শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪১
সুরভী আক্তার
শ্যামা কে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে সংগ্রাম । রাতে আর খাবে না । খেয়েই ফিরেছে । লতিফ জোয়ার্দার যেন ওদেরই অপেক্ষায় ছিলেন । অন্দরে বসে ছিলেন তিনি । গায়ে ধূসর রঙা মোটা শাল জড়ানো । কাশছেন খুক খুক করে । ঠান্ডা লেগেছে তার । বয়স বেড়েছে , আজকাল শরীরের অবহেলা না হলেও অসুস্থতা লেগেই থাকে । গ্রামেও বেরোতে পারেন না আজকাল । আগে রোজ টহল দিতে বেরোতেন । এখন পারেন না ।
সংগ্রাম ফিরে অন্দরে ঢুকতেই লতিফ জোয়ার্দার বলেছেন একবার নিচে আসতে । গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে । বাড়ির সবাইকেই ডেকেছেন তিনি । সংগ্রাম, শ্যামা ঘরে গিয়ে একটু বাদ নিচে নেমেছে আবার । সালেহা লতিফ জোয়ার্দারের পাশেই বসে । সংগ্রাম কে দেখে উৎসুক হলেও সংগ্রামের পাশে শ্যামা কে দেখে মুখ কুঁচকালেন তিনি । চোখ ফেরালেন অবিলম্বে নির্বিকার ভঙ্গিতে । সংগ্রাম বড় সোফা টার মাঝ বরাবর বসতে বসতে বলল লতিফ জোয়ার্দারের উদ্দেশ্যে…
” কি ব্যাপার আব্বা ? মুখটা এমন শুকনো দেখাচ্ছে যে ? কি হয়েছে ?
” শরীরটা ভালো যাচ্ছে না কদিন ধরে ।
” কি হয়েছে আব্বা ?
” কি হয়েছে আজ খোঁজ হলো তোর ? বাপ হয় এটা ভুলে গেছিস ? বাপ মা যে এখনো বেঁচে আছে, সেটা মনে আছে তোর ? আমি তো ভেবেছিলাম বউয়ের পাল্লায় পড়ে সব ভুলেছিস !
সালেহার তপ্ত নিরেট স্বর । রসকস হীন কাঠখোট্টা । সংগ্রামের স্বাভাবিক মুখশ্রীতে বদল আসলো তৎক্ষণাৎ । লতিফ জোয়ার্দার বিরক্তি প্রকাশ করলেন…
” আহ্ সালেহা , কি শুরু করলে আবার ? সব জায়গায় মেয়ে টাকে কেনো টানো তুমি ?
” টানি কি আর সাধে ? কদিন ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে আছেন , আপনার ছেলে জানে ? তার খেয়াল আছে সেদিকে ? আমার কথা না হয় বাদই দিলাম । আমি তো ভালো না । কিন্তু আপনি তো ভালো ।
বউ বাড়িতে নেই একদিন , বউয়ের পিছু পিছু শশুর বাড়িতে গিয়ে বউয়ের আঁচলের নিচে লুকানো যায় । অথচ বাড়িতে যে বাপ পড়ে আছে , সেদিকে ?
শ্যামা মাথা নোয়ালো । নিরিহ তার ছোট্ট মুখখানা । সংগ্রাম সালেহার সব কথার গুরুত্ব দিলো না । লতিফ জোয়ার্দারের অবস্থার কথা শুনে আঁতকে উঠলো । বিচলিত হয়ে শুধালো…
” শয্যাশায়ী মানে ? কি হয়েছে আব্বা , আপনি ঠিক আছেন ?
” আমি ঠিক আছি বাবা । আসলে কদিন ধরে শরীরটা নেতিয়ে পড়েছে একটু । বয়স বেড়েছে , এটা স্বাভাবিক ।
অতঃপর শ্যামার দিকে ফিরলেন । শ্যামা কে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মোলায়েম কন্ঠে বললেন….
” তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেনো আম্মা ? এসো দেখি , আমার পাশে বসো তো একটু !
শ্যামা মাথা তুলে হাসার চেষ্টা করলো । সংগ্রাম মুচকি হেসে চোখে ইশারা দিতেই লতিফ জোয়ার্দারের পাশে বসলো শ্যামা । সালেহা ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে চাইলেন । লতিফ জোয়ার্দার শ্যামার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন নরম গলায়…
” তোমাদের ঘাড়ে কিন্তু বিশাল দায়িত্ব পড়তে চলেছে আম্মা ! নিজেকে এভাবে নুইয়ে রেখো না । কঠোর হও একটু ।
তোমার আম্মা কেই দেখো , তোমার সামনেই তোমার বিরুদ্ধে কেমন ঠাস ঠাস করে কথা বলছে ! তার থেকে শিখে নাও এটা । সংগ্রাম জোয়ার্দারের স্ত্রী তুমি । জমিদার বাড়ির একমাত্র বউ , জমিদারের গিন্নি তুমি , একটু দাপট না থাকলে চলে ? দাপুটে হয়ে দেখাও একটু…।
লতিফ জোয়ার্দারের কথার মাঝেই আতিয়া বেগম হাজির হলেন । তার পিছু পিছু বাকিরা । লতিফা আর জুনাইদ ও আসলো । পিছে শবনম সৈকত কে কোলে করে ।
লতিফ জোয়ার্দার শ্যামা কে ছেড়ে আতিয়া বেগমের দিকে তাকাতেই বলে উঠলেন আতিয়া বেগম….
” নাত বৌ , কহন আইলি তুই ?
শ্যামা ধীরে উত্তর করলো,,
” কেবলই আইলাম দাদি জান ।
” আর কইস না লো , মাজার ব্যাথা বহুত বাড়ছে । কাইল থাইকা তোর কথা কয়বার যে মনে করছি । তুই একটু তেল মালিশ কাইরা দিলে আরাম পাই …
” আমিও তো বাড়িতেই আছি আম্মা । আমাকে তো বলেন নি তেল মালিশ করে দিতে।
সালেহার শক্ত কন্ঠে আতিয়া বেগম তার দিকে ফিরে উত্তর করলেন…
” তোমার হাতে এখন জোর নাই বউমা । মুখেই যা জোর । তয় , শ্যামা জোর দিয়া ভালো কইরা মালিশ করতে পারে । জাদু আছে হের হাতে , হেয় মালিশ করলে ব্যাথা চড়াও কইরা কইমা যায় আমার…
কটমট করলেন সালেহা । সবাই দেখি ঐ মেয়েটার গুনগান গাচ্ছে । তার সহ্য হলো না মোটেও । লতিফ জোয়ার্দার হাসলেন । জুনাইদ, লতিফা , শবনম , সবাই বসেছে । পুরো পরিবার আজ একত্রে । একসাথে বসেছে সকলে । প্রত্যেক বার কারোর না কারোর কমতি থাকে , খাওয়ার টেবিলে ব্যাতীত সবাই একজোট হয় না । আজ হয়েছে । সৈকত শবনমের কোল থেকে নেমে সংগ্রামের দিকে ছুটেছে । এক লাফে উঠেছে সংগ্রামের কোলে । সংগ্রাম হলে আর কাউকে চাই না তার । আতিয়া বেগম ভরাট মুগ্ধ চোখে চেয়ে এর মাঝেই বলে উঠলেন…
” দাদু ভাই , একখানা ছাওয়াল নিয়া ফেলা দেখি ! বিয়া তো হইলো মেলা মাস । ছাওয়াল লইবি কবে ? যৌবন থাকতে থাকতে বাচ্চা কাচ্চা পয়দা কইরা মানুষ কইরা ফেলা । আমি দেইখা যাইতে পারি যেন । মইরা গেইলে আফসোস হইবো নাইলে । আমার আদরের নাতির পোলাপান দেখমু না আমি ?
শ্যামা লাজুকতায় মাথা নোয়ায় । তা দেখে হাসে সংগ্রাম । লতিফ জোয়ার্দার গলা ঝেড়ে মূল আলোচনায় আসলেন এবার । ডাকলেন প্রথমে…
” সংগ্রাম ?
” জ্বি, আব্বা !
” আমার কিছু কথা বলার আছে । সবাইকে এজন্যই ডাকা !
” বলুন ।
” অনেক হয়েছে , আমি আর পারি না । এমনিতেও সবকিছু তোমাকেই দেখতে হয় । তুমিই সামলাও সব । এখন নামমাত্র আমি জমিদার । আমার অবসর নেওয়া উচিত এসব থেকে । গ্রামের মানুষের কাছে ছোট জমিদার থেকে জমিদার হয়ে যাও এবার । সব দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে এই মর্যাদা টুকু ও বুঝে নাও । আমি চাইছি সব একেবারের জন্য তোমার হাতে তুলে দিতে । উত্তরের জমি টা নিয়ে তালুকদার দের সাথে বিবাদ চলছে , সেটা স্থির আছে এখনো । তুমিও সেভাবে মাথা ঘামাচ্ছো না দেখছি । নিজের উপর সব দায়িত্ব পড়লে ঠিক মাথা ঘামাবে তখন । ওটা ওদের হাতে ফেলে রাখার কোনো মানে নেই । জমি আমাদের , জমিদার গ্রামের শেষ সীমানা ওটা । ওটা হাত ছাড়া করা যাবে না । তোমাকে এটায় গুরুত্ব দিতে হবে । পুরো জমিদারি এখন থেকে পুরোপুরি সামলাতে হবে তোমাকে । গ্রামের মানুষের ভরসা এমনিতেও আমার থেকে তোমার উপর বেশি । সবটা ভেবেই বলছি আমি….
লতিফা আঁতকে উঠলো । ধক্ করে চাইলো জুনাইদের দিকে । সংগ্রাম জমিদার হবে এবার ? বংশ পরম্পরাই চলবে তবে ? জমিদারের ছেলে জমিদার ? আর জুনাইদ ? ওর কি হবে ?
জুনাইদের স্থির দৃষ্টি, ভেতরে ভেতরে তীব্র উত্তাপ সৃষ্টি হলো । হাত মুঠো করে দাঁত চেপে ধরলো সে । চোখ নুইয়ে ক্ষিপ্ত রক্ত চক্ষু আড়াল করলো । ফুসলো নিঃশব্দে । সংগ্রাম লতিফ জোয়ার্দারের সব কথা শুনে শান্ত হয়ে বললো….
” আপনি সবার কাছে জমিদার আছেন সেটাই থাকুন । আমি যেভাবে চলছি, সেভাবেই চলি । সবটা সামলাচ্ছি যখন, তখন এভাবেই সামলাই । আপনার মর্যাদায় হস্তক্ষেপ করতে চাই না আমি…
” কেউ কারোর মর্যাদায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না । তুমি যেহেতু দায়িত্ব পালন করবে , তো সেই দায়িত্বের মর্যাদা গ্রহণ করতে দ্বিধা কিসে ? আমি চাইছি তুমি সবটা বুঝে নাও ।
” ঠিকি তো দাদু ভাই …
তুই তো জমিদার হইবিই , আইজ হইলেও আর কাইল হইলেও । তোর বাপ তোর থাইকা ছোট বয়সে জমিদারি গ্রহণ করছে । তুই তো মেলা তাগড়া হইছোস । বিচক্ষণও তুই ।
আতিয়া বেগমের কথায় সংগ্রাম শ্বাস ফেললো । লতিফা গলা ভিজিয়ে বলে উঠলেন এবার আমতা স্বরে…..
” সংগ্রাম বিচক্ষণ , এমনিতেও ও সবার কাছে জমিদার । একে আবার আলাদা করে ঢাক ঢোল পিটিয়ে জমিদার হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে নাকি ?
” হবে তো । ঢাক ঢোল পিটিয়েই ওকে জমিদার হিসেবে অভিষেক করানো হবে । জমিদার হিসেবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হবে ওর । পরবর্তীতে ওর সন্তান দের ।
লতিফা মুখ চুপসে ফেললেন । এতো দিন নিজেকে অন্তত এই বলে শান্তনা দিয়ে এসেছেন, যে জুনাইদের কিছু একটা গতি হবে । জুনাইদ সংগ্রামের বড় । ছোট থেকে এই বাড়িতেই মানুষ । উপর উপর হলেও সে তো কম কাজে না লতিফ জোয়ার্দারের । গ্রামে গেলে জুনাইদ সাথে থাকে সবসময় । সংগ্রাম ওকে গ্রাহ্য না করলেও লতিফ জোয়ার্দার করতেন । মনে একটু হলেও আশা ছিলো তাই । যদিও নিজ শান্তনায় । সংগ্রাম জমিদার হবে এটাই ভবিতব্য ছিলো । এটাই হাওয়ার ।
জুনাইদ মাথা নুইয়ে । লতিফা ছেলেকে পরখ করলেন , ওর ক্রোধিত অবস্থা বোধগম্য হচ্ছে তার । সংগ্রাম কে হেয় করতে অনেক চেষ্টা করেছিল জুনাইদ । সংগ্রামকে অযোগ্য প্রমানের কম চেষ্টা হয় নি । কিন্তু বৃথা সব । ঐ যে , সংগ্রাম দূরদর্শী । ওর বিপরীতে হওয়া প্রত্যেকটা বিরুদ্ধাচারন ওকে ছুঁতে ও পারে নি । সংগ্রামের জানা সব । এসব বৃথা চেষ্টায় ও কখনো গুরুত্ব দেয় নি । এসবের পেছনে কে আছে কে নেই, সব জানা । জুনাইদ নির্বোধ , ওর নির্বোধের ন্যায় কর্মকান্ড কে তাচ্ছিল্য করে সংগ্রাম । তবে জুনাইদ একা নয় ।
লতিফ জোয়ার্দার এর মধ্যেই আবার বললেন…
” আর কিছু বলতে চাও সংগ্রাম ?
” আমার আর কি বলার ?
” তাহলে জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার হচ্ছো ? কি বলে ডাকবো এখন তোমায় ? জমিদার সাহেব ?
হাসলো সংগ্রাম । সাথে বাকিরাও । শীতল হাসি সকলের । লতিফ জোয়ার্দার হেসে বললেন শ্যামার উদ্দেশ্যে…
” তোমাকে কি বলে ডাকবো আম্মা ? জমিদার গিন্নি , নাকি গিন্নিমা ?
লতিফ জোয়ার্দারের রসিক স্বরে লাজুক হাসে শ্যামা । সালেহা তেঁতে উঠলেন । ওনাদের পরিবারের মাঝে এই কুৎসিত মেয়েটা কে সহ্য হচ্ছে না একেবারেই । এ কিনা জমিদার গিন্নি হবে ? ছ্যাহ্.. মানবে কে একে ? সালেহা কটমটিয়ে বললেন দাঁত পিষে..
” আদিখ্যেতা ! জমিদার গিন্নি হবে ও ? ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকুক ।
” স্বপ্ন তো পূরণ হয়েই গেছে আম্মা । আর কোনো স্বপ্ন দেখতে হবে না ওকে । স্বপ্ন দেখার আগেই সবকিছু ওর হাতের নাগালে চলে আসবে ।
” মাথায় তোল আরো …
” মাথায় তো তুলেই রেখেছি !
” ওকে মাথায় তুলতে গিয়ে পায়ে ঠেলছিস আমায় ! আমার কথা ভাবিস তুই ? আমি যে তোর মা , এটা মনে আছে…?
সালেহার কন্ঠ স্বর কাঁপছে । ধিক্ ধিক্ করে চোখে অশ্রু জমছে । ভিজে আসছে অক্ষিপট । ছেলের প্রতি অভিমান টুকু নিংড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে কেঁদে কেঁটে । তার একমাত্র ছেলে সংগ্রাম । সে কিনা ঐ কালো বিদঘুটে মেয়েটার জন্য নিজের মাকে উপেক্ষা করে ? সংগ্রামের সঙ্কিত স্বর…
” আম্মা , পায়ে ঠেলছি না তোমায় ! তুমিই ভেবে নিচ্ছো ।
সালেহা কাঁপতে কাঁপতে বললেন আবার…
” আমি ভাবছি ? কি ভাবছি আমি ? আমার অবস্থান তোর জীবনে কোথায় ছিলো এতদিন ? আর এখন কোথায় ? ভেবে দেখেছিস ? মুখ ফুটে দুটো কথা বলিস আমার সাথে ? কি মন্ত্রনা দিয়েছে ঐ মেয়ে তোর কানে ? বউয়ের আঁচলের তলায় গুটিয়ে গেছিস একেবারে ?
” আম্মা !
” কি আম্মা ? বল ? আজকাল ডাকিস আমায় মা বলে ? তাকাস আমার দিকে ? বউ আসলো দুদিন ও হয় নি , এতেই এতো পরিবর্তন ? আর কদিন গেলে তো চোখ তুলেও তাকাবি না আমার দিকে !
” কি কও বউমা এইগুলা ? নিজের পোলারে দোষারোপ করতাছো …?
আতিয়া বেগমের কথায় আরো জ্বলে উঠলো সালেহা । দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি । চোখ থেকে গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে । কাঁপছে গলা…
” ঠিকি বলছি আম্মা ! দোষারোপ করছি না ? আমার আর কোনো মূল্য নেই আমার ছেলের কাছে ! সে দু’চোক্ষে সহ্য করতে পারে না আমাকে ? কেনো জানেন ? ঐ মেয়েটার জন্য ! ঐ তো কান ভাঙাচ্ছে সংগ্রামের । আমি তো মানি না ওকে , এর প্রতিশোধ নিচ্ছে । আমার ছেলে কেই দূরে সরাচ্ছে আমার থেকে ।
লতিফা সুযোগ পেলেন । আগুনে ঘি ঢালার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না । তিনি সালেহা কে উদ্বিগ্ন করলেন আরো..
” ঠিকি তো ! সংগ্রাম আগে এমন ছিলো নাকি ? ঐ মেয়েটা এ বাড়িতে আসার পর না এমন হলো । বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই এতো কিছু । দূরত্ব তৈরি করলো মা ছেলের মাঝে । দেখো , পুরো জমিদারি পেলে আরো কি হয় ! মাটিতেই পা পড়বে না তখন । সংগ্রামের কাঁধে ভর করে চলা অভ্যাস হয়ে গেছে তো…
” চুপপপপ ,, কথা বলতে বলেছি তোকে..
থামলো সংগ্রাম । গর্জে উঠেছিল মুহুর্তেই । তৎক্ষণাৎ সামলেও নিয়েছে নিজেকে । আচমকা সংগ্রামের ক্ষিপ্ত গর্জনে চমকালো সবাই । শ্যামা একটু বেশি । ও চকিতে ভড়কে চাইলো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম বোধহয় তাৎক্ষণিক দৃষ্টি সরালো । লতিফা চমকেছেন । ধক্ করে উঠেছিল বক্ষ স্থল । জিভে অধর ভিজিয়ে নিলেন তিনি । লতিফ জোয়ার্দার অবস্থা বুঝে নিরেট ডাকলেন সংগ্রাম কে…
” সংগ্রাম !!
সংগ্রাম নিজেকে সামলে নিলো । সৈকত কে কোল থেকে নামিয়ে পায়ে পা তুলে সটান বসলো , তবুও নরম হলো না । বললো ক্ষিপ্ত স্বরে…
” শ্যামা আমার বেগম , আমার বেগমের চলার হলে আমার কাঁধেই ভর করে চলবে ও ! কার কি এসে যায় এতে ? যদি এর মাঝে বাইরের কেউ মুখ খোলে , তাহলে ভালো হবে না । আমি এখন শুধু আমার মায়ের সাথে কথা বলবো । আর একটা বাহ্যিক অতিরিক্ত কথা শুনতে চাই না আমি । আর না এখানে অতিরিক্ত কারোর উপস্থিতি চাই । ভাবি, সৈকত কে নিয়ে ঘরে যান । নিজের স্বামী আর শাশুড়ি কেও বলুন এখান থেকে যেতে ।
শবনম তড়িঘড়ি করে সৈকত কে কোলে তুললো । সিঁড়ির দিকে এগোলো ঝটপট । শ্যামা হতবাক হয়ে চেয়ে । আকস্মিক সংগ্রামের ক্ষিপ্ততা বোধগম্য হলো না । জুনাইদ আর লতিফা ও সময় পার করলো না , এক প্রকার পালালো ওরা । জুনাইদ কয়েক ধাপ সিঁড়ি উঠে থামলো । ঘাড় ঘুরিয়ে পৈশাচিক বাঁকা দৃষ্টি আরোপ করলো সংগ্রামের দিকে । অতঃপর উঠে গেলো ।
ওরা দৃষ্টির আড়াল হতেই শক্ত মুখশ্রীতে বদল টানলো সংগ্রাম । নরম হয়ে আসলো সে । পা নামিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বসলো । ডাকলো , বললো একই সাথে…
” আম্মা !
শ্যামা কে তুমি মানো , না মানো , সেটা তোমার ব্যাপার । সে আমার স্ত্রী । এটা তোমার মানা, না মানাতে মিথ্যে হবে না । বরং মা হয়ে ছেলের সম্পর্ক কে ছোট করবে তুমি । এতে আমার চোখেও তোমার অবস্থান কোথায় হবে , সেটা তুমিই জানো ভালো করে ।
এই যে বললে , শ্যামা আমাকে তোমার থেকে দূরে সরাচ্ছে । এটা কিন্তু নয় । তুমি নিজেই নিজেকে আমার থেকে দূরে সরাচ্ছো । বিরোধ সৃষ্টি করছো । শ্যামা কে মানতে না পেরে আমাকেও তিরষ্কার করছো ।
আজ শ্যামা কি বলল জানো ? বললো , আমি যেন তোমার সাথে একটু সময় কাটাই । তোমার মনের ভুল ধারণা গুলো মিটিয়ে দেই । এটাই পরিকল্পনায় ছিলো বিশ্বাস করো । তুমি শ্যামা কে অগ্রাহ্য করো , অথচ শ্যামা আমাকে শেখায় তোমাকে গ্রাহ্য করতে !
একজন মা হিসেবে , আমার সুখ ব্যাতীত তোমার আর চাওয়ার কি আছে ? যদি আমার সুখ চেয়ে থাকো , তাহলে শুনে রাখো , আমি সুখি আমার বেগমের সাথে । ওকে নিয়ে সাজানো সংসারে আমি সুখি । আমরা সুখি একে অপরের সাথে । আমার সুখ যদি দেখতে চাও , তাহলে এই বিবাদ যেনো আর সৃষ্টি না হয় । শ্যামা আমার সুখ , আমি আমার সুখকে বেছে নিয়েছি । এখন তুমি তোমার ছেলের সুখকে সাচ্ছন্দে গ্রহণ করবে , এটাই আশা রাখি আমি ।
আমাদের একটা সুন্দর সংসার হোক, আম্মা । সব মিলিয়ে আমরা সুখি হই । তোমার একমাত্র ছেলে আমি , আমার বিয়ে নিয়ে যেহেতু স্বপ্ন ছিলো তোমার, যেটা পূরণ হয় নি – সেটা না হয় এবার পুরণ করে দেবো । আবার বিয়ে করবো আমি…
থামলো সংগ্রাম । শেষের কথাটার অর্থ না বুঝে আঁতকে চাইলো সবাই । ছ্যাত করে উঠলো শ্যামা । বড় সড় দৃষ্টিতে সংগ্রামের পানে তাকালো । সংগ্রাম ওর চোখে চেয়ে মুচকি হাসলো । বললো…
” আমি আবার বিয়ে করবো আমার বেগম কে । আমাদের বিয়ে টা যেভাবে হয়েছে , সেটা অন্য রকম সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে । আর এবারের টাও । শ্যামা কে আবার বিয়ে করবো আমি , এবার না হয় বড় সড় করে বিয়ে করবো ।
হা হয়ে গেল শ্যামা । খানিক ক্ষণেই বুক ধক্ করে উঠেছিল কি না কি ভেবে । পরমুহূর্তে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো শ্যামা । কাতর হয়ে আসলো অক্ষি যুগল । সংগ্রাম চোখ বুলিয়ে শান্তনা জাগালো শ্যামার মনে । হাসলো এক চিলতে ।
লতিফ জোয়ার্দার প্রথমে অবাক হলেও পরমুহুর্তে চিকচিক করে উঠলেন । আতিয়া বেগম খুশিতে ভরে উঠলেন ।
” কি কস দাদু ভাই , আবার বিয়া করবি তুই ?
” বিয়ে তো করেছি দাদি জান, অনুষ্ঠান করবো এবার । আবার না হয় কবুল পড়বো আমার বেগমের নামে ।
সালেহা একটুও খুশি হলেন না । বরং আরো বেশি রি রি করে জ্বলে উঠলেন তিনি । বিষাদের তপ্ত শ্বাস ফেললেন তিনি । ভেতর জ্বলছে । আক্রোশ বাড়ছে শ্যামার প্রতি ।
তিনি ঝাঁজিয়ে উঠলেন….
” আমার স্বপ্নের কথা তোকে আর ভাবতে হবে না । থাক তুই তোর বউকে নিয়ে । কর বিয়ে…
” করবো তো আম্মা .. এক জীবনে যদি হাজার বার বলো , তাহলে হাজার বারই আমার বেগম কেই বিয়ে করবো আমি । হাজার বার কবুল করবো আমার শ্যামাঙ্গিণী কে । বউ যদি হয় আমার শ্যামা সুন্দরী , তাহলে হাজার বার তাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক এই সংগ্রাম জোয়ার্দার ।
আব্বা , আপনার ছেলে নতুন করে বিয়ে করতে চায় আপনার বউ মাকে । আপনার কোনো আপত্তি নেই তো ?
হাসলেন লতিফ জোয়ার্দার । মাথা নত করেছে শ্যামা । চোখ সজল হয়ে আসছে । এটা হয়তো সুখের অশ্রু । লতিফ জোয়ার্দার বললেন…
” আপত্তি নেই । তবে ..
” তবে ?
উদ্বিগ্ন প্রশ্ন সংগ্রামের । লতিফ জোয়ার্দারের উত্তর শীতল কন্ঠে….
” আগামী শুক্রবার তবে বিয়ে হোক আমার ছেলে বউমার ! সাত গ্রামের সব মানুষ উপস্থিত থাকবে বিয়েতে । উৎসব হোক পুরো জমিদার রাজ্যে । জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দারের বিয়ের উৎসব ।
সালেহা এক মুহুর্ত দাঁড়ালেন না । ফোঁস করে উঠে গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করলেন । তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সংগ্রাম । মাথা নাড়ালো দুদিকে ।
ঘরে অংকুর নেই । রাতের খাবারের পর থেকে আর খোঁজ নেই তার । খাওয়ার পর পরই আজ ঘুমিয়েছেন শায়লা । ইদানিং ঘুমানোর সময় মেলাতে পারেন না তিনি । আগের তুলনায় দেরি হয় ঘুমাতে ঘুমাতে । আজ একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়েছেন । বালা ঘরে গিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছে তাকে । নিজের ঘরে এসে পায়চারি করেছে অনেক্ষণ । সময় কাটছে না আজ । একলা একলা সময় পেরোতে চাইছে না । এই অংকুর টা কোথায় কে জানে ? বাবড়ি ওয়ালা গেলো টা কোথায় ?
সুরবালা হাঁটাহাঁটি করে ঘর থেকে বেরোলো । অংকুর বাইরে বেরোয়নি বাড়ি থেকে । তাহলে ? ছাদে ? বালা আজ অবধি ঘর আর বসার ঘর ব্যতীত পুরো বাড়ি টাও ঘুরে দেখে নি । ছাদে তো যায়ই নি । এই রাতে ছাদে অংকুর ? তাছাড়া আর কোথায় যাবে ? হয়তো ছাদে ! বালা এক পা দু পা করে ছাদের দিকে পা বাড়ালো । সেদিকটায় অন্ধকার । আলোর বাতি আছে কি না জানা নেই । আবছা আলো পৌঁছেছে অন্ধকারে । বালা ধীর পায়ে এগোলো । যতো এগোচ্ছে অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে । প্রথমে ভয় না জাগলেও এখন ভয় জাগলো বালার মনে । ছমছম করে উঠলো গা । সামনে ছাদের দরজা । আঁধারে বোঝা যাচ্ছে না খোলা কি বন্ধ । ঢোক গিললো বালা । কম্পিত পায়ে এগোলো তবুও । এই লোকটা এভাবে অন্ধকারে ছাদে কি করছে ? বালা আর কয়েক পা এগোতেই অংকুরের কন্ঠ ভেসে আসলো পিছন থেকে….
” সুরবালা !!
ঝটকা মেরে উঠলো বালা । ধক্ করে পিছু ফিরলো । আঁধারে আবছা অবয়ব দেখতে পেলো অংকুরের । আঁতকে উঠলো অমনি । অংকুর পেছনে ? তার মানে ছাদে নেই !
বালা বুকে হাত রেখে হাঁফ ছাড়তেই ছাদের দিক থেকে ধাম করে বিকট একটা শব্দ ভেসে আসলো । অমনি চিৎকার মেরে ছুটে আসলো বালা । হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো অংকুর কে ।
এলোমেলো হয়ে সে শক্ত করে জড়িয়ে নিজেকে লুকাতে ব্যাস্ত অংকুরের সুঠাম বুকের মধ্যিখানে । চোখ মুখ খিচে চেঁচিয়ে উঠলো আবার….
” ভুউউউউততত….
বালার আকস্মিক স্পর্শ সামলে হাসলো অংকুর । প্রতিক্রিয়া হীন হয়েই বললো…
” কোথায় ?
” শব্দ হলো কিসের ওখানে ?
বুকের মাঝে সেপ্টে মুখ লুকিয়ে প্রশ্ন । উত্তর অংকুরের….
” প্রকৃতি আমার কাছে আসার সুযোগ করে দিলো তোমায় ! তুমি তো ভারি সুযোগ সন্ধানী , সু্যোগের সৎ ব্যাবহার করতে সময় নিলে না !
ঝট করে মাথা তুললো সুরবালা । আবছা আলো আঁধারির মাঝে অংকুরের ফিচেল হাসি সমেত মুখখানা দেখে এক ঝটকায় দূরে সরলো । নিজেকে সামলে কথা পাল্টালো ক্যাটক্যাটে স্বরে…
” বাবড়ি ওয়ালা গোমড়া মুখো , কোথায় ছিলেন এতক্ষণ ?
” কেনো , খুঁজছিলে আমায় ?
” ঘরে নেই , তাই খুঁজতে বেরিয়েছিলাম । ভেবেছিলাম ছাদে !
” কি প্রয়োজন আমার সাথে ?
বালা সরু দৃষ্টি পাত করলো । পাশেই সুইচ বোর্ড । অংকুর সুইচ বোর্ড হাতড়ে আলো জ্বালিয়ে দিলো । বুকে হাত গুটিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো দেয়ালে । বালা চোখের চাহনি আরো সরু করলো । পড়নের ঢিলে ঢালা বাদামি গেঞ্জি টাতে রং লেগে । কপালেও একটু । হাতেও আছে বোধহয় । অংকুর শুধালো ফের…
” কি হলো , কি প্রয়োজন আমার সাথে ! এই রাতে ?
খানিক চাপা স্বর । বালা কটমট করলো । বললো তড়িতে….
” কোথায় ছিলেন এতক্ষণ ?
” পাশের ঘরে ।
” কি করছিলেন ?
” সেখানে বউ আছে আরেকটা , তার সাথেই সময় কাটাচ্ছিলাম ।
বড় সড় টাস্কি খেলো সুরবালা । কপাল গুটিয়ে হা বনে তাকালো ।
ওর মুখো ভঙ্গিমা দেখে খানিক পর হেসে ফেললো অংকুর । আজ ওর মনটা ফুরফুরে একটু । ওকে এভাবে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসতে আজ প্রথম দেখলো সুরবালা । খানিক মূক বনে তাকিয়ে রইল সে । লোকটা হাসলে মন্দ লাগে না । ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম টোল পড়ে । সেটাও নজর এড়ালো না ।
পরমুহূর্তেই নিজের নজর সামলালো সুরবালা । থতমত দৃষ্টি সরিয়ে কড়া করলো চাহনি । শুধালো কঠিন স্বরে…
” মশকরা করেন ?
” পছন্দ না হলে আর করবো না । এমনিতেও এসব মশকরা করি না আমি ।
” কি করছিলেন পাশের ঘরে ?
” রং …
অর্ধেক কাজ ফেলে এসেছি , সেরে আসি গিয়ে । ঘরে যাও তুমি ।
বলতে বলতে পিছু ফিরে হাঁটা ধরলো । সুরবালা তড়িতে তাড়া করলো ওকে । অংকুর আর শায়লার ঘরের মাঝে একটা ঘর আছে , যেটা সবসময় তালা বদ্ধ থাকে । সেটার তালা আজ খোলা । সে ঘরেই ঢুকলো অংকুর । বালা পিছু ঢুকতে গেলে খানিক থেমে বললো কপালে ভাঁজ ফেলে…
” আমাকে ছাড়া আজ দেখছি ঘুম আসছে না তোমার । ব্যাপার কি বলতো ?
সুরবালা বিরক্তি নিয়ে অংকুর কে টপকে ঘরে ঢুকলো…
” সরুন ।
দু পা ঘরের ভেতর ঢুকতেই থমকে গেলো । এটা ঘর ? নাকি রঙের কারখানা ? মেঝেতে যেখানে সেখানে রঙের ডিব্বা পড়ে আছে । দেয়াল জুড়ে নানান আঁকি বুকি । অংকিত ছবি অগনিত । রংয়ের ছেটা এদিক ওদিক । সাদা মোটা কাগজ পড়ে আছে এখানে ওখানে । ইজেল অগনিত । বালার মুখ ফাঁক হয়ে আসলো আপনা আপনি । অক্ষি যুগল বৃহৎ হয়ে আসলো । অংকুর একটা ছবি অংকন করছিল , কারোর নুপুরের ঝিনঝিনে আওয়াজে বাইরে বেরিয়েছিল । এখন বাকি আর্ট টুকু সম্পন্ন করতে হবে । সে সুরবালা কে পাশ কাটিয়ে নিজের অর্ধ সমাপ্ত করে রাখা ছবিটার দিকে এগোলো । চেয়ারে বসে রংতুলি তুললো দুই আঙ্গুলে । সারফেসে রং করতে লাগলো নিজের মতো । সুরবালা খানিক থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে, সেভাবেই মূর্তির মতো এগোলো । বললো ছবিটার দিকে লক্ষ্য রেখে…
” কি আঁকছেন এসব ?
” দেখো !
” কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না ।
” এমনই !
” এঁকে কি হবে ?
” বিক্রি !
” দুই টাকায় ?
চলন্ত হাত থামলো অংকুরের । কপাল কুঁচকে সুরবালার দিকে তাকালো । সুরবালা ফ্যালফ্যালে হেসে বলল আবার…
” বেশি বলে ফেললাম ?
অংকুর শ্বাস ফেললো । ফের কাজে মনোযোগ দিয়ে বললো…
” কমপক্ষে দশ হাজার টাকায় !
আঁতকে উঠলো বালা । চাইলো বৃহৎ নয়নে । বিশ্বাস হলো না । মুখ ভেংচালো ও । পাশের লম্বা টেবিলের উপর কতগুলো ছবি , এগুলোর রং শুকিয়ে গেছে । সুরবালা সেখান থেকে একটা ছবি হাতে তুলে সেটাতে নজর বোলাতে বোলাতে বললো…
” এর থেকে তো সৈকত ভালো আঁকতে পারবে । আপনি রং মিস্ত্রী ভালো না । অঙ্কনের আগা গোড়া কিছুই বোঝা যায় না । মুখে চোপা মারেন ? কে কিনবে এসব ?
” হাতে যেটা ধরে আছো , সেটা ইতিমধ্যে সোল্ড হয়ে গেছে । বারো হাজার টাকায়…
ধক্ করে উঠলো সুরবালা । রং শুকানো ছবি খানা হাত থেকে ফসকে পড়লো আপনা আপনি । কি বলে এই লোক ? বুদ্ধ পেয়েছে ওকে ? নিচে নজর দিতেই আরো বেশি আঁতকে উঠলো । কাগজ টা গিয়ে পড়েছে ভেজা রংয়ের উপর । সুরবালা তড়িতে সেটা তুললো । বিকৃত হয়ে গেছে মুহুর্তেই । শুকনো রংয়ের উপর ভেজা রং । মুহুর্তেই ছড়িয়ে গেছে । জিভে কামড় বসালো সে । ধীরে চোখ তুলে চাইলো অংকুরের পানে । অংকুর আগে থেকেই তাকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে । সুরবালা তাকাতেই বললো শীতল কন্ঠে…
” বারো হাজার টাকা শেষ ….
বলেই দীর্ঘ শ্বাস । ফের মনযোগ দিলো কাজে । বালা শুধালো সন্দিহান …
” সত্যিই বারো হাজার ?
” হুঁ !
” এবার কি হবে ?
” কি আর হবে ?
” নষ্ট হয়ে গেলো তো !
” যাক !
” বকবেন না আমায় ?
” স্বামীর আদুরে বকা খেতে চাও ?
বালা স্বাভাবিক হলো । এই লোকটা অন্যরকম বলে ফেলছে । ভ্রু গুটিয়ে তীক্ষ্ণ করলো বালা ।
শ্যামা ঘরে একলা । সংগ্রাম বাইরে বেরিয়েছে বেরোবে না বলেও । সব আলো জ্বালিয়ে সংগ্রামের জন্য অপেক্ষা করছে সে । তার আসার কোনো নামই নেই । বারান্দায় দাঁড়ালো শ্যামা । ফটকের বাইরে সংগ্রামের টিকি টাও নজর পড়লো না । রাত পেরিয়েছে দশটা । এতো রাতে বাইরে কি করছেন এই লোকটা ?
বারান্দায় দাঁড়ানোটা সায় দিল না শ্যামার মনে । গায়ে আচানক কাটা দিতেই পিছু ফিরলো বারান্দা ছাড়তে । অমনি মুখোমুখি হলো সংগ্রাম । চমকে উঠলো শ্যামা । সংগ্রাম এখানে ? এসেছে? কখন ? শ্যামা কে চমকাতে দেখে ভ্রু নাচালো সংগ্রাম , এগিয়ে শুধালো…
” আজ শরীরের ঘ্রাণ টের পেলে না যে ?
” সুগন্ধি মাখেন নি আর !
কাপড় পাল্টে সুগন্ধি মাখা হয় নি । সংগ্রাম বললো…
” তারমানে সুগন্ধির ঘ্রাণ অনুভব করো ? আমাকে নয় ?
” দুটোই !
” আমাকে অনুভব করার ক্ষমতা বাড়াতে হবে, বেগম । এবার বিয়ের পর বাড়িয়ে নিও । কদিন পর কিন্তু বিয়ে আমাদের ।
শ্যামা চিবুক নামায় । বলে…
” বিয়ে তো হয়েছে আমাদের । এখন আবার এভাবে আবার বিয়ে করার কি প্রয়োজন ছিলো ?
” ছিলো ! আগের বিয়েটা উপভোগ করতে পারি নি । জ্ঞান শূন্য বউকে ওভাবে বিয়ে করে লাভ আছে বলো ? এমন ভাবে বিয়ে করেছি , বিয়ের পর দিন বউ চেনে না আমায় ! তাকে ছোঁয়ার অপরাধে হাত কেটে দিতে চায় আমার । বাহ্ , সাহসের তারিফ করতে হয় তার …
শ্যামা হাসলো । বললো…
” আমি কি তখন জানতাম নাকি ?
সংগ্রাম শ্যামা কে পিছু ফেরালো । বরাবরের ন্যায় আলতো করে জড়িয়ে ধরলো পিছন থেকে । থুতনি কাঁধে ঠেকাতেই কুঁকড়ে উঠলো শ্যামা । সংগ্রামের খোঁচা খোঁচা দাড়ি বিদ্ধ হলো উন্মুক্ত কাঁধে । শ্যামা কে কুঁকড়ে যেতে দেখে সংগ্রাম বললো….
” বিয়ের জন্য প্রস্তুত হন বেগম ! আমাকে আরো একবার স্বামী হিসেবে গ্রহনের জন্য প্রস্তুত হন । আপনাকে আপন বউ হিসেবে দেখবো আমি…
” এখন কি আমি আপনার পর বউ ?
হাসলো সংগ্রাম ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪০
” আমার জন্য তো বউ সাজেন নি সেবার । এবার সাজবেন । একান্ত আমার জন্য…
” সেদিন তো সাজালেন ! দেখলেন ও !
” সেদিন কি বিয়ে করেছি নাকি ? বিয়ের বউ আলাদা । আলাদা একটা অনুভুতি আছে বিয়েতে । বউকে বউ সাজে দেখতে ।
” আচ্ছা ?
” হুম ! বিয়ের রাতে বউয়ের সাজগোজ নষ্ট করতেও কিন্তু আলাদা একটা অনুভুতি আছে , জানেন ?
শ্যামা ঝট করে ঘাড় ঘোরায় । তাকায় বৃহৎ নয়নে । তা হেসে শব্দ করে হেসে ওঠে সংগ্রাম ।
