Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর

ঘরটার ভেতরের পরিবেশ তখন যেন মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধ। মিটমিটে বাল্বের ক্ষীণ আলোয় চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে ভাঙা চেয়ার, আর ধুলোবালি। কয়েকজন গুণ্ডা মেঝেতে কাতরাচ্ছে, কেউ মুখ চেপে ধরে বসে আছে, আবার কেউ ভয়ে দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি।তার চোখ দুটো রক্তিম, হাতের আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে গেছে। মুখে কোনো চিৎকার নেই, নেই কোনো তাড়াহুড়ো। সেই নীরবতাই যেন আরও ভয়ংকর কিছু বোঝাচ্ছে
সে ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,

— তোরা খুব ভাগ্যবান। আজ আমার আদরের নিঃশ্বাস চলছে বলেই এখনো বেঁচে আছিস।
তারপর নিজ হাতে একে একে সবাইকে এমন শাস্তি দিল, যেন প্রত্যেকটা আঘাতে তার বুকের ভেতরের ভয়, কষ্ট আর অসহায়ত্ব বেরিয়ে আসছে।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো। পুলিশ এসে একে একে সবাইকে নিয়ে যেতে লাগল।ঠিক তখনই ইউভি রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, মশা মেরে হাত নোংরা করার মতো মানুষ আমি, শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী নই।
রেসব অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— ব্রো, তোর এখনো আর কী করার বাকি আছে বল তো?
ইউভি কপালে হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বললো
— এখন আপাতত আমার কিছু করার ইচ্ছে নেই। তবে ভোরের আলো ফোটার আগেই যা করার, আমি করব। এখন আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে… আমার আদরের কাছে।কথাটা বলেই সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একবার আরেকবার তার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে পারছে—এই নীরব মানুষটার ভেতরে এখন ভয়ংকর এক ঝড় বইছে।
ধীরে ধীরে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

অন্যদিকে হাসপাতালের করিডোরে তখন এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা বয়ে যাচ্ছে
রিমঝিম বাড়ির সব গিন্নিদের আসতে নিষেধ করেছেন। তাই করিডোরে উপস্থিত আছেন শুধু রাতিব চৌধুরী, লিখন চৌধুরী, রাইহান চৌধুরী, রাশেদ মির্জা, রেদোয়ান প্রত্যেকের মুখেই উদ্বেগের ছাপ।হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর করিডোরের নিস্তব্ধতা যেন সবার অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ লিখন চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
কে করেছে এসব, রেদোয়ান?রেদোয়ান কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি পুরুষালি, গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো কিছু সময় পর সব জানতে পারবেন সবাই। সবাই পিছু ঘুরে তাকাল।সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি।

তার কালো শার্টে ধুলো আর রক্তের হালকা দাগ লেগে আছে। হাতের গাঁট ছড়ে গেছে, কিছু জায়গায় রক্ত জমে কালচে হয়ে আছে।
লিখন চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন, ইউভি… তোমার হাতে কী হয়েছে, বাবা?
ইউভি বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। কিছু হয়নি, বাবা। আপনারা চিন্তা করবেন না।কথাটা বলেই সে রাজ্যের দিকে তাকাল।তার গলায় স্পষ্ট অস্থিরতা।
কী অবস্থা আমার আদরের?
রাজ্য ধীরে ধীরে সবার সামনে এসে দাঁড়াল। তার মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট।
ইউভি তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে বলল,

