Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৬

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৬

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৬
জাবিন ফোরকান

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।
কেরানীগঞ্জ কমপ্লেক্সের ভেতরের ওয়ার্ডটি বিশেষ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। নতুন হলেও দেয়ালে শ্যাওলার পরত। বিশাল রুম ধরে সারি সারি চৌকি পাতা। প্রথম দেখায় মনে হয়, বুঝি কোনো মেসে এসে পড়েছে কেউ। অথচ এটি অপরাধীদের জন্য নির্মিত জেলখানা।
সময়টা বিকালবেলা। সারাদিন কাজের শেষে দুপুরের খাবারের পর খানিকটা সময় পাওয়া যায়। বেশিরভাগ কয়েদী এই সময়ে নিজ নিজ টুকটাক কাজ নয়ত বিশ্রামে থাকে। চৌকির উপর নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে অনেকে। কেউ আবার এদিক ওদিক বসে গল্প গুজব সারছে। আপাতদৃষ্টিতে খুবই ফুরফুরে সময় মনে হলেও এখানে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটি গল্প।

সবার থেকে আড়ালে একদম কোণায় নিজের চৌকির ধার ঘেঁষে মেঝেতে বসে আছে কয়েদী নং ৪৫২১/২৭। পরনে ধূসর বর্ণের ফতুয়া এবং ঢোলা পায়জামা। ফতুয়ার পিঠে জেল কর্তৃপক্ষের লোগো। কিছুক্ষণ আগেই আসরের নামাজ শেষ করে জায়নামাজ কোলে রেখেই বসে আছে। হাতে একটি পুরাতন বই। জেলের লাইব্রেরীতে কাজ করার সুবাদে সে প্রায়ই গাদা গাদা বই নিয়ে আসে। অদ্ভূত হলেও সত্য জেলের কর্মচারী কর্মকর্তারা এই কয়েদীকে বেশ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। শিক্ষিত বলে? অর্থবান বলে? জানা নেই কারো।
দুজন কয়েদী নিজেদের চৌকিতে বসে আড়চোখে তাকে দেখছে। তাতে তার বিশেষ কোনো খেয়াল নেই। সে মগ্ন নিজের দুনিয়ায়।
“এমন একটা থোবরা নিয়ে জেলে কে আসে ভাই?”
শুরু করলো প্রথমে একজন। অপরজন তার কথা শুনে খানিকটা বিস্মিত হলেও পরক্ষণে কয়েদী নং ৪৫২১/২৭ কে লক্ষ্য করে মৃদু হাসলো।
“চেহারায় যাস না ভাই। খু*নের আসামী!”
“খু*নের আসামী?”
“হ্যাঁ।”
হাসলো সে। বিদ্রূপ নিয়ে বললো,

“খু*নী কি ভাবছে জেলের ভেতর বসে নামাজ কোরআন পড়লে পাপ মোচন হয়ে যাবে? হাহাহা…!”
দুজনের কথোপকথন এবং টিটকারীমূলক মন্তব্যে লোকটির একটুও পরোয়া হলোনা। যেন সে নিজস্ব ধ্যানে মগ্ন, বাস করছে ভিন্ন জগতে, একমনে বসে হাতের বইটি পড়ছে। পাতা উল্টে সে সূর্যের আলোর দিকে মুখ বসে বসলো এবার।
“হুশ, এত জোরে কথা বলিস না। শুনতে পাবে।”
“শুনতে পেলে কি হবে? আমার কি চুলটা ছিঁড়বে?”
এমন সময়ে ওয়ার্ডের দরজা বেয়ে ভেতরে ঢুকলো এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তার ইউনিফর্ম বুটের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো শক্ত মেঝে জুড়ে। জেলের জেলার। তীক্ষ্ণ চোখে দেখলেন তিনি চারপাশ। ওপাশ থেকে হেঁটে আসা জেলারকে দেখে দুজনেই চুপ করে গেলো। তাদের কথোপকথন জেলার শুনেছেন। তিনি মাথা কাত করে গম্ভীর আওয়াজে বললেন,

“যে নিজের ভাইয়ের জন্য দুই দুইটা খু*ন করে জেলের ঘানি টানতে পারে, সে আরো অনেক কিছুই করতে পারে! কথাবার্তায় সাবধানতা কাম্য নয় কি?”
চুপ করে গেলো সমস্ত ওয়ার্ড। জেলার গভীর নজরে দেখলেন একে একে সবাইকে। যেন নিঃশব্দে সতর্ক করলেন। তারপর কয়েদী নং ৪৫২১/২৭ কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আয়দান। আমার সাথে এসো। তোমার জন্য বিশেষ একটা কাজ আছে।”
অবশেষে নিজের মনোযোগ ভেঙে বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো কয়েদী নং ৪৫২১/২৭—আয়দান। জায়নামাজ এবং বই সুন্দর মতন নিজের চৌকিতে রেখে ঝাঁকড়া চুলে আঙুল বুলিয়ে এগিয়ে গেলো জেলারের দিকে। তবে পথিমধ্যে থামলো সে। কিছুক্ষণ আগে তাকে নিয়ে গল্প করতে থাকা দুজনের দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকালো। উভয়েই বিনা কারণে খানিক সংকুচিত হয়ে গেলো। আয়দান মোলায়েম গলায় বললো,
“কার কোন পাপ কোন উছিলায় আল্লাহ্ পাক মোচন করবেন, সেটা বোঝার সাধ্য যদি মানবহৃদয়ের হতো, তাহলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তির কোনো অভাব থাকতোনা।”

পিনপতন নীরবতা বিরাজমান চারিদিকে। সেটি ছাপিয়ে আয়দানের গভীর কন্ঠ ধ্বনিত হলো,
“তুমি সেদিনই হেরে গিয়েছ, যেদিন বিশ্বাস করে নিয়েছ তোমার ফেরাকে তোমার রব স্বাগতম জানাবেন না।”
আর দাঁড়ালোনা আয়দান। জেলারকে অনুসরণ করে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেলো। উপস্থিত কয়েকজন কয়েদীদের মধ্যে গুঞ্জণ পরে গেলো। এর মধ্যে বয়স্ক গোছের একজন বাকিদের উদ্দেশ্যে হঠাৎ করে বলে উঠলেন,
“ওর সাথে লাগতে যাইস না। ওর মধ্যে নূরানী কিছু একটা আছে, আমি অনুভব করবার পারি। খোদার লগে ওর আত্মার সম্পর্ক।”
জেলখানার চারদেয়ালের মাঝে বাণীটি ভীষণ অলৌকিক এবং অবাস্তব শোনালো। অথচ কয়েদীদের বেশিরভাগই জানে, কথাটা চরম সত্য।

জারিনের আজ প্লে- গ্রাউন্ডে যাওয়ার নির্ধারিত দিন। প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে চারদিন তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়। বেশিরভাগ দিন সাবিন সাথে থাকলেও আজ কোম্পানিতে অতি জরুরী মিটিং থাকার কারণে সে মেয়ের সাথে যেতে পারেনি। তাই বলে মেয়ের এত সাধের সময়টা রুখে দেয়নি সে। আজ ন্যানি এসেছে তার সাথে। সাবিন যখন বাড়িতে থাকে না, সেই সময়টায় জারিনের দেখাশোনা করার জন্য একজন বিশ্বস্ত মহিলা রেখেছে সে।
গাড়ি প্লে গ্রাউন্ডের সামনে এসে থামতেই উত্তেজিত জারিন লাফিয়ে নেমে পড়লো ভেতর থেকে। খুব সুন্দর একটা টকটকে লাল ফ্রক পরনে তার। মসৃণ চুলগুলো মাথার দুপাশে দুটো খাড়া ঝুঁটি করে রাখা। হাতের চুড়ি এবং কানের স্বর্ণের রিং হালকা রোদের আভায় জ্বলজ্বল করে উঠল তার। হাতের টুকটুকিকে ধরে গুটিগুটি পায়ে দৌঁড়ে সে চলে গেলো ভেতরে। বন্ধুরা অপেক্ষা করছে তার। অনেকগুলো বন্ধু হয়েছে তার প্লে গ্রাউন্ডে। খেলতে এলে দেখা হয়।
আজও সকলে এসে পড়েছে। একজনের মা ম্যাট বিছিয়ে দিয়েছে। বাকিরা সেটার উপর বসে খেলনা দিয়ে খেলছে, হাসাহাসি করছে। তাদের বাবা মায়েরা আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করছে, নিজেদের মধ্যে কথোপকথনে ব্যাস্ত তারা। জারিন ন্যানির সাবধানবাণী কানে না তুলেই দৌঁড়ে গিয়ে ম্যাটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

