শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৪
সুরভী আক্তার
বাইরের এতো সব চেঁচামেচি, হট্টগোল শুনে সংগ্রাম বেরিয়েছে বাইরে । সাথে জুনাইদ , লতিফ জোয়ার্দার দু’জনেই আছেন । অতিথি শালা থেকেও বেরিয়েছে সবাই । বাইরের হইচই আর সংগ্রাম কে এভাবে বেরোতে দেখে শ্যামাও বিচলিত হয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো আড়াল হয়ে , যাতে নিচ থেকে দেখা না যায় ওকে । উপর থেকে ফটকের বাইরে আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে । অনেকের সম্মিলিত উপস্থিত লক্ষনীয় বাড়ির বাইরে । কারোর মুখ স্পষ্ট নয় , স্পষ্ট হলেও শ্যামার কাছে পরিচিত নয় । সে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে । যতটুকু স্পষ্ট দেখলো , সবার করুন মুখশ্রী নজরে ততটুকুতে । কেউ কেউ হাত জোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন ।
সংগ্রাম কে দেখা গেলো এবার । স্বভাব সুলভ গম্ভীর আচরণে পেছনে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবার সামনে । পাশেই লতিফ জোয়ার্দার । তিনি কথা বলছেন সবার সাথে । এখন সবাই প্রায় চুপ । কিছু আর্জি , বা বিচার নিয়ে এসেছে হয়তো । অতিথি শালার পিছনে দেয়াল ঘেঁষে , অংকুর , আরশ , আলামিন , মাসুদ ,ওরা সবাই দাঁড়িয়ে । মেয়েরাও আছে ওদের সাথে ।
গ্রামের লোকজন কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেলেন যে যার মতো । হয়তো ওনাদের সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছেন । অতঃপর ফাঁকা হলো ফটকের সামনের ভিড় । লতিফ জোয়ার্দার হতাশ শ্বাস ফেলে নিজেও ফিরলেন অন্দরে । জুনাইদ তার পিছু পিছু । সংগ্রাম ঘরে ফিরতেই শ্যামা মুখোমুখি দাঁড়ালো । শ্যামা প্রশ্ন সূচক চাহনি দেখে সংগ্রাম নিজেই থেকেই বললো…
” কেশবপুরে যেতে হবে আমায় । এখনই বের হবো । ফিরতে ফিরতে রাত হতে পারে…
শ্যামা হন্তদন্ত হয়ে প্রশ্ন করলো…
” কেনো ? কি হয়েছে ? গ্রামের এতো লোক এসেছিল কেনো ?
” ওদের গ্রামে ডাকাত পড়েছিল কাল । মাতব্বরের বাড়িসহ অনেক বাড়িতেই ডাকাতি হয়েছে । বুঝতেই পারছো কি অবস্থা ওদের । হাহাকার পড়েছে গ্রামে । একেই এবছর অনটন ।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এখন আমাকে যেতে হবে ওখানে । আপাতত ওদের একটা ব্যবস্থা করে একটু মনোবল জোগানো প্রয়োজন । ডাকাতের হিসেব পরে হবে । আব্বা যেতে পারবে না এখন । আমাকেই যেতে হবে…
শ্যামা শূন্য অনূভুতিতে দাঁড়িয়ে আছে কিংকর্তব্য বিমূঢ় । সংগ্রাম আলমারি থেকে নতুন একটা শাল বের করলো । গায়ে জড়ালো সেটা । আলমারি থেকে আরো কিছু একটা বের করে পাঞ্জাবির পকেটে রাখলো সেটা । শ্যামা সেদিকটায় খেয়াল করে নি । সংগ্রাম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার চুল গুলো গুছিয়ে নিলো । গোঁফ পাকিয়ে শ্যামার সম্মুখে দাঁড়ালো..! নরম কন্ঠে বলল…
” আমি আসছি । সাবধানে থেকো আপাতত…
শ্যামা হাসলো জোর পূর্বক । সংগ্রাম পা বাড়াতে গিয়ে আবারো পিছন ফিরলো । তীক্ষ্ণ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বুকে হাত গুটিয়ে প্রশ্ন করলো….
” তুমি আমার কি হও ?
শ্যামা থতমত খেলো হঠাৎ এমন প্রশ্নে । খানিক অপ্রস্তুত হয়ে ধীর কন্ঠে বলল…
” বেগম…
” আর আমি তোমার ?
শ্যামা এবার দ্বিগুন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো । ইতস্তত কন্ঠে বলল…
” ছোট জমিদার সাহেব ,, না মানে , স্বামী…
শ্যামার এহেন অবস্থা দেখে ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করলো সংগ্রাম । ভ্রু গুটিয়ে গম্ভীরতা টেনে ফের প্রশ্ন করলো….
” তোমার দায়িত্ব কি ?
” কি ?
সংগ্রাম এগোলো । শ্যামা কে শক্ত করে জড়িয়ে অধর ছোঁয়ালো কপালে । মিহি স্বরে বলল…
” মানলাম তুমি মেয়ে মানুষ । নিজে থেকে কিছুই করবে না । তাই বলে আমি করলে যে বারন করবে না সেটাও জানি । বেগম আমার ,,, আমি যে ভুলে গেছিলাম , এটা কিন্তু মনে করিয়ে দেওয়া আপনার দায়িত্ব ছিলো । আপনার দায়িত্ব বোধে আপনি এখনো কাঁচা….
