Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৯

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৯
সুরভী আক্তার

বড় সড়ো ঝটকা খেলো শ্যামা । বৃহৎ হলো অক্ষি যুগল‌‌‌ । ফাঁক হলো ওষ্ঠ দ্বয় । ভুল শুনলো ও ? অবিশ্বাস্য লাগলো নিজের কান কে ! মাথা ঝাঁকিয়ে শ্যামা শুধালো…
” কি বলছেন ছোট জমিদার সাহেব ?
” বিশ্বাস হলো না , তাই না ?
শ্যামা বিমূর্ত ! সংগ্রাম বলা শুরু করলো….

” বালার বয়স যখন চার বছর । তখন ছোট ছোট গুটি গুটি পায়ে সারা জমিদার বাড়ি ছুটে বেড়াতো ও । তোমার ফুফু আম্মা , মেয়ে হয়েছে বলে অতটা পছন্দ করতো না ওকে । কিন্তু বালার নিষ্পাপ শিশু সুলভ চেহারা খানার প্রতি একটু হলেও মায়াময় অনুভূতি ছিল তার ‌। সেই একটু অনুভূতি তিনি নিজ হাতে মুছে ফেলেছেন । বালা কিন্তু পবিত্র , একদম একটা নিষ্পাপ ফুল ও । ওর গায়ে শুধু আঁচড় লেগেছিল একটু ‌ । আমাদের বাগানের পুরনো মালি , নিজের জঘন্য লালসার শিকার বানাতে চেয়েছিল ঐ চার বছরের শিশু টাকে । বাড়ির সবার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে স্পর্শ করেছিল বালা কে । আর বেশি কিছু না । বালার কিচ্ছু করতে পারে নি ঐ জানোয়ার । শুধু এটুকুই অতীত ওর । যা সম্পর্কে ও নিজেও অজ্ঞাত । কি বুঝতো ও তখন , আর এখনি বা কি জানে এই বিষয়ে ! এই সামান্য ঘটনা কে নিজের ঘৃনিত মনে পুষে রেখে এখনো ওর মা আর ভাই চোখ তুলেও তাকায় না ওর দিকে ।
শ্যামা থমকে পিছুলো । হাত পা শিরশির করছে ওর । কি সব বলছে সংগ্রাম ?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বিমূঢ় শ্যামা কেঁপে উঠলো । ঢোক গিললো শুকনো । সংগ্রামের চোখ অদূরে ।
কেবিনের ভেতর ঝনঝন শব্দে ধ্যান ভাঙ্গলো দুজনেরই । তড়িতে পিছনে চাইলো ওরা । দ্রুত বারান্দা ছেড়ে ঘরে আসলো । পিছু পিছু কম্পিত পায়ে শ্যামা । দরজা থেকে বোধহয় ছায়া মতো কিছু একটা সরে গেলো । এক পলক ওদিকটায় নজর গেলো সংগ্রামের । পর মূহুর্তে নজর পড়লো বালার দিকে । মেঝেতে স্টিলের ট্রে টা পড়ে আছে । ঔষধ পত্র সব মেঝেতে গড়াগড়ি । বেডের পাশের লম্বা মতো টেবিলটা উল্টে ।
বালা মেয়েটা হাঁটু জড়িয়ে ভীতের ন্যায় বসে আছে মেঝেতে । হাত পা কাঁপছে ওর । দৃষ্টি নিচে । ওষ্ঠ জোড়া ফাঁক করে নিজের মাঝে বিড়বিড় করছে কিছু ।
বৃহৎ নয়নে তাকালো সংগ্রাম । বলে উঠলো বড় গলায়…

” বালা ? কি হয়েছে তোর ? এভাবে এসব পড়ে আছে কেনো ?
বালা শুনলো না । আর না তাকালো । চোখ ভেজা ওর । ও এখনো বিড়বিড় করছে কিছু । সংগ্রাম এক হাঁটু মুড়ে বসলো…
” এই বালা ? কি হয়েছে ? ঘুম থেকে উঠেছিস কখন ? আর এসব পড়লো কি করে ? মেঝেতে কেনো তুই ?
বালা ধীরে ধীরে চাইলো সমুদ্র ভরাট সজল চোখে । অদ্ভুত হাসলো মেয়েটা । বিড়বিড় করলো নিভু স্বরে….
” আমার সাথে কি হয়েছিল সংগ্রাম ভাই ?
সংগ্রামের মুখখানায় বদল এলো তৎক্ষণাৎ । চিন্তার ছাপ যুক্ত মুখ সঙ্কিত হলো খানিক । ওর উত্তরে দেরি হওয়ায় ফের প্রশ্ন করলো বালা….

