শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৬
অনামিকা তাহসিন রোজা
সেদিন ললিতা খাতুনের বাড়ি থেকে ঠিকঠাক ভাবেই ফিরে এসেছিল সাদিক এবং কনিকা। সাদিক ভেবেছিল কনিকাকে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরবে। বাড়ির কাছে আসার পরই এক মহিলা তাদের দেখে নেয়। গ্রামের মানুষের চোখ বলে কথা! এক মুহুর্তের জন্য অশিক্ষিত মহিলাটি কোনোরকম বিবেক বিবেচনা না করে চেঁচামেচি শুরু করে। তার ধারনা সাদিক আর কনিকা অবৈধ সম্পর্কে জড়িত, এবং কনিকা বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে নিজের প্রেমিক কে নিয়ে অসামাজিক কাজকর্মে লিপ্ত ছিল।
এরপর সেই মহিলা অনেক গুলো মহিলা জড়ো করে সাদিক আর কনিকা কে ঘিরে ফেলে তারা। কনিকা খুবই ভয় পেয়েছিলো। হুট করে গ্রামবাসীর এমন চেঁচামেচি তে আতঙ্কিত হয়ে সাদিকের বাহু আঁকড়ে ধরেছিল। ব্যাস! যা হওয়ার হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন জাহান্নাম হয়ে গেলো চারপাশ। অশিক্ষিত মহিলার মুখ থেকে ছুটে আসা সন্দেহের আগুন সেকেন্ডের মধ্যেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো। মহিলারা এগিয়ে এসে বেচারি কনিকাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দিতে দিতে থাপ্পড় মারতে থাকল। কনিকাকে টেনে বের করে আনা হলো মানুষের ভিড়ের মাঝে। মেয়েটি হাঁটু পর্যন্ত কাঁপছে, মুখে দম আটকে আসছে। সে ফুঁপিয়ে উঠলো কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলল
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” আপনারা ভুল ভাবতাছেন! আমি কিছু করিনি… আমরা কোনো খারাপ কাজ করিনি।”
কিন্তু তার কান্না যেন আরও আগুন ঢেলে দিলো ভিড়ের মধ্যে। এক মহিলা তেঁতে বলল,
—” চুপ কর বেলাজ ছেড়ি! লজ্জা নেই তোর? মা-বাপ বাড়ির বাইরে দেইখা তুই প্রেমিক নিয়ে বাড়ির ভেতর অসামাজিক কাজ করোস?”
আরেকজন বলল,
—”এমন মেয়ে গ্রামে থাকতে দিলে আমাদের মেয়েরা কি বাঁচব নাকি?”
অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে করতে এক মহিলা হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে কনিকাকে চুল ধরে টান দিলো। মেয়েটি চিৎকার করে কেঁপে উঠলো। এর পরপরই কয়েকটা থাপ্পড় ঝরে পড়লো তার গালে। মুখ থেকে কান্নার শব্দ বেরোলো, কিন্তু সেই কান্না থামাতে পারলো না মানুষের ক্রোধ। সাদিক হতবিহ্বল হয়ে চিৎকার করলো,
—” থামুন! দয়া করে কেউ ওর গায়ে হাত দেবেন না! আমরা কিছুই করিনি। আল্লাহর কসম, আমি শুধু ওকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছিলাম!”
কিন্তু তার কথা যেন কারো কানে পৌঁছাল না। মুহূর্তেই কয়েকজন পুরুষ এসে সাদিককে ধরে ফেললো। বারবার হাত ঝাড়া দিতে চাইলো সে, তবুও ওরা তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে সুপাড়ি গাছের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলো। কনিকা ছটফট করতে করতে চিৎকার করে উঠলো—
—” আপনারা বিশ্বাস করুন কাকি! আমি নির্দোষ! আল্লাহর কসম করছি আমরা কোনো ভুল করিনি। উনি শুধু আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে এসেছিল…!”
কিন্তু তার কণ্ঠ ডুবে গেল মানুষের তীব্র গালাগালি আর ঘৃণার শব্দে। কোনো সহানুভূতি নেই, কেবল ঘৃণা আর অন্ধ বিচারে অবাক হলো সাদিক। একজন মহিলা সজোরে কনিকার কাঁধে ধাক্কা দিলে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তখনই কয়েকজন একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে লাথি মারতে লাগলো। মেয়েটি বুক চেপে ধরে কাঁদতে লাগলো, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো, তবুও কণ্ঠরোধ ভরা কান্নার মাঝেই বারবার বলতে থাকলো,
—”আমরা কিছু করিনি, বিশ্বাস করুন, আল্লাহর কসম!”
