Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৭

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭
সুমাইয়া ইসলাম নূর

বসন্তের মিষ্টি সকাল।
হালকা রোদ, নরম বাতাস…
চারপাশে কাঁচা ফুলের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।
কলেজের সামনে গাছগুলোতে নতুন পাতা র দেখা মিলেছে।
কোথাও কোথাও লাল শিমুল ফুল ফুটে আছে—
পুরো পরিবেশটা যেন একদম জীবন্ত লাগছে ।
ঠিক তখনই—
একটা গাড়ি এসে থামল কলেজ গেটের সামনে।
গাড়ি থেকে নামল ইনায়া আর পিয়াসা।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল গেটের দিকে
ইনায়ার চুল সুন্দর করে বেনি করা—
হালকা লালচে আভা, হাঁটুর নিচ পর্যন্ত নেমে গেছে চুল গুলো ।
আর পিয়াসার চুল কোমর পর্যন্ত,
হালকা বাতাসে উড়ছে। দুজনের গল্প করতে করতে নিচের দিকে আগাচ্ছে
হঠাৎই—

“আহ!”
গেটের পাশের একটা কাঁটাযুক্ত গাছের সাথে
ইনায়ার বেনিটা আটকে গেল।
সে বিরক্ত হয়ে বলল—
“ধুর! বালের চুল… কেটে ফেলবো এই চুলদাঁড়া
পিয়াসা হেসে উঠল—
এই পাগল দাঁড়া দাঁড়া
সে এগিয়ে এসে আস্তে করে চুলটা ছাড়াতে লাগল—
“বেবি, আমি ছাড়িয়ে দিচ্ছি…”
ইনায়া মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো—
“এই জন্যই বলি চুল খোলা রাখাই ভালো ছিল।
পিয়াসা হেসে বলল—
না রে, আজ তোকে অনেক সুন্দর লাগছে।”
চুল ছাড়িয়ে দিয়ে বলল—
“হয়ে গেছে, ম্যাডাম।”
ইনায়া চুলটা ঠিক করতে করতে বলল—
“বেবি, আজ একটু পার্লারে যাবো… কাজ আছে।”
পিয়াসা বললো আমার ও কাজ আছে তাহলে চল আজ একটু কারিসমা দেখিয়ে দেই—
ঠিক তখনই—

পেছন থেকে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল তুবা।
“উফফ! কতদিন পর!”
পিয়াসা হেসে বলল—
“তুই কোথায় ছিলি এতদিন?”
তুবা এবার পিয়াসার দিকে তাকিয়ে—
“এই! সালি আমি কোথাই ছিলাম মানে তুই তো একদম গায়েব হয়ে গেছিলি!”
পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরে বলল—
“অনেকদিন পর দেখলাম তোকে!”
তিনজন একসাথে দাঁড়িয়ে হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর—
পিয়াসা হঠাৎ বলল—
“আচ্ছা, তোর ওই রুদ্র ভাইয়ার কাহিনীটা কী হলো?”
ইনায়া একটু থেমে গেল।
তুবা মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।
তুবা আগ্রহ নিয়ে—
কোন ছাও পুনা হয় নি বেবি
ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলল—

“ধুর! কিছু না…ও অন্য কাউকে ভালোবাসে।”
এক সেকেন্ড চুপ থেকে
পিয়াসা আর তুবা একসাথে হেসে উঠল—
“হাহাহা!”
ইনায়া চোখ রাঙিয়ে—
“হাসো! যত খুশি হাসো!”
আরও রেগে বলল ইনায়া
“আমার স্বপ্নের শেহেজাদা আসলে তখন দেখবো
কি করো তোমরা! হুম!”
তার অভিমানী মুখটা দেখে—
তুবা আবার হেসে বলল—
“ওহহ! শেহেজাদা!”
পিয়াসা মজা করে—
“আমরা তো তখন লাইভ শো দেখবো!”
ইনায়া আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল—
বালের বান্ধবী জুটেছে কপালে
বালের কপাল