— কী হয়েছে, রাজ্য? আমার আদর ঠিক আছে তো?রাজ্য মৃদু স্বরে বলল,ওকে অজ্ঞান করার জন্য ওরা সম্ভবত মিডাজোলাম (Midazolam) জাতীয় শক্তিশালী সেডেটিভ ব্যবহার করেছে। সাধারণত এতটা ডোজ দেওয়া হয় না। বেশি পরিমাণে দেওয়ার কারণেই ইনায়ার জ্ঞান ফিরতে দেরি হচ্ছে।
কথাটা বলে সে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
তারপর শান্ত গলায় বলল, তবে চিন্তার কিছু নেই। আল্লাহর রহমতে অন্য কোনো সমস্যা নেই। আর… ওরা যেটা বলেছে, সেটা সত্যি। ইনায়ার গায়ে কেউ স্পর্শ করেনি।কথাটা শুনে ইউভি গভীর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ ধরে বুকের ওপর চাপা পড়ে থাকা বিশাল একটা পাথর সরে গেছে।সে ধীরে ধীরে রাইহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিল। রেডি থাকবেন।রাইহান চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেন, কিসের জন্য?ইউভির ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। মজা দেখাব আমি।
তার চোখের সেই চাহনি দেখে রাইহান চৌধুরী কিছু একটা আন্দাজ করতে পেলো।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল।
হাসপাতালের করিডোরে বসে থাকা ইউভির চোখ হঠাৎ গিয়ে পড়ল রেদোয়ানের দিকে।ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে আছে।চোখদুটো লাল হয়ে গেছে কান্নায়।ইউভি ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে বসল।
তারপর শান্ত গলায় বলল, ব্রো… বাসায় চলে যা।
রেদোয়ান বিস্ময়ে তাকাল। আমার বোনুর এই অবস্থা, আর তুমি আমাকে বাসায় যেতে বলছ?
ইউভি মৃদু হেসে বলল,আমার ওপর ভরসা আছে তো?রেদোয়ান এক মুহূর্ত চুপ থেকে মাথা নাড়ল।
ইউভি তার কাঁধে হাত রাখল। তাহলে আমার বোনটার কথা তুই ভাববি না। আমি চাই না, আমার আদরের জন্য আমার বোনের মনে বিন্দুমাত্র খারাপ লাগা কাজ করুক।
সে কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, আমি কী বলতে চাইছি, আশা করি বুঝেছিস।তার কণ্ঠটা এবার আরও গভীর হয়ে উঠল। তোর বোনের দায়িত্ব আমি আজ থেকে না… এগারো বছর আগে থেকে নিয়েছি। ঠিক তখন থেকে আমি ওকে আগলে রেখেছি, যখন আমাকে আগলে রাখার জন্য অন্য কারও প্রয়োজন ছিল।
রেদোয়ানের চোখ ছলছল করে উঠল।

ইউভি মৃদু হাসল। আজ থেকে তুইও একইভাবে আমার বোনটাকে আগলে রাখিস। বাসায় চলে যা। আমি আগামী তিন ঘণ্টার মধ্যে আমার আদরকে নিয়ে বাড়ি ফিরব।তারপর হটাৎ ইউভির যেন কিছু মনে পড়ল।
—আর যাওয়ার আগে একটা টি-শার্ট কিনে দিয়ে যা। এই ভারী লেহেঙ্গায় ওর নিশ্চয়ই খুব অস্বস্তি হচ্ছে।কথাটা শেষ হতেই রেদোয়ান আর নিজেকে সামলাতে পারল না।সে উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত করে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল।কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
— ব্রো… আই’ম রিয়েলি সরি। আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। তখন আমার মাথা কাজ করছিল না।
ইউভি তার পিঠে হাত রেখে মৃদু হেসে বলল,
ভাগ্যিস তখন একটু পাগলামি করেছিলি! না হলে তোর মতো কাপুরুষের হাতে আমি আমার বোনকে দিতাম নাকি?রেদোয়ান চোখের জল মুছে হেসে ফেলল। ভাইয়া…ইউভিও মুচকি হাসল।
কিছুক্ষণ পর রেদোয়ান ধীরে বলল, আসি, ব্রো।
সাবধানে যাস।রেদোয়ান চলে গেল।
তারপর ইউভি আবার ইনায়ার কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল।এক এক করে রিমঝিমসহ বাড়ির সবাইকে বাসায় যেতে বলল।কেউ রাজি হচ্ছিল না।

শেষ পর্যন্ত একপ্রকার জোর করেই সবাইকে পাঠিয়ে দিল সে।কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো করিডোর প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।শুধু ইউভি আর রাজ্য থেকে গেল রাজ্য বহুবার বলল,ভেতরে গিয়ে ওর কাছে বস।কিন্তু ইউভি উদাস দৃষ্টিতে কেবিনের দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
না, ব্রো… জ্ঞান ফিরলে আমাকে বলিস। তার আগে ওকে ওই অবস্থায় দেখতে পারব না।তার কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট।ঠিক তখনই একটি নার্স দ্রুত হেঁটে এসে বলল, স্যার, পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে।
রাজ্য ভেতরে যেতে উদ্যত হতেই ইউভি তাকে থামিয়ে দিল। আমি যাচ্ছি, ব্রো। তুই শুধু বল, ওকে কখন বাসায় নিয়ে যেতে পারব?রাজ্য হেসে বলল,
এখনই নিয়ে যেতে পারবি।
ইউভির ক্লান্ত মুখে অবশেষে একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল।সে ধীরে বলল,থ্যাঙ্কস, ব্রো।তারপর কাঁপা হাতে কেবিনের দরজার হাতল স্পর্শ করল…

ইউভি কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল, ইনায়া আধশোয়া হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।দুজনের চোখে চোখ পড়তেই ইনায়া মুচকি হেসে দিল।খুব আস্তে, ফিসফিস করে বলল,
আমার শেহজাদা…শব্দটা কানে যেতেই ইউভির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।সে ধীরে ধীরে ইনায়ার কাছে এগিয়ে গেল। তারপর তার হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বিছানার পাশে বসে পড়ল।
আস্তে করে ইনায়ার কপালে একটি চুমু দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
এতটা কষ্ট দেওয়ার পরও কি আপনার মন ভরে না, মিসেস চৌধুরী?
ইনায়া ম্লান হেসে বলল, না, বর। আপনাকে আমি সারাজীবন কষ্ট দেব।কথাটা শুনে ইউভির চোখের কোণে জমে থাকা জল চিকচিক করে উঠল।
পরের মুহূর্তেই সে ইনায়ার কপালে, চোখে গালে আর ঠোঁটে একের পর এক স্নেহভরা চুমু এঁকে দিল।
তারপর ইনায়ার হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে ধরে কাঁপা গলায় বলল,

— কষ্ট পেয়েছিলি? খুব ভয় পেয়েছিলি?ইনায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। একটুও না।ইউভি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।ইনায়া দুষ্টু হেসে বলল, আমি জানতাম, আমার শেহজাদা ঠিক আমাকে খুঁজে বের করবে। আপনি আমাকে বাঁচাতে আসবেন কথাটা শুনে ইউভির বুকটা অদ্ভুত এক উষ্ণতায় ভরে গেল।
সে আবারও ইনায়ার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল বেয়াদব একটা!ইনায়া হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর ইউভি নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
এখন কেমন লাগছে?ইনায়া একটু ভেবে বলল,
মাথাটা একটু ভারী লাগছে। তা ছাড়া সব ঠিক আছে।ইউভি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।তারপর পাশে রাখা একটি প্যাকেট হাতে তুলে নিল।প্যাকেট খুলে একটি নরম সাদা টি-শার্ট বের করল।
মৃদু হেসে বলল, এটা পরে নে। এই ভারী লেহেঙ্গায় তোর খুব কষ্ট হচ্ছে।ইনায়া টি-শার্টটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল।তারপর ধীরে বলল,
আমার শেহজাদা আমার সবকিছু আগে থেকেই ভেবে রেখেছে, দেখি ?ইউভি তার কপালের ওপর হাত বুলিয়ে দিয়ে উত্তর দিল,

আপনাকে নিয়ে ভাবাটাই তো আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ, মিসেস চৌধুরী।
চৌধুরী ভিলার বিশাল হলরুমজুড়ে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। সবাই সেখানেই বসে আছে, তবে আগের মতো সেই দমবন্ধ করা আতঙ্কটা আর নেই। কারণ কিছুক্ষণ আগেই রাজ্য ফোন করে জানিয়েছে ইনায়ার জ্ঞান ফিরেছে।খবরটা শোনার পর থেকেই সবার বুকের ওপর জমে থাকা পাথরটা যেন খানিকটা সরে গেছে। সবাই বারবার আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন।
সবার অপেক্ষা একটাই—
কখন ইউভি তাদের আদরের নূরকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
এইদিকে হসপিটালের কাজ শেষ করে ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার কাছে এগিয়ে গেল।তারপর কোনো কথা না বলে আলতো করে তাকে কোলে তুলে নিল।
ইনায়া অবাক হয়ে বলল, আমি হেঁটে যেতে পারবো
ইউভি তার কপালে চুমু দিয়ে মৃদু হেসে বলল,
বিরক্ত করে না বউ।

ইনায়া মুচকি হেসে নিজের মাথাটা তার বুকের মাঝে গুঁজে দিল।কেবিনের দরজার কাছে এসে ইউভি পেছন ফিরে বলল,রাজ্য, আমরা রওনা হচ্ছি। তুইও চলে আয়, ব্রো।রাজ্য ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,যেতে তো হবেই আমার পিচ্চি যে অপেক্ষা করছে
রাজ্য ও চিৎকার করে বললো ঠিক আছে। তোরা আগে যা, আমি আসছি।ইউভি মাথা নাড়ল।
তারপর নিজের পৃথিবীটাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ধীর পায়ে হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে বাইরে চলে এল।
রাত অনেক হয়েছে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬২ (২)

চারপাশের শহরটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ইউভি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছে।
আর ইনায়া…সে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো ইউভির বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে।
এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে তার আদরকে।
মাঝেমধ্যেই ইউভি নিচু হয়ে ইনায়ার কপালে আলতো করেো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিচ্ছে।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here