” বলুন না সংগ্রাম ভাই ! কি হয়েছিল আমার সাথে ? আমি , আমি অপবিত্র ? এজন্যই আম্মা আর ভাইজান আমাকে পছন্দ করে না ? আমি ধর্ষি…
বালা কথা শেষ করতে পারলো না । ওর মুখখানা চেপে ধরলো সংগ্রাম । সবকিছু শুনেছে বালা , এটা বুঝতে বাকি নেই ! আতঙ্কিত হলো সংগ্রামের চিত্ত । এতো বছর সবকিছু লুকিয়ে আসা হয়েছে । আর আজ বালার সম্মুখে প্রকাশ হলো সবকিছু । তাও অপ্রত্যাশিত ভাবে । বালা অর্থ বোঝে নি এসবের । সংগ্রাম কি কি বলেছে বোঝার চেষ্টাও করে নি । কি শুনেছে, কতটা শুনেছে জানে না সংগ্রাম ।
বালাকে থামিয়েই বললো ও…
” বালা ? আর একটা কথাও আনবি না মুখে..
বালা হাত সরালো সংগ্রামের । এই স্পর্শ চাই না তার । এটা তো আগে চেয়েছিল , কিন্তু পায় নি । এখন সহানুভূতি প্রকাশের জন্য এই স্পর্শের কোনো প্রয়োজন নেই ওর । চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়ালো বালার । আবার বললো থেমে থেমে…

” সত্যিই আমি ধর্ষি…
এবারো কথা শেষ হওয়ার আগেই ধমকে উঠলো সংগ্রাম । চড়াও করে উঠলো মস্তিষ্ক । চোখ মুখ শক্ত করলো সে । বালা সূচক উচ্চস্তরের ধমকে কেঁপে উঠলো মেয়েটা । পিছনে শ্যামাও । ও কিংকর্তব্য বিমূঢ় । মাথায় এসবের সাথে সাথে আরো অনেক কিছুই একসাথে বাড়ি মারছে ওর । বক্ষ স্থল ধক্ ধক্ করছে ।
বালা ঠোঁট উল্টালো । কেঁদে উঠলো শব্দ করে । হাঁটু জড়িয়ে ধরে নিজেকে গুটিয়ে নিলো আরো । দুহাতে কান চেপে ধরে ডুকরে উঠলো । কান গরম হয়ে আসছে ওর । কি সব শুনলো ও এই কানে ? সব সত্যি ? ও কিনা ধর্ষিতা ? সম্মান টুকু নেই ওর ? হারিয়ে গেছে সেই ছোট বেলায় ? মেয়েদের তো এটাই সব , যেটা বালা হারিয়েছে ! অপবিত্র বালা ? কালো স্পর্শ আছে ওর এই শরীরে ? বালার ঘেন্না লাগলো নিজেকে । হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো ও । দুহাতে ডলতে লাগলো নিজের শরীর । চিৎকার করে উঠলো ক্রন্দনরত কন্ঠে….

” ছিঃ,, কিচ্ছু নেই আমার ! কিচ্ছু না ! অপবিত্র আমি ! এতো দিন পবিত্র ভেবে এসেছি নিজেকে , আজ জানলাম , আমার পবিত্রতা নেই আমার মাঝে ! নোংরা আমি । জঘন্য আমি । নর্দমার থেকেও বেশি অপবিত্র আর নোংরা আমার শরীর ।
সংগ্রাম ওর দুই হাত আটকে ধরলো । শ্যামা ঠাঁয় থমকে । সংগ্রাম কিছু বলার আগেই বালা ছোটাছুটি করে দ্বিগুণ গলা বাড়িয়ে চিৎকার করলো….
” ছেড়ে দিন আমায় । ছোঁবেন না আমায় । আমি নোংরা । আমাকে স্পর্শ করে নিজের হাত নোংরা করবেন না । আমি কুলষীত । নষ্ট আমি । ছোঁবেন না আমায়…
” বালা….

কথা কানে যায় না তোর ? কি বলছিস এসব ? পাগল হয়ে গেছিস ? মাথা ঠিক আছে তোর ?
একটু শান্ত হলো মেয়েটা । স্থির হয়ে নরম করলো নিজেকে …
” মাথা তো ঠিক ছিল সংগ্রাম ভাই । কিন্তু আমি ঠিক ছিলাম না । ঠিক নেই আমি ।
” কিচ্ছু হয়নি তোর সাথে ! তুই একদম ঠিক আছিস ! শোন আমার কথা ! ভালো করে শোন সবটা । তোর কেউ কিচ্ছু করতে পারে নি । তুই পবিত্র , কুলষীত নোস তুই !
বোঝানোর স্বরে শান্ত কন্ঠে সংগ্রামের । বালা ঠোঁট উল্টে ফিকড়ে উঠলো । ঘাড় কাত করে বলে বসলো আচমকা….
” এই জন্যই আমাকে কখনো ভালোবাসেন নি সংগ্রাম ভাই ? আমাকে ভালোবাসা যায় না , তাই না ? আমি অপবিত্র বলে ? ভালোবেসে নিজের বেগমের মতো পবিত্র স্থানে এই জন্যই ঠাই দেন নি আমায় ? আমার শরীরে অন্য কারোর স্পর্শ আছে বলে….