সূর্যটা
ধীরে ধীরে নেমে এসেছে শহরের উপর।
অফিসের বড় কাঁচের জানালা দিয়ে রোদ ঢুকে পড়েছে ইউভির কেবিনে।
চারপাশে সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে—
ফাইল, মিটিং, কাজ…
কিন্তু ইউভির মন টাই আজ ঠিক জাইগাই নায়
কিছুই ঠিকমতো লাগছে না ইউভির।
ইউভি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে,
সামনে খোলা ল্যাপটপ—
কিন্তু তার চোখ সেখানে নেই।
তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে—
সকালের সেই চুড়ির ঝুনঝুন শব্দ…
ইনায়ার হাসি…
তার খোলা চুল…
আর কতো জালাবি ইডিয়েট …”
নিজের কপালে হাত ঠেকাল সে।
“আজ একদমই কাজের মুড নেই…”
চোখ বন্ধ করতেই আবার সেই দৃশ্য—
ইনায়া…

তার হাতে সেই চুড়ি…
মুখে হালকা হাসি
ইউভি গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল।
গ্যালারি খুলল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
ইনায়ার একটি চুলের ছবি…
হয়তো কোনো এদিন লুকিয়ে তুলে রাখা।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে করে—
ফোনের স্ক্রিনে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
চোখ বন্ধ করে মৃদু স্বরে বলল—
“অনেক অপেক্ষা করিয়েছো, লিখন চৌধুরীর আর না…”
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক দুষ্টু, আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল—
“এখন দেখবা…

এই শেহেজাদা ইউভি চৌধুরী কী জিনিস।”
চেয়ার থেকে একটু সোজা হয়ে বসল সে।
চোখে সেই চেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—
“তুমি যদি আমাকে বাধা দাও…”
“আমি দেখিয়ে দিবো—
আমি কী করতে পারি।”
“খেলাটা এতদিন তোমাদের ছিল…
এখন থেকে আমার।”
ফোনটা টেবিলে রেখে দিল সে।
তার চোখে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই—
শুধু একরাশ জেদ…
আর অধিকারবোধ।
ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—

“তুই পালিয়ে থাকতে পারবি না, আদর…
শেষ পর্যন্ত—
তোকেই আমার কাছে আসতে হবে।”ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বললো ইউভি
“আর যদি না আসিস…”
“তোর বাপ-চাচাদের সাথে…
তুইও জ্বলবি।”

কলেজ শেষ হতেই—
তিন বান্ধবী একসাথে গেট থেকে বের হলো।
ইনায়া ফোন বের করে কারো সাথে কথা বলল—
“আজ গাড়ি আসা লাগবে না …
আমরা আজ একটু দেরি করে বাসায় ফিরব,
পার্সোনাল কাজ আছে।”
কল কেটে দিয়ে পিয়াসার দিকে তাকাল—
“চল, হাঁটি।”
তিনজন হেসে হেসে পার্লারের দিকে রওনা দিল।
শহরের সবচেয়ে বড় আর নামকরা পার্লারটাতে ঢুকতেই—
ঠান্ডা এসির হাওয়া আর সুন্দর সাজানো ইন্টেরিয়র—
একদম অন্যরকম একটা ফিল দিল।
তিনজন একসাথে বসে পড়ল।
তারপর শুরু হলো তাদের বিউটি সেশন—