“আততালামু আলাইকুম!”
অন্যান্য বাচ্চারা অবাক হয়ে ঘুরে তাকালো। অদূরে দাঁড়ানো একজন মহিলা মৃদু হেসে বললো,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম! কি মিষ্টি! তোমাকে সালাম দেয়া কে শিখিয়েছে বাবু?”
“মাম্মাম! মাম্মাম বলে তবাইকে তালাম দিতে অয়, তাহলে আল্লাহ আদল দেয়।”
“মাশাআল্লাহ।”
মুখে মুখে প্রশংসা খেলে যেতেই জারিন ভীষণ গর্বিত হাসলো। পরমুহুর্তেই বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় যোগ দিলো। তার ন্যানি পাশেই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে রইলো, যেন বাচ্চাদের অসুবিধা না হয়।
ব্লক, টয়ট্রেন, বল দিয়ে খেলতে খেলতে একঘেঁয়ে হয়ে যাওয়া বাচ্চারা আজ নতুন একটা খেলা আবিষ্কার করলো। তারা একে অপরকে নিজেদের বাবা মায়ের নাম বলে বলে শোনাচ্ছে। কার বাবা মায়ের নাম সবথেকে সুন্দর সেটা নির্ণয় করাই আজকের মহতী লক্ষ্য তাদের।

“আমার আব্বুর নাম শফিক চৌধুরী, আর আম্মু হাসনাহেনা চৌধুরী।”
“হাসনাহেনা! ফ্লাওয়ার! অনেক সুন্দর!”
তালি দিয়ে একে অপরকে উৎসাহ জানাচ্ছে সবাই। সবশেষে এলো জারিনের পালা। সে লালচে কোমল ঠোঁটজোড়া ফুলিয়ে সুন্দর করে উচ্চারণ করতে চাইলেও অস্পষ্ট ভাষায় বেরোলো শব্দগুলো।
“আমাল মাম্মাম তাবিন হুতেইন।”
“ওটা সাবিন হুসেইন।”
খিলখিল করে হেসে সবচেয়ে স্পষ্টবাদী বাচ্চাটা শুধরে দিলো জারিনকে। এ এই গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে বড়, বছর পাঁচ। তাই উচ্চারণ পরিষ্কার। সাবিন আগেও জারিনকে নিয়ে প্লে গ্রাউন্ডে এসেছে, তখন তার নামটা জানা হয়েছিল তার। বাচ্চাটার কথা শুনে মুখ ফোলালো জারিন। তার মায়ের নাম অন্য কেউ বলে দেবে, এটা তার জন্য অপমান এবং ঈর্ষার বিষয়। মাথা ঝাঁকিয়ে জারিন এবার বললো,
“যাই অক, আমাল আপ্পা আল মাম্মামের নাম অন্নেক তুন্দল!”
দুহাত যত দূরে সম্ভব ছড়িয়ে কত বড় সুন্দর ভঙ্গি করে দেখিয়েও দিলো জারিন। তারপর বেশ গর্ব নিয়ে দাঁত কেলিয়ে জানালো,

“আমাল আপ্পা জায়লান আলেপিন!”
“আলপিন?”
“আলেপিন!”
অপমানিত বোধ করলো জারিন রীতিমত। কত বড় সাহস! তার বাবার নামকে এরা বিকৃত করে উচ্চারণ করে! একটা হাসির রোল পড়ে গেলো বাচ্চাদের মাঝে।
“আচ্ছা আচ্ছা, তুমি যেমন বলো। কিন্তু তোমার আপ্পাকে তো তোমার সাথে দেখাই যায়না। খেলে না তোমার সাথে?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। আমাদের সবার ড্যাডি মাম্মি আসে। কিন্তু তোমার তো শুধু মাম্মি আসে। তোমার বাবা কোথায়? উনি কেন আসেনা? উনি তোমাকে পছন্দ করেনা?”
“উনি মনে হয় আমাদের আব্বুদের মতন ওনার বাচ্চাকে ভালোবাসে না।”
শিশুদের মাঝে অদ্ভূত এক তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়লো। জীবনে পিতা মাতার অনুপস্থিতি তাদের ছোট্ট মস্তিষ্কে না ভালোবাসারই সামিল। অজস্র প্রশ্নবাণে জর্জরিত ছোট্ট জারিন না বিষয়টা হজম করতে পারলো, আর না তো সইতে পারলো। তার পিতাকে ঘিরে এমন প্রশ্নবাণ নতুন নয়। সে তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো,

“জা-ইনের আপ্পা অলেক বালো, অলেক তুন্দল!”
“তাই হলে তোমার আপ্পা তোমার সাথে খেলতে আসেনা কেনো?”
এই প্রশ্নের জবাব নেই জারিনের কাছে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো তার সঙ্গীদের দিকে। ঠিকই তো! প্লে গ্রাউন্ডে সবার বাবাই এসেছে। অদূরে দেখা যাচ্ছে, একজন ছেলের বাবা মা দুজনই হাসিমুখে দোলনা ঠেলে দিচ্ছে, ছেলেটি ভীষণ মজায় খিলখিল করে হেসে উঠছে। অপরদিকে একটি এক বছরের শিশুকন্যাকে বুকে অতি যত্নে আগলে রেখে পার্কের ধারে হাঁটাহাঁটি করছে এক সুদর্শন ভদ্রলোক।
“জারিনের আপ্পা বালো না! জারিনের সাথে কেলেনা!”
অপর এক খেলার সঙ্গী বলে উঠতেই জারিন হাতের পুতুল টুকটুকিকে শক্তভাবে চেপে ধরলো। তার ডাগর ডাগর বাদামী আঁখিজুড়ে অশ্রুর বন্যা বয়ে গেলো। সে তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করে উঠলো,
“জা- ইনের আপ্পা স্পেতাল! আপ্পা কুব স্পেতাল! তোমলা খালাপ! তোমলা কুব খালাপ! আমাল আপ্পা বালো, অনেক বালো! আমি দানি, আপ্পা কেলবে, আপ্পা একদিন জা-ইনের সাতে কেলবেই কেলবে!”
অশ্রু ভাসিয়ে চলে গেলো জারিনের বুক অবধি। সকলে ফিরে ফিরে তাকালো হঠাৎ একটা বাচ্চার এমন আর্তনাদে। জারিন টকটকে লাল মুখে চিৎকার করে বললো,
“আপ্পা জা-ইনকে বালোবাতে! আপ্পা জা-ইনকে আদল কলে! আপ্পা লাব ইউ! আপ্পা অলেক অলেক লাব ইউ!”
ন্যানি আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। ছুটে এসে ক্রন্দনরত জারিনকে কোলে তুলে নিজের বুকে জাপটে ধরে শান্তনা দিলো। বাকি সকল বাচ্চা এবং অভিভাবক বিস্মিত দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো দৃশ্যটি।

হুসেইন গ্রুপ কোম্পানিভবন।
মিটিংরুমে বসে আছে সাবিন। গত রাতে কাজের চাপে একফোঁটা ঘুম হয়নি তার। সকাল থেকেই কর্মব্যস্ততা। ক্লান্ত লাগছে ভীষন। অথচ সে শিরদাঁড়া টানটান করে টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে আছে। তার ঠিক বিপরীত দিকে একজন পুরুষ বসে আছে।
মিসির। এই মুহূর্তে তার স্বামীর বন্ধুটি দ্রুত হাতে একটা রাফ স্কেচ করছে। রেমান গ্রুপের টেন্ডার লাভের পর সাবিন মিসির ইকবালের আর্কিটেকচারাল ফার্মকেই দায়িত্ব দিয়েছে ডিজাইনের জন্য। সেই মিটিংটা প্রায় শেষ, মিসির শুধু অন্তিম কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট করছে।
সাবিন একনাগাড়ে মিসিরকে দেখে গেলো। এই কয়েক বছরে মুখটা খানিকটা ভারী এবং গুরুগম্ভীর হওয়া বাদে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসেনি ছেলেটার মাঝে। এই পুরুষটির কাছে সাবিনের কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। যখন একটা খুঁটির প্রয়োজন ছিলো জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা সামাল দেয়ার, তখন সেই খুঁটি না হতে পারলেও অন্তত ভরসা – সহযোগীতা নিয়ে সে পাশে ছিল। বাকিটা সাবিন কাটিয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব চেষ্টায়। তবুও, কেউ তো অন্তত সাথে ছিল যখন সে কোর্টে কোর্টে আর হাসপাতালে চক্কর কেটেছে।

“তুমি ফাইনালি বড় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললে জেনে সত্যি খুব ভালো লাগছে, মিসির।”
সাবিনের হঠাৎ মন্তব্যে মুখ তুলে তাকালো মিসির। এতক্ষণ নুয়ে থাকায় তার কপালে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চুল। সেগুলো হাতের আঙুলে গুছিয়ে নিতে নিতে মৃদু হেসে সে জানালো,
“বাবা মায়ের ইচ্ছা। তাছাড়া, বিয়ে তো সুন্নত। একদিন না একদিন করতেই হতো।”
“শুধু আংকেল আন্টির জন্য? তোমার ইচ্ছা নেই? হবু স্ত্রীকে পছন্দ হয়নি?”
মিসির বুকে দুবাহু বেঁধে খানিকটা ভেবে বললো,
“আপাতত ওনার মাঝে পছন্দ না হওয়ার কিছু দেখছি না। বাকিটা নাহয়, সময় শিখিয়ে দেবে?”
তীর্যক হাসলো সাবিন।
“উনি! অনেক সম্মান দেয়া হচ্ছে তাহলে!”
এবার খানিকটা শব্দ করে হাসলো মিসির। সেই হাসিটা যেমন হঠাৎ করে উদয় হয়েছিল, তেমন হঠাৎ করেই আবার মিইয়ে গেলো। আনমনে মিসির বলে উঠলো,

“আমি এত বড় একটা কাজ ওকে ছাড়া করতাম না সাবিন, কোনোদিন করতাম না! যদি ডাক্তার একবার বলতো, শুধু একবার আশ্বাস দিতে পারতো একদিন ও ফিরে আসবে, একদিন ও উঠে বসবে, আমাদের সঙ্গে কথা বলবে, বছর বছর পেরিয়ে গেলেও আমি ওই দিনটার আশায় বসে থাকতাম!”
সাবিনের চেহারায় অমাবস্যার আঁধার নেমে এলো। মিসিরের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভিন্নদিকে তাকালো সে। ডাক্তার জায়দানের অবস্থা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। কতদিন এভাবে ধুঁকে ধুঁকে শরীরটার বাঁচা হবে তা অনিশ্চিত। আর কোনোদিন কি ফিরে আসবে সে? তাও অনিশ্চিত। উত্তর মেলেনা এই প্রশ্নের।
জায়দান কোনো ডিপ কোমায় নেই। সে যে অবস্থায় আছে তাকে মেডিকেলের ভাষায় বলে প্রোলংড মিনিমালি কনশাস স্টেট, সংক্ষেপে এম সি এস। দূর্লভ এই অবস্থাটি সাবিনের নিজের স্বামীকেই একদিন গ্রাস করে নেবে সে কি ভেবেছিল কোনোদিন?

সাবিন বেশি ভাবার কিংবা মিসিরের কথার প্রতিক্রিয়া করার সময় পেলনা। এর আগেই মিটিং রুমের দরজা খুলে গেলো। ভেতরে প্রবেশ করলো নীলাভ স্যুট পরিহিত একজন।
আরিয়ান হান্নান। পঁয়ত্রিশ বছর বয়স্ক এক ভদ্রলোক। প্রভাবশালী হান্নান পরিবারের ছোট সন্তান। বাবার পর বড় ভাইয়ের বদলে নিজের যোগ্যতায় ব্যবসায় বসেছে। আজ তার কোম্পানির সঙ্গে একটা ডিল সাইন হচ্ছে সাবিনের। এই ব্যবসায়িক বন্ধুত্ব যদি সফল হয়ে যায়, তবে হুসেইন গ্রুপকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবেনা। তাকদীর হুসেইন চলে যাওয়ার পর যে গ্রুপ কাদায় নেমে গিয়েছিল, আজ সেই গ্রুপকে আবারো টেনে ধীরে ধীরে একটু একটু করে উপরে তুলছে সাবিন। সেক্ষেত্রে হান্নানদের সঙ্গে এই চুক্তিটা সাফল্য দ্রুত অর্জনে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

“মিস্টার হান্নান। প্লীজ বসুন।”
সাবিন স্বাগতম জানাতেই বিরাট হেসে চেয়ার টেনে টেবিলের পাশে বসে পড়ল আরিয়ান। মীরা বাহির থেকে কফি নিয়ে এলো এমন সময়ে। একটি মিসিরকে দিয়ে অপরটি সে আরিয়ানের সামনে রেখে দিয়ে বললো,
“ফাইল তৈরিই আছে স্যার, আপনি দেখে নিন।”
দক্ষ সহকারীর মতন মীরা ফাইল বের করে কাজে লেগে গেলো। তবে আরিয়ানের মনোযোগ অ্যাসিস্টেন্টের তুলনায় অধিক তার বসের উপর। একনাগাড়ে সাবিনকে দেখে আরিয়ান বলে বসলো,
“ইউ আর লুকিং টায়ার্ড টুডে, মিস হুসেইন।”
নিজের কপাল ঘষতে ঘষতে মিসিরের হাতের পেন্সিলের চলন দেখছিল সাবিন। কণ্ঠটি কানে যেতেই ভ্রু তুলে ঘুরে তাকিয়ে আরিয়ানকে দেখলো সে। বান্দা বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে বসে আছে। কফির কাপের উপর দিয়ে সাবিনকে দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।

“রাতে ঘুম হয়নি, না?”
দৃষ্টি সরু হলো সাবিনের। আরিয়ানের এমন ব্যক্তিগত আলাপ এই প্রথম নয়। বিশেষ করে পরিচয় হওয়ার পর থেকে প্রায়ই এই লোক তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে জুড়ে যেতে চায়। বিষয়টা বহুদিন যাবৎ কঠোর পেশাদারিত্ব অবধিই সীমাবদ্ধ রেখেছে সাবিন। তবে আজ এমন প্রশ্ন কেন যেন গায়ে লাগলো তার। বিশেষ করে মিসির এবং মীরার সামনে বলায়। এতে দুজনকেই কি ভুল ইঙ্গিত দেয়া হলোনা?
“মিসেস হুসেইন আরেফিন!”
সাবিন ঝাঁঝালো কন্ঠে শুধরে দিলো আরিয়ানকে। তাতে একগাল হাসলো আরিয়ান। কফির মগ রেখে সোজা হয়ে বসে বললো,

“উপস। মাই মিস্টেক। আসলে আপনাকে দেখলে আমি সত্যিই ভুলে যাই আপনি বিবাহিত। কি করবো বলুন, ওই বিয়ে থাকা না থাকা একই কথা।”
এই কথাটা এবার সত্যিই অনেক গায়ে লাগলো সাবিনের। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো সে। তবে প্রতিক্রিয়ার আগেই পাশ থেকে গম্ভীর গলায় মিসির বললো,
“এক্সকিউজ মি? আপনার মনে হয়না আপনি প্রফেশনালিজমের সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন?”
মাথা ঝাঁকিয়ে হাসলো আরিয়ান।
“প্রফেশনালিজম? ওয়েল, অবশ্যই। তবে যেহেতু লং টার্ম বিজনেস করতে হবে, সেহেতু একটু ব্যক্তিগত পরিচয় থাকাই দরকার তাইনা?”
মিসির কিছু বলতে যাচ্ছিল তবে সাবিন নীরবে হাত উঁচু করে থামিয়ে দিলো তাকে। সেটি লক্ষ্য করে আরিয়ান আরও বিস্তৃত হাসলো।

“দেখুন মিস…আই মিন মিসেস হুসেইন আরেফিন, আমি আর পাঁচজনের মতন লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু করতে পারিনা। যা করব বা বলবো সামনা সামনি। আপনাকে আমি আগেও একবার বলেছি, আজ আবারও বলছি। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।”
পিনপতন নীরবতা নেমে এলো মিটিং রুমজুড়ে। মীরা ফাইল আঁকড়ে ধরে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। মিসির চেয়ারের হাতল ধরে ক্রুদ্ধ চোখে তাকালো, শুধুমাত্র সাবিন নিষেধ করায় সে এখনো বসে আছে। সাবিন তুলনামুলক শান্ত, একটু বেশীই শান্ত। আরিয়ান তাতে সাহস পেয়ে বললো,
“আমি জানি আপনার একটা মেয়ে আছে অ্যান্ড অল। আমার কোনো প্রবলেম নেই। আই উইল বি আ ফাদার টু হার। আপনিই বা আর কত বছর যাবৎ একটা অনিশ্চিত সম্পর্কের বোঝা টানতে থাকবেন? আপনার মেয়ের একটা বাবার দরকার, আমার একটা বউয়ের দরকার। আর আমাদের দুজনের বিজনেসেরই পার্টনার দরকার। থিঙ্ক অ্যাবাউট রিয়ালিটি। আমার কাছে আছে নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা, সহযোগিতা। এভরিথিং ইউ নিড রাইট নাউ! দিনশেষে একজন নারী যত সফলই হোক না কেন, পুরুষ নেই তো ভ্যালু নেই।”
মীরা শুনতে পারলোনা। কঠোর গলায় বললো,