” বালা…?
চোখ মুখ টাটিয়ে হাত তুলতে উদ্যত হলো সংগ্রাম ! একই সাথে চমকে উঠলো শ্যামা আর বালা । বালা মুখ নামিয়ে গুটিয়ে গেলো আরো ।
তবে ওর শক্ত হাতের আঘাত বালার গায়ে পড়ার আগেই থেমে গেল হাত খানা । চমকালেও তৎক্ষণাৎ ওর খানা একটা নরম হাতের ক্ষিন শক্তি আটকে দিয়েছে । বাঁধা পেয়ে ক্ষিপ্ততায় রক্ত চক্ষু পাত করলো সংগ্রাম । কেঁপে উঠলো শ্যামা । হাত ছাড়লো তৎক্ষণাৎ । বললো কাঁপা গলায়….
” কি করছেন আপনি ? গায়ে হাত তুলবেন ওর ?
শান্ত হওয়ার চেষ্টা করলো সংগ্রাম । উদ্যত হাত নামালো । চোখ খিচে আড়াল করলো রক্তিম অক্ষি দ্বয় । ভয়ে জড়িয়ে যাওয়া বালার দুই বাহু আঁকড়ে হিচড়ে আনলো নিজের কাছে । জবজবে ভেজা অক্ষি সমেত ঝাঁপসা চোখে কেঁপে উঠে তাকালো বালা । হিসহিসিয়ে উঠলো সংগ্রাম….

” আমার হাতের মার খাস নি কখনো ! খেলে বুঝতি আমার হাত কতোটা শক্ত । এই অবস্থায় এই পরিস্থিতিতে আমার হাতের শক্ত মার তোর গায়ে ফেলার জন্য বাধ্য করিস না আমায় । সইতে পারবি না ।
বলছি না, কিচ্ছু হয় নি তোর সাথে ! কথা কানে যায় না । আমি কি বলেছি, আর কি বুঝেছিস তুই ? কেউ তোকে ছুঁয়েছে মানে সম্মান নষ্ট হয়েছে তোর ? আমি ও তো ছুঁলাম…
” আপনার স্পর্শে তো খারাপ উদ্দেশ্য নেই সংগ্রাম ভাই ।
থমকালো সংগ্রাম । ছেড়ে দিলো বালার বাহু । পিছিয়ে এসে আঙ্গুল তুলে বললো….
” খারাপ উদ্দেশ্য ছিলো কারোর মনে , কিন্তু তোর সাথে সেই খারাপ কিছুই হয় নি । বুঝলি ? বোঝার চেষ্টা কর আমার কথা ! তোর মা আর ভাইয়ের ঘৃনিত মনভাব নিজের মাঝে ঢোকাস না । তুই পবিত্র , বুঝলি ! নিজের সম্মান আছে তোর কাছে ।

উল্টো পাল্টা ভেবে আর বলে মাথা গরম করাস না আমার…
ফুঁপিয়ে উঠলো বালা । চারদিক থমথমে লাগছে । শরীর নেতিয়ে আসছে ওর । মেঝের ঠান্ডা উঠে কম্পন ধরেছে শরীরে । সংগ্রাম কথা শেষ করে গটগটিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে । ফর্সা চেহারা লাল বর্ণ ধারণ করেছে ওর । মুখাবয়বের শিরা উপশিরা দৃশ্যমান ।
ও বেরোতেই শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা । নিজেকে গুটিয়ে নিলো আরো । শ্যামা বসলো হুড়মুড়িয়ে । দুহাতে আগলে নিলো মেয়েটা কে । বালা সিটিয়ে যাওয়া থেকে প্রসস্থ হলো । ডুকরে কেঁদে উঠলো শ্যামার বুকের মধ্যিখানে স্থান পেয়ে । ছলছল চোখ দিয়ে পানি গড়ালো শ্যামার । ও তুললো বালা কে । তিরতির করে কাঁপছে মেয়েটা । মুখখানা কালচে দেখাচ্ছে । ঠোঁট জোড়া নীলচে । শ্যামা ওর শরীরে উষ্ণ গরম কাপড় পেঁচিয়ে দিলো ।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে । মাথার তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে এতোক্ষণ তড়পেছে বালা । এখন ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়েছে ওকে । নিথর হয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় শুয়ে আছে মেয়েটা ।

সংগ্রাম তখন থেকে এই‌ কেবিনে আসে নি আর । শ্যামা গুটি গুটি ধীর পায়ে পাশের কেবিনে পা রাখলো । বারান্দায় বুকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে সংগ্রাম । মুখখানা শক্ত এখনো । পাঞ্জাবির হাতা কনুই অবধি গোটানো । হিমেল হাওয়া বইছে । শ্যামা হাতে একটা শাল তুলে নিঃশব্দে দাঁড়ালো ওর পেছনে । সংগ্রাম সবসময় ওকে জড়িয়ে অতি যত্নে শাল জড়িয়ে দেয় গায়ে । শ্যামাও তাই করলো আজ । তবে মলিন মুখে । উৎকর্ষতা নেই কোনো । সংগ্রাম নড়ে উঠলো খানিক । শ্যামা পাশে দাঁড়াতেই হাসার চেষ্টা করলো বৃথা, জোরপূর্বক । আচমকা বলে বসলো শ্যামা..
” মেয়েদের বোধহয় কোনো অতীত থাকতে নেই , তাই না ছোট জমিদার সাহেব ?
জোরপূর্বক হাসি টুকুও গায়েব হলো সংগ্রামের ঠোঁট থেকে । দৃষ্টি সরালো ও । শ্যামার চোখ ভরে আসছে । আবারো প্রশ্ন করলো ও , এবার কন্ঠ স্বর আরো আড়ষ্ট, করুন…

