Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫২

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫২

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫২
জাবিন ফোরকান

“ফাইনালি! দর্শকবৃন্দ, আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, এইমাত্র আমার প্রাণপ্রিয় স্বামী দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। অবশেষে অপেক্ষার অবসান, তাকে দেখে আমার আনচান আনচান হৃদয় ফিরে পেলো প্রাণ।”
অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে আমার এমন নাটকীয় বক্তব্য শুনে খানিক দ্বিধান্বিত হলো জায়দান। তবে আমি নাছোড়বান্দা। আমার হাতে ধরা নিজের মোবাইল ফোন, সমস্ত দৃশ্য আমি ভিডিও করে চলেছি ব্লগারদের মতন করে।
“ও স্বামী, আজ কি এনেছ আমার জন্য?”
আমার সম্বোধনে এবার সামান্য না হেসে পারলোনা জায়দান। ধরে রাখা ক্যামেরার সামনে নিজের বাম হাতটা তুলে দেখালো, তাতে ধরা আমার প্রিয় তিরামিসু ডেজার্টের বক্স।
“এটা কিন্তু হালাল।”

মৃদু হাসলাম আমি। জায়দান বক্স ডাইন ইন টেবিলে রেখে দিলো। অতঃপর বেডরুমের দিকে এগোলো। আমি যথারীতি মোবাইল ক্যামেরা ধরে তার পিছু নিলাম।
“আপনারা দেখতে পাচ্ছেন দর্শক, এখন আমার স্বামী বেডরুমে ঢুকলো। হয়ত এখন তার লোভনীয় মেদহীন শরীরটা দেখার সুযোগ হবে আমাদের। ছিঃ ছিঃ লজ্জা লজ্জা! আপনারা চোখ বন্ধ করুন, শুধু আমি দেখব!”
নিজের ব্লেজার খুলতে খুলতে চশমার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকালো জায়দান। শুধালো,
“ব্যাপার কি বলো তো? পিৎজা ব্যবসায়ীদের মার্কেট খেয়ে এখন ডেইলি লাইফ ব্লগারদের পিছনে পড়েছ?”
রহস্যময় হাসলাম আমি। জায়দান হাতঘড়ি খুলে নিলো, টাই ঢিলে করে একে একে শার্টের বোতামগুলোও খুলতে লাগলো। ক্যামেরা ধরে রাখলাম আমি, একটুও নাড়লাম না।
“অবশ্যই। আমি যে সেক্টরেই পা রাখি, সেই সেক্টরই আমার হয়ে যায়। ব্লগিং ট্রাই করলে আর দোষ কোথায়?”

মুখে বললেও মনে মনে জায়দান এবং আমি উভয়েই সত্যিকার উত্তরটা জানি। আমি স্মৃতি জমাচ্ছি! বুকের ভেতর ভীষণ তাড়না! কখন ফুরিয়ে আসবে সময়? কারোরই জ্ঞাত নয়। যদি যথেষ্ট বাঁচা না হয়? যদি আরো কিছু করা বাকি থেকে যায়? যদি শুধু অন্তর দিয়ে স্মরণ করাটুকু যথেষ্ট না হয়? আমি জানি, আমি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এসব দৃশ্য কেন ধারণ করছি। জায়দানও তা উপলব্ধি করতে সক্ষম। অথচ, কেউই এই ব্যাপারে কিছু বললাম না একে অপরকে। এমন ব্যবহার করলাম নিজেদের সঙ্গে, যেন এটা খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়।
চিঠিটা পড়ার পর থেকে আমি কখনো জায়দানকে সরাসরি কিছু বলিনি। না কিছু জিজ্ঞেস করেছি। আমার মাঝে শোক উদযাপনের ভাবটা আসেনি। অন্তত, জায়দানের সামনে নয়। কারণ তাকে দুঃখটা না দেখাতেই আমি বদ্ধপরিকর। ভবিষ্যত আমাদের জীবনের ঝুলিতে কি রেখেছে জানিনা। তবে শোকের মাতম ঘটিয়ে আমি জায়দানকে সেই চরম সময় ঘনিয়ে আসার আগে কষ্ট দিতে চাইনা। জায়দান আমার কাছে শেষ কিছু সুখের স্মৃতির আবদার করেছে। আমি তাকে সেটা দেব। পরিপূর্ণভাবে।