সাদিক দড়ির ফাঁসে মরিয়া হয়ে ছটফট করছিল। চোখ দিয়ে রাগ আর অসহায়তায় অশ্রু বেরিয়ে আসছে। কস্মিনকালেও এমন কিছু ভাবেনি সে। কিন্তু কনিকাকে পেটাতে দেখে বুক চিঁড়ে আসলো তার, গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
—” ওকে মারবেন না! দয়া করে, মারবেন না ওকে। আমি আপনাদের পায়ে ধরছি, ও নির্দোষ!”
কিন্তু ততক্ষণে চারপাশে মানুষের নিষ্ঠুর হাত আর কথার বিষে পুরো পরিবেশ হাহাকারে ভরে গেছে।
গ্রামের চেনা উঠোন, চেনা মুখ,সবই হঠাৎ করে রূপ নিলো হিংস্রতায়। কোনো সত্য, কোনো অস্বীকার, কোনো শপথই তাদের কাছে আর কোনো মূল্য রাখলো না।
আধুনিক যুগে বসবাস করেও আজ আমরা এমন এক সমীকরণের ধাঁধায় পড়েছি যা থেকে বাঁচা মুশকিল। এই যুগে মানুষ মঙ্গল গ্রহে কলোনি বসানোর স্বপ্ন দেখছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পৃথিবী মুহূর্তেই একে অপরের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলার শক্ত কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেখানেই আজো কোনো কোনো গ্রাম যেন ঘোর অন্ধকারে আটকে আছে।৷ সাদিক আর কনিকাকে ঘিরে দাঁড়ানো সেই মুখগুলোতে আলো নেই, নেই সামান্যতম মানবিক বোধও। এ যেন সময় থেমে গেছে এক ভয়ানক পশ্চাদপদতায়। মানুষগুলো গায়ের জোরে, গালির তেজে আর সংখ্যার অহংকারে নিজেদের আইন বানিয়ে নিয়েছে। এসব কি মোটেই কাম্য?
কনিকা মাটিতে পড়ে আছে, শরীরটা ব্যথায় কুঁকড়ে গেছে। আজকের পৃথিবীতেও প্রাচীণ কালের মত সামান্য ছেলে-মেয়ে কে একসাথে হাঁটতে দেখেই গ্রামের মানুষের চোখ জ্বলে। অমানবিক রোষের শিকার কনিকা যদি আজ শহরে থাকত, তবে কি এসব হতো? উল্টো, শহরে সবাই নিজের মত চলে। অথচ আজ এখানে কনিকার কান্না, তার শপথ, তার নির্দোষত্ব, সবই চাপা পড়ে গেলো ভিড়ের গর্জনের নিচে। সাদিক বাঁধা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে, অসহায়তায় চোখ ছলছল করছে। সে-ও তো এই যুগের তরুণ, যে জানে শিক্ষার আলো কাকে বলে, জানে নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব মানেই সম্পর্ক নয়। অথচ, গ্রামের এই অন্ধচোখ সমাজে তার সমস্ত শিক্ষাই মিথ্যা হয়ে গেলো। সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে আইন চলে গেলে যুক্তি আর সত্যি কেবলই তুচ্ছ হয়ে যায়, আজ সাদিক সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে নিজের প্রেয়সীকে এভাবে যন্ত্রনা পেতে দেখে। এ এক ভয়ঙ্কর বৈপরীত্য। পৃথিবী যতই এগিয়ে যাক, মানুষের ভেতরের অশিক্ষা, ভয় আর সন্দেহ যদি না বদলায়, তবে কোনো আধুনিকতা তার মূল্য পায় না। এই ভিড়ের কাছে আজও নারী মানে লজ্জার পাত্র, আর ছেলেমেয়ে একসাথে দাঁড়ালেই মানে পাপ।
সাদিকের বুক ফেটে যাচ্ছিল এই উপলব্ধিতে, যে সমাজ এখনও মেয়েকে গালাগালি দিয়ে, চুল টেনে, দড়ি বেঁধে বিচার করে, সে সমাজ আসলে আধুনিকতার মুখোশের আড়ালে আদিম নিষ্ঠুরতাকেই বাঁচিয়ে রেখেছে। কনিকাও ভেতরে ভেতরে এই নির্মম শিক্ষা পাচ্ছিল। যতই যুগ এগোক, গ্রামের অমানবিকতা, কুসংস্কার আর সন্দেহের আগুন এখনও তার অস্তিত্বকে ছাই করে দিতে পারে। তারপর সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে উপণীত হলো পুরো গ্রামবাসী। এক ঘন্টার মধ্যেই কাজী ডেকে বিয়ে পড়িয়ে দিল কনিকা আর সাদিকের। তারপর তারা জানালো, তাদের দুজনের জন্য আজ থেকে এই গ্রাম নিষিদ্ধ। কনিকার বাবা-মায়ের অনুমতি না নিয়েই, কাওকে কোনো কিছু না জানিয়েই গ্রামের এই লোকগুলো সাদিক আর কনিকাকে গ্রাম থেকে চিরতরে বের করে দিল।
সালমা বেগম জগে পানি নিতে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সিঁড়ির কাছে এসেই থমকে গেলেন তিনি। হতবাক হয়ে দেখলেন, সিঁড়ির ধারে ধারা পড়ে আছে নিথর হয়ে। ফোনটা হাত থেকে ছিটকে একটু দূরে গড়িয়েছে। মুখে রঙ নেই, ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। বুক ওঠানামা করছে তীব্র কাঁপুনি নিয়ে, অচেতন হয়ে যাওয়ার আগে শরীরটা পুরোটা কেঁপে উঠেছিল। সালমা বেগমের চোখ প্রথমেই পড়লো ধারার ফ্যাকাশে মুখে, তারপর ভেজা চোখে। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো তার। হাঁক ছাড়লেন ঘরভর্তি শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে,
—” হায় আল্লাহ! ধারা মা..! কে আছো? শ্রাবণ, কই তুই? তাড়াতাড়ি আয়রে কেউ!”
