Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১১

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১১

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১১
‎আফীফা আফনান

সকাল থেকেই আকাশটা থমথমে মেঘলা রূপ ধারণ করে আছে। মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তেই ঝুম বৃষ্টি নেমে পুরো ধরণীকে ভিজিয়ে দেবে। সতেজ গাছপালার সবুজ পাতাগুলো কালচে মেঘের ছায়ায় যেন নতুন রূপ ধারণ করেছে, বাতাসে বইছে আর্দ্র, হিমশীতল এক স্নিগ্ধ আমেজ। প্রকৃতি যেন আজ তার সমস্ত অপরূপ সৌন্দর্য উজাড় করে সাজিয়ে বসেছে।
‎​কিন্তু প্রকৃতির এই মনোরম রূপও আজ মেহুলের বিষণ্ণ মনকে স্পর্শ করতে পারছে না।
‎​বৃষ্টি বরাবরই মেহুলের ভীষণ পছন্দের। কিন্তু আজকের এই মেঘলা দিনটা কেন যেন ওর মনকে বড্ড ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। তার ওপর আজ হাসপাতালে ওর কোনো ডিউটি নেই। আগামীকাল সন্ধ্যায় এক সপ্তাহের জন্য রাজশাহীর সেই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে বের হতে হবে, তাই আজকের দিনটা ও ছুটি নিয়েছে।

‎​কিন্তু এই অবসরে মন যেন কিছুতেই শান্ত হতে চাইছে না। সবকিছু ছেড়ে বহুদূরে কোথাও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে ওর। হৃদয়ের গহীনে এক নাম না জানা দোলাচল, এক অকারণ হাহাকার অনবরত দোলা দিয়ে যাচ্ছে।
তাই ‎​অস্থিরতা কাটাতে মেহুল ঘর ছেড়ে ধীর পায়ে বাড়ির সামনের ছোট বাগানটায় এসে দাঁড়াল।
‎​ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। মেহুল অপলক দৃষ্টিতে নিজের বাড়ির দিকে তাকাল। একসময় এই বাড়িটা কত চেনা-পরিচিত মানুষে গমগম করত! কত আলো, কত হাসি-ঠাট্টা আর আনন্দের গুঞ্জন ছিল এখানে! অথচ আজ… সামান্য স্বার্থ আর চরম বিশ্বাসঘাতকতায় সবকিছু চুরমার হয়ে গেছে। যে যার মতো আলাদা হয়ে গেছে, পড়ে আছে শুধু স্মৃতি আর বিষাদের পাহাড়। সে সব মনে করেই ‎​মেহুল বুকচেরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‎​ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছনের দরজার কাছ থেকে রিনরিনে, অতি পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এলো—

‎​”কেমন আছ, মেহুপু?”
‎​এই নির্জন সকালে আকস্মিক এমন একটা পরিচিত ও প্রিয় কণ্ঠ শুনে মেহুল চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকাল।
‎​দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক মিষ্টি তরুণী। পরনে চকোলেট রঙের লং স্কার্ট আর হালকা গোলাপি টপস। কোঁকড়ানো চুলগুলো হালকা করে কাঁধে ফেলে রাখা।
‎​মেয়েটি আর কেউ নয়—তার মামা আজমল সাহেবের ছোট কন্যা, মিথিলা!

‎​শ্যামা গায়ের রঙে মিষ্টি এক মায়াবী মুখের মিথিলা দরজায় দাঁড়িয়ে অপূর্ব এক হাসি ছড়াচ্ছে। তার হাসিতে যেন কোনো খাদ নেই, একরাশ স্নিগ্ধতা আর চপলতা ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।
‎​মেহুল সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে মিথিলাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। আজমল মামার এই ছোট মেয়েটির মধ্যে অন্তত মামি আর আনিকার সেই বিষাক্ত ছায়াটা এখনও স্পর্শ করতে পারেনি। মেয়েটি এখনো ঠিক আগের ন্যায় নিষ্পাপ আর স্নিগ্ধ।
‎​মেহুলের ভাবনার জগৎ ছিন্ন করে দিয়ে হঠাৎ করেই মিথিলা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। দূর থেকে ছুটে এসে হুট করেই মেহুলকে শক্ত করে জাপটে ধরে জড়িয়ে ধরল!
‎​”অনেক দিন পর দেখলে বুঝি বোনকে এভাবে অপলক দৃষ্টিতে দেখতে হয়, মেহুপু?” মেহুলের বুকে মুখ গুঁজেই রিনরিনে কণ্ঠে আবদার মাখিয়ে বলে উঠল মিথিলা।
‎​মিথিলার এই আকস্মিক ও উষ্ণ জড়িয়ে ধরায় মেহুলের ভেতরের জমে থাকা সমস্ত বিষাদ আর মেঘলা ভাব যেন এক লহমায় উবে গেল। তাই সে-ও আলতো করে মিথিলার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম ভালোবাসায় তাকে জড়িয়ে ধরে মৃদু হাসল।

‎মেহুল মিথিলাকে নিজের জড়িয়ে ধরা থেকে কিছুটা আলাদা করে তার চিবুক ছুঁয়ে মৃদু হেসে বলল, “হঠাৎ কিছু না বলেই চলে এলি যে?”
‎​মিথিলা গাল দুটো ফুলিয়ে, ঠোঁট বাকিয়ে মিষ্টি আবদারের সুরে বলল, “তোমাদের সবার কথা খুব মনে পড়ছিল মেহুপু! তাই আর থাকতে পারলাম না, একবারে সারপ্রাইজ দিতে চলে এলাম।”
‎​মেহুল পরম আদরে মিথিলার কপালে ঝুলে থাকা কয়েকটা চুল সরিয়ে দিয়ে বলল, “খুব ভালো করেছিস। চল ভেতরে চল, মামা তোকে দেখলে অনেক খুশি হবেন।”
‎​মিথিলা আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে নিজের দু-হাত দিয়ে মেহুলের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, একদম ছোটবেলার মতো ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মেহুলের সাথে হাসিমুখে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
‎​বুকের ভেতরের জমাট মেঘগুলো মিথিলার এই আগমনে যেন এক লহমায় কিছুটা হলেও হালকা হয়ে এলো মেহুলের।