“আজ আমার জন্য কিছু নেই?”
শার্ট খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলো জায়দান। আমি মোবাইলটা খানিক শক্তভাবে ধরে উত্তর করলাম,
“ডাইন ইন টেবিলে চলো, স্বামী।”
আমার দিকে চেয়ে চোখ নাচিয়ে মুচকি হাসলো জায়দান।
“তুমি একটা চমৎকার মানুষ, মাই ওয়াইফ।”
জায়দান ফ্রেশ হয়ে সংক্ষিপ্ত একটা গোসল সেরে আসতে আসতে আমি ডাইন ইন এরিয়ায় স্ট্যান্ডে মোবাইল সেট করে ফেললাম। ক্যামেরা অন করে টেবিল গুছিয়ে ফেলতে লাগলাম। আজ আমি ইউটিউব দেখে অনেক নতুন খাবার রান্না করেছি। কাশ্মীরি পোলাও, বাটার চিকেন, ছেড়া পরোটা, খাসির মাংসের কাবাব এবং নবাবী সেমাই। সঙ্গে জায়দানের নিয়ে আসা তিরামিসুটাও সুন্দর মতন প্লেটে সাজিয়ে রাখলাম। কিছুক্ষণ পরেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটা হাজির হলো। এখন তার পরনে একটা ঢোলা ফতুয়া এবং ট্রাউজার। চেয়ার টেনে টেবিলে বসতে বসতে অদূরে সেট করে রাখা ট্রায়পড এবং মোবাইল খেয়াল করলো জায়দান। তবে সেই ব্যাপারে মন্তব্য এড়িয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখা পদগুলো দেখলো।

“ওয়াও। এতকিছু কখন অর্ডার করলে?”
“অর্ডার করিনি। নিজের হাতে রেঁধেছি।”
“সত্যি?”
জায়দানের বাদামী চোখজোড়া চকচক করে উঠলো। এক মুহুর্তও সময় ক্ষেপন না করে সে এক টুকরো পরোটা তুলে বাটার চিকেনে ডুবিয়ে মুখে পুরলো। তৎক্ষণাৎ এক ঝিলিক খেলে গেলো তার চেহারায়।
“কেমন হয়েছে?”
উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করলাম। আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে পরপর আরো কয়েক টুকরো পরোটা মুখে দিলো জায়দান। অতঃপর লম্বা হাত বাড়িয়ে আমাকে কাছে টেনে নিলো। আমার দুটো হাত তুলে ঝুঁকে চুমু দিলো ত্বকের উপর। অসংখ্য চুমুর ধারা বয়ে এসে থামলো আমার কনুইয়ে।

“তোমার হাতে সহস্র চুমু, আমার বউ।”
লজ্জায় লাল টুকটুক হয়ে গেলাম। সঙ্গে একটা ভয়ানক আতঙ্ক চেপে বসলো বুকে। যদি আর কোনোদিন এমন করে কেউ আমায় না বলে? যদি এই মানুষটা আমার চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যায়? মাথা ঝাঁকিয়ে জোরপূর্বক অনিশ্চিত চিন্তাগুলোকে দূর করলাম আমি। তারপর জায়দানের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একটুখানি ঝোলের বিন্দু বৃদ্ধাঙ্গুলে মুছে নিয়ে নিজের মুখে পুরলাম। বললাম,
“আমি খাইয়ে দেই তোমায়?”
সামান্য একটু থমকালো জায়দান। তারপর হাত বাড়িয়ে আমার কোমর জড়িয়ে এক টানে নিজের কোলের উপর বসিয়ে নিলো।
“তোমার ক্ষুধায় ক্ষুধার্ত আমি, তুষ্ট করো আমায় মহারাণী।”
বুকের ভেতরটা শিউরে উঠল। এত আবেগ, এত ভালোবাসা, এত মায়া! কোনোদিন কাটিয়ে উঠতে পারবোনা আমি, কোনোদিন না!

প্লেট সাজিয়ে ধীরে ধীরে সময় নিয়ে জায়দানকে খাওয়াতে শুরু করলাম আমি। প্রত্যেক গ্রাস তুলে দেয়ার সময় কখনো আমার হাতের আঙ্গুলে, কখনো বা হাতের পিঠে, কখনো আবার কব্জিতে ঠোঁট ছুঁয়ে চুমু খেলো স্বামী আমার। তারপরই শুধুমাত্র গ্রাসটুকু গ্রহণ করলো। আবেগে টলটলে হলো আমার চোখ। প্রাণভরে দেখলাম, অনুভব করলাম তার প্রতিটি ভালোবাসার নিবেদন।
খাবার শেষে বেডরুমে ফিরে এলাম আমরা। আজ আর লুকিয়ে চুরিয়ে ওষুধ সেবন করলোনা জায়দান। সরাসরি আমার সামনেই প্রেসক্রাইব করা ওষুধের একটা খেলো সে। বুকটা ফেটে এলেও মুখে আমি কিছুই উচ্চারণ করলাম না। শুধু ফোনের ভিডিও ক্যামেরা অফ করে দিলাম। এই মুহুর্তটা আমি স্মৃতির মাঝে রাখতে চাইনা।
বিছানায় উঠে ফতুয়াটা খানিকটা টেনে তুলে জায়দান বললো,
“আজ একটু বেশিই গরম পড়েছে, তাইনা?”
“এসি কমিয়ে দেবো?”
“দাও, প্লীজ।”

রিমোট তুলে এসি কমাতে কমাতে খেয়াল করলাম বিষয়টা। আগেও কয়েকবার খেয়াল করেছি, তবে এভাবে বিষদ পর্যবেক্ষণ করিনি। তখন আমার বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাও ছিলোনা বিধায় সন্দেহ হয়নি। আজ দেখলাম। জায়দান ফতুয়াটা সামান্য তুলতেই কিছু দাগ উন্মোচিত হলো তার হালকা হলদেটে উজ্জ্বল ত্বকজুড়ে। লালচে, বেগুণী ছোট ছোট আভার মতন। ভেতরটা চেপে এলো আমার। জায়দানের অসুস্থতা সম্পর্কে জানার পর থেকে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেছি আমি। দাগগুলো হলো অসুস্থতার লক্ষণ। শরীর স্বাভাবিক মাত্রায় রক্ত তৈরি করতে পারেনা বিধায় সামান্য চাপেই ত্বকে ছোটখাট ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। এই যেমন একটুখানি চুলকে দিলেও সেখানে গাঢ় লাল দাগ ক্ষতের মতন বসে যেতে পারে। হাহাকার করে উঠল আমার অন্তর। রিমোট রেখে এগিয়ে গিয়ে কোনো কথা না বলেই জায়দানের ফতুয়াটা টান দিয়ে ধরলাম।
“এই, কি করছ?”
জবাব না দিয়ে ফতুয়া টেনে মাথার উপর দিয়ে খুলে নিলাম। জায়দান আমায় বাঁধা দিলোনা। নিষ্পলক চেয়ে রইলো শুধু। তার শরীর সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত হতেই ঘাড়, কোমর এবং বুকের কাছে ছড়িয়ে থাকা দাগগুলো দেখলাম আমি। হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিলাম। আঙুল কাঁপলো আমার। অস্ফুট স্বরে শুধালাম,
“ব্যথা হয়?”