ফেশিয়াল (Glow Facial)
ক্লিনআপ
হেয়ার স্পা
ম্যানিকিউর
পেডিকিউর
আইব্রো শেপিং
লাইট মেকআপ টাচ
হাসি-ঠাট্টার মাঝেই একে একে সব সার্ভিস শেষ হলো।
সবশেষে—
ইনায়া আয়নার সামনে বসে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল—
“বেবি… আমি চুল কাটবো।”
“কি????”
পিয়াসা প্রায় চিৎকার করে উঠল—
“মানে কি!
তোর এই লম্বা চুল কাটবি?”
ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে—
“হ্যাঁ রে… এত বড় চুল সামলাতে অনেক কষ্ট হয়।
বেশি কাটবো না… তোর চুলের মতো করবো।”
পিয়াসা মাথা নাড়ল—
“না! বড়দের কাছে না বলে চুল কাটবি না বেবি!
বাড়িতে শুনলে কাটতেই দেবে না!”
পিয়াসা একটু ভেবে বলল—

“আচ্ছা… ঠিক আছে… বুঝছি।
তাহলে ফুপি মনিকে একটা কল দে।”
পিয়াসা সাথে সাথেই—
“না না! পিহু! কাউকে জানাবো না!
বাড়ি গিয়ে সারপ্রাইজ দিবো!”
পিয়াসা একটু হেসে—
“ওকে… তবে আমার চুলের থেকে একটু বেশি রাখিস।”
পিয়াসা চুলে আঙুল দেখিয়ে বললো
“এক ইঞ্চি বেশি কাটলে কিন্তু কথা বন্ধ!”
ইনায়া হেসে জড়িয়ে ধরল—
“ওকে বেবি… উম্ম্ম্ম্ম্মা!”
তারপর ইনায়া পার্লারের মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল—

“আপি, পাঁচ ইঞ্চি কেটে দিন… এর বেশি না।”
মহিলা মাথা নেড়ে কাজ শুরু করলেন।
কাঁচির টুকটুক শব্দে_____
ধীরে ধীরে কমতে লাগল ইনায়ার চুলের দৈর্ঘ্য…
আয়নায় নিজের নতুন লুক দেখে—
ইনায়ার চোখে এক অদ্ভুত অনুভূতি ফুটে উঠল।
সব কাজ শেষ হতে হতে—
সন্ধ্যা নেমে এসেছে শহরে।
হালকা বাতাস, রাস্তার লাইট জ্বলে উঠছে একে একে।
তিন বান্ধবী হেসে গল্প করতে করতে
হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরছে।
হঠাৎই—
একটা গাড়ি এসে তাদের সামনে গিয়ে থামল।
ব্রেকের শব্দে তিনজনই থমকে গেল।
এক কিচু সেকেন্ড এর জন্য
নীরবতা।
তারা একে অপরের দিকে তাকাল—
তারপর ধীরে ধীরে চোখ গেল গাড়িটার দিকে
হঠাৎ গাড়ির দরজা খুলে—
নামল ইউভি আর রেদোয়ান।
পিয়াসা অবাক হয়ে বলল—
“ভাইয়া! তোমরা এই সময়?”
ইউভি হালকা হেসে বলল—

“মেজো মা ফোন দিয়েছিল। বলল, তোরা নাকি বাসায় ফিরিসনি…
তাই বাসায় যাওয়ার সময় তোদের নিয়ে যেতে বলল।”
পিয়াসা বললো আমরা এখানে আছি তোমরা জানলে কি করে।
ইউভি বলে আছে হয়তো কিছু যেইটার মাধ্যমে জানতে পেরেছি।
পিয়াসা আর কোন কথা বারাই না
ইনায়া শান্ত গলায় বলল—
“আমরা তো এখনই যাচ্ছিলাম… ভালোই হয়েছে তোমরা এসেছো।”
“চল, ওঠ।”
সবাই গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
পথে তুবাকে নামিয়ে দিয়ে যাবে তারা
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর—
রেদোয়ান ভ্রু তুলে বলল—
“এখন বলো তো…