আর একটু পাকাতে হবে আমায়..! সমস্যা নেই , আমার এই দায়িত্ব আমি যথা যথই পালন করবো । ভরসা করতে পারেন…
কথা শেষ করেই ঠোঁট কামড়ে ফিচেল হাসলো সে । শ্যামা লাজুকতায় সংগ্রাম কে দুহাতে ঠেলে দূরে সরালো । চোখ সরিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো…
” হয়েছে , এবার যান…
সংগ্রাম কথা বাড়ালো না ।
” খেয়াল রেখো নিজের । আমি আসছি…
বলেই বেরিয়ে গেলো । শ্যামা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো । ওখান থেকে সংগ্রাম কে একেবারে ফটক পেরিয়ে বাইরে যাওয়া পর্যন্ত এক দৃষ্টে দেখে নিলো ।
আজ সকালের খাবারের পর জবা,তহুরা আর রিক্তা অন্দরে ঢুকেছে এই প্রথম । ঢুকতে দেওয়া হয়েছে ওদের । বাইরে থেকে দেখতে দেখতে ভিতরটা আন্দাজ করে হাঁপিয়ে উঠেছিল ওরা । পুরুষ প্রবেশ নিষিদ্ধ , মহিলা তো নয় । ওদের বাঁধা দেওয়া হয় নি তাই । তবুও অনুমতি নিতে হয়েছে । অনুমতি দিয়েছে সংগ্রাম নিজেই । ওরা ভেতরে প্রবেশ করেই হতবাক । সজ্জল জমিদার বাড়ির ভিতর টা আধুনিকতায় পূর্ণ । সজ্জিত নানান নামি দামি গৃহোপকরনে । ছাদ বিশাল উঁচু শিখরে । ঝাড়বাতি ঝুলছে মাঝ বরাবর । লম্বা সিঁড়ি বেয়ে দোতলা । চারদিকের সাদা দেয়াল , সাদা মার্বেল পাথরের মেঝে , উজ্জ্বল আলো , সবমিলিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে । ওরা সবে অন্দরের বসার ঘরে । সেখান থেকেই চোখ ঘুরিয়ে আশ্চর্যান্বিত হয়ে দেখছে আশপাশ । দেয়াল জুড়ে কতশত পুরনো ঐতিহ্য, ছবি । ঠিক সামনের দেয়ালে জমিদারি প্রত্যেক প্রজন্মের একেকটা ছবি । লতিফ জোয়ার্দারের ছবিটা চিনতে অসুবিধা হলো না কারোর । সবশেষে সংগ্রামের ছবি , সেটাও ব্যাক্তিত্ব পূর্ণ সুঠাম গড়নে ।
তহুরা মুখ প্রসস্থ করে বিড়বিড় করলো….
” আগামীর জমিদার সাহেব…
ওর বিড়বিড়ানো না শুনলেও সবাই এবার একটা মহিলা কন্ঠ শুনলো….
” তোমরা এখানে ?
চকিতে তড়াৎ চাইলো সবাই । চমকেছে বোধহয় । পিছনে সালেহা দাঁড়িয়ে । সংগ্রামের ন্যায় গম্ভীর তার ভাবভঙ্গি । ছেলের মুখের অবয়বের সাথে মিল আছে অনেকটা । রিক্তা কোমল কন্ঠে বলল…
” ভিতরটা একটু দেখতে এসেছিলাম ! ছোট জমিদার নিজেই অনুমতি দিয়েছেন আমাদের ভেতরে আসার জন্য…
সালেহা শীতল হয়ে বসলেন পাশের চেয়ারে । আর কিছু না বলে উচ্চ স্বরে বালা কে ডাকতে লাগলেন…
উপর থেকে বালার সাঁড়া পেয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন…
” বালা আসছে , ও তোমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে পুরো বাড়ি ।
বালা কে – এটা কেউই বুঝলো না । একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো সবাই । ঝনঝনিয়ে নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ কানে আসতেই সবাই ঘুরে তাকালো পেছনে । সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখলো একটা মেয়ে কে । ভালো করে দেখতে গেলে চোখ কপালে উঠলো ওদের । ফের তড়িতে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো ওরা । এই মেয়ে তো সেই ছবির মেয়ে । যাকে কাল অংকুরের তৈরি ক্যানভাসে সুনিপুণ ভাবে ভেসে থাকতে দেখেছে ওরা । এই মেয়ে টাকেই তাহলে এঁকেছে অংকুর ? সত্যিই ? ওদের আহম্মদকের ন্যায় তাকিয়ে থাকার মাঝে বালা ওদের পাশ কাটিয়ে সালেহার সামনে দাঁড়িয়েছে । সালেহা বালার দিকে তাকাতেই বালা নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো…
” ডাকছিলে মামি ?
সালেহা মাথা দোলালো । হাত ইশারা করে রিক্তা,জবা আর তহুরা কে দেখিয়ে শান্ত স্বরে বললো…
” ওদের পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখা । ওরা তো অতিথি , ভালো মতো ঘুরিয়ে দেখাস । ছাদে নিয়ে যাস পারলে !
বালা এক পলক পিছনে তাকালো । সবার দৃষ্টি ওর নিজের দিকে দেখে মুচকি হাসলো । ফের সালেহার দিকে ফিরে গলা নামিয়ে সায় দিলো…
” ঠিক আছে মামি !
এবার আসলো রিক্তা দের সামনে । এক গাল হেসে বললো…
” চলুন আপনারা !
বলেই পা বাড়াতে গেলে জবার রুক্ষ কন্ঠ ভেসে আসলো । সে সোজাসুজি দু’টো প্রশ্ন করলো…
” তুমি কে বলোতো ? অংকুর কেনো এঁকেছিল তোমার ছবি ?
তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো বালা । আচমকা এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো সে । জবা নিজেও হুট করেই প্রশ্ন টা করেছে । সালেহা তড়িতে চেয়েছেন এমন কথায় । তবে মানে বুঝতে পারেন নি । আন্দাজ ও করতে পারেন নি কিছু । জবার অস্বাভাবিক কুঁচকানো রুষ্ট চাহনি দেখে , আর প্রশ্ন শুনে সালেহার ভাবগতিক পর্যবেক্ষণের জন্য বালা আড়চোখে এক পলক তাকালো সালেহার দিকে । সালেহা কপাল কুঁচকে চেয়ে আছেন । বালা চোখ ফিরিয়ে মিনমিন করলো…
” মানে ?
ফের জবার রুক্ষ কন্ঠ… খানিক ক্ষিপ্ত ও বটে…
” মানে জিজ্ঞেস করছো ? অংকুর কে চেনো না ? দেখেছো নিশ্চয়ই ? ও তোমাকে দেখালো কিভাবে ? আর তোমার ছবি আঁকলো কেনো ও ? কে তুমি ?
সালেহা পাশ থেকে বলে উঠলেন…
” এই মেয়ে , কি সব বলছো ? ওভাবে কথা বলছো কেনো ওর সাথে ? আর কি বলছো , কে কার ছবি এঁকেছে ?
জবা এবার সম্বিতে ফিরলো । সালেহার উপস্থিতি ধ্যানে ছিলো না । সালেহার দিকে তাকাতেই ওনার কুঁচকানো দৃষ্টি নজরে আসতেই দু-ঢোক গিললো জবা । নিজেকে স্বাভাবিক করলো…। ওর বেগতিক ভাব দেখে তহুরা ঝোল টেনে বললো….
” কিছু না ! আমরা….
” কিছু না মানে কি ? কে অংকুর ? ছবি এঁকেছে মানে ? বালার ছবি এঁকেছে ? কে এঁকেছে ?
বালা পলক ঝাপটালো । ছবি বিষয়ে বাড়িতে কেউ জানে না , একমাত্র সংগ্রাম ছাড়া । বালা ছবিটা লুকিয়ে রেখেছে সযত্নে সবার অগোচরে । এ বিষয়ে লতিফা জানতে পারলে রক্ষে নেই ! যদিও তিনি বালার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেখান না , তবে কোনো ছেলে জড়িত আছে জানলে রক্ষা হবে না ।
বালা শুকনো অধর ভিজিয়ে কথা ঘোরালো….
” তেমন কিছু না মামি । আমি ওনাদের নিয়ে ছাদে যাচ্ছি । চলুন আপনারা…
তড়িঘড়ি করে তাড়া দিলো বালা । আর এক মুহূর্ত কেউ দাঁড়ালো না সেখানে । কেউই দাঁড়ালো না । সালেহার তীক্ষ্ণ প্রশ্ন থেকে বাঁচার তাগিদে তড়িঘড়ি করে ছুটলো বালার পিছু পিছু । তিনতলায় ছাদ । দোতলায় উঠে একটু থেমে হাফ ছাড়লো বালা । সবাই সংকুচিত নয়নে চেয়ে আছে ওর দিকে । বালা হাসার চেষ্টা করলো জোর পূর্বক । জবার দিকে তাকিয়ে বললো নতজানু স্বরে…
” আমি সুরবালা । আমি আপনাদের আগেও দেখেছি । আপনারা হয়তো দেখেন নি আমায় ।
রিক্তা নরম কন্ঠে বললো…
” খুব সুন্দর তুমি ! তোমার নামটাও অনেক সুন্দর , একদম তোমার মতোই । দ্বিতীয় বার দেখলাম তোমায় , তাও সামনাসামনি । প্রথম বার দেখেছিলাম অংকুরের আঁকা ছবিতে । মাশাআল্লাহ ছবির থেকে কোনো অংশে কম নও তুমি , বরং বেশিই ।
প্রশংসায় লাজুক শীতল হাসলো বালা । জবা দাঁত পিষলো । মুখ চেপে বললো…
” অংকুর তোমায় দেখলো কখন ?
বালার সহজ শীতল জবাব…
” অংকুর মানে , যিনি আমার ছবি এঁকেছেন উনি ? উনি তো সেই দিন সকালে বাগানে দেখেছিলেন আমায় । তার পর হয়তো ছবিটা এঁকেছিল । অনেক সুন্দর হয়েছে ছবিটা ।
” তুমি দেখেছো ?
” হুম , উনি তো আমার ছবি আমাকে দিয়ে দিয়েছেন । আসলে বাড়িতে কেউ জানে না এই বিষয়ে । শুধু সংগ্রাম জোয়ার্দার জানে…
তহুরা প্রশস্ত উৎসুক হয়ে বলে বসলো…
” সংগ্রাম জোয়ার্দার , মানে ছোট জমিদার – তোমার মামা তো ভাই ?
বালা ফিকে হাসলো । তাচ্ছিল্যতা ঠোঁটের কোণের হাসি টুকুতে । চোখ নামিয়ে ছোট্ট জবাব দিলো…
” হুম..
চলুন আপনারা !
বালাকে অনুসরণ করে এগোলো সবাই । এগোতে এগোতে বালা দাঁড়ালো । শ্যামা ঘরে একা আছে । আর কোনো দিন ছাদেও যায় নি শ্যামা । একবার ওকে ডাকলে মন্দ হয় না ।
এই চিন্তা মাথায় আসা মাত্রই আবার কিছু একটা ভেবে বেরিয়ে গেল মাথা থেকে । শ্যামা কে ডাকলো না আর । সবাই কে দোতলা টা পুরোপুরি ঘুরিয়ে ছাদের দিকে অগ্রসর হলো বালা । দমকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে ছাদে । বিশাল ছাদ পুরোটা ফাঁকা । ছাদের মেঝেতে কালচে দাগ পড়েছে । অনেক দিন কারোর পা পড়ে না স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । আসে না কেউ ছাদে । আসলে গৃহকর্মীরা আসে , বাড়ির কেউ আসে না । বালা প্রায় বছর খানেক পর ছাদে উঠলো । উঠতেই প্রফুল্ল লাগলো নিজেকে । হাওয়ায় তাল মিলিয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলো বালা । হাঁটতে হাঁটতে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো ।
উত্তরের দিক থেকে বিশাল পানি পূর্ণ ধরলা নদী সম্পুর্ন সাফ লক্ষনীয় । নদীর শীতল হাওয়া গায়ে লাগছে খোলা ছাদে । বাতাসের দিক অনুসরণ করে ছাদের উত্তরের দিকে এগোলো রিক্তা । পিছন পিছন জবা আর তহুরাও । ছাদ থেকে চওড়া নদীর অদূর পর্যন্ত সম্পুর্ন বিস্তৃতি দেখা যাচ্ছে । যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি । দুই পাড়ে উঁচু উঁচু গাছ । সবুজের মাঝে চিকচিক করছে নদীর জল । যা আকর্ষণীয় ভাবে ধরা দিচ্ছে চোখে । তহুরা অমত্য চেয়ে অবাক স্বরে বলল….
” কি সুন্দর দেখাচ্ছে , তাই না ?
বালা কথা শুনে আলতো হাসলো । এগোতে এগোতে বললো…
” আপনারা ঘাটে যান নি ? ঘাটে তো নৌকা আছে । নৌকায় ওঠেন নি ?
তহুরা ঝট করে চাইলো ।
” ঘাটে তো গেছিলাম । কিন্তু নৌকায় ওঠা হয় নি ।
” নৌকায় উঠবেন ? মাঝি কাকা তো আছে , ওনাকে বললে নৌকায় করে নদীতে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে আপনাদের ।
তহুরা’র চক্ষু দ্বয় চিকচিক করে উঠলো । সেদিন ঘাটে যাওয়ার পর নৌকায় উঠতে চেয়েছিল । তবে নদীতে পানি বেশি থাকায় আরশ বাঁধা দিয়েছে । তবে এখন ইচ্ছে জাগছে নৌকায় ওঠার । তহুরা শিশু সুলভ বায়না ধরলো রিক্তার কাছে…
” এই রিক্তা , চল না নদীতে ঘুরে আসি একবার । দেখ , দুদিন পর তো চলেই যাচ্ছি আমরা । আর তো কখনো আশা হবে না ! শহরে এসব পাবি ,, বল ? তুই শুধু একবার আরশ কে বল । পত্নী ব্রতা স্বামী তোর , তোর কথা কিছুতেই ফেলতে পারবে না ও । আজ একবার বলে দেখ..
রিক্তা অমত করতে পারলো না । এখান থেকে ধরলা কে নতুন রূপে দেখার পর ওরও বাসনা জাগছে নৌকায় ওঠার । ও নদীর দিকে মুখ করে সায় দিলো…
” আচ্ছা , চল নিচে । বলে দেখি । যদি যেতে দেয়…
খুশিতে লাফিয়ে উঠলো তহুরা । গদগদ হয়ে বলল…
” তাহলে এক্ষুনি চল । অপেক্ষা কিসের ?