“লজ্জা লাগেনা আপনার? একজন বিবাহিত মেয়েকে এমন কথা বলতে? আপনার প্রয়োজন আছে কার? সাবিনের কি স্বামী নেই?”
“স্বামী? ওহ…ইউ মিন ওই প্রফেসর? ইজ নট হি জাস্ট আ ভেজিটেবল নাউ? মিসেস হুসেইন আরেফিনের সকল চাহিদা, হোক তা আর্থিক, সামাজিক কি শারীরিক, পূরণ করতে সে একেবারেই অপারগ।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সাবিন। হতবাক মিসির এবং মীরাকে পিছনে ফেলে সে আরিয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালো। বান্দা বেশ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ঠোঁটে হাসি নিয়ে চেয়ে রইলো সাবিনের দিকে।
“ঠিকই বলেছেন আপনি।”
সাবিনের কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো মিটিং রুমজুড়ে। আরিয়ানের হাসি বিস্তৃত হলো আরও।
“রাইট?”
“হুম। আমার স্বামী অপারগ।”

বিদ্যুৎ গতিতে ঘটলো পরবর্তী ঘটনাটি। কেউ কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ অবধি পেলনা। নিজের পরনের হাই সোলের শু জুতা পা থেকে খুলে নিয়ে অপর হাতে আরিয়ানের চুলের মুঠি পাকিয়ে ধরে সাবিন হুংকার দিলো,
“আর তুই একটা প্রতিবন্ধী!”
জুতাটা দিয়ে সপাত করে আরিয়ানের গাল বরাবর চাপড় মারলো সাবিন। একবার না, অসংখ্যবার। চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে গেলো মিসির, তবে সাবিনকে থামানোর চেষ্টা করলোনা কেউই। হট্টগোলের শব্দে বাইরে থেকে সিকিউরিটি গার্ড এবং অন্যান্য কিছু কর্মকর্তা ছুটে এলো, দেখলো এক উন্মত্ত ঘূর্ণিঝড়কে। আরিয়ানের মুখটা টেবিলের উপর সশব্দে চেপে ধরে জুতার বাড়ি হাঁকাতে হাঁকাতে সাবিন বললো,

“আমি বাঁচলে ওর জন্য বাঁচি, মরলে ওর জন্য মরবো। তোর মতন সুযোগ সন্ধানী হারামীর জন্য না! ভেজিটেবল? অপারগ? শুনে রাখ লোভী, আমার স্বামী শুধু আমার স্বামী না, আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিচরণ তার। অসুস্থ শরীর কেন, তার পোশাকের একটা ছিঁড়া টুকরোকে নিয়েও আমি জনম জনম কাটিয়ে দিতে পারি। নারী আমি, তোর মতন লালায়িত পুরুষ না! আমার স্বামী যে রাস্তায় হাঁটত, সেই রাস্তায়ও আমি তোর অপবিত্র ছায়া পড়তে দেবোনা, শালা মাদারের বাচ্চা! আমার মেয়ের ঠেকা পড়েনি তোর মতন কুত্তাকে বাপ ডাকবে! তোর চুক্তি আর কপাল দুটোর উপরই আমার জুতার বাড়ি!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৫

ধাক্কা দিয়ে আরিয়ানকে দূরে সরিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সাবিন চিৎকার করে উঠল,
“দূর হ! আমার কোম্পানির সামনে থেকে দূর হ তুই! তোকে যদি এই সাবিন দ্বিতীয়বার নিজের চোখের সামনে দেখে, কসম তোর কলিজাটা টেনে ছিঁ*ড়ে ফেলবে!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here