সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৬
জাবিন ফোরকান
নিজের ফোনটা মীরা সন্ধ্যার পর থেকে সুইচড অফ করে রেখেছে। মেসেজের উপর মেসেজ, ফোনের উপর ফোনের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে সে। সাবিনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। নেটিজেনদের মতে এক বেয়াদব মহিলা ব্যবসায়ীকে উচিৎ শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত সমাজে ভুঁড়ি ভুঁড়ি স্থাপন করা উচিৎ। সাবিনকে নির্মমভাবে মা*রার ভিডিওগুলোতে সয়লাভ মিডিয়া। যেহেতু মীরা নিজের পেইজ থেকে কয়েকবার সাবিনের পিৎজা বিজনেসের প্রচার করেছিল, সেহেতু তাকে বন্ধু হিসাবে ধরে হেনস্তা করতেও পিছপা হচ্ছেনা মানুষজন। এই অনলাইন জগতের বিষাক্ততা থেকে নিজের মনকে মুক্ত রাখতে সবকিছু আপাতত বন্ধ করে দিয়েছে মীরা।
রাত প্রায় সাড়ে নয়টা বাজে এখন। হাসপাতালের খানিকটা স্যুপ খাইয়ে সাবিনকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে মীরা। আজকের দিনটা ওয়ার্ডে থেকে আগামীকালই বাসায় চলে যাবে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই মুহূর্তে সাবিনের বিছানার পাশে বসে তার ঘুমন্ত মুখপানে চেয়ে আছে মীরা। মেয়েটার মুখে অদ্ভুত একটা মায়া আছে। গাল ফুলে গিয়ে মায়াটুকু কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের কোণ সামান্য কেটে গিয়েছে। ব্যান্ডেজের বাঁধনে নিজের বান্ধবীকে দেখে হুহু করছে মীরার বুক।
সাবিনের সঙ্গে মীরার পরিচয় খুব বেশিদিনের নয়। গুণতে চাইলে এক বছর মতন হবে প্রায়। আজও মনে পড়ে সেদিনের কথা। লোকাল বাসে তাকে উত্যক্ত করতে থাকা দুটো লোককে কি বেধড়ক পিটুনিটাই না দিয়েছিল সাবিন! একটা মেয়ের মধ্যে এতটা জ্বালাময়ী সত্তা প্রথমবার দেখা হয়েছিল তার। সেদিনের সেই তেজস্বী বাঘিনী কখন, কিভাবে যে তার জীবনের একটা খুঁটিতে পরিণত হয়ে গেলো মীরা টেরটুকুও পায়নি। এত কম সময়ে এতটা প্রগাঢ় বন্ধুত্ব অন্যদের জন্য হাস্যকর অবাস্তব ব্যাপার হতে পারে। কিন্তু মীরার জন্য নয়। এতিম জীবনে একটা পরিবারের যে অভাব ছিলো, সাবিনের মাধ্যমে না চাইতেও সেই অভাবে ভাটা পড়েছে অনেক। তাই এই মেয়েটার প্রতিটা কষ্ট তিনগুণ হয়ে আঘাত করে মীরাকে।
আনমনে সাবিনের কপালে অতি সন্তপর্নে হাত বুলিয়ে এনে মীরা ভাবলো, মেয়েটার জীবন এত কষ্টের কেন?
এমন সময়েই ভাইব্রেশনের শব্দ। একবার দুবার নয়, এই নিয়ে অসংখ্যবার শব্দটা শুনলো মীরা। ভীষণ বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে সে উঁকি দিয়ে তাকালো। হাসপাতালের বেডের পাশেই ছোট্ট টেবিলের উপর রাখা সাবিনের ফোনটা। সেটা গত এক ঘন্টা যাবৎ বিরতি দিয়ে থেকে থেকে ভাইব্রেট করে যাচ্ছে। মীরা এর আগে ধরেনি, কারণ স্প্যাম কিংবা অনলাইনের গাঁধাগুলোর কারো ফোন হতে পারে। তবে এতবার ফোন কেন দেয়া হচ্ছে ভাবতে ভাবতে সে যন্ত্রটা হাতে নিলো। স্ক্রীনে ভেসে উঠেছে অত্যন্ত আজব একটা বাক্য।
—হার্ট অ্যাটাক কলিং….
ভ্রু কুঁচকে গেলো মীরার। চোখ কচলে ভালোমত দেখলো। শব্দগুলো বদলালো না। জিভ দাঁতে ঠেকিয়ে কৌতূহল এবং বিরক্তি মিশ্রিত এক শব্দ করে মীরা আপনমনে বলে উঠলো,
“ এই হার্ট অ্যাটাকটা আবার কে? ”
“ আমি। ”
অপ্রত্যাশিত জবাবটা এলো তৎক্ষণাৎ। লেবু এবং আপেলের একটা সূক্ষ্ম অতি মোহনীয় মৃদু ঘ্রাণের অস্তিত্ব নাকে ঠেকলো মীরার। কেমন যেন আরামদায়ক সুঘ্রাণটি। হালকা মিষ্টতার সঙ্গে টকের সংমিশ্রণ। হতবাক হয়ে মাথা কাত করে পিছনে তাকালো মীরা। সামনে দন্ডায়মান লোকটাকে দেখে সে জমে গেলো বিনা কারণেই।
সুদীর্ঘ এক পুরুষালী কাঠামো। উচ্চতায় ৬ ফুট ছাড়িয়েছে অবলীলায়। পরনে কালো শার্ট এবং প্যান্ট, তার উপরে বাদামী বর্ণের লেদার জ্যাকেট। গাঢ় বাদামী চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। হাতে নিজের ফোনটা ধরে রাখা। মীরা তাকাতেই ফোন কেটে পকেটে ভরলো সে। সঙ্গে সঙ্গে মীরার হাতে ভাইব্রেট হতে থাকা ফোনও কেটে গেলো। প্রমাণিত হলো, নাম্বারটা আসলেই এই বান্দার।
কয়েক পা এগিয়ে সাবিনের বেডের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো সে। মীরা সুচারু দৃষ্টিতে নজর রাখলো। বান্দার চোখজোড়া তার চেনা চেনা লাগছে। আগেও কোথাও একটা দেখেছে। কিন্তু কেন যেন হিসাবটা ঠিক মিলিয়ে উঠতে পারছেনা।
“ আপনি কে, জানতে পারি? ”
সতর্ক কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়লো মীরা। তাতে লোকটি মাথা তুলে নির্বিকার জবাব দিলো।
“ সাবিনের এক্স হাসব্যান্ড। ”
নিজের নাম বা অন্যকিছু প্রকাশের কোনো লক্ষণ দেখালোনা জায়দান। আস্তে করে বেডের পাশের টুলে নিঃশব্দে বসে পড়লো। চশমার অন্তরাল থেকে তার দৃষ্টি আবদ্ধ হয়ে রইলো সাবিনের ঘুমন্ত মুখায়বে।
দ্বিধায় পরে গেলো মীরা। সে বুঝতে পারছেনা তার কি করা উচিত। সাবিন নিজের অতীত সম্পর্কে তাকে বলেছে খুব কমই। শুধু এটুকুই জানিয়েছিল যে তার ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। কেনো, কি, কিভাবে সেসবের কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। এমনকি নিজের প্রাক্তন স্বামীর নাম ধাম সম্পর্কেও কোনোদিন একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। স্বভাবত মীরা ধরে নিয়েছিল, সাবিনের স্বামী লোকটা খারাপ। নাহলে ডিভোর্স হবেই বা কেনো? তবে আজ, সত্যিকারে বান্ধবীর প্রাক্তন স্বামীকে দেখে সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।
“ ডাক্তার কি বলেছে? ”
প্রশ্নটি ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো মীরাকে। এমন গুরুতর মুহূর্তে ঠিক বেয়াদবি করতে ইচ্ছা হলনা তার। পুরুষ মানুষটা হাসপাতাল অবধি যখন এসেছে, তখন নিশ্চয়ই চিন্তিত।
“ হাড়গোড় ভাঙেনি। শুধু কিছু ক্ষত হয়েছে। মুখটা ফুলে গিয়েছে, তাতে ওষুধ দেয়া হয়েছে। আগামীকাল সকালে ছেড়ে দেয়া হবে। ”