‎বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে মেহুল আর মিথিলা ভেতরে পা রাখতেই ভেতরের শান্ত পরিবেশটা যেন একঝিলিক আলোয় ভরে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে মিনারা বেগম ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। বসার ঘরে আর কেউ উপস্থিত ছিল না।
‎​হঠাৎ এই সাতসকালে মিথিলাকে সামনে দেখে মিনারা বেগম চমকে উঠে থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ-মুখে বিস্ময়ের পর মুহূর্তেই ভেসে উঠল অপত্য স্নেহের অপার আনন্দ। প্রায় চার মাস পর মেয়েটাকে দেখছেন তিনি!
‎​মিনারা বেগম দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে আসতেই মিথিলা মেহুলের হাত ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

‎​”কেমন আছ তুমি? শরীরের যত্ন নিচ্ছ তো ঠিকমতো?” মিনারা বেগমের বুকে মুখ গুঁজেই একাধারে প্রশ্ন ছুড়ে দিল মিথিলা।
‎​মিনারা বেগম পরম আদরে মিথিলার মাথায় হাত বুলিয়ে পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “আমি খুব ভালো আছি রে সোনা! কিন্তু তুই হঠাৎ করে না জানিয়ে একা একা চলে এলি? শরীর ঠিক আছে তো তোর? রাস্তায় কোনো কষ্ট হয়নি তো?”
‎​”উহু, একদম না! তোমাদের কথা বড্ড মনে পড়ছিল ফুপি, তাই আর থাকতে পারলাম না,” মিষ্টি হেসে জবাব দিল মিথিলা।
‎​কথা শেষ করেই মিথিলা একটু পিছিয়ে এসে বসার ঘরের একপ্রান্তের বন্ধ ঘরের দিকে তাকাল। তারপর সুর তুলে জোরে ডেকে উঠল—
‎​”বাবা! ও বাবা! দেখো তো কে এসেছে!”
‎​মেয়ের পরিচিত চঞ্চল কণ্ঠ কানে পৌঁছাতেই ভেতরের রুম থেকে হুইলচেয়ারের চাকা ঘোরানোর শব্দ পাওয়া গেল। একটু পরেই আজমল সাহেব নিজের হুইলচেয়ার গড়িয়ে গড়িয়ে রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
‎​বাবাকে দেখেই মিথিলা মিনারা বেগমকে ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে আজমল সাহেবের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। পরম ভালোবাসায় বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাঁর কোলে মাথা রেখে দিল।
‎​আজমল সাহেবের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। তিনি কাঁপাকাঁপা হাত দুটো মিথিলার মাথায় রেখে পরম মমতায় চুমু খেলেন।

‎​”আমার মামণিটা এসেছে… কতদিন পর দেখলাম তোকে! এই বুড়ো বাবাকে বুঝি দেখতে মন চায় না?” রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন আজমল সাহেব। বাবা-মেয়ের এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে বসার ঘরের পরিবেশটা এক লহমায় যেন ভীষণ আবেগঘন হয়ে উঠল।
‎​ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে দরজার লক খোলার শব্দ হলো। ধীরপায়ে ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে বাইরে বেরিয়ে এলেন শিরিনা বেগম। তবে মিথিলাকে সামনে দেখে তাঁর মুখাবয়বে বিশেষ কোনো আনন্দের রেখা ফুটল না, বরং তাঁর চোখ-মুখের হাবভাব দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল—মিথিলা যে আজ হুট করে বাড়ি আসবে, সে বিষয়ে তাঁর বিন্দুপরিমাণ ধারণাও ছিল না!
‎​শিরিনা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু কৃত্রিম মুচকি হেসে হালকা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কখন এলি মিথিলা? হঠাৎ না জানিয়ে চলে এলি যে?”
‎​মায়ের কণ্ঠ কানে যেতেই মিথিলা আজমল সাহেবকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শিরিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা হালকা, শুষ্ক হাসি দিল।

‎​”এইমাত্র এলাম মা। ইচ্ছে করলো না জানাতে তাই জানাইনি। ভালো আছ তুমি?” অতি সাধারণ কণ্ঠে বলল মিথিলা।
‎​শিরিনা বেগম শুধু মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে সংক্ষেপে বললেন, “হ্যাঁ, ভালো।”
‎​যে মেয়েটি বাড়িতে প্রবেশ করেই প্রথমে মেহুলকে আর তারপর মিনারা বেগমকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার ও উষ্ণতার সুবাস ছড়াচ্ছিল—নিজের আপন জন্মদাত্রী মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরার মতো বিন্দুমাত্র উৎসাহ তার ভেতরে দেখা গেল না! এমনকি শিরিনা বেগমের আচরণেও মেয়েকে কাছে টানার কোনো তাগিদ দেখা গেল না। মা-মেয়ের এই নীরব ব্যবধান যেন পুরো ঘরের আলোতেই একটা হালকা ছায়া ফেলে গেল।
ঠিক ‎​এসবের মাঝেই দরজার বেল বেজে উঠল। প্রতিদিনের মতো সকালে পার্ক থেকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলেন ইকবাল সাহেব। ড্রয়িংরুমে মিথিলাকে দেখেই তিনি একটু অবাক হলেন। মিথিলা সাথে সাথে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে বিনীতভাবে সালাম জানাল।
‎​ইকবাল সাহেব সালামের উত্তর নিয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “ভালো আছ মা? পড়াশোনা কেমন চলছে ঢাকাতে?”

