Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ১৩

সায়রে গর্জন পর্ব ১৩

সায়রে গর্জন পর্ব ১৩
নীতি জাহিদ

ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজ কানে লাগছে। পুকুরের এক কোণায় সিড়ির উপর বসে আছে দিয়া। হাতে এবং কাঁধে শাহাদের কাপড়। এই প্রথম খোলামেলা ভাবে শাহাদকে গোসল করতে দেখলো। অনবরত ডুব দিয়ে যাচ্ছে। ঘষে ঘষে গায়ে সাবান লাগাচ্ছে। আশ্চর্য লোকতো! পোকার কামড়ে এভাবে সাবান ঘষলে তো শরীর জ্বলবে। ক্যামিকেল এরও তো একটা এফেক্ট হতে পারে। পাক্কা বিশ মিনিট হতে চললো এখনো পুকুর থেকে উঠার নাম নেই। এবার তো ঠান্ডা লেগে যাবে। দিয়া কণ্ঠের জোর বাড়িয়ে ডাক দিলো,

– শেহজার বাবা,উঠে আসুন। ঠান্ডা লেগে যাবে তো?
অকস্মাৎ খেয়াল করলো পুকুরের চারপাশ সুনসান। কি হলো মানুষটা কোথায় গেলো। দিয়ার বুকটা ধক করে উঠলো। আরো দুবার গলা ছেড়ে ডাকলো,
– শেহজার বাবা… কোথায় আপনি!
এবারো নিশ্চুপ। তৃতীয়বারের মত হাঁক ছাড়লো দিয়া,
– আমার ভয় করছে তো। উঠে আসুন।
ছপাৎ করে উঠলো পুকুরের পানি। কেঁপে উঠলো পুকুরের চারপাশ। মনে হলো কেউ তান্ডব চালাচ্ছে পানিতে৷ জলধারার প্রতিধ্বনিতে চারপাশ আন্দোলিত। ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারদিকে।দিয়া লাফিয়ে দু সিড়ি উপরে উঠে চিৎকার দিয়ে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– ইয়া আল্লাহ! পানিতে কে! শেহজার বাবা কোথায় আপনি?
পানিতে তোলপাড় করা ঢেউ, এলোমেলো তরঙ্গ সৃষ্টি করে পুকুরের ঠিক মাঝখান থেকে সাঁতরে আসছে কেউ। কাছে আসতেই লেবু গাছের পাশে হলদে বাতির আলোতে স্পষ্ট শাহাদের মুখ। সোজা সিড়ি বেয়ে দিয়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। চুল বেয়ে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে মুখে। সেট করা চুলগুলো এলোমেলো অবস্থায় কখনো দেখা হয়নি। স্নিগ্ধ লাগছে গোসলের পর। শ্যাম বর্ণের মানুষটার মুখ জলজল করছে সিক্ততায়। পেটানো দেহের ভাঁজে ভাঁজে পানি। হাতে টাওয়াল নিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলে উঠলো,

– শাহাদ ইমরোজ সমুদ্র শাসন করে এসেছে জীবনের পনেরোটা বছর। তাকে নিয়ে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। ডুব দিয়েছিলাম তাই প্রতি উত্তর করিনি।
গত রাতের ব্যবহারের পর দিয়ার ভেতরটা অনেকভাবে পুড়েছে।নিজেকে প্রতিনিয়ত মানুষটার কাছাকাছি কল্পনা করে। আজ দুপুর থেকে দিয়ার মন ফুরফুরে। সন্ধ্যার ঘটনায় প্রচন্ড মন খারাপ করে দিয়েছে। এখন শাহাদের ডুব দেয়ার ঘটনায় হৃদ স্পন্দন বেড়ে গিয়েছে।দিয়া তখনো শুকনো ঢোক গিলছে। কম্পিত গলায় বলে উঠলো,
– আমি একা ছিলাম,আপনার তখনকার অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দেখে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
– পোশাক কি এখানে পরিবর্তন করবো? লজ্জা পাবে না তো আবার!
দিয়ার দু গালে রক্তিম আভা ফুটে উঠেছে। তা ঢাকতে ভ্রু কুঁচকে বলে,

