শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৮
অনামিকা তাহসিন রোজা
অফিসে আজ গেলো না শ্রাবণ। সে কাওকে না জানিয়ে জিহানের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। কারন মুনিরার খবর কেও না পেলেও জিহানের কাছে তো পাওয়া যাবেই। যাওয়ার পথে একবার জিহানকে কলও করল সে। কিন্তু কল ধরল না জিহান। আরেকটু দুশ্চিন্তায় পড়ল শ্রাবণ। লাগাতার কল দিতেই থাকলো। শেষে জিহানের ফ্লাটেই পৌঁছে গেলো। সময় নষ্ট না করে সে দ্রুত গতিতে জিহানের বাড়ির সামনে চলে আসলো। কিন্তু, বারবার কলিং বেল বাজালেও কোনো সাড়া পেলো না সে। অনেকক্ষণ ঠোঁট কাঁমড়ে ভাবল শ্রাবণ।
এরপর দরজা ভেঙেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। চারপাশে কাওকে না দেখলেও জিহানের ঘরে আসতেই শ্রাবণের শরীর পাথরের মত জমে গেলো। রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধপ করে নেমে গেল। দেখে মনে হচ্ছে ঘরটা কোনো যুদ্ধক্ষেত্র। মেঝেতে ছড়িয়ে আছে ভাঙা গ্লাস, ছেঁড়া কাগজ, উল্টে যাওয়া চেয়ার আর ছাইভরা সিগারেট। বিছানা এলোমেলো। টেবিলের ওপর রক্তমাখা টিস্যু, অর্ধেক খাওয়া পানির বোতল উল্টে পড়ে আছে। জানালার পর্দা আধখোলা, ধুলো জমে উড়ে আসছে বাতাসে। এক অদ্ভুত, ঘন ভারী গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার উপক্রম। এসব দেখে মুখ কুঁচকালেও এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই শ্রাবণের চোখ পড়লো ঘরের কোণায়। জিহান নিথর হয়ে মেঝেতে বসে আছে। চুলগুলো এলোমেলো, দাড়ি গজিয়ে মুখটা কেমন অচেনা আর উন্মাদ লাগছে। চোখদুটো লালচে, ফাঁকা চাহনিতে স্থির হয়ে আছে মেঝের এক বিন্দুতে। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে, তবুও সে নড়ছে না। মনে হচ্ছিল ঘন্টার পর ঘন্টা নয়, দিনের পর দিন সে ঠিক ওইভাবেই বসে আছে পাথরের মত। যেন চারপাশের কোনো কিছুই তার কানে পৌঁছাচ্ছে না।
শ্রাবণের বুকের ভেতর ধপধপ করতে লাগলো। সে হতবিহবল কন্ঠে ডেকে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” জিহান!”
শ্রাবণ গলা ফাটিয়ে ডাক দিলো, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আরেকবার ডাক দিলো, এবার সে এগিয়ে এসে কাঁপা হাতে কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে গেলো। কিন্তু জিহান শুধু মাথা ঘুরিয়ে তাকালো, আর সেই চোখে এমন এক অদ্ভুত উন্মাদনা ছিলো, যা দেখে শ্রাবণের নিজের শরীর শিরশির করে উঠলো।
—” কী হয়েছে ভাই? এ কী অবস্থা? তুই এভাবে…এসব কী?”
শ্রাবণ অস্থির ভঙ্গিতে বারবার এসব জিজ্ঞেস করতে থাকলো আর জিহানকে ঝাঁকাতে থাকলো উত্তরের আশায়। কিন্তু জিহান পাথরের মতই বসে রইলো। শরীর যেন অচল তার। মানসিকভাবে ভঙ্গুর দেখাচ্ছে তাকে। শ্রাবণের মাথায় কিছুই ঢুকলো না। সে কিছু একটা ভেবে এবার জোরগলায় জিজ্ঞেস করল,
—” এই জিহান, মুনিরা কোথায়? তুই জানিস কিছু? ওকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!”
মুনিরার নাম শোনা মাত্রই যেন জমাট বরফ ভাঙার মতো একটা শব্দ হলো, জিহান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সশব্দে। ঠোঁট কেঁপে উঠলো, চোখের কোণ বেয়ে টুপটাপ করে পানি পড়তে লাগলো। পরক্ষণেই সে হঠাৎ ভেঙে পড়লো পুরোপুরি ভাবে। উন্মাদের মত ফুঁপিয়ে কেঁদে বুক চাপড়াতে লাগলো জিহান। মুহূর্তের মধ্যেই শ্রাবণকে আঁকড়ে ধরে দমবন্ধ গলায় বললো,
—” আমি ওকে হারিয়ে ফেলেছি রে…! সব আমার দোষ! আমি কিছুই করতে পারিনি… আমি চাইলে বাঁচাতে পারতাম, কিন্তু পারলাম না! আমি…আমি একদম ব্যর্থ!”
জিহানের বুক কাঁপতে লাগলো অঝোর কান্নায়। ভিজে গলাটা কাঁপছিলো, শব্দ ভাঙছিলো বারবার। শ্রাবণ হতবিহ্বল হয়ে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে শুধু বললো,
—” কী বলছিস তুই? আমি কিছু বুঝতে পারছি না। সব খুলে বল ভাই, সবটা সত্যিটা বল!”
কনিকা পুকুর থেকে গোসল করে ঘরে আসলো। আতিকের মা জরিনা খাতুনের দেয়া শাড়িগুলোই সে পড়ছে। আজ ধূসর রঙের একটা শাড়ি পড়ল মেয়েটা। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে অল্প সময়েই। মুখটা ফ্যাকাসে। খাওয়া দাওয়ার অনিয়মের জন্য শরীরও মিইয়ে পড়েছে। সর্বদা প্রাণোচ্ছল উচ্ছাসে মাতোয়ারা কনিকা আজকাল একদম পাথর হয়ে গেছে। সে গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলো। ঢুকেই ধপ করে খাটে বসে পড়লো। সে এখনো ভেবে পাচ্ছে না যে কেনো তার বাবা মা এখনো তার কোনো খোঁজ নিচ্ছে না। তারা কেনো এখনো খুঁজছে না তাকে? এসব ভাবতে ভাবতেই খট করে দরজা খোলার শব্দ হলো। সাদিক কেবলই খামারের কাজ শেষ করে আসলো। আজ অল্প কাজ করেছে সে। ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই হাসনাহেনা ফুলের ন্যায় স্নিগ্ধ একরকম ঘ্রাণ পেলো সাদিক। সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস টেনে নিল। খানিক সময় পেরোতেই চোখ খুলে দেখতে পেলো সদ্য গোসল সেড়ে আসা ধূসররঙা শাড়ি পরিহিত কিশোরী কনিকাকে। সাদিক অবাক হলো। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো কনিকা বড় হয়ে গেছে, একদম পরিপূর্ণ নারী হয়ে গেছে সে। কি স্নিগ্ধ লাগছে! কি সুন্দর লাগছে! মনে হলো শাড়িটা ধূসররঙা হলেও কনিকার গায়ে রঙিন উজ্জ্বলতায় ভরপুর হয়েছে।
চোখে মুগ্ধতা স্পষ্ট হতেই নিজেকে সামলালো সাদিক। গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানালো। কনিকা চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। সাদিক এবার এগিয়ে এসে বিছানায় বসলো। কনিকার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আমি আইজ একটু শহরের দিকে যাইতাছি বুঝলি?”
সবকিছু থেকেও নেই কনিকার। এখন একমাত্র সাদিক ছাড়া কিছুই নেই। হুট করে সাদিকের কথায় চমকালো মেয়েটা। মিনমিন করে বলল,
—” কেন যাবা সাদিক ভাই?”
সাদিক ঠোঁট কাঁমড়ে ভাবলো কিছু একটা। সময় নিয়ে হৃদয়ে টান পড়া গলায় বলে উঠলো,
—” চাকরি খুঁজবার জন্য! ”
কনিকা দু’হাত দিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটা চেপে ধরলো। চোখ নামিয়ে ফেললো আতঙ্কিত ভঙ্গিতে। গলা শুকিয়ে গেছে যেন। ছোট্ট গলায় শুধু জিজ্ঞেস করল,
—” শহরে চাকরি করবা?”
সাদিক ধীরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালো। চোখে স্পষ্ট ভীষণ ক্লান্তি। কপালের ঘাম হাতে মুছে বলল,
—” হ। এইখানে আর চলবে না। খামার কইরা ঘর চালানো যাবে না। তোর জন্য কিছু একটা করতে তো হবে। ঘর না জুটাইলে তোরে রাখমু কই? চাকরি না করলে খাওয়ামু কী?”
কনিকা বিস্ময় ভরা চোখে তাকালো সাদিকের দিকে। বুকের ভেতর অদ্ভুত হাহাকার ফুটলো। সাদিক তার কথা ভেবে এত চিন্তা করছে দেখে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করলো। তবে একটু কষ্ট হলো। এই কয়দিনে যার ভরসায় একরকম বেঁচে আছে, সেই যদি দূরে যায় তবে কী হবে তার? ঠোঁট কেঁপে উঠলো, চোখ ভিজে উঠলো অনায়াসেই। সে এবার কাঁপা গলায় বলল,
—” শহরে গেলে…আমারে ছাইড়া যাবা?”
প্রশ্নটা ছিলো অতি সরল, অথচ সাদিকের বুকের ভেতর ঝড় তুলল। সে অস্থির হয়ে পড়লো। ধূসর শাড়ি পরা, অস্থির চোখের কনিকার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরলো। একটু অসস্তি হলো কনিকার, তবে সরালো না।
সাদিক এবার আশ্বাস দেয়ার ভঙ্গিতে বলল,
—” তোরে এহন নিয়া গেলে রাখমু কই ক? আপাতত এইখানে থাক। সাতদিন পর আইসা তোরেও নিয়া যামু, কথা দিলাম!”
কনিকা নীরব হয়ে গেলো। চুপচাপ বসে রইলো। কিন্তু বুকের ভেতর অশ্রু জমে জমে ঘোলাটে হয়ে আসছিলো চোখদুটো। সাদিক এবার কণ্ঠ নরম করে বললো,
—” আমাগো জীবনটারে নতুনভাবে সাজাতে হইবো কনিকা। তুই শুধু একটু ধৈর্য ধর।”
কনিকার দৃষ্টি তখনও অস্ফুট। মনে হলো কথাগুলো ঠিকমতো কানে পৌঁছালেও হৃদয়ে পৌঁছাচ্ছে না। সে কেবল মিনমিন করে বলল,
—” আমি ভয় পাই সাদিক ভাই…খুব ভয় পাই। শহরে গেলে তুমি আমারে ভুলে যাইবা না তো?”
সাদিক চমকালো, ভড়কালো, স্তব্ধ হলো সহসা৷ তাকালো কনিকার দিকে। বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়েই রইলো। তার এমন বিমূর্ত দৃষ্টি দেখে কনিকা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো,
—” বাবা মা আমার খোঁজ নিতেছে না কেন সাদিক ভাই? আমি কি মইরা গেছি? সবাই কি আমারে ভুইলা গেলো? আমার তো এখন কেও নাই তাইলে!”
সাদিকের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো কনিকারের কথায়। সে তড়িঘড়ি করে দু’হাত দিয়ে কনিকারের মুখটা তুলে দিলো। অশ্রু ভেজা চোখদুটো সরাসরি তার চোখের ভেতর ঢুকে গেল।
—” চুপ কর! এইসব বাজে কথা আর কইস না। তুই কেমন কইলি তুই একা? আমি কি নাই তোর জন্য? আমি কি তোর পাশে নাই? তোরে যদি কেও ভুইলাও যায়, আমি পারব?”
কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো সাদিকের। সে জোরে মাথা নাড়লো।
—” আমি তোরে ভুইলা গেলে আমারে মানুষ কইবা কেমনে? আমি যদি না থাকি, তোরে রাইখা দুনিয়ার মানে আমার কাছে শূন্য।”
কনিকা কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করলো, কিন্তু ব্যর্থ হলো। হঠাৎই মাথাটা ঝুঁকিয়ে সাদিকের বুকের ওপর রাখলো। বুকের ভেতরটা যেন শান্তির জন্য হাহাকার করছে। সাদিক হতবাক হলেও শক্ত করে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো কনিকাকে।
—” ভয় পাস না। সাতদিন বাদে আমি ফিরমু, তোরে নিয়া যামু। তুই শুধু বিশ্বাস রাখ। দুনিয়ার যা-ই হোক, আমি তোরে ছাইড়া যামু না। এ কথা আমার জীবন দিয়া রাখমু।”
কনিকারের বুক কেঁপে উঠলো সাদিকের কণ্ঠে এমন দৃঢ়তা শুনে। তবু চোখ বুঁজে ফিসফিস করে দোয়া করল সাদিকের জন্য। অন্তত এতদিনে সে এটা বুঝেছে যে সাদিক না থাকলে সে মরেই যেত। আজ এই মানুষ টা আছে বলেই সে এখনো বেঁচে আছে। কনিকা ছোট। তবে এতটাও ছোট নয় যে বিয়ের মানে বোঝে না। তাই সে এটুকু জানে সাদিক তার জীবনে এমন এক মানুষ হয়ে গিয়েছে যার সাথে তাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকতে হবে।
শ্রাবণ গাড়ির স্টিয়ারিং চেপে ধরে নির্বাক বসে আছে। চারপাশে মানুষের শব্দ, রোদ্দুর, যানবাহনের হর্ন সবই যেন তার কানে ভেসে ভেসে আসছে দূর থেকে। জিহানের বাড়ির ভেতর যা দেখেছে, যা শুনেছে, সেটা এখনো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। জিহানের উন্মাদ চোখ, পাগলের মতো কণ্ঠ, বুক ভেঙে কান্না তার ভেতরটা ছিঁড়ে ফেলেছে। বুক ধড়ফড় করছে, শ্বাস ভারী হয়ে আসছে। হঠাৎ মনে হলো গাড়ির ভেতর অক্সিজেন নেই, সব শূন্য হয়ে গেছে। শ্রাবণ দু’হাত দিয়ে চুল চেপে ধরে মাথা নামিয়ে রাখলো। কণ্ঠ ভেঙে ফিসফিস করে বললো নিজের সাথেই,
—” এটা কেমন খেলা আল্লাহ? এভাবে সবকিছু ভেঙে পড়ছে কেন? মুনিরা এভাবে…এটা কীভাবে সম্ভব?”
চোখের সামনে ভেসে উঠলো জিহানের অস্থির মুখ, ঘরের ছন্নছাড়া অবস্থা,সেই পাগলামি ভরা চোখদুটো, আর জিহানের মুখে শোনা সেই ভয়ানক রাতের কাহিনী। গা শিরশির করে উঠলো শ্রাবণের। গাড়ি স্টার্ট দেওয়া হাতটাও কেঁপে উঠলো। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অশনি সঙ্কেত বাজতে লাগলো। এই ঘটনার পেছনে কোনো অন্ধকার সত্যি লুকিয়ে আছে।
শ্রাবণের একবার মনে হলো সে এসবে ধারা কে জড়াবে না। তবে না জড়িয়েও কোনো উপায় নেই। তাই সে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এক হাতে ফোন তুলল, ধারার ফোনে মেসেজ পাঠালো তৎক্ষনাৎ,
—” তুমি একটু তৈরী হয়ে নাও। বাইরে যেতে হবে। দুপুরে বাইরেই খাব আমরা।”
মেসেজ টা পাঠিয়ে বড় করে শ্বাস নিল শ্রাবণ। স্বাভাবিক হলো সে। অকারনে এমন অস্থির হওয়া যাবে না। ঠান্ডা মাথায় সবকিছু করতে হবে। এদিকে শ্রাবণের কথা শুনেছে ধারা। দ্রুত তৈরী হয়ে বসে রইলো, অপেক্ষা করতে থাকলো শ্রাবণের। দশ মিনিটের মধ্যে বাড়ির সামনে এসে পৌঁছালে ধারা নেমে আসে।
সাদা রঙের কুর্তি পরিহিত ধারা কে দেখেই ঢোক গিলে শ্রাবণ। মেয়েটা একটুখানি সাজলেই কেমন যেন অন্যরকম সুন্দর হয়ে যায়। তাক লেগে যায় শ্রাবণের। চুল খোপা করতে করতে এগিয়ে আসা ধারার দিকে চোখ রেখে শ্রাবণ বিড়বিড় করে,
—” এই মেয়ে আমায় খুন করেই ছাড়বে! ”
ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলায় শ্রাবণ। অবাধ্য মনটা নিষিদ্ধ চাওয়া-পাওয়ার খেলায় মাতোয়ারা হয় বারবার। এসবে সায় দেয়া যাবে না এখন। সঠিক সময় আসে নি যে। ঠোঁট ভিজিয়ে সেদিকে তাকায় শ্রাবণ। এর মধ্যে ধারা এসে বসে পড়ে গাড়িতে। শ্রাবণ এবার গাড়ির দরজা ঠিকমত লক করে ধারার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
—” একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে বুঝলে। তোমায় দরকার!”
ধারা বাধ্যের মত মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলো। গাড়ি চলতে শুরু করল। হুট করে শ্রাবণের মনে পড়ল সে তো কালকে ধারা কে দুটো জায়গায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এর মধ্যে একটা জায়গায় সে চাইলে এখনই নিয়ে যেতে পারে। যেহেতু ধারা বাইরে এসেছেই, তাই কাজটা সেড়ে ফেলাই মঙ্গল। তাই শ্রাবণ একটু গলা খাঁকারি দিয়ে ডেকে উঠলো,
—” ধারা?”
ধারা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। শ্রাবণের ডাকে হুঁশ ফিরলে সাড়া দিলো,
—” হু?”
শ্রাবণ এবার সামনে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করে,
—” তুমি পড়াশোনা করবেনা?”
শ্রাবণের কথায় মুখ কুঁচকে ফেলে ধারা। তার কাছে সবচেয়ে বিরক্তকর জিনিস এটা। সে সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
—” না! ”
অবাক হলো শ্রাবণ। এই মেয়ে বলে কী. গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলল,
—” কেনো? ”
ধারা মুখ কুঁচকে রেখেই মিনমিন করে বলল,
—” ভালো লাগেনা! ”
শ্রাবণ পড়ল বিরাট বিভ্রান্তিতে। এই মেয়ে বলছে কী এসব? হতবিহ্বল হয়ে মুখ ফঁসকে বলেই উঠলো,
—” ভালো লাগে না বললে তো হবে না। এমন করলে আমার ফুটবল টিমকে এ বি সি ডি শেখাবে কে? ”
বোঝেনি ধারা। তাই চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” ফুটবল টিম মানে? ”
মুখ ফঁসকে এমন কথা বলায় চোখ খিঁচে বন্ধ করেছিল শ্রাবণ। বোকা মেয়েটা বোঝেনি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলল, আর আড়চোখে তাকিয়ে ধীরে বলল,
—” কিছু না! ”
তবে ধারা নাছোড়বান্দা, তাই জোর গলায় বলল,
—” বলুন কী বলছিলেন? কাকে কী শেখাতে হবে? আমি ফুটবলার দের কেনো শেখাব?”
শ্রাবণ ঠোঁট কামড়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলো। ধারা যে এতটা খুঁটিনাটি ধরে বসবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি। হালকা হেসে গলা নামিয়ে বলল,
—” আরে না, বিষয়টা তেমন না। আমিও তো ফুটবল খেলি না। তবে আমার টিমের কয়েকজন ছোট ভাই আছে, ওরা ফুটবল খেলে। ইংরেজি পড়তে পারে না ঠিক মতো। তাই ভেবেছিলাম…তুমি যদি ওদের একটু সাহায্য করো।”
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। অবিশ্বাস ভরা গলায় বলল,
—” আমি? আমি কেনো? আমি কী শিক্ষক নাকি?”
শ্রাবণ এবার মুচকি হেসে এক ঝলক তাকালো ধারার দিকে। নরম গলায় বলল,
—” তুমি তো আমার স্ত্রী। আমার স্ত্রীর কাছে যদি আমি এইটুকু না চাইতে পারি, তবে আর কার কাছে চাইবো? ওরা সবাই গরিব বাড়ির ছেলে, টিউশনি করার সামর্থ্য নেই। তুমি পড়াশোনা তো ভালোই জানো। তাই ভেবেছিলাম, যদি তুমি একটু সময় দাও…”
শ্রাবণ কথাটা মজা করেই বলল। অথচ, ধারা ঠোঁট ফুলিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো। বেশ খানিকটা নীরবতা টেনে নিয়ে হঠাৎ বলল,
—” কিন্তু আমি পড়াতে চাই না!”
শ্রাবণ এবার জোরে হেসে উঠলো। তার হাসিতে ধারা আরো বিরক্ত হয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। শ্রাবণ হাসি চেপে গম্ভীর সুরে বলল,
—” আচ্ছা ঠিক আছে, পড়াবে না। তবে একটা প্রশ্ন আছে, তুমি যদি পড়াশোনা না করো, আবার না পড়াও, তাহলে তুমি সারাদিন করবে কী?”
ধারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
—” আমি? আমি ঘুমাবো, আপনার সাথে গল্প করব, ঘুরব , আর…আর…!”
শ্রাবণ এবার খিলখিল করে হেসে উঠলো। তার চোখে-মুখে খুনসুটির ঝিলিক ফুটে উঠলো। স্টিয়ারিং এ হাত রেখে ধীরস্বরে বলল,
—” আর আমার সাথে প্রেম করবে?”
ধারা আঁতকে উঠে জ্বিভ কাঁমড়ে বলল,
—” ছিঃ ছিঃ নাউজুবিল্লাহ। ওসব বাজে কাজ করব না!”
ধারা এমন ভাবে বলল যেন এর থেকে বাজে কাজ হতেই পারে না। এই কথা সে ভুলেও শুনবে না। ধারার এমন অঙ্গভঙ্গি দেখে মুখ কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” বাজে কাজ মানে? প্রেম কি বাজে কাজ?”
ধারা তৎক্ষনাৎ মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ অবশ্যই! আপনি জানেন না? ছিঃ ছিঃ, ওসব কথা বলবেন না। মানুষ শুনলে খারাপ বলবে!”
শ্রাবণ হালকা অবিশ্বাস নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়ে কি বোকা, নাকি সে-ই পাগল হয়ে গেছে। কী বলছে এসব? ধারার ভ্রু কুঁচকানো মুখ দেখে অবশ্য আরও মজা পাচ্ছে শ্রাবণ। সে এবার ধীরে ধীরে গলা নামিয়ে বলল,
—” আচ্ছা, মানুষ শুনে খারাপ বলবে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু মানুষ যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি কাউকে ভালোবাসো, তখন কী উত্তর দেবে?”
ধারা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে গিয়েও যেন গিলে ফেলল। তারপর হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো,
—” আমি এসব বাজে প্রশ্নের উত্তর দিই না। আমার মাথায় শুধু পড়াশোনা, বুঝেছেন? প্রেম-ভালোবাসা কিছু না!”
শ্রাবণ একটু ঝুঁকে ওর মুখের কোণটা দেখতে চাইলো, যেন সেখানে কোনো সত্য লুকানো আছে। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
—” তাই নাকি? এই না বললে পড়াশোনা করবে না?”
ধারা এক লাফে সিট থেকে সোজা হয়ে বসল। সে এবার নিজেই নিজের কথায় ফেঁসে গেছে। সে এবার মিনমিন করে বলল,
—” পড়াশোনা করব না তো। ভালো লাগেনা।”
শ্রাবণ এবার আর হেসে থামতে পারল না। ওর গম্ভীর পুরুষালি হাসি গাড়ির ভেতর ভরে উঠলো। তারপর হালকা সুরে বলল,
—” তুমি এসএসসি দিয়েছো তাই না?”
ধারা মাথা ঝাঁকিয়ে এমন ভাবে হ্যাঁ বলল যেন এটাই অনেক কঠিন কাজ। অথচ শ্রাবণ মাথা নেড়ে বলল,
—” হুম। তাহলে তোমায় একটা ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দেব আমি।”
ধারা হা করে তাকালো শ্রাবণের দিকে। জেদ ধরে বলল,
—” আমি পড়ব না, শেখ সাহেব!”
—” আপনাকে পড়তে হবে, ম্যাডাম!”
শ্রাবণ আদুরে ভঙ্গিতে বলল।
ধারা এবার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটু হেসে বলল,
—” আপনি আমায় কলেজে নিয়েই যেতে পারবেন না।”
শ্রাবণও একটু ভাব নিয়ে বলল,
—” আমরা তোমার কলেজের রাস্তাতেই যাচ্ছি এখন! ”
ধারা এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে চুপ করে রইল। মাথা নিচু করে আড়চোখে তাকাল শ্রাবণের দিকে। তাকে হাসতে হাসতে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধকধক করে উঠলো। শ্রাবণ আঙুলে স্টিয়ারিং ঠুকে ধীরে ধীরে যোগ করল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৭
—” কলেজের প্রিন্সিপাল বাবার পরিচিত বুঝলে। তোমায় ভর্তি করিয়ে নেবে বলেছে। আর কলেজটাও অনেক ভালো। আজ নিয়ে যাব শুধু দেখা করানোর জন্য। আগামী মাস থেকে কলেজ শুরু করে দেবে তুমি। আমি এর মধ্যে কাগজপত্র রেডি করে ফেলব। অন্তত ইন্টার পাশ তো করতেই হবে তোমায়!”
