Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৮

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৮

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৮
jannatul firdaus mithila

“ ডাক্তার হয়েও কেউ এমন বোকাসোকা কথাবার্তা বলে ডাক্তার সাহেব? আজ নাহয় কাল তো ঠিকই ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে আমাদের তাই-না?”
নাছোড়বান্দা রৌদ্র। নিজের বাক্যে অটল। মেয়েটাকে বুকের মাঝে আরও খানিকটা চেপে ধরে বলল,
“ না..লাগবে না ওসব।আমার গোটা একটা জীবনের জন্য তুই-ই যথেষ্ট সানশাইন। আমি তোর হেলথের সাথে কোনোরকম কম্প্রোমাইজ করতে পারবোনা।”

অরিন এবার মোচড়াচ্ছে। ঠেলেঠুলে রৌদ্রের বুক থেকে মাথা তুলে চাইলো ছলছল চোখে। রৌদ্রের দৃষ্টি থমকায় আবারও। বুকে উঠে অনাকাঙ্ক্ষিত কম্পন। মেয়েটা কেনো বোঝেনা তাকে? কেনো বোঝেনা তার ভয়গুলো? রৌদ্র ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো।অরিনকে ছেড়ে দিলো আলগোছে। কাবার্ড হাতড়ে কাপড় বের করে হাঁটা ধরলো বিছানার কাছে। অরিনও পিছুপিছু এলো।রৌদ্র প্যান্ট পরতে নিলেই, ছেলেটাকে পেছন থেকে সবেগে এসে জড়িয়ে ধরে অরিন। ঘটনার আকস্মিকতায় রৌদ্র বোধহয় নড়লো খানিকটা। বেচারার হাত থেকে প্যান্টটাও কেমন খসে পড়লো মেঝেতে। অরিনের দু’হাত ধীরেসুস্থে উঠে আসে রৌদ্রের মেদহীন পেট বরাবর। সেথায় আলতো হাতের পরশ একেঁ, অরিন কেমন কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ওঠে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ আমরা কী এ নিয়ে আরেকবার ভাবতে পারিনা?”
রৌদ্রের চোয়াল শক্ত হলো এবার। মাথার তালু জ্বলে ওঠল মুহুর্তেই। ছেলেটা তৎক্ষনাৎ ঝটকা মেরে অরিনের হাতদুটো সরিয়ে দেয় পেটের ওপর থেকে। তড়িৎ পেছনে ঘুরে শক্ত চোখে তাকায় অরিনের পানে।অরিন ভড়কায়।শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে নিজ অজান্তেই। রৌদ্র তৎক্ষনাৎ দু-আঙুলে অরিনের চোয়াল চেপে ধরে শক্ত করে। ভীষণ রাগ নিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,
“ যা বলেছি,তা বলেছি! এর পিঠে আরেকটা কথাও নয়। এই প্রসঙ্গে আমার কথাই লাস্ট কথা। নেক্সট টাইম এ বিষয়ে আর কথা বলতে আসবি না।গট ইট?”

চোয়ালের ব্যাথায় চোখমুখ কুঁচকে রেখেছে অরিন। ইতোমধ্যেই চোখের কোণে জমেছে কয়েক ফোঁটা অশ্রু কণা।তা দেখামাত্রই রৌদ্রের টনক নড়ল যেন। সে তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিলো মেয়েটার চোয়াল। তবে আজ আর যেচে পড়ে আদর করলোনা না অরিনকে।থাকুক এভাবেই। একটু-আধটু শাসন-বারণ না করায় মেয়েটা কেমন মেজাজ দেখাচ্ছে ইদানিং! রৌদ্র চোয়াল শক্ত রেখেই হাত বাড়ালো মেঝেতে। পড়ে থাকা প্যান্টটা খানিক ঝাড় দিয়ে পরতে লাগলো নিজ আঙ্গিকে। একে একে গায়ে শার্টও জড়ালেন সুদর্শন যুবক। পাক্কা প্রফেশনালিজম মেইনটেইন করে ইন করে পড়লেন শার্টটা।কপাল বরাবর লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুলগুলোয় আঙুল বোলাতে বোলাতে চলে গেলেন ড্রেসিং টেবিলের সামনে। তারপর আয়নায় চোখ রেখেই চুল সেট করলেন, বা-হাতে পড়লেন ব্র্যান্ডেড ওয়াচ।

