Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ২১

সায়রে গর্জন পর্ব ২১

সায়রে গর্জন পর্ব ২১
নীতি জাহিদ

ওহে, কি করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে
ওহে, কি করিলে বল পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে
ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব, নাথ
এত প্রেম আমি কোথা পাব, নাথ তোমারে হৃদয়ে রাখিতে
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।
গান শুনে রেস্টুরেন্টে উপস্তিত সকলে মুগ্ধ। যেন কোনো প্রফেশনাল গায়কের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা গান। তাহি মুগ্ধ হয়ে বললো,

– থামলেন কেনো?
রাশেদ মৃদু হেসে বলে,
– থামতে হবে,নতুবা স্টেশন মিস করে ফেলব ডক্টর।
– মানে?
– এখন যদি না থামি ট্রেন ধরবো কি করে! আগে তো ট্রেন ধরি এরপর নাহয় পরের স্টেশনে দুজন মিলে মেঘালয়ের উদ্দেশ্য নেমে পড়বো। পথিমধ্যে এই বেসুরে গাওয়া আমজনতার গান মহামানবী, সেবিকা ডক্টর তাহিরা জান্নাতকে শোনাবো। কি বলেন! শুনবেন না?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– এত ভালো ফ্লার্ট করেও প্রেমিকা জুটাতে পারলেন না?
– কি করে পারবো? আপনার খাড়ুশ ভাইটা আমার জান কবজ করার জন্য আশপাশে ঘুর ঘুর করে। জানেন এক জেনারেলের মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম।আমাদের মাঝে ইটিশ পিটিশ ও হয়েছিলো কিন্তু মাঝে আপনার ভাই গিয়ে সব এলোমেলো করে দিলো। ওই বেয়াদ্দপ মেয়ে আপনার ভাইয়ের প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে আমাকে ন্যাকামি করে বলে, রাশেদ ভাইয়া একটা হেল্প করবেএএএন। আমি না আপনার বন্ধুর প্রেমে পড়ে গিয়েছি উনাকে বলবেন। আমি তো ভ্যাবলা কান্ত। জানি বন্ধু নাকোচ করবেন। নাকোচ করলে আমার রাস্তা ক্লিয়ার।ওই শা’লা তো অন্যজনরে মন দিয়েছে। গিয়ে বন্ধুকে বলতেই বন্ধু গিয়ে মেয়ের বাপকে ফোন দিয়ে বলে,আপনার মেয়ে সামলান। এবার ভেবে দেখেন, কেমন বে’য়া’দ্দপ। নিজেও করলিনা,আমারেও দিলি না।
তাহি হো হো করতে হাসতে দাঁড়িয়ে পড়ে। পেটে খিল ধরেছে। ও জানতো বড় ভাইজান এমন কিন্তু এতটা তা জানতোনা।
ঘুমের ঘোর লেগে এসেছিলো। নার্স ফরিদার ডাকে অকস্মাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছে। একমাত্র তাহি যে প্রায় রাশেদকে স্বপ্নে দেখে। অবচেতন মন ঘিরেই রাশেদের বাস। ভাবনা থেকে বেরিয়ে মুখ ধুয়ে নিলো। কিছুটা ফ্রেশ লাগার পর রওয়ানা দিলো আউটডোরে।

গুলশানের নামকরা ক্লাব। উপস্থিত নামজাদা নেতাকর্মী, উচ্চ পদস্থ অফিসার, মাঝে তিনজন নারী। সকলের একটাই উদ্দেশ্য মনির কাছ থেকে রাশেদের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট হাতিয়ে নেয়া। মেয়েটা বড্ড চালাক। ভাগে আনতে পারছেনা। ক্যাপ্টেন আলতাফ বললো,
– ডাক্তার মনিকা, এটা তো আমাদের চুক্তির মাঝে ছিলোনা। আপনি শর্ত মোতাবেক দুটো জিনিস চেয়েছেন। একটি তো দিতে সক্ষম হয়েছি আমরা।
– তাহলে অপরটি?
খালেদ পারভেজ বিরক্ত হয়ে বললো,
– এজন্যই আমি দু পয়সার মেয়ে মানুষের ফান্দে পড়তে চাইনা। তোমার কথা মত মেমোরি কার্ড দিলাম।আমি কি জানতাম ওটা তোমার পাঠানো লোক নয়, ওই শাহাদের লোক। না তুমি চাইতা আর না আমি হারাতাম এত স্ট্রং একটা প্রমান। ওই এক্স লে. কমান্ডারের মান সম্মান ও ধূলায় মিশতো বোনের চরিত্র টান দিলে।
ক্যাপ্টেন আলতাফ বললো,