‎​”জি ফুফা মণি, ভালো চলছে,” নম্র গলায় উত্তর দিল মিথিলা।
‎​ইকবাল সাহেব মাথা নেড়ে মিথিলার খোঁজখবর নিয়ে সোজা দোতলায় নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। আর মেহুল এতক্ষণ নীরব দর্শক হয়ে সবটা দেখার পর বসার ঘরের সোফায় গিয়ে আরাম করে বসল এবং পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রল করতে শুরু করল।
‎​তবে মিথিলা আসার পর থেকেই যেন বাড়ির রান্নাঘরের আবহাওয়া পুরোপুরি বদলে গেল! সকালের নাস্তার জন্য রান্নাঘরে থালা-বাসন আর কড়াইয়ের হুলস্থুল কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। মিনারা বেগম আর শিরিনা বেগম দুজন মিলে সবার জন্য ঢালাও নাস্তা তৈরিতে লেগে পড়লেন।
একসময় ‎​সময় গড়িয়ে দেয়ালঘড়ির কাঁটা তখন সকাল সাড়েনয়টার কাছাকাছি। সচরাচর দিনগুলোর চেয়ে আজ টেবিলে খাবারের বহর অনেক বেশি। মিনারা বেগম একে একে টেবিলে ধোঁয়া ওঠা পরোটা, ভাজি, হালুয়া, মিষ্টিসহ হরেক পদের নাস্তা এনে সুন্দর করে সাজাতে লাগলেন।
‎​ঠিক সেই সময়ে ওপর থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য একদম রেডি হয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো মিনার। সিঁড়ির মাঝামাঝি আসতেই সোফায় বসে থাকা মিথিলার দিকে নজর পড়তেই মিনারের চোখ দুটো শয়তানিতে চকচক করে উঠল!
‎​মিথিলাকে দেখে মিনার নিজের স্বাভাবিক গাম্ভীর্য হারিয়ে মুখে এক দুষ্টুমিভরা হাসি টেনে উচ্চস্বরে বলে উঠল—
‎​”ওরে বাবা রে! আজ সকালে সূর্য কোন দিকে উঠল রে ভাই? ঢাকা শহর থেকে আমাদের কুঁড়েঘরে কোন রাজকন্যা পদার্পণ করলেন? রাস্তা ভুল করে আসা নাকি!”

‎মিথিলা মিনারের চঞ্চল রূপ দেখে মিষ্টি করে হেসে বলে উঠল, “রাজপ্রাসাদে থেকেও যদি নিজের প্রাসাদকে কুঁড়েঘর বলে দাবি করো, তবে তো সেটা খুবই অন্যায়, মিনার ভাই!”
‎​মিনার সিঁড়ি থেকে শেষ ধাপে নেমে এসে মিথিলার মাথায় একটা হালকা গাট্টা মেরে বলল, “হয়েছে, আর ন্যাকামি করতে হবে না! আজ এতদিন পর বুঝি আমাদের কথা মনে পড়ল তোর?”
‎​মিথিলা হালকা হেসে আদুরে গলায় বলল, “তোমাদের কথা তো আমার সবসময় মনে পড়ে মিনার ভাই! শুধু পড়াশোনার প্রবল চাপের কারণে আসতে পারি না। এই যে আজ সব সামলে হুট করেই চলে আসলাম তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে!”
‎​মিনার একগাল হেসে একটা চেয়ার টেনে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ল। খানিক বাদে ওপর থেকে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলেন ইকবাল সাহেব। পরিবারের সবাই টেবিলে আসন গ্রহণ করতেই মিনারা বেগম বরাবরের মতোই নিজ হাতে সবার পাতে একে একে গরম গরম নাস্তা পরিবেশন করতে লাগলেন। অন্যদিকে শিরিনা বেগম তখনো রান্নাঘরের ভেতর এক মনে পরোটা বেলছিলেন।
‎​নাস্তা দেওয়া শেষ হলে সবাই একে একে খাওয়া শুরু করল। মিনারা বেগম মিথিলার দিকে এক চিলতে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মিথিলা, তুই যে আসবি, আমাকে আগে একটা ফোন করে জানাতে পারলি না?”

‎​মিথিলা পরোটার একটা ছোট টুকরো মুখে দিতে দিতে বলল, “আসলে ফুপি, আমার এখানে আসার সিদ্ধান্তটা গতকাল রাতেই হঠাৎ করে ঠিক হয়েছিল। তাই আর কাউকে ফোন করার সুযোগ পাইনি। তাছাড়া আমি একটা বিশেষ কাজে এসেছি।”
‎​”বিশেষ কাজ? কী কাজে এসেছিস রে? ভার্সিটির কোন কাজ?” মিনারা বেগম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
‎​মিথিলা প্লেট থেকে মুখ তুলে স্পষ্ট গলায় জবাব দিল, “আমি বাবা আর মাকে আমার সাথে ঢাকায় নিয়ে যেতে এসেছি।”
‎​মিথিলার কথাটা শেষ হতেই যেন পুরো ডাইনিং এরিয়াতে হঠাৎ এক মহাশূন্য নীরবতা নেমে এলো! সবার হাতের চামচ আর নাস্তা খাওয়া যেন থমকে গেল।
এদিকে ‎​কথাটা রান্নাঘর থেকে শিরিনা বেগমের কানে পৌঁছাতেই তিনি একপ্রকার তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। একপ্রকার চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “মানে কি এসবের?! কাকে জিজ্ঞেস করে তুই আমাদের নিতে এসেছিস, হ্যাঁ? আমি কোথাও যাব না!”

‎​শিরিনা বেগমের এমন উদ্ধত ব্যবহারে ডাইনিংয়ের পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠল। কেউ কিছু বলার আগেই হঠাৎ হুইলচেয়ারে বসে থাকা আজমল সাহেব এক চরম গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন—
‎​”আমরা আজ দুপুরেই মিথির সাথে ঢাকায় যাচ্ছি। আর এটা সম্পূর্ণ আমার সিদ্ধান্ত! মিথি আমার কথাতেই ঢাকা থেকে এখানে এসেছে আমাদের নিতে।”
‎​শিরিনা বেগম যেন আগুন হয়ে উঠলেন, “তোমার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি? এই অবস্থায় তোমাকে নিয়ে আমি এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না!”
‎​আজমল সাহেব এবার কঠোর দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বরফশীতল গলায় বললেন, “তুমি কি এই বয়সে এসে আমার থেকে তালাক চাও, শিরিনা?”
‎​আজমল সাহেবের মুখ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত ও কঠিন শব্দ শুনে শিরিনা বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন! তিনি অবিশ্বাস্য চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে বললেন, “কী… কী বলছ তুমি এসব?!”
“যা বলছি শুনতে পাও নি?” আজমল সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন।
“তোমার সাথে যে যাবো খবো কি থাকবো কোথায় সেটা খেয়াল আছে তোমার!” শিরিনাও তেতে উঠে বললেন।

