শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৯ (২)
আফীফা আফনান
হাসপাতালের তিনতলার করিডোরে তখন চরম ব্যস্ততা আর হুড়োহুড়ি। সরকারি হাসপাতালের পরিচিত সেই চেনা দৃশ্য—একদিকে রিলিজ পাওয়া পুরনো রোগীরা ছাড়পত্র পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাড়ি ফিরছে, তো অন্যদিকে সেই খালি সিটে নতুন জরুরি রোগী ভর্তি করার তাড়াহুড়ো। সাথে স্বজনদের ভিড়, বিষণ্ণ মুখের আনাগোনা, ট্রলির চাকার একটানা শব্দ আর আষাঢ়ের ভ্যাপসা গরম—সব মিলিয়ে পুরো করিডোরের আবহাওয়া যেন এক চরম বিশৃঙ্খলা ও দমবন্ধ করা ক্লান্তিতে থমথম করছে।
টানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিউটি আর রাউন্ড শেষে মেহুল হাসপাতালের নিচতলার ছোট্ট, সুসজ্জিত ক্যাফেটেরিয়ার দিকে পা বাড়াল। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনিতে শরীরে যেন আর একবিন্দু শক্তি অবশিষ্ট নেই, ঘাড় আর পিঠের ব্যথায় রগ টান ধরে আছে।
তাই তখনি ক্লান্তি কমাতে সে ক্যাফেটেরিয়ার কাউন্টারে গিয়ে একটা কফির অর্ডার দিল—কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেকোরেটেড সিরামিকের মগে ভেসে উঠল গরম ধোঁয়া ওঠা, উপাদেয় সেই কফি। মেহুল আলতো করে কাপটি হাতে তুলে নিয়ে একটা ফাঁকা টেবিলে গিয়ে বসল। কফির মিষ্টি সুবাস আর দুধ-চকোলেটের আবেশ নোজ-ব্লেণ্ড হতেই মনটা যেন মুহুর্তেই সতেজ হয়ে উঠল। আনমনে একচুমুক কফি মুখে পুরে চোখ দুটি বুজে প্রশান্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। সারাদিনের জমে থাকা ক্লান্তিটা যেন এই এক চুমুকেই কর্পূরের মতো উবে যেতে লাগল।
সে ভাবল—এই কফিটা শেষ করেই আজকের মতো ডিউটি অফ করে বাড়ির দিকে রওনা দেবে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্যাফেটেরিয়ার হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করল হাসপাতালের এক ওয়ার্ডবয়। সে চারদিকে তাকিয়ে মেহুলকে দেখতে পেয়েই দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো।
সে মেহুলকে দেখে কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে তড়িঘড়ি করে বলে উঠল, “ম্যাম! আপনাকেই খুজছিলাম। সিনিয়র কনসালটেন্ট ডক্টর চৌধুরী স্যার আপনাকে এখনই ওনার রুমে ডেকে পাঠিয়েছেন। এমার্জেন্সিতে দুজন গুরুতর রোগী এসেছেন, স্যার আপনাকে এখনই রেফার্ড ফাইল দুটো নিয়ে ওনার কেবিনে যেতে বললেন।”
ওয়ার্ডবয়ের হুট করে দেওয়া এই বার্তায় মেহুল চোখ মেলল। হাতে থাকা সুস্বাদু কফির মগটা ধীরেসুস্থে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল সে। কফির কাপ থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছে, কিন্তু মেহুলের চোখে কোনো বিরক্তি বা আলসেমির ছাপ নেই; বরং সেখানে ফুটে উঠল একজন প্রকৃত চিকিৎসকের নিষ্ঠা ও পরম দায়িত্ববোধ।
সে নিজের স্টেথোস্কোপটা আবার গলায় ঝুলিয়ে নিল, ওয়ার্বয়ের এগিয়ে দেওয়া ফাইল দুটো হাতে তুলে নিয়ে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে সিনিয়র স্যারের কেবিনের দিকে পা বাড়াল।
সিনিয়র কনসালটেন্ট ডক্টর চৌধুরীর কেবিনে প্রবেশ করতেই ডক্টর চৌধুরী গম্ভীর ও ব্যস্ত গলায় বললেন, “এসো মেহুল, বসো।”
মেহুল ফাইলের ওপর চোখ রেখে বিনীতভাবে দাঁড়াল। ডক্টর চৌধুরী ফাইল দুটো টেবিলের ওপর টেনে নিয়ে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এমার্জেন্সিতে যে দুজন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন, তাদের কেসটা একটু ক্রিটিক্যাল। দুজনই মাতৃত্বজনিত জটিলতা নিয়ে এসেছেন। আমার আজ জরুরি একটা কনফারেন্স ও ব্যক্তিগত কাজে শহরের বাইরে যেতে হচ্ছে, তাই আর দেরি করার সময় নেই।”
ডক্টর চৌধুরী ঘড়ি দেখে তাড়াহুড়ো করে নিজের চামড়ার ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলেন। তারপর মেহুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ রাতের শিফটে ওই দুজন রোগীর সম্পূর্ণ দায়িত্ব তোমার ওপর রইল মেহুল। আমি সবকিছু ওভারঅল বলে দিচ্ছি, তুমি বাকিটা হ্যান্ডেল করে নিও। আমার আজ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, তাই ইমারজেন্সিতে বের হতেই হচ্ছে। তুমি ওদের সব রিপোর্ট চেক করে সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে রেখো। জটিল কিছু মনে হলে আমাকে ফোন করো। আমি কাল সকালেই চলে আসবো। আর এসেই যা করার করে নেব, আপাতত তুমি তোমার মতো করে ম্যানেজ করো। আশা রাখছি তোমার এতে সমস্যা হবে না?”
সিনিয়র স্যারের নির্দেশ শুনে মেহুল আর কোনো দ্বিরুক্তি করল না। সে অত্যন্ত আস্থার সাথে মাথা দুলাল, “ঠিক আছে স্যার, আপনি নিশ্চিন্তে যেতে পারেন। আমি দেখছি রোগীদের।”
ডক্টর চৌধুরী আর এক মুহূর্তও দেরি না করে নিজের ব্যাগ হাতে কেবিন থেকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন। কেবিন খালি হতেই মেহুল নিজের কাজের মুডে ফিরে এল। সে নিজের অ্যাপ্রনটা ভালো করে ঠিক করে নিয়ে ওয়ার্ডের দিকে পা বাড়াল।
এরপর শুরু হলো মেহুলের একটানা যুদ্ধ।
হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে থাকা সেই দুজন প্রসূতি রোগীর কাছে গিয়ে মেহুল একে একে তাদের ভাইটাল সাইন চেক করতে শুরু করল। প্রেসার মাপা, ফিটাস হার্ট রেট দেখা, জরুরি স্যালাইন ও ইনজেকশনের ডোজ ঠিক করা—সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে করতে সময় কীভাবে গড়িয়ে গেল, তার কোনো হদিশই পেল না সে।
একজন রোগীর হঠাৎ ব্লাড প্রেশার ফল করায় নার্সদের সাথে নিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে হলো তাকে। এক রোগীর শিয়রে দাঁড়িয়ে তাকে মানসিকভাবে ভরসা দেওয়া, তো আরেকজনের প্রেসক্রিপশন মডিফাই করা—সব মিলিয়ে হাসপাতালের করিডোরের ঘড়ির কাঁটা যখন গভীর রাতের দিকে এগোচ্ছে, মেহুল তখনো ক্লান্তিহীন হাতে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছে। সময় তখন অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। পুরো প্রসূতি ওয়ার্ডজুড়ে এখন একটা থমথমে নীরবতা, কেবল স্যালাইনের ড্রিপ আর মনিটরের হালকা বিপ-বিপ শব্দ ছাড়া আর কোনো শোরগোল নেই। টানা কয়েক ঘণ্টার অক্লান্ত চেষ্টার পর নতুন দুজন প্রসূতি রোগীকেই অবশেষে মেহুল বিপদমুক্ত আর সম্পূর্ণ স্ট্যাবল করতে পেরেছে। কঠিন দায়িত্বটা সুচারুভাবে পালন করতে পেরে মেহুলের মনের ভেতর যেন একপ্রস্থ পরম স্বস্তি নেমে এল।
অতঃপর রোগী দুজনকে সম্পূর্ণ স্ট্যাবল করে যখন মেহুল ডক্টরস রুমে ফিরে এসে ঘড়ির দিকে তাকাল, তখন সে দেখল—রাত প্রায় গভীর! হাড়ভাঙা খাটুনিতে শরীর ক্লান্ত হয়ে এল, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত তৃপ্তি কাজ করছে যে, সে দুটো মানুষকে নিরাপদে রাখতে পেরেছে। রুমে ফিরে এসে সে নিজের অ্যাপ্রনের বোতাম কটা আলগা করল। শরীর একদম ভেঙে আসছে ক্লান্তিতে। তাই ধীর পায়ে গিয়ে টেবিলের পেছনের রিভলভিং চেয়ারটায় বসে শরীরটা একটু এলিয়ে দিল মেহুল। মাথার ওপর সিলিং ফ্যানের ঠাণ্ডা হাওয়ায় চোখের পাতা দুটো যেন ভারী হয়ে আসছিল তার। তাই সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দিতে যেই সে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ দুটো একটু বুজলো —
ঠিক তখনই বাইরের শান্ত করিডোর ফুঁড়ে হঠাৎ এক বিকট শোরগোলের শব্দ ভেসে এলো!
একদল মানুষের একসাথে তীব্র চিৎকার-চেঁচামেচি, গালাগাল আর হুড়োহুড়ির বিকট শব্দে হাসপাতালের নিরবতা এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল! যেন একদল উগ্র মানুষ একসাথে মারমুখী হয়ে হাসপাতালের ভেতরের দিকে ধেয়ে আসছে। নার্স আর ওয়ার্ডবয়দের ব্যাকুল গলায় বারণ করার শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছে সেই তান্ডব চালানো জনতার উগ্র চিৎকারের নিচে।
হুট করে এমন আতঙ্কজনক হইচই আর হইচইয়ের শব্দে মেহুল ঝটকা মেরে চোখ মেলল! নিজের চেয়ার ছেড়ে একঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ওর কপালে ভাঁজ পড়ে গেল—গভীর রাতে হাসপাতালের মতো জায়গায় এত বড় শোরগোল কিসের?
মেহুল বিন্দুমাত্র দেরি না করে দরজার দিকে পা বাড়াল। বাইরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে মেহুলের চোখের সেই ক্লান্তি এক নিমেষে উবে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল এক কঠোর ও সতর্ক দৃষ্টি!
অতঃপর করিডোর ধরে হইচই আর বিশৃঙ্খলার তীব্র আওয়াজটা অনুসরণ করতে করতে মেহুল যখন দ্রুত পায়ে একতলার মেইন লবিতে এসে পৌঁছাল, তখন সেখানকার পরিস্থিতি দেখে ওর চক্ষু চড়কগাছ!
হাসপাতালের সিকিউরিটি গার্ড আর কয়েকজন ওয়ার্ডবয়ের সাথে একদল বেপরোয়া উগ্র লোক পুরোদমে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছে। মারামারিটা যেকোনো মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নিতে চলেছে! আশপাশে থাকা ভয়ার্ত নার্স, কয়েকজন জুনিয়র ডাক্তার আর ইন্টার্নরা ভয়ে জড়সড় হয়ে কোণঠাসে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। এত রাতে জরুরি বিভাগের সামনে এমনিতেই কোনো সিনিয়র ডাক্তার বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা উপস্থিত নেই—যাঁরা আছেন তাঁরা হয় অপারেশন থিয়েটারে ব্যস্ত, নয়তো ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরে গেছেন। আর সেখানে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন রোগীর আত্মীয়স্বজন তো আতঙ্কে তটস্থ! কারো মধ্যেই এমন হিম্মত নেই যে সামনে গিয়ে এই হিংস্র উন্মাদগুলোকে থামায়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হাতাহাতির তীব্রতায় এক সিকিউরিটি গার্ডের হাতে থাকা কাঠের লাঠির সজোড় আঘাতে ওই দলের একজন লোকের কপাল ফেটে রক্ত ছিটকে বের হয়ে এলো। মুহূর্তে গাল আর শার্ট বেয়ে রক্ত গলগল করে পড়তে দেখে পুরো লবির পরিবেশ আরও বেশি বিষাক্ত ও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠল! দু-পক্ষই যেন এখন রক্তমুখী—কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ!
এই চরম বিশৃঙ্খলার মাঝেই মেহুলের তীক্ষ্ণ নজর গিয়ে পড়ল ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বাটে, শ্যামলা বর্ণের এক তরুণের দিকে। পুরো ভিড়ের মাঝে মেহুলের আলাদা করে তার দিকে নজর যাওয়ার একমাত্র কারণ হলো—হাতাহাতির টানে লোকটির শার্টের নিচের অংশ কিছুটা উপরে উঠে যাওয়ায় তার কোমড়ে গুঁজে রাখা চকচকে একটি দেশি পিস্তল স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে!
আকস্মিক এই দৃশ্য দেখে মেহুল শিউরে উঠল! পুরো হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের সিংহভাগই সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু, মুমূর্ষু রোগী আর অনাগত সন্তানের অপেক্ষায় থাকা গর্ভবতী মায়েরা। এখন যদি কোনো কারণে ফায়ারিং বা বড় কোনো অঘটন ঘটে যায়, তবে নিষ্পাপ কতগুলো প্রাণ নিমিষেই আতংকিত হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে কপাল কেটে যাওয়া লোকটির রক্তে শার্ট ভিজে যাচ্ছে তার ওপর সে কপাল ধরে কাতরাচ্ছে যা দেখে একজন ডাক্তার হিসেবে মেহুলের পেশাগত বিবেক হঠাৎ জাগ্রত হয়ে উঠল। তাইতো বিপদ জেনেও এক বুক অদম্য সাহস বুকে চেপে মেহুল দ্রুত পায়ে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই—সেই শ্যামলা বর্ণের তরুণটি আর সহ্য করতে না পেরে নিজের কোমড় থেকে বের করে নিল সেই মারাত্মক দেশি পিস্তলটি! সে উন্মাদের মতো লাঠি হাতে থাকা মধ্যবয়সী সিকিউরিটি গার্ডের কপাল বরাবর পিস্তল ঠেকাবে—ঠিক সেই
তড়িৎ মুহূর্তে বিদ্যুৎবেগে তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল মেহুল!
পরমুহূর্তেই ঘটল সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা—মেহুল হঠাৎ সামনে চলে আসায় শ্যামলা লোকটির হাতের লোডেড পিস্তলটি সোজা গিয়ে ঠেকলো মেহুলের ধবধবে ফর্সা কপাল বরাবর!
চোখের সামনে আকস্মিক এক অপরূপা, নির্ভীক যুবতীকে এভাবে আত্মরক্ষার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে দেখে লোকটির রাগ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে রগের শিরা ফুলিয়ে চরম হিংস্র গলায় গর্জে উঠতে চাইল—
”সর তো বা*ল সামনে থেকে! মরার শখ জাগছে? সর নাহলে তোরেই এখন…”
কিন্তু হঠাৎ যেন পুরো বিশ্ব থমকে গেল! দ্বিতীয় কোনো শব্দ বা গালাগাল সেই লোকটির মুখ থেকে ফুটে বের হলো না! কথারা যেন মাঝপথেই আটকে গেল তার গলায়!
এদিকে মেহুল নিজের বরফশীতল ও তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি লোকটির মুখমণ্ডলে নিবদ্ধ রেখে শান্তভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। একটু আগে যে লোকটার চোখে-মুখে মানুষকে স্রেফ খুন করার মতো পশুত্ব আর হিংস্রতা জ্বলজ্বল করছিল, সেই লোকটাই এখন কেমন যেন স্তম্ভিত, হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! যেন আকাশে মেঘের পরিবৃত্তে অকল্পনীয় বা অলৌকিক কিছু দেখে ফেলেছে সে!
মেহুল লক্ষ্য করল—শুধু ওই অস্ত্রধারী তরুণটিই নয়, তার সাথে থাকা বাকি উগ্র সঙ্গীরাও যারা এতক্ষণ হাসপাতালে তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তারাও মেহুলকে দেখে চরম এক চমক ও অদ্ভুত বিস্ময় নিয়ে একদম নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে!
পুরো পরিবেশ যখন এক অদ্ভুত থমথমে স্তব্ধতায় মোড়ানো, ঠিক তখনই পাশ থেকে এক আতঙ্কিত ওয়ার্ডবয় সাহস সঞ্চয় করে মেহুলের একটু কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “ম্যা-ম্যাডাম! আপনি এখান থেকে সরেন! এখনই পুলিশরে ফোন দেন! এরা এহানে আইসা মাস্তানি আর গুন্ডামি করতেছে! এখনি ফোন দেন, সব কয়টারে জেলের কয়েদে পাঠানের ব্যবস্থা করেন, কয়েকটা ডান্ডার বারি খাইলে দেখবেন এদের মাস্তানি বার হইব!”
তখনি মেহুল হাত তুলে শান্ত কিন্তু অত্যন্ত কড়া গলায় ওয়ার্ডবয়কে থামিয়ে দিয়ে বলল—
”আহ, চুপ! এখন কোনো কথা নয়!”
অতঃপর সে কপাল কেটে গলগল করে রক্ত পড়তে থাকা লোকটার দিকে ইশারা করে ওয়ার্ডবয়কে নির্দেশ দিল—
”আগে উনাকে ইমারজেন্সিতে নিয়ে যাও। ক্ষত পরিষ্কার করে ব্লিডিং বন্ধ করো, আমি আসছি।”
মেহুলের নির্দেশের পর ওয়ার্ডবয় বা ওই সঙ্গীদের আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস হলো না। ওয়ার্ডবয়রা আহত লোকটিকে ধরে দ্রুত আইসিইউ আর ইমারজেন্সির ব্লকের দিকে নিয়ে ছুটল। ওই দলের মধ্য থেকেও দুই-তিনজন সাথী অনুগত ছাগলের মতো তাদের পিছু নিল।
এদিকে, সেই লম্বাটে শ্যামবর্ণের তরুণটি এখনো মেহুলের দিকে বোবা বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছে। হাতের পিস্তলটি কখন যে সে অজান্তেই নামিয়ে নিয়েছে, তা হয়তো সে নিজেও জানে না! তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন মুখ থেকে তার সমস্ত ভাষা চিরতরে হারিয়ে গেছে।
লোকটিকে এভাবে তাকাতে দেখে মেহুল নিজের দুই ভ্রু সামান্য কুঁচকে, অতীব গম্ভীর ও ধারালো কণ্ঠে তরুণটির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল—
” কারা আপনারা? আপনিই বা কে! এত রাতে একটা হাসপাতালে এসে এমন নোংরা উশৃঙ্খলা আর মারামারি করছেন কেন, বলতে পারেন? এটা একটা হাসপাতাল! এখানে অসংখ্য মুমূর্ষু রোগী আছে, ছোট ছোট সদ্যজাত বাচ্চা আছে, প্রসূতি মা ও গর্ভবতী নারীরা মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন! আপনাদের একটা ছোট্ট ভুল বা এই বন্দুকের একটা ফায়ার এখানে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত, সে বিষয়ে ন্যূনতম কোনো ধারণা আছে আপনাদের?!”
মেহুলের ধারালো আর যুক্তিযুক্ত প্রশ্নের জবাবে লোকটির মুখে যেন কোনো উত্তর নেই। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করল। নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে, জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে অতি নিচু গলায় শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করল—
”আই অ্যাম সরি…”
হঠাৎ এমন ব্যবহারে মেহুল ব্যাস ধাক্কা খেলো। কারন সে তো ভেবেছিল লোকটি হয়তো নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য তর্ক করবে, মাস্তানির দম্ভ দেখাবে বা নিজের পক্ষে সাফাই গাইবে। কিন্তু সে সরাসরি বিনা শর্তে ‘সরি’ বলায় মেহুল আর কথা বাড়াল না। সে ধীর পায়ে ইমারজেন্সি রুমের দিকে হাঁটা দিল।
তবে যাওয়ার আগে, লোকটির সঙ্গীদের ও আশপাশের সবাইকে চরম কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলল—
”আর একটাও যদি অতিরিক্ত শব্দ মুখ দিয়ে বের করেন বা বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করেন, তবে আমি কিন্তু সরাসরি পুলিশকে ইনফর্ম করতে এক সেকেন্ডও দ্বিধা করব না! মনে থাকে যেন।”
বলেই মেহুল হনহন করে ইমারজেন্সির দিকে চলে গেল। আর পেছনে সেই শ্যামলা তরুণটি মেহুলের চলে যাওয়ার পথের দিকে এক অদ্ভুত, রহস্যময় আবেশে তাকিয়ে রইল—যেন এই সামান্য সময়ের দেখা মেহুল তার ভেতরের সমস্ত হিংস্রতাকে এক পলকে ভস্ম করে দিয়ে গেছে!
পরক্ষণেই সে মুচকি হেসে তার মোবাইল ফোনটি প্যান্টের পকেট থেকে বের করে একটা নির্দিষ্ট নাম্বারে কল লাগাল—যেন এই ফোনকলটি কারো বহুদিনের অমরত্ব-তৃষ্ণা মেটাতে চলেছে!
দুবাইয়ের এক অত্যাধুনিক শহরের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি আকাশচুম্বী বহুতল ভবন। সেটারই এক রাজকীয় ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে আলো-আঁধারির এক অদ্ভুত মায়াজাল ছেয়ে আছে।
স্বল্প আলোর সেই ঘরটিতে ঘরের আবহের সাথে মানানসই ক্যাজুয়াল পোশাকে বসে আছে এক অত্যন্ত সুপুরুষ তরুণ—সালমান শাহ নেওয়াজ (শিশির)।
ঘরের আবহাওয়ায় তখন চড়া তামাকের গন্ধ। অ্যাশট্রেতে জমা হয়ে আছে অসংখ্য আধপোড়া সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ। তবে সালমানের সমস্ত মনোযোগ আঁকড়ে ধরে রেখেছে সামনের দেয়ালজুড়ে থাকা বিশাল বড় স্মাট টিভিটি।
টিভির স্ক্রিনে বারবার ঘুরেফিরে ভেসে উঠছে সাধারণ একটা মেয়ের ছবি—চশমা পরিহিত, নিষ্পাপ ও কিছুটা বোকা বোকা চেহারার, যার দু-পাশে দুটো বেনুনি করা। মেয়েটি আর কেউ নয়, মেহুল!
সালমানের কাছে মেহুলের খুব বেশি ছবি নেই, মাত্র দশ থেকে বারোটি। কিন্তু সেই কয়েকটি ছবিই স্ক্রিনে একের পর এক স্লাইডশো হয়ে ঘুরছে। সালমান গভীর মনোযোগ দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে যেন ছবিগুলো গিলে খাচ্ছে! তাকে দেখে মনে হবে, এই মুহূর্তে তার কাছে পৃথিবীর আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজই অবশিষ্ট নেই।
প্রতিটি ছবি যখন ঘুরেফিরে চোখের সামনে আসছে, সালমানের ভেতরের অনুভূতির সাথে সাথে যেন তার মুখের অভিব্যক্তিও বদলে যাচ্ছে। কখনো চোখে ফুটে উঠছে গভীর হাহাকার, কখনো তীব্র টান, তো কখনো এক তীব্র পাগলামি! এ যেন এক অদ্ভুত, নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি!
এদিকে ফ্ল্যাটের বাইরে মিটিং রুমে তার সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছেন বড় বড় ব্যবসায়িক পার্টনাররা। কিন্তু এই মুহূর্তে রুমে ঢুকে সালমানকে ডেকে তোলার সাহস তার ব্যক্তিগত সেক্রেটারি ধ্রুবর হচ্ছে না। কারণ, সে খুব ভালো করেই জানে—সালমানের এই একান্ত মুহূর্তে তাকে বিরক্ত করা মানে নিজের জীবন নিজ হাতে শেষ করে দেওয়া!
অন্যদিকে দেয়ালের বিশাল স্ক্রিনে ভেসে থাকা চশমা পরিহিত নিষ্পাপ মেহুলের দিকে তাকিয়ে সালমান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সিগারেটের ধোঁয়া হাওয়ায় উড়িয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
”তোমাকে সাথে নিয়ে বিশ্বভ্রমণ করার তীব্র ইচ্ছে ছিল… ভ্রমণের ইচ্ছে তো পূরণ হচ্ছে, কিন্তু তুমি যে পাশে নেই! আর কত বিরহ দেবে আমায়, আমার অপ্সরা? আর কোথায় খুঁজব তোমাকে? এই হৃদয় যে আমার আর কোনো বারণ মানতে চাইছে না!
এ বিরহ যে বড্ড পোড়ায় আমাকে, তা তোমাকে কি করে বোঝাই…”
মেহুলের জন্য হৃদয়ের সুপ্ত ব্যাকুলতা আর হাহাকার যখন তাকে পুরোদমে গ্রাস করে নিচ্ছে, ঠিক তখনই তার কোলঘেঁষে রাখা ফোনটি সোফায় সশব্দে বেজে উঠল।
এমন একান্ত মুহূর্তে ফোনের নোটিফিকেশন শুনে সালমানের কপালে বিরক্তির গভীর ভাঁজ পড়ে গেল। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে ‘রবি’ নামটি জ্বলজ্বল করতে দেখেই তার মুখের কঠোরতা নিমেষে মিলিয়ে গেল। সে মুহূর্ত না ভেবেই কলটি রিসিভ করল।
কল রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে রবি অত্যন্ত ব্যাকুল ও উত্তেজনামাখা কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলে উঠল—
”আমি চট্টগ্রামে আছি, আর এখানে এসে ভাবীকে পেয়ে গেছি ভাই! আমাদের বছরের পর বছরের খোঁজ আজ সফল হলো! ভাবী এখন ঠিক আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে!”
রবির কাছ থেকে আকস্মিক এই খবরটি শুনে সালমান যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য একদম পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল! হৃদস্পন্দন থমকে গেল তার! যে মানবীকে বিগত দীর্ঘ পাঁচটি বছর ধরে সে দেশের আনাচে-কানাচে হন্যে হয়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে গেছে, অবশেষে তার সন্ধান মিলল?!
“ভাই শুনতে পাচ্ছো আমি কি বলেছি?” রবি উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলো।
স্তব্ধতা কাটিয়ে সালমান নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর অথচ কম্পিত কণ্ঠে বলল—
”কী বলছিস তুই?!”
”ঠিকই বলছি ভাই! আমরা ভাবীকে পেয়ে গেছি!”
সালমানের বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। অস্থির গলায় প্রশ্ন করল—
”কোথায় ও? এখন কোথায়? কেমন আছে সে?”
রবি হাপাতে হাপাতে উত্তর দিল—
”ভাবী এইমাত্র ইমারজেন্সি ওয়ার্ডের ভেতরে গেলো। কবিরের কপাল কেটে গেছে তো, ওকেই এখন ড্রেসিং করছে।”
সালমানের কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ল। মেহুল আর ইমারজেন্সি ওয়ার্ড? সে বিভ্রান্ত কণ্ঠে আওড়াল—
”ইমারজেন্সি ওয়ার্ড? ড্রেসিং করাচ্ছে মানে?”
রবি ওপাশ থেকে একগাল হেসে বলে উঠল—
”হ্যাঁ ভাই! ভাবী তো ডাক্তার! এখানে উনি ডিউটিতে আছেন।”
ডাক্তার?! কথাটা কানে পৌঁছাতেই সালমানের বিষণ্ণ ঠোঁটের কোণে পাঁচ বছর পর এক মায়াবী ও তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তার অপ্সরা আজ এত বড় এক পরিচয়ে নিজের জীবন গড়ে তুলেছে!
অতঃপর সালমান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারছে না। সে গভীর ব্যাকুলতায় ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল—
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ৯
”আমি ওকে দেখতে চাই। এখনই দেখতে চাই রবি!”
”সব ব্যবস্থা করছি ভাই, তুমি শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকো!”
অতঃপর দীর্ঘ বহুদিন, বহুবছরের হাহাকার আর তপস্যার পর সালমান তার অপ্সরাকে শুধু ফ্রেমে বাঁধানো ছবিতে নয়, বরং লাইভ ভিডিওর বদৌলতে একদম চোখের সামনে জীবন্ত দেখতে পাবে!