– আপনি বহুত শেয়ানা খালেদ সাহেব। মেয়েটারে স্পষ্ট বুঝা যাইতেছিলো ভিডিওতে অথচ আপনারে চেনাই যায়না।
প্রত্যেকে হাসছে।এর মাঝেই মনি তেড়ে জবাব দেয়,
– আমার ডিল লাগবেনা। আমি রিপোর্ট দিব না। এভাবে তো কাজ করা সম্ভব নয় ক্যাপ্টেন। আমাকে অপমান করা হচ্ছে রীতিমতো।
– আহ হা ডাক্তার মনিকা,এটা মাথা গরম করার সময় নয়। খালেদ সাহেব আপনি একটু সংযত হোন। বলুন ওটা বাদে আপনার আর কি লাগবে?

– শাহাদ ইমরোজকে। বিনিময়ে তার বর্তমান স্ত্রীকে যা খুশি করতে পারেন। আমি জাস্ট শাহাদের লাইফে এন্ট্রি করতে চাই। ওই দিয়ার অস্তিত্ব যেন আমার জীবনে না পড়ে।
উপস্থিত প্রতিটা মানব প্রাণী হতভম্ব। নারী কত বড় ধ্বংস তারা সচক্ষে দেখতে পারছে। এক নারীর ঘর ভেঙে নিজের ঘর গড়বে ভাবছে।সবচেয়ে বড় গেইমার তো এই নারী জাতি। এরা মাতৃ,স্ত্রী,ভগ্নী সর্বরূপে ধরা দেয়, ঠিক তেমনি সর্বনাশী হয়েও জীবনে আসে।এই মুহুর্তে মনিকে সকলে শাহাদের সাক্ষাৎ সর্বনাশ ভাবছে। কিসের শঠতা, বেঈমানী, প্রতারণা। এসব রিপুর সবচেয়ে বড় উদাহরণ তো এই মনি।কোলে পিঠে মানুষ করা শাহাদের ক্ষতি করতে এর বিবেকে কি বাঁধবে না! এই নারী, নারী জাতির কলঙ্কের ইতিহাস গড়বে।

অফিস থেকে হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে গেলো শাহাদ। পেছনে ছুটছে পাভেল,হামজা আর তুহিন। কিসের মিটিং কিসের আলোচনা। সব কিছু আজ পোস্টপনড। নিজের মেরুন রং গাড়িতে উঠে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লো।বাকি তিনজন জানে আজ গাড়ি না মিসাইল ছুটাবে। ঘটনা তাই ঘটলো। দশটা বাজে ঘড়িতে। আশপাশ তোয়াক্কা না করে গাড়ি ছুটছে নৌবাহিনীর সদর দপ্তরের উদ্দেশ্যে যা বনানীতে অবস্থিত। পাশে,পেছনে বসে বাকি তিনজন আল্লাহর নাম জপছে। যেভাবে ওভারটেক করছে গাড়ি না উলটে যায় গেটে এসে থামতেই তিনজন দম ছাঁড়লো। সামনে আসতেই একজন অফিসার আটকালো। প্রথমত মুখে সবার মাস্ক। রাস্তায় কেউ দেখলে মারাত্মক বিপদ ঘটতে পারে। প্রচন্ড ক্রোধে অফিসারের গায়ে হাত তুলতে যেয়েও নিজেকে সংযত করে কমান্ডার নওয়াজকে ফোন দিলো।

