনো।কান্না করছে
কি হয়েছে আদর এখোনো।কান্না করছিস?
ইনায়া মুখ ঘুরিয়ে বললো কিছু না।
ইউভি হালকা হেসে বললো।
এই কিছু না -র মধ্যেই তো সব কিছু থাকে
তোরা মেয়েরা কিছু না।বললেই বুঝি কিছু একটা বড় সমস্যা আছে এই কিছুনার মাঝে
ইনায়া এবার ইউভির দিকেমতাকায় চোখে অভিমান স্পষ্ট।
আপনার সাথে তিয়া সবসময় আঠার মতো লেগে থাকে কেন…?
ইউভি ভ্রু তুলে মুচকি হেসে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে
লেগে থাকলে কি হয়েছে হুম…?এতো হিংসুটে কেন কি হই আমি তোর
একদম স্পষ্ট কণ্ঠে ইনায়া বললো
সম্পর্কের নাম যাই হোক না কেন
আমি মারাত্মক হিংসুটে।
যেটা আমারসেটা একান্তই আমার।
এক বিন্দুও আমি শেয়ার করবো না ইউভি ভাইয়া
এক মুহূর্ত নীরবতা নেমে।এলো দুজনের মাঝে
ইউভির চোখ নরম হয়ে গেল।
ইউভি বললো তাহলে
তোর আর আমার সম্পর্কটা কী বুঝতে পারছিস ?
ইনায়া আস্তে বললো
জানি না…
শুধু এইটুকু জানি—
আপনি আমার আমার শুধু আমার।একটু থেমে আবার তাকায় ইনায়া ইউভির দিকে।
ইউভি ভাইয়া…
আপনার ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্কটা কী…?
ইউভি ধীরে এগিয়ে আসে…
ইনায়ার সামনে দাঁড়ায়…
ইনায়ার কপালে চুমু দিয়ে ইউভি নরম গলায় বলে আমি ও জানি না শুধু এইটুকু জানি—
তুই আমার লাইফের অনেক স্পেশাল পারসন…
যাকে ছাড়া আমি…
ভীষণ নিরামিষ।
একটু ঝুঁকে আবার বললো
ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে—ইউভি
এখন চল…
তোকে ছাড়া খুব শূন্য শূন্য লাগছে, আদর…
ইনায়ার চোখ আবার ভিজে ওঠে…
ইনায়া হালকা কাঁপা গলায় বলে
কারো জীবনে আমি এতটাও স্পেশাল না…
যে আমি না থাকলে কারো জীবন শূন্য শূন্য লাগবে…!
ইনায়ার কথা শেষ হতেই ঘরের ভেতর আবারও নীরবতা নেমে এলো…
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে, খুব ধীরে এগিয়ে এসে ইনায়ার দুই গাল নিজের হাতে তুলে ধরল।
নরম গলায় বলল তুই যে আমার কি এই টা তুই নিজেই বুঝে।নিবি
ইনায়ার বুকটা কেঁপে উঠল। চোখ ভরা পানি নিয়েই সে ফিসফিস করে বলল কথা দেন ইউভি ভাইয়া আপনি শুধু আমার। এক সেকেন্ডও দেরি করল না ইউভি। তার কণ্ঠ দৃঢ় হয়ে উঠল—
কথা দিলাম।
এই দুইটা শব্দ যেন ইনায়ার সব অভিমান গলিয়ে দিল। তার ঠোঁটে ধীরে একটা শান্ত হাসি ফুটে উঠল
ইউভি হালকা হেসে বলল।এখন চল আদর না হলে লিখন চৌধুরী আমাকে ধমকাবে।
এই বলে সে আলতো করে ইনায়ার হাতটা ধরল। তার আঙুলের ফাঁকে আঙুল জড়িয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ইনায়া আর কিছু বলল না শুধু চুপচাপ তার সাথে হাঁটতে লাগল।
দুজন আবার ছাদের দিকে উঠতেই— দূর থেকেই হইচই শোনা গেল।
ইউভি ভ্রু কুঁচকে বলল এবার আবার কী শুরু হলো?
ছাদে উঠে তারা যা দেখল দুজনেই একদম থমকে গেল।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাজ্জো আর তুবা দুজনের তর্ক জমে একেবারে যুদ্ধ পর্যায়ে!
রাজ্জো অবাক হয়ে তুবাকে বলছে।এই ৫ ফিটের লিলিপুট। মাথায় কী গিলু বলতো? সামনে এত বড় একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাও না নাকি?।
তুবা কোমরে হাত দিয়ে, মেকি হাসি দিয়ে বলল।ওলে বাবা লে! আমার সামনে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে বুঝি? কই? আমি তো একটা আস্ত সাদা মুলা দেখতেছি।
পাশ থেকে সবাই হেসে উঠতেই— তুবা আরও গরম হয়ে বলল সরে যান সামনে থেকে না হলে কিন্তু মুলার কিমচি বানিয়ে খেয়ে ফেলবো বলে দিলাম
চারপাশে দমফাটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
রাজ্জোও ছাড়ার পাত্র না সে তুবারের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল—
এই হাইটের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ পাইছো— এইটাই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভাগ্য, বুঝছো?
তুবা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল ভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য—এখনো কনফিউশনে আছি।
ইউভি পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল এই থাম তোরা
ইনায়া ধীরে ইউভির দিকে। দিকে তাকাল।মনে।মনে বললো এই মানুষ টা আমার শুধু আমার
ছাদের আলো, হাসি, গান সবকিছুর মাঝে দাঁড়িয়ে ইনায়া শুধু একবার নিজের হাতের দিকে তাকাল…
ইউভির হাত এখনো শক্ত করে ধরা।
শেহেজাদার আদর পর্ব ১৭
আর সে আর ছাড়াতে চাইল না…
আর ইউভি ছোট্ট করে একটি চিমটি কাটলো ইনায়ার হাতে।
কানে কানে ফিসফিস করে বললো বড্ড বিরক্ত করিস আমাকে।
ইনায়া বললো আমি কি করলাম?