“তুমি ছুঁয়ে দিলে আমার সব ব্যথারা দৌঁড়ে পালায়।”
শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলাম আমি। আর কত রকমভাবে এই পুরুষটি দূর্বল করবে আমায়? হঠাৎ করে মাথায় এক অমোঘ তাড়না ভর করল। জায়দানকে হালকা ঠেলে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আমি হেঁটে ড্রেসিং টেবিলের কাছে গেলাম। ড্রয়ার খুলে ভেতরে থেকে একটা লিপস্টিক বের করে নিলাম। লাল এবং গোলাপীর মিশ্রণে একটা হালকা মিষ্টি বর্ণ লিপস্টিকটার। একটা সময় আমার ভীষন প্রিয় ছিল, তাই প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। আয়নায় দেখে নিজের ঠোঁটে অত্যন্ত গাঢ় করে লিপস্টিক পড়লাম আমি। জায়দান বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমায় দেখে যাচ্ছে। এত রাতে কেন সাজগোজ করছি বুঝতে পারছেনা হয়ত বা। তবে তার মোহনীয় দৃষ্টি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, দৃশ্যটি বেশ উপভোগ করছে সে।
লিপস্টিক দেয়া শেষ হলে সেটা হাতে নিয়েই বিছানায় উঠে এলাম আমি। বুকের উপর ভর দিয়ে শুয়ে থাকা জায়দানের কোমরের দিকটায় বসলাম। ভ্রু তুলে বিস্ময় নিয়ে তাকালো সে।

“কি করছো?”
এর উত্তর আমি করলাম না। ঝুঁকে পড়লাম। জায়দানের পিঠে, কাঁধের দিকটায় ফুটে থাকা দাগের উপর নিজের লিপস্টিকে রাঙা ঠোঁট ছুঁয়ে দিলাম গাঢ়ভাবে। গভীর এক চুমু খেলাম সেখানে। সামান্য শিউরে উঠে বালিশ চেপে ধরলো জায়দান। আমার ঠোঁটের ছাপ ফুটে উঠল তার ত্বকজুড়ে, ঢেকে ফেলল অসুস্থতার সকল লক্ষণকে। দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে উল্টো ঘুরে শুলো জায়দান। চোখ পিটপিট করে আমার দিকে তাকালো। ভরাট গলায় বললো,
“কলঙ্ক ঢাকছো?”

“ভাগ্যকে জানান দিচ্ছি, আমার সিলমোহরের ক্ষমতা কতটুকু। ভাগ্যের আগে তুমি আমার জায়দান।”
আবারো ঝুঁকে পড়লাম। জায়দানের গলার দিকটায় ঠোঁট ছুঁয়ে নিজের চিহ্ন এঁকে অসুখের চিহ্ন ঢাকলাম। স্বামী আমার চওড়া নয়ন মেলে গর্বিত দৃষ্টিতে চিহ্নটা দেখলো। নেমে এলাম বুকের দিকটায়। সেখানেও স্পর্শ করলাম আমার ঠোঁটের মোহর। বারংবার। কখনো আলতো করে, কখনো বা গাঢ়ভাবে। জায়দান এক হাতে মুঠো পাকিয়ে অত্যন্ত যত্নে আমার চুলের গোছা ধরে রাখলো। অন্য হাতটা আমার কোমর চেপে ধরলো। চশমা খুলে চোখজোড়া অত্যন্ত আবেশে বুঁজে নিলো সে। নীরবে অনুভব করে গেলো আমার আদর, আমার চিহ্নিতকরণ। ক্রমশ গভীর হয়ে উঠলো তার শ্বাস প্রশ্বাস। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়লো আমার অধিকার হাসিল। ঠোঁটের দাগে বুকের একপাশ থেকে একেবারে উদর অবধি স্বামীকে রাঙিয়ে তবেই থামলাম আমি। মুখ তুলে মনোমুগ্ধ নয়নে দেখলাম দৃশ্য। বেডরুমের ল্যাম্পশেডের আলোয় জায়দানের শরীরজুড়ে জ্বলজ্বল করছে আমার ঠোঁটের ছাপ। তার অসুস্থ শরীরটাকে আমি নিজের ভালোবাসায় ছাপাঙ্কিত করেছি।
জায়দান অবশেষে চোখ খুললো। তার বাদামী নয়নে পরম শান্তির পরত। মুখ ঝুঁকিয়ে নিজের দেহটাকে দেখলো সে। একটি হাত দিয়ে ধীরে ধীরে ছুঁয়ে দিলো সকল দাগকে। ঠোঁটের সূক্ষ্মতম হাসি ফুটলো তার।
“আমি যদি আর কোনোদিন গোসল না করি, তোমার সমস্যা হবে?”

মুচকি হাসলাম আমি। জায়দানের মুখখানি নিজের দুহাতে ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে বললাম,
“তুমি আমার আস্ত একটা মায়া। এই মায়ায় টান আছে, সমস্যা না।”
বিনিময়ে আমার ঘাড়ে হাত রেখে গভীরভাবে নিজের ঠোঁটের স্নেহের স্পর্শ ছুঁয়ে দিলো জায়দান। দীর্ঘ একটা সময় ধরে সুগভীর অনুভূতির বিনিময়। অতঃপর তার বুকের উপর শুয়ে পড়লাম আমি। লম্বা দুবাহুর মাঝে আমায় নিজের শরীরের উপর আগলে নিলো জায়দান। তার একটি হাত আমার পিঠে বয়ে চললো। আমার পরিধানের জামার মাঝে প্রবেশ করে ছুঁয়ে চললো তপ্ত নরম ত্বকে। আবেশে চোখ বুঁজে তার বুকে মাথা গুঁজে পরে রইলাম। দীর্ঘ একটা সময় কেউই কোনো কথা বললাম না। নীরবে। উপভোগ করলাম একে অপরের সঙ্গ। এসি কমিয়ে রাখায় পরিবেশ ক্রমশ শীতলতর হয়ে উঠতেই গুটিশুটি দিয়ে আশ্রয় নিলাম স্বামীর প্রশস্ত রাঙা বুকে।
একটা সময় নীরবতা ভাঙলো জায়দান। আমার চুলে আঙুল বোলাতে বোলাতে একেবারে হালকা গলায় বললো,

“আরেফিন বাড়িতে যেতে বারণ করেছিলাম।”
জমে গেলাম আমি। একচুল নড়ার সাহস হলোনা। আরো খানিকটা চুপসে গেলাম। আমার হাতের আঙ্গুল আঁকড়ে বসলো জায়দানের বুকে। তার মাঝে অবশ্য নির্বিকারতা। আমি ভেবেছিলাম ভীষণ রাগ করতে পারে। অথচ, তেমন লক্ষণ না দেখায় খানিকটা অবাক না হয়ে পারলাম না।
“আমাকে খুব ভালোবাসো তাইনা?”
জায়দানের আদুরে গলায় গলে গেলাম। থুতনীতে ভর দিয়ে মুখ তুলে চেয়ে মাথা দোলালাম। জায়দান মুগ্ধ নয়নে আমায় দেখলো। ঝুঁকে এসে প্রথমে আমার গালে তারপর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে মন্থর কন্ঠে জানালো,

“আব্বু একটা সময় অ্যাডিক্টেড ড্রিংকার ছিলেন। লিভারে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। হার্টেরও হালকা পাতলা কিছু প্রবলেম আছে। বয়সটা তো কম হয়নি।”
আমি রীতিমত নিঃশ্বাস আটকে ফেললাম। জায়দান কি বলতে চাইছে সেটা উপলব্ধি হওয়ার সাথে সাথে অভ্যন্তরের সবকিছু বরফের মতন জমাট বাঁধতে আরম্ভ করেছে। স্বামী আমার থেমে নেই, সে বলে যাচ্ছে,
“আর আয়দান তো বিশাল একটা বিপদ পার করে এসেছে। পাক্কা দুটো বছর লাগলো ওর সুস্থ হতে। দেশ বিদেশের হাসপাতালে হাসপাতালে কেটেছে ছেলেটার জীবন। একটা সময় রক্তশূন্যতা হয়ে গিয়েছিল। ওর নিজের শরীরটাই তো জোড়াতালি দিয়ে গড়া!”
ভয়ানকভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো আমার হৃদয়। সবকিছু স্পষ্ট। জায়দান কেন এতদিন কোনো উদ্যোগ নেয়নি, তা আজ পরিষ্কার। সে আগেই বুঝতে পেরেছিল, জাফর এবং আয়দান, দুজন যদিওবা ডোনার হয়ে যায়, তাদের স্টেম সেল নিরাপদভাবে ব্যবহার করা মেডিক্যালি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। সেটা হয়ত ডাক্তারের সঙ্গে আলাপও হয়েছে তার। এজন্যই সে এতটা নিশ্চিত, যে তার আদতে কোনো আশাই নেই!
আয়দান এবং জাফর দুজন এইচ এল এ টেস্ট করার জন্য রাজী হওয়ার পর যে আশাটুকু আমার মাঝে জ্বলে উঠেছিল, তা সহসাই দপ করে নিভে গেলো।
আমার মুখটা আলতোভাবে ধরলো জায়দান, চোখে চোখ রাখলো,

“যদি আর কখনো আমার জন্য নিজের উঁচু মাথা কারো সামনে নিচু করো, তবে আমি সেদিনই মরে যাবো, মনে রেখো।”
আর আটকানো গেলোনা নিজেকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই টপটপ করে আমার দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে লাগলো অনবরত। গাল গড়িয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়লো তা জায়দানের বুকের উপর। আমায় নিজের বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরলো জায়দান। তাকে আঁকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলাম আমি। আমার সমস্ত শরীরে হাত বুলিয়ে দিলো সে, যেন শান্ত করতে চাইলো অশান্ত এক ঘূর্ণিঝড়কে। সময় যত গড়ালো, আমার কান্নার তেজ তত বাড়লো। অস্ফুট স্বরে জায়দান বলে গেলো,
“আমি এখানেই আছি, আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমি তোমার কাছেই থাকবো, একদম কাছে, তোমার মনের ভেতরে। সবসময়।”
একটা সময় শরীর দূর্বল হয়ে এলো আমার। সঙ্গে কমে এলো কান্নার দাপট। বাইরে রাত আরো গভীর হচ্ছে। ভেতরে আমরা দুজন একে অপরের আলিঙ্গনে নিজেদের অনুভব করছি। ল্যাম্পশেড বন্ধ করে দিয়েছে জায়দান। স্বচ্ছ জানালা বেয়ে চাঁদের আলো গড়িয়ে এসে পড়ছে। এর মাঝেই আমাকে আগলে রেখেছে স্বামী, নিজের বাহুডোরে। শুধুমাত্র আমার নাক টেনে ফুঁপিয়ে চলার আওয়াজ নীরবতায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। একটা সময় জায়দান হঠাৎ করেই খানিকটা ধরা গলায় বললো,
“আমার একটা শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পারবে, মাই ওয়াইফ?”
“শেষ ইচ্ছা নয়। তোমার সব ইচ্ছা আমি পূরণ করব। বলো, কি চাও, মাই লাভ?”
অশ্রুসিক্ত গলায় বললাম আমি। কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। অতঃপর আবদার এলো,
“আমার কবরে আম্মুর হাতের এক মুঠো মাটি দিও।”

আজ কত বছর পর ঘরটিতে এসেছেন, জেসমিন ঠাওর করে উঠতে পারলেন না। জায়দানের বেডরুমটা একদম পরিপাটি করে সাজানো। কোথাও কোনো খুঁত নেই। সে যাওয়ার দিন যেমন রেখে গিয়েছিল, আজও তেমনটাই রয়ে গিয়েছে। রোজিনা নিয়ম করে সপ্তাহে দুবার এই ঘরটা পরিষ্কার করে যায়।
জেসমিন ধীরে ধীরে চারপাশে নজর বুলিয়ে দেখতে লাগলেন। মাঝ বরাবর বিছানা, তার পাশে ক্লোজেট। মেঝেতে বিছানো পাপোস। এর উপরে একজোড়া স্লিপার রাখা। দেয়ালে দুটো ফটোফ্রেম। একটাতে স্টুডিওতে তোলা সকলের পারিবারিক ছবি। অন্যটায় শুধু জেসমিন এবং জাফর। বিছানার পাশের টেবিলেই আরেকটা ফটোস্ট্যান্ড। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন জেসমিন। সেটা হাতে তুলে দেখলেন।
জেসমিনের যুবতী বয়সের ছবি। সময়টা হয়ত যখন জায়দান বছর পাঁচেকের ছিলো, সেই সময়কার। বাড়ির বাইরের বাগানে হোসপাইপ দিয়ে পানি দিচ্ছেন তিনি, তার চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। সূর্যের হলুদাভ আভা রাঙিয়ে তুলেছে তার মুখমন্ডল। অপূর্ব এক দৃশ্য। ফ্রেমের এক কোণায় একটি বাচ্চা ছেলের হাত দেখা যাচ্ছে। ওটা জায়দান। পিছনে খেলছিল অথবা কিছু করছিল সে হয়ত। ছবিটা তুলেছিলেন জাফর। সেটা তার বড় সন্তান নিজের নাইটস্ট্যান্ডে রেখে দিয়েছে অতি যত্নে আগে জানা ছিলনা জেসমিনের।
ফটোস্ট্যান্ডটা টেবিলে রেখে দিলেন জেসমিন। পুনরায় আশেপাশে তাকালেন। এই ঘরের বাতাসে অদ্ভুত একটা গন্ধ টের পেলেন তিনি। কেমন যেন মিষ্টি এবং তেঁতোর মিশ্রণ। খানিকটা ফলের মতন। গন্ধটা জেসমিনের খুব চেনা।

পায়ে পায়ে ক্লোজেটের দিকে এগিয়ে সেটা খুলে ফেললেন জেসমিন। ভেতরে এখনো কিছু জামাকাপড় আছে যেগুলো জায়দান আর নিয়ে যায়নি। তার মাঝে হাতড়ে খুঁজলেন জেসমিন, অথচ নিজের বুনে দেয়া খয়েরী রঙের সোয়েটারটা পেলেন না। একটি শার্ট তুলে নিলেন, এই পোশাকের মাঝেই বাতাসে ভেসে বেড়ানো গন্ধটা পেলেন তিনি। নাকে ঠেকিয়ে দীর্ঘ প্রশ্বাস টানলেন তিনি। ভেতরটা কেমন যেন ফাঁপা মনে হলো। একদম নির্লিপ্ত ক্লোজেটের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে পরক্ষণে দরজা আটকে সরে আসছিলেন জেসমিন। তবে পারলেন না। হঠাৎ করে তার চোখ পড়ল ক্লোজেটের নিচের দিকের তাকে। একটা কার্ডবোর্ডের বক্স চাপা দিয়ে রাখা। কিছু না ভেবেই সেটা টেনে বের করলেন তিনি। মেঝেতে বসে খুলে ফেললেন বক্সটা। ভেতরে বেশকিছু পুরাতন জিনিসপত্র।

একটা হাওয়া চুপসে যাওয়া ফুটবল। জেসমিন প্রশস্ত নয়নে দেখলেন। অনেক বছর আগেকার স্মৃতিটি স্মরণে এলো তার। ঈদ উপলক্ষে গ্রামের দিকে যাওয়া হয়েছিল সেবার। গিয়েই আয়দান বায়না ধরেছিল ফুটবল খেলবে। তখন তিনি নিজে দোকান থেকে ফুটবল কিনে দিয়েছিলেন ছেলেদের। সেটা খেলতে খেলতে ফেটে চুপসে যাওয়ার অনেক আগেই আয়দান ফেলে দিয়েছিল। তবে সেটি কুড়িয়ে এনে রেখেছে জায়দান।
বক্সের ভেতর আরো কিছু টুকটাক জিনিস আছে। একটা ভাঙা রুপোর লকেট। জায়দানের জন্মের পর জেসমিনের বাবার বাড়ি থেকে উপহার দেয়া হয়েছিল। সেটা তিনি নিজেই পরিয়ে দিয়েছিলেন সন্তানকে। বছর পেরিয়ে যেতে যেতে সেটা ভেঙে গেলে ছোট্ট জায়দান ঠিক করিয়ে দেয়ার বায়না ধরেছিল। জেসমিন কোনোদিন কর্ণপাত করেননি।

আছে একটি ছেড়া কাগজের টুকরো। জায়দান একবার একটি আপেলের চিত্র এঁকে উঠতে পারছিলনা। জেসমিন আর পাঁচটা সাধারণ মায়ের মতন সেদিন হাতের চুড়ি বসিয়ে গোল করে এঁকে দিয়েছিলেন। সেই পুরাতন জং ধরা চুড়ি আর কাগজ দুটোই রেখে দিয়েছে জায়দান।
জেসমিনের নিঃশ্বাস আটকে এলো। তিনি আর দেখতে পারছেন না এসব। কেমন দমবন্ধ লাগছে নিজেকে। বক্সটা ঠাস করে বন্ধ করতে চাইলেন তিনি। তবে শেষ মুহূর্তে পুরাতন একটা ছোট্ট নোটবুক তার নজর কেড়ে নিলো। স্কুলের নোটবুক, সন্দেহ নেই। কাঁপা কাঁপা হাতে সেটি তুলে নিলেন জেসমিন। উপরে হালকা ধূলোর আস্তরণ ফুঁ দিয়ে ঝেড়ে নোটবুকটা খুললেন তিনি। বহু বছর আগেকার, পৃষ্ঠাগুলো কেমন হলদেটে হয়ে গিয়েছে। পোকায় খেয়ে ফেলেছে বেশ খানিকটা। কলমের কালিগুলোও লেপ্টে গিয়েছে। সেই লেপ্টানো লিখার মাঝে প্রথম একটা লিখা চোখে পড়ল জেসমিনের।
॥ আমি দোলনায় দুলছি একা। দূরে তুমি আয়দানের দোলনাটা ঠেলে দিচ্ছ। তুমি আজকে একটা লাল রঙের শাড়ি পড়েছ। তোমাকে একদম আমার লক্ষ্মী আম্মু আম্মু লাগছে। ইচ্ছা করছে আমিও আয়দানের সঙ্গে ওই দোলনায় গিয়ে বসি আর তুমি আমাদের ঠেলে দাও। কিন্তু তুমি সেটা পছন্দ করবেনা। থাক, আমার দূর থেকেই তোমায় দেখতে ভালো লাগছে আম্মু।

—জায়দান। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০০১॥
থমকে গেলেন জেসমিন। কয়েক পৃষ্ঠা উল্টালেন। এবার ভেসে উঠলো অন্য আরেকটি লিখা।
॥ আম্মু জানো? আমি ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছি। টিচার সাইন্স ফেয়ারের জন্য আমার প্রজেক্ট সিলেক্ট করেছেন। আমার আজ খুব তোমার হাতের খিচুড়ি আর মুরগী কষা খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু তুমি তো অসুস্থ। থাক, তুমি ঘুমাও আম্মু। বিশ্রাম নাও। আমার রেজাল্ট তো এমনিতে তুমি শুনতে চাওনা, যেদিন চাইবে, আমি নাহয় সেদিন সব একসাথে বলবো! কার্ডগুলো সব জমিয়ে রাখলাম আজ।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫১

—জায়দান। ২৬ ডিসেম্বর, ২০০২॥
জেসমিন খেয়াল করলেন, বক্সের ভেতরে একটা বেগুনী ফিতায় বাঁধা একগাদা পুরাতন রেজাল্ট কার্ড। হাত বাড়িয়ে সেগুলো নিলেন তিনি, খুলতেই ভেতর থেকে সকল শ্রেনীর রেজাল্টের কার্ড বেরিয়ে এলো। প্রত্যেকটাতে প্রথম স্থান। দূর্দান্ত নাম্বারের রেজাল্ট। শিক্ষকদের প্রশংসাপত্র।
আর গার্জিয়ানের স্বাক্ষরের জায়গায় শুধুমাত্র জাফরের সাইন। কোনো কোনোটাতে তাও নেই। নোট দিয়ে লিখা—
—দুঃখিত টিচার, আমার আব্বু দেশের বাইরে আছেন।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here