শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৫১
অনামিকা তাহসিন রোজা
শহরে ফিরে এসে এত বড় একটা সুখবর শুনে রীতিমতো তব্দা খেয়েছিলেন সামিউল শেখ। তিনি অত্যন্তই অবাক হয়েছেন, আর এটাই স্বাভাবিক। এমনকি সালমা বেগমের অনুপ্রেরণায় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাড়িতে দুদিন পর একটা বিরাট আয়োজন করবেন। অনেকদিন হলো আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। এ বিষয়ে সামিউল শেখ অত্যন্ত সতর্ক। তিনি মেহমানদের সেবা করতে অত্যন্ত পছন্দ করেন। এ বিষয়ে তার রয়েছে চমৎকার মন মানসিকতা। যুবক বয়সে সংসারের প্রথমে তিনি প্রায়ই মাসে মাসে আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করে বাড়িতে এনে খাওয়াতেন। ছোট ছোট আয়োজন ছিল শেখ বাড়ির নিত্য এক ঘটনা। কিন্তু অনেকদিন হলো এসব আর হয় না। সামিউল শেখের বয়স হয়েছে, পরিবেশে বদলেছে, তাই কাউকে দাওয়াত দিয়ে বাড়িতে খাওয়ানো হয় না। সেসব মেলামেশা নেই বললেই চলে। গত মাসে অবশ্য তিনি একবার ভেবেছিলেন এমন কিছু আয়োজন করবেন, আর এখন ধারার মা হওয়ার সংবাদটা শুনে তিনি আর কোনো কিছুই ভাবলেন না। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন দুদিন পরই বাড়িতে বিরাট এক আয়োজন হবে, যেখানে সকল আত্মীয়রা আসবে, খাওয়া-দাওয়া হবে, আনন্দ হবে এবং সবাই ধারাকে দেখে যাবে, দোয়া করে যাবে তার জন্য।
সালমা বেগম উৎফলিত হয়ে উঠলেন। ধারাও এ বিষয়ে দ্বিমত করেনি। সেও অত্যন্ত খুশি হলো। ভীষণ আগ্রহী হলো বিষয়টিতে। এর আগে কখনো এমন আয়োজন দেখেনি সে। তাই বাড়িতে লোকজনের সমাগম হলে তার বেশ ভালই লাগবে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হলো শ্রাবণ শেখ। তার মতে তার মুরগির ছানার মত বউ এখন পেটের মধ্যে আরেকটা হাঁসের ছানা নিয়ে ঘুরঘুর করছে। এর মধ্যে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে গিজগিজ করলে তার বউ হাঁটবে কোথায়.? গড়াগড়ি করবে কীভাবে? এমনিতেই মাশআল্লাহ তার বউ উষ্টা খাওয়াতে চমৎকার পারদর্শী। যেখানে সেখানে যখন তখন এভাবে সেভাবে উষ্টা খাওয়াতে গত সপ্তাহতেই নোবেল জিতেছে ধারা, এই মনে করে শ্রাবণ শেখ। এই জন্য সে অত্যন্ত চিন্তিত ধারা কে নিয়ে। হয়তো অনেকেই শুনলে বলবে, শ্রাবণ শেখ তার নিজের সন্তানের জন্য চিন্তিত। কিন্তু না! আসলে শ্রাবণ শেখ তার বউকে নিয়েই চিন্তিত। ব্যাঙের ছানার মত, ব্যাঙাচির মত লাফালাফি করা, তার বউয়ের একটা সুন্দর ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্য, যা তার সবচেয়ে বেশি অপছন্দ।
এই বিষয়ে জরুরি কথা বলার জন্য সালমা বেগমের কাছে গেল শ্রাবণ শেখ। গলা উঁচিয়ে বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” বাড়িতে এত লোকজন আসলে ধারার সমস্যা হবে মা। ও এমনিতেই ব্যাঙাচির মত লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। এখন আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করলে এটা সেটা করতে যাবে, মেহমানদারী করতে যাবে, তখন উষ্ঠা খেয়ে পড়ে একটা বিপদ ঘটিয়ে ফেলবে।”
সালমা বেগম মুখ কুঁচকে হাসলেন। ছেলের মাথায় গাট্টা মেরে বললেন,
—” মোটেই না। আমি আছি না? ওকে কোন কাজ করতেই দেবো না। সব কাজ তো আমি করব। আগে এসব কম করেছি নাকি? তুই তো নিজেই দেখেছিস। তুই যখন ছোট ছিলি, ছোট ছোট বিষয়ে তোর বাবা এভাবে আয়োজন করত। আর সকলে এসে খাওয়া দাওয়া করত, আনন্দ করত, আমার তো ভালোই লাগতো। কতদিন হলো এসব আর হয়না। বাড়িতে এরকম একটা আয়োজন করাই হয় না। এর মধ্যে আত্মীয়রা আসলে ভালোই হবে। বৌমাকে একটু দোয়া দিয়ে যাবে। মানুষের দোয়া যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা তুই পরে বুঝতে পারবি। ”
তবে শ্রাবণ মুখ কুঁচকে তাকালো। এ বিষয়ে সে মোটেই একমত হতে পারছে না। ছেলের এমন ভঙ্গি দেখে সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বলে উঠলেন,
—” তুই জানিস আমি কেনো ধারাকে এতটা আদর করি! কেনো এত ভালোবাসি বল তো?”
স্বাভাবিক ভাবে বললে হয়তো কারণ হিসেবে বলা যেত, ধারা শ্রাবণের বউ আর সালমা বেগমের কোন মেয়ে নেই, এই কারণে ভালোবাসেন। কিন্তু শ্রাবণ শেখ ভাবলো কিছুক্ষণ। এরপর বলল,
—” কারন দিয়ে ভালোবাসা হয় না মা। ভালোবাসা অকারনে বেশি হয়।”
সালমা বেগম হেসে ফেলেন ছেলের এমন কথা শুনে। বুঝলেন ছেলে বড় হয়েছে। বুঝতে শিখেছে, বাস্তবতা শিখেছে। তিনি বললেন,
—” ঠিক বলেছিস। কিন্তু ধারার জায়গায় অন্য কেও হলে কিন্তু আমি তাকে এত ভালোবাসতাম না। বিশেষত ধারাকে এতটা আদর করার, এতটা ভালবাসার একটা কারণ আছে।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—” কী?”
সালমা বেগম চিন্তিত হলেন। কোনো এক খেয়ালে ডুবে গেলেন। কিছু একটা ভেবে বললেন,
—” ছোটবেলা জিজ্ঞেস করেছিলি না? তোর নানা বাড়ি নেই কেন।”
শ্রাবনের ভ্রু শিথিল হলো। কোনো এক চিন্তাতে স্থির হলো সে। হ্যাঁ এমন কথা সে ছোটবেলার খুব বলতো, তার নানু বাড়ি নেই কেনো। ছোট থেকে শ্রাবণ দেখে এসেছে সালমা বেগম কখনোই বাপের বাড়ি যায়নি। এমনকি নিজের বাপের বাড়ির সম্পর্কে কখনো কোন কথা বলেনি। শ্রাবণ আজ পর্যন্ত জানেই না তার নানু বাড়ি নেই কেন? আর তার মা কোথায় থাকতো? তার নানু বাড়ি আসলে কোথায়? তার মায়ের জন্মস্থান, জন্ম পরিচয় কোনো কিছুই জানে না সে। বিষয়টা শুনতে একটু অদ্ভুত মনে হলেও এটা সত্যি।
প্রথম প্রথম এটা নিয়ে শ্রাবণ অনেক বেশি চিন্তা করতো। কিন্তু সময় পেরোনোর সাথে সাথে বড় হওয়ার পর থেকে একসময় এটা তার মস্তিষ্ক থেকে চলে গিয়েছিল। আজ হুট করে এমন একটা কথা বলায় শ্রাবণ স্তব্ধ হলো। জিজ্ঞেস করলো সন্দিহান কন্ঠে,
—” এখানে নানুর কথা আসছে কেনো মা? ”
সালমা বেগম আড়ালে চোখের পানি মুছলেন। ঠোট কামড়ে নিজেকে সামলে নিলেন ছেলের সামনে। অতীত নিয়ে তিনি কোন কথা বলতে চান না। তবুও আজ অল্প কিছু বলে ফেললেন,
—” ধারা বাবা- মা না থেকে এতিম, আর আমি বাবা-মা বেঁচে থাকতেও এতিম। বাবা-মা মরে গিয়ে পৃথিবীতে একা থাকার থেকে বেঁচে থেকেও তাদের হারিয়ে ফেলা বেশি কষ্টের। ধারার মতো আমি এতিম ছিলাম না। আমার বাবা ছিল। কিন্তু ভালো বাবা হতে পারেনি উনি। সারাদিন নেশা পানি করতো, আর মা কে মারধর করতো। তোর নানি কিন্তু ভালো একজন মা ছিল। এতকিছুর পরেও আমি যখন জন্ম নিলাম, তখন আমায় খুব আদর করতো। কিন্তু দিনে দিনে তোর নানার নেশাপানি করা একদম ভয়ানক পর্যায়ে চলে যায়। এমন করতে করতে একটা সময় তোর নানা অপরাধে জড়িয়ে যায়। গ্রামে কিছু খারাপ লোকজন ছিল, যারা ড্রাগ বিজনেস করতো। তোর নানা টাকার লোভে শেশে যুক্ত হয়ে যায় সেসবে, আর এই জগতে যারা চায় তারা তো আর সহজে ফিরে আসতে পারে না, যদি ফিরে আসতে হয়, তাহলে একটাই রাস্তা থাকে— মৃত্যু। নিমিষেই পুরো পরিবারটা ধ্বংসের মুখে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। তোর নানি যখন এসব জানতে পারল তখন আমায় নিয়ে চলে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু তোর নানা আবার আমাকে অনেক ভালোবাসতো।
যতই যা হোক না কেন, মাঝরাতে যখন বাড়ি ফিরতো, তখন এসে আমার কপালে একটা চুমু দিত, প্রতিদিন আসার সময় আমার পছন্দের খাবার নিয়ে আসতো। তাই মা যখন আমায় নিয়ে সংসার ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল, তখন বাবা রাজি হয়নি। বলেছিল, তুই গেলে যা, আমার সন্তানকে রেখে যাবি। শেষে কি হলো জানিস? আমার মা স্বার্থপরতার পরিচয় দিয়ে আমায় অমাবশ্যার এক রাতে বিছানায় ফেলে রেখে সত্যি সত্যি পালিয়ে গেল। কিন্তু টাকা ও তামাকের নেশা বড়ই ভয়ানক। অত্যন্ত বিপদজনক। একটা সময় বাবা আমায় আদর করা বন্ধ করে দিল, আগের মতো ভালোবাসতো না। নতুন করে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু করেনি বা করতে পারিনি। কিন্তু ড্রাগ, মদ ছাঁইপাশ এসব নেশা তো মানুষের মস্তিষ্ক খেয়ে ফেলে। তোর নানার মস্তিষ্কও একদম জম্বির মত হয়ে যায়।”
এটুকু বলে থেমে গেল সালমা বেগম। এক মুহূর্তের জন্য তার সারা মুখ কালো হয়ে উঠলো। হাত-পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করল। শ্রাবণ খেয়াল করল মায়ের অস্থিরতা। সে গিয়ে এসে সালমা বেগমের হাত ধরে বলল,
—” তারপর? তারপর কী হলো মা? ‘
সালমা বেগম ছলছল নয়নে ছেলের দিকে তাকালেন। এক হাত তুলে শ্রাবণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এরপরে শুকনো ঢোক গিলে বললেন,
—” এরপরে কী হয়েছে তা আমি তোকে বলতে পারব না বাবা। মা হয়ে বলতে পারব না। কিন্তু এমন কিছু হয়েছে যেটার জন্য আমি সেই মানুষটাকে, নিজের পিতাকে অসম্ভব ঘৃণা করি। নিজের পিতার রূপী জানোয়ারটাকে অসম্ভব ঘৃণা করি আমি। পারিনি রে। মাত্র সাত বছর বয়সে এমন ভয়ানক অভিজ্ঞতা সম্মুখীন হয়ে নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। মাঝরাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছি।”
শ্রাবণ রীতিমতো থমকে গেল। তার হাত-পা অসাড় হয়ে আসলো। চোখ বড় করে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে সে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো তার কথাগুলো। সে যা ভাবছে সেটাই যে সত্যি, এটা মেনে নিতেই যেন তার হৃদয় কেঁপে উঠল। কিন্তু কিছু করার নেই। বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়ংকর। শ্রাবনকে এতটা চমকে উঠতে দেখে সালমা বেগম চোখে পানি নিয়েই মলিন হাসলেন। এরপরে বলতে থাকলেন,
—” পালিয়ে আসার পর, যাওয়ার মতো কোনো জায়গা ছিল না। শেষে গিয়ে উঠলাম মামার বাড়িতে। একটা মাত্র মামা ছিল আমার। খুব আদর করত ছোট থেকে। যখন আশ্রয় চেয়েছিলাম, একটা কথাও বলেনি জানিস। আদরেই আশ্রয় দিয়েছিল আমায়। আমার মামাতো একটা বোনও ছিল। তার নাম হলো ধরণী। ও আমায় অনেক ভালোবাসতো। নিজে যা খেতো সব আমার জন্য আলাদা করে রাখতো। এত অভাবের পরেও আমার জন্য যদি কেও ভাবতো সেটা একমাত্র ধরনী। আমরা তো ছোটবেলায় একে অপরকে ছাড়া চলতামই না। রক্তের সম্পর্ক কিনা জানিনা, তবে অন্যরকম একটা টান ছিল আমাদের। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম সবসময় একসাথেই থাকবো। কিন্তু… পারিনি। যাকগে, আমি তখন মামার বাড়িতে থাকতে শুরু করলাম। সবচেয়ে আশ্চর্যকর কথা কি জানিস? মামি কখনো আমায় অত্যাচার করেনি। নিজের মেয়ের মতোই আগলে রেখেছিল। মাঝে মাঝে নিজে থেকেই আমি সব কাজ করে দিতাম।
বসে বসে খেতে বিবেকে বাঁধা দিত। এমন চলতে চলতে একটা সময় মামার বাড়িতে ভয়ানক অভাবের দেখা গেল। মামার চাকরিটা চলে গেলো। শেষে এতটাই অভাব চলছিল যে আমাকে কেনো, মামা নিজের সন্তানকে খাবার খাওয়ানোর জন্য টাকা টুকু জোগাড় করতে পারছিল না। আমার মামাতো বোনটা সারাদিন না খেয়ে থাকতো, এমনও দিন গিয়েছে। তবুও রাতে আমার হাত ধরে ধরনী জিজ্ঞেস করতো, “তোর কি খিদে পেয়েছে বুবু? অনেক কষ্ট হচ্ছে তাই না?” অথচ বেচারি নিজেই খিদেয় মরে যেত। বোন হওয়ার পাশাপাশি খুব ভালো বন্ধু ছিল ও আমার। আমার থেকে দু এক বছরের ছোট ছিল তো। আমি খুব করে আল্লাহর কাছে চাইতাম।
আমার জন্য যেন এই পরিবারকে ধ্বংস না হয়। আমি যে এই পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছি, সেটা বুঝতে পারছিলাম। এমন চলতে চলতে একদিন তোর দাদু আসে গ্রামে, ভাগ্যের খেলায় আমাকে দেখে তোর বাবার জন্য পছন্দ করে নিয়ে শহরে নিয়ে আসতে চায়। মামি রাজি ছিল, মামা আমার মত চেয়েছিল। আমি ধরনীর শুকনো মুখটার দিকে তাকিয়ে আর মামির ছেঁড়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে যাই। ধরনী খুব কেঁদেছিল, বলেছিল যেন আমি ওকে ছেড়ে না আসি। কিন্তু আমি পারিনি। তাই চলে আসি। জানতাম কখনো দেখা হবেনা। এরপর নিয়ে আসার পরই তোর বাবার সাথে বিয়েও দিয়ে দেয় তোর দাদু। বিশ্বাস কর তখন থেকে আর কখনো আমি আজ পর্যন্ত দুঃখের ছায়াটাও দেখিনি। আল্লাহর বিশেষ রহমতে আজ পর্যন্ত আমি অনেক সুখী হয়েছি রে শ্রাবণ। ”
অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো শ্রাবণ। মায়ের দিকে তাকিয়েই রইলো। ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁধে হাত রেখে মোলায়েম সুরে বলে উঠলো,
—” তোমার মামা কি এখনো বেঁচে আছে মা?”
সালমা বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
—” না। আমার বিয়ে হওয়ার ৫-৬ বছর পর মামা মারা গিয়েছে।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” ও শিট! তারপর? তোমার মামি আর তোমার মামাতো বোন?”
সালমা বেগম এবারে কিছু একটা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন
—” তোর বাবার সাথে বিয়ে হওয়ার পর আমি তো সুখী হয়েছি। কিন্তু আমার মামাতো বোন, ধরণী সুখী হতে পারেনি। ওর কপালে সুখ ছিল না কখনো। মামা মারা যাওয়ার পর মামি একদম অসহায় হয়ে পড়ে। শেষে অনেক কষ্টে একটা গরীব ঘরে ধরনীর বিয়ে দিয়ে দেয়। এরপর স্বামীর পদবী পেয়ে ধরনীর নাম হয়ে যায় ধরনী হোসাইন। এর পরে যখন ধরনী বিয়ের পিঁড়িতে বসলো, তার ঠিক এক সপ্তাহ পর মামি মারা গিয়েছে।”
শ্রাবণ যেন চমকের পর চমক খাচ্ছে। আঁতকে উঠে বলল,
—” ওহ শীট! ট্রাজেডির উপর ট্রাজেডি! তারপর? তোমার মামাতো বোন ধরনী? তার কী অবস্থা? বেঁচে আছে?”
সালমা বেগম এবারে একটু রহস্যময়ী ভঙ্গিতে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” উমম..জানতেই হবে?”
শ্রাবণ এক মুহূর্তের জন্য উৎফুল্লিত হয়ে উঠল,
—” অবশ্যই। তোমার এত ভালো বন্ধু ছিল, মামাতো বোন হয়েও নিজের বোনের মত ছিল। না জানলে আমার পেট ব্যাথা করবে। এরপর বলো! তোমার সাথে তার যোগাযোগ আছে? ”
সালমা বেগম হেসে বললেন,
—” হ্যাঁ ছিল। অনেকদিন পর্যন্ত ছিল। টেলিফোনে কথা বলতাম। ধরনী অনেক কষ্টে ছিল রে। ওর শ্বশুর বাড়ি ভালো ছিল না। স্বামী ছিল ব্যাবসায়ী। কিন্তু নামেই সেটা ব্যবসা। কোনো কাজবাজ করতেই পছন্দ করতো না। তোর নানুর মত ভন্ড ছিল। সারাদিন ছাইপাঁশ গিলতো। যাকগে, এরমধ্যে তুই আমার কোলে এলি। ধরনী তো তোকে দেখার জন্য পাগল ছিল। কিন্তু গ্রামে থাকার কারনে দেখতে পারেনি। চিঠি পাঠাতো আমায়। কয়েক বছর পর তুই যখন একটুখানি বড় হলি, তখন আমি খোঁজ পেলাম যে ধরনী প্রেগন্যান্ট। অনেক খুশি হয়েছিলাম জানিস। গ্রামে তখন কোন এক আত্মীয় ঢাকা থেকে বেড়াতে গিয়েছিল ধরনীর। তখন সেই আত্মীয়র ফোন থেকে ভিডিও কলে কথা বলেছিলাম সেদিন। কত বছর পর যে সেদিন ধরনীকে দেখেছিলাম! স্নিগ্ধ সুন্দর মেয়েটাকে এতটা বিধ্বস্ত দেখে আমার কান্না পেয়ে গেছিল জানিস। ধরনী তো তখন প্রেগন্যান্ট ছিল। ওকে যখন তোকে দেখালাম, তখন মজা করে বলেছিল, ‘ এত সুন্দর ছেলে টা তোর বুবু? আমার মেয়ে হলে তোর ছেলেকে জামাই বানাবো। গরিব বলে না করবি না তো বুবু্ু?’ সেদিন যে এত কান্না পেয়েছিল। সাথে সাথে বলেছিলাম, অবশ্যই ধরনী, তোর মেয়েকে বউমা বানাবো আমি।”
বলেই চোখের পানি মুছলো সালমা বেগম। শ্রাবণ নিজেও আবেগী হয়ে গিয়েছে। একটা পর্যায়ে সে আঙুলে চোখে আসা সদ্য পানির কণা মুছে নিয়ে বলল,
—” শুধু শুধু কথাটা দেয়া উচিত হয়নি মা! আমি তো বিয়ে করে নিয়েছি। এখন তোমার কথাটা ভেঙে গেলো যে। এটা অন্যায়।”
সালসা বেগম নিজেও মাথা নেড়ে বললেন,
—” হুম সেটাই।”
শ্রাবণ আবারো বলল,
—” আচ্ছা তারপর?”
সালমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, এরপরের সব কথাগুলো শ্রাবণের চোখের দিকে তাকিয়েই বললেন,
—” দুর্ভাগ্যবশত ধরনীর বাচ্চা পেটে থাকার এই অবস্থাতেই ওর স্বামী ক্যান্সারে মারা যায়। সাথে সাথে অসহায় হয়ে পড়ে ধরণী। যাওয়ার মত কোন জায়গা থাকে না। ততদিনে ওর খোঁজ হারিয়ে ফেলেছিলাম। তবে পরে জানতে পারি, শ্বশুর বাড়িতে সেভাবেই অবহেলায় জন্ম দেয় তার প্রথম সন্তানের। মেয়ে হয়েছিল ওর। কিন্তু বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়েই ধরনী মারা যায়। বেচারি মেয়েটা। বাবা-মা দুজনকেই হারায়। এরপরের নিজের চাচা চাচির কাছে অবহেলায় বড় হতে থাকে। আসলেই পুরো পরিবারের কপাল টাই খারাপ! ”
বলে আবারো থামলেন সালমা বেগম।
এবারে শ্রাবণ অপলক তাকিয়ে রইলো। চোখে অনুভূতিশূন্য দৃষ্টি। অকারণে শ্রাবণের হৃদপিন্ডের গতি কেন যেন বেড়ে গেল। মনে হলো সে এমন কিছু আন্দাজ করতে পারছে, যা রীতিমতো তার হার্ট অ্যাটাক করাতে সক্ষম। রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো শ্রাবণ শেখের। গায়ের লোম খাঁড়া হলো সহসা। সালমা বেগমের বলা কথাগুলো আবারো পুনরাবৃত্তি করে মনে মনে ভেবে নিল সে। এরপরে শুকনো ঢোক গিলে ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৫০
—” ধরণী আন্টির মেয়েটা এখন কোথায়?”
সালমা বেগম ঠোঁট কাঁমড়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেন ছেলে কে। এরপর কাছে এগিয়ে এসে ফট করেই বললেন,
—” তোর ঘরে।”