– এমনভাবে বলছেন যেন আমি আপনাকে জীবনে প্রথম দেখছি!
কথা শেষ করেই জিহবায় কামড় দিলো। ইশ! কি বলে ফেললো। সাহস বেড়ে গিয়েছে। এখন যদি রেগে গিয়ে ধমকে একাকার করে… দিয়া মাথা নত করে নিজেকে মনে মনে শাসন করেই চলেছে। শাহাদের মনে হলো ওর প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে। বড়ই অদ্ভুত! কি হলো ওর। সহজে হাসি না আসা মানবের আজ ছোট্ট কারণেও হাসি আসছে।তবুও নিজেকে সামলে বললো,
– তাই নাকি, আগেও দেখেছিলে! কখন বলোতো! কি অবস্থায় দেখেছিলে?
দিয়া লজ্জা পেয়ে দু অধর আলগা করে ফেললো।অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলো। এতক্ষন খেয়ালই করেনি কথা বলতে বলতে শাহাদ ইতিমধ্যে পোশাক পালটে ফেলেছে। দিয়া চমকে বলে,

– আপনি তো আমাকে ভুলিয়ে বদলেই ফেললেন।
– ওহ হো ভুল হয়েছে! না বদলালে ভালো হতো বলছো! আচ্ছা ঠিক আছে আবার খুলে তোমার সামনে বদলাচ্ছি।
– এ্যাই একদম না…
দু হাতে মুখ ঢেকে ফেললো দিয়া। শাহাদ হাসি লুকিয়ে পুকুরে নেমে প্যান্ট টা পানিতে চুবিয়ে নিলো। জোরে শ্বাস নিয়ে ঠোঁট কামড়ে নিশব্দে হাসলো। শাহাদের এই হাসি যদি আজ দিয়া দেখতো আজো প্রেমে পড়ে যেত প্রথম রাতের মত। পুনরায় মুখ গম্ভীর করে উপরে উঠে আসলো ভেজা প্যান্ট নিয়ে। শাহাদের পোশাক কেউ ধুবে এটা তার পছন্দ নয়। শিফা আর সুলতানা কবির ছাড়া কারো অনুমতি নেই। বিয়ের প্রথম দিকে দিয়া সেই অনুমতি পেলেও এখন নেই। শাহাদ প্যান্টের পানি ঝেড়ে বলে,

– ফারাহ… কিছু একটা হলেই যে ঠোঁট দুটো আলগা করে ‘হা’ হয়ে যাও এই জিনিস টা দেখতে বেশ লাগে।
– এ্যাহ!!
দিয়াকে তোয়াক্কা না করেই শাহাদ হাঁটা ধরলো বাড়ির পথে। দিয়াকে বিব্রত করতে পেরে মজা পেয়েছে।মেয়েটা বেশ অপ্রস্তুত থাকে। এখনো বিবেচনাবোধ আসেনি।তাই তো বড় ভুলটা করে ফেলেছিলো। পুরোনো কথা ছেড়ে বর্তমানে মনোযোগ দিয়ে বলে,
– আমার পেছনে কখনো হাঁটবে না,সামনে হাঁটো। তোমার অবস্থান সবসময় প্রথম সারিতে।
দিয়া চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো সামনে হাঁটছে। সাধারণ কথার মধ্যেও কত অসাধারণ অর্থ লুকায়িত।শাহাদ দিয়াকে সামনে এগিয়ে যেতে বলেছে।এরচেয়ে সুন্দর বোধহয় কিছু হয়না। অকস্মাৎ শাহাদ ঘাড় ঘুরিয়ে দোতলার বারান্দায় তাকালো।অনাকাঙ্ক্ষিত মুখটা দেখে নিজেকে সংযত করে ঘৃণায় এক দলা থুতু ফেললো এক পাশে। দিয়া সামনে সামনে হেঁটে যাচ্ছে। শাহাদ পেছনে পরিকল্পনা কষছে। ফোনে মেসেজ পাঠানো শেষ। পাভেলকে গাড়ি বের করার নির্দেষ দিলো।