চৌধুরী বাড়ির মেয়েরা আজ এত দেরি করে কেন ফিরছে?”
ইনায়া হালকা হেসে—
“মেয়েদের অনেক কাজ থাকে, ভাইয়া…
আজ আমরা পার্লারে গিয়েছিলাম।
অফার ছিল, তাই সব সার্ভিস নিয়ে নিলাম।”
গাড়ির আয়নায়—
শুরু থেকেই ইউভি তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে।
চুপচাপ… গভীরভাবে।
তার চোখে অদ্ভুত একটা অনুভূতি—
মনে মনে বললো ইউভি—
“এমনিতেই যে রূপ…
তার উপর আবার পার্লারে যেতে হয়?”
চোখ নামিয়ে আবার তাকাল আইনায়—
“আমি তো এক্ষুণি জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি…
আদর… তোর আর রূপের আগুন লাগবে না…”
ঠিক তখনই—

পিয়াসা হেসে বলল—
“আরও আগেই হয়ে জেতো আমাদের ভাইয়া…
আমাদের মহারানী তার লম্বা চুল কেটে ফেলেছে!”
“চুল কে*টে ফেলেছে…”
এই কথাটা যেন হঠাৎ গিয়ে আঘাত করল কারো ভেতরে।
হঠাৎ—
শব্দ করে
গাড়ির ব্রেক চাপল ইউভি।
সবাই সামনের দিকে একটু ঝুঁকে গেল।
তুবা বললো
“কি হলো?”
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
ইউভি ধীরে ঘুরে তাকাল।
তার চোখ এখন পুরো বদলে গেছে।
গভীর… তীক্ষ্ণ… রাগে ভরা।
“কি বললি?”
তার কণ্ঠ ঠান্ডা… কিন্তু ভয়ংকর।
“কে চুল কেটেছে?”
পিয়াসা একটু কেঁপে উঠে বলল—
“ক… কেন ভাইয়া… ইনায়া…”
ইউভির চোখ এবার সরাসরি ইনায়ার দিকে—
“কতটুকু কাটছিস?”
ইনায়া একটু ভয় পেয়ে—
“বেশি না… ভাইয়া… মাত্র পাঁচ ইঞ্চির মতো…”
“কি???”

ইউভির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
সে হঠাৎ দরজা খুলে বাইরে নামল।
তারপর ইনায়ার দিকের দরজাও খুলে দিল—
“নাম।”
ইনায়া অবাক, ভয় পেয়ে নামল।
কিছু বোঝার আগেই—
ইউভি তার দুই গালে পঁচিটি থাপ্পড় মারে ইউভি
“তুই জানিস… তোর এই চুলের দাম কী
তার গলায় রাগ… কষ্ট… অধিকার—সব মিশে গেছে।
“এক ইঞ্চি কাটার আগে একবারও ভাবলি না?”
ইনায়া কাঁপা গলায়—
“আমি… আমি তো…”
ইউভি চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল।
সে দাঁত চেপে বলল—
“নেক্সট টাইম…
এক ইঞ্চি চুল কাটার আগে—
এই মুহূর্তটা মনে রাখিস…”
ইউভির কণ্ঠ কাঁপছে…
রেদোয়ান দ্রুত নেমে এসে বলল—
“ভাই! শান্ত হও!” কি করলে তুমি এই টা আমার কলিজার সাথে
তারপর ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল—

“বোনু… ঠিক আছিস?”
ইনায়ার চোখে পানি চলে এসেছে—
“ভাইয়া… উনি এমন করলো কেন…?”
রেদোয়ান চুপ করে রইলো
ইউভি মুখ ঘুরিয়ে বলল—
“তোর বোন তোর কলিজা হতে পারে…
কিন্তু আমার কাছে কী—
তুই খুব ভালো করেই জানিস।”
একটু থেমে—
“ওদের নিয়ে বাড়ি যা…
আমার সামনে থেকে সরিয়ে নে…
না হলে আমি কী করে ফেলবো—নিজেও জানি না…”
মনে মনে শুধু একটা কথাই বললো—

শেহেজাদার আদর পর্ব ৬

“যেটা আমার…
সেটা আমি নষ্ট হতে দেবো না…”
কোনদিন ও
না আই রিপিট
কোনোদিন ও না..।.।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