এক মুহূর্তে বাড়ি জুড়ে হাহাকার ছড়িয়ে গেলো। ছুটে এলেন সামিউল শেখ, এক ঝলকেই সিঁড়ির ধারে পড়ে থাকা ধারাকে দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি। সালমা বেগম কাঁপা হাতে মাথাটা কোলে তুলে নিলেন, কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে আতঙ্কে,
—” ধারা মা! চোখ খোল মা! কী হইছে তোর রে?”
কিন্তু ধারা নিশ্চুপ, নিঃশ্বাস আছে খুব ক্ষীণ। ফোনটা তুলে দেখতেই সালমার কপাল কুঁচকে গেলো, লাইনে তখনও ওপাশ থেকে ক্ষীণ চেঁচামেচি ভেসে আসছিল। সালমা তাড়াতাড়ি কল কেটে দিলেন।
শ্রাবণ ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল। হুট করে মায়ের এমন চেঁচামেচি তে সে দৌঁড়ে বের হয়ে এলো। সিঁড়ির কাছে এসে ধারা কে ওভাবে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তার বুক কেঁপে উঠলো। রীতিমতো ছিটকে গিয়ে ধারাকে নিজের কোলে তুলে নিল শ্রাবণ। শ্রাবণের চোখ মুহূর্তেই ভরে গেল আতঙ্কে। কোলের ভেতর নিথর ধারার মাথাটা নেমে এলো তার বুকে। শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ, ঠোঁট ফ্যাকাশে, চোখদুটো একদম বন্ধ। বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠলো শ্রাবণের
এত দৃঢ়, এত শক্ত এই মানুষটা হঠাৎ করেই এক মুহূর্তে যেন অসহায় হয়ে পড়লো। কণ্ঠটা ফেটে যাচ্ছিল তাড়াহুড়োয়। সে অস্থির হয়ে বলল,
—” ধারা! ধারা, চোখ খোলো… শোনো আমার কথা! শুনতে পাচ্ছো? কথা বলো, প্লিজ, ধারা!”
সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে কাতর কন্ঠে শ্রাবণ অস্থির হয়ে বলতে থাকলো,
—” মা, কী হয়েছে ওর? অজ্ঞান হলো কী করে? কী হয়েছে?”
সালমা বেগম নিজেও কাঁপছিলেন, কিন্তু ছেলের এমন অসহায় অবস্থা দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। বিভ্রান্তিতে পড়েছেন তিনি। মাথা নেড়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
—” জানিনা রে। তুই ওকে ঘরে নিয়ে যা। আমি পানি নিয়ে আসছি। শ্রাবণের বাবা, দ্রুত ডক্টরকে কল করে আসতে বলো।”
সামিউল শেখ দেরি না করে ফোন হাতে নিয়ে কল করলেন। সালমা বেগমও দ্রুত নিচে গেলেন পানি আনতে। আতঙ্কে শ্রাবণের হাত কাঁপতে লাগলো। কপালে বারবার হাত বুলিয়ে দিল, অস্থিরভাবে চুল সরিয়ে দিল কানের পাশ থেকে। চোখে অঝোর ধারা, গলায় চিৎকার আটকে যাচ্ছে, তবুও মরিয়া স্বরে চেঁচিয়ে ডাকল,
—” কী হয়েছে, ধারা? চোখ খোলো প্লিজ!”