গায়ে স্প্রে করলেন টম ফোর্ডের উডি পারফিউম। মুহুর্তেই পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে গেলো এক অসাধারণ সুবাস। ওদিকে অরিনটা কেমন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। রৌদ্র আয়নায় চোখ রেখেই স্পষ্ট দেখলো তা।মুহুর্তেই মনটা কেমন ভার হয়ে গেলো তার। সে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে আবারও এগিয়ে আসে অরিনের নিকট। হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে আলতো করে টেনে নেয় নিজের বুক-পিঞ্জরের মাঝে। অরিন এবার তেজ দেখাচ্ছে। রৌদ্র তাকে নিজ বুকে টানলেও অরিন সরে যেতে চাইছে বারংবার। রৌদ্র মুচকি হাসলো মেয়েটার এহেন প্রয়াসে। হাতের বাঁধন আরও খানিকটা জোরালো করে মেয়েটাকে জড়িয়ে রাখলো নিজের সঙ্গে। ওদিকে অরিন ছেলেটার বুক বরাবর দু’হাত দিয়ে ক্রমাগত ঠেলছে,মোচড়াচ্ছে ছাড়া পেতে অথচ বলিষ্ঠদেহী যুবক যেন নড়লোও না একটুও! প্রায় বেশ কিছুক্ষণ এহেন নিরব দ্বন্দ্ব চালিয়ে অরিন থামলো অবশেষে। মাথা নুইয়ে নাক টানলো বেশ। কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,

“ ছাড়ুন আমায়!”
রৌদ্র হাসলো একটুখানি। অরিনের মসৃণ ললাটে অধরযুগলের নরম স্পর্শ একেঁ দিলো আলগোছে। অরিন বুঝি শান্ত হলো কিছুটা।রৌদ্র মেয়েটার ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখেই ভরাট কন্ঠে বলল,
“ তোমার যত রাগ-ক্ষোভ, অভিমান আছে সবকিছুকে আমি সাদরে গ্রহণ করলাম সানশাইন। সবটাকে মাথা পেতে মেনে নিলাম, তবুও আমার কাছ থেকে দূরে যাওয়ার কথা ভুলেও মুখে এনো না বউজান। আমি সইতে পারবোনা এসব।বিশ্বাস করো, একেবারে মরে যাবো।”

নাক টানছে অরিন। নখ দিয়ে খুটাচ্ছে রৌদ্রের বুকের কাছের শার্টের অংশ। রৌদ্র এবার আলগোছে ঠোঁট সরালো মেয়েটার ললাট হতে। ধীরে ধীরে ঠোঁট নামিয়ে আনলো মেয়েটার ফোলা ফোলা কপোল দ্বয়ে।সেথায় বেশ শব্দ করে চুমু খেয়ে তবেই ক্ষ্যান্ত হলেন ডাক্তার সাহেব। বেহায়া মনটা তার বারকয়েক মেয়েটার নরম গোলাপি অধরজোড়ায় কর্তৃত্ব চালানোর মন্ত্রনা দিলেও রৌদ্র বেশ কৌশলে নিজেকে সামলে নিলো। এমুহূর্তে আরেকটু আগাতে গেলেই নিয়ন্ত্রণ হারাবার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এরচেয়ে বরং থাক..রাতে এসে নাহয়..এহেম এহেম যা হওয়ার হবে।
রৌদ্র ছাড়লো মেয়েটাকে। অরিনের গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,

“ আর মন খারাপ করে থেকো না হানি। রাতে এসে তোমার সকল মন-খারাপ গুলো ভেঙে দিব প্রমিস। ততক্ষণ নাহয় একটু হাসি খুশি থাকো কেমন?”
মুখ কুঁচকায় অরিন। চোখ না তুলেই বিরবির করে বলে,
“ নির্লজ্জ!”
কথাটা বেশ শুনলো রৌদ্র। সে তৎক্ষনাৎ ঠোঁট কামড়ে হাসলো। সামান্য ঝুকেঁ অরিনের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“ লুক হু ইজ টকিং এবাউট দেট! যে কি-না নিজেই আমার সাথে যখন-তখন নির্লজ্জতা করতে উঠে পড়ে থাকে সে-ই কি-না আমাকে বলছে নির্লজ্জ? আহা…দেটস নট ফেয়ার হানি!”
এপর্যায়ে কানদুটো কেমন ঝা ঝা করে ওঠে অরিনের।সে তৎক্ষনাৎ মুখ কুঁচকে তাকায় রৌদ্রের পানে। গলায় কেমন ঝাঁঝ ঢেলে বলে,