” বালা কে সত্যিই আপনি এই কারণে ভালোবাসেন নি ?
ঝট করে চাইলো সংগ্রাম । পুনরায় শক্ত হলো চোয়াল । ক্ষিপ্ত হলো দৃষ্টি । ঝেড়ে উঠলো ও…
” বেগম , আবার শুরু করলে তুমি ?
শ্যামার গলা কাঁপছে । জড়িয়ে আসছে ভাষা । ওর ও যে এমন অতীত আছে ! ফরিদ ? ফরিদ তো ওকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছিল ! কুপ্রবৃত্তিতে হাত বাড়িয়েছিল ওর দিকে । সেক্ষেত্রে বালার অবস্থা আর শ্যামার অবস্থা তো এক ! বালাও তো ঘৃনিত স্পর্শের স্বীকার । আর শ্যামা ও । যদিও সেই স্পর্শ গাঢ় নয় , কারোর দিক থেকেই নয় ।
বালা কে যদি সংগ্রাম সত্যি এই কারনে ভালো না বেসে থাকে , তাহলে শ্যামা ? কেঁপে উঠলো শ্যামা ! আর ভাবতে পারলো না কিছু ।
কোনো পুরুষ তার নারীর শরীরে অন্য কারোর দৃষ্টি ও সহ্য করতে পারে না , স্পর্শ তো অনেক দূরের কথা । সংগ্রাম তো জানে না শ্যামার এই ছোট্ট অতীত ! যদি জানতে পারে , তাহলে কি করবে ? ও ঘৃনা করবে শ্যামা কে ? আর ভাবা গেলো না । মাথা ভার হয়ে আসছে ।
শ্যামা কম্পিত স্বরে বলল….

” আমার যদি এমন কোনো অতীত থেকে থাকে , তাহলে ? তাহলে ঘৃণা করবেন আমায় ?
সংগ্রামের সূচালো দৃষ্টি । আরো প্রখর হলো তা । সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হলো । কন্ঠ স্বর স্বাভাবিক হয়ে আসলো….
” তোমার প্রতি শুধুই আমার ভালোবাসা ! ঘৃণা তো দূর , সামান্য বিরক্তিও কখনো আসবে না তোমার প্রতি । তোমার প্রতি আমার ভালোবাসায় ঘৃণা পরিত্যার্য বেগম ।
” যদি সত্যিই কোনো অতীত থেকে থাকে , তাহলে ? যদি কখনো জানতে পারেন আমাকেও কেউ ওভাবে স্পর্শ….
সংগ্রাম আটকে দিলো শ্যামার কথা । কাছে টানলো ওকে । বুক খানা কাঁপছে শ্যামার । ওষ্ঠ জোড়াও তাই । ও বলতে পারছে না কিছু । সংগ্রাম ওর কোমর জড়িয়ে ওকে আঁকড়ে ধরলো । মাথাটা চেপে ধরলো নিজের প্রসস্থ বুকের সাথে । চোখ বুজে তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো হীম শীতল কন্ঠে…

” শরীরে স্পর্শ লেগে থাকে না বেগম । লেগে থাকে মনে । তোমার শরীর মন দুটোই আমার স্পর্শে ভরা । যদি অন্য কোন স্পর্শ থেকে থাকে , তাহলে সেটা এতো দিনে আমার স্পর্শে ঢেকে গেছে । চাপা পড়েছে আমার ভালোবাসার স্পর্শের গভীরতায় ।
ভেবো না বেগম , আমি কখনো ভুল বুঝবো না তোমায় । বলেছি না ভালোবাসি , আর কতো বোঝাবো বলো । আমি ভালোবাসি তোমায় !
বালা কেও ভালোবাসি , এটাও বলেছি তোমায় । সেটা শুধুই বোন হিসেবে । ও পবিত্র , আর তুমিও ! নিজের বিষয়ে বা বালার বিষয়ে ভুল ধারণা করো না নিজের মাঝে ।
শ্যামা খানিক ফুঁপিয়ে থামলো । ঢোক গিলে কপাল কুঁচকালো । একই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলো করার তাগিদে ডাকলো মোলায়েম কন্ঠে..

” ছোট জমিদার সাহেব ?
” বলো বেগম ?
” ঐ মালি ? ঐ জানোয়ার টা ? এখন কোথায় উনি ?
” কবরে !
মাথা তুললো শ্যামা । চোখ তুলে দৃষ্টি পাত করলো সংগ্রামের মুখে । প্রশ্ন করলো…
” মানে ?
” কবর দিয়েছি ওকে !
শ্যামার প্রশ্ন সূচক দৃষ্টি । সংগ্রাম একটু থেমে বললো আবার…
কন্ঠ স্বর খানিক শক্ত…
” হায়াত ফুরিয়ে গেছিলো ওর । মরেছে ‌, মুসলমান তো ,তাই কবর দিয়েছি । নয়তো পুরিয়ে ফেলতাম…
শ্যামা বোধহয় বুঝলো না । অবুঝের ন্যায় দৃষ্টি ওর । সংগ্রাম হাসলো একটু । ওর পুরুষালি খানিক শব্দ তুলে মুচকি হাসি টুকু ভীষণ সুন্দর দেখালো । বিমূর্ত হয়ে চেয়ে দেখলো শ্যামা । এক মুহুর্তের জন্য চোখ আটকে গেলো ওর । সংগ্রাম ওষ্ঠ বাড়িয়ে শ্যামার কপালে পরশ আকলো । দুহাতে চোখ জোড়া মুছিয়ে দিয়ে মোলায়েম স্বরে বললো…
” ভালোবাসি বেগম । আমার ভালোবাসা ব্যতীত অন্য কোন কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না তোমায় ।

ক্ষয়ে ক্ষয়ে পেরোলো মাঝে কটা দিন । পরদিন বালা কে নিয়ে ফেরা হয়েছে জমিদার বাড়িতে । মেয়েটা নিশ্চুপ , নির্জীব হয়ে গেছে । আগের তুলনায় অধিক গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে । আজকাল দরজা লাগিয়ে ঘরে থাকে । কেউ ডাকলে তবেই দাঁর খোলে । কথা বলে না তেমন । কথার উত্তর ও করে সময় নিয়ে ।
আগেই ভালো ছিলো মেয়েটা । সংগ্রাম ভেঙ্গেছে অর্ধেক । আর অর্ধেক ভাঙলো ওর অতীত । যদিও গহীন নয়, তবুও অন্ধকার তা । যা প্রত্যেক টা সাধারণ মেয়ের স্বাভাবিক জীবনে অভিশাপ স্বরুপ ।

পড়ন্ত বিকেল । অতিথি শালার তালা খোলা আজ । কেউ ঢুকেছে ঘরে । দরজা হাট করে খুলে রাখা । সংগ্রাম ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকছিলো । অন্দরে প্রবেশের আগে নজর পড়লো অতিথি শালার দিকে । দরজা খোলা দেখে থামলো একটু , কপাল কুঁচকালো । পরমুহূর্তে ভাবলো হয়তো পরিষ্কার করছে কেউ । ভেবে পা বাড়িয়ে আরো একবার ফিরে তাকালো । সন্দেহ দূর করার জন্য স্বভাব সুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে পেছনে হাত গুটিয়ে এগোলো অতিথি শালার দিকে । দরজায় দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো না আগেই । বাইরে থেকেই ভেতরের জন কে দেখতে পেলো । ললাট কুঁচকে আসলো বেশি । ভ্রু যুগলের মাঝে ভাঁজ পড়লো কয়েক স্তর । গোটানো হাত সোজা করলো সংগ্রাম । গলা খাঁকারি দিলো বাইরে থেকে । ভেতরের জন চকিতে ফিরলো । গম্ভীর মুখশ্রী স্বাভাবিক করলো সংগ্রাম কে দেখে । ঝাঁকড়া চুল কপাল পেরিয়ে চোখ ঢেকেছে অল্প স্বল্প । সে চুল গুলো গোছালো । এক হাতে চুল গুলো পিছনের দিকে ঠেলে হাতের ব্যাগটা রাখলো চেয়ারের উপর । ভেতরে ঢুকলো সংগ্রাম । বললো রাশভারী গলায়….

” আবার ফিরলে যে ?
” কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস রেখে গেছিলাম । ভুলো ক্রমে ছেড়ে গেছিলাম বলতে পারেন , সেসব নিতেই ফিরেছি ।
অংকুরের বরাবরের ন্যায় সটান গম্ভীর জবাব । সংগ্রাম তাকালো খাটের উপরের ব্যাগটার দিকে । হাসলো একটু , স্বর ভিজিয়ে বললো….
” তা ,,কি কি রেখে গেছিলে..?
” কিছু জিনিস পত্র ,, তাড়াহুড়ো করে গেছিলাম তো ,তাই সব ঠিকঠাক ভাবে গুছিয়ে নিয়ে যেতে পারি নি ।
” ও আচ্ছা ! জিনিসের পাল্লায় অন্য কিছু কেও তুলে দিচ্ছো না তো ?
অংকুর উত্তর করলো না । থতমত খেয়ে দৃষ্টি সরালো । সংগ্রাম এগোলো আরো একটু । বললো ভনীতা হীন…
” সেদিন হাসপাতাল থেকে পালালে কেনো ?
ঝট করে চাইলো অংকুর । প্রশ্ন টার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না ও । সংগ্রামের তীক্ষ্ণ ধারালো দৃষ্টির মুখোমুখি কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকা কুলোলো না ওর পক্ষে । ও দৃষ্টি নত করলো । অধর ভেজালো জিভে । নজর ঘোরাচ্ছে এদিক ওদিক । সংগ্রাম তাকিয়ে থেকেই আবার শুধালো….

” শুনেছো সব ?
এবার উত্তর আসলো অংকুরের থেকে । তাও ক্ষিণ ছোট্ট জবাবে..
” হুম !
” তা , মন পাল্টালে ? নাকি রুচি ?
” মানে ?
” এটার মানে না বোঝার মতো অবুঝ নও তুমি ! তোমাকে চিনতে ভুল করি নি আমি নিশ্চয়ই ? জিনিস পত্র তাড়াহুড়োয় ফেলে যাওয়া কাঁচা কাজ , তোমার দিক থেকে এটা মানতে পারলাম না । অজুহাতে রেখে গেছিলে সব , তা এই অজুহাতের সূত্র একই আছে , নাকি বদলেছে ?
অংকুর নিরুত্তর । অপ্রস্তুত পরিস্থিতির সম্মুখীন ও । ও পিছু ফিরলো । চোখ বুজে শ্বাস টানলো । উত্তর না পেয়ে ফের বললো সংগ্রাম , এবার কন্ঠ চিপে…