গায়ে সাদা স্লিভলেস টিশার্ট, পরনে কালো ট্রাউজার। গলায় তোয়ালে ঝুলছে। সুলতানা কবিরের কাঁদো কাঁদো চেহারা দেখে বললো,
– আম্মু আমি ঠিক আছি, সারাদিনের ব্যস্ততায় হঠাৎ শরীর নেতিয়ে পড়েছে। চিন্তা করবেন না। বেরিয়ে পড়ি দেরি হয়ে যাচ্ছে।
– আজ না গেলে হয়না!
– অসম্ভব! আমার অনেক কাজ আম্মু।গতকাল মিটিং পোস্টপন্ড করে এসেছি।
রায়হান সাহেব সুলতানা কবিরকে বারণ করলেন ইশারাতে। উপর থেকে তাহি, মনিকা নেমে এলো। তাহি বলে উঠলো,
– ভাইজান আমাদের দুজনকে কি নিয়ে যাবেন! আমার একটা মেজর অপারেশন আছে আগামীকাল। পোস্ট অফিসের মোড়ে নামিয়ে দিলে হবে আমাকে। সি এন জি নিয়ে চলে যাব।

– আর মনি!
মনিকা হেসে বললো,
– ভাইজান আমিও চলে যেতে পারবো।
শাহাদ লিমনকে হাঁক ছেড়ে ডাক দিলো। লিমনের এলোমেলো হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা দেখে শাহাদ চোখ ছোট করে অসন্তোষ ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
– তুমি কি সর্বদাই এমন আচরন করো!
– স্যরি ভাইজান। কাপড় পাল্টাচ্ছিলাম।
তাহি মুখ চেপে হাসছে। দিয়া হাসি আটকে দুহাতে মুখ চেপে ধরলো। শাহাদ ধমকে বললো,
– শুধু যে দু পায়ে দু রকম জুতো পরেছো তাই নয় ট্রাউজার উলটো পরেছো,জিপার পর্যন্ত আটকাও নি। কমনসেন্স নেই তোমার! বাড়িতে কতগুলো ছোট বড় মেয়ে আছে। অসভ্য।

– ভাইজান ভেতরে আন্ডারওয়্যার আছে তো!
শাহীন খুব জোরে লিমনের মাথায় গাট্টা মেরে শাহাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
– ভাইজান ছোট মানুষ মাফ করে দেন।
শাহাদ তেঁতে উঠে প্রবল বিরক্তি গর্জে উঠলো,
– ওর আচরণে পরিবর্তন আনতে বলো,কোনদিন তুলে আঁছাড় মা*রবো বুঝতে ও পারবেনা। বেয়াদপ।
শাহাদ উপরে উঠে যেতেই শাহীনকে বলে,
– ওকে বলে দাও তাহি এবং মনিকাকে পোস্ট অফিস মোড়ে নামিয়ে দিতে। আমি একটু প্রাইভেসি চাচ্ছি।
‘ আমি একটু প্রাইভেসি চাচ্ছি’ এই কথাটি অনেকের কর্ণে বাজলো। শাহীন,লিমন শাহাদের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। শাহীন পাভেলকে ইশারা দিতেই পাভেল দু চোখের পলক ঝাপটে বুঝিয়ে দিলো গন্ডগোলের পূর্বাভাস। লিমনকে তৈরি হতে পাঠিয়ে দিলো শাহীন।

শেফালী রুমের দরজা আটকে চুপিচুপি বারান্দায় এসে কল রিসিভ করলো,
– বলো।
– তোর কি মনে হয়না তোকে সময় বেশি দিচ্ছি? এখনো কাজ সারতে পারলিনা কেনো?
– বললেই হলো, আমি সুযোগ পেলাম কই। আর ভাইজানের আশে পাশে তো ডাইনিটা সারাক্ষন থাকে।
– ব্যবস্থা কর। নাহলে তোর ঢেকে রাখা গোমড় ফাঁস করতে আমার বেশি দিন সময় লাগবে না।
-আপা…
টুট টুট করে ফোনটা কেটে গেলো। শেফালীর মন চাইলো নিজের চুল নিজেই ছিড়তে। যে করেই হোক শাহাদের সাথে আজ দিয়ার ও বাড়ি যাওয়া আটকাতে হবে। রুমের দরজা খুলে টিপে টিপে পা দেখে দিয়া শাহাদ নিচে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য রেডি। ঠিক তখনই শেফালী ইচ্ছাকৃত সিড়ি দিয়ে পড়ে গেলো।আকস্মিক আর্তনাদে কেঁপে উঠলো ‘তারা ভিলা’। শুরু হয়ে গেলো আহাজারি। শেফালীর শোকের মাতমে ছেয়ে গিয়েছে তারা ভিলা। শাহাদ, শাহীন ছুটে এলো বোনের পায়ের কাছে। শিফা পায়ে ম্যাসাজ করতে চাইলে তাহি বাঁধা দেয়। ম্যাসাজে ব্যাথা বাড়বে। মনি এসে বলে, যত দ্রুত সম্ভব ওর তো এক্সরে করা দরকার। তাহিও মাথা নাঁড়ালো। মনি এর মাঝে বলে উঠলো,

– শাহাদ ভাই, শেফালীকে হাসপাতালে নিয়ে চলুন। তাহি চল। দেরী করলে বিপদ বাড়বে।
পেছনে দিয়ার কোলে শেহজা। রায়হান সাহেব বলে উঠলেন,
– তোমরা যাও শাহাদ। আমরা নিয়ে যাব শেফালীকে।হয়তো হালকা ব্যাথা লাগবে। বেশিদূর পড়েনি।
মনি বলে উঠলো,
– বড় আব্বু এই অবস্থায় কেউ কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। শেফালীকে হাসপাতালে নেয়া জরুরি।
মনির ধমকটা উপস্থিত কয়েকজনের খুব কানে লেগেছে। লিমনের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে। কোনো এক সংযত কারণে লিমনের মুখভঙ্গি পরিবর্তিত হলো। শাহাদ নিজেও কিছুটা হতবিহ্বল। বোনকে ফেলে যাওয়াটা বড্ড বোকামী। উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো,

– পাভেল গাড়ি বের করেছো? তোমরা ওকে গাড়িতে তোলো।
যে কাজ কখনো এই বংশে হয়নি এমন একটি কাজ হয়ে গেলো আজ। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগে কথা বলাটা বড্ড অন্যায় যেখানে গুরুজনেরা উপস্থিত। যার মুখের উপর কথা বলা মানায় না। অথচ আজ এমনি একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছে এই পরিবার। যেখানে অন্যসময় হলে ঘাম ছুটে যায়, অথচ আজ সেই ছেলে এসে শাহাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
– বড় ভাইজান মাফ করবেন। আপনার কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। শেফালী আপার কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ। হয়তো পা মচকে গিয়েছে। আমি, শাহীন ভাই, কাব্য,মনি আপা মিলে হাসপাতালে নিচ্ছি।বড় আব্বুর গাড়ি আছে। আপার পা টা ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু ভাবীমার মনে পাওয়া কষ্ট তো থেকে যাবে। এতদিন পর যাবে বলে নিয়ত করেছে না গেলে রূহ কষ্ট পাবে। এক্সিডেন্ট জীবনে কম বেশি হবেই। আমরা আপনাকে আপডেট দিব। আপনি ভাবীমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।
শাহীন ও এগিয়ে এসে বলে,

– জ্বি ভাইজান আপনি যান।
সুলতানা কবির মন খারাপ করে দিয়ার দিকে তাকালো।মেয়েটা আসলে বিষন্ন।মা হয়েও শক্ত হতে হলো আজ। শাহাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
– শেফালী নিজের দোষে পড়েছে বাবু। যাও তোমরা। আপডেট দিব আমরা।
শেফালী চেঁচিয়ে বললো,
– না ভাইজান আপনি যাবেন না,আমার কষ্ট হবে আপনি গেলে। আপনিতো আমাকে আগলে রাখেন।
শাহাদ দো টানায় পড়ে গেলো। নিজেকে স্থির করে কথা বলবে তার আগেই লিমন চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
– মাথা ঠিক আছে তোমার, এতগুলা মানুষ থাকতে ভাইজানকেই কেন লাগবে। নাটক কইরোনা উঠো।
একেবারে কাছে চলে গেলো লিমন।শেফালীর দিকে ক্রোধান্বিত দৃষ্টি দিতেই শেফালী শুকনো ঢোক গিলে বলে উঠলো,

– আচ্ছা ভাইজান যান। আমি ঠিক হয়ে যাব।
শাহাদ, শাহীন সহ ভ্রু কুচকে ফেললো অনেকে,মিনিট পাচেকের মধ্যে এমন কি হলো…
শাহাদ আর কথা না বাড়িয়ে শেহজাকে কোলে তুলে নিয়ে দিয়ার কাছ থেকে। লিমনের মাথায় হাত রেখে বললো,
– সাবধানে যাবে। আমাকে আপডেট দিও। দায়িত্ব নিয়েছো কিন্তু…
– জ্বি ভাইজান।
লিমন মহানন্দে দু পাশে মাথা দুলালো।মনে মনে কুটিল হাসি দিয়ে বলে,
– মাফ করবেন ভাইজান। এভাবে না হলে আপনাকে আর ভাবীমাকে এরা এক হতে দিবেনা। এত বড় সত্যের মুখোমুখি আজ হব ভাবতেই পারিনি। এবার এই দুই মুখোশধারীকে বুঝাবো লিমন কি জিনিস!
কিছুক্ষন আগে যখন শেফালী শাহাদকে যেতে দেবেনা বলে চেঁচিয়ে উঠলো তখনি লিমন শেফালীর কানের কাছে গিয়ে বলে উঠলো,
– ইচ্ছে করে পড়েছো যে দেখেছি আমি, সাথে তোমার ফোন রেকর্ড ফাঁস করে দেব।
তাই ভীতসন্ত্রস্ত শেফালী ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে আর ঝামেলা বাঁধিয়ে শাহাদকে আটকানোর সাহস করেনি৷ লিমন হেসে বলে,
– একটাকে ও ছাড়বোনা। পিতা সমতুল্য আপন ভাইয়ের সাথে এসব করে যাচ্ছো তোমরা, ছেড়ে দেবো ভেবেছো। তোমরা ঠকাতে পারলেও আমি পারবোনা। মানুষটা আমার কাছে আমার বাবার মতো ছাদ।তোমাদের জন্য নিজের মাথার ছাদ হারাবো নাকি। লজ্জ্বাহীন,বেলেহাজ মহিলা। সাথে আছে আরেক ইবলিস।

অহেতুক কারণে বাড়ি মাথায় তুলেছে। মহান রব যা করে ভালোই করে। পায়ে হালকা মোচ লেগেছে এছাড়া তেমন কিছুই হয়নি। বাড়িসুদ্ধ লোকজনকে নাস্তানাবুদ করে রেখেছিলো। এক্সরে করার পর ডাক্তার বেড রেস্ট দিয়েছে। লিমন হাসপাতালের ফরমালিটিস পূরণ করেই সিড়ি দিয়ে উঠতেই শাহীন ওকে আড়ালে নিয়ে আসে। শাহীনকে এভাবে দেখে ঘাবড়ে যায়। শাহীন রাগান্বিত হয়ে বলে,
– আজকে কি এমন ঘটেছে খুলে বল।
লিমন জোরে শ্বাস ছেড়ে বলে,
– ছোট দা শেফালী আপা ইচ্ছে করে পড়ে গিয়েছে সিঁড়ি থেকে। ভাইজান আর ভাবীমাকে আটকাতে। এমন একটা সিচুয়েশনে পড়বো চিন্তাও করিনি। ও যখন বারান্দায় ফোনে কথা বলছিলো তখন আমি বাড়ির ছাদ থেকে আম গাছটায় বেয়ে নামছিলাম।শিফা আর নিশি কাঁচা আম খাবে বলেছিলো।বারান্দায় শেফালী আপাকে দেখে এগিয়ে গিয়ে ভাবলাম ভয় লাগাবো সেই মুহুর্তে ওর ফোনের কথাগুলো শুনি।তুমি অবাক হবে জানলে শেফালী আপা এমন একজনকে সাহায্য করছে যাকে কেউ কখনো কোনো অবস্থাতেই এমন কাজ করতে পারে বলে ভাবতে পারবে না।

– কে?
– দেয়ালের ও কান আছে।
শাহীন মাথা নেড়ে বলে,
– চল। ঢাকা ব্যাক করবো। আব্বু,আম্মুকে বুঝাতে হবে শেফালীর মাথা ঠিক নেই।
– তাই ভালো।
বেরিয়ে গেলো দুইভাই। মনে হাজারো প্রশ্ন।শাহীন এমন অনেক কিছু গত কয়েকদিনে শুনেছে,দেখেছে তবে যাচাই করার সুযোগ হয়নি। ভাইজান একাই সামলে নিতে পারবে তবুও ভাইজানের জন্য একজন সাপোর্ট হিসেবে থাকবে। নোমানের খোঁজ পেয়েছে ভাইজান। কি হয়েছিলো প্রায় তিন বছর আগে যার জন্য ভাইজান আর ভাবীমার সম্পর্কে আজ বিরোধ। সম্পর্কটা স্বাভাবিক হবেনা কিছুতেই তা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছে এই দুদিনে। লিমন ছোট মানুষ ওকে বুঝতে না দিয়েই ব্যাপারটা সামলে নিতে হবে। আগে ইনফরমেশন ওর কাছ থেকে আদায় করে নিতে হবে।
পকেটে দ্রিপ দ্রিপ করে বাজছে মুঠো ফোন। কার্গো প্যান্টের পকেট থেকে বের করে ফোন। নাম দেখেই ঠোঁটের কোণে সেই চির অধরা হাসি,

– জ্বি ম্যাডাম বলুন,বান্দা কিভাবে আপনার উপকার করতে পারে?
– কথা বলবেনা। আজ সারাদিনেও সুযোগ পাওনি?
– সে অনেক কথা,শেফালীর পা মচকে গিয়েছে।ওকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলাম।
– ওমা কি বলো,এখন কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
হেঁটে হেঁটে কথা বলছে শাহীন। শেফালীর কেবিনের সামনে এসে দেখে ভেতরে শেফালী ছাড়াও অন্য কেউ আছে। বাড়ি থেকে তো শুধু লিমন আর শাহীন এসেছে। বাকিদের আপডেট ও জানানো শেষ তাহলে ভেতরে কে? এখন তো শেফালীর ঘুমানোর কথা। নওরীনকে বলে ফোন রেখেই ধপ করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে শাহীন। দুই নারী হকচকিয়ে গেলো। শাহীন নিজেকে ধাতস্থ করে বললো,

– মনি তুই না বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলি,এখানে কখন এলি?
মনি সাবলীলভাবে উত্তর দিলো,
– ছোট দা আমি তো চলেই যাচ্ছিলাম।পোস্ট অফিস মোড় এসে ভাবলাম শেফালীকে দেখে যাই। তাই এলাম।
– ওহ।
পুনরায় ফোন বেজে উঠাতে শাহীন বেরিয়ে এলো। ফোন হাতে নিয়ে দেখে শাহাদের কল। রিসিভ করতেই শাহাদ বলে উঠলো,
– শাহীন আমরা ঠিক ভাবে পৌঁছেছি। তুমি সাবধানে থেকো।
– ভাইজান…
শাহীনের গলার স্বর শাহাদকে ভাবিয়ে তুললো।
– কি হয়েছে…সবকিছু ঠিক আছে।
শাহীন কেমন যেন অপ্রস্তুত। কিভাবে কথাটা বলবে ভাইকে। ভাই যদি বিচলিত বোধ করে।অন্যভাবে নেয়। এমন অসম্মানজনক কথা ভাইকে জিজ্ঞেস করতেও বিবেকে বাঁধছে। পাভেল যতটুকু বলেছে শুণেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছে।

– শাহীন…
– ভাইজান মনি হাসপাতালে এসেছে।
– তো…
– না… মানে… আমি চাচ্ছিলাম মনি থেকে শেফালীকে দূরে রাখতে।
– কেনো?
– দুজনেরই গোপনসন্ধিতে হয়তো আপনার ব্যাপারটা…
– স্টপ দেয়ার… আমি এই ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাচ্ছিনা। শেফালীকে নিয়ে বাড়িতে যাও। খেয়াল রেখো সবার।
শাহীন ঢোক গিলে বলে উঠলো,
– দুঃখিত ভাইজান। আমি বাড়ি গিয়ে আপনাকে জানাবো।

ও পাশ থেকে ফোনের টুট টুট আওয়াজ।শাহীন স্পষ্টত বুঝতে পারছে ভাই রেগে গিয়েছে। নিজের উপর রাগ হচ্ছে। এভাবে প্রশ্ন করা উচিত হয়নি হয়তো বিচলিত হয়ে গিয়েছে। যখনই পাভেলের কাছে শুনেছে মনির কুদৃষ্টি ভাইয়ের উপর পড়েছে।কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। অথচ এই মনিকে ভাইজান আদরে আদরে মানুষ করেছে। মনি আর তাহি দুজনই ফ্রেন্ড। ছোট কাকার মেয়ে মনি। কাকা অন্যদের তুলনায় সামর্থ্যের দিক থেকে কম স্বচ্ছল ছিলোনা। তবে তাহির খায়েশ তাকে যেন ভাইজান পড়ায়। তাহি সরকারি মেডিকেলে চান্স পেলেও বড় খালা যখন রাজি হয়না বাপ মরা মেয়েকে পড়াতে তখন শাহাদই নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলো। তা দেখে মনি জেদ ধরেছিলো তাকেও মেডিকেলে পড়াতে হবে। মনি সরকারিতে চান্স পায়নি। শাহাদ ও রায়হান সাহেব দুজনে একটি স্বনামধন্য প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি করায়। এরপর থেকে মনি এবং তাহির পড়াশোনার সকল খরচ শাহাদ নিজে বহন করেছে। পুতুলের মত আগলে রেখেছে দুবোনকে। অথচ আজ সেই মনির কুনজর পড়েছে শাহাদের দিকে এই ব্যাপারটা ভাবতেই মনে হচ্ছে কত বড় পাপ! শাহাদ নিজেও এই কথা সহ্য করতে পারেনি বলে শাহীনের ধারণা।

সায়রে গর্জন পর্ব ১২

মুঠোফোনের অপর প্রান্তে শাহাদ ভাবছে নিশ্চয়ই পাভেল বলেছে শাহীনকে। খোঁজ খবর নিতে বলেছিলো পাভেলকে। এই খবর তার কাছে থেকে পাওয়া। পাভেল, শাহীন দুটো এক পেট। শাহাদ ও পছন্দ করে ওদের বন্ধুত্ব। তবে ভাই এতটুকু শুণেই ঘাবড়ে গেলো। অথচ গতকাল বোনের মত আদরে যত্নে গড়ে তোলা মেয়েটার অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, অপবিত্র ছোঁয়ার কথা ভাবতেই বুকের ভেতর টা হাহাকার করে উঠলো। মন থেকে বেরিয়ে এলো আফসোস,
– কেনো রে মনি, তুই তো আমার আদরের ছোট্ট পরী ছিলিস। আমার শেহজার মতো। এভাবে কষ্ট দিতে পারলি তোর ভাইজানকে। ভুলটা আমারই ছিলো। তোকে বড় ভাইজান থেকে শাহাদ ভাই ডাকার অনুমতি দেয়াটাই আমার জন্য অস্পৃশ্য ছোঁয়া,অকল্যাণ বয়ে এনেছে। ভাইয়ের রূপ দেখেছিস।এবার বিচারকের রূপ দেখবি। তোর বিচার আমি করবো। মাথা যখন আমার,ব্যাথাও আমার। আমি চিকিৎসা করবো।

সায়রে গর্জন পর্ব ১৪