আচ্ছা সুরবালা ,, তুমিও চলো আমাদের সাথে ! বেশ ভালোই হবে….
বালা কিছু বলার আগেই জবা তিক্ত স্বরে ফোড়ন কাটল….
” ও কেনো যাবে আমাদের সাথে ?
রিক্তা বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই বালার উপর নিক্ষেপিত খিটখিটে দৃষ্টি সরালো জবা । রিক্তা মিষ্টি হেসে বললো…
” হ্যাঁ সুরবালা , তুমিও চলো । নিচটা ঘুরে তারপর একসাথে ঘাটে যাবো ।
বালা অমত করলো । স্বভাব সুলভ হাসি টুকু ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে বললো…
” আমাকে তো বাইরে যেতে দেবে না । অন্দর থেকে বাইরে বেরোনো বারন । আম্মা শুনলে রেগে যাবে । আপনারা যান…
” বাব্বা , অন্দর থেকে বাইরে বেরোনো বারন , তাহলে সেদিন বাইরে বেরিয়েছিলে কিভাবে ?
তাচ্ছিল্য করে কথাটা বললো জবা । রিক্তা ফের বিরক্তি নিয়ে চোখ রাঙিয়ে তাকালো । মুখ বাঁকালো জবা । বালা কিছু বলছে না দেখে রিক্তা ওর হাত দুটো ধরে বললো…
” নিচে চলো , আমি জমিদার গিন্নি , মানে তোমার মামি কে বলবো । যদি যেতে দেন..!
বালা উশখুশ করলো । ঘাটে যাওয়া বা নৌকায় ওঠা হয় না আজ কতদিন ! ওর নিজেরও ইচ্ছে করলো যাওয়ার । মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে চেপে রাখে । কিন্তু আজ রিক্তা দের দেখে চেপে রাখতে পারলো না । ওরা কতো স্বাধীন । সেই শহর ছেড়ে এই গ্রামে এসেছে । তবুও বাঁধা নেই ওদের ।
রিক্তা দের নিয়ে ছাদ ছেড়ে পুরো জমিদার বাড়ি ঘুরিয়ে দেখালো বালা । সালেহা সেই তখন থেকে অন্দরে বসে আছেন । এখন লতিফ জোয়ার্দার ও আছেন অন্দরে । লতিফা নেই আশেপাশে । রিক্তা, জবা আর তহুরা অন্দরে এসে লতিফা জোয়ার্দার কে দেখে বিনয়ের সহিত সালাম দিলো । লতিফ জোয়ার্দার সালামের উত্তর করে মুচকি হেসে কথা বললেন টুকটাক । ওরা শহরে ফিরবে চারদিন পর , এটাও শুনলেন তিনি । সবশেষে রিক্তা নতজানু আমতা স্বরে দোনামোনা করে বলেই ফেললো….
” জমিদার সাহেব ,, আমরা আজ একটু ঘাটে যেতে চাচ্ছিলাম । নৌকায় উঠবো তো তাই ।
আর কিছু বলার আগেই লতিফ জোয়ার্দার বলে উঠলেন….
” নৌকায় উঠবে ? ভালো তো ! আমি হাকিম কে বলে দিচ্ছি । ও মাঝিকে বলে দেবে তোমাদের নৌকায় ওঠানোর কথা । মাঝি ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে তোমাদের ।
রিক্তা ইতস্তত হয়ে পড়ছে বালার কথা তুলতে । বালা ওর অবস্থা বুঝে ধীর কন্ঠে বলল…
” আমি যাবো না,আপা । আপনারা যান…
রিক্তা ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে সাহস করে বলে বসলো….
” আমরা আমাদের সাথে সুরবালা কে নিয়ে যাই ? আসলে শুনলাম ও তেমন বাইরে বেরোয় না । আমাদের সাথে গেলে ওর ও ভালো লাগবে , আর আমাদের ও । নিয়ে যাবো ওকে অন্দরের বাইরে ?
লতিফ জোয়ার্দারের ভাবভঙ্গি অপরিবর্তনীয় । তিনি বালা কে এক নজর দেখে খানিক বাদ বললেন….
” বালা যদি যায় , তাহলে নিয়ে যাও । তবে যেতে হলে এখনই যাও , আর তাড়াতাড়ি ফিরে এসো ওকে নিয়ে ।
রিক্তার চোখ মুখ জ্বল জ্বল করে উঠলো এহেন কথায় । বালা আশা করে নি এমন কথার । রিক্তা তড়িঘড়ি করে বালার হাত টেনে বাইরে বের হওয়ার জন্য উদ্যত হতেই সালেহা লতিফ জোয়ার্দারের দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে বালা কে ডাকলেন .. বললেন নিস্তেজ স্বরে…
” বালা… তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস ।
বালা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো । অতঃপর বেরোলো সবার সাথে । বাইরে আরশ, আলামিন, মাসুদ – ওরা দাঁড়িয়ে । রিক্তা দের আসতে দেখে আরশ চোখ কুঁচকে ধমকের স্বরে বলল….
” কখন গেছো অন্দরে । এতোক্ষণ লাগলো কেনো আসতে…
বলতে বলতে নজর পড়লো বালার দিকে । অমনি চোখ কপালে ওর । চিনতে অসুবিধা হলো না । বালা নরম দৃষ্টিতে চেয়ে আছে । মাথায় সুন্দর করে ওরনা জড়িয়ে রাখা । টানাটানা দু-চোখে একটু কাজল । ঠোঁটে বরাবরের ন্যায় স্নিগ্ধ হাসি । আরশ অবাকের ন্যায় বিস্মিত স্বরে বিড়বিড় করলো…
” এ তো…
” হুম , একদম ঠিক চিনেছো । জানো ও কে ? ও হলো সুরবালা ! আমাদের অংকুর ওর ছবিই এঁকেছিল ।
আচ্ছা শোনো , আমরা এখন ঘাটে যাচ্ছি । নৌকায় উঠবো । বারন করলে শুনবো না , তাই বাঁধা দিয়ে লাভ নেই । আমরা গেলাম..।
বলেই কিছুর তোয়াক্কা না করে হাঁটা লাগালো ওরা । আলামিন আর মাসুদ হতভম্ব বালা কে দেখে । মেয়েটা সুন্দর আছে ছবির তুলনায় । ওদের এগোতে দেখে আরশ চেঁচিয়ে ডাকলো…
” আরে , একা একা কোথায় যাচ্ছো ? আমরাও আসছি !
বলেই ছুটলো পিছু পিছু । পা মেলালো ওদের সাথে । জবা ওদের তিন জন কে দেখে জিজ্ঞেস করলো…
” অংকুর কোথায় ?
” ও ঘাটেই আছে । বেরোলো একটু আগে ।
” তাহলে তো সুবিধাই হলো ।
রিক্তার কথায় সজাগে প্রশ্ন করলো জবা…
” সুবিধা কিসের ?
” আমরা এখানে চারজন মেয়ে আছি । তো , চারজন মেয়ের সাথে চারজন ছেলে থাকলে সুবিধা নয় কি ? বলা তো যায় না.. যদি কিছু ! যাক বাদ দে…অংকুর কে তুলে নেবো ওখানে…
” ও যাবে ?
রিক্তা ঠোঁট কামড়ে একটু হাসলো । মনে মনে ভাবলো কিছু । অতঃপর বললো…
” যাবে না মানে , দৌড়াবে…
ঘাটে কয়েকটা নৌকা ভেড়ানো । লতিফ জোয়ার্দার হাকিম নামক একজন কে দিয়ে মাঝিকে অবগত করে দিয়েছেন । নৌকায় উঠে ওদের জন্য অপেক্ষা করছে মাঝি । অংকুর ঘাট থেকে একটু দূরে বুকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সটান হয়ে । দৃষ্টি নদীর পানির দিকে । সবাই ঘাটের সামনে দাঁড়িয়ে ওকে দেখলো । ডাকলো আরশ..
” এই অংকুর !
অংকুর তাকাতেই রিক্তা বললো…
” আমরা নৌকায় উঠছি , নদীর ওদিকটায় যাবো একটু । তুই যাবি !
অংকুর চোখ ফিরিয়ে রাশভারী জবাব দিলো…
” না..তোরা যা ।
রিক্তা ঠোঁট পিষে টিটকারী স্বরে বলল…
” আরে আয় না । আমাদের সাথে সুরবালাও আছে…
চকিতে কপাল কুঁচকে চাইলো অংকুর । একে একে লক্ষ্য করলো সবাইকে । রিক্তার পিছনে সুরবালা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে । অংকুর ভাবাবেগ দেখালো না কোনোরূপ । ফের চোখ ফিরিয়ে একই স্বরে বলল…
” আমি যাবো না । যা তোরা…
রিক্তা এবার সবেগে এগোলো ওর দিকে । কাছে গিয়ে নরম কন্ঠে বলল….
” চল না , আমাদের একেক জনের সাথে এক জন করে ছেলে থাকলে সুবিধা হবে ।
আর মেয়ে টাকে আমরা নিজেদের দায়িত্বে নিয়ে এসেছি । শুনলাম ওকে বাইরে বের হতে দেয় না তেমন , আজ অনেক দিন পর বাইরে বেরিয়েছে মেয়েটা । নৌকাতেও উঠছে অনেক বছর পর । যদি কোনো বিপদ আপদ হয় ! চল না ভাই…
” বিপদ আপদ হলে আমার কি ? অন্যের মেয়েকে নিজেদের দায়িত্বে আনতে কে বলেছিল তোদের ? এনেছিস যখন, তখন তোরা বুঝে নে…
রিক্তা ব্যাহত শ্বাস ফেললো । আর জোর করে বললো না কিছু । অংকুরের কাছ থেকে সরে এসে ঘাটের সামনে দাঁড়ালো । বললো…
” ও যাবে না । চলো তোমরা…
এতো গুলো মানুষ । একটা নৌকাতে হবে না । ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে নয়তো । দুটো নৌকায় উঠতে হবে । মাঝিও আছে । তহুরা , আলামিন, মাসুদ ,আর জবা উঠলো একটায় । অন্যটায় রিক্তা,আরশ , ওদের সাথে বালা উঠবে । বালা ঘাটের সিঁড়ি থেকে নৌকায় পা রাখতেই দুলে উঠলো নৌকা খানা । পানির ঢেউয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো । বালা ভড়কালো । নৌকায় উঠেছিল সেই কবে , মনেই নেই । আজ বহু বছর পর আবার । রিক্তা হাত বাড়িয়ে দিলো বালার দিকে । বালা দু-ঢোক গিলে হাতখানা ধরে উঠলো নৌকায় । এখনো দুলছে নৌকাটা । পানি অনেক নদীতে , ভয় লাগলো বালার । ভয়ে ভয়ে মাঝিকে উদ্দেশ্য করে ভীত নয়নে তাকিয়ে বললো….
” কাকা , একটু সাবধানে , নদীর বেশি মাঝে নিয়ে যাবেন না ,কেমন ? আমি কিন্তু সাঁতার জানি না ।
মাঝি আশ্বাস দিলো…
” তুমি তো আমাগো জমিদারের বোইন লতিফার মাইয়া , তাই না আম্মা ? মেলা দিন পর দেখলাম তোমারে ! চিন্তা কইরো না আম্মা , কিচ্ছু হইবো না ! শক্ত কইরা ধইরা বসো ।
রিক্তা শেষ বারের মতো অংকুরের দিকে ফিরলো । অংকুরের বাঁকা দৃষ্টি এদিকেই । রিক্তা ডাকলো ওকে…
” আরে অংকুর আয় না রে ! কি সমস্যা তোর ? ওখানে দাঁড়িয়ে থেকেই বা কি করবি ?
মেয়েটা ভয় পাচ্ছে । বারবার বলছি, যদি কোনো বিপত্তি ঘটে…
অংকুর তবুও দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । অন্য নৌকা থেকে জবা বিরক্তি নিয়ে বললো…
” ও আসবে না । মাঝি কাকা , চলুন আপনারা ।
নৌকা ছেড়ে মাঝি পাল তুলতে গেলে অংকুরের ভারী কন্ঠস্বর ভেসে আসলো…
” দাঁড়ান ,, আমি আসছি ।
সচকিতে চাইলো সবাই । রিক্তা আর আরশ তৎক্ষণাৎ একে অপরের দিকে তাকালো । ঝিলিক বয়ে গেল দু’জনের চোখে ।
অংকুর নৌকায় উঠতেই জবা দাঁত পিষে মুখ বাঁকালো ।
বৈঠা বাওয়ার সাথে সাথে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনা যাচ্ছে । আশপাশ টা নীরব । কেউই কথা বলছে না এই মুহূর্তে । নীরবে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ টাকে অনুভব করছে সবাই । চোখ ঘুরিয়ে দেখছে এদিক ওদিক । গ্রামের অন্যান্য বাড়ি গুলো নদীর এক পাড়ে । অন্য পাড়ে জঙ্গল । হাওয়া বইছে মিষ্টি । সাথে কলকল ঢেউয়ের ধ্বনি । বৈঠা বাইতে বাইতে ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে মাঝিরা নিস্তব্ধতা ভেঙে লোকগান ধরলো…
” মন মাঝি খবরদার ,,
আমার তরী যেন ভেড়ে না , আমার নৌকা যেন ডুবে না,, মন মাঝি খবরদার..
মন মাঝি খবরদার ,,
আমার তরী যেন ভেড়ে না , আমার নৌকা যেন ডুবে না ,,মন মাঝি খবরদার !
মাঝির কন্ঠে গান টা বেশ সুরায়িত শুনতে লাগছে । চেরা গলায় গানটা বেরিয়ে আসছে উতাল হয়ে । ঢেউয়ে ঢেউয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে স্রুতি । দুই নৌকার সবাই গানের সুরে তাল মিলিয়ে শরীর দোলাচ্ছে নরম সরম । একমাত্র অংকুর বাদে । সে নিজের কাঠিন্যতা বজায় রেখে বসে আছে পাথরের ন্যায় । তবে দৃষ্টি শীতল । সেটা কোনো এক দিকে । বালার ঠোঁটে স্মিত নরম হাসি । মাঝির দিকে তাকিয়ে মন দিয়ে গান অনুভব করছে সে ।
মাঝি গাইছে….
” সাড়ে তিন হাত নৌকার খাঁচা…
মন মাঝিরে ঘন ঘন জোড়া ,,,
সাড়ে তিন হাত নৌকার খাঁচা..!
মন মাঝিরে ঘন ঘন জোড়া ,,,,
সেই নৌকা খান বাইতে আমরণ মন মাঝিরে হাড় হইলো গুঁড়া রে.!!
মন মাঝিরে খবরদার ,,,
আমার তরী যেন ভেড়ে না , আমার নৌকা যেন ডুবে না , মন মাঝি খবরদার..!!
নৌকা চলতে চলতে অনেক দূর । সোজাসুজি অনেক টা এগিয়েছে সবাই নৌকায় । দূরে একটা ঘাট দেখা যাচ্ছে । বালা সেদিকটায় খেয়াল করতেই লাফিয়ে উঠলো । চঞ্চল হয়ে গলা উঁচিয়ে বললো…
” মাঝি কাকা ,, ওটা শ্যামা দের বাড়ির ঘাট না ?
মাঝি দূরে এক পলক চেয়ে সায় দিলো…
” হ তো , ঐটা তো মোখলেছ মিয়ার বাড়ির ঘাট । বাড়ির বেড়া দেখা যাইতাছে ,ঐ দেখো ।
সবাই একই সাথে তাকালো বালা আর মাঝির দৃষ্টি অনুসরণ করে । তাকালো এবার অংকুর ও । দূরে ঘাট দেখা যাচ্ছে । অপর নৌকা থেকে তহুরা কৌতুহলী হয়ে শুধালো…
” শ্যামা কে ?
বালা চাইলো তড়িতে । মোলায়েম স্বরে পাল্টা শুধালো….
” শ্যামা ? শ্যামা কে চেনেন না ? জানেন না ও কে ?
আলামিন বললো…
” আমরা তো এদিকটায় আসি নি । ঐ গ্রামে যাই নি । শ্যামা তো মেয়ে ? কে এই শ্যামা ? আমাদের চেনার কথা ছিলো বুঝি ? না চিনে ভুল করলাম নাকি ?
রিক্তাও তাল মেলালো…
” শ্যামা কে, সুরবালা ?
বালা সবার দিক থেকে চোখ সরিয়ে ঘাটের দিকে তাকালো । শান্ত শীতল চোখে চেয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । বললো নরম কন্ঠে…
” শ্যামা কে চেনার জন্য আলাদা করে আর ঐ গ্রামে যেতে হবে না । শ্যামা কে জানেন ? সে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্য সম্পন্ন নারী । শ্যামা সুন্দরী নারী , যার ভাগ্য আর সৌন্দর্য অপার্থিব ।
সবাই তাকিয়ে আছে বালার দিকে । তহুরা আরো বেশি কৌতুহলী হয়ে শুধালো….
” কে এই সৌভাগ্য বান – শ্যামা ?
বালা তাকালো ওর দিকে । মুচকি হাসলো । সবার দৃষ্টিতেই আগ্রহ । বালা বললো…
” সাত গ্রামের জমিদার লতিফ জোয়ার্দারের একমাত্র পুত্র সংগ্রাম জোয়ার্দারের অর্ধাঙ্গিনী – শ্যামা । সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগম সে ।
তহুরা চুপসে যাওয়া অবিশ্বাস্য স্বরে বলে উঠলো..
” এ্যাহ..?
ছোট জমিদার , মানে সংগ্রাম জোয়ার্দার বিবাহিত ?
” হুম !!
ঠোঁট উল্টে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল বেচারি তহুরা । বাকিরা প্রথম প্রথম অবাক হলেও মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলো না কারোর । ওরা কেউই সংগ্রামের বিয়ে সম্পর্কে জানতো না আগে থেকে । এদিকে তহুরার অবস্থা দেখে আলামিন, মাসুদ আর আরশ মুখ চেপে হেসে উঠলো ফিক করে ।
মাঝি নৌকা ঘুরিয়েছে । পুনরায় ফেরা হচ্ছে জমিদার ঘাটে । এতক্ষণ প্রসস্থ, উৎসুক থাকলেও বালা এখন আর উৎসুক নেই । মলিন হয়ে গেছে ওর মুখখানা । এক দৃষ্টে বিষন্নতায় চেয়ে আছে কোনো এক দিকে ।
সবাই কথা বলছে টুকটাক । ওদের দিকে মনযোগ নেই বালার । আর না এই মুহূর্তে বালার দিকে কারোর । তবে এক জোড়া দৃষ্টি বাদে । উক্ত দৃষ্টি নিরপেক্ষ ভাবে চেয়ে আছে ওর দিকে । ঘাটে তরী ভিড়তেই একে একে নামলো সবাই । নৌকা দুলছে । রিক্তা কে নামতে সাহায্য করলো ওর স্বামী আরশ । ওরা ঘাটের দু-ধাপ সিঁড়ি উঠে পিছন ফিরেছে । অংকুর নেমে এগোতে গেলে রিক্তা বলে উঠলো…
” বালা কে নামতে সাহায্য কর । ও একা একা নামতে পারবে নাকি ?
পিছনে পড়ে আছে বালা । নামতে পারে নি এখনো । রিক্তা কথা টা বলে আরশের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো । অংকুর পিছনে বালার দিকে চেয়েছে কপাল কুঁচকে । গুলুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে বালা । পা বাড়িয়ে সিঁড়িতে রাখা বাকি । তবুও দায় সারা ভাবে বললো অংকুর…
” নামতে পারবে ?
” আবার জিজ্ঞেস করছিস কেনো ? ধরে নামা না মেয়েটাকে !