” ঘৃণা হচ্ছে ?
ঝট করে ফিরলো অংকুর । দৃষ্টি তীরের ন্যায় । দৃষ্টিতে যেন ছলকে উঠলো ওর ব্যাক্তিগত সত্ত্বা । চড়া গলায় বলে উঠলো ও…
” কি সব বলছেন আপনি ?
” তাহলে ?
” ঘৃণা হওয়ার মতো কিছুই ঘটে নি ‌!
” তাহলে পালালে কেনো ?
” আমার সামনে আপনাদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলতে চাইনি আমি !
” আর আজ ফিরলে কেনো ?
” জানি না !
” পছন্দ বালা কে ?
” জানি না !
” নিজের সিদ্ধান্তে বিভ্রান্ত ?
” জানি না !
” তাহলে কি জানো !

” পার্থক্য ! বলেছিলেন না , জমিদার আর জমাদার এর মধ্যে পার্থক্য জেনে রাখতে । সেটাই জানি । আপাত দৃষ্টিতে কতোখানি জানা নেই । তবে অনেক পার্থক্য আছে !
” জমিদার আমরা ,, বালা নয়‌ !
” একই তো রক্ত ! বেড়ে উঠেছে একই বিলাসীতায় ।
” ও বিলাসী নয়‌ ! আর তোমার অভাব আছে বলে জানা নেই আমার ।
অংকুর উত্তর করতে পারলো না । শান্ত অবস্থাতেই ছটফট দেখাচ্ছে ওকে । সংগ্রাম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করলো ওকে । ওর মনের অবস্থা ঠাহর করতে একটুও অসুবিধা হচ্ছে না সংগ্রামের । ছেলেটা গম্ভীর কাঠখোট্টা হলেও মন পড়া যায় সহজেই । সংগ্রাম হুতাশ হয়ে শ্বাস ফেললো । সময় নিয়ে বললো…
” বালা একটা পবিত্র ফুল অংকুর ! কিচ্ছু ক্ষোয়া যায় নি ওর জীবন থেকে । ভেবো না গছাতে চাইছি তোমার উপর ! ও বেশি নয় আমাদের কাছে । কোনো পুরুষের দৃষ্টির সম্মুখীন ও হয় নি ও । মেয়েটার একটু ভালোবাসার অভাব । আর ওর এই অভাব পুরণের জন্য যোগ্য কাউকে প্রয়োজন । ওকে নিয়ে যাও এখান থেকে,, এখানে থাকলে ওর যন্ত্রণা বাড়বে বই কমবে না ।

” আমি যে যোগ্য বুঝলেন কি করে ?
” তোমার চোখে ! যোগ্যতা কতখানি খাটাতে পারবে জানা নেই , তুমিই জানো সেটা , তবে অযোগ্য নও তুমি !
” সুরবালার আমাকে পছন্দ ?
” তুমি নিজেই জেনে নিও !
” কি করে ?
” কাছে যাও ওর ! ঘরেই আছে ‌…
” অন্দরে প্রবেশ নিষিদ্ধ …
” আমি অনুমতি দিচ্ছি !
” ওর ঘরে যাবো ? এতো বিশ্বাস আমার প্রতি ?
” জানি না কেনো, তবে বিশ্বাস হয় তোমায় ।
” যদি ভেঙ্গে দেই ?
” ভাঙ্গলে বেশি তুমিই‌ পুড়বে !
অংকুর কথা বাড়ালো না । মাথা উপরের দিকে তুলে চোখ বুজে শ্বাস ফেললো দীর্ঘ । এতো দিনে স্বস্তি লাগছে একটু । হালকা লাগছে নিজেকে ।
সংগ্রামের সাথে অন্দরে ঢুকেছে ও । অন্দরে কেউ নেই । সোজা উপরে উঠেছে ওরা । সংগ্রাম ওর নিজ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো । একটা ঘর বাদ দিয়ে বালার ঘর ইশারা করে বললো..

” ঐ ঘরেই আছে ! যাও….
অংকুর ইতস্তত । সন্দিহান হয়ে শুধালো ও …
” যাবো ? যদি ভুল ভাবে আমায় ?
” সামলানোর দায়িত্ব তোমার ।
বলেই এক ফালি হেসে দরজা আলতো ফাঁক করে ঘরে ঢুকলো সংগ্রাম । অংকুর এগোলো ইতস্ততায় । ঢোক গিললো কয়েক বার । দরজায় কম্পিত হাতে কড়া নাড়লো বেশ কবার । অনেক টা সময় বাদ খুললো দরজা খানা । বালা নতজানু । চোখ মুখ ফ্যাকাশে । সামনের জনের পায়ের দিকে দৃষ্টি যেতেই চোখ তুললো ঝট করে । কপাল কুঁচকে আসলো আপনা আপনি । অংকুরের সাথে চোখাচোখি হতেই ঝট করে দরজার আড়াল হলো বালা । সচকিতে সঙ্কিত হয়ে বলে উঠলো….

” আপনি এখানে ?
” হুম !
” অন্দরে ঢুকলেন কি করে আপনি ? এখানে ? এখানে কি প্রয়োজন আপনার ?
” সংগ্রাম জোয়ার্দার নিয়ে এসেছে অন্দরে !
এখানে কিছু প্রয়োজন !
সোজা সাপ্টা উত্তরে আর সংগ্রামের কথা শুনে শ্বাস ফেললো বালা । প্রশ্ন করলো…
” কি প্রয়োজন এখানে ? সংগ্রাম জোয়ার্দারের ঘর এটা নয়‌ ।
” জানি । প্রয়োজন টা তোমার সাথে !
” মানে ?
সঙ্কিত প্রশ্ন বালার । খানিক কম্পিত স্বর ! ভয় লাগলো ওর । ঘর পোড়া গরু তো , সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ডরায় ।
অংকুর উত্তর করলো ভনীতা হীন…
” ভেতরে আসবো ? এসে বলি ?
” ভেতরে আসবেন মানে ? আমার সাথে কোনো প্রয়োজন থাকার কথা নয় আপনার !
” প্রয়োজন তোমার নয় , আমার । আমার কার সাথে প্রয়োজন আছে নেই , তুমি জানবে কি করে ?
কেঁপে উঠলো বালা । সুবিধার লাগছে না কিছু । ও ঝট করে দরজা ঠাস করে বন্ধ করতে গেলে অংকুরের শক্তি শালী হাত আটকে দিলো তা । বালার ভীত চেহারা খানা নজরে আসলো । ফের ঢোক গিললো বালা । ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো অংকুর । ধপ করে লাগিয়ে দিলো দরজা খানা । কেঁপে কেঁপে পিছনে পিছালো বালা ।
অংকুর পিছু ফিরে বললো শান্ত স্বরে…

” দেখো , ভয় পেয়ো না । আমি কিছু কথা বলতে এসেছি তোমার সাথে ! সত্যি বলছি , কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই আমার । বিশ্বাস করো…
চেঁচিয়ে উঠলো বালা…
” বিশ্বাস ? বিশ্বাস কাকে করবো আমি ? আপনাদের মতো পুরুষ দের ? কাউকে বিশ্বাস করি না আমি ! কাউকে না । চলে যান এখান থেকে ! নয়তো, নয়তো চেঁচাবো আমি । আমি কিন্তু ছোট নোই , সেই চার বছরের শিশু নেই আমি । আমার কাছে আসলে খুন করে ফেলবো আপনাকে । মেরে ফেলবো একদম । চলে যান এখান থেকে….
অংকুর বুঝলো ওর ভয়ের কারণ । কাঁদছে মেয়েটা । চোখ ছাপিয়ে জল গড়াচ্ছে । নিজেকে শান্ত করলো অংকুর । পিছিয়ে কন্ঠস্বর মোলায়েম করলো….
” ঠিক আছে , চলে যাবো । কাছে যাবো না তোমার । আগে আমার কথা শোনো ।
বিয়ে করবে আমায় ?
থমকালো বালা । আচমকা কথাটার মানে বুঝেও বুঝলো না । স্থির হলো ও । অংকুর রয়ে সয়ে শান্ত মোলায়েম স্বরে বলল ফের…

” বিয়ে কবরে আমায় ?
স্থির বালা কেঁপেছে একটু । কি বলছে এই লোকটা ? মাথা খারাপ ?
মাথা খারাপ লোকটা একই ভাবে বললো আবার..
” যাবে আমার সাথে ? শহরে , অনেক দূরে ? মা ছাড়া কেউ নেই সেখানে আমার ! মায়ের পর অন্য কেউ হবে আমার জীবনে ? মায়ের পর দ্বিতীয় কোনো নারী ? আর জীবনের প্রথম নারী ? হবে তুমি ? এই গ্রামের গন্ডি পেরিয়ে যাবে আমার সাথে ? আমার হাত ধরে..?
বালা নিস্তব্ধ । নির্বোধের ন্যায় দৃষ্টি ওর । অংকুর এবার নিঃশব্দে এক পা এক পা করে বলতে বলতে এগোলো…

” আমার ক্যানভাসে আঁকা প্রথম মেয়ে ছিলে তুমি , আর আমার জীবনেও প্রথম সেই তুমি । তোমাকেই শেষ বানাতে চাই । অতীত বুঝি না , কে ছিল কে নেই জানি না । জানতেও চাই না । চাই তোমায় ! হবে আমার ?
বালা এবার তেঁতে উঠলো ।
” দাঁড়ান । এগোবেন না । আসবেন না আমার কাছে । সুযোগ নিচ্ছেন ?
” সুযোগ নিলে ভরা বাড়িতে নিতাম না । সুযোগ নেবো তবে বিয়ের পর ।
” কে বিয়ে করবে আপনাকে ?
” তুমি ?
হাসলো বালা । বললো ব্যাঙ্গ করে..
” বিয়ে করবেন আমায় ? কতটুকু চেনেন আমায় , কতটুকু জানেন আমার বিষয়ে ? আমার অতীত সম্পর্কে ? আরে আপনি কি করে জানবেন , আমি তো নিজেও জানতাম না আমার অতীত । আগে জানুন, শুনুন , তারপর বলতে আসবেন এসব..
” অতীত জানতে চাই না । ভবিষ্যৎ গড়তে চাই তোমার সাথে !
একটু থেমে বললো..
” সংসার সাজাতে চাই ‌তোমার সাথে । আমার সংসারে মা আর আমি ছাড়া কেউ নেই । তৃতীয় জন তোমাকে বানাতে চাই !
বালা হাসলো আবার । হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললো …
বললো কান্না জড়িত অস্ফুট স্বরে…

” আমি চাই না কাউকে । এখন তো আরো চাই না । যাকে চেয়েছিলাম – তাকে পাই নি , আর অন্য কাউকে চাই না আমার ! কাউকে চাই না , আমার নোংরা জীবনে কারোর সহানুভূতি চাই না ! চলে যান আমার চোখের সামনে থেকে..!
” যাবো না !
জেদি কন্ঠ অংকুরের । বালা ফিরলো । এই লোকটা কে ও দেখেছে তো মাত্র কয়েক বার । এতো কথা বলছে কেনো ও এর সাথে ? বালা চোখ মুছলো । প্রগাঢ় করলো নিজেকে…
” যাবেন না ? এখানে আপনাকে দেখলে আরো কালি লাগবে আমার শরীরে !
” লাগুক , আমি মুছে দেবো তা…
” আরে মাথা খারাপ আপনার ? কিসব বলছেন তখন থেকে ? এটা বাস্তব জীবন । বুঝলেন ?
” আমি অবাস্তব বললাম কখন ?
” অবাস্তব কল্পনা করবেন না ! আমাকে মানবে না কেউ । আমার সামান্য অতীত আমার আম্মা আর ভাইজানই মেনে নিতে পারে নি । সেও মানে নি , তাইতো ভালোবাসে নি আমায় । আর আপনি ? আপনি তো বাইরের লোক ।
গলায় কান্না চেপে কোনো রকমে কথা গুলো বললো মেয়েটা । কি করবে? কষ্ট হচ্ছে ভীষণ ? কথা বলতে পারছে না ও । গলা চিরে যাচ্ছে । তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে ভেতরে ।
ওর যন্ত্রণার ছেদ ঘটিয়ে বলে উঠলো অংকুর..

” আপন কেউই তো হতে চাইছি ! অতীত ছিলো না তোমার । যেটা ছিলো সেটাকে অতীত বলে না !
বালা ফিকড়ে উঠলো । কান্না চেপে ধপ করে বসলো মেঝেতে । ডুকরে উঠলো….
” অতীত ছিলো । ঘৃণীত অতীত ছিলো আমার ।
ভরা চোখে তাকালো অংকুর । নিজেকে আজ অচেনা লাগছে । এটাই কি সেই গম্ভীর অংকুর ? সন্দেহ হচ্ছে নিজেই নিজেকে ?
ও একটু এগোলো । দুই হাঁটু গেড়ে বসলো বালার সামনে । মাঝে দূরত্ব অনেক । শীতল কন্ঠে ডাকলো অংকুর…
” সুরবালা ?
ধীরে ধীরে সজল চোখ তুললো মেয়েটা । মুখখানা দুই হাতের তালুতে চেপে রাখা । অংকুর বললো…
” উত্তরের অপেক্ষায় আছি তোমার !
বালার এবার শান্ত কন্ঠ…

” আমি আমার জীবনে কাউকে জায়গা দিতে পারবো না । চলে যান আপনি …
” কেনো পারবে না ? কেউ আছে তোমার জীবনে ? ভালোবাসো কাউকে ?
বালা হাসলো । তাচ্ছিল্যের সুর হাসিতে । বললো তাচ্ছিল্যের স্বরেই…
” ভালোবাসা ? না তো , কাউকে ভালোবাসি না । যদি ভালোবাসতাম , যদি সত্যি হতো আমার ভালোবাসা , তাহলে তো তাকে পেতাম । সত্যিকারের ভালোবাসা নাকি যেভাবেই হোক সফল হয় , পূর্নতা দেয় আল্লাহ নিজেই । আমার ভালোবাসা সত্যিই ছিলোই না । ভালোবাসি নি আমি কাউকে । কাউকে না ,, চলে যান আপনি ….

” বিয়ে হয়েছে তার ,, সংসার আছে । তার প্রতি মোহ রেখে লাভ কি আর ?
” এটাও জানেন ?
” জেনেছি !
” তাও আসলেন কেনো ? চলে যান …
” গেলে তোমায় নিয়েই যাবো । মাকে নিয়ে আসবো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ?
” না ,,
” কেনো ?
“…..
নিশ্চুপ বালা । উত্তর করার প্রয়োজন বোধ হলো না । অংকুর বললো নীরবতা ভেঙে…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৮

” সংগ্রাম জোয়ার্দার রাজি…।
তড়িতে চাইলো মেয়েটা । চোখাচোখি হয়ে মুহূর্ত পেরোলো কিছুটা । হাসলো বালা , আর যাই হোক এটা ছাড়া যাবে না ঠোঁট থেকে । চোখ ফিরিয়ে দুই হাঁটু জড়ো করে হাঁটুর ভাঁজে মাথা এলিয়ে রাখলো বালা । শ্বাস ফেললো নিঃশব্দে চোখ বুজে । পানি গড়ালো বাঁ চোখের কর্নিশ বেয়ে । আর কথা হলো না ওদের মাঝে । অংকুর অনেক টা মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলো বিমূঢ় হয়ে । অতঃপর নিঃশব্দে ঘর ত্যাগ করলো ও । বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩০