শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৯
অনামিকা তাহসিন রোজা
রাগ হচ্ছে শ্রাবণের। ভীষণ রকম রাগ হচ্ছে। সেটা নিজের উপর নাকি অন্য কারোর উপর তাও ঠিকঠাক টের পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে শ্রাবণ এটা জানে এসব আর সহ্য হচ্ছে না তার। বাবা-মা পেয়েছে টা কি? এসব কি নাটক? ছেলেখেলা নাকি? প্রথমে এক মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে, তারপর আবার আরেক মেয়েকে বিয়ে করতে বলবে? এসব কী? কেনো হবে এসব? আরে বাবা, তাকে তো একটু সময় দিতে পারত! বিয়ের সাত দিনের মাথায় ডিভোর্স দিয়ে আবারো বিয়ের কথা বলছে!
পায়চারি করতে থাকলো শ্রাবণ। পরনের শার্টটা মুহুর্তেই খুলে ছুঁড়ে ফেলল বিছানায়। দুহাত দিয়ে নিজের চুল আঁকড়ে ধরে ডিভানে ধপ করে বসে পড়ল। মাথা নিচু করে ভাবতে থাকলো। কেনো সে আত্মসম্মানের কাছে এভাবে হার মানছে? কারন, এটাই শ্রাবণ শেখের স্বভাব! কিন্তু তাই বলে এভাবে সবকিছু মেনে নেবে নাকি! পা ঝাঁকিয়ে থুতনিতে আঙুল বুলিয়ে চোখ বন্ধ করল শ্রাবণ, চিন্তা করতে করতেই টের পেলো গুনগুন করে আসা কান্নার আওয়াজ। তার পাশের ঘর থেকে রিনরিনিয়ে কান্নার শব্দটা তার কানে এসে তীক্ষ্ণ স্বরে বাড়ি খেলো। মুহুর্তেই ফট করে চোখজোড়া খুলল সে! ধারা কাঁদছে? কেনো? ও কেনো কাঁদছে? এসব ভাবনা শুরু করার আগেই দরজা ঠেলে ঢুকলেন সালমা বেগম।
খট করে দরজা খোলার আওয়াজে শ্রাবণ তাকালো। সালমা বেগম কে দেখেই অভিমান মাথা চাড়া দিল। তার মা সবকিছু বুঝেও না বোঝার ভান করছে। তাই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” এসব নাটক ছাড়া তোমরা কি আর কিছু করতে পারো না? যখন ডিভোর্সই করিয়ে দেবে, তাহলে বিয়ে দিয়েছিলে কেনো? তামাশা পেয়েছো?”
সালমা বেগম ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। দরজা ঠেসে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। শ্রাবণ তখনো মুখ ফিরিয়ে বসে আছে, রাগে বুক ওঠানামা করছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর সালমা বেগম নরম গলায় বললেন,
—”রাগ করিস না বাবা। তোর রাগের কারণ আমি বুঝি।”
শ্রাবণ মুখ ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল না, বরং গলার স্বর উঁচু করল,
—”বুঝো? তাই নাকি? যদি এতই বুঝতে, তাহলে আজ এমনটা হতো না মা! একটা বিয়ের সাত দিনও কাটেনি, এরমধ্যে আবার ডিভোর্সের কথা তুললে কেনো? আমার জীবনটা কী খেলার পুতুল নাকি? আমার কথা বাদই দিলাম। ধারাকে বাবা আবার বিয়ে দেবে মানে? ওই মেয়ে এটুকু বয়সে আর কতবার বিয়ে করবে?”
সালমা বেগম ঠোঁটে হাত রেখে লুকিয়ে চাপা হাসি আটকে বললেন,
—” হুট করে মনে হয় তুই চাইছিস ধারাকে নিজের কাছে রাখতে?”
ঠিক এখানেই থেমে যাচ্ছে শ্রাবণ। শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
—” সেরকম কিছু না। আমি শুধু বলছি যে, ওটুকু বাচ্চা মেয়ে কতবার বিয়ে করবে? বাবা কি ওকে পুতুল পেয়েছে?”
সালমা বেগম ঠোঁট কাঁমড়ে হাসি আটকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে থাকলেন। দেখলেন আর কত অযুহাত তার ছেলে তৈরী করতে পারে। তাঁর এমন দৃষ্টি তে অপ্রস্তুত হয়ে শ্রাবণ নিজের কথা ফিরিয়ে নিল,
—” আচ্ছা ওর কথা বাদ দাও। আমাকে কী পেয়েছো তোমরা? দুবার বিয়ে করব আমি? পাগল নাকি?”
সালমা বেগম ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে ডিভানে বসলেন। মৃদু হেসে ছেলের দিকে তাকালেন,
—” না, তেমনটা না। তবে, তুই তো ছোট থেকে এমনই। যা ঠিক মনে করিস, তাই আঁকড়ে ধরিস। কিন্তু সবসময় কি নিজের জেদেই ঠিক হয়? কখনো ভেবে দেখেছিস, আসলে তুই কী চাস?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
—”মানে?”