ধারার এমন নিথরতা দেখে শ্রাবণ আর কোনো কথা বলল না। মেয়েটার শরীরটাকে কোলে নিয়ে বজ্রপাতের মতো দ্রুত ঘরে নিয়ে এলো। বিছানায় আলতো করে শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশে বসলো। ধারার ক্ষীণ নিঃশ্বাসের শব্দ সে শুনতে পাচ্ছে। শুকনো ঢোক গিলে বারবার ধারার কপালে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো শ্রাবণ। একটুখালি ধারার জ্ঞান ফেরানোর প্রয়াস! হুট করে কী হলো মেয়েটার? একটু আগেই তো ঠিক ছিল। এসব ভাবনার মধ্যে শ্রাবণ ততক্ষণে একেবারেই ভেঙে পড়েছে। পাশে বসে অস্থিরভাবে বারবার ডাকতেই থাকলো,
—”ধারা, প্লিজ, তুমি চোখ খোলো! কিছু হবেনা তোমার! আমি আছি তো..কিছু হবে না তোমার..!”
ঠিক তখনই ডাক্তার দ্রুত ভেতরে এলেন। পেছনে সামিউল শেখও হন্তদন্ত হয়ে ছুটছেন। ডক্টরের স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলছে, হাতে ছোট্ট ব্যাগ। শ্রাবণ কোনো কথা না শুনেই আতঙ্কিত কণ্ঠে অনুনয় করলো,
—” ডক্টর, প্লিজ ওকে দেখে বলুন না, কী হয়েছে ওর! একদম হুঁশে আসছে না, নিঃশ্বাসটাও কেমন যেন লাগছে…ও কিন্তু একটু আগে ঠিকই ছিল! হুট করেই কী হলো কে জানে!”
ডাক্তার শান্ত কিন্তু দ্রুত হাতে ধারার পালস চেক করলেন, চোখের পাতা টেনে দেখলেন। তারপর কিছুক্ষণ সময় নিয়ে গভীর শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। আস্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,
—”মিস্টার শেখ, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে ওনার। মানে, এমন কিছু শুনেছে বা হঠাৎ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে যা মানসিকভাবে ভয়ঙ্কর আঘাত দিয়েছে। তাই সাময়িকভাবে শরীর দুর্বল হয়ে গিয়েছে।”
শ্রাবণ হাঁফ ছেড়ে বসলেও ভয় পুরোপুরি কাটল না। সামিউল শেখ আতঙ্কিত মুখে ডাক্তারকে আরেকবার জিজ্ঞেস করলেন,
—” মানে, এখন কি বিপদমুক্ত ও? ও কি ঠিক হয়ে যাবে?”
ডাক্তার হালকা আশ্বাসের স্বরে মাথা নেড়ে বললেন,
—”হ্যাঁ, খুব একটা চিন্তার কারণ নেই। তবে ওনাকে এখন বিশ্রামে রাখতে হবে। বেশি ভিড় করবেন না, শান্ত পরিবেশে রাখুন। উনার হুঁশে আসবে ধীরে ধীরে।”
সালমা বেগম একজন মা। মনে মনে ভেবেই নিলেন মেয়েটা খাওয়াদাওয়া ঠিক মত করছেন না। ডাইনিং টেবিলেও খুব একটা খাবার তিনি ধারাকে খেতে দেখেন না। সাথে সাথে মাতৃ সুলভ মনটা অস্থির হলো তার। শ্রাবণের ফোনটা বেডসাইড টেবিলে রেখে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। সামিউল শেখও এবার ডক্টরকে বিদায় দিতে গেলেন।
ঘর পুরো ফাঁকা হলে শ্রাবণ এবার দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে কিছুটা সময় নিঃশ্বাস নিল। তারপর আস্তে করে মাথা নামিয়ে আবারো ধারার কপালে চুমু খেলো। অচেতন মেয়েটার আঙুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
—” তুমি আমার সাথে কিছু শেয়ার করোনি, ধারা। কী এমন শুনলে তুমি? কী নিয়ে এত ভয় পেয়েছো যে আমাকে কিছু না জানিয়েই…! মেয়ে তুমি বড্ড খারাপ!”
ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো শ্রাবণ। এখনো চোখ খুলছে না কেনো কে জানে! ভয়ে হাত পা অসাড় হয়ে গেলো তার। মিনিট দশেক পর হঠাৎই ধারার চোখের পাতাগুলো হালকা কেঁপে উঠলো। ভ্রু কুঁচকে একবার নিঃশ্বাস নিলো গভীরভাবে। তারপর ধীরে ধীরে ভারী চোখ দুটি খুললো সে। শ্রাবণ যেভাবে ওর হাত চেপে ধরে বসেছিল, সেভাবেই ঝুঁকে পড়লো আরও কাছে। অস্থির গলায় দ্রুত বলে উঠলো,
—”ধারা ! শুনতে পাচ্ছো, দেখতে পাচ্ছো আমাকে!”
ধারা প্রথমে সবকিছু ঝাপসা দেখছিল। চারপাশ অস্পষ্ট, কেবল অনুভব করলো কপালে কারো উষ্ণ হাত, আঙুলের ভেতর ভরসার এক চাপ। ধীরে ধীরে দৃষ্টি স্পষ্ট হলো। আর সেই প্রথম যে মুখটা চোখে পড়লো, তা শ্রাবণের। চোখ নামিয়ে নিতে চাইলো ধারা, কিন্তু শরীর দুর্বল হয়ে পড়ায় কেবল চোখের ভেতরেই কষ্টের ছায়া ফুটে উঠলো। শুকনো ঠোঁট নড়ল কাঁপতে কাঁপতে, গলাটা ভারী হয়ে এলো, তবুও ফিসফিস কিছু একটা বলতে চাইলো, তার আগেই শ্রাবণের অভিমানী কন্ঠটা বেজায় কঠোর হয়ে বলল,
—” চোখ খুলতে এত দেরি করলে কেনো, ধারা? আমার হৃদয়টা কেড়ে নিয়ে শান্তি হয়নি, এবার প্রাণটাও কেড়ে নিতে চাইছো? আমায় ঋণী করে রেখো না, তোমার পাওনা ভালোবাসাগুলো শোধ করা বাকি!”
ধারা ক্লান্ত চোখে তাকালো এলোমেলো হয়ে অস্থিরতায় ডুবন্ত মানুষটার দিকে। বুকের মধ্যে কালবৈশাখীর ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেলো। নির্ভার হওয়া ডান হাতটা একটু উঠিয়ে ছুঁয়ে দিল শ্রাবণের গালের কাছটায়। শ্রাবণ কাতর চোখে তাকাতেই আধখোলা চোখচোড়া নিমিষেই বন্ধ করল ধারা। শ্রাবণ হকচকিয়ে গেলো। তার চোখ দুটো ভরে উঠলো আরোও বেশি উৎকণ্ঠায়। সে দ্রুত ওর মুখের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
—” চোখ খোলো! একদম বন্ধ করবেনা! তাকাও আমার দিকে। কী হয়েছিল তোমার? এমন করে অজ্ঞান হলে কেনো?”
ধারা এবার তাকালো। আধখোলা চোখে তাকিয়ে ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না আটকালো। অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,
—” কনিকা.. ওরা কনিকা কে মেরে ফেলেছে শেখ সাহেব। আমার দোষে ওরও জীবনটা শেষ!”
শ্রাবণ বুঝলো না। বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলে তাকালো। ধারা চোখ বন্ধ করে ফেললো আবার। বুকটা কেঁপে উঠলো তার। মনে হলো কান্না আসছে। ঠোঁট কাঁপলো, কিন্তু বলার শক্তি যেন হারিয়ে ফেললো মেয়েটি। শুধু কাঁপা কণ্ঠে একটাই বাক্য বের হলো,
—” সাদিক আর কনিকাকে গ্রামের সবাই ধরেবেঁধে বিয়ে পড়িয়ে দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছে!”
শ্রাবণের বুক কেঁপে উঠলো বজ্রপাতের মতো। সে স্থির হয়ে গেলো কয়েক সেকেন্ডে। বুকটা যেন জমে গেলো মুহূর্তেই। চোখে স্থির হয়ে রইলো নিথর দৃষ্টিটা। ধারা যে কী বললো, তা গুছিয়ে বোঝার শক্তি যেন হারিয়ে ফেললো সে। মাথার ভেতর শব্দগুলো প্রতিধ্বনির মতো বাজতে থাকলো। ঠিক তখনই ধারার বুক কেঁপে উঠলো প্রবল ঝড়ে। সে আর সামলাতে পারলো না নিজেকে। হঠাৎই ফুঁপিয়ে উঠলো। কান্নার শব্দে ঘরটা ভারী হয়ে গেলো। পরমুহূর্তেই সে ভেঙেচুরে অনেক জোরে জোরে কাঁদতে লাগলো। বুক চেপে, মুখ হাত দিয়ে ঢেকে। নিজের ভাগ্যের সমস্ত তিক্ত পরিহাস ভেঙে আসছে একসাথে।
শ্রাবণ তাকিয়ে রইলো স্তব্ধ দৃষ্টিতে, কিন্তু এক মুহূর্তের বেশি স্থির থাকতে পারলো না। এমন অসহায় কান্না, তাও আবার প্রিয়তমার এমন আহাজারি সহ্য করা যায় না তার পক্ষে। সে তড়িঘড়ি করে সামনে ঝুঁকে পড়লো। কাঁপতে থাকা মেয়েটার শরীরটাকে শক্ত করে নিজের বুকে টেনে নিলো।
—” শান্ত হও, ধারা! প্লিজ, শান্ত হও তুমি!”
ধারার গলগল কান্নার শব্দ তার বুকে চাপা পড়লো। শ্রাবণ দু’হাত দিয়ে ওকে আঁকড়ে ধরে রাখলো, মাথার চুলগুলো বুলিয়ে দিতে থাকলো অবিরাম। নিজের বুকের ভেতরটা কেমন তীব্র যন্ত্রণায় মোচড় দিতে লাগলো তারও, তবু সে আঁকড়ে রাখলো শক্ত করে
সে তো নিজেও যেনো ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছিলো। ধারার প্রতিটা কান্নার শব্দ তার বুকের ভেতর শিকল দিয়ে পেটাচ্ছিলো। এতটা অসহায়, এতটা ভেঙে যেতে, এভাবে আগে কোনোদিন দেখেনি ধারা’কে। সে দু’হাত দিয়ে শক্ত করে বুকে চেপে ধরলো মেয়েটিকে। ধারাও এমনভাবে আঁকড়ে ধরল,যেন এই বুকই এখন তার একমাত্র আশ্রয়। শ্রাবণের আঙুলগুলো কাঁপছিলো, তবুও চুলগুলো সরিয়ে কপাল জুড়ে দিতে লাগলো হাত। গলা কেঁপে উঠলো শ্রাবণের,
—” ধারা, প্লিজ থেমো না, কান্না করো। সব কষ্ট কান্না করে বের করে দাও। কিন্তু একা বোঝা বইবে না তুমি। আমি আছি। আমি আছি তোমার জন্যেই।”
ধারার বুক হু হু করে উঠছিলো। তার অশ্রু শ্রাবণের বুকে ভিজিয়ে দিচ্ছিলো শার্টটা। অস্পষ্টস্বরে হাহাকার করে সে বলে উঠলো,
—” আমি খারাপ, শেখ সাহেব! আমার জন্যেই কনিকা শেষ হয়ে গেলো। আমার কথা না শুনলে ওরা, হয়তো বাঁচতো ও, আমার দোষে সব হলো!”
শ্রাবণের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিলো। সে এক হাত দিয়ে ধারার মুখ চেপে ধরলো আলতো করে, যেনো এ শব্দ আর না বেরোয়। চোখের কোণ ভিজে উঠলো তারও। কাঁপা কণ্ঠে সে গলা নামিয়ে বললো,
—” একবার আমার চোখের দিকে তাকাও। তুমি দায়ী নও, ধারা। তুমি বোঝো না? পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা, সমাজের নির্মমতা, ওটাই কেড়ে নিয়েছে কনিকাকে। তুমি কিছু করোনি। তুমি পারতেই না ওকে আটকাতে। দোষ তোমার নয়, দোষ এই দুনিয়ার!”
ধারা আবার কেঁপে উঠলো। তীব্র কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিলো। শ্রাবণ এবার তার মুখটা নিজের বুকের ভেতর আরো গভীর চেপে ধরলো, যেনো বাইরের পৃথিবী থেকে তাকে আড়াল করে রাখে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এক গ্লাস গরম দুধ আর কাজুবাদাম নিয়ে হাজির হন সালমা বেগম। তার ধারনা ধারার গায়ে কোনো শক্তি নেই। তাই সে এভাবে অজ্ঞান হয়েছে। শ্রাবণও খুশি হলো মায়ের এমন কাজে। আসলেই মেয়েটা কিছুই খায় না। ধারাকে ধীরেসুস্থে শোয়া থেকে উঠে বসালো শ্রাবণ। সালমা বেগম ধারার পাশে বসে চুল খোপা করে বেঁধে দিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে কাজুবাদামের বাটিটা হাতে দিয়ে বললেন,
—” বাটি যেন একদম ফাঁকা পাই। সব বাদাম যদি না খেয়েছিস তুই, আমি কিন্তু ভুলে যাব তুই আমার বউমা! আমার মা’র খাস নি তো!”
শ্রাবণ ফিক করে হেসে উঠলো সালমা বেগমের এই শাসন দেখে। ধারা চোখে পানি নিয়েই হেসে বাদাম খেতে শুরু করল। দুধ দেখে কিছুটা মুখ কুঁচকে তাকালে সালমা বেগম চোখ রাঙিয়ে খেতে বলেন। শ্রাবণও সায় দেয়। সালমা বেগম এবার ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
—” কী হয়েছিল?”
শ্রাবণ ধীরেসুস্থে সবটা খুলে বলে সালমা বেগম কে। ধারার মুখটায় আঁধার নেমে আসে। সব কিছু শুনে স্তব্ধ হন ভদ্রমহিলা। আজকালও এমন উদ্ভট ঘটনা ঘটে নাকি। এই দশকে এসে যদি এমন ঘটনা শুনতে হয়, তবে কিসের আধুনিকতা! গ্রামের এত উন্নয়ন করে যদি মানুষের দৃষ্টি আর মন-মানসিকতা উন্নত না হয়, তবে সবই বৃথা!
ধারা খেতে খেতেই ফুঁপিয়ে বলল,
—” না জানি ওরা কোথায় গেছে। সাদিক ভাইয়া কনিকাকে নিয়ে যাবে কোথায়? যাওয়ার তো জায়গাই নেই। আর ছোট মা, চাচা সবাই কী করছে? ওনারাও কি কনিকা কে ভুল বুঝেছে? একবারও কি খোঁজার চেষ্টা করেনি?”
সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ে রইলেন ধারার দিকে। মেয়েটার চোখ ভেজা, হাতের কাজুবাদাম খেতে খেতেও তার গলাটা আটকে যাচ্ছে। তিনি আলতো করে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন,
—” মা, সমাজের অন্যায় এত সহজে ভাঙা যায় না। কিন্তু মনে রাখিস, সত্য আর ভালোবাসার শক্তি কোনোদিন হারায় না। তোদের কথা শুনে যা মনে হলো, সাদিক ছেলেটা খারাপ নয়, আর কনিকাও নিশ্চয়ই একা হয়নি। রিযিকের মালিক ওপরওয়ালা! আল্লাহ ওদের জন্য পথ বের করে দেবেন।”
শ্রাবণ ঠোঁট কামড়ে বসেছিলো মায়ের কথাগুলো শুনে। তার নিজের ভেতরটাও ক্ষোভে জ্বলছে, কিন্তু ধারার সামনে সে কিছু বললো না। বরং গ্লাসটা হাতে নিয়ে আলতো স্বরে বলল,
—” আরেক চুমুক খাও, ধারা। শরীরটা শক্ত না হলে তুমিই ভেঙে পড়বে।”
ধারা দুধটা একটু গিলে নিলো। চোখে টলটল করা পানি জমে আছে। সে নিচু স্বরে আবার বলল,
—” কেউ যদি খোঁজ না নেয়? যদি সত্যি সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়? তাহলে তো ওরা একেবারেই শেষ হয়ে গেলো, শেখ সাহেব।”
শ্রাবণ ওর হাত নিজের হাতে তুলে নিলো দৃঢ়ভাবে। কণ্ঠটা ভারী হয়ে গেলো তার।
—” শেষ বলে কিছু নেই, ধারা। আমি খুঁজে বের করব। যেখানে থাকুক, যেভাবেই থাকুক, সাদিক আর কনিকাকে আমি খুঁজে বের করব। আর যদি কেউ ভুল বুঝেও থাকে, আমি প্রমাণ করে দেবো ওরা নির্দোষ। তোমাকে আর এই অপরাধবোধে পুড়তে দেবো না। ঠিক আছে? আর চিন্তা কোরো না!”
ধারার চোখ ছলছল করে উঠলো, কিন্তু এবার তার ভেতরটা একটু শক্ত হলো। মাথা নাড়লো আস্তে করে। সালমা বেগম একদিকে তাকিয়ে নিজের অশ্রু গোপন করলেন। তিনি জানলেন, ছেলে আজ সত্যিই বদলে গেছে, শুধু ধারার জন্য নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো দৃঢ়তায়ও। একটু পরেই আবার ফিক করে হাসলেন সালমা বেগম। শ্রাবণ আর ধারা দুজনেই বিভ্রান্ত হয়ে তাকালো মায়ের দিকে।
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—” হাসছো কেনো মা?”
সালমা বেগম ঠোঁট ভিজিয়ে মুচকি হেসে তাকালেন নিজের ছেলের দিকে। ঠোঁট চেপে টেনে টেনে বললেন,
—” কে যেন কার হাঁটুর বয়সী! কে যেন কাকে মেনে নিবে না কখনো! আরো কী কী যেন বলেছিল..উমম..ও হ্যাঁ, ধারাকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দিলেও কারো কিছু যায় আসে না! এসব কে বলেছিল শ্রাবণ? আমি ঠিক মনে করতে পারছিনা!”
দুধ খাচ্ছিল ধারা। অথচ মুখে কিছু না থাকা সত্ত্বেও বিষম খেলো শ্রাবণ। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে নিজেকে লুকোনোর জায়গা খুঁজলো। কাশতে কাশতে হতবিহ্বল ধারা কেও এক পলক দেখে নিলো। সালমা বেগম হাসতে হাসতে ফাঁকা গ্লাসটা নিয়ে ধারাকে বাদাম খেতে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। শ্রাবণের রাগ হলো। এখানে তারই বা কী দোষ! কে এখন তার স্বয়ং মা কে বোঝাবে যে মেয়েটা তাকে জাদুটোনাই করেছে। নইলে সত্যিই মেনে নিত না। যদি না প্রণয়ের অদৃশ্য বন্ধনে বদ্ধ না হতো, তবে আসলেই মেনে নিত না। সব এই মেয়েটার দোষ!
রাগ ঝেড়ে ফেলার জায়গা পেলো না শ্রাবণ। পাশে বড় বড় চোখ করে তাকানো ধারার দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস পেয়ে ধমকে বলল,
—” সব তোমার দোষ, বেয়াদব মেয়ে! না জানি আর কতদিন এভাবে খ্যাপাবে আমায়! তাড়াতাড়ি বাদাম খাওয়া শেষ করো!”
ইচ্ছেমতো ধমক দিয়ে ধুমধাম করে বারান্দায় চলে যায় শ্রাবণ। ধারা চোখ পিটপিট করে একবার দরজার দিকে, একবার শ্রাবণের গমনপথে তাকিয়ে থাকে। সবকিছু মাথার উপর দিয়ে গেলো তার। কিছুই বুঝলো না! এই না লোকটা আদুরে ভঙ্গিতে কথা বলছিল, আবার ধমকালো কেনো? নিজের দোষটা খুঁজে পেলো না বেচারি মেয়েটা। দুটো বাদাম হাতের মুঠোয় রেখে বাটিতে থাকা সব বাদাম গুলো শেষ করল। তারপর ধীরেসুস্থে বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় উঁকি মেরে দেখলো শ্রাবণ রেলিঙে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ফোনটা নিয়ে কিছু একটা খোঁজাখুঁজি করছে। ধারা এগিয়ে গেলো। শ্রাবণ লক্ষ্য করলেও কিছু বলল না।
ধারা এবার একদম কাছে এসে বাদাম দুটো শ্রাবণের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
—” এই দুটো আপনি খান!”
শ্রাবণের চোখ সরু হয়ে এলো। আবারো চাপা স্বরে ধমক দিলো মেয়েটাকে,
—” নিজে খাও, নির্বোধ! শরীরে তো একফোঁটা শক্তি নেই। টোকা দিলেই চিৎপটাং হয়ে যাও, আর এসেছো আমাকে বাদাম খাওয়াতে। তুলার মত শরীর নিয়ে ঘোরাফেরা করো! ফু দিলেই তো উড়ে উড়ে বাংলাদেশের বর্ডার পার করে ইন্ডিয়ায় পৌঁছাবে!”
ধারা ঠোঁট উল্টালো। কী হয়েছে লোকটার। গিরগিটির মত কেনো রূপ বদলাচ্ছে। মিনমিন করে অভিমানী কন্ঠে ধারা বলল,
—” আপনি আমার সাথে এমন করছেন কেনো? তখন থেকেই বকাবকি করছেন! আমি কী করেছি?”
শ্রাবণ হাতের ফোনটা এবার পকেটে ঢোকালো। দৃঢ় কন্ঠে বলল,
—” কী করোনি সেটা বলো? সবই তো করছো। সব তোমার দোষ!”
একটু থেমে শ্রাবণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। একটানে ধারাকে নিজের কাছে এনে তর্জনী তুলে হুমকিস্বরূপ বলে উঠলো,
—” কান খুলে শোনো। তোমার প্রাণপ্রিয় শ্বাশুড়ি কে বলে দেবে, আমায় যেন আর খোটা না দেয়। আমার বউ, আমি যখন খুশি মানব, যখন খুশি মানব না। আগে মানিনি, এখন মেনেছি, ভবিষ্যতে মানব। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে যদি তোমার শ্বাশুড়ি আমায় আবারো পচিয়েছে বা খ্যাপিয়ে কথা শুনিয়েছে, ফর গড সেইক, আমি আমার বউ নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাব। কথা বুঝেছো?”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকালো। কিন্তু শ্রাবণের রাগান্বিত কন্ঠস্বরে দ্রুতগতিতে মাথা নেড়ে বোঝালো, সে বুঝেছে। শ্রাবণ নিজের সব কথা গুলো উগলে দিয়ে কিছুটা শান্ত হলো। নরম হয়ে ধারারর কপালে আঙুল ছুঁইয়ে বলল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৫
—” মাথায় ব্যাথা পেয়েছো নাকি?”
ধারা দুদিকে মাথা নেড়ে না বোঝালো। শ্রাবণ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধারার মুখটা ধরে নরম হয়ে বলল,
—” তুমি চিন্তা কোরো না। সাদিককে তো চেনোই। ও কখনো কনিকা কে খারাপ রাখবে না। নিশ্চয়ই ওরা যেখানেই আছে, ভালো আছে। আর আমি তবুও ওদের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করছি। গ্রামেও লোক পাঠিয়ে দেব হুম? একদম চিন্তা করবেনা!”
