Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৯

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৯

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৯
‎আফীফা আফনান

‎সময় আর স্রোত কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না। বরং ​সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলে। সেই অনুযায়ী দেখতে দেখতে কেটে গেলো প্রায় দেড়টি মাস।
‎​এই দেড় মাসের ব্যবধানে শিকদার বাড়িতে যেমন অনেক হিসেব-নিকেশ বদলে গেছে, তেমনি বদলে গেছে মেহুলের জীবনটাও। যে জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে একসময় মিশে ছিল অপমান, ট্রমা আর দমবন্ধ করা মানসিক যন্ত্রণা—আজ সেখানে শুধুই এক চিলতে রোদ আর মুক্ত বাতাসের আনাগোনা। এখন মেহুলের জীবনে কোনো বাধা নেই, নেই কোনো বিষাক্ত সম্পর্ক কিংবা অতীতের কোনো পিছুটান। সে এখন এক মুক্ত পাখির মতো, যে নিজের ইচ্ছেমতো নীলাকাশে ডানা মেলে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে।

‎​বিগত দুই মাস আগের সেই শান্ত আর কোণঠাসা হয়ে থাকা মেহুলের সাথে আজকের মেহুলের যেন আসমান-জমিন তফাৎ!
‎​পরিবর্তন এসেছে তার চলায়, বলায়, মানসিকতায়—এমনকি শারীরিক গঠনেও। এতদিন মানসিক অবসাদ আর অবহেলার কারণে মেহুল কিছুটা নাদুস-নুদুস আর অসচেতন ছিল। কিন্তু এই দেড় মাসে সে নিয়মিত জিম, ইয়োগা আর ব্যালেন্সড ডায়েট মেনে নিজেকে একদম ফিট আর আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মেহুলের রূপ যেন এখন নতুন করে ঠিকরে বেরোচ্ছে! কথাতেই তো আছে—মানুষ যখন মন থেকে সুখে থাকে, তখন তার ভেতরের আত্মবিশ্বাস আর সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মেহুলের ক্ষেত্রেও ঘটেছে ঠিক তা-ই।

‎​যে মেহুল আরমানের কারণে বিগত বছরগুলোতে তার আনুগত্য থেকে একপ্রকার বন্দিদশায় জীবন কাটিয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে হাজার মাইল দূরত্ব বজায় রেখে চলত, সে আজ বন্দিদশা কাটিয়ে জীবনকে উদযাপন করতে শিখেছে। তাইতো মিনারের বন্ধুমহলে এখন মেহুল একদম প্রাণকেন্দ্র! মিনার তো শুরু থেকেই তার প্রাণের ভাই, কিন্তু এখন মিনারের বন্ধুদের সাথেও মেহুলের এক দারুণ ও নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছে।
‎সবাই মিলে ​ট্রাভেলিং, পিকনিক, বাইক রেস এখন তাদের পুরো গ্যাংয়ের নতুন নেশা! সুযোগ পেলেই মিনার আর বন্ধুদের সাথে নিয়ে মেহুল বেরিয়ে পড়ে প্রকৃতি দর্শনে। কখনো শহরের এই কোনা, তো কখনো ওই কোনা। সন্ধ্যা নামতেই তাদের জীবনে যেন সারাদিনের সকল ধকল কাটিয়ে রংধনুর আগমন ঘটে। এই তো মাত্র গত সপ্তাহেই পুরো টিম নিয়ে তারা চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড় ট্র্যাকিং করে ঘুরে এসেছে! পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ আর মেঘের ছোঁয়ায় মেহুলের মুখের সেই প্রাণখোলা হাসিটা যেন হাজার ওয়াটের আলোর মতো জ্বলজ্বল করছিল। নাচ, গান, আর হাসি-আনন্দে মেহুল যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর কৈশোরকে নতুন করে ফিরে পেয়েছে।

‎​তবে জীবনকে উপভোগ করার পাশাপাশি মেহুল তার প্রফেশনাল লাইফ রূপান্তর করেছে একদম অন্য উচ্চতায়।
‎​সে এখন পুরোপুরি মন দিয়েছে তার ডাক্তারি ক্যারিয়ারে। শহরের নাম করা মেডিকেল কলেজের একজন অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল ডাক্তার হিসেবে সে এখন প্রতিদিন অসংখ্য রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছে। মেহুলের নিখুঁত দায়িত্ববোধ, রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ আর শান্ত মেজাজের কারণে সিনিয়র ডাক্তারদের কাছ থেকে প্রশংসা আর সহকর্মীদের ভালোবাসা সে প্রতিনিয়ত পাচ্ছে। সাদা অ্যাপ্রন জড়িয়ে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে যখন সে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে হেঁটে যায়, তখন তাকে দেখে বোঝা কঠিন—এই মেয়েটার ওপর দিয়ে একসময় কতটা ভয়ংকর কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে!
‎​আজকের মেহুল কেবল একজন সফল নারী নয়, সে এখন এক স্বাবলম্বী, সুগঠিত আর চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব। যে মেহুলকে একদিন সুমনা আর আরমান মিলে অন্ধকারের গর্তে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, আজ সে নিজের পরিশ্রমে আর সততায় সূর্যের মতো আলো ছড়াচ্ছে।

‎​তবে একদিকে যখন মেহুলের আকাশে ঝলমলে রোদ্দুর, তখন শহরের অন্য কোনো নোংরা গলিতে আরমান আর সুমনা বেগমদের দিন কাটছে চরম অন্ধকার আর ধিক্কারে!
‎সেদিন রাতের আঁধারে মেহুল যখন শিকদার বাড়ির ভারী কাঠের দরজাটি সুমনা বেগম, আরমান আর আনিকার মুখের ওপর সজোরে আছড়ে বন্ধ করে দিয়েছিল—তারপর থেকে এই দেড় মাসে তারা আর কখনো সেই বাড়ির ত্রিসীমানাতেও ঘেঁষতে পারেনি। আর না পেরেছে নিজেদের সেই নুয়ে পড়া মাথাটা উঁচু করে আরেকবার দম্ভ দেখিয়ে সমাজে বাঁচতে! কারণ মেহুল নিজ হাতে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সমস্ত পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
‎​সেদিন রাতে যখন তারা শিকদার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্ধকার রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছিল, তখনো সুমনা বেগম আর আরমানের মনের কোণে বিন্দুমাত্র আশা বেঁচে ছিল। সুমনা ভেবেছিলেন, শিকদার বাড়ির টাকায় আরমান লুকিয়ে নিজের ও মায়ের নামে যেসব গোপন ব্যাংক ব্যালেন্স আর বেনামি সম্পত্তি করে রেখেছে, তা দিয়েই তো তাদের পুরো জীবন আরামে কেটে যাবে!

‎শিকদার নিবাসের মতো রাজপ্রাসাদ না থাক, নিজস্ব বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তো আছে!
‎​কিন্তু সেই মূর্খ বেইমানরা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে, মেহুল আর মিনার আগেই তাদের সেইসব চুরির হাঁড়ি ভেঙে গোপন সম্পত্তির সমস্ত তালিকার ফাইল তৈরি করে বসে ছিল!
‎​রাতের অন্ধকারেই মাথা গোঁজার জন্য আরমান যখন সুমনার নামে থাকা শহরের সেই দামি ফ্ল্যাটটিতে গিয়ে উঠতে চাইল, ঠিক তখনই তাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! ফ্ল্যাটের দারোয়ান ও ম্যানেজার তাদের ভেতরে ঢুকতেই দিল না। ম্যানেজার স্পষ্ট জানিয়ে দিল—জাবেদ ইকবাল শিকদার সাহেব নিজের প্রভাব খাটিয়ে রাতারাতি কোর্টের আইনি স্টে-অর্ডার এনে বেনামে কেনা সেই সকল সম্পত্তি নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছেন!

‎​কারণ, সেই সমস্ত ফ্ল্যাট আর জমি যে শিকদার এন্টারপ্রাইজের চুরি করা টাকায় কেনা হয়েছিল, তার নিখুঁত হিসাব আর আইনি প্রমাণ আগেই আদালতে পেশ করা হয়ে গেছে। দরজায় দাঁড়ানো দারোয়ান শেষমেশ একপ্রকার দূর-দূর করে চোরের মতো তাড়িয়ে দেয় শিকদার বাড়ির একসময়ের রাজপুত্র আরমানকে!
‎নিজেদের সাজানো পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে দেখে​হতাশ আর অপমানে মাথা নিচু করে সেই ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে রাতটুকু থাকার জন্য অন্তত কোনো ভালো হোটেলে ওঠার সিদ্ধান্ত নেয় আরমান। কিন্তু এটিএম বুথে কার্ড গলিয়ে টাকা তুলতে গিয়ে তার পায়ের নিচের মাটি যেন আরো একবার সরে যায়! স্ক্রিনে ফুটে ওঠে—‘ব্যালেন্স: ০.০০ টাকা’। ব্যাংক ব্যালেন্স পুরোটাই শূন্য!

‎এমন অবস্থায় আরমান কি করবে ভাবতে না পেরে তার পরিচিত সকল ভাই ব্রাদার যারা একসময় তার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলতো তাদের সাথে যোগাযোগ করে। কিন্তু ​একদিনের এই কালবৈশাখী ঝড় যেন আরমানের জীবন থেকে তার তথাকথিত সমস্ত ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ আর চামচাদের এক মিনিটের মধ্যে হাওয়া করে দিয়েছিল! অতঃপর কোনো উপায় না পেয়ে সেই অন্ধকার রাতে কেবল এক রাতের জন্য আশ্রয় পেতে আরমান তার বহুদিনের পরিচিত ধনী বন্ধু আর ‘সঙ্গী ভাইব্রাদারদের’ ফোন করতে শুরু করে। কিন্তু হায়! শিকদার পরিবারের খাঁচা থেকে বের হওয়া ডানা-ভাঙা আরমানকে আর কে খাতির করবে? কেউ সরাসরি না করে দিল, কেউ ব্যস্ততার অজুহাত দেখাল, আবার অনেকে আরমানের ফোন আসছে দেখে তাকে সোজা ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দিল!

‎​অবশেষে কোনো পথ খোলা না দেখে, পকেটে থাকা সামান্য কিছু খুচরো টাকা সম্বল করে শহরের এক সস্তা, নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত তিন নম্বর শ্রেণির হোটেলে সুমনা আর আনিকাকে নিয়ে সেই অভিশপ্ত রাতটুকু কাটাতে বাধ্য হয়েছিল আরমান।
‎​কোম্পানির সাথে এত বড় জালিয়াতি করার অপরাধে আরমানের সমস্ত অফিশিয়াল ও ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ইতিমধ্যেই সিজ করে দেওয়া হয়েছিল। তার ওপর শিকদার এন্টারপ্রাইজের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের জন্য যেসব ব্যক্তিগত গাড়ি ও সম্পত্তি তারা বানিয়েছিল, কোম্পানির ঠোকা মামলায় তাও জলছবির মতো হাত থেকে ফসকে যায়।

‎​মাত্র কয়েক ঘণ্টার এক তীব্র ঝটকায় যেন আরমান রাজকীয় আসন থেকে সোজা নোংরা ড্রেনে এসে পড়েছিল! বিলাসী জীবন, দামি শার্ট আর দামি ব্র্যান্ডের অহংকার ছেড়ে আজ তাকে চরম দারিদ্র্য আর অপমানের মুখে পড়তে হয়েছে।
‎​যে মেহুলকে তারা অবলা আর বোকা ভেবে ভেবে নিজেদের পায়ের নিচে পিষে মারতে চেয়েছিল, আজ সেই মেহুলের ছুড়ে মারা এক আঘাতের খেসারত আরমান আর সুমনা বেগমকে প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা সেকেন্ডে তিলে তিলে দিতে হচ্ছে!

‎​শিকদার বাড়ির জমকালো ডাইনিং টেবিলে তখন সকালের নাস্তার দারুণ তোড়জোড়। মিনারা বেগম প্রতিদিনের মতো আজকেও দ্রুত হাতে টেবিলে গরম গরম নাস্তা পরিবেশন করছেন আর থেকে থেকে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। ঘড়ির কাঁটা দুটি তখন আপন মনে কাঁটায় কাঁটায় নয়টার ঘরের দিকে এগিয়ে চলছে।
‎​ঠিক যখন ঘড়ির দুটো কাঁটা তার সঠিক স্থানে গিয়ে নয়টা বাজাল, ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে কারো গাম্ভীর্যপূর্ণ হেঁটে আসার পায়ের শব্দ পেলেন মিনারা বেগম। হাতে থাকা ধোঁয়া ওঠা তুলতুলে রুটির ঝুড়িটা ডাইনিং টেবিলে রাখতে রাখতেই ওনার দৃষ্টি গেল সিঁড়ির দিকটায়।

‎​সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে মিনার! পরনে একদম নিখুঁত ইস্ত্রি করা জেন্টল শার্ট, ফিটিং প্যান্ট আর চকচকে লেদার শু। চুলগুলো আঁচড়ানো পরিপাটি, আর চোখে-মুখে এক দক্ষ কর্পোরেট এক্সিকিউটিভের আত্মবিশ্বাস।
‎​মিনারের এই পূর্ণাঙ্গ অফিশিয়াল রূপ দেখে মিনারা বেগমের দু-চোখ এক নিমেষে খুশিতে আর গর্বে ভরে উঠল।
‎​বিগত প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন সকালে এই সুন্দর দৃশ্যটিই দেখছেন মিনারা বেগম। মূলত মেহুলের অনবরত পীড়াপীড়ি আর মিনারা বেগমের মিষ্টি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের ঠেলায় অবশেষে মিনার বাধ্য হয়ে শিকদার এন্টারপ্রাইজে জয়েন করেছে! আর এই বিগত এক মাসে সে মেহুলের সাথে ছুটিছাটায় ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি বাকি সবকটা দিন নিয়ম করে অফিসে উপস্থিত থেকেছে।

‎​বর্তমানে সে কোম্পানির একটা জুনিয়র পোস্টে কর্মরত আছে। জয়েনিংয়ের সময় ইকবাল সাহেব তাকে আরমানের সেই খালি হওয়া বড় ডিরেক্টর পদটাই দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মিনার নিজের ইচ্ছেতেই তা নিতে অস্বীকার করে। তার স্পষ্ট কথা—সে যা অর্জন করবে, তা নিজের যোগ্যতা আর পরিশ্রমের জোরেই করবে, কারো দয়ায় নয়।

‎​মিনার ডাইনিং টেবিলে এসে নিজের চেয়ার টেনে বসতেই তার ঠিক পিছু পিছু পরিপাটিরূপে মেহুলও এসে উপস্থিত হলো। আজমল সাহেব আর জাবেদ ইকবাল সাহেব আগে থেকেই টেবিলে বসে নাস্তা করছিলেন।
‎​মেহুল ডাইনিংয়ে পা রেখেই মিষ্টি হেসে আজমল সাহেবের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, “গুড মর্নিং, মামা! শরীর কেমন লাগছে আজ?”

‎​আজমল সাহেব ভাগ্নির মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে হেসে বললেন, “অনেক ভালো রে মা।”
‎​এরপর মেহুল ইকবাল সাহেবের চেয়ারের পেছনে গিয়ে হালকা ঝুঁকে বলল, “গুড মর্নিং, বাবা!”
‎ইকবাল সাহেবও মেয়ের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে হেসে উত্তর দিলেন, “গুড মর্নিং, আম্মা।”
‎​সবাই টেবিলে বসতেই মিনারা বেগম একে একে সবার প্লেটে নাস্তা বেড়ে দিতে লাগলেন। আজ তিনি বিশেষ অনেক দিন পরে নিজ হাতে খাঁটি দুধের জাফরানি ফিরনি রান্না করেছেন। জাবেদ সাহেব, আজমল সাহেব আর মিনারকে বেড়ে দেওয়ার পর মিনারা বেগম বেশ ভালো পরিমাণে ফিরনি মেহুলের বাটিতে ঢালতে গেলেন।

‎​তা দেখে মেহুল সাথে সাথে হাত দিয়ে বাটি ঢেকে ফেলে হেসে বলল, “আহা মনি! থামো থামো… ফিরনি আমাকে দিচ্ছ কেন? আমি তো মিষ্টি আর ফিরনি একদমই খাব না! ভুলে গেছ, আমি ডায়েটে আছি?”
‎​কথাটা শোনামাত্রই ডাইনিংয়ের পরিবেশ হালকা হয়ে গেল। ঠিক তখনি মিনার নিজের চামচ ভর্তি ফিরনি গালে পুরে চোখ বন্ধ করে এক স্বর্গীয় তৃপ্তির ভান করল। তারপর মুখটা একটু বাঁকিয়ে মেহুলের দিকে তাকিয়ে খিটখিটে গলায় চেতানোর সুর তুলে বলল—
‎​”আহারে! ডায়েটের চক্করে পড়ে যে জীবনের আসল স্বর্গীয় স্বাদ মিস করছে, তার জন্য এক বালতি সমবেদনা! উফ মা! এই ফিরনিটা যা অসাধারণ হয়েছে না… যে খাবে না, সে বুঝতেই পারবে না পৃথিবীতে সে কী চরম জিনিস মিস করল!
‎কোথায় ওই ঘাস-পাতা আর সালাদ! আর কোথায় এই ফিরনি! এ যেন পরম শান্তি!”

‎এদিকে মিনার যখন এমন বকবক করছিলো তখন মিনারের এই ধরনের কথায় মেহুল বিন্দুমাত্র উত্তেজিত হলো না, রইল একদম শান্ত। কারণ গত দেড় মাস ধরে ডায়েট শুরু করার পর থেকেই মিনার তাকে এভাবে প্রতিনিয়ত জ্বালিয়ে আসছে! কখনো মেহুলের পছন্দের সুস্বাদু মিষ্টি, কখনো পেস্ট্রি কেক, আবার কখনো চকলেট আইসক্রিম এনে মেহুলের চোখের সামনে রেখে লোভ দেখায় সে। প্রথম প্রথম মেহুল বেশ রাগ দেখালেও এখন সে এসবে পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
‎অন্যদিকে ​ডাইনিং টেবিলে মেহুল আর মিনারের এই প্রতিদিনের মিষ্টি কাণ্ডকারখানা দেখে মিনারা বেগম, জাবেদ ইকবাল সাহেব আর আজমল সাহেব মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন।

‎মিনার যখন দুষ্টামিতে মেতে ছিলো তখন ​মেহুল মিনারের দিকে আর কোনো মনোযোগ না দিয়ে একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের হেলদি ব্রেকফাস্ট শেষ করল। তারপর মিনারকে টোটালি পাত্তা না দিয়ে, নিজের ব্যাগ আর স্টেথোস্কোপ গুছিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
‎এদিকে মেহুলকে যেতে দেখে ​মিনারও চটজলদি মুখের শেষ লোকমাটুকু গিলে নিয়েই প্লেট ঠেলে উঠে দাঁড়াল। “আরে দাঁড়া সিস্টার, আমি তোকে হাসপাতালে ড্রপ করে দিয়ে অফিসে যাব!”—বলতে বলতে সে মেহুলকে আবারও ক্ষ্যাপাতে ক্ষ্যাপাতে দ্রুত পিছু নিল।

‎দেখতে দেখতে ​একটু পরেই একে একে ইকবাল সাহেব ও আজমল সাহেব নাস্তা শেষ করে যার যার গন্তব্যে ও ঘরে চলে গেলেন। ডাইনিং রুমটা একদম ফাঁকা হতেই এতক্ষণ রান্নাঘরের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা শিরিনা বেগম হনহন করে বেরিয়ে এলেন।
‎​তিনি দ্রুত চোখ দুটো চারদিকে বুলিয়ে নিলেন—বাড়ির কেউ কোথাও নেই তো? তারপর টেবিলে অবশিষ্ট থাকা রুটি, মাংস,ডিম সহ আরো নাস্তা আর ফলমূলগুলো অতি দ্রুত ফয়েল পেপারে মুড়িয়ে নিজের আঁচলের নিচে লুকিয়ে আবার রান্নাঘরের দিকে সটকে পড়লেন।

‎​ঠিক সেই মুহূর্তেই মিনারা বেগম আজমল সাহেবকে নিজের রুমে রেখে ড্রয়িংরুমের কোণ থেকে ডাইনিংয়ে ঢুকছিলেন। তাই শিরিনা বেগমের এই চুরি করে নাস্তা লুকানোর দৃশ্যটি ওনার নজর এড়ালো না। তিনি থমকে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখলেন যে শিরিনা ফয়েল পেপারে খাবার মুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মিনারা বেগম কিছু বললেন না, কোনো প্রশ্নও তুললেন না। শুধু ওনার চোখে কোনে ফুটে উঠল কেবল এক নিবর কৌতুহল।

‎একসময় সকালের ব্যস্ততা কেটে গিয়ে শিকদার বাড়িটা একদম ফাঁকা ও শান্ত হয়ে এল। ঠিক তখনই শিরিনা বেগম নিজের ঘরের কাবার্ড থেকে একটা সাধারণ বাজারের ব্যাগ বের করলেন। ডাইনিং রুম থেকে চুপিচুপি লুকিয়ে রাখা খাবারের ফয়েল পেপারগুলো খুব সাবধানে ব্যাগের তলায় গুছিয়ে নিয়ে উপরে সদ্য ফ্রিজ থেকে আনা সবজি রেখে তিনি চুপিচুপি পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
‎​বাড়ি থেকে বের হয়ে তিনি দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে পৌঁছালেন শিকদার বাড়ি থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্বে থাকা একটি নিরিবিলি পাবলিক পার্কের ভেতর।

‎​পার্কের ভেতরে ঢুকে বাজারের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শিরিনা চারপাশের নির্জনতার দিকে একবার সশঙ্ক চোখে তাকালেন। কেউ তাকে দেখে ফেলছে না তো? পরিচিত কারাগুলা নেই তো। আশেপাশে তেমন কাউকে না দেখে, ​অতঃপর একটু ভেতরের দিকে এগোতেই নিজের কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখতে পেলেন তিনি। পার্কের এক কোণে, একটা জরাজীর্ণ বেঞ্চের ওপর একলা বসে আছে আনিকা!

‎​শিরিনা বেগম আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পায়ে আনিকার দিকে এগিয়ে গেলেন।
‎​শিরিনা কাছাকাছি আসতেই আনিকার নজর গেল ওনার দিকে। অনেকদিন পর মাকে চোখের সামনে দেখে আনিকা এক লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর দৌড়ে এসে শিরিনা বেগমকে শক্ত করে জাপটে ধরল!
‎​আগে যে মেয়েটার গায়ে সামান্য ধুলোবালি লাগলে চিৎকার জুড়ে দিত, আজ তার পরিধেয় জামাকাপড় কিছুটা ময়লা, চুলগুলো পরিপাটি নয়, চোখ দুটো প্রায় গর্তে ঢুকে গেছে। মাকে জড়িয়ে ধরে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

‎​শিরিনা বেগম চোখের জল মুছে আনিকাকে নিয়ে আলতো করে বেঞ্চে গিয়ে বসলেন। তারপর ব্যাগটা খুলে, সযত্নে মুড়িয়ে রাখা নাস্তা আর ফলের ফয়েল পেপারগুলো একে একে আনিকার সামনে মেলে ধরলেন।
‎​খাবারের মিষ্টি সুবাস নাকে লাগতেই আনিকার চোখে খিদে আর লোভ স্পষ্ট হয়ে উঠল। কোনো প্রকার দ্বিধা বা ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে, সে ব্যাগ থেকে খাবারগুলো তুলে নিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করল! যেন বহু বহু দিন পর সে একটু সুস্বাদু আর পুষ্টিকর খাবার মুখে তুলছে! যে মেয়ে শিকদার বাড়িতে একসময় পরীর মতো থাকতো সেই আনিকা আজ লুকানো খাবারের জন্য এভাবে ক্ষুধার্ত পশুর মতো ঝাপিয়ে পড়েছে, তা দেখে শিরিনার বুকটা ফেটে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিরবে চোখের জল ফেলতে লাগলেন।

‎​এদিকে, পার্কের একটু দূরে একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটি নিশ্চুপে দেখছিলেন মিনারা বেগম!
‎​শিরিনা বেগম যখন সকালের নাস্তা চুরি করে ব্যাগে ভরছিলেন, মিনারা তখনই বুঝেছিলেন কোন গোপন কারন নিশ্চয় আছর। তাই শিরিনা বাসা থেকে বের হতেই মিনারা বেগম আড়ালে আড়ালে তার পিছু নিয়েছিলেন।

‎​আজ আনিকার এই করুণ, নিঃস্ব আর ক্ষুধার্ত রূপ দেখে মিনারা বেগমের মনটা এক মুহূর্তের জন্য ভার হয়ে উঠল। যে মেয়ে একদিন অহংকারের চাদর মুড়ি দিয়ে মেহুলের জীবন ছারখার করতে চেয়েছিল, আজ সে খোলা পার্কে বসে চোরের মতো খাবারের ফয়েল পেপার চাটছে!
‎​সত্যিই, প্রকৃতির হিসেব বড় অদ্ভুত, সে নিয়ম করে সবার সব পাওনা চুকিয়ে দেয়!

‎গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখতে দেখতে মিনারা বেগমের দীর্ঘশ্বাস আরও গভীর হলো।
‎​আসলে সুমনা আর আনিকাকে শিকদার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে মিনারা বেগম আজ নতুন দেখছেন না; বহু আগেই বহুবার দেখেছেন। বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর থেকেই অভাব আর বাসস্থানের সংকটে পড়ে ওরা যে এই এলাকার আশেপাশেই কোথাও সস্তায় ডেরা বেঁধেছে এবং চোরের মতো সুযোগের অপেক্ষায় ঘুরে বেড়ায়, তা মিনারা বেগমের অজানা ছিল না। এতদিন মিনারা বেগম এ নিয়ে কাউকে কিছুই বলেননি—না জাবেদ ইকবাল সাহেবকে, না মেহুলকে। ভেবেছিলেন, হয়তো গৃহহীন, আশ্রয়হীন হয়ে পস্তাতে পস্তাতেই ওরা একদিন সুধরে যাবে!

‎​কিন্তু হঠাৎ যখন মিনারা দেখলো শুধু খাবার নয় বরং শিরিনা খাবারের পাশাপাশি আনিকা কে টাকা ও আদান-প্রদান করছে সেই সাথে নতুন চক্রান্ত। মিনারা শুনতে পেলো— ​আনিকার খাওয়ার গতি একটু কমতেই সে হাত দিয়ে মুখ মুছে বিষাক্ত গলায় মাকে বলছে, “মা, এই সামান্য খাবার আর টাকা দিয়ে কী হবে বলতো? আরমান তো কোনো কাজ পাচ্ছে না। যে অফিসে যায়, সেখানেই নাকি শিকদার এন্টারপ্রাইজের লোক আগে থেকে বলে রেখেছে ওকে যেন কাজ না দেওয়া হয়! আমরা দিনে একবেলা খেয়ে বেঁচে আছি। ওই বাড়ি থেকে আমাদের দামি জিনিসপত্র কিছু গহনা বা আরো বেশি করে টাকা সরাতে পারো না? আমরা এভাবে আর কতদিন রাস্তায় পচব?”

‎​শিরিনা বেগম আশপাশে তাকিয়ে ভীতিজনক গলায় বললেন, “চুপ কর আনিকা! মেহুল এখন আগের মতো নেই। ও যদি জানতে পারে আমি তোদের এভাবে সাহায্য করছি, তবে আমাকেও যে গা-ধাক্কা দিয়ে ওই বাড়ি থেকে বের করে দেবে! তখন তোর ওই পঙ্গু বাপকে নিয়ে আমি কোথায় ঘুরবো। আমিতো চেষ্টা করছি নাকি আর ইকবাল ভাইও এখন আর আমার কথা শুনবে না। তাই তোরা এখন একটু কষ্ট করে চালিয়ে নে…”

‎​”কষ্ট করব মানে?!” আনিকা চোখ উল্টে গর্জে উঠতে গিয়েও গলা নামিয়ে বলল, “আমরা কষ্টে মরব আর মেহুল ওই রাজপ্রাসাদে রানী হয়ে রাজত্ব করবে?! না মা, তুমি যেভাবে পারো আমাদের টাকার ব্যবস্থা করে দাও, আমার আর এমন জীবন ভালো লাগছে না! কোথায় ভেবেছি আরমানকে বিয়ে করে রাজরাণী হয়ে থাকবো আর এখন রাস্তার ফকিন্নি হয়ে আছি।”

‎​দূর থেকে ওদের ফিসফিসানি আর অসৎ পরিকল্পনার গুঞ্জন মিনারা বেগমের কানে পুরোপুরি না পৌঁছালেও শিরিনা বেগমের ব্যাকুলতা আর আনিকার মুখের লোভাতুর অভিব্যক্তি ওনাকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে দিল। তিনি বুঝলেন শিরিনা বেগম শুধু আজকের এই নাস্তা টুকু আর টাকাই চুরি করে আনেননি; বরং মেহুল, জাবেদ সাহেব আর তাদের সবার অজান্তে, বাড়ির সবার অলক্ষে শিকদার বাড়ির টুকিটাকি চাল-ডাল, জিনিসপত্র আর ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়মিত এভাবে পাচার করে ওদের হাতে তুলে দিচ্ছেন! মেয়ের প্রতি অন্ধ ভালোবাসায় শিরিনা বেগম নিজের অজান্তেই আবার সেই বেইমানদের শিকদার বাড়িতে পেছন দরজা দিয়ে ঢোকার রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছেন।

‎অতঃপর ​মিনারা বেগম আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ধীর পায়ে উল্টো ঘুরে শিকদার বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। ওনার মনে এখন একটাই চিন্তা—শিরিনা বেগম নিজের মেয়ে আনিকাকে বাঁচাতে গিয়ে পুরো পরিবারকে আবার কোনো বড় বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন না তো? আর মেহুল যদি এই চুরির কথা জানতে পারে, তবে কি এই শান্ত শিকদার বাড়িতে আবারও এক রক্তচক্ষু কালবৈশাখী নেমে আসবে?

‎শহরের এক গলির মাথার নোংরা আর স্যাঁতসেঁতে চা-স্টলটির এক কোণে ঝাপসা আলোর আড়ালে বসে আছে আরমান। পরনে কিছুটা কালচে হয়ে যাওয়া অপরিচ্ছন্ন শার্ট, গালে কয়েক দিনের না-কামানো খসখসে দাড়ি, আর চোখের নিচে লেপটে থাকা কালি বলে দিচ্ছে অনেক দিন শান্তিতে ঘুমায় নি সে।
‎​সারা জীবন অন্যের অর্জিত রক্ত জল করা টাকায় বিলাসবহুল জীবন কাটিয়ে এসে আজ এই নরক যন্ত্রণার দিনে আরমানের মানসিক অবস্থা প্রায় উন্মাদ ও দেউলিয়াদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে!

‎​কাজকর্ম সে একেবারেই করছে না বললে ভুল হবে—বাস্তবতা হলো সে কোনো কাজই পাচ্ছে না! ছোটখাটো যে দু-একটা দোকানে কাজ করার সুযোগ আসছে, সেগুলোর পারিশ্রমিক এতই নগণ্য যে তা দিয়ে শহরের এই ভাঙা ঝুপড়ির ঘরভাড়াও মেটানো দায়। তার ওপর শিকদার এন্টারপ্রাইজের দাপটে বড় কোনো কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার দরজাও তার জন্য চিরতরে বন্ধ। শিকদার বাড়ির আরাম-আয়েশ আর বিলাসী ব্র্যান্ডের অহংকার ছেড়ে প্রতিদিন একবেলা খেয়ে বেঁচে থাকার এই চরম বাস্তবতা তার বরদাশত হচ্ছে না।

‎​কিন্তু আরমানের ভেতরের কুটিল শয়তানটা এখনো মরে যায়নি; বরং খিদের জ্বালায় তা আরও বেশি হিংস্র ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।
‎​সে খুব ভালো করেই হাড়াহাড়ে টের পাচ্ছে—এই নরক থেকে নিস্তার পাওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো মেহুল! মেহুলকে ছাড়া তার জীবনে ফের রাজকীয় আসনে বসার আর কোনো দ্বিতীয় রাস্তা নেই। তাইতো সে আবার এক নতুন চক্রান্তের জাল বুনতে শুরু করেছে। তার মাথায় একটাই হিসাব—যেভাবেই হোক, মেহুলের সামনে গিয়ে আবারও সেই পুরনো মায়াকান্না, অনুশোচনা আর ভালোবাসার নাটক সাজাতে হবে। অবলা মেহুলকে একবার মিষ্টি কথায় পটিয়ে নিজের ‘ভালোবাসার জালে’ ফাঁদে ফেলতে পারলেই আবার সে শিকদার বাড়ির রাজপুত্র বনে যাবে, আবার ফিরে পাবে বিলাসবহুল জীবন!

‎​সেই অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই বিগত কিছুদিন ধরে সে মেহুলের হাসপাতালের আশেপাশে নিয়মিত ছায়ার মতো ঘুরঘুর করছে।
‎​যেমন আজকেও—দুপুড় গড়িয়ে বিকেল নামতেই মেহুল যে হাসপাতালে কাজ করে, তার থেকে একটু দূরে এক অন্ধকার অলিগলির ফুটপাতে বসে ওয়ান-টাইম কাপে সস্তা রং চা খেতে খেতে সে মেহুলের বের হওয়ার অপেক্ষা করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওভাবে চটপটে চোখে নজর রাখাই এখন তার প্রতিদিনের ডিউটি।

‎​মাঝে মাঝে সে হাসপাতাল থেকে মেহুলকে বের হতে দেখে, আবার কোনো কোনো দিন অনেক রাত পর্যন্ত বসে থেকেও দেখতে পায় না। আর যদিওবা কদাচিৎ দেখতে পায়, মেহুলকে ঘিরে থাকে শিকদার বাড়ির শক্তিশালী সিকিউরিটি, মেহুলের নিজস্ব ড্রাইভার, কিংবা পারছায়ার মতো সাথে থাকে মিনার! মিনারের উপস্থিতি আর কড়া পাহারা দেখে ভয়ে সাহস করে আরমান সামনে যাওয়ার সুযোগই পায় না।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৮

‎​তবুও আরমান হাল ছাড়েনি। কুকুর যেমন উচ্ছিষ্টের লোভে দরজায় পড়ে থাকে, সেও তেমনি হাসপাতালের এই অন্ধকারের কোণে বসে ওত পেতে অপেক্ষা করছে।
‎​সে শুধুই একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছে—একবার, কেবল একবার যদি মেহুলকে একটু একা পায়! একা পেলেই সে তার বিষাক্ত ভালোবাসার জাল ছুড়ে মারবে মেহুলের দিকে, ওকে টোপ বানিয়ে ফের নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিলাসবহুল জীবনটা উদ্ধার করার এক ভয়ংকর পাঁয়তারা চালাচ্ছে সে!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৯ (২)