“ মিথ্যে কথা বলবেন না। আমি আবার কখন আপনার সাথে নির্লজ্জতা করলাম?”
দুষ্ট হাসলো রৌদ্র। বাঁকা চোখে মেয়েটাকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে দুষ্ট কন্ঠে বলল,
“ রাতে এসে বলব হানি। একটু ভিন্নভাবে। এখন যেতে হবে তো!”
অরিন মুখ বাঁকায়। নাক ফুলিয়ে তাকায় অন্যদিকে।রৌদ্র আর ঘাঁটল না মেয়েটাকে।থাক,একটু নাহয় অভিমান করেই থাকুক অভিমানীনি।

“ স্যার! আসবো?”
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন। ডেস্কে বসে ফাইল ঘাঁটছেন কবির সাহেব। আঙুলের ভাঁজে তার এখনো কলম গুঁজে রাখা। কপালে জমেছে গোটা কয়েক চিন্তার ভাজঁ।ঠিক তখনি কেবিনের দরজায় এসে দাঁড়ালেন মোকলেস মিয়া।সশ্রদ্ধায় অনুমতি চাইলেন ভেতরে আসার। কবির সাহেব ভ্রু উঁচালেন। মোকলেস মিয়াকে দেখেই নড়েচড়ে বসলেন তিনি।হাসিমুখে অনুমতি দিয়ে বললেন,

“ হ্যা,হ্যা এসো।”
মোকলেস মিয়া ভারি ভদ্র মানুষ। আলতো হেসে ভেতরে ঢুকলেন তিনি। ডেস্কের ওপাশে দাঁড়াতেই কবির সাহেব বললেন,
“ বসো!”
মোকলেস মিয়া মাথা নাড়িয়ে বসলেন। কবির সাহেব হাতের ফাইলখানা গুটিয়ে রাখলেন পাশে। আঙুলের ভাঁজে কলমটা নাড়াতে নাড়াতেই জিজ্ঞেস করলেন,
“ কী মোকলেস মিয়া? কিছু বলবে না-কি?”
মোকলেস মিয়া কেন যেন দোনোমোনো করছেন। খানিক ঢোক গিলে থেমে থেমে বলেন,
“ স্যার আসলে…একটা কথা বলতে এসেছিলাম।”
“ হ্যা বলো।আমিতো শুনছি!”

এহেন কথায় ভরসা পেলেন মোকলেস মিয়া। ডানহাতের বাহুর ভাঁজে গুটিয়ে রাখা শপিং ব্যাগটা ধীরে ধীরে বের করে আনলেন মুখচোরা মানুষটা। সেখান থেকে একটা নেমন্তন্ন কার্ড বের করে আলতো করে এগিয়ে দিলেন কবির সাহেবের নিকট। মুখে কিছুটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভাব রেখে বললেন,
“ স্যার! আমার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামীকাল বাদ জুম্মায়। স্যার,আপনি এবং আপনার পরিবার যদি এই অধমের ভিটেতে একটুখানি আসতেন.. আমি বড্ড খুশি হতাম স্যার। আর আপনার যদি কোনো সমস্যা থাকে তাহলে থাক স্যার।আপনি কেবল দোয়া রাখবেন আমার মেয়েটার জন্য। তাইলেই হবে।”
কবির সাহেব তৎক্ষনাৎ গালভরে হাসলেন। নেমন্তন্ন কার্ডটা নিজের দিকে এগিয়ে এনে হাসিমুখে বললেন,
“ আরে! তোমার মেয়ের বিয়েতে দাওয়াত দিয়েছ আর আমি যাবো না? তা কী করে হয় বলোতো? আমি যাবো,এমনকি পুরো পরিবার নিয়ে যাবো।তুমি টেনশন করোনা।”