বালা উদ্বেগ দেখালো না । আর না কারোর কোনো কথার গুরুত্ব দিলো । নিশ্চুপ বনেছে নৌকায় , এখনো মুখ খোলেনি । না খোলার ইচ্ছে জাগলো । তাকালো ও না কারোর দিকে । পা বাড়িয়ে লাফিয়ে নামলো গলুই থেকে । কোনো দিকে না তাকিয়ে হনহনিয়ে উপরে উঠতে লাগল সিঁড়ি ডিঙিয়ে । হঠাৎ এমন পরিবর্তন আর নিজের উপেক্ষা বুঝে বিভ্রান্ত হলো অংকুর । রিক্তাও অবাক হলো আচমকা এমন আচরণে । বিড়বিড় করলো ও…
” হঠাৎ আবার কি হলো ? বালা ??
বালা আর কোনো দিকে তাকায় নি । ঘাট থেকে এক প্রকার ছুটে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছে । রিক্তা ডেকেছে, কানে পৌঁছেছে । তবে সাঁড়া দেয় নি বালা ।
বিকেল থেকে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে শ্যামা । এখন সন্ধ্যার লগ্ন পেরিয়ে রাতের সময় । শবনম আসরের পর ঘরে উঁকি দিয়েছিল একবার , শ্যামা কে ঘুমোতে দেখে ডাকে নি । সংগ্রাম ফেরেনি , লতিফ জোয়ার্দার বিকেলে বেরিয়েছেন কেশবপুরের উদ্দেশ্যে । একসাথে ফিরবে ওনারা । শ্যামা এখনো ঘুমে বিভোর । যে অবস্থায় কাত হয়ে শুয়ে ছিল , সে অবস্থাতেই আছে এখনো । নড়েনি এক চুল ও । শরীরেও চাদর টানা নেই , ঠান্ডায় গুটিয়ে আছে মেয়েটা । রাত আটটার দিকে বাড়ি ফিরেছে সংগ্রাম । ক্লান্ত পরিশ্রান্ত সে । গিয়েছিল ডাকাতের কবলে পড়া গ্রামবাসীর সাহায্য করতে । কিন্তু সেখানে গিয়ে আরেক বিপত্তি , বিপাকে পড়তে হয়েছে আরেক । সবজি, চাল-ডাল , সব নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পরিস্থিতি সাপেক্ষে । অনেক বাড়িতেই ডাকাতি হয়েছে । কেশবপুর গ্রাম টা বাকি ছয় গ্রামের তুলনায় ছোট । ভীত গ্রামের সবার মাঝেই হা-হুতাশ পড়েছে ।
জমিদার রাজ্যে দীর্ঘ অর্ধশত বছর পর আবারো এমন ডাকাতি হলো । গ্রামের সাধারণ মানুষ । উচ্চবিত্ত নয় তারা । আর না মধ্যবিত্ত । যাকে বলে নিম্নবিত্ত । সেই নিম্নবিত্ত মানুষেরা মাথার উপরের ছাদ বাদে সব হারিয়ে নিঃস্ব প্রায় এখন । তাদের এখন শেষ ভরসা, আশ্রয় জমিদার লতিফ জোয়ার্দার ।
আপাতত তাদের দু-বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে দিতে পারলেই সন্তুষ্ট তারা । সংগ্রাম যেসব ত্রাণ নিয়ে গেছিলো , ভ্যানেই ছিলো সব । ওদিকে এক পাশে গ্রাম বাসিদের কাছে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য যাওয়ার পর পর ত্রাণ ভর্তি তিনটে ভ্যানে আগুন লেগেছে অজ্ঞাত উৎসে । কিভাবে আগুন লাগলো জানা নেই । কাঁচা সবজি , চাল , ডাল , ভ্যান , সব নিমিষেই দাও দাও আগুনে পুড়ে একাকার । সংগ্রাম ফিরে এসে অক্ষত দেখতে পায় নি কোনো কিছু । তিন তিনটে ভ্যান অনেক টা দূরত্বে থাকার পরও আগুন লাগলো কিভাবে , এটা নিয়ে সন্দিহান সংগ্রাম । আগুন লেগেছে শুধু ভ্যানে , তবে কিভাবে ? জানা নেই ! আশেপাশে কেউ ছিল না সেই মূহূর্তে । আগুন তো আর এমনি এমনি লাগতে পারে না , তাও আবার কাঁচা সবজিতে ! নিশ্চয়ই কেউ লাগিয়েছে ! হঠাৎ গ্রামে ডাকাতির সাথে এই অবাঞ্চিত ঘটনার যোগসূত্র আছে অবশ্যই । সংগ্রামের তীক্ষ্ণ ধারালো মস্তিষ্কে ঘটনা পর্যবেক্ষণে নিমিত্ত হানা দিয়েছে অনেক । তবে উপস্থিত মুহুর্তে গ্রাম বাসির কথা ভেবে সংগ্রাম এই নিয়ে আর ঘাটে নি । গ্রাম বাসি একেই আতঙ্কিত , তার উপর আগুন দেখে ভ্রান্ত – অলিক বিশ্বাসি অহেতুক ধারনার জন্ম হয়েছে সবার মাঝে । সংগ্রাম সবকিছু সামলানোর চেষ্টা করেছে যথেষ্ট ।
পুনরায় বাজার থেকে নতুন করে বাজার নিয়ে আসা হয়েছে গ্রাম বাসির জন্য ।
সবশেষে গ্রামের অবস্থা পূর্বের তুলনায় স্বাভাবিক করে বাড়িতে ফিরেছে সংগ্রাম । সারাদিনের ক্লান্তি এখন বেড়েছে দ্বিগুণ । শরীর অবসন্ন হয়ে আসছে । সংগ্রাম কোনো রকমে পা দুটোকে টেনে টুনে উপরে তুললো সিঁড়ি বেয়ে । ঘরে ঢুকেই খাটে নজর পড়লো সবার আগে । ঘুমিয়ে আছে তার বেগম । সংগ্রাম ক্লান্ত মুখেই ঠোঁট প্রসারিত করলো । হাতে একটা কিছুর প্যাকেট ওর । সেটা রাখলো টেবিলের উপর । শ্যামা কে গুটিয়ে থাকতে দেখে গায়ের চাদর খুলে রাখতে রাখতে এগোলো ওর দিকে । খাটের পাশে দাঁড়িয়ে একটু ঝুঁকে কপালে হাত ছোঁয়ালো । যা ভেবেছিল তা নয় । ঠান্ডায় গুটিয়ে আছে তার বেগম । সংগ্রাম শ্যামার গায়ে চাদর টেনে দিয়ে নিস্তেজ পায়ে গোসলখানার দিকে এগোলো ।
