Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৯

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৯

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৯
অনামিকা তাহসিন রোজা

পৃথিবীর সবকিছুরই সহ্যসীমা রয়েছে। সুখের সীমা যেমন বাঁধাহীন হলে অনেক সময় সুখকর হয়না, তেমনই বিরহের সীমা বাঁথাহীন হলে তো কোনো কথাই নেই। তা হয় সবচেয়ে বেশি অসহনীয়। ইকরা তাই আর নিজের কষ্ট বাড়াতে চাইলো না। দেশে পা রাখার আগে ভেবেছিল এখানেই পার্মানেন্টলি থেকে যাবে। প্রিয় মানুষটার সাথে সংসার করে জীবন কাটিয়ে দেবে অনায়াসে। কিন্তু সবসময় তো মানুষের চাওয়া পাওয়া পূর্ন হয় না৷ আধুরা থেকে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। কারণ প্রকৃতির খেলা অত্যন্ত ভয়ানক। অত্যন্ত কষ্টকর, যা অদ্ভুত হলেও বাস্তব।

তাই ইকরাও আর দেশে থেকে মরিচীকার পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করতে চাইল না। বিকেলেই বেরিয়ে পড়লো শেখ বাড়ি থেকে। রওয়ানা দিলো আবারো আগের সেই উদ্দেশ্যে। রিক্ত মন, অতৃপ্ত হৃদয় নিয়ে ফিরে গেলো হতাশ হয়ে। তবে তাই বলে যে সে খারাপ থাকবে এমন টা নয়। নিজের মত করে নতুন জীবন গুছিয়ে নেবে বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। হাসিমুখে শ্রাবণ এর কাছে বিদায় নিয়েছে। দোয়া চেয়েছে সামিউল শেখের কাছে। সামিউল শেখ এবং সালমা বেগম দুজনেই এক অপরের দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। কারন তারাও নিরূপায়।
সন্ধ্যার পরপরই সামিউল শেখ ঘরে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলেন। এদিকে সালমা বেগম রান্নাঘরে স্যুপ বানাতে ব্যস্ত। একটু আগে খবর পেয়েছেন যে ধারা অসুস্থ। তাই আর ডাকেনও নি। এদিকে শ্রাবণ পড়েছে অত্যন্ত দুশ্চিন্তায়। সূর্য ডোবার পরে এই হেমন্তের শেষকালে এমন সিজনাল জ্বর হওয়া স্বাভাবিক, ঠান্ডা অনুভব করাও স্বাভাবিক। কিন্তু ধারার জ্বর মোটেই ভালো লাগলো না শ্রাবণের। সে ভীষন সতর্ক এসব নিয়ে। তাই ভাবলো ডক্টর ডেকে নেবে, যা শুনে সালমা বেগম যেন আকাশ থেকে পড়লেন। হতবাক হয়ে বললেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” তুই কি মেয়ে টাকে আরো অসুস্থ বানাতে চাইছিস? ওসব ডক্টরের দরকার নেই। আমি আদা, লেবু দিয়ে কড়া লিকারের এক কাপ চা বানিয়ে দেব ওকে। গরম গরম স্যুপ করেছি। সেসব খাবে। রাতেই সুস্থ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আজকের রাতটা দেখতে দে। পরে না হয় ডক্টর দেখাস।”
কিন্তু শ্রাবণ শেখ অত্যন্ত অবাধ্য হলো এ বিষয়ে। কথা না শুনে জেদ করে কল করলো ডক্টরের নাম্বারে। সাবরিনা চৌধুরী, মহিলা ডক্টর তিনি। শেখ বাড়ির পারিবারিক ডক্টরও বলা যায়। যখন তখন যেকোনো সমস্যা তেই তাঁরা ডক্টর সাবরিনার কাছেই কম্ফোর্ট পায়। এছাড়াও, সালমা বেগমের কলেজ লাইফের বান্ধবী তিনি। সালমা বেগম আর দ্বিরুক্তি করলেন না। ছেলের জেদের কাছে বরাবরই হেরে গিয়েছেন তিনি। বরং দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে চলে গেলেন। স্যুপ করা শেষ হয়েছে, তাই বাটিতে ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করলেন,

—” ধারা কি শুয়ে আছে?”
শ্রাবণ বলল,
—” না, ঘুমিয়েছে।”
সালমা বেগম যেন আঁতকে উঠলেন। তিনি তড়িঘড়ি করে ট্রে তে স্যুপ আর পানি নিয়ে শ্রাবণের ঘরে যেতে যেতে বলে উঠলেন,
—” তুই সাবরিনা কে ডাক তাহলে। আমি ধারাকে স্যুট টা খাইয়ে দিয়ে আসি। এটা খেলে ভালো লাগবে। খালি পেটে কেও ঘুমায় নাকি! তাও আবার অসুস্থ!”
শ্রাবণও মাথা নেড়ে নীরবে সম্মতি দিল। সাথে ডক্টর সাবরিনাকেও খবর দিলো। ভদ্রমহিলা জানালেন তিনি দশ মিনিটের মধ্যে শেখ বাড়িতে এসে পৌঁছাবেন।

সালমা বেগম ঘরে এসে ধারাকে আলতো করে ঝাঁকিয়ে ডাকতে শুরু করলেন,
—” বউমা! মা, ধারা! ওঠো দেখি মা। আগে স্যুপ টা খেয়ে নাও দেখি। ওঠো।”
ধারার ঘুম হালকা। এক ডাকেই ত্বরাক করে উঠে পড়ার কথা তার৷ কিন্তু এখনো তার কোনো সাঁড়া
শব্দ না পেয়ে চিন্তিত হলেন সালমা বেগম। তিনি এবারে ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে আরেকটু জোরে ডাকতে শুরু করলে, প্রায় পাঁচ মিনিটের মাথায় চোখ খুলে ধারা। পিটপিট করে তাকায় আশেপাশে। সালমা বেগম কে দেখে জিনিস করে,

—” কী হয়েছে মা?”
সালমা বেগম হাতে থাকা ট্রে টা ধারার সামনে তুলে ধরে বলে ওঠে,
—” তোমার জন্য স্যুপ বানিয়েছি। গরম গরম স্যৃুপটা খেয়ে নিয়ে তারপর বিশ্রাম নাও দেখো, ভালো লাগবে।”
এতক্ষণ ধারা ঠিকই ছিল। এমনকি ঘুম থেকে উঠে অর্থাৎ চোখ খোলার পর সালমা বেগমকে দেখেও অত আঁতকে ওঠেনি, কিন্তু তার মুখের সামনে স্যুপের বাটি টা রাখা মাত্রই কেমন যেন পেট গুলিয়ে উঠলো ধারার। মাংসের গন্ধ পেয়ে রীতিমতো পেটের ভেতর গোলমাল লেগে গেল, মাথা ঘুরে উঠল। সে বুঝতে পারল বমি হতে পারে। কিছু বোঝে উঠার আগেই সাথে সাথে মুখ চেপে ধরে সে দৌঁড় দিল ওয়াশরুমের দিকে।

সালমা বেগ কিছুক্ষণের জন্য হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বুঝতে পারলেন না কী হয়েছে। এর মধ্যেই ধারা দ্রুত দরজা খুলে বেসিনে হেলে পড়ল। বমি করে ফেলল গড়গড় করে। যদিও পেটে তেমন কিছু ছিল না তার, কিন্তু যা ছিল সব বের করে দিয়ে একদম পেট ফাঁকা করে ফেরেছে। অনেকটাই কষ্ট হলো ধারার। মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল তার বাজে অবস্থা টা।
ওয়াশরুমের দরজা হা করে খোলা থাকায় সালমা বেগম পুরো দৃশ্যটা দেখতে পেলেন। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করলেন বিষয়টা। এরপরে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে এগিয়ে গেলেন ওয়াশরুমের দিকে। বেসিনের কাছে এসে ধারার কাঁধে হাত রেখে বললেন,

—” তুমি ঠিক আছো?”
ধারা মাথা নেড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে দ্রুত মুখ হাত ধুয়ে ফেলল। ফ্রেশ হয়ে হাত মুখ মুছতে থাকলো টাওয়াল দিয়ে। সালমা বেগম ঠোঁট কাঁমড়ে হুট করে জিজ্ঞেস করলেন,
—” তোমার কি খাবারের গন্ধে বমি পাচ্ছে ধারা?”
নাক মুখ কুঁচকালো ধারা। ঢোক গিলে বিরক্তির ভাব নিয়ে বলল,
—” হ্যাঁ মা। কি যে হয়েছে আমার। রুচির কোনো সমস্যা হতে পারে। কিন্তু মাংসের গন্ধে আরো কষ্ট হচ্ছে। বারবার পেট গুলিয়ে যাচ্ছে।”
সালমা বেগম ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু একটা ভেবে তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করলেন,

—” কবে’ থেকে হচ্ছে এমন?”
ধারা একটু ভেবে বলল,
—” গত পরশু থেকে।”
সালমা বেগম আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেন। কিন্তু তার আগেই শ্রাবণ দরজায় নক করে ডেকে উঠলো,
—” মা, সাবরিনা আন্টি চলে এসেছে।”
ধারা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল সালমা বেগম কে,
—” সাবরিনা আন্টি কে?”
সালমা বেগম হেসে বললেন,

—” ডক্টর। আমার বান্ধবী। তোমার চেকআপ করতে এসেছে। ঘরে চলো। দেখি কী বলে।”
বলেই ধারাকে নিয়ে ঘরে আসলেন তিনি। বসিয়ে দিলেন বিছানা তে। ধারা যন্ত্রের মত বসে পড়লো। সামান্য জ্বরের জন্য ডাক্তার কে ডাকে তাই ভেবে পেলো না। যদি তাকে ইনজেকশন দেয়? ইনজেকশনের কথা মনে পড়তেই ভয়ে তটস্থ হয়ে গুটিয়ে গেলো ধারা। অসহায় নেত্রে তাকালো শ্রাবণের দিকে। মিনমিন করে বলল,
—” আমি কিন্তু ইনজেকশন দিতে দেব না!”
বিধিবাম! আবারো শ্রাবণের কাছে রামধমক খেলো বেচারি ধারা। অগত্যা তাকে চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মত বসে থাকতে হলো। সেও বসে রইলো চুপচাপ।
ডক্টর সাবরিনা এসে শ্রাবণ ও সালমা বেগমকে শান্ত হতে বলে ভদ্র হাসি দিলেন। বয়স চল্লিশের কোঠায়, কিন্তু অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর চোখে মুখে স্পষ্ট। ব্যাগ খুলে একের পর এক যন্ত্রপাতি বের করতে করতে হালকা গলায় বললেন,

— “জ্বর কতোদিন?”
সালমা বেগম উত্তর দিলেন,
— “আজ সকাল থেকেই, কিন্তু দুপুরের পর থেকে শরীর গরম আর দুর্বল লাগছে। একটু আগে স্যুপ দিতে গিয়েছিলাম, গন্ধেই বমি করে দিল।”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকালো ধারার দিকে। ডক্টর সাবরিনা চৌধুরী হালকা ভ্রু কুঁচকালেন। কাগজে কিছু নোট নিতে নিতে ধারার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “তুমি একটু হাত বাড়াও তো।”
ধারা ভয়ে ভয়ে হাত বাড়ালো। তার হাতের শিরা চেপে ধরতেই ধারার শরীর কেঁপে উঠলো সামান্য। সাবরিনা চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ফিল করলেন, এরপর ধারার মুখ দেখে মাথা নেড়ে হালকা হাসলেন,

— “মাইল্ড ফিভার। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অন্য কিছু কারণও থাকতে পারে।”
তিনি এরপর স্টেথোস্কোপ লাগালেন ধারার বুকে, কয়েক সেকেন্ড শুনলেন। তারপর বললেন,
— “শরীরে পানি কম। নরমাল প্রেসার। কিন্তু মুখ ফ্যাকাশে… তোমার কি শরীর দুর্বল লাগে?”
ধারা মাথা নাড়ল ধীরে। শ্রাবণের ইচ্ছে করলো গিয়ে ঠাস করে মেয়ে টাকে একটা থাপ্পড় মারতে। যেভাবে অবাধ্যের মত না খেয়ে ঘোরাঘুরি করে, তাতে শরীরে তো পানি কম হবেই। দুর্বল তো লাগবেই। ধারা মিনমিন করে বলল,
—” না আমি অনেক ভালো ছিলাম। গত পরশু থেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনো কাজ করতে গেলেই মাথা ঘোরে।”
সাবরিনা এবার কলম থামালেন। খানিকটা সময় নিলেন চিন্তায় ডুবে। তারপর মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

— “তুমি কি ক্লান্ত লাগলে গন্ধে বমি পাচ্ছো? যেমন চা, মাংস, কিংবা পারফিউম?”
ধারা বিস্ময়ে তাকালো, ঠিক তাই তো!
— “হ্যাঁ, একদম তাই… বিশেষ করে মাংসের গন্ধে সহ্য হয় না।”
সালমা বেগম পাশ থেকে উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন,
— ” সাবরিনা, এটা কি জ্বরের লক্ষণ? ডেঙ্গু হলো নাকি আবার?”
সাবরিনা মৃদু হাসলেন। গলার স্বর নামালেন কিছুটা, সাবধানি ভঙ্গিতে বললেন,
— “না না, ওসব কিছু না। স্বাভাবিক জ্বর। তবে এটা শুধু জ্বরও না। আমি একটু প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছি, আর একটা ছোট টেস্ট করতে হবে কাল সকালে। তাহলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে বিষয়টায়।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

—” মানে?”
ডক্টর সাবরিনা এবারে সবকিছু গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। শ্রাবণের কাঁধে হাত রেখে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—” গুড লাক বয়। একদম বড় হয়ে গেছো। আরো বড় হও। দোয়া থাকবে।”
সালমা বেগম একটু বুঝলেও নিশ্চিত হতে পারলেন না।৷ শ্রাবণ অবুঝের মত তাকিয়ে থাকলো। এখানে হচ্ছে টা কী? সালমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
—” কীসের টেস্ট করতে বললে সাবরিনা?”
ধারাও অবাক হয়ে তাকালো ভদ্র মহিলার দিকে। জিজ্ঞেস করলো,

— ” হ্যাঁ! কী টেস্ট?”
সাবরিনা চুপচাপ তাকালেন ধারার চোখের দিকে। তারপর আলতো গলায় বললেন,
— ” তোমার শ্বাশুড়ি জানে কীসের টেস্ট! আমি আজ বরং যাই। মিষ্টি খেতে কাল আসব আবার।”
শ্রাবণ এবারে বাধ্য হলো জোর করতে। সাবরিনা চৌধুরী কে আটকিয়ে বলল,
—” কীসের মিষ্টি? আগে বলুন না, ওর কী হয়েছে?”
সাবরিনা চৌধুরী হেসে বললেন,
—” আরেহ বাবা কুল ইয়াং ম্যান। এত তাড়া কীসের?”
ধারাও কিছু একটা বলতে চাইলো, কিন্তু বলার আগেই ডক্টর নিজেই সালমা বেগম কে উদ্দেশ্য করে মিষ্টি হেসে বললেন,

—” কংগ্রাচুলেশনস! দাদি হতে চলেছো। অবশেষে নাতি-নাতনিদের মুখ দেখতে পারবে।”
বিস্ফোরণ ঘটে গেলো ঘরটায়। ধারার নিঃশ্বাস প্রায় আটকে গেল। ওর চোখ দুটো মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল। গায়ের রঙ যেন আরো ফ্যাকাসে। গলা শুকনো, ঠোঁট কাঁপছে। কোনোমতে হা করে তাকালো শ্রাবণের দিকে। বরফের মতো স্থির, কিন্তু ভেতরে ঢেউ আছড়ে পড়ার মত অনুভূতি নিয়ে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল শ্রাবণ। চোখ বড় করে তাকালো ধারার দিকে। ও অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। হৃদপিণ্ড যেন একবার থেমে আবার চলতে শুরু করলো, ধারা…? সত্যি? সত্যি শ্রাবণ শেখ বাবা হতে চলেছে? সত্যি? কথাটা ভেবেও তগলায় আটকে গেল, কিন্তু দৃষ্টি নরম হয়ে ধারার দিকে ছুটে গেল। সব মিলিয়ে শ্রাবণের চেহারায় বিস্ময়, আনন্দ, ভয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর দমবন্ধ করা আবেগের ঝড় জেগে উঠলো, যেন পৃথিবীটা হঠাৎ অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে গেছে।

শ্রাবণ, ধারা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেও একমাত্র খুশিতে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন সালমা বেগম। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাঁর মুখে নিখাদ আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটলো মুহূর্তটা বোঝার আগেই উনি দু’হাতে মুখ চেপে জোরে বললেন,
—”আলহামদুলিল্লাহ! শুকরিয়া! হায় আল্লাহ! অবশেষে! আমি দাদি হবো.? আল্লাহ! অনেক অনেক শুকরিয়া!”
চোখে পানি চলে এসেছে ভদ্রমহিলার। চোখেমুখে এমন আনন্দ দেখে যে কেও খুশিতে হাসবে। তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ধারার মাথায় হাত রাখলেন, হাঁটু একটু কেঁপে উঠলো, মিশ্র অনুভূতির চাপে তাঁর গলা ভারী। তবুও তিনি চোখে পানি আটকে রেখে ধারার কপালে চুমু খেলেন৷ ধারা অনুভূতিশূন্য নয়নে শুধু তাকিয়েই রইলো। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে কী থেকে কী হয়ে যাচ্ছে। স্তব্ধ ধারার কপালে হাত বুলিয়ে সালমা বেগম হেসে বললেন,

—” তোকে যে কীভাবে আমি আদর করব রে মা! আমার তো মন চাইছে তোকে নিয়ে এখন আনন্দে মেতে উঠতে। আল্লাহ! আমি খুব খুশি হয়েছি।”
বলেই ডক্টর সাবরিনার কাছে গিয়ে সালমা বেগম বললেন,
—” কত মাস চলে বলতে পারবি?”
সাবরিনা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—” এভাবে টেস্ট না করে তো বলা সম্ভব নয়। কিন্তু বেশিদিন হয়নি। তবে সাবধানে থাকতে হবে এখন থেকে। আমি আসলে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছিনা। কাল হসপিটালে এসে আরেকবার চেকআপ আর টেস্ট করে যাক ওরা। এরপর সব সাজেশন দিয়ে দেব। বাট প্রাথমিকভাবে এটা শিউর যে ধারা শেখ মা হতে চলেছে।”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৮

শ্রাবণ নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে। কথাগুলো তার কানে যাচ্ছে, আর হাত পা অসাড় হয়ে যাচ্ছে। সালমা বেগম চোখের জল মুছলেন, এরপর সাবরিনা কে এখনি মিষ্টি খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে নিচে চলে গেলেন। ঘরে শুধু শ্রাবণ আর ধারা হতবাক হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে বিস্ময়ভরা নয়নে একে অপরের দিকে তাকিয়েই রইলো। সবচেয়ে বেশি চমক টা পেয়েছে শ্রাবণ। তার মাথা এখনো কাজ করছে না। কী করা উচিত তাও বুঝতে পারছে না। শুধু উপলব্ধি করতে পারছে, সে বাবা হবে, সে বাবা হতে যাচ্ছে। এটা ভেবেই পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তার অংশ, তার অস্তিত্ব এখন ধারার গর্ভে? ধারার কোল আলো করতে, শেখ বাড়ির পূর্ণতা দিতে তাদের সন্তান পৃথিবীতে আসছে?

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৫০