মোকলেস মিয়া হাতে যেন একটুকরো চাঁদ পেলেন। মানুষটার মুখে তৎক্ষনাৎ লেপ্টে গেলো একরাশ খুশির দীপ্তী। তিনি তো ভেবেছিলেন সাহেব বোধহয় নাকচ করবেন কিংবা কোনরূপ অজুহাত দেখাবেন কিন্তু নাহ! কবির সাহেব তার তথাকথিত ধারণাটা কী সুন্দর ভেঙে দিলেন! মোকলেস মিয়া বড় আনন্দ নিয়ে বললেন,
“ ধন্যবাদ স্যার।সত্যি আমি খুব খুশি হয়েছি।”
কবির সাহেব মাথা নাড়ালেন।তক্ষুনি কিছু একটা মনে পড়ায় হুট করেই বললেন,
“ আচ্ছা মোকলেস! মেয়ের বিয়ে দিচ্ছো যেহেতু সেহেতু হাতে ব্যাপক খরচা হচ্ছে। তা বলছিলাম, সবটা ঠিকমতো করতে পারছো তো? কোনো সমস্যা থাকলে নির্দ্বিধায় জানাবে কেমন?”
মোকলেস মিয়া কৃতজ্ঞ হাসলেন। এ জমানায় এটুকু ক’জন বলে শুনি? সে-তো কবির সাহেবের বড় মন,তাই বললেন। মোকলেস মিয়া সময় নিয়ে বললেন,
“ না স্যার।আল্লাহর রহমতে সব ঠিকঠাক মতো গোছাতে পেরেছি। এখন মানসম্মান মত মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলেই আলহামদুলিল্লাহ।”

বেলা গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। কলেজের পূব দিকের মাঠটা আপাতত বেশ ঠান্ডা। চারিদিকে গাছ-গাছালিতে ঘেরা মাঠ,তার পাশ দিয়েই বইছে ছোট্ট একটা খাল। আশেপাশের মানুষজন প্রায়শই বিকেলের দিকটায় ছুটে আসেন এদিকে। কেউ কেউ আসেন হাঁটাহাঁটি করতে, তো আবার কেউ কেউ আসেন প্রেমিকের সঙ্গে।
বড় একটা বটগাছের ছাউনি তলে বসে আছে আহিরা।বাম হাতের তালুতে গোটাকতক বাদাম ছিলে ফু দিচ্ছেন তিনি। বাদামের গায়ে থাকা পাতলা খোসাটা সরতেই এক ঝটকায় বাদামগুলো মুখে পুরে নেন মেডাম।আশেপাশে নিজের অপেক্ষারত দৃষ্টি বুলিয়ে, আরামসে চিবুচ্ছে বাদাম। পাদু’টো ঝোলাচ্ছেন বিরক্ত হয়ে। গায়ে এখনো কলেজ ড্রেস জড়ানো তার। অপেক্ষা করতে করতে আহি একবার কব্জি উল্টে ঘড়ির দিকে চাইলো।সে-ই পচিঁশ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছে মেয়েটা,অথচ নবাব পুত্তুরের আসবার কোনো নামগন্ধও নেই! আহি বিরক্ত হলেও বসে অপেক্ষা করছে। একটাবার আসুক ইফতি, তাকে কিছুক্ষণ ঝাঁঝ দেখিয়ে কথা না বললে গায়ের রাগ মিটবে না তার। তাইতো বিরক্ত হওয়া স্বত্বেও তার এতো অপেক্ষা চলমান।

সময় আরও মিনিট দুয়েক পেরুলো। মাঠের সামনে তখন হুট করেই এসে থামলো তিন-চাকার রিকশাটা।সেখান থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলেন ইফতি। হতবুদ্ধির ন্যায় ছুটতে লাগলেন মাঠের দিকে। ওমনি পেছন থেকে রিকশাওয়ালা মামা ডেকে ওঠেন তাকে।
“ ও মামা! ভাড়া দিতেন না?”

ইফতির জোরালো কদম থামলো।ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকাতেই হুঁশ ফিরলো তার।এই যাহ! রিকশা ভাড়া না চুকিয়েই দৌড়াচ্ছে সে? আহারে! লোকটা কি-না কি ভাবলো তাকে। বাঁচা-কুছা ইজ্জতটুকুরও ফালুদা হলো অবশেষে। ইফতি আবারও দৌড়ে এলো রিকশাওয়ালার নিকট। পরনের কালো রঙা পাঞ্জাবির পকেট হাতড়ে মানিব্যাগটা হাতে নিলো তৎক্ষনাৎ। সেখান থেকে চকচকে ১০০ টাকার একটা নোট বের করে হাতে দিলো রিকশাওয়ালার। রিকশাওয়ালা মামা বুক পকেট থেকে খুচরো বার করার আগেই আবারও মাঠের দিকে দৌড় লাগালো ইফতি।পেছন থেকে মামা ডাক দিয়ে বলেন,

“ ও মামা? আগো বাকি ট্যাকা নিতেন না?”
ইফতি মশাই সামনে থেকেই চেচিয়ে বললেন,
“ রেখে দেন মামা।”
এহেন কথায় রিকশাওয়ালা মামা তার পান খাওয়া দাঁতকপাটি বের করে কেমন হেসে ফেললেন। হাতের চকচকে নোটটা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে বিরবির করে বললেন,
“ এই পোলা নির্ঘাৎ পেরেম করে রেহহহ!”

কলিজাটা হাতে নিয়ে ছুটছে ইফতি। রাগীনি বোধহয় এতক্ষণে রেগেমেগে আগুন হয়ে গেছে। না জানি বেচারার আজ কী হাল হয়! ইফতি পকেট হাতড়ে ফোন বের করল। ফের দ্রুত কল লাগালো আহির নম্বরে।এ নিয়ে পাঁচবার কল দিয়েছেন মশাই তবে আহি একবারের জন্যও রিসিভ করেনি তার ফোন। এতেই ইফতির আর বুঝতে বাকি নেই, অষ্টাদশী আজকে তার খবর করে ছাড়বে। কল ঢুকেছে,রিং ও হচ্ছে তবে ফোন তুলছেনা মেডাম।ইফতি এবারেও ধরে নিলো ফোন তুলবেনা আহি। সে হতাশ হয়ে এদিক-ওদিক দিকবিদিকশুন্য মানুষের ন্যায় তাকায় বারেবার। ঠিক তখনি ওপাশে কল রিসিভ হলো।ইফতি অস্থির গলায় তৎক্ষনাৎ বলল,

“ হ্যালো! আহি? পাখি কই তুমি?”
“ উড়াল দিছি আকাশে। কেনো দেখেননি?”
ইফতি অস্থিরতায়ও হাসলো একটুখানি। মেয়েটার এহেন ত্যাড়াত্যাড়া কথাগুলোই কেন যেন বেশ লাগে তার।ইফতি পায়ের গতি কমালো।কানে ফোন ঠেকিয়ে আবারও বলল,
“ বলোনা কোথায় তুমি?”
“ আপনার বাসায়!”
“ হ্যা,সেটা তো আমি নিবো।তুমি একা একা যাবে কেনো?”
ওপাশে আহি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। কাঁধের ওপর ব্যাগ চড়িয়ে পা বাড়িয়ে বলল,
“ কী আর করার বলুন! যার কপালে এমন দেরি করা মানুষ জোটে, তার তো সবকিছু নিজে থেকেই যেচে পড়ে করা লাগে।”
ইফতি হাসলো ঠোঁট কামড়ে। আশেপাশে নজর বুলিয়ে আবারও বলে,

“ মিস ত্যাড়া, আপনি আপাতত আছেন কই বলেন তো? আমি কিন্তু প্রচন্ড রকমের মিস করছি আপনাকে।আমার চোখদুটোও কেমন হন্যে হয়ে খুঁজছে আপনাকে।তা বলছিলাম কী…আজকের মতো নাহয় এই আমিটাকে একটু ক্ষমা করুন। এটলিস্ট নিজের লোকেশনটা বলুন।”
মুখ বাঁকায় আহি। খালের ধারের পথ ধরে এগোতে এগোতে বলে,
“ ভুলে গেছি মিস্টার লেজি। আপাতত আপনি পারলে খুঁজে নেন।”
ইফতির আর কী করার। সে ফোন কানে নিয়েই চক্কর লাগালো পুরো মাঠ জুড়ে। নাহ! আহি কোথাও নেই। ইফতি এবার ছুটলো খালের ধারে। আশেপাশে নজর বুলাতেই দেখে — অদূরে হাতের ওপর হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে আহি।চোখ নিবদ্ধ রেখেছে খালের স্বচ্ছ পানিতে। ইফতি এতক্ষণে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। দৌড়ে গেলো মেয়েটার নিকট। হাঁপাতে হাঁপাতে পেছন থেকে ডাকলো,

“ এই যে পাখি! এসেছি আমি।”
কপাল কুঁচকে পেছনে ফিরে আহি।গলায় অসম্ভব ঝাঁঝ ঢেলে বলে ওঠে,
“ তো কী করবো? আপনাকে কোলে তুলে নাচবো?”
থতমত খেলো ইফতি। শুষ্ক অধরজোড়া জিভ দিয়ে খানিক ভিজিয়ে নিয়ে আমতাআমতা করে বলল,
“ ইয়ে না মানে…এখনো রেগে আছো?”
মুখ ভেংচি কাটে আহি। সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে শক্ত গলায় বলে ওঠে,

“ রাগ? ওসব আবার কী জিনিস? আমিতো এই প্রথম শুনলাম এ শব্দ।”
ইফতি মাথা চুলকায়। আহি হাঁটছে দেখে দৌড়ে ছুটে আসে মেয়েটার সামনে। অতঃপর আশেপাশে তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের কানদুটোয় হাত রেখে অপরাধী সুরে বলে,
“ সরি.. সরি! এই যে কান ধরলাম পাখি আর হবে না কখনো। তুমি বললে এক্ষুণি কান ধরে উঠবস করতেও রাজি আছি আমি!”
আহি আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলোনা। উল্টো ফিক করে হেসে দিলো ইফতির এমন কান্ডে।এদিকে মেয়েটাকে হাসতে দেখে মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো ইফতি। যাক,মেয়েটার রাগ তবে ভাঙলো কিছুটা!

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলো। রৌদ্র বাড়ি ফিরেছে একটু আগেভাগেই। হাতে করে নিয়ে এসেছে মেয়েটার পছন্দের হান্ডি বিফ।তবে অরিনটাকে দেখো! রৌদ্র এসেছে পর থেকে একটাবার ঘরে এসে উঁকি অবধি মারেনি সে। একপ্রকার গা বাঁচিয়ে চলছে রৌদ্রের কাছ থেকে। মাঝে থেকে অবশ্য পছন্দের হান্ডি বিফ খেয়েছে মায়ের ঘরে বসে। রৌদ্র এবার তিতিবিরক্ত! বেশ কয়বার অরিনকে ডেকে পাঠালেও মেয়েটা আসেনি ঘরে। এ নিয়ে যে কত্ত দুঃখ বেটার তা বলার বাইরে। রৌদ্র এপর্যায়ে নিজেই বেরুলো ঘর ছেড়ে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বার কয়েক ডাকলো,
“ অরি? এই অরি? কই তুই?”

সাড়াশব্দ নেই অরিনের। রৌদ্র সিঁড়ি থেকে নেমে কোমরে হাত চেপে দাঁড়ালো। কোথায় গেলো মেয়েটা? মনের কোণে উত্থাপিত প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব পেতে রৌদ্র পা বাড়ালো রান্নাঘরের দিকে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার উঁকি দিলো ভেতরে। মা এবং চাঁচিকে কাজ করতে দেখে রৌদ্র গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ মেজো মা! আমার বউজান কই?”
রাঁধতে ব্যস্ত রাফিয়া বেগম। ধোঁয়া ওঠা গরম মাংসের পাতিলে খুন্তি নাড়ছেন দক্ষ হাতে। পাশেই পেয়াঁজ কাটছেন জুবাইদা বেগম। গাল বেয়ে তার টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দে নোনাজল। মানুষটা ক্ষনে ক্ষনে নাক টানছেন আর পেয়াঁজ কাটঁছেন। এরইমধ্যে রান্নাঘরের দরজার কাছ থেকে ভেসে আসা রৌদ্রের ভরাট কন্ঠে থামলেন দু’জন। রাফিয়া বেগম খুন্তি নাড়ানো বাদ দিয়ে পেছন ফিরে তাকালেন। কপালের মাঝে গোটাকতক ভাজঁ ফেলে সন্দিহান গলায় বললেন,

“ অরি না মাত্রই অনিক আর ইকরার সাথে বাইরে গেলো? কেনো, তোকে বলে যায়নি?”
রৌদ্রের চোয়াল শক্ত হলো এপর্যায়ে। সন্ধ্যা থেকে মেয়েটার এহেন ইগনোর করাটা মোটেও হজম হচ্ছে না তার।সেটা কী অরিন বোঝেনা? বোঝে তো!মেয়েটা তো বেশ বুঝেশুনেই করছে এসব। রৌদ্র নিজ চিন্তায় মগ্ন বলে রাফিয়া বেগম ফের বললেন,
“ রোদ! অরি কী তোকে বলে যায়নি?”
বিচক্ষন রৌদ্র বউয়ের দোষটা আলগোছে ঢেকে নিলো।প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,
“ হ্যা! বলেছে বৈকি!বাট এখনি চলে যাবে সেটা জানতাম না। যাকগে..কী করছো তোমরা?”
রাফিয়া বেগম হাসলেন একটুখানি।কবির সাহেবের পছন্দানুযায়ী মাছের পাতলা ঝোলে খুন্তি নাড়িয়ে নরম কন্ঠে বললেন,

“ ঐ আরকি রাতের রান্না সারছি।তা তোর কী কিছু লাগবে বাবা?”
রৌদ্র ঠোঁট গোল করে শব্দ করল খানিকটা। নজর ঘুরিয়ে একপলক তাকালো মায়ের দিকে। মা’কে ওমন নাক টানতে দেখে এগিয়ে আসে সে।মায়ের পিছু দাঁড়িয়ে আলতো করে হাত রাখলো মায়ের কাঁধে। অতঃপর মা’কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করায় রৌদ্র। মায়ের অশ্রুসিক্ত নয়নের পানে চোখ রেখে ভ্রু কুঁচকায় ছেলেটা। গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কতবার বলেছি আম্মু, পেঁয়াজ কাটাঁর সময় মুখে চুইঙ্গাম রাখবে! কথাটা একবারও শোনোনা কেনো বলোতো?”
জুবাইদা বেগম ভেজা চোখে হাসলেন ছেলের কথা শুনে। রৌদ্র একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো মায়ের মিষ্টি হাসিখানা। পরক্ষণে মায়ের ভেজা চোখদুটো বৃদ্ধা আঙুলের সাহায্যে আলতো করে মুছে দিয়ে, মা’কে সাইডে চাপিয়ে নিজে এগিয়ে গেলো চপিং বোর্ডের কাছে। জুবাইদা বেগম তৎক্ষনাৎ ছেলের হাত আগলে ধরেন।দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে চটপট কন্ঠে বলেন,

“ আরে আরে কী করছিস! রেখে দে আব্বু, আমি করে নিবো!”
রৌদ্র মুচকি হাসলো। হাতের ওপর থেকে মায়ের হাতখানা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে দক্ষ হাতে ছুড়ি চালালো চপিং বোর্ডে। মা’কে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ আমার প্রিয় মানুষদের চোখের পানি, আমার কেন যেন সহ্য হয়না আম্মু! কেন যেন সহ্য হয়না!”

রাত হয়েছে। খাবার খেতে সকলকে ডাকা হয়েছে ইতোমধ্যে। অরিন এতক্ষণ জম্পেশ একটা আড্ডা শেষে টেবিলে এসে বসেছে।তাও আবার বাবা এবং ভাইয়ের মাঝে! রৌদ্র মাত্রই পা রাখলো ডাইনিং এ। তবে অরিনের ওমন বসা দেখে ভ্রু গোটায় সে। মেয়েটার পানে তাকায় কটমট দৃষ্টিতে। কিন্তু অরিনের তো সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা নেই! সে কী সুন্দর হাসিমুখে খাবার খাচ্ছে। রৌদ্র একবার চাইলো না খেয়ে চলে যেতে তবে পরক্ষণেই ভাবলো — থাক! খাবারের সাথে গোসসা করে কী লাভ?
রাফিয়া বেগম বিচক্ষণ মানুষ। বেশ বুঝলেন মেয়ে এবং রৌদ্রের মাঝের নিরব মনোমালিন্য। মনে মনে ভেবে নিলেন

— সুযোগ বুঝে এ নিয়ে মেয়ের সনে কথা বলবে নাহয়। রৌদ্র প্লেটে খাবার বেড়েছে। এক-দু লোকমা নিতেও কেন যেন বেশ কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার। সম্মুখে বসা বউটা তার কী সুন্দর খাচ্ছে অথচ সে? মেয়েটার অবহেলায় মূর্ছা যাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। রৌদ্র একরাশ কষ্ট মনে নিয়েই কোনমতে খাবারগুলো গিললো। সবার আগে খাবার শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অরিনের উদ্দেশ্যে বলল,

“ খাওয়া শেষ হওয়া মাত্রই ঘরে আসবি।খবরদার আর কোথাও যাবি না!”
কবির সাহেব খাবার মুখে নিয়েই কেশে উঠেন ছেলের মুখ নিসৃত বাক্যে।পাশ থেকে সাব্বির সাহেব ভড়কে গিয়ে ভাইজানকে একগ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন। ওদিকে তাশরিক সাহেব মুখ টিপে হাসছেন।তক্ষুনি পাশ থেকে তায়েফ সাহেব ভাইয়ের পেট বরাবর কনুই দিয়ে গুঁতো দিলেন। তাশরিক সাহেব হাসি থামালেও ভ্রু কুঁচকালেন তৎক্ষনাৎ। মুখ ফুটে কিছু বলবেন তার আগেই তায়েফ সাহেব ইশারায় বোঝালেন চুপ থাকতে।
এদিকে সবার এতো হতবিহ্বলতায় থোড়াই যায় আসছে রৌদ্রের! সে-তো কথাখানা বলেই প্রস্থান ঘটিয়েছে গটগট পায়ে। ওদিকে অরিনের খাওয়ার গতি কমেছে এখন।তারাতাড়ি খেলে তো তারাতাড়ি ঘরে যেতে হবে। তখন কীভাবে হবে? ডাক্তার সাহেবকে একটু-আধটু শিক্ষা না দিলে তো হবেনা!

“ অনিক! এই অনিক দরজা খোল!”
ব্যাপক রোমান্টিক মুডে ছিলেন অনিক সাহেব। ওমনি দরজায় কড়া নাড়ানোর শব্দ পেয়ে রোমান্টিক মুডে বারোটা বাজলো তার। অনিক কেমন মুখ কুঁচকে ছুটে আসে দরজার কাছে। দরজা খুলতেই সম্মুখে রৌদ্রকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভড়কায় বেচারা। থতমত খেয়ে বলে,
“ কী হলো ভাইয়া? এতোরাতে?”
রৌদ্রের মেজাজ এখন সপ্ত আসমানে।সে কেমন দাঁত খিঁচে জিজ্ঞেস করল,

“ আমার বউজান কই? ওকে ফেরত দে!”
এবার যেন আকাশ থেকে পড়লো অনিক। বেচারা কেমন ফটাফট উত্তর দিলো,
“ বনু কই মানে? ও তোমার ঘরে নেই? ও তো সেই কখন চলে গেলো ঘুমাতে!”
আবারও মেজাজ বিগড়ালো রৌদ্রের। সে তৎক্ষনাৎ ছুটলো অরিনের ঘরের দিকে। দরজার কাছে এসে খেয়াল করলো, দরজাটা ভেতর থেকে লাগানো।ওমনি দরজার গায়ে বার-কতক কড়া নাড়ায় রৌদ্র। গলা উঁচিয়ে ডেকে ওঠে,
“ জানবাচ্চা! গেট খোল।”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৭

কে শোনে কার কথা! অরিনটা তো মুখের ওপর কাথা ছড়িয়ে নাক টেনে ঘুমাচ্ছে। রৌদ্র বেশ কিছুক্ষণ কড়া নাড়ায়।অবশেষে ক্লান্ত হয়ে মেয়েটার ঘরের দরজার কাছে পিঠ ঠেকিয়ে বসে বিরবির করে বলে,
“ এতো অভিমান ভালো না সানশাইন।কিছু কিছু অভিমান ভালোবাসার বদলে দুরত্বও বাড়ায়!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ৯