Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৭

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৭

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৭
জাবিন ফোরকান

তাকদীর হুসেইন।
অভিজাত মহলে আমার ড্যাডের নামের কোনো তুলনা ছিলোনা। আমাদের পরিবারটা ওল্ড মানি ছিলোনা। অর্থাৎ বনেদী নয়। ড্যাডই সেই ব্যক্তি যে হুসেইন নামের শূন্যতা থেকে তৈরি করেছিলেন মহাশূন্য। তার মতন বিচক্ষণ ব্যবসায়িক টাইকুন গোটা দেশে খুঁজে হয়ত হাতে গোণা কয়েকজনকে পাওয়া যাবে। মধ্যবিত্তের কাতার থেকে গোটা হুসেইন সাম্রাজ্যকে টেনে নিয়ে তিনি ফেলেছিলেন ধনীদের কাতারে। আমার জন্ম হয়েছিলো ড্যাড আর হুসেইনদের স্বর্ণযুগে।
ড্যাডের একমাত্র দূর্বলতার নামটা আমি, সাবিন। প্রাণাধিক ভালোবাসতেন তিনি আমায়। সেই ভালোবাসা ছিলো নিতান্তই অন্ধ। চোখ – মুখ বুঁজে ভালোবাসা জাহির করা যাকে বলে। অভাব কি জিনিস জন্মের পর থেকে কোনোদিন অনুভব তো দূরে থাক, কানে শুনিওনি। একমাত্র সন্তান, একমাত্র কন্যা। পুরুষের হৃদয়ের মহৎ দূর্বলতা। যাই চেয়েছি, তাই পেয়েছি। যা চাইনি, তাও পেয়ে গিয়েছি। এত এত অর্থ সম্পদ, সবকিছুই সাবিন নামের পদতলে। টাকার বিছানায় ঘুমানো শুধুমাত্র একটা প্রবাদবাক্য হলেও সেটি আমার জীবনের অমোঘ সত্যি ছিলো একটা সময়ে। কোনোকিছুর ভয় ছিলোনা, না ছিলো পরোয়া। ভীষণ স্বাধীনচেতা ছিলাম আমি, এখনো আছি। কিশোরী বয়সেই সমবয়সী বন্ধু বান্ধবদের সাথে রাজধানীর রাস্তায় রেসিং করা শিখে গিয়েছিলাম। আঠারো হওয়ার আগেই পা রেখেছিলাম ক্লাবিং, নাইট আউটের দুনিয়ায়। বন্ধুদের সাথে হুটহাট বিদেশ ট্যুর আমার জীবনের অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো। এমনও দিন গিয়েছে কাউকে না জানিয়ে বান্ধবীদের সাথে বালিতে পৌঁছে ড্যাডকে ফোন করেছি, যেন চিন্তা না করে। রাণীর মতন যে জীবন যাপনের ওয়াদা পুরুষ এক নারীর কাছে করে, আমি তখন থেকেই সেই রকম জীবনের অধিকারী ছিলাম।

তাই হয়ত আমার অহংকারটা দিনকে দিন বেড়েই চলছিল। ধরাকে সরা জ্ঞান করা যাকে বলে, আমি তাই করতাম। নাকের ডগায় রাগ পোষা থাকতো আমার। কারণ আমি জানতাম, যাই হয়ে যাক না কেনো, আমার পিছনে তাকদীর হুসেইন আছেন। আমার ধনী ড্যাড। এই দেশে টাকার চাইতে বড় কোনো ক্ষমতা নেই।
এরপর একদিন হঠাৎ করেই মুক্ত বিহঙ্গের মতন জীবনটা বদলে গেলো। ড্যাড কি চিন্তা করছিলেন আমি জানিনা। শুধু ধারণা করতে পারি। আমার জীবনধারা তিনি মোটেও পছন্দ করছিলেন না। শেষদিকে বহুবার রাত বিরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যাত্রায় বাঁধা পেয়েছি। অথচ ড্যাড আগে এমনটা করতেন না। এখন কেন করছেন? ভেবে ভীষণ রাগ হতো আমার। সপ্তাহে সপ্তাহে বাসার জিনিসপত্র ভাংচুর করা আমার নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়। গ্র্যাজুয়েশনের পরপরই লাগামহীন জীবনটায় বিয়ে নামক লাগাম পরে যায়।