জায়দান নিঃশব্দে শুনে গেলো শুধু। তার পাথরের ভাস্কর্যের মতন চেহারা মীরাকে খানিকটা অস্বস্তিতে ফেলে দিলো। লোকটা কেমন যেন। তার অভিব্যক্তি দেখে কিছুই বোঝা যায়না। তার মতামত কিংবা ভাবনার বিশেষ গুরুত্ব জায়দানের কাছে নেই। মেয়েটার উপস্থিতিই তার কাছে মূল্যহীন এবং উপেক্ষণীয়। সবটুকু মনোযোগ নিবদ্ধ সাবিনের মুখজুড়ে। মেয়েটি পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। হাসপাতালের বেডে তার লতানো শরীরটা দেখাচ্ছে খানিক রুগ্ন। ধীরস্থির নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে বুক ওঠানামা করছে। জায়দান নির্লিপ্ত দেখে গেলো প্রত্যেকটি ক্রিয়া। অতঃপর নিজের একটি হাত বাড়িয়ে দিলো। উদ্দেশ্য ওই কপালে বাঁধা ব্যান্ডেজের প্রান্ত ছুঁয়ে দেয়া। কোনো প্রয়োজন নেই, তবুও এক অতৃপ্ত চাহিদা। ইতস্তত করলো জায়দান, সামান্য কাঁপলো তার হাত। কেন যেন শেষমেষ ছুঁয়ে দিতে পারলোনা। আঙুল গুটিয়ে নিলো। যে মুহূর্তে সে হাতটি ফিরিয়ে নিতে গেলো ঠিক ওই মুহূর্তেই,
“ উমম…”
ঘুমের ঘোরে সামান্য গুঙিয়ে উঠলো সাবিন। চোখের পলকে চিৎ হওয়া থেকে পাশ ফিরে আঁকড়ে ধরে ফেললো জায়দানের হাতখানি। বালিশে রেখে তার উপর নিজের গাল ছুঁইয়ে ঘুমন্ত গলায় বিড়বিড় করলো,
“ গরম…উম…”
পাথরে পরিণত হলো জায়দান। সুস্থির চেয়ে রইলো রমণীর মাঝে। হাতের মাঝে লেপ্টে থাকা গালের ছোঁয়া তার মাঝে পুরাতন কিছু স্মৃতিদের তাজা করে তুললো। ব্যান্ডেজ এবং ফোলায় ঢাকা মুখটা ধীরে ধীরে যেন ঝাপসা হয়ে গেলো দৃশ্যপট থেকে। এর পরিবর্তে ভেসে উঠলো ওই লাবণ্যময়ী চেহারা, যার হাসির ঝংকারে আঁধারেরা ভীত হতো, আলোয় আলোয় ছেয়ে উঠত পৃথিবীর আনাচে কানাচ।
ঘড়ির কাঁটা সাড়ে বারোটার ঘরে।
নিস্তব্ধ হলঘর। গোটা শহর ঘুমিয়েছে। রাত্রির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে নীরবতা। অদূরে কোথাও বুঝি ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে দেয়ালঘড়ির কাঁটার টিকটিক আওয়াজ। সোফায় হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে থমথমে মুখে বসে থাকা জায়দানের হাতে নিজের ফোন। একটা নাম্বারে সে গত এক ঘন্টা যাবৎ যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। আবছা আলো ছায়ার মাঝে তার চোখের পাঁপড়ির অস্থির কম্পন। ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা পঁয়তাল্লিশ পেরোলো তখন সে আড়চোখে পাশের টি টেবিলের উপর রাখা নিজের বাইকের চাবিটা পরখ করে দেখলো। অতঃপর যেই না হাত বাড়ালো সেটা তুলে নিতে তখনি অট্টহাসির আওয়াজে চারপাশ ভরে উঠলো।
“ আহ্হাহা! ”
হাঁট করে খুলে গেলো সদর দরজা। ঠকঠক হিলের শব্দ তুলে বেখেয়ালী পদক্ষেপে ভেতরে ঢুকলো সাবিন। সে একা নয়। তার সঙ্গে রয়েছে এক সুদর্শন পুরুষ। যুবক গোছের ছেলেটার নাম আহান। সাবিনের বড় চাচার ছেলে, সম্পর্কে চাচাতো ভাইবোন তারা। আহানের দুহাত জড়ানো সাবিনের কোমরজুড়ে। রমণীর লাস্যময়ী শরীর ঢুলছে কোনো কারণে, তার ভারসাম্য ঠিক রেখে ধরে ধরে হাঁটিয়ে ভেতরে আনছে। কোনো এক কারণবশত সাবিন বিনা কারণেই খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে। আহানের গলার টাই হাতের আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে টানছে।
দৃশ্যটা অপ্রীতিকর এবং আপত্তিজনক। জায়দান দ্রুত সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। লম্বা কয়েক পায়ে কাছে পৌঁছেই আহানের হাত থেকে সাবিনকে ছাড়িয়ে নিলো। রমণী তৎক্ষণাৎ তার বুকে ঢলে পড়লো। গন্ধটা তখনি নাকে ঠেকলো জায়দানের। ঠান্ডা গলায় বললো,
“ ডিড ইউ ড্রিংক, মাই ওয়াইফ? ”
সাবিন চোখ পিটপিট করে জ্বলজ্বলে এক নিষ্পাপ ভঙ্গিতে জায়দানকে দেখলো। তারপর কোনো কারণ ছাড়াই ফিক করে হেসে উঠে তার বুকে মাথা গুঁজে দিলো। জায়দান তাকে বুকের মাঝে ধরে রেখে আহানের দিকে তাকালো।
“ তুমি বলেছিলে শুধুমাত্র একটা বিজনেস ডিনার পার্টি, রাইট? ”
আহান কাঁধ তুলে মুচকি হাসলো।
“ ওহ কাম অন, চিল ম্যান। শুধু তিনটে শটই নিয়েছে। সাবিন বরাবরই লাইট ড্রিংকার। এত চিন্তার কিছু নেই।”
জায়দান শীতল দৃষ্টিতে তাকালো আহানের দিকে। তাতে বান্দার ঠোঁটের মুচকি হাসিটি ক্রমেই ক্রুর হয়ে উঠলো।
“ হাহা, আহান ভাইয়া! আজকের স্পিডিংটা দারুণ ছিলো, উঁহু! আমরা আবার যাইনা কালকে? প্লীজ, প্লীজ, প্লীইজ! ”
জায়দানকে ছেড়ে আহানের দিকে ঘুরে ঠোঁট ফুলিয়ে আবেদন জানালো সাবিন। চোখ দুটো তার চকচক করছে। মুখটা লালচে, হেঁচকি তুলছে ক্ষণে ক্ষণে। আহান হাত বাড়িয়ে তার মাথা থেকে গাল অবধি স্পর্শ বুলিয়ে খানিকটা আবেশিত গলায় জবাব দিলো,
“ অফকোর্স, বেবিগার্ল। ”
“ সাবিন। ”
পিছন থেকে জায়দান সাবিনের পাতলা কোমরে দুবাহু জড়িয়ে তাকে নিজের কোলে তুলে নিলো। সাবিন সামান্য হেঁচকি তুলে আঁকড়ে ধরলো তার ঘাড়। তারপর দুর্বল শরীরে মাথা কাঁধে ঠেকিয়ে পরে রইলো চুপচাপ। এতক্ষণ যাবৎ প্যান্টের পকেটে রাখা চশমাখানি বের করে চোখে পরে আহানের দিকে তাকালো জায়দান।
“ সরি টু সে, কিন্তু ভবিষ্যতে আমার স্ত্রীর সঙ্গে তোমার নাইট আউট না করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এনিওয়ে, ওকে সুস্থভাবে বাসায় পৌঁছে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। প্লীজ, তুমি চলে গেলে বাইরে দারোয়ান আছে, উনি গেট আটকে দেবে। ”
“ অবশ্যই। আমি চলে যাচ্ছি। বাট আ সুইট রিমাইন্ডার টু ইউ দ্যাট, সাবিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, ইউ নো? ও নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। ওর ড্যাডেরও ক্ষমতা নেই ওর স্বাধীনতাকে রোখার। বিষয়টা মাথায় রাখলেই ভালো। গুডনাইট। ”
উল্টো ঘুরে গেলো আহান। পায়ে পায়ে হেঁটে সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলো। পিছনে মৃদু শব্দ তুলে আটকে দিলো দরজা। জায়দান খানিকটা সময় নিঃশব্দে চেয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার পথের দিকে। সাবিন ঘুমের ঘোরে কি যেন বিড়বিড় করে উঠতেই সম্বিৎ ফিরে পেয়ে স্ত্রীকে ভালোমত নিজের বুকে জড়িয়ে দুইতলার সিঁড়ির দিকে এগোলো। নিশাচরের মতন নীরবে সিঁড়ির উপরে পৌঁছাতেই অদূর থেকে রাগী অথচ মৃদু নারীসুলভ কণ্ঠটি ভেসে এলো।
“ ভদ্রলোকের বাড়ির মেয়ে বউরা রাত বিরাতে মাতাল হয়ে বাড়ি ফেরেনা। ”
থমকে গেলো জায়দানের পদক্ষেপ। সামান্য মাথা হেলিয়ে পিছনে তাকালো। হলঘরে দন্ডায়মান ছায়ামূর্তি। ওটা যে জেসমিন, তা টের পেতে বেগ পোহাতে হলোনা জায়দানকে।
“ আম্মু, তুমি এখনো ঘুমাওনি? ”
নির্লিপ্ত প্রশ্ন করলো সন্তান। জননী তাতে ছায়া ছেড়ে হালকা আলোর মাঝে সরে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় জবাব দিলেন,
“ ঘুম নামক শান্তি তোমার বউ আসার সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়ি থেকে উড়ে গিয়েছে। ”
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো জায়দান। কোলের মাঝে সাবিনকে সাবধানে ধরে তার মুখটা নিজের বুকের মাঝে আড়াল করে নিয়ে নরম কন্ঠে বললো,
“ আম্মু। অনেক রাত হয়েছে। তোমার প্রেশারের সমস্যা আছে। প্লীজ ঘুমিয়ে পড়ো। শুভরাত্রি। ”
এটুকুই। আর কথা বাড়ালোনা জায়দান। ঘুমন্ত সাবিনকে নিয়ে হেঁটে চলে গেলো নিজেদের বেডরুমের দিকে। পিছন থেকে ভেসে এলো জেসমিনের কন্ঠস্বর।
“ ওই বউ তোমাকে ভোগাবে জায়দান, আমার কথা মিলিয়ে নিও। ”
বর্তমান।
নিজের হাতটা আচমকাই সাবিনের কাছ থেকে টেনে সরিয়ে নিলো জায়দান। রমণীর মাথা তাতে নড়ে উঠলো। চোখের পাতা কেঁপে উঠলেও ঘুম ভাঙলোনা সাবিনের। জায়দান সটান টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। তার এমন হঠাৎ কান্ডে বিস্মিত মীরা।
শেষ একবার সাবিনের মুখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো জায়দান। বেডের পাশ ঘেঁষে ঘুরে এলো। মীরার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মৃদু আঁচে একটা কথাই বললো,
“ আমি এসেছিলাম, সেটা ওকে জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। ”
মীরাকে পাশ কাটিয়ে লম্বা পায়ে নিঃশব্দে সোজা হেঁটে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেলো জায়দান। পিছনে ফেলে গেলো নিজের পারফিউমের একদম হালকা সুঘ্রাণ। মীরা চোখ পিটপিট করে তার চলার পথে তাকিয়ে পরক্ষণে আবার সাবিনের দিকে দৃষ্টি ফেরালো। এখানে এইমাত্র যা হয়ে গেলো তার একটা কিছুও মাথায় ঢোকেনি। সব কেমন যেন তালগোল পাকানো।
বেডে পা ঝুলিয়ে চুপচাপ বসে ওয়ার্ডের জানালা গলে নরম রোদ চুঁইয়ে পড়া দেখছি আমি। অন্যদিকে মীরা ব্যস্ত টুকিটাকি জিনিসগুলো গুছিয়ে নেয়ার। একটা টোটব্যাগের ভেতরে ওষুধ, চিরুনী, পানির বোতল এবং ছোটখাট সামগ্রীগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে সে। নার্সরা স্যালাইন স্ট্যান্ড সরিয়ে রাখছে। এবার আমার হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার পালা। গতকাল রাতে বেশ লম্বা একটা ঘুম দেয়ায় এখন শরীরটা আগের তুলনায় বেশ ভালো লাগছে।
কাজ শেষ করে ব্যাগ এক কাঁধে নিয়ে অপর হাতটি আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো মীরা। ঠোঁটে হাসি মেখে বললো,
“ চল দোস্ত, এবার বাসায় ফেরা যাক। ”
ওর হাসিটুকু মায়াবী দেখালো ভীষণ। পাল্টা খানিক হাসতে চেয়েও পারলাম না। ফোলা গালে ব্যথা লাগলো বেশ। তাই হাসির চিন্তা বাদ দিয়ে বান্ধবীর হাতটা ধরে উঠে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে ওয়ার্ড ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
“ আস্তে আয়। কোথাও ব্যথা লাগছে? ”
“ আমি ঠিক আছি মীরা। এত চিন্তা করিস না। ”
মুখে বললেও মাথা এবং হাতের ব্যান্ডেজের ভেতর চিনচিনে ব্যাথা স্পষ্ট টের পাচ্ছি। মীরার সহযোগীতায় ওয়ার্ডের করিডোর পেরিয়ে বাইরে এলাম। মূল ফটক পেরিয়ে যেই না আমরা দুজন বাইরে পা রাখলাম তখনি আশেপাশে তীব্র এক গুঞ্জন উঠলো। বুঝতেও পারলাম না কি হচ্ছে। একেবারে হঠাৎ করেই মৌমাছির ঝাঁকের মতন তেড়ে এলো একদল লোক। হাতে হাতে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন এবং মোবাইল ফোন। শুধুমাত্র আমরা না, আমাদের আশেপাশে থাকা হাসপাতালের অন্যান্য রোগী এবং কর্মীরাও ভড়কে গেলো। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলা হলো আমাদের। মুখের সামনে অগণিত মাইক্রোফোন, হ্যান্ড মাইক্রোফোন এবং মাউথপিসের অস্তিত্ব দেখলাম। কে কে যেন কোথা থেকে হাত বাড়িয়ে আমার জামার কলারে অবধি মাইক গুঁজে দিচ্ছে।
“ আরে আরে! এসব কোন ধরণের অসভ্যতা? সরুন! সরুন বলছি! ”
মীরা গর্জে উঠে কয়েকজনকে ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হলোনা। ভীড় ক্রমশ বাড়তেই থাকলো। পারলে আমার গায়ের উপর উঠে আসে। সকলের সম্মিলিত উত্তেজিত কন্ঠস্বর আমার কানে ঘণ্টার মতন বাজতে থাকলো।
“ আমি লাইভ টিভি থেকে এসেছি। আপনার বিরুদ্ধে একটা পিৎজা বিজনেস নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে সেটা কেমনভাবে দেখবেন? ”
“ আমাদের তথ্যমতে আপনি তো খুব ধনী পরিবার থেকে এসেছেন। তাহলে মানুষের সঙ্গে এমন উদ্ভট আচরণের মানে কি? ”
“ মিস সাবিন হুসেইন! গত বছর হুসেইন গ্রুপের এত বিভৎস পতনের পরপর আপনার মনুষ্যত্বেরও অধঃপতন। রাস্তাঘাটে মার খাওয়ার বিষয়টা আপনার পরিবারের অন্যদের উপর কেমন প্রভাব ফেলছে?”
“ সাবিন হুসেইন! প্লীজ। আপনার দিকটা ক্লিয়ার করুন। আপনি রাস্তায় কেনো? ”
একটা প্রশ্নও আমার কানে পৌঁছালোনা। কেমন গমগমে শোনালো সবকিছু। মীরার আর্তচিৎকার শুনলাম,
“ আল্লাহর দোহাই লাগে, মেয়েটা অসুস্থ! ওকে একটু শান্তিতে বাঁচতে দিন আপনারা! ”
পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। ক্যামেরা এবং মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশ, সোশ্যাল মিডিয়ার লাইভ আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিলো। কানে শুধুই অশ্রাব্য শব্দেরা গুণগুণ করতে থাকলো। হুড়োহুড়িতে চোখেমুখে গোত্তা লাগতেই আগের ক্ষত ভয়ানকভাবে যাতনা ছড়িয়ে দিলো সমস্ত শরীরে। হাসপাতালের কয়েকজন গার্ড ঠেলেঠুলে লোকজন সরানোর চেষ্টা করছে। আমার কানে শুধু গোত্তা খেয়ে যাচ্ছে,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৫
“ সাবিন হুসেইন….সাবিন হুসেইন…! ”
“ আহহহহ! আমি সাবিন হুসেইন না! সাবিন হুসেইনকে বাঁচতে দিসনি তোরা! ”
কন্ঠনালী ছিঁ*ড়ে জোরালো চিৎকার বেরিয়ে এলো আমার। মনে হলো, বুঝি ভেতরের অন্তরটাই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। রয়ে গেলো শুধু আর্তচিৎকারের দামে কেনা ঝড়ের মাঝের এক পশলা নীরবতা।