বেশ সময় নিয়ে বেরিয়ে এসে ক্লান্ত শরীর টা এলিয়ে বসলো খাটের একপাশে । মাথা এলিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো । ক্ষিদে পেয়েছে ভীষণ । শ্যামা ঘুমিয়ে , ডাকার ইচ্ছে করলো না । একবার মাথায় হাত বুলিয়ে ধীর কন্ঠে ডাকলো তবুও…
” বেগম… শুনছো ? শ্যামা…
শ্যামার সাঁড়া নেই । না হেলদোল । কাঁচা ঘুম ওর । এতক্ষণে সংগ্রামের উপস্থিতি টের পেয়ে উঠে যাওয়ার কথা । সেখানে হিতে বিপরীত । সংগ্রাম ডাকলো , তবুও উঠলো না । সংগ্রাম এবার একটু ঝুঁকলো অনেকটা । শ্যামার ঘুমন্ত মুখের কাছাকাছি পৌছে খানিক গলা বাড়িয়ে ডাকলো…
” বেগম… উঠে পড়ুন । স্বামী এসেছে আপনার । সে ক্লান্ত ভীষণ । আজ সে আপনার ক্লান্তির ঘুম দেখবে না । বরং তার নিজের ক্লান্তি দূর করার উপশম খুঁজবে শুধু । তার ক্ষয়িত হৃদয়ের অবসাদগ্রস্ততা দূর করার জন্য আপনাকে প্রয়োজন । আপনার তদারকির যত্ন প্রয়োজন তার । উঠে পড়ুন এখন…
শ্যামার একটুও নড়চড় নেই । সংগ্রাম তার বেগমের ঘুমন্ত আবেদনময়ী মুখপানে চেয়ে অনিমেষ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । ক্লান্তি দূর করার অনন্য উপশম এটা । যা কাজ করলো একটু । সংগ্রাম ওষ্ঠ বাড়িয়ে শ্যামার অধরের কোণে চুমু আঁকলো । গরম নিঃশ্বাস তার বেগমের । যা আছড়ে পড়লো সংগ্রামের মুখের উপর । সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করলো না সংগ্রাম । পরপর কয়েকটা চুমু খেলো , শেষটা শক্ত করে , গাঢ় পরশ আকলো তার ঘুমন্ত বেগমের ওষ্ঠাধরে । তবুও শ্যামা নড়লো না একটুও । সংগ্রাম মুখ তুলে মুচকি হাসলো । পুরো মুখখানা স্পর্শ পেল ওর অধরের । বন্ধ দু-চোখের পাতা দ্বয় ও বাদ গেল না । কপাল বেছে নিলো এবার । সেখানে একবার ঠোঁট ছুঁইয়ে ফের ডাকলো আবেশিত কন্ঠে…
” কি হলো বেগম ? ঘুমের বাহানায় সায় দিচ্ছেন আমায় ? আমি কিন্তু খেই হারিয়ে ফেলবো এবার ! খেই হারালে কিন্তু রক্ষে নেই আজ আর !
এবারও শ্যামার পরিবর্তন নেই । সংগ্রাম আবারো বলতে লাগলো….
” ঘুমন্ত স্ত্রীর সুযোগ নেওয়ার মতো সুপুরুষ আমি নোই । আপনি আমার ঘুমের সুযোগ নিতেই পারেন , আমি পারি না । আমার পদ্ধতি ভিন্ন । আপনাকে আমায় সুযোগ করে দিতে হবে না । আমার সুযোগ খুঁজে নেবো আমি ।
আপাতত খুব ক্লান্ত , এখন উঠুন বেগম…
এবারও অনড় শ্যামা । সংগ্রাম এবার সংঙ্কায় ভ্রু গুটালো । এতোটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন শ্যামা ? এতো গভীর ঘুম তো নয় ওর । সংগ্রাম এবার গুরুত্বর কন্ঠে তার বেগমকে আলতো ঝাঁকিয়ে ডাকলো…
” শ্যামা… ডালিয়া !!
এই মেয়ে ? ওঠো ! বেগম !
এবাবো একই অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলো সংগ্রাম । হুড়মুড়িয়ে উঠে বসলো । শক্ত হাতে ঝাঁকালো শ্যামা কে । ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ডাকলো অনাড়গল । তবুও শ্যামার সাঁড়া না পেয়ে পাশ থেকে পানির গ্লাস তুলে নিলো হাতে । হাতের আজলে পানি নিয়ে ছেটালো শ্যামার চোখে মুখে । পানির ঝাপটায় চোখ মুখ কুঁচকালো শ্যামা । সংগ্রাম হাঁসফাঁস করছে । শ্যামা নড়ে উঠতেই সে উত্তেজিত হয়ে ডাকলো আবারো…
” বেগম .. কি হয়েছে ? ঘুমিয়েছিলে এতক্ষণ ? কখন থেকে ডাকছি , সাঁড়া দিচ্ছিলে না কেনো ? ওঠো…
শ্যামার মুখের উপর ছেটানো বিন্দু বিন্দু পানির কনা গুলো নরম হাতে মুছিয়ে দিলো সংগ্রাম । শ্যামা আধো আধো চোখ খুলেছে । আধো চোখ পুরোপুরি খোলার চেষ্টা করলো এবার । চোখ কচলে উঠে বসলো । সংগ্রাম ধরে রেখেছে ওকে । চোখে মুখে বিস্ময় আর চিন্তার ছাপ । এক মুহুর্তে আঁতকে উঠেছিল সে । শ্যামা ঝাপসা ঘুম জড়ানো চোখে সংগ্রাম কে দেখে বিড়বিড় করলো….
” কে আপনি ? ছাড়েন আমারে…..
সংগ্রাম জিভে অধর ভিজিয়ে বললো….
” কি বলছো ? ঘুমের রেশ কাটেনি এখনো ? আমি এখানে ? তোমার ছোট জমিদার সাহেব ! দেখো আমায়… বেগম… ঠিকঠাক ভাবে তাকাও আমার দিকে । কি হয়েছে তোমার ?
শ্যামা সংগ্রামের হাত সরিয়ে দিলো । একই স্বরে বলল..
” ছাড়েন আমারে… ছোঁবেন না !
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৩
শ্যামার অবস্থা ঠাহর করে সংগ্রাম এবার পাশ থেকে পানির গ্লাস হাতে তুলে পুরো পানিটা ছিটিয়ে দিলো শ্যামার মুখের । ঠান্ডা পানির তীব্র ঝাপটায় কেঁপে উঠলো শ্যামা । সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রাম ওর মুখটা চেপে ধরলো নিজের বুকের সাথে । মাথায় হাত বুলিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল…
” কিচ্ছু হয় নি বেগম ! আমি আছি….