অতঃপর রচিত হয় আরো এক আখ্যান। যার নাম দেয়া আমার পক্ষে দুষ্কর। ডিভোর্সের পর খুব তৃপ্তি পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আমার জীবনটা আবারো আগের মতন হয়ে উঠবে। মুক্ত, স্বাধীন, নির্ভয়, দূর্বার, দুর্বোধ্য। দুঃসাহসের ডানায় ভর করে আমি উড়ব, আমায় রোখার কেউ থাকবেনা। ভাগ্য বুঝি আমার অনুরাগ শুনে কুটিল হেসেছিল। আমার খায়েশ নিদারুণভাবে মেটানোর সমস্ত পরিকল্পনা ভাগ্য আগে থেকেই সেরে রেখেছিল।
ডিভোর্সের কিছুদিন পরেই, স্ট্রোকে মৃ*ত্যু হয় ড্যাডের। তাকদীর হুসেইন নামটা তৈরি করতে লেগেছিল বছরের পর বছর, অথচ সেই নামটার মান সম্মান গুঁড়িয়ে যেতে প্রয়োজন ছিলো কয়েক ঘণ্টার। বিজনেসের বি বুঝে ওঠার আগেই আমার সামনে খুলে যায় হাজার হাজার দেনা পাওনার ফাইল। কি রেখে কি সামলাবো, নাকি নিজের সদ্য পিতৃহারা অন্তরকে বোঝাবো বুঝে ওঠার আগেই বাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়া বন্যার পানির মতন চলে যেতে লাগলো সকল অর্থ – সম্পদ। যে সম্পত্তির বড়াইয়ে একটা সময়ে আমার মাটিতে পা পড়তোনা, সেই সম্পত্তি কয়েক দিনের মাথায় চলে গেলো ব্যাংক হেফাজতে। ড্যাড নাকি ইমপোর্ট বিজনেসের জন্য অনেক মোটা অংকের ঋণ নিয়েছিলেন ব্যাংকের কাছ থেকে। হুসেইন নামটা যেমন একেবারে হঠাৎ করে অভিজাত মহলে উদয় হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ করেই বিদায় নিলো সামান্যতম রেশ না রেখে।

ভাগ্যের এমনি পরিহাস ছোটবেলা থেকে কোলেপিঠে মানুষ হয়ে ওঠা চাচা – চাচীর দুয়ারে অবধি আমার স্থান হয়নি সেদিন। বড় চাচা চাচীর গোমড়া মুখের দিকে নজরপাত করে আমায় বলেছিলেন,
“ সাবিন, বুঝতেই তো পারছিস মামণি, আমি অপারগ।”
এত বড় সংকেতের পরে বলার আর কিছু থাকেনা। এক ব্যাগে কাপড় নিয়ে চাচার বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম আমি। আমার সঙ্গে ছিলো শুধু পরিধানের কাপড় চোপড় আর বিয়ের দেনমোহরের চল্লিশ লাখ টাকা——
মীরার থমথমে মুখটায় এক অদ্ভুতুড়ে ছায়া পড়লো। টানা টানা হরিণীর ন্যায় চোখজোড়াতে অব্যক্ত কিছু ভাসলো। বুঝলাম, হয়ত জিজ্ঞেস করবে আমার কাছে যে টাকাগুলো ছিল সেগুলো কোথায়। কিন্তু মেয়েটাকে হয়ত আমি ভুল বিচার করে ফেলেছি। কিছুই জিজ্ঞেস না করে সে নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে গেলো। কিছুক্ষণ বাদেই ফিরে এলো এক গ্লাস লেবুর শরবত হাতে। আমার হাতে দিয়ে বললো,

“ অনেক কথা হয়েছে। এবার একটু গলা ভিজিয়ে নে। ”
মেয়েটার দিকে নিষ্পলক কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলাম আমি। পৃথিবীতে এত ভালো মানুষও থাকা সম্ভব? জানা নেই আমার। এই মুহূর্তে নিজেদের ঘরের বিছানায় বসে আছি আমি। বাইরের জগতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। অথচ আমার জীবনটা বুঝি ওই একটা চক্রেই আটকে আছে। দুর্ভাগ্যের চক্র। যে চক্রের ভয়াল প্রভাব থেকে আমি কিছুতেই আর নিজের জীবনটাকে মুক্ত করে নিতে পারছিনা। কোনোদিন ভাবিনি আজ মীরার সামনে আমায় নিজের অতীত জীবনের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসতে হবে। কোনো প্রয়োজন ছিলোনা, মীরা আমায় চাপ দেয়নি। তবুও অন্তর থেকে যে শব্দগুলো আজ বেরিয়ে গিয়েছে, তাদের হয়ত বহুদিনের তাড়া ছিলো নিজেদের প্রকাশের।
শরবতের গ্লাসে চুমুক দিলাম। টের পেলাম বিনা কারণেই আমার হাত সামান্য কাঁপছে। এক চুমুকের বেশি শরবত আমার গলা বেয়ে নামলো না। গ্লাসটা আনমনে ধরে রেখেই মীরার দিকে তাকালাম। জানালার দিকে চেয়ে কেমন এক উদাসী ভাব মেখে বসে আছে। বুঝলাম, আমার গল্পটা তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে হয়তবা।
“ আমি একটা খারাপ মেয়ে, তাইনা রে মীরা? ”
আমার নিষ্প্রাণ কন্ঠস্বর কানে যেতেই মীরা চোখ ঘুরিয়ে তাকালো। স্থির দেখলো আমায়। ওই নয়নজোড়ার মাঝে কি আছে আমি জানিনা। তবে নিজের জন্য ঘৃণা এবং হতাশা দেখতে না চাওয়ায় নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম। আনমনে বলে উঠলাম,

“ না পেরেছি ড্যাডের সাথে থাকতে, না পেরেছি সংসার টিকিয়ে রাখতে। আমার মতন মানুষদের সঙ্গে এমনি হয় মীরা। মানুষ যখন সম্পদের মোহে অন্ধ হয়ে যায়, তখন ভাগ্য তাকে এভাবেই মুখ থুবড়ে মাটিতে টেনে ফেলে। মীরা, তুই খুব ভালো একটা মেয়ে রে। তোর আমার মতন একটা চরম বেয়াদব মেয়ের জীবনে আসা উচিত হয়নি। আমার দূর্ভাগ্য তোকেও অচিরেই গ্রাস করবে। ”
“ চুপ! একদম চুপ! আর একটা কথা বললে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো!”
আচমকাই ধমকে উঠলো মীরা। নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে ধপাস করে আমার পাশে বসে পড়লো। দুবাহু বাড়িয়ে শক্তভাবে আমার কাঁধ জড়িয়ে বললো,
“ তুই আসলেই একটা বেয়াদব, অসহ্যকর, অহংকারী, বদমেজাজী মেয়ে। তোর দোষের কথা গুণে শেষ করা যাবেনা। কিন্তু এই শয়তান তুইটাই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, একটা না পাওয়া বোন সমতুল্য। ”
জমে গেলাম সম্পূর্ণ। মনে হলো বুকের ভেতরের হৃদযন্ত্রটা বিদ্রোহে মেতেছে। বেহুদাই দ্রুত স্পন্দিত হয়ে চলেছে। মীরা দুহাতে আমার মুখটি তুলে নিজের দিকে ঘোরালো। ব্যান্ডেজের আড়ালে ফোলা গালে আলতো স্পর্শ বুলিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বললো,

“ বন্ধুত্ব কখনো পারফেক্ট হয়না সাবিন। যদি তোর দোষ গুণ, চরিত্র, বৈশিষ্ট্য দেখেই তোকে বন্ধু বানাতাম তাহলে সেটা কি আর বন্ধুত্ব থাকতো? দর কষাকষি হিসাব হয়ে যেতনা? আমি বাজারে একটা পারফেক্ট বন্ধু কিনতে আসিনি। আমি একটা ভেজালমুক্ত খাঁটি বন্ধু পেয়েছি। তুই হয়ত মানুষটা ভালো না, কিন্তু তুই মানুষটা বাস্তব। যা তথাকথিত ভালোর মুখোশ পরে থাকা হাজারটা পারফেক্ট মানুষের থেকে অনেক গুণে সত্য। ”
বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। মানুষ এমনও হয়? নাকি মীরা পাগল? ওর মাথায় নিশ্চিত সমস্যা আছে। আমার ভাবনা বুঝি পড়তে পারলো মেয়েটা। তাই খিলখিল করে হেসে উঠলো। তর্জনী তুলে আমার নাকে টোকা দিয়ে সে জানালো,
“ আমি আমার নাকের ডগায় রাগ পুষে রাখা রগচটা বেয়াদব বান্ধবীটাকেই ভালোবাসি। ”
মীরার কাঁধে মাথা গুঁজে একদম চুপটি করে পরে থাকলাম। মেয়েটি আমায় আগলে নিয়ে অতি যত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আবেগ গলায় দলা পাকিয়ে গেলো আমার। ভাঙা গলায় কান্না চেপে ফিসফিস করলাম,
“ আমি তোকে ডিজার্ভ করিনা, মীরা। ”
“ কে কার যোগ্য সেই হিসাব তোর করার না। সময় দে নিজেকে। ভাগ্যাকাশের এই কালো মেঘ দ্রুতই কেটে যাবে। আবারো তোর জীবন ভরে উঠবে সূর্যরশ্মিতে। আমার কথা মিলিয়ে নিস, সাবিন। ”
সূর্যরশ্মি? এই আঁধার কালো রাত্রিতে? বাস্তবতা নয় সেটি। কিন্তু মানুষ তো কল্পনাবাসী। স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়?

সাবিন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে আজ এক সপ্তাহ প্রায়। সেদিনের সেই ঘটনা এবং পরে হাসপাতালে ঝেঁকে ধরা হলুদ সাংবাদিকদের অপপ্রচারের কল্যাণে সাবিন দেশের অঘোষিত এক সেলিব্রিটিতে পরিণত হয়েছে। এই দুনিয়া ভাইরালের দুনিয়া। সাবিনকেও ভাইরালের বস্তুতে পরিণত করে তবে ক্ষান্ত হয়েছে জনতা। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে রাস্তা দিয়ে মনমত হেঁটে যাওয়াও দুষ্কর। সাবিন তাই বাসায় থিতু হয়েছে। একবারের জন্যও বাইরের জগতে পা রাখেনি।
এখন রাত অনেক। প্রায় এগারোটা। মীরা এত রাত্রিতে বেরোতে পছন্দ না করলেও আজ বাধ্য হয়েছে। যেহেতু সাবিনের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও কদাচিৎ কাছাকাছি দেখা গিয়েছে, ঝামেলা ঝক্কির অনেকটা অংশ তার উপরেও পড়ছে। ক্যাম্পাসের বন্ধু বান্ধবদের সত্যি ঘটনা খুলে বলে বোঝানো গিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো আর বুঝবেনা। বাসার বেশকিছু জিনিস কেনাকাটা প্রয়োজন তাই সে তুলনামূলক সুনসান রাতের সময়টাকেই বেছে নিয়েছে। পরনে হালকা সালোয়ার কামিজ এবং মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক। মীরা ঢুকলো রাস্তার ধারের ছোট একটা সুপার শপে। এসব দোকান অনেক রাত অবধি খোলা থাকে।

লিস্ট দেখে দেখে প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিঃশব্দে কার্টে তুলে নিচ্ছিলো মীরা। ঠিক তখনি অদ্ভুতুড়ে এক ধরণের ফ্ল্যাশে চমকে উঠলো। মাথা হেলিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাতেই দেখলো তার ঠিক পাশের আইলেই দাঁড়ানো এক লোক। হাতে মোবাইল ফোন। মীরার ছবি তুলছিল স্পষ্টত, তবে হয়ত ফ্ল্যাশ অফ করতে ভুলে গিয়েছিল। তাই মীরা তাকাতেই তড়িঘড়ি করে সে ফোন পকেটে ভরে ফেললো। কার্টের হাতলে শক্তভাবে চেপে বসলো মীরার হাত। তারপরই সেটি ধাক্কা দিয়ে পাশে ঠেলে হনহন করে এগোলো। চোখের কোণে খেয়াল করলো এখানে সিসিটিভি থাকলেও সেটার লেন্স খুলে ঝুলে আছে, অর্থাৎ নষ্ট। এই সুযোগটাই নিয়েছে লোকটা। মীরাকে দেখে সে নিঃশব্দে পিছু হটছিল তখনি মীরা খপ করে তার কব্জি পাকড়াও করে ফেললো।
“ ফোনটা দেখি। ”
“ হ্যাঁ? ”
“ শো মি ইওর ফোন, নাউ! ”
লোকটার সঙ্গে একপ্রকার হাতাহাতি করেই মীরা তার পকেট থেকে ছো মেরে ফোনটা বের করে নিলো। ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক থাকায় তার আঙুল চেপে ছাপ বসিয়ে গজগজ করে উঠলো,
“ আপনারা কি একটা মেয়েকে কখনো শান্তিতে বাঁচতে দেবেন না? গোটা সমাজ মিলে তার টুঁটি চেপে ধরেও শান্তি হয়নি? ”

মীরা ভেবেছিল লোকটা অনলাইনের কেউ, আর তার ছবি সাবিনের ঘটনাটার ব্যাপারেই তুলেছে। কিন্তু ফোন খুলতেই মীরার চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার দশা। লোকটা তার ছবি তুলেছে ঠিকই, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। অত্যন্ত বিশ্রীভাবে মীরার বুকের দিকের অংশটায় জুম করে ফোকাস করা হয়েছে। বুকের উপরিভাগ থেকে কোমর অবধি দৈর্ঘ্য ছবিটার। বজ্রাহতের মতন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মীরা প্রথম কয়েক সেকেন্ড। তারপর ফিক করে হেসে উঠলো,
“ আরে বাহ্! মশাই আপনার তো দেখছি রসের কোনো কমতি নেই! ”
লোকটি মীরার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করতেই রমণী সেটি তৎক্ষণাৎ ছুঁড়ে মারলো ফ্লোরে। শক্ত টাইলসের মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেলো ফোনটা। সকল পার্টস খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো চারপাশে।
“ ওগো! কি হয়েছে? ”
ঠিক তখনি দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটলো এক নারীর। কার্ট ঠেলে এগিয়ে আসছে, পরনে সুতির প্রিন্টের শাড়ী। সে এসেই এমনভাবে লোকটার বাহুতে হাত রাখলো যে মীরার বুঝতে বাকি রইলোনা এই নারী তার স্ত্রী হয়।

“ কি…কিছুনা, হাত থেকে ফোনটা ফস্কে পরে গিয়েছে সুইটি…”
“ ইশ! এত দামী ফোন, সেদিনই কিনলে, কিভাবে পড়লো? ”
দম্পতিদের কথোপকথনের মাঝে মীরা খানিক ঝুঁকে সাবধানে ভাঙা ফোনের ধ্বংসস্তূপ থেকে মেমোরি এবং সিমকার্ড তুলে নিয়ে নিজের ব্যাগে রেখে দিলো। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই লোকটার গাল বরাবর সশব্দে চড় বসিয়ে দিয়ে তার স্ত্রীকে বললো,
“ পুরুষের মতন দেখালেও কিছু লোক ভেতর থেকে জানোয়ার হয়। বিয়ে করার আগে ভালোমত পরখ করার দরকার ছিলো, আদতেই পুরুষ বিয়ে করছেন নাকি কুকুর।”
“ অ্যাই আপু! কি বললেন আপনি! আমার স্বামীর সম্পর্কে একদম বাজে কথা বলবেন না! ”
হতবাক মহিলা প্রশ্ন ছুঁড়তেই মীরা তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ নয়নে তাকালো। তারপর ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে জানালো,

“ চোখে ঠুলি পরে থাকা মহিষকে কিভাবে বোঝানো যায় ঘাসের রং সবুজ, কালো নয়? ”
“ অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করছিস তুই এবার, বেয়াদব ছেড়ি! ”
অতর্কিতে খেঁকিয়ে উঠে লোকটা মীরার দিকে হাত বাড়াচ্ছিল, ঠিক তখনি তার হাতটা কেউ আচমকাই ধরে ফেললো। শক্ত পুরুষালী বাহুর অস্তিত্ব টের পেয়ে মীরা ঝট করে মাথা হেলিয়ে তাকাতেই মানুষটার মুখোমুখি হলো। সেদিনের দেখা সেই ছেলেটা, ঠিক মীরার পিছনেই দন্ডায়মান, লোকটার দিকে চেয়ে আছে আগুনে দৃষ্টিতে।
বাঁকা হাসলো আয়দান আরেফিন। হতবাক লোকটার মুঠো চেপে সজোরে বাঁকিয়ে ধরলো হাতখানি।
“ আহহহহ! ”
“ ফোন আমার পকেটেও আছে। মেমোরি কার্ডটা ভরে দেখা যাক তুই আদও হিমালয় ফেরত সাধু নাকি? ”
“ ভাই, ছেড়ে দিন প্লীজ! ”
লোকটির স্ত্রী আয়দানের বাহু চেপে ধরে আর্জি জানালো। ততক্ষণে শপের দুইজন স্টাফও দৌঁড়ে এসেছে হট্টগোল শুনে। আয়দান লোকটার গাল বরাবর সজোর এক ঘুষি হাঁকিয়ে বলে উঠলো,

“ ইতরের বাচ্চা! ”
ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিয়ে পিছনে ঘুরলো আয়দান। মীরা বর্তমানে এতটাই বিস্মিত যে অবাক তাকিয়ে ছাড়া আর কিছুই করতে পারছেনা। তার মুখ দেখে আয়দানের ঠোঁটে ছড়িয়ে থাকা হাসিখানি আরো বিস্তৃত হলো। সামান্য ঝুঁকে মীরার কানের কাছে সে ফিসফিস করলো,
“ লুকস লাইক আই ফাইন্ড ইউ ওনলি হোয়েন ইউ আর ইন ট্রাবল, কিটেন। ”
“ জায়দান! ”
বিপরীতে আনমনে তার জানা নামটা ফিসফিস করে উচ্চারণ করলো মীরা।

সময়ের হিসাবে রাত ১১:৩০ গভীর রাত। তবে এই রাতের কোনো ভয়ডর আমার মাঝে কোনোকালে ছিলোনা। ভূত – প্রেত না হলেও একলা মেয়ে হিসাবে সংকোচ করা উচিৎ। সমাজ আমাদের তেমনটাই শিক্ষা দেয়। অথচ আমার মাঝে তার কোনো হেলদোল নেই। তাইতো মীরা বাইরে থাকাকালীন বাসায় তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়তে খুব বেশি ভাবনা চিন্তার প্রয়োজন হয়নি।
টানা সাতটা দিন বাসায় সিধিয়ে থাকার মতন মানুষ আমি নই। দমবন্ধকর এক অবস্থা। একা থাকলে বুকের ভেতরের একাকীত্ব এবং হতাশার অনুভূতিটা ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে। কিছুক্ষন আগেও বিছানায় শুয়ে শুয়ে রুমের সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে হিসাব কষছিলাম ঠিক কতটুকু লম্বা এবং মোটা দড়ি হলে ওই ফ্যান আমার ভার বইতে পারবে। চিন্তা অত্যন্ত অশুভ বুঝে ওঠার সাথে সাথে আলমারি থেকে নিজের ওভারসাইজড হুডিটা গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়েছি। এই রুমের ভেতর একলা থাকতে এখন আমি নিজের উপরেও নিজে বিশ্বাস রাখছিনা।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত এক ব্যক্তির মুখোমুখি হলাম। বাড়িওয়ালা, মোখলেস চাচা। ধবধবে সাদা লম্বা দাড়ি মুখজুড়ে, মাথায় টুপি, পরনে লুঙ্গি এবং চাদর। বয়সে আমার দাদার সমান। আমায় দেখে মোখলেস চাচা সামান্য কেশে বললেন,

“ সাবিন দেখছি। ভালোই হয়েছে তোমাকে এখানে পেয়ে গেলাম। তোমাদের বাসাতেই যাচ্ছিলাম। ”
মোখলেস চাচা বাড়িওয়ালা হিসাবে যথেষ্ট ভালো মানুষ। রাজধানীতে ব্যাচেলর মেয়েদের ভাড়া দেয়া এমন মানসিকতার ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দূরূহ। আমি সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“ জ্বি, চাচা? কিছু বলবেন? ”
মোখলেস চাচা কেমন যেন ইতস্তত করতে লাগলেন। অতঃপর জড়তা ঝেড়ে বলেই ফেললেন,
“ আসলে মা, হয়ত এমন সময়ে এমন বলাটা খারাপ আর অমানবিক, কিন্তু আমি নিরূপায়। তোমরা দুজন বাসাটা খালি করে দাও, এক সপ্তাহ সময় দিচ্ছি আমি তোমাদের। ”
আমার অবাক হওয়া উচিত ছিলো। অথচ একটুও হলাম না। বরং আমার ঠোঁটজুড়ে অদ্ভুতুড়ে এক হাসি ছড়িয়ে পড়লো। সামান্য শব্দ তুলে হেসে ফেললাম আমি। তাতে মোখলেস চাচা বেজায় বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকলেন।
“ যা হচ্ছে তার জন্য আমি দুঃখিত, কিন্তু আমার দিকটাও একটু বুঝবে আশা রাখি। বিল্ডিংয়ের সামনে প্রতিদিন অজানা মানুষকে ভীড় করে ভিডিও করে। আমায় জ্বালিয়ে মারছে পাড়া প্রতিবেশী। ঘরে বাড়ন্ত মেয়ে, নাতনী। তোমাদের সাথে যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছেনা, আমি জানি তোমরা নির্দোষ। কিন্তু আমার সঙ্গে যা হচ্ছে তা কি ঠিক হচ্ছে বলো মা?”

“ উঁহু, একদম ঠিক হচ্ছেনা চাচা। ”
হাসিমুখেই জবাব দিলাম আমি। তারপর মাথা সামান্য কাত করে শীতল গলায় বললাম,
“ সাত দিনের আগেই আপনার বাসা খালি করে দেবো। চিন্তা করবেন না চাচা। ”
এটুকুই। পাশ কাটিয়ে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম। আমার কঠিন কথায় মোখলেস চাচা কষ্ট পেয়েছে স্পষ্ট বুঝেছি। কিন্তু আমার তাতে আপাতত কিছু যায় আসেনা। অসহায় দুটো মেয়েকে যখন এমন দূর্যোগে বাড়ি ছাড়তে বলতে পারছেন, তখন ওটুকু তার প্রাপ্য ছিল।
বাইরের রাস্তায় পা রাখতেই ঝিমঝিম কুয়াশার বর্ষণ টের পেলাম। নভেম্বর মাসটা যত শেষের দিকে যাচ্ছে ততই শীতের প্রকোপে বেড়ে চলেছে। রাত্রির তীব্র কনকনে বাতাস আমার হুডির ভেতরেও কেমন এক শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রাণ ভরে প্রশ্বাস টানলাম। ফুসফুস ফুলে উঠলো শীতল বায়ুতে। ধারালো ছু*রির মতন গেঁথে গেলো তা শ্বাসনালীজুড়ে। সামনে এগোলাম। বারোটার কাছাকাছি সময়ে চারপাশে মুগ্ধকর নীরবতা। রাত্রির এই সময়টা আমার সবচেয়ে পছন্দের। যখন নির্জনতার মাঝে একাকীত্বের বসবাস। হলদেটে সোডিয়াম বাতির অপ্রতুল আলোর পথ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম। গন্তব্যহীন।
আমার জীবনটাই এখন উদ্দেশ্যহীন এক তরী। যে তরী কোন ঘাটে গিয়ে ভিড়বে কিংবা তার নামে নামাঙ্কিত কোনো ঘাট এই পৃথিবীতে রয়েছে কিনা জানা নেই। এমনটাই হওয়ার ছিলো। সূচনায় যার গলদ, সমাপ্তিতে সে কিভাবেই বা সুখ পায়?

গলির শেষ প্রান্তে স্ট্রীট ল্যাম্পের নিচ বরাবর দাঁড়ানো দুজন লোককে চোখে পড়লো। একটা মুখ সামান্য চেনা, এলাকায় হয়ত আসতে যেতে কখনো দেখেছি। অপরজন অচেনা। বেশ আয়েশ করেই সিগারেট টানছে দুজন। হাস্য রসাত্মক কোনো গল্প করছে বোধ হয়। আমি বিশেষ খেয়াল না দিয়ে পাশ বেয়ে হেঁটে যেতে চাইলাম। তখনি খেয়াল করলাম দুজনের হাতেই উঠে এসেছে মোবাইল ফোন। ব্যাপারগুলো গত কয়েকদিনে আমার সঙ্গে এতবার হয়েছে যে, তারা আমার ছবি তোলার চেষ্টা করছে বুঝতে একটুও সময় লাগলোনা।
বুকের মাঝে ভয়ানক এক ঝড় উঠলো। মাথার মস্তিষ্কে বুঝি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি জাগ্রত হয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটালো। শাই করে ঘুরে দাঁড়ালাম। মাথায় তুলে দেয়া হুডির টুপি খুলে নিজের খোলস উন্মুক্ত করলাম। ধপাধপ করে হেঁটে বরাবর তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দুহাত দুদিকে বাড়িয়ে প্রশস্ত করে ঝিলিক মাখা নয়নে বলে উঠলাম,
“ ছবি তুলবেন আমার? নিন, তুলেন। ”
দুজনই ভড়কে গিয়েছে টের পেলাম। তাই আরো কয়েক পা এগিয়ে একজনের হাত থেকে সিগারেট কেড়ে নিয়ে নিজের ঠোঁটে ঠেকিয়ে বললাম,

“ তুলেন ভাই, তুলেন। তুলে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, টেলিগ্রাম যা যা আছে সব জায়গায় বড় করে পোস্ট দেবেন। ভাইরাল গার্ল সিগারেটখোড়, সাবিন হুসেইন একটা চরিত্রহীন মহিলা, বেয়াদব বেয়াল্লিশ! নেন তুলেন! কোন পোজ দিলে ভালো লাগবে বলেন? ”
নিজেদের ফোন নামিয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকালো তারা। তাতে আমি এবার ধমকে উঠলাম,
“ কি হলো? তুলেন না কেনো? রিচ, ভিউ, শেয়ার লাগবে, তাইনা? না তুলতে পারলে আমাকে দেন, আমি সেলফি তুলে দেই! দেন, ফোন দেন। ”
লোক দুজন ভীষণ অস্বস্তি থেকে রীতিমত উল্টো ঘুরে দৌঁড়ে গেলো। আমি পিছু নিলাম কয়েক কদম,
“ আরে ভাই যাচ্ছেন কোথায়? ছবি তুলে যান এই বেহায়া ব্যবসায়ী মহিলার! আরো ভাইরাল করতে হবেনা? ভিউজ দিয়ে টাকা কামাতে হবেনা? শালার গুষ্টি! ”
দুজন গলির অপর প্রান্তে আড়াল হয়ে গেলো। আমি থেমে গেলাম মাঝপথেই। তারপর অত্যন্ত আক্রোশে সিগারেটখানি ছুঁড়ে ফেললাম রাস্তার মাঝে। খোঁপা বাঁধা চুল খুলে গিয়েছে। এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে গিয়েছে কাঁধের চারপাশে। দুহাতের আঙুলে সেসব চুল পেঁচিয়ে টেনে ধরলাম। মাথার তালুতে ব্যথা লাগলো ভীষণ। সমস্ত ক্রোধ গলে রূপান্তরিত হলো বেদনায়। ভয়ানক রকমের যাতনা, অস্তিত্বকে গুঁড়িয়ে দেয়া মরমজ্বালা।

“ আহহ…. আল্লাহ্! এর শেষ কোথায়? ”
অস্ফুট স্বরে আকাশের দিকে চেয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। চোখের দুই কোণ বেয়ে উষ্ণ অশ্রুধারা নেমে গেলো। কাঁপতে থাকলো শরীর দমকে দমকে। রাস্তার মাঝেই উবু হয়ে বসে পড়লাম। কুয়াশা গলে বৃষ্টির ফোঁটার মতন ঝিরঝির করে পড়তে লাগলো আমার শরীরে। সিক্ত করে তুলতে লাগলো হুডি।
ঠিক এমন সময়েই ইঞ্জিনের আওয়াজ। চাপা একটা যান্ত্রিক গুঞ্জন। জনমানবহীন রাস্তার শেষে গলির মাথায় উদয় হওয়া বাহন ঝাপসা দৃষ্টিতে চোখে পড়লো আমার। ক্রমশ কাছে এসে খানিকটা দূরের স্ট্রীট ল্যাম্পের সামনে থামলো একটা তকতকে কালো বাইক।
ডুকাটি প্যানিগল ভি ফোর। চেনায় কোনো ভুল নেই। ওই বাইক, বাইকের মডেল এবং আরোহী প্রত্যেকেই আমার স্মৃতির স্থায়ী বাসিন্দা।
ইগনিশনের চাবি মোচড় দিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে ধীরে ধীরে পা নামিয়ে বাইক থেকে নেমে এলো আরোহী। পরনে সাদা শার্ট, কালো স্যুট এবং চেকটাই। সম্ভবত ভার্সিটি কিংবা কোনো বিজনেসের কাজ থেকে সোজা এসেছে। মাথার বিশাল বিপদজনক দেখতে কালো ড্রাগন অংকিত হেলমেটটা খুলতেই হলদেটে আলোর নিচে উন্মোচিত হলো ওই জায়দানের মুখ, তাতে ভাসমান বাদামী নয়নজোড়া। নিষ্পলক চেয়ে রইলাম আমি।
স্যুটের পকেট থেকে চশমা বের করে চোখে পরে বাইকের হ্যান্ডেলে হেলমেট ঝুলিয়ে ফিরে দাঁড়ালো জায়দান। হাতে তখনো বাইকিং গ্রিপের জন্য লিদার গ্লোভস পরনে। অজান্তেই উবু হওয়া থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম লোকটার দিকে। জায়দান নিঃশব্দে আমায় আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো। অতঃপর নরম অথচ শক্তিশালী গলায় জানালো,