তখনি মিথিলার বলে উঠলো, “আপনাদের কারো থাকার কষ্ট হবে না। আমি একটা ছোটখাটো চাকরি পেয়েছি মাসে একটা ভালো সেলারি পাই, একটা বাসাও ভাড়া নিয়েছি আশা করি এতে আমাদের হয়ে যাবে।”
শিরিনা রাগান্বিত চোখে মিথিলাকে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি, ‎​আজমল সাহেবের কণ্ঠস্বরে বিন্দুমাত্র নমনীয়তা ছিল না, তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে জানিয়ে দিলেন, “আমার সোজা কথা—তুমি যদি আজ আমার সাথে ঢাকায় না যাও, তবে আমি তোমাকে তালাক দিতে বাধ্য হব! এরপরে তুমি তোমার কী ব্যবস্থা করবে, সেটা তুমি নিজে বুঝে নিয়ো শিরিনা!”
‎​আজমল সাহেবের এমন রুদ্রমূর্তি আর কঠোর বার্তা শুনে শিরিনা বেগম আর একটি বাক্য উচ্চারণ করারও সাহস পেলেন না। তিনি আতঙ্কে আর রাগে রীতিনীতি ভুলে একপ্রকার গজগজ করতে করতে সেখান থেকে সোজা নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন।
‎​ডাইনিং টেবিলে নেমে এলো থমথমে ভাব। মিনারা বেগম আর ইকবাল শিকদার বেশ চিন্তিত মুখে আজমল সাহেবকে বোঝাতে লাগলেন—হঠাৎ করে এমন একটা চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?
‎​আজমল সাহেব ঠোঁটের কোণে মায়াবী কিন্তু ব্যথিত এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “আপনাদের সাথে তো অনেক বছর থাকলাম ভাইজান… এবার না হয় মেয়েটার সাথে গিয়ে শেষ কটা দিন কাটাই? মানুষের জীবনের তো কোনো ঠিকানা নেই, কখন কী হয়!”

‎​আজমল সাহেবের এমন আবেগঘন কথার পর মিনারা বেগম বা ইকবাল শিকদার—কেউ আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন তুললেন না।
‎​তবে মেহুল চুপচাপ বসে পুরো দৃশ্যটা দেখলেও সে ভালো করেই জানত মামার এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের পেছনের আসল কারণটা কী! গতকাল রাতে সে যখন পানি খেতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল, তখন মনি আর মামার কথোপকোথন সে শুনেছে সাথে আড়াল থেকে তাদের মধ্যকার গোপন কথোপকথন তার কানে এসেছিল। মিনারা বেগম আজমল সাহেবকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে কীভাবে শিরিনা বেগম চুরি করে আনিকাকে খাবার, টাকা আর ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র পাচার করছেন। মামা হয়তো সব শুনে নিজের এই আত্মসম্মানবোধ আর লজ্জা থেকেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে ‎​কথা শেষ হতেই সবাই পুনরায় যার যার নাস্তায় মনোযোগ দিল।
‎​ইকবাল সাহেবের নাস্তা শেষ হতেই তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিনারকে তাড়া দিলেন, “মিনার, তাড়াতাড়ি করো, অফিসে বেরোতে হবে। আজ গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে জানো তো!”
“জি আঙ্কেল।”‎​ বলেই মিনার রুটির শেষ অংশটুকুতে ডিম মুড়িয়ে মুখে পুরে দিয়ে দ্রুত বেসিনের দিকে এগিয়ে গেল।

‎​সবাই যখন টেবিল ছেড়ে ওঠার উপক্রম করছে, ঠিক তখনই মেহুল বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে উঠল, “বাবা, তোমার সাথে একটা কথা ছিল।”
‎​ইকবাল সাহেব পা থামিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন, “বল মা, কী কথা?”
‎​মেহুল একটু দ্বিধা কাটিয়ে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আগামীকাল রাজশাহী যাচ্ছি।”
‎​হঠাৎ মেহুলের এই আকস্মিক ঘোষণায় টেবিলে উপস্থিত মিনারা বেগম থেকে শুরু করে ইকবাল শিকদার—সবার চেহারার রং এক লহমায় বদলে গেল!
‎​ইকবাল শিকদার সামান্য থেমে, কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “হঠাৎ রাজশাহী? আগে তো আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলোনি মা?”
‎​মেহুল তখন পুরো ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্পের বিষয়টি বিস্তারিত বুঝিয়ে বলল এবং এটাও জানাল যে বিষয়টি সে নিজেও গতকালই জানতে পেরেছে।
সব শোনার পরে ‎​ইকবাল সাহেব বেশ কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় ডুবে রইলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, “ঠিক আছে, আমি এই বিষয় নিয়ে তোমার সাথে রাতে বিস্তারিত কথা বলব।”
‎​ঠিক তখনই মিনার রেডি হয়ে সেখানে এসে হাজির হওয়ায় ইকবাল সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে মিনারের সাথে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন।
‎​ইকবাল সাহেব বেরিয়ে যেতেই মেহুল মিনারা বেগমের দিকে তাকাল। মিনারা বেগম বেশ আশঙ্কাজনক দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। মেহুল মনি মায়ের দুশ্চিন্তা বুঝতে পেরে চোখের ইশারায় আলতো করে আশ্বাস দিয়ে বোঝাল—’টেনশন করো না মনি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

‎নিজের রুমের নিভৃত পরিবেশে বারান্দা ঘেঁষে রাখা বেতের চৌকিতে বসে আছে মেহুল। হাতে একটা থিক-কভারের সাইকোলজির বই। মানুষের মনস্তত্ত্ব আর সাইকোলজির জটিল সব মতবাদের ওপরই এখন তার পুরো মনোযোগ নিবন্ধ।
‎​ঠিক তখনই কাঠের দরজায় মৃদু করাঘাতের শব্দ ভেসে এলো। বাইরে থেকেই রিনরিনে কণ্ঠে ডেকে উঠল মিথিলা—
‎​”মেহুপু, ভেতরে আসব?”
‎​মিথিলার ডাকে মেহুল বইয়ের ওপর চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, আয় ।”
‎​দরজাটা আলতো ঠেলে রুমে প্রবেশ করল মিথিলা। ভেতরে ঢুকে সোজা গিয়ে মেহুলের বিছানার একদম মাঝখানে পা গুটিয়ে বসল। বসেই সে ঘরের চারপাশটায় গভীর চোখে একবার নজর ঘুরিয়ে নিল। মেহুলের ঘরটা ঠিক আগের মতোই ধবধবে পরিষ্কার আর পরিপাটি! কোনো কিছুর বিন্দুমাত্র নড়চড় ঘটেনি। শুধু বদলটা হয়েছে তার মেহুপুর ভেতর। সে সবটা শুনেছে তার বাবার কাছে। সাথে তার বান্ধবীরাও তাকে ফোন করে সবটা বলেছিলো। নিজের বোনের করা কুর্কিতি গুলো মনে পড়তেই মিথিলার শরির রাগে রি রি করে উঠলো। কে বলে বোনেরা একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়। কই তার আর আনিকার মাঝে তো কোন কিছুরই মিল নেই বরং সব অমিল।
ভাবতে ভাবতেই ‎​চারপাশ দেখা শেষে মিথিলা মেহুলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু দ্বিধাভরে বলল,

“আপু… একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
‎​মেহুল হাতের বইটা বন্ধ করে সাইড টেবিলে রাখল। তারপর মিথিলার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, কর।”
‎​মিথিলা একটু থমকে মেহুলের চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি… তুমি সত্যিই ঠিক আছো তো আপু?”
‎​মেহুল ঠোঁটের কোণে মায়াবী একটা মুচকি হাসি ফুটিয়ে বলল, “কেন রে? খারাপ থাকার কথা ছিল বুঝি?”
‎​”নাহ নাহ, আমি ঠিক সেটা বলতে চাইনি আপু…” মিথিলা একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় যোগ করল, “আসলে… আনিকা আপু আর আরমান ভাইয়া যা যা করেছে, তার পর থেকে—”
‎​মিথিলাকে কথা শেষ করতে দিল না মেহুল। সে তৎক্ষণাৎ হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। শান্ত অথচ সুদৃঢ় গলায় বলল, “অতীতের সেসব বিষাক্ত কথা বাদ দে মিথি। এসব নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না। তোর কথা বল, ঢাকায় একা একা কেমন আছিস?”
মেহুলের কথাতে ‎​মিথিলা থেমে গেলো মৃদু হেসে বলল, “আমি তো ভালোই আছি আপু। নতুন চাকরি খুব ভালো লাগছে। এখন মনে হচ্ছে যে নাহ আমিও কিছু করতে পারি।”
মিথিলার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে ‎​মেহুলের ঠোঁটের কোনাতেও হাসি ফুটলো,অতঃপর সে একটু থেমে, গভীর চোখে মিথিলার দিকে তাকিয়ে আলতো করে জিজ্ঞেস করল, “মামির সাথে এখনো রেগে আছিস, তাই না?”

‎​মেহুলের এই একটি প্রশ্নে মিথিলা একলহমায় চুপ মেরে গেল। ঘরের থমথমে বাতাসে শুধু তার একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পাওয়া গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর মিথিলা চোখ দুটো নামিয়ে অপরাধীর মতো কণ্ঠে বলল—
‎​”তুমি তো জানোই আপু, মা কেমন! তিনি ছোটবেলা থেকেই সর্বদা আমার চেয়ে আনিকা আপুকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন… আর এখনো দেন। আর এর সবচেয়ে বড় কারণ কি জানো? আমার গায়ের এই শ্যামলা রঙটা!”
‎​মিথিলা একটু থেমে একটা কষ্টের হাসি হাসল। যে হাসিতে ফুটে উঠল এক অবহেলিত কন্যা সন্তানের হাজারো জমানো আক্ষেপ। সে বলতে লাগল—
‎​”আমি শ্যামলা রঙের দেখতে বলে মা সবসময় আমার প্রতি একপ্রকার উদাসীন ছিলেন। আর আনিকা আপু দেখতে ফর্সা, সুন্দর… তাই আপুই মার কাছে রাজকন্যা, মার সবটুকু আদরের একমাত্র দাবিদার! আজও সেই বৈষম্য এতটুকু কমেনি আপু। বাহ্যিক রূপটাই যে মার কাছে সন্তানের ভালোবাসার মাপকাঠি ছিল, তা আমি হাড়হাড় টের পেয়েছি।”

‎​সুন্দর আর কালোর মধ্যকার এই বিষাক্ত বৈষম্যের তীব্র আঘাত মিথিলার কণ্ঠে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
‎​কথাগুলো শুনে মেহুলের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল। সে মিথিলার বুকের অদেখা কষ্টটুকু খুব ভালোভাবে বুঝতে পারল। কারণ শিরিনা বেগমের এই কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা আর অন্ধ রূপের মোহ সম্পর্কে এই বাড়ির সবাই কমবেশি অবহিত। তাইতো মা হিসেবে শিরিনা মিথিলাকে যে ভালোবাসা দেয় নি সেটা দিয়েছে মিনারা। আর মিনারার জন্যই মিথিলাকে খুব পছন্দ করে মেহুল কারন দুজন মিনার কাছে একসাথে মানুষ হয়েছে।
হঠাৎই ‎​পরিস্থিতি আর আবহাওয়াটা ভারী হয়ে উঠছে দেখে মেহুল মিথিলার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। বিষয় পাল্টানোর জন্য সে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল—
‎​”ছেড়ে দে তো সেসব কথা! তোর আইন বিষয়ক অনার্স শেষের প্রিপারেশন কেমন চলছে বল? ভার্সিটির পড়াশোনা সামলাতে পারছিস ঠিকঠাক? আর হ্যাঁ… জীবনে নতুন কোনো বিশেষ কেউ এলো নাকি, এইযে এত পড়াশোনার বাহানা করিস তা কি আদো সত্য নাকি…?”

‎​মেহুলের শেষ কথায় মিথিলা এক মুহূর্তের জন্য লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে ফেলল। তারপর মেহুলের দিকে তাকিয়ে হালকা দুষ্টুমির সুরে নিজের পড়ার গল্প, হোস্টেল লাইফের নানা ঝুটঝামেলা আর জীবনের নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
‎​এভাবে দুই বোনের মধ্যে একের পর এক খুনসুটি আর হৃদয়ের সুপ্ত অনুভূতির আদান-প্রদান চলতে লাগল। দীর্ঘদিন পর যেন একে অপরের কাছে মনের দরজা পুরোটাই খুলে দিল তারা।
‎​সকাল থেকে মেঘলা আকাশের সাথে সাথে মেহুলের মনটা যতটা বিষাদে ভারাক্রান্ত ছিল, মিথিলার চঞ্চল উপস্থিতি আর এই আন্তরিক কথোপকথনে তা যেন আস্তে আস্তে রোদের মতো নির্মল আর হালকা হতে শুরু করল।

‎ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক দুপুর দুটো।
‎​হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আগত বিশেষ ফ্লাইটটি অবতরণ করেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। ভিআইপি এক্সিট টার্মিনাল পেরিয়ে ডাবল-ব্রেস্টেড গাঢ় ব্ল্যাক সুট আর চোখে ডার্ক সানগ্লাস চড়িয়ে অত্যন্ত স্টাইলিশ ভঙ্গিতে হেঁটে বেরিয়ে আসছে সালমান শাহ নেওয়াজ।
‎​তার প্রতিটা পদক্ষেপে যেমন ফুটে উঠছে রাজকীয় আভিজাত্য, তেমনই রয়েছে এক অদ্ভুত, প্রখর অহংকার। পারফিউমের তীব্র সুবাসে চারপাশ মাতিয়ে সালমান যখন লম্বা কদমে হেঁটে এগোচ্ছিল, তখন আশেপাশের সব নারীর দৃষ্টিই একলহমায় তার ওপর এসে আটকে গেল! কিন্তু সালমানের সেদিকে সামান্যতম মনোযোগও নেই। আশেপাশের জগৎ তার কাছে পুরো অর্থহীন, কারণ সালমানের সমস্ত মন-প্রাণ আর ধ্যান-জ্ঞান এখন শুধুই তার ‘অপ্সরা’র ওপর নিবন্ধ!
‎​টার্মিনালের বাইরে পা রাখতেই সামনেই ব্র্যান্ড নিউ ব্ল্যাক মার্সিডিজ বেঞ্জ এসে থামল। সালমানের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল রবি। সাথে সাথে গাড়ি থেকে নেমে পেছনের সব সাঙ্গপাঙ্গরা মাথা নত করে অত্যন্ত শ্রদ্ধায় কুপোকাত হয়ে তাকে কুর্নিশ জানাল।
‎​সালমান রবিকে দেখে অন্য কোনো কুশলবিনিময় ছাড়াই সোজা ও গম্ভীর গলায় প্রশ্ন ছুড়ল—

‎​”ও কোথায়? ওর সমস্ত ইনফরমেশন জোগাড় হয়েছে?”
‎​রবি বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একটা নেভি ব্লু কালারের সিক্রেট ফাইল সালমানের দিকে বাড়িয়ে দিল। সালমান গাড়ি পেছনের সিটে গিয়ে বসেই অধীর আগ্রহে ফাইলটি খুলতে শুরু করলো।
‎​ফাইলটা খুলতেই প্রথম পাতায় ডাক্তারের অ্যাপ্রন পরিহিত মেহুলের এক মায়াবী ও অপূর্ব ছবি ভেসে উঠল! সালমান যেন নিজের অজান্তেই শ্বাস আটকে ফেলল। সে এক অদ্ভুত মুগ্ধতায় নিজের আঙুলের ডগা দিয়ে ছবির মেহুলের স্নিগ্ধ মুখশ্রী আলতো করে ছুঁয়ে দেখল। এক অদ্ভুত শিহরন জাগলো তার সর্বাঙ্গে।
‎​অতঃপর তার ধারালো দৃষ্টি ঘুরে গেল ফাইলের প্রতিটি ছত্রে ছত্রে লেখা টেক্সটগুলোর ওপর—
‎​নাম: অপ্সরী মেহুল ইকবাল
‎​পিতার নাম: শিকদার জাবেদ ইকবাল
‎​মাতার নাম: মোহনা শিকদার
‎​জন্মস্থান: চট্টগ্রাম
‎​স্থায়ী ঠিকানা: চট্টগ্রাম
‎​উচ্চতা: ৫’ ২”

‎​রক্তের গ্রুপ, পছন্দের রং, পছন্দের স্থান, খাবার, কাজের ক্ষেত্র, অভ্যাস থেকে শুরু করে মেহুলের জীবনের প্রতিটা খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে লেখা রয়েছে সেখানে। সালমান লাইনগুলো বারবার পড়তে লাগল—যেন প্রতিটা অক্ষর তার মস্তিষ্কে আর হৃদয়ে স্থায়ীভাবে মুখস্থ করে নিচ্ছে! তার অপ্সরার প্রতিটি বিস্তারিত তথ্য এখন তার হাতের মুঠোয়।
‎​ঠিক তখনই, গাড়িটা এয়ারপোর্টের মেইন সিগন্যালে স্লো হতেই সালমান অভ্যাসবশত গাড়ির কাঁচের ব্ল্যাক গ্লাসের দিকে তাকাল।
‎​আর অমনি তার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল!
‎​গাড়ির ঠিক কয়েক গজ সামনে, রাস্তার এক পাশে হালকা বাতাসে ওড়না সামলে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং মেহুল!
‎​সালমানের জীবনের গতি যেন সেখানেই একলহমায় থমকে গেল। এই প্রথমবার… সম্পূর্ণ প্রথমবার সে নিজের রক্ত মাংসের অপ্সরাকে এত কাছাকাছি নিজের চোখের সামনে দেখছে! ৪ থেকে ৫ সেকেন্ডের এক সামান্য ঝলক মাত্র! কিন্তু সালমানের কাছে মনে হলো, এই ৫ সেকেন্ড যেন অনন্তকালের চেয়েও বড়, এক স্বর্গীয় অনুভূতির পূর্ণতা! মেহুলের ওই স্নিগ্ধ মুখ, উদাস দৃষ্টি আর মায়াবী রূপ তাকে মুহূর্তেই পাগল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

‎​”দরজা খোল! রবি, ওপেন দ্য ডোর রাইট নাউ!”—সালমান একপ্রকার পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল।
‎​হুট করে সালমানের এমন উন্মাদের মতো চিৎকারে রবি থতমত খেয়ে দ্রুত সেন্ট্রাল লক আনলক করে দিল। সালমান গাড়ির দরজা এক ঝটকায় খুলে প্রায় রীতিনীতি ভুলে হুড়মুড় করে বাইরে বেরিয়ে এলো!
‎​”মেহুল!”
‎​সালমান হন্যে হয়ে চারপাশে খুঁজতে লাগল। সানগ্লাসটা খুলে পকেটে পুরে সে পাগলের মতো প্রতিটা মানুষের মুখ দেখছে। কিন্তু কোথায় মেহুল? কোথায় তার অপ্সরা? ভিড়ের মাঝে সে যেন এক লহমায় হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
‎​এদিকে সালমান যখন ভিড়ের মাঝে এক বুক হাহাকার আর তীব্র ব্যাকুলতা নিয়ে মেহুলকে খুঁজে মরছে, ঠিক তখনই মেহুল, মিনারা বেগম আর মিনারকে নিয়ে নিজেদের গাড়িতে চেপে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে।
‎​কারণ আজমল মামা, শিরিনা বেগম আর মিথিলাকে ঢাকা অভিমুখী ফ্লাইটে বিদায় জানাতেই তারা সবাই দুপুরে একসাথে বিমানবন্দরে এসেছিল! কিন্তু ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা—সালমান মেহুলকে সামনাসামনি দেখে ফেললেও, মেহুল জানতেই পারল না যে তার অস্তিত্বের পিছু নিয়ে এক তীব্র তাণ্ডব আজই এই শহরে অবতরণ করেছে!

‎ইকবাল সাহেবের রুমে মুখোমুখি বসে আছে মেহুল। বেশ কিছুক্ষণ দুজনই নিশ্চুপ। ঘরের থমথমে নীরবতা ভেঙে অবশেষে ইকবাল সাহেবই ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “তাহলে তুমি রাজশাহী যাচ্ছই, মা?”
‎​মেহুল একটু নীরব থেকে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ বাবা, আমাকে আমাদের টিমের সাথে যেতেই হবে। এটা আমার পেশাগত দায়িত্ব।”
মুহুর্তেই ‎​ইকবাল সাহেবের চোখে-মুখে এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তার ছায়া ফুটে উঠল। তিনি আকুল দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “না গেলে চলে না মা? এই হাসপাতালেই থেকে নিজের কাজ কর না হয়! দরকার পড়লে বাবা তোমার জন্য নিজের খরচে একটা বড় ফ্রি ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি!”
‎​মেহুল তার বাবার মনের ভেতরের অচেনা ভয় আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব বুঝতে পারল। তাই সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইকবাল সাহেবের দুটো হাত পরম মমতায় নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তারপর আলতো হেসে বলল—
‎​”দুনিয়া যা-ই বলুক না কেন, আমি তুমি ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস করি না বাবা! তাই তোমার ভয় পাওয়ার বা দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। আর আমি তো একজন ডাক্তার, বাবা! পরিস্থিতি যা-ই হোক, কখনো নিজের দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে আসতে পারি না। তুমিই তো আমাকে শিখিয়েছিলে—জীবনে যাই হয়ে যাক না কেন, কখনো হেরে যেতে নেই! বাধা যত বড়ই হোক, শত গুণ শক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।”

‎​মেহুলের এই পরিপক্ক ও সাহসী কথা শুনে ইকবাল সাহেব যেন নতুন করে বুড়ো বুকে সাহস ফিরে পেলেন। তিনি মনের সব শঙ্কা ঝেড়ে ফেলে গভীর স্নেহভরে বললেন, “তুমি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিস মা, তবে বাবা হয়ে আমি আর তোমাকে আটকাব না। শুধু এটুকু সবসময় মনে রাখবে—জীবনের চলার পথে তুমি নিজের পাশে কাউকে পাও বা না পাও, তোমার এই বুড়ো বাবাকে সবসময় নিজের ছায়া হিসেবে পাবে।”
‎​মেহুল এক চিলতে মিষ্টি হেসে পরম শ্রদ্ধায় বাবার হাতের মুঠোয় নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ভালোবাসার পরশ দিল। অতঃপর সে খাটের পাশের ড্রয়ারের দিকে এগিয়ে গেল। ড্রয়ার খুলে ইকবাল সাহেবের রাতের নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ বের করে এক গ্লাস পানিসহ বাবার হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এবার চুপচাপ ওষুধটা খেয়ে নাও তো!”
‎​ইকবাল সাহেব বাধ্য সন্তানের মতো ওষুধটা খেয়ে নিঃশব্দে খাটে শুয়ে পড়লেন। মেহুল ডিম লাইটটা জ্বালিয়ে দিয়ে ঘরের মেইন লাইট নিভিয়ে দিল। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, “গুড নাইট, বাবা।” বলেই ‎​কক্ষ থেকে বের হয়ে মেহুল সোজা নিজের রুমে চলে এলো। ভেতর থেকে দরজার লকটা আটকে দিয়ে সে সোজা গিয়ে নিজের আলমারিটা খুলল। আলমারির একদম ভেতরের গোপন কোণ থেকে বের করে আনল তার প্রয়াত মায়ের স্মৃতিবিজড়িত সেই পুরনো ডায়েরিটা।

‎​বেশ কিছুক্ষণ ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো অলস আঙুলে উল্টেপাল্টে দেখে সে ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
‎​রাতের শীতল বাতাসে মেহুলের চুলগুলো হালকা উড়ছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা কাটার পর থালাবাসনের মতো জ্বলজ্বল করছে পূর্ণাঙ্গ চাঁদ। মেহুল অপলক দৃষ্টিতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে যেন কাল্পনিকভাবে তার মায়ের সাথেই কথা বলতে লাগল—
‎​’মা… তুমি যেখানেই থাকো, নিশ্চিন্তে থেকো। তোমার শেষ ইচ্ছে আমি শত কষ্টের বিনিময়ে হলেও পূরণ করব। আমি বাবাকে কখনো একা হতে দেব না… বাবার পাশে সবসময় বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকব, কথা দিলাম মা।’
‎​মেহুল যখন উদাস মনে রূপালী আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ভাবনায় ডুব সাঁতার কাটছিল, ঠিক তখনই তাদের বাড়ির সামনের নিঝুম গলির ল্যাম্পপোস্টটার নিচে আবছা ছায়ায় দাঁড়িয়ে ছিল এক সুঠামদেহী মানবমূর্তি!
‎​পুরো কালো কাপড়ে নিজেকে আবৃত করে ল্যাম্পপোস্টের নিচে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সালমান!
‎​আজ দুপুরের পর থেকে মেহুলকে একটুখানি দেখার আকুলতায় সে এই দূর থেকে নজর রাখছিল। অবশেষে তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে—তার রূপকথার ‘অপ্সরা’ এখন তার চোখের ঠিক সামনে, খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে!

‎​মাঝে কয়েক গজ দূরত্ব আর একরাশ অন্ধকার ছাড়া আর কোনো ব্যবধান নেই। বাহ্যিক দূরত্ব থাকলেও সালমানের মনে হচ্ছে, তার হৃদয় আজ অপ্সরার হৃদয়ের বড্ড কাছাকাছি চলে এসেছে!
‎​সালমানের চোখ দুটোতে আজ গভীর এক অদ্ভুত মুগ্ধতা আর অনুভূতির প্রখর আলো জ্বলছে। সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেহুলের মায়াবী অবয়বের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মোহাচ্ছন্ন হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
‎​”আমার আঁধার মেটানোর একমাত্র আলো তুমি, আমার অপ্সরা… বহু দূরে পালিয়েও লাভ নেই, কারন এই সালমান শাহ নেওয়াজের সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার যে তোমার সাধ্যে নেই!”

এদিকে ‎বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে দেখতে হুট করেই মেহুলের দৃষ্টি নিচের শান্ত, নিঝুম গলিটার দিকে চলে গেল।
‎​আর অমনি ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আবছা আলোয় তার চোখ আটকে গেল নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটার ওপর! রাস্তার ঠিক ওপারে, ল্যাম্পপোস্টকে পিঠ দিয়ে—মাথা থেকে পা পর্যন্ত কুচকুচে কালো পোশাকে নিজেকে ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময় পুরুষ।
‎​অন্ধকারের আবহ ছাপিয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল!
‎​ওপরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধ মেহুল, আর নিচে দাঁড়ানো মোহাচ্ছন্ন সালমান।
‎​চোখে চোখ মিলতেই সালমানের বুকের ভেতরটা যেন তোলপাড় করে উঠল! তার মনে হলো, চারপাশের সময়, বাতাস আর মহাবিশ্বের গতি যেন একলহমায় থমকে স্থির হয়ে গেছে। পুরো দুনিয়ায় এখন আর কেউ নেই—আছে শুধু তার অপ্সরা আর সে নিজেই! চোখের সেই কয়েক সেকেন্ডের চাহনিতে সালমানের প্রতিটি ধমনীতে যেন উন্মাদের মতো ভালোবাসার উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল।
‎​এদিকে মেহুল ভুরু জোড়া মারাত্মকভাবে কুঁচকে ফেলল।

‎​শ্রাবণের এই ভ্যাপসা গরমে, যেখানে স্বাভাবিক পাতলা কাপড়েও টেকাই দায়, সেখানে একটা মানুষ টুপি-হুডি দিয়ে নিজেকে একদম মুড়িয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে তাদের বাড়ির দিকে এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে আছে!
‎​মেহুল বিরক্তি আর তাচ্ছিল্যে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক হাত গালে দিয়ে নিচে তাকাল। তারপর এক চিলতে বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে আপনমনেই ফিসফিস করে বলে উঠল—
‎​”পাগল নাকি রে বাবা! এই কাঠফাটা ভ্যাপসা গরমেও কেউ এমন কম্বল মার্কা পোশাক মুড়ি দিয়ে রাস্তায় খাড়া হয়ে থাকে? দিন দিন দেখছি এই শহরে পাগলের আনাগোনা বড্ড বেড়ে যাচ্ছে! পাবনা থেকে পালিয়ে সোজা আমাদের বাড়ির সামনে এসে ল্যাম্পপোস্ট ধরে ধ্যানে বসল নাকি আবার?”
‎​কথাটা বলেই মেহুল সালমানের মহাজাগতিক সেই প্রেমময় চাহনিকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে,আর সেখানে দ্বাড়ালো না বরং রুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বারান্দার কপাট দুটো ঠাস করে বন্ধ করে দিল!

‎​এদিকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সালমানের ঘোর তখনও কাটেনি। কিন্তু হঠাৎ বারান্দার দরজা বন্ধের শব্দে সে থমকে গেলো কিন্তু পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোনে হাসি রেখা আরো গাঢ়ো হয়ে ফুটে উঠলো। সে এক রহস্যময় হাসি দিয়ে আওড়ালো, “এটা তো কেবল ক্ষণিকের আড়ালে যাওয়া, মনে রেখো অপ্সরা সময় বদলায়, পরিস্থিতি পাল্টায়, নাটকের দৃশ্যপটও বদলে যায়—কিন্তু বদলায় না কেবল এই হৃদয়ের স্পন্দন, তোমার প্রতি জমা রাখা ভালোলাগা, আর সেই প্রথম দিনের তীব্র সম্মোহন।

‎​তোমাকে যেদিন প্রথম মন দিয়েছিলাম, তুমি তখন এক নাদান, অবুঝ বালিকা। আর আজ? আজ তুমি এক পূর্ণাঙ্গ মানবী। সত্যি বলতে, তোমার সেই ছেলেমানুষী রূপটাই আমি আজ অবধি ভুলতে পারিনি… আর সেখানে আজকের এই রূপ? উফফ! এই রূপে তোমাকে ভুলে থাকা যে কতটা অসম্ভব, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না অপ্সরা!
‎​তাই আমার হৃদয়ের চেনা সীমানায় যখন তোমার আগমন আরও একবার হলো, আমার এই তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি যখন ভিড়ের মাঝেও কেবল তোমাকেই খুঁজে নিল… তখন বুঝে নিও, এই মায়াজাল থেকে তোমার আর কোনো মুক্তি নেই!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১০ (২)

সেদিন পরিস্থিতির কারনে মন থেকে চেয়েও তোমাকে আটকে রাখতে পারিনি, কিন্তু আজ… আজ থেকে তুমি হাজার চেষ্টা করেও আমার থেকে দূরে যেতে পারবে না। কারন সেদিন সময়টা হয়তো তোমার অনুকূলে ছিল, কিন্তু আজকের এই ভাগ্য, এই মুহূর্ত, আর এই পুরো সময়টা… কেবলই মাএই আমার।”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ১২