– আসসালামু আলাইকুম স্যার শাহাদ ইমরোজ স্পিকিং।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম, কেমন আছো কিং অফ ওয়েভ?
– স্যার, আমি গেটে।
– ওয়েট ওয়েট আমি আসছি।
কমান্ডার নওয়াজ মোর্শেদ ছুটে এলো আরো কয়েকজন অফিসার নিয়ে। কেয়ারটেকার আঁৎকে উঠলো এভাবে কমান্ডারকে ছুটে আসতে দেখে। শাহাদকে স্যালুট করে বাকি অফিসারসহ ভেতরে নিয়ে আসলেন নওয়াজ। ওখানে শাহাদের জন্য অপেক্ষারত ছিলেন ভাইস এডমিরাল মানিক মোজাম্মেল। যা ইনফরমেশন দরকার সব নিয়ে বের হওয়ার সময় এডমিরাল মানিক বললেন,
– রাশেদকে করা প্রতিটি অপমানের জবাব চায় নেভি। যার দায়িত্ব রাশেদের প্রিয় মানুষ শাহাদের উপর বর্তেছে। আশা করি মঙ্গলের মুখ দেখতে পাব।
– আই আই স্যার।

স্যালুট করেই শাহাদ বেরিয়ে এলো গেট দিয়ে। গাড়িতে অপেক্ষা করছে বাকি তিনজন। শাহাদ গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত দিবে এমন সময় হামজার দিকে ফিরে বলে,
– হামজা আসার সময় সিজারকে দেখেছিলাম ডেস্কে কাজ করছিলো।ও এখানে কি করছে?
গাড়ির থাই গ্লাস না খুলেই সেদিকে সবাই তাকিয়ে দেখে সিজার রাস্তার অপর পাশে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হুট করে কেউ দেখলে চিনতেই পারবেনা তাকে। তার মানে কি ফলো করছিলো! পাভেল হেসে বলে,
– ওরে বাটপার,আমাদের খেয়ে আমাদের বাঁশ মারার জন্য কায়দা করো। বস আপনি সেদিন কন্ট্রাক্ট পেপার কেড়ে নেয়ার পর থেকে ওর হাবভাব বদলে গিয়েছে।
শাহাদ হেসে বলে,

– ও চোরের উপরে বাটপারি করতে আসছে। আমাকে এখনো চিনে নাই। মাছ ধরবি তোরা? রাঘব বোয়াল!
তিনজনই কেবলাকান্তের মতো মুখ করে তাকিয়ে আছে।শাহাদ সেসবের তোয়াক্কা না করে গাড়ি ছুটালো।তুহিন ফিসফিস করে হামজাকে বলে,
– বসের মাথা গেছে, আইলো নেভি অফিছে, যাইবো অপরাধীরে ধরতে অহন কইতাছে মাছ ধরবো। পাগল টাগল হই গেছে নি বস!
হামজা মাথায় জোরে গাট্টা মেরে বললো,
– চুপ থাক,গাল সেলাই করে দিবে শুনলে।
গাড়ি থামলো ৩০০ ফিট নীলা মার্কেট এসে। আজব এখন কেউ হাঁসের গোস্ত খাবে নাকি। গাড়ি থেকে নেমে সখিনা খালাকে ডাক দিলো। এগিয়ে এসে সালাম দিয়ে বললো,

– বাপজান বহুত বছর পর আইছেন। ভালা আছেন?
– জ্বি খালা ভালো। আপনার স্পেশাল হাসের মাংস আর চাপড়ি দেন।
আশপাশে মানুষ কম। কয়েকজন দেখে এগিয়ে আসলো। শাহাদ মিষ্টি হেসে সালাম বিনিময় করলো,অনেকে সেলফি তুলতে চাইলো। অবুঝের মত ওরা তিনজন খাবার আসার পর খাচ্ছে। যেন কেউ জোর করে বসিয়ে দিয়েছে খেতে। শাহাদ খুশি মনে খাচ্ছে। এভাবে খেতে আজ অবধি ওকে কেউ দেখেনি। খাবারের ব্যাপারে সন্দিহান নয়,বরং এমন খোলামেলা জায়গায় ভবঘুরের মত আচরণ ওদের বেশ ভাবাচ্ছে। খেয়ে হাত ধুয়ে সখিনা খালার দিকে টাকা বাড়িয়ে দিতেই খালা প্রশ্ন করলো,