—”মানে এই যে…ডিভোর্সের কথা উঠতেই তোকে এতটা রেগে যেতে হলো কেনো? যদি ধারা তোর কাছে একেবারেই গুরুত্বহীন হতো, তাহলে তুই কি এতটা উত্তেজিত হতিস? শুধু বাবা-মার নাটক নিয়ে রাগ করলে তোর রাগের মধ্যে এত কষ্ট আসতো না বাবা। কষ্টটা আসছে অন্য জায়গা থেকে।”
শ্রাবণ চুপ করে গেল। মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল, ঠোঁট কামড়ালো। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে লুকোতে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। সে নিজেও একটু একটু বুঝতে পেরেছে, কিন্তু স্বীকারোক্তি টা মন থেকেই এখনো আনেনি সে। সেও খুব ভালো করে জানে যে কষ্টটা অন্য জায়গা থেকেই আসছে। সালমা বেগম এবার আরো নরম গলায় বললেন,
—”তুই সবসময় বলিস আত্মসম্মান, আত্মসম্মান। কিন্তু বল তো, আত্মসম্মান বাঁচাতে গিয়ে তুই যদি নিজের সত্যিকার অনুভূতি থেকেই পালিয়ে যাস, তাহলে লাভটা কী হবে? তুই কি নিশ্চিত তোর মনে ধারার জন্য কোনো জায়গা নেই? আমায় যে বলেছিলি, কোনোদিনও মানবিনা! আসলেই কি তাই?”
শ্রাবণ এবার ভেতরে ভেতরে ধাক্কা খেলো। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। মনে হলো গলার ভেতর যেন কেউ শব্দ আটকে রেখেছে। নাহ! শ্রাবণ মনে মনেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আর যাই হোক, মায়ের সামনে সে নিজে স্বীকার করবেই না। সালমা বেগম গভীর শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন,
—”বাবা, আমি তোকে কিছু করতে বলছি না। শুধু নিজের ভেতরটা একটু খুঁজে দেখ। তুই কি সত্যিই ডিভোর্স চাস? মানে তুই ধারাকে মেনে না নিলে তো ডিভোর্স একটা স্বাভাবিক বিষয়। নাকি… ভয় পাচ্ছিস, স্বীকার করলে তোকে বদলে যেতে হবে?”
এটুকু বলে তিনি দরজার দিকে এগোলেন। যাবার আগে থেমে আবারো বললেন,
—”নিজেকে সময় দে বাবা। নিজের অনুভূতিটা চিনতে শিখ। সব প্রশ্নের উত্তর তুই-ই পেয়ে যাবি।”
দরজা টেনে দিয়ে সালমা বেগম চলে গেলেন। শ্রাবণ তখনো ডিভানে বসা, বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ধাক্কা অনুভব করছে। নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করল সে। তাহলে কি… আসলেই সে ধারাকে হারাতে চায় না? নাহ! সালমা বেগমের কথামত শ্রাবণের সময় নেয়ার কোনো দরকার নেই। সে তো একটু আগেই বুঝতে পেরেছে। বেশ বুঝেছে নিজেকে।
যখন ড্রয়িং রুমে ডিভোর্স এর কথাটা উঠলো। তখনি শ্রাবণ উপলব্ধি করেছে। তাই এই মুহুর্তে সে ভয়ানক কথাটা নিজের মনেই স্বীকার করল। হ্যাঁ, সে আসলেই ধারা কে ভালোবেসে ফেলেছে। আসলেই ভালোবেসে ফেলেছে। মন থেকে বউ বলে সম্বোধন করেছে মেয়েটাকে। পিচ্চিটা মারাত্মক জাদু করল! একদম এলোমেলো করে দিল শ্রাবণের হৃদয় টাকে। গোছানো অনুভূতি গুলো কেমন যেন জট পাকিয়ে হারিয়ে গেলো অন্তরালে!
চোখ বুঁজে শ্রাবণ ভাবতে চাইলো ভিন্ন কিছু, বুঝতে চাইলো নিজের চিন্তাধারা, কিন্তু অন্তঃপটে ধারার মুখটা ভেসে উঠলো তৎক্ষনাৎ! ভেসে উঠলো একজোড়া টলমল করা হরিণী চোখ! স্নিগ্ধ বাতাসে উড়ে ভাসতে থাকা লম্বা চুল! ছোট্ট ছোট্ট দুখানা হাত! ফর্সা গলায় চিকচিক করা একটা লাল তিল! সরু নাকের পাশে গালে খুব ছোট্ট আরো একটা তিল! আর…তিড়তিড় করে কেঁপে ওঠা ওই কোমল রক্তলাল ওষ্ঠজোড়া! ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ খুলল শ্রাবণ। সর্বনাশ! এ কি অবস্থা! এ তো সাংঘাতিক জাদু! এতকিছু কেনো দেখলে ও? নাহ! আর নেয়া যাচ্ছে না! কিছু একটা করতে হবে। ধারা তাকে মারাত্মক ফ্যাাসাদে ফেলেছে। এখন অদ্ভুত অনুভূতির এই অতল গহ্বর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় ওই মেয়েটাই বলতে পারবে।
বিকাল নেমে এসেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে কমলা রঙের সূর্যের আলো ঢুকে পড়েছে শ্রাবণের ঘরে। আলোটা সরাসরি এসে পড়ছে ডিভানের গায়ে, গাঢ় কমলা আভায় যেন ঘরটা ভরে উঠেছে। বাইরে পাখিরা কিচিরমিচির করতে করতে নীড়ের দিকে ফিরছে। বাতাসে একধরনের ক্লান্ত অথচ শান্ত সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। শ্রাবণ এখনো ডিভানে বসেই আছে। সামনের টেবিলে অযত্নে ছুঁড়ে ফেলা শার্টটা পড়েই আছে। হাতদুটো এখনো মুঠো করা, কিন্তু আগের মতো শক্ত করে নয়, হালকা ঢিলে। চোখদুটো স্থির, যেন দূরে তাকিয়ে আছে, অথচ কোথাও মন নেই।
একটু অদ্ভুত হলেও সত্য আজ দুপুরে শ্রাবণ বা ধারা কেওই খেতে নামেনি। দুজনেই ঘরের দরজায় খিল দিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ধারা কান্না করতে করতেই ঘুমিয়ে গেছে বলে সালমা বেগম আর খেতে ডাকেননি। শ্রাবণের ঘরে অনেকবার নক করলে সেও খোলেনি। তাই দুজনের এমন মরমরে অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু করতে পারলেন না সালমা বেগম আর সামিউল শেখ।
মাগরিবের আযান কানে আসতেই শ্রাবণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে গোসল করে নামায পড়ে নিল। এদিকে সামিউল শেখ মসজিদ থেকেই তন্নিদের বাড়িতে গিয়েছেন। ভবিষ্যত সম্পর্কে তিনি এবার নিশ্চিত। তার ছেলে মোটেই অকাজ করতে রাজি নয়। তাই তিনিও যাচ্ছেন তন্নির বাবা কে গর্ব করে কথাটা বলে ঝুটঝামেলা এখানেই শেষ করতে। এদিকে সালমা বেগম ধারার ঘরে গিয়ে দেখলেন, ধারা শাড়ি পড়ছে। অবাক হলেন সালমা বেগম।
—” ধারা? কিরে তুই শাড়ি পড়ছিস কেনো?”
সালমা বেগমের উপস্থিতি টের পেয়ে আয়না থেকে তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিজেকে ঠিকঠাক করল ধারা। লজ্জা পেলো খানিকটা। কারন কোনোমতে পেচিয়ে শাড়ি পড়েছে সে। কুচি, আঁচল কোনোটাই ঠিক করতে পারছে না।
সালমা বেগম ধীরপায়ে এসে বিছানার কোণায় বসলেন। মৃদু হেসে নরম গলায় বললেন,
—” আরে, এমন কাঁচা হাতেই যে এত সুন্দর করে শাড়ি পড়েছিস এটাই অনেক! সুন্দর লাগছে৷ তোর বয়সে আমি চোখ বুঁজে আঁচল ঠিক করে নিতাম।”
বলেই মুখভরে হাসলেন তিনি।
ধারাও মিষ্টি হেসে মাথা নিচু করেই রাখলো। এক হাতে আঁচল ঠিক করল। সালমা বেগম এবার জিজ্ঞেস করলেন,
—” কিরে, সত্যি সত্যিই বল তো, শাড়ি পরছিস কেনো?”
ধারা হাতের কাঁপুনি লুকাতে আঁচলটা বুকের ওপর টেনে ধরল। চোখ আয়নায় আটকে আছে, কিন্তু দৃষ্টি যেন দূরে কোথাও। ঠোঁট কাঁপছে, কণ্ঠ ভিজে গেছে অশ্রুতে,
—” এমনিতেই পড়লাম মা!”
ধারা সত্যিই নিজেও জানে না সে কেনো শাড়ি পড়ল। শুধু জানে যে পড়তে খুব মন চাইলো। এই শাড়িটা লাল রঙের। সুতির, কিন্তু উন্নত মানের কাপড় হওয়ায় আরো বেশি সুন্দর। সালমা বেগম কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে চোখ সরু করে বলে উঠলেন,
—” তুই তবে সত্যি সত্যিই আমার ছেলেকে জাদুটোনা করে আনলি?”
কথাটা বোঝেনি ধারা। শুনতে পায়নি ঠিকঠাক। তাই প্রতিবারের মত মিষ্টি স্বরে বলল,
—” হু? ”
সালমা বেগম দুদিকে মাথা নাড়ালেন, বললেন,
—” কিছু না!”
ধারা এবার কিছু একটা মনে করে বলে উঠলো,
—” মা, জানেন, উনি আমায় জুতো কিনে দিয়েছে!”
সালমা বেগম একটু অবাক হলেন। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলেন,
—” জুতো? কোন জুতো?”
—” কালো রঙের জুতোটা। আজই কিনে দিয়েছেন। আমার জুতো পুরোনো হয়ে ছিঁড়ে গিয়েছিল তো। তাই আর কি। অনেক দামি হয়ে গেছে বোধহয়। বিশ্বাস করুন, আমি অত দামি চাইনি!”
বলতে বলতে ধারা নিজের মনে ডুবে গেল। চোখের কোণে ভেসে উঠল সেই ছোট্ট মুহূর্তটা, শ্রাবণের অজান্তেই কী এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পড়া।
সালমা বেগম চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলেন ধারার মুখে। তার মুখে যে নিষ্পাপ আলোর ঝলকানি৷ তা তিনি অস্বীকার করতে পারলেন না। অল্প সময়ের সম্পর্কেও ধারা যে নিজের সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে এই সংসারটাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে, সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। মৃদু হেসে সালমা বেগম ঠাট্টার সুরে বললেন,
—” আমার ছেলে ভেবেছে জুতো কিনে দিয়ে তোর মনটাও কিনে নেবে! কি বোকা দেখেছিস! ”
ফট করে মুখের হাসি নিভে গেলো ধারার। মন? মন কি আদৌও কিনে নেয়া যায়? উনাকে তো এই মন অনেক আগেই বিনামূল্যে দেয়া হয়ে গিয়েছে। শুধু উনি গ্রহণ করেনি! নিজের ভাবনাতে নিজেই চমকে গেলো ধারা। আশ্চর্য! ও এমন চিন্তা করল কেনো? সে তো মোটেই কাওকে মন দেয়নি। উহু না! এই চিন্তা করেনি সে। কিন্তু এই মুহুর্তে এমন ভাবনা আসলো কেনো। কোনো কারন ছাড়াই আবারো চোখ ভিজে উঠলো ধারার। ভাবনা শেষ হতেই বুকটা ভেঙে। গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে এলো। একটু থেমে আঁচল দিয়ে আড়ালে চোখ মুছল সে।
সালমা বেগম খেয়াল করলেন। কিছু বললেন না। হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললেন,
—” আয়হায়, তোর শ্বশুর কে সস আনতে বলার কথা ভুলে গেছি। রাতে যে পাকোড়া বানাবো। সস ছাড়া তো মজাই নেই। তুই থাক, আমি একটু কল করে আসি! শাড়ি আবার খুলে ফেলিস না যেন। আমি ফিরে এসে ঠিক করে দিচ্ছি!”
ধারা মিষ্টি হেসে মাথা নাড়ালো।
সালমা বেগমের প্রস্থানের পর অনেক সময় পেরিয়ে গেলো। ধারা কোনোমতে এলোমেলো শাড়ি নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। আলতো করে ছুঁয়ে দিল বাগানে থাকা সমস্ত ফুল গুলো। এরপরে না চাইতেও পাশের বেলকনিতে তাকালো। দেখলো সেই জায়গায় কোনো অস্তিত্বই নেই কারো, একদম অন্ধকার! সালমা বেগম ঠিকই বলেছিলেন, শ্রাবণের ঘরের বেলকনি একটুও ব্যবহার করা হয়না। শ্রাবণ কখনো বেলকনিতে আসে না। কিন্তু ধারার মন বলল, যদি শ্রাবণ বেলকনিতে আসতো, তাহলে ভালো হতো!
একটু পরেই অধৈর্য্য হয়ে গেল মেয়েটা। সালমা বেগমের অপেক্ষা করার আর তর সইলো না। সিদ্ধান্ত নিল সালমা বেগমের ঘরেই যাবে। তাই কোনোমতে আঁচল হাতে জড়িয়ে পটলা পাকিয়ে হাঁটা শুরু করল সে। শাড়িটা এবার আরো এলোমেলো লাগছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গুছিয়ে পড়তে হবে।
কিন্তু নিজের ঘর পেরিয়ে শ্রাবণের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে গেলেই বাঁধে ঘোর বিপত্তি। যা কখনো কেও ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করেনি, তাই ঘটলো। এক অদৃশ্য ঝড়ের মত শক্ত হাত ধারার কব্জি ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে নিল। আর দরজাও ঠাস করে বন্ধ হলো। আপনাআপনি ছিটকিনিও বন্ধ হলো। ঘটনাটা এত হঠাৎ ঘটল যে ধারা প্রথমে বুঝতেই পারল না। এক টানে ঘরভর্তি অন্ধকারে টেনে নিয়ে গিয়ে সজোরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল সেই ঘরের মালিক।
ধারা হাপিয়ে উঠল, ভয়ে বুক ওঠানামা করছে তার। চরম চমকে গেছে সে। চিৎকার দিতে গিয়েও ভয়ে দেয় নি। এলোমেলো শাড়ি আরও এলোমেলো হয়ে বেঁধে গেল শরীরের সাথে। পটলা পাকান, আঁচল গড়িয়ে পড়ল হাতের মুঠো থেকে, চুলের খোঁপা ভেঙে কপালের ওপর ঝুলে পড়ল এক গোছা চুল।
কিন্তু কে টেনে আনলো ধারাকে এভাবে? কে তাকে এভাবে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল? ভয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করেছিল ধারা। কিন্তু আলো জ্বালাতেই সেই শক্ত হাতের মালিককে দেখে আত্মা উড়ে গেলো তার। মার্বেলের মত চোখ গোল করে তাকিয়ে দুবার পলক ফেলল ধারা। সামনেই সে দেখতে পাচ্ছে সদ্য গোসল করে আসা শ্রাবণ শেখ কে, যার কপালে এখনো টপটপ করে চুলের পানি পড়ছে। মানে এইমাত্রই গোসল করেছে। গায়ে আপাতত কিছুই নেই। শুধু ট্রাউজার পড়েছে।
এমন একটা উদ্ভট পরিস্থিতিতে শ্রাবণকে এভাবে উদাম গায়ে দেখে আরো চমক খেলো বেচারি ধারা। তার হাত দুটোই শ্রাবণের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সে,
—” আ…আপনি! ”
শ্রাবণের বুক ধুকপুক করছে প্রচণ্ডভাবে। চোখ নেশালোভাবে লাল, নিঃশ্বাস গরম আর ভারী। কণ্ঠে অদ্ভুত ঝাঁঝ মিশে গেল,
—” পালাচ্ছো কেনো? কোথায় যাচ্ছ? একবারও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যি বলবে না? তুমিও বসে বসে তামাশা দেখছো?”
ধারার চোখে এখনো বিস্ময়। সে বোঝেই উঠতে পারছে না, এই হঠাৎ টান, এই হঠাৎ রাগ, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অদ্ভুত টান, সবকিছুর মানে আসলে কী! চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল সে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এত জোরে বাজছে যে মনে হচ্ছে শ্রাবণও শুনতে পাচ্ছে।
ধারার ভীষণ অসস্তি হচ্ছে। শ্রাবণ দুই হাত দিয়ে দেয়ালে বন্দী করে রেখেছে তাকে। এতটাই কাছে এসে ঝুঁকেছে যে সদ্য গোসল করে আসা শুভ্র পুরুষটার গায়ের স্নিগ্ধ গন্ধটুকু পর্যন্ত অনুভব করতে পারছে সে। তার উপর উদাম গায়ে। কিন্তু এসব মেনে নেয়া গেলেও ধারার মনে পড়ল নিজের শাড়ির কথা। তাই কিছু বলতে যাওয়ার আগেই শ্রাবণ এবার দাঁত কিড়মিড় করে বিনা আগাম বানীতেই বলতে শুরু করল,
—” সবকিছু তামাশা পেয়েছে ওরা। নাটক করছে সবাই? একটা ছেলে একবার বিয়ে করবে, একটা মেয়ে একবার বিয়ে করবে। এটাই নিয়ম। এটা কি তোমার শ্বশুর শ্বাশুড়ি জানেনা হ্যাঁ? এটা কিছু হলো? খুব তো পাগলের মত সমাজ সমাজ করে, তো এখন কি সমাজ নদীর তলে দাওয়াত খেতে গেছে? দ্বিতীয় বিয়ে করলে সমাজ কি ধিমতানা করে নাচবে? এটা কি খুব ভালো কাজ? এটা বোঝেনা তারা? আর আমায় কি কলুর বলদ মনে হয়? তন্নির মত আখাম্বা কে বিয়ে করার মত খারাপ দিন এখনো আসে নি আমার! আমার কথা কান খুলে শোনো, আমি বিয়ে করব না, কোনোভাবেই বিয়ে করবনা আমি। ওই মেয়ে কে তো করবই না। এটাই ফাইনাল ডিসিশন। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
চোখ পিটপিট করে তাকালো ধারা। শ্রাবণের সব কথা তার মাথার উপর দিয়ে গেছে। তবে বুঝেছে মানুষটা রেগে আছে। তবুও আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করল,
—” এ..এসব আমাকে ব..বলছেন কেনো?”
ফুটন্ত আগুনে কেরোসিন ঢালার মত অবস্থা হলো। শ্রাবণ দেয়াল ধাবা মেরে ধারার মুখের আরো কাছে এসে চেঁচিয়ে উঠলো,
—” তোমাকে বলব না তো কি পাশের বাসার আন্টিকে বলব? তুমিই তো আসল নাটের গুরু! তোমারও তো ইচ্ছে আছে। এটুকু একটা মেয়ে! সে নাকি দু বার বিয়ে করবে! ইশ! শখ কত! লজ্জা করে না তোমার? এই বয়সে দুবার বিয়ে করবে? খুব শখ হয়েছে? কত সুন্দর করে বলছে ,আপনারা যা ভালো মনে করেন! কেন রে কেন? নিজের কোনো মতামত নেই? মানুষ যা করতে বলবে তাই করবে? মগের মুল্লুক নাকি? ”
ঘর ভর্তি নীরবতা, শুধু শ্রাবণের গর্জনমাখা কণ্ঠ আর দুজনের ধুকপুকানি। ধারা দেয়ালের সাথে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতদুটো এখনো শ্রাবণের শক্ত মুঠোয় বন্দী। তার চোখ বড় বড়, মুখ ফ্যাকাশে। এতটা তীব্র রাগ, এতটা অবদমিত ক্ষোভের প্রকাশ সে কখনো দেখেনি।
শ্রাবণ নিঃশ্বাস নিতে নিতে হঠাৎ থেমে গেল। দুজনের মাঝে কয়েক ইঞ্চি ফাঁক, অথচ সেই ফাঁকও এখন ভারী হয়ে উঠেছে। ধারা ভয়ে চোখ নামিয়ে নিলো, কণ্ঠ কাঁপছে,
—” আমি কিছু চাইনি… আমি তো কিছু বলিনি..!”
শ্রাবণের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। গরম নিঃশ্বাস ধারা অনুভব করছে গালে। অল্পক্ষণ স্তব্ধ থেকে সে দাঁত চেপে বলল,
—” এটাই তো সমস্যা। কিছু বলবে না কেনো তুমি? কিছু না করেও দোষ তোমার ঘাড়েই এসে পড়ছে। তুমি কি ভাবছো, আমি বুঝি না? সবাই চাইছে তোমাকে ঠেলে আমার থেকে দূরে দিতে। যেন তুমি কোনো খেলনা। কিন্তু শোনো ধারা, আমি খেলনা নই, তুমিও নও!”
ধারা বিস্মিত হয়ে তাকালো শ্রাবণের চোখে। সেখানে শুধু রাগ নেই, একটা তীব্র অধিকারবোধও আছে। শ্রাবণ হাত ছেড়ে দিয়ে এক ঝটকায় পেছনে সরে গেল। দু’হাত মাথায় চালান করে ডিভানের পাশে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছে সে। কণ্ঠ গাঢ় হয়ে এলো,
—” আমি আর পারছি না। সবার কথা শুনে শুনে, সবার নাটক মেনে নিতে নিতে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি! আমার নিজের বউকে অন্য কারোর জন্য সাজিয়ে দিতে হবে? আবার আমাকেও অন্য কারো জন্য বর সাজতে হবে? মেনে নেব নাকি এসব?”
চোখ নামিয়ে আঁচল বুকে জড়িয়ে ধরল ধারা। তার মনে হলো এখনই হয়তো মাটির নিচে গর্ত করে ঢুকে পড়ুক। কিন্তু সেই সাথে বুকের ভেতর কোথাও যেন অদ্ভুত আলোড়ন খেলে গেল। নিজের বউ কথাটা বুকে গিয়ে কাঁপিয়ে তুলেছে।
হুট করেই শ্রাবণের কিছু একটা মনে পড়ল। সে আবারো তেড়ে এসে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল ধারাকে। রাগে দপদপ করছে সে, কপালের শিরা টানটান হয়েছে।
—” এই মেয়ে, তুমি চুপ ছিলে কেনো?”
—” ক..কখন?”
শ্রাবণ চোখ সরু করে দাঁত চিবিয়ে বলল,
—” যখন ডিভোর্সের কথা বলা হলো, ওই মেয়েটা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরল, তোমায় অপমান করল! ওই সময়গুলোতে চুপ ছিলে কেনো?”
ধারার ভয় লাগছে। সে আগে জানতে চায় লোকটা মিনিটে মিনিটে রূপ পাল্টাচ্ছে কেনো। এই না ছেড়ে দিল, এই আবার তেড়ে এসে আগের থেকেও জোরে চেপে ধরল। এমন তো ছিল না শ্রাবণ শেখ! মেয়েটা ঢোক গিলে মিনমিন করে বলল,
—” না মানে…আমি কী বলতাম?”
রেগে গেলো শ্রাবণ। মেজাজ চরম বিগড়ানো তার। তাই ঠোঁট চেপে বলল,
—” একটা বাইরের মেয়ে এসে তোমার স্বামীকে বিয়ে করতে চাইবে, তোমার স্বামীকে নিয়ে টানাটানি করবে, আর তোমার কিছু বলার নেই? ইডিয়ট! লাইক সিরিয়াসলি, তুমি কি বলদ?”
চোখ পিটপিট করল ধারা,
—” আপনিই তো…!”
—” শাট আপ! আমি কী করব সেটা পরের কথা। তুমি কেনো কিছু বলবে না! তোমার তো উচিত ছিল ওই মেয়ের সাথে চুলোচুলি করা, চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলা উচিত ছিল। সেখানে তুমি কেনো ল্যাম্পপোস্টের মত দাঁড়িয়ে থাকবে? তামাশা পেয়েছো? স্বামীকে নিজের কাছে আটকে রাখতে পারো না বলদ!”
আবারো চোখ পিটপিট করল ধারা। লোকটা নেশা করে এসেছে, নাকি পাগল হয়ে গেছে। কিসব উল্টোপাল্টা কথা বলছে! বারবার স্বামী স্বামী যে করছে, অথচ তাকেই তো বউ মানেনা! আবার বলছে মেয়েটার সাথে চুলোচুলি করা উচিত ছিল!
শ্রাবণ তর্জনী তুলে আবারো বলল,
—’ তুমি একটা গাধা! কথাটা বোঝো, তুমি আসলেই গাধা! নিজের জিনিস কেড়ে নিতে পারোনা?”
একটু থেমে শ্রাবণ আরেকটু জোরে আদেশ ছুঁড়লো,
—” অধিকার ছিনিয়ে নাও, বেয়াদব! এখনি বলো তুমি আমার সাথে থাকবে, এখনি বলো তুমি ডিভোর্স দিতে ইচ্ছুক নও, নাহলে তুলে আঁছাড় মারব অভদ্র মেয়ে!”
মায়াভরা চোখে তাকালো ধারা। এবার পূর্ণ দৃষ্টি তে তাকালো। কারন সে মনোযোগ দিয়ে শ্রাবণের সব কথা শুনেছে। শ্রাবণের ভাষ্যমতে সে গাধা হলেও উপরন্তু সে মোটেই এত গাধা নয় যে একটা মানুষের এসব কথার মানে বুঝবোনা। ধারা বুঝেছে। তাই অভিমানে চোখ টলমল করা শুরু করল তার। সেই সময়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেও এবার চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইলো। ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না আটকে সে মিনমিন করে বলল,
—” কিন্তু আপনি তো আমায় স্ত্রীর অধিকার দেন নি!”
তৎক্ষনাৎ শক্ত জবাব এলো,
—” তুমি অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারছো না?”
এবার আরো বেশি অস্থির হয়ে প্রায় ফুঁপিয়ে ধারা বলে উঠলো,
—” কিন্তু আপনি তো আমায় বউ বলে মানেন নি!”
এ পর্যায়ে শ্রাবণ নিজেও শুকনো ঢোক গিলল। দেরি না করে দুহাতের মুঠোয় নিয়ে নিল ধারার আদুরে মুখটা। মেয়েটার দু গালে হাত রেখে একটু এগিয়ে এনে জোর দিয়ে বলতে থাকলো,
—” এখন মানছি, এই মুহুর্তে মানছি। তুমি আমার বউ! কথাটা কান খুলে শোনো মেয়ে, পুরো পৃথিবীকে বলব আমি, আমার বউ তুমি। তুমি শুধু আমারই বউ! শুধু আমার!”
শেষ কথাটা ভাঙা স্বরে বলল শ্রাবণ। নিজেকে দুর্বল করতে ইচ্ছে করছে। আত্মসম্মান চুলোয় যাক! বউয়ের সামনে আবার কিসের সেল্ফ রেস্পেক্ট! তার এখন পুরুষ হয়ে কাঁদতে মন চাইছে। কিন্তু ধারা আর পারল না। শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিলো, টলমল করা চোখ দিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকলো। তব্দা খেয়ে গেলো শ্রাবণ। কিছু বুঝতে না পেরে অসহায় মুখে জিজ্ঞেস করল,
—” কাঁদছো কেনো? থাকতে চাও না আমার সাথে?”
কাঁদতে কাঁদতেই কোনোমতে ধরা গলায় ধারা ফুঁপিয়ে বলল,
—” আপনি যেখানে থাকতে বলবেন, সেখানেই থাকবো তো!”
শ্রাবণের ইচ্ছে করল ধারাকে বুকের মাঝে ঢুকিয়ে নিতে। আদুরে কান্নারত মুখটায় হাজারো চুমু খেতে ইচ্ছে করল। কিন্তু পারল না। কোথায় যেন আটকে গেলো! কোথায় যেন একটু অসস্তির আভা রয়ে গেছে। তাই মনের ইচ্ছে টা পূরণ করে একটু জড়িয়ে ধরতে পারল না। তবে একটা জিনিস পারবে সে। সেটাই করলো। শুকনো ঢোক গিলে দুহাতের মাঝে মেয়েটার মুখ নিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে গালে গড়িয়ে চলা অশ্রু সযত্নে মুছে দিল। চোখের কিনারা থেকেও একটু একটু করে মুছে দিল অশ্রুকণা! ধারা আর কাঁদলো না। হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এই প্রথমবার কেও চোখের পানি মুছে দিচ্ছে। ধারা স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। এতদিন ধরে যতবার কেঁদেছে, কেউ কোনোদিন চোখের পানি মুছে দেয়নি। বরং অপমান, ধমক, অবহেলা, এসবই সয়ে এসেছে সে। আজ প্রথমবার…সেই চোখের পানি কারো আঙুল ছুঁয়ে দিচ্ছে! যত্ন করে, মমতা নিয়ে।
মুহূর্তটা অবিশ্বাস্য। ধারা আঁচল আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরল। মনে হলো সে যেন একেবারে অচেনা জগতে এসে পড়েছে। এ কি সত্যি হচ্ছে? আমি কি স্বপ্ন দেখছি?—ভাবলো ধারা। চোখের ভেতর আবারো টলমল করে উঠলো অশ্রু, কিন্তু এবার আর তা দুঃখের ছিল না, অদ্ভুত, অপরিচিত এক উষ্ণতার অনুভবের।
শ্রাবণ নিজের অজান্তেই মগ্ন হয়ে গেল সেই কান্নারত মুখটার দিকে। অশ্রুসজল চোখ, লাল হয়ে ওঠা নাক, ফুঁপানো ঠোঁট, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে ধারা। মুহূর্তে রাগ, হতাশা সব উবে গেল। তার জায়গায় যেন জন্ম নিলো মুগ্ধতা, একরাশ কোমল টান। শ্রাবণের কণ্ঠ নরম হয়ে এলো,
—” এত সুন্দর করেও যে কেউ কাঁদতে পারে, আগে জানতাম না।”
ধারা চোখ বড় করে তাকিয়ে আবারো চোখ নামিয়েও নিল। কিছু বলল না। শুধু বুকের ভেতরটা আরো জোরে ধুকপুক করতে লাগলো। শ্রাবণ আঙুলের ছোঁয়ায় গাল থেকে শেষ অশ্রুকণাটুকু মুছে দিতে দিতে মনে মনে ভাবলো, যদি এই মেয়েটা শুধু আমার জন্য হাসে, শুধু আমার জন্য কাঁদে… তবে এটাই কি সবচেয়ে বড় পাওয়া নয়?
ধারার মাথা নিচু করা দেখে শ্রাবণ বুঝলো মুখ ফঁসকে লজ্জা দেয়ার মত কথা বলেছে সে। তাই কথা ঘোরানোর জন্য কিছু খুঁজলো। তখনি খেয়াল করল পিচ্চিটা আবারো শাড়ি পড়েছে। তবে শাড়ির অবস্থা খুবই এলোমেলো। নরম কন্ঠে শ্রাবণ জিজ্ঞেস করল,
—” শাড়ির এই অবস্থা কেনো? ম্যারাথনে দৌঁড়ে এসেছো?”
ধারা ভীষণ লজ্জায় গুটিসুটি মেরে গেল। শাড়ির আঁচলটা বুকের কাছে টেনে ধরলো আর চোখ নামিয়ে মিনমিন করে বলল,
—” না.. মানে, ঠিকমতো পড়তে পারিনি…!”
মাঝে কণ্ঠ কেঁপে গেল। মনে হলো এইমাত্র ধরা পড়ে গেছে কোনো দোষে।
শ্রাবণের চোখে অদ্ভুত এক নরম ভাব এলো। আগে হলে হয়তো খেপে উঠতো, অথবা ঠাট্টা করতো। কিন্তু এখন সে একেবারেই অন্য মেজাজে। হালকা হেসে, গলা আরও নিচু করে বলল,
—” হুম…তোমায় তো শাড়ি পড়তে মানা করেছিলাম। সামলাতে কষ্ট হবে না তোমার?”
ধারা এবারো কোনো উত্তর দিল না। মাথা আরও নিচু করে ফেলল। তবে গোপনে মনে পড়ল, আসলে সে শাড়ি পড়া শিখতে চাইছিল। ফুফু বলেছিল তাকে নাকি শাড়ি পড়লে সুন্দর লাগে। শ্রাবণ কয়েক মুহূর্ত ওভাবেই তাকিয়ে রইল। এলোমেলো আঁচল, কাঁপতে থাকা আঙুলে আঁকড়ে ধরা শাড়ি, অস্থির দৃষ্টি, সব মিলিয়ে মেয়েটাকে দেখে এই মুহুর্তে শ্রাবণের অন্তঃপটে ঝড় শুরু হয়েছে।
হঠাৎ করেই হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল সে। এক হাতে ধারার আঁচলটা আলতো করে ধরলো, আরেক হাতে তার কোমরের কাছে খসে যাওয়া ভাঁজটা ঠিক করতে করতে বলল,
—” দাঁড়াও, আমি গুছিয়ে দিই…!”
ধারা হকচকিয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল একবারে। থতমত খেয়ে বলল,
—” ন..না! আমি পারব..!”
কিন্তু হাত সরাল না শ্রাবণ। মুখে হালকা হাসি নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” তুমি পারবে না। শুধু গুবলেট করবে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।”
মেয়েটার বুক কাঁপতে লাগলো আরও বেশি করে। এত কাছে শ্রাবণ, আবার নিজের শাড়ি ঠিক করছে সে। ধারা বুঝতে পারছে না, এই মুহুর্তে লজ্জায় মরবে নাকি এ অনুভূতিতে হারিয়ে যাবে।
শ্রাবণ ধীরে ধীরে শাড়ির খসে যাওয়া অংশটা গুছিয়ে দিতে লাগলো। তার আঙুলের স্পর্শে ধারার বুকের ভেতরটা কেমন যেন শিহরিত হয়ে উঠলো। গরম নিঃশ্বাস আটকে রাখার চেষ্টা করল সে, কিন্তু শরীরের কাঁপুনি লুকোতে পারল না। শ্রাবণ এবার আঁচলটা বুকের কাছে গুটিয়ে দিল, কাঁধের উপর ফেলে সযত্নে ভাঁজটা মেলালো। তবে সমস্যা হচ্ছে ধারার। মাঝে মাঝে শ্রাবণের আঙুল ছুঁয়ে যাচ্ছে ধারার ত্বক, আর প্রতিবারই ধারা হকচকিয়ে উঠছে ভেতরে ভেতরে।
—” দেখেছো? এখন ঠিকঠাক হয়ে গেছে!”
শ্রাবণ এক নিঃশ্বাসে সব ঠিক করেই দম নিল।
ধারা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে উত্তর দিল,
—” থ..থ্যাঙ্ক ইউ..!”
শ্রাবণ হালকা হেসে বলল,
—” থ্যাঙ্ক ইউ তুমি নিজের আঁচলের তলায় রাখো। তার থেকে বরং নিজের শ্বশুর কে গিয়ে আসল কথা বলে এসো!”
শেষ কথাটা শুনে আবারও চোখ বড় হয়ে উঠল ধারার। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে বলল,
—” কী বলব?”
শ্রাবণ আগের মত জোরালো গলায় বলল,
—” গিয়ে বলবে এই ডিভোর্সে তোমার আপত্তি আছে! যদি ঠিকঠাক বলতে না পারো, তাহলে যে তোমায় আমি কি করব সেটা নিজেও জানিনা।”
ধারা মুখ খানিকটা নিচু করে মিনমিন করে ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,
—” আপনি আমায় হুমকি দিচ্ছেন?”
—” হ্যাঁ দিচ্ছি!”
ফটাফট বলল শ্রাবণ। বেশ গুরুতর ভঙ্গি তার। কিন্তু ধারা মন খারাপ করল। এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল দুজন। শ্রাবণের দৃষ্টি তখনো ধারার মুখে, আর ধারা কেবল চোখ নামিয়ে রাখল। নিস্তব্ধতা ভাঙলো শ্রাবণের নরম কণ্ঠ,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ১৮
—” ধারা…!”
ধারা চমকে তাকাল, চোখে প্রশ্ন। শ্রাবণ এক পলক তাকিয়ে নিয়ে ধীর স্বরে বলল,
—” ঠিক আছে। তোমায় কিছু বলতে হবেনা। আমিই ব্যবস্থা করব। তুমি শুধু তোমার আবেগে ডুবন্ত শ্বশুর শ্বাশুড়ির কথায় সম্মতি দিও না!”