“ ইওর পেইজ হ্যায বিন রিকভার্ড। পেইজটা ফিরে এসেছে, আশা করছি ঝামেলাহীন ব্যবহার করতে পারবে। ”
অমন একটা অরক্ষিত মুহূর্তে প্রত্যাশিত খবরের চাইতেও খবরবাহী মানুষটার অস্তিত্ব আমাকে প্রভাবিত করলো দারুণভাবে। এতক্ষণ ক্ষীণ ধারায় ঝরতে থাকা অশ্রুগণ এবার বারিধারার রূপ নিলো। চোখ উপচে গাল বেয়ে টপটপ করে ঝরতে লাগলো। জায়দান নিষ্পলক, নিঃশব্দে চেয়ে রইলো, কাছে আসার সাহস করলোনা বোধ হয়।
লোভীর মতন ভাঙা ভাঙা পদক্ষেপে এগোতে শুরু করলাম প্রাক্তনের দিকে। যার বাদামী নয়নজোড়া আমার অন্তরকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে।
“ মানুষ কাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারে জানো? ”
প্রশ্নটা কেন বেরিয়েছে, কোন উদ্দেশ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে আমি জানিনা। জানার দরকার নেই। উত্তরের দরকার। আমার দিকে সুস্থির বাদামী নয়নজোড়া চেয়ে রইলো। নির্জন রাত্রিতে কনকনে বাতাসের মাঝে দন্ডায়মান প্রাক্তন নির্লিপ্ত জবাব দিলো,

“ বাবা মাকে। ”
চোখের অশ্রুর টলটলে স্রোত নিয়ে মলিন হাসলাম আমি। বায়ুর ঝাঁপটায় গাল উপচে গড়ালো অবাধ্য ফোঁটাগুলো। মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম,
“ মানুষ যখন চারদিক থেকে অসহায় হয়ে পড়ে, তখন সে এমন একটা মানুষের বুকেই মাথা গুঁজে যাকে সে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভরসা করে। ”
দ্বিতীয় দফায় কনকনে বায়ুপ্রবাহ খেলে গেলো। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেলো আমার। পা দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমায় এগিয়ে নিলো, প্রথম কয়েক পদক্ষেপ হেঁটে, অতঃপর তীব্রবেগে দৌঁড়ে। জায়দান চশমার লেন্সের আড়াল থেকে নিগূঢ় নয়নে চেয়ে রইলো। সরলোনা এক কদমও।
আমার ফিনফিনে শরীরটা ঝাঁপিয়ে পড়ল জায়দানের বুকে। লোকটি কোনো শব্দ করলোনা, অবাক ভাবটুকুও দেখালনা। লম্বা দুবাহু বাড়িয়ে আমায় জড়িয়ে নিলো নিজের মাঝে। পা দুটো তার কোমরে জোড় বেঁধে ঘাড় আঁকড়ে কাঁধে মাথা গুঁজে দিলাম, শিশুদের মতন। ফুঁপিয়ে উঠে ধরা গলায় ফিসফিস করলাম,

“ আমায় একটুখানি লুকিয়ে রাখবে, জায়দান?”
আমার চারপাশে বাহুদ্বয় জড়িয়ে গেলো, সুরক্ষা আশ্রয়স্বরূপ। মৌখিক কোনো উত্তর এলোনা। শব্দের প্রয়োজন নেই। এই শীতল গভীর রাত্রির নির্জন সড়কে এক উষ্ণ বুকের প্রেরণা আমার জন্য আজ যথেষ্ট।
জায়দান ওই অবস্থায়ই আমায় ধরে রেখে স্ট্রিট ল্যাম্পের সাথে লাগোয়া সিমেন্টের বেঞ্চের উপর বসে পড়লো। তার বুকে মুখ লুকিয়ে রইলাম আমি, যেন এক ছোট্ট শিশুটি, যার আজ বড্ড স্নেহের প্রয়োজন। জায়দানের হাত নীরবে আমার পিঠে স্পর্শ বুলিয়ে গেলো, ভরসার, আশ্বাসের এবং শান্তনার। শনশনে বায়ুর সঙ্গে নির্জন রাত্রির নীরবতা ভেদ করা একমাত্র আওয়াজ আমার মৃদু ফোঁপানি। কতক্ষণ ওই অবস্থায় কেটেছে আমার হিসাব নেই। জায়দান নিঃশব্দে ধরে রাখলো আমায় নিজের আলিঙ্গনে, বিলিয়ে গেলো উষ্ণতা। তারপর আমার চুলগুলো নিজের এক হাতের আঙুলে গুছিয়ে আনতে আনতে জায়দান কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু গলায় অবিশ্বাস্য এক প্রশ্ন শুধালো,

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৬

“ ওয়ানা স্পিড উইথ মি, সাবিন? ”
প্রশ্নটি আমার কানে গুঞ্জরিত হলো অন্যভাবে, স্মৃতির প্রবাহ ভাসিয়ে আনলো চিরায়ত সেই আবদারটি, যখন আমার নামের বদলে জায়দান একই প্রশ্নে উচ্চারণ করতো,
“ ওয়ানা স্পিড উইথ মি, মাই ওয়াইফ? ”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here