– বাপজান আপনের লগে আরেকটা বাপজান আইতোনা উনি কই?
শাহাদ সখিনা খালার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
– আপনার ওই বাপজান তিনবছর আগে মা*রা গেছে।
এতক্ষনে বাকিরা বুঝলো শাহাদ রাশেদকে নিয়ে এই জায়গায় আসতো। সখিনা খালা আঁৎকে উঠলেন। উনার দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে। শেষ বার সখিনা খালাকে বলেছিলো কক্সবাজার নিয়ে যাবে দুইবন্ধু সাগর দেখাতে।সেই যে গেলো কেউ আর এলো না। পুরোনো নেতিয়ে যাওয়া আঁচলে চোখ মুছে কাঁপা গলায় সখিনা খালা বলে উঠলো,
– এমন খবরডা না হুনলেই ভালা হইতো।কলিজাটা হু হু করতাছে। আমি ওই বাপজানরে কোনো দিন ও ভুলুম না। কি সুন্দর আইয়াই কইতো, ও খালা আপনার গরম গরম চাপড়ি দেন। আজ আর বাসায় ভাত খামুনা,আপনি ভাত রানলে দুইটা দিয়েন একেবারে খাইয়া যামু।এক্কেরে মাটির মানুষ আছিলো।
শাহাদ নিজেকে সামলে বলে উঠলো,

– মন খারাপ কইরেন না। যার হায়াত যতটুকু সে ততদিন বাঁচবে। আমি তো আছি,আমি আসবো….
থমকে গেলো শাহাদ। আচ্ছা জোর গলায় তো বললো প্রকৃতপক্ষে ও কয়দিন বাঁচবে? অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। নিজেরই তো সময় ঘনিয়ে এসেছে। সখিনা খালা থেকে বিদায় নিয়ে পাশে সামুদ্রিক মাছের ফ্রাই হচ্ছে সেই দোকানে গিয়ে বসলো। ঘাড় কাঁত করে মুচকি হেসে পাশের টেবিলে গিয়ে চেয়ারে বসা আগন্তুকের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,
– আমার সাথে এলেই তো পারতি। আর এসব কি ছাঁই পাশ খাচ্ছিস! এ্যাই কুদ্দুস এই টেবিলে একটা রাঘব বোয়াল বারবি কিউ দে।

সিজার থতমত খেয়ে মুখ থেকে মাস্ক খুলে শাহাদের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে। হামজা,পাভেল আর তুহিন টেবিলের চারপাশে চেয়ার নিয়ে সিজারকে ঘিরে বসে। কি সুকৌশলে ধরে ফেললো সিজারকে। নীলা মার্কেট আসার প্ল্যান তাহলে সিজারকে ধরার জন্যই করা। কুদ্দুস টেবিলে এক বিশাল বোয়ালের বারবিকিউ এনে দিলো। শাহাদ রুমালী রুটি ছিড়ে বোয়াল মাছ দিয়ে সিজারের মুখের সামনে ধরে বললো,
– হা কর, বেশি করে খা। সামনে মোটেও তোর বস শাহাদ ইমরোজ বসা নেই। গুন্ডা শাহাদ বসে আছে। আর যদি খেতে না পারিস, বলতে পারিস। সেই ব্যবস্থাও আছে। হা কর।
সিজার শাহাদের রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে দু অধর আলগা করে হা করলো।শাহাদ মুখের মধ্যে রুটি পুরে দিয়ে বললো,

– আশপাশে তোর চামচা যদি থাকে সবাইকে আমার দেয়া এড্রেসে যেতে বল। নাহলে তোর রেহাই নেই।
আরেক টুকরো রুটি মুখে পুরিয়ে দিয়ে বলে,
– গত মাসে জনি, রিপন আর প্রতাপরে তো খুঁজে ও পেলাম না আমরা তাই না সিজার?
সিজার মাথা নাড়ে ভয়ে। বুঝায় হ্যাঁ পাইনি। শাহাদ কুটিল হেসে বলে,
– পাবি কি করে,আমার মতো গুন্ডার পিছু ধরতে ওদের মজুমদার বাড়ি পাঠালি অথচ এই খবর রাখলি না যে মজুমদারদের রাবার বাগানে এমপি শাহাদ ইমরোজ তার দুহাত র*ক্তে রাঙিয়ে সেখানেই পুঁতে দিয়েছে তিনটাকে। ভেবেছিস শাহাদ বোকা তাই না! যুদ্ধ করা হাত। দেশ বাঁচাতে কত যে শেয়াল-কুকুর মে/রে/ছি। আর তোদের মত দু একটা তো আমার কাছে মশা-মাছি।
সিজারের দম যায়। গলায় খাবার আটকেছে। বিষম খেলো চরম ভাবে। হামজা পানি এগিয়ে দিয়ে শয়তানি হাসি দিয়ে বলে,

– জানিস ওরা ম রতে ম রতে বলেছে সিজারের কাছে দৌলতদিয়া প/তি/তা/ল/য়ের ভি আই পি কাস্টমার খালেদ পারভেজের ব্যবসার পার্টনার মেহেরজান আম্মার হদিস আছে। ফটাফট দিয়ে দেয়।
শাহাদ সোজা দাঁড়িয়ে বলে,
– কুদ্দুস পার্সেল কর। পাভেল আমি সিজারের বাইক নিয়ে ঢাকা যাচ্ছি। বাকি কাজ সেরে নে।
– ওকে বস।
মাথাটা ঝুঁকিয়ে সিজারের কানের কাছে এসে বললো,

– আমার ঘাড়ের একটা রগ ত্যাড়া। তুই যে আমার মা*ল লুটতেছিস এই খবর আমি মাস তিনেক আগেই পেয়েছি। ছাড় দিয়েছিলাম,ছেড়ে দি নি। যদি আবার দেখা হয় বুঝবি বেঁচে গিয়েছিস,নতুবা আজই শেষ দেখা।
মুখে মাস্ক লাগিয়ে সিজারের বাইকে চেপে রওয়ানা দিলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে একটা দশ। দুটোর মধ্যে পৌঁছানো জরুরি। কথা দিয়েছে শাহীনকে। একটা পঞ্চান্নতে বাসার গেটে এসে পৌঁছায়। গেটকিপার হকচকিয়ে যায় এই প্রথম স্যারকে বাইকে দেখে। বাইক নিয়ে সোজা গ্যারেজে পার্ক করে হামজাকে সময় মত বাইক নিয়ে যাবার নির্দেশ দিতে দিতে বাসার দরজায় ঢুকে দেখলো সকলে বসে আছে। বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আব্বু,আই উইল টেক অনলি টেন মিনিটস।

কামরা খালি। শেহজা হয়তো বাইরে চাচ্চুদের কাছে। তার গিন্নি কাজে ব্যস্ত বাসায় নতুন অতিথি এসেছে সেজন্য। একদম ক্লিন সেভ করা মুখ, কালো একটা শার্ট হাতা গুটিয়ে রেখেছে, পরনে ডেনিম প্যান্ট লিভিং রুমে আসতেই নওরিন সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো, শাহীন ও সালাম দিলো। হাতের ইশারায় বসতে বললো। নওরীন এই প্রথম সরাসরি এভাবে দেখছে হবু ভাসুরকে। অদ্ভুত চোখতো।সারাক্ষন চোখে পাওয়ার চশমা অথবা রোদচশমা দেখে অভ্যস্ত।আজ দেখে ভারী চমকালো।এমন ছাই রঙা চোখ এদের বংশে আছে নাকি। মনে হয় যেন লেন্স লাগিয়েছে।ইংরেজিতে এই চোখকে হ্যাজেল আই বলে। খুব কম শতাংশ মানুষের এমন হয়। বডি স্ট্রাকচারে শাহীনকে মাঝে মাঝে তার দা’নব মনে হত। শাহাদকে দেখে তো আরো ভয় লাগছে। এরা কোনো ভাই ই একেবারে ছ ফিট লম্বা এমন নয়।শাহীন বলেছিলো ও উচ্চতায় পাঁচ নয় আর ভাইজান পাঁচ এগারো। ভাইজানকে দেখে রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছে নওরীন। ভাবীমাকে এখনো দেখেনি। নওরীন আসার পর শিফা আর সুলতানা কবির গল্প করে যাচ্ছে। শেহজা নওরীনের কোলে। মেয়েটা পুরোই বাবার আদল,বিশেষ ভাবে ওর চোখ জোড়া তো বাবার কপি। শাহীন নওরীনের চোখে মুখে আতঙ্ক দেখে পাশ ঘেঁষে বসলো।ফিসফিস করে বললো,

– কি হয়েছে?
– আমার ভাইজানকে ভয় লাগছে।
শাহীন চমকে গেলো।ওমা ভয় লাগার কি আছে। একটুখানি আশ্বাস দিয়ে বললো,
– ভয় কেনো লাগছে?
– টিভিতে যেমন, ভাইজান বাস্তবে তার চেয়ে ও ভয়ানক দেখতে।
– কিহ?
– আমার কাছে ভাইজানকে কেমন যেন ম্যাজিশিয়ান বা অদ্ভুত কিছু লাগছে। শ্যাম বর্নের মানুষের হ্যাজেল আই আমি এর আগে কখনো দেখিনি শাহীন।ভাইজান কি আমাকে ধমকাবে সবার সামনে।
শাহীন তাজ্জব বনে গেলো। ভালো করে শাহাদের দিকে তাকিয়ে ওর হাসি পেলো। ভাই সত্যি সুঠাম দেহের অধিকারী। শাহাদের শ্যামবর্ণ শরীরে চোখ গুলো সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় যার কারণে ওকে দেখতেই অন্য কিছু ভেবে ভয় পাবে অনেকেই। শাহীনের মনে হলো ভাইজানকে আজকে জ্বীন জ্বীন লাগছে এরমধ্যে পরেছে কালো। চশমাটা পরলে নাহয় কম বুঝা যেত। বলতেও পারছেনা ভাইজান চশমাটা পরেন। হাসি আটকে শাহীন কানের কাছে এসে বলে,

– ভাবীমাকে দেখলে ঠিক হয়ে যাবে। কারণ আমার ভাই যদি অদ্ভুত সুদর্শন হয়, উনি অদ্ভুত সুদর্শনা। এরা মানিকজোড়।
বাবার সাথে কথা শেষ করে,আচমকা ভারিক্কি গলায় শাহাদ বললো,
– নওরীন কি করছো এখন?
নওরিন ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
– বাবুকে নিয়ে… বসে আছি।
শাহাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
– আচ্ছা,গুড। আমি জিজ্ঞেস করেছি পড়াশোনা তো শেষ, শুনেছি জব করো। কোথায় করছো?
– এহ.. না মানে অফিসে।
শাহীন নিজেই এবার বিব্রত হয়ে গেলো। নওরীনের হয়ে উত্তর দিলো,

– ভাইজান একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে আছে।
– উত্তরটা তুমি দিচ্ছো কেনো? ওর কি সমস্যা?
নওরীন শাহীনের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো। শাহাদ চোখে চশমা দিলো। শাহাদের মাথায় ধরছেনা এই মেয়ে কি বলছে এসব। যতদূর খবর নিয়েছে মেয়ে ভালো।এমন আবোলতাবোল বকছে কেনো? শাহাদের কুঞ্চিত ভ্রু দেখে নওরীনের মনে হলো এই মুহুর্তে ওকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে। চোখে চশমা দেখে মনে হলো যাক এখন মনে হয় স্বাভাবিক লাগছে কিছুটা। তাই সাহস নিয়ে বললো,
– ভাইজান আমি আপনাকে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছি।
শাহাদ চমকে গেলো।এটা কেমন উত্তর।ওকে দেখে ঘাবড়ানোর কি আছে। ভাঁজ পড়া কপাল নিয়ে প্রশ্ন করলো,
– ঘাবড়ানোর কি আছে? ক্যাজুয়াল প্রশ্ন করেছি তোমাকে। ইন্টারভিউয়ের ভাইভা নিতে তো বসিনি। আত্নবিশ্বাসহীন আমার পছন্দ নয়।

– না মানে আপনি দেখতে তো শাহীনের মতো না।
শাহাদের অবাক হওয়া চাহনিতে মনে হলো নওরীন আজই শেষ। শাহীনের মত না মানে। শাহাদ রাগত চোখে শাহীনের দিকে তাকালো। বাকিরাও বিস্মিত। শাহাদ কিছু বলার আগেই দিয়া সরবতের ট্রে নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে সালাম দিলো।
নওরীনের কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– ছোট ভাইয়ার মতো না একদম ঠিক, তবে উনি উনার মতো।আপু আপনি যেমন প্রথম দেখাতে ভয় পেয়েছেন,আমিও তেমনি ভয় পেয়েছিলাম। মানুষটা মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন। এজন্যই অনেকে ঘাবড়ে যায়। ভয় পাবেন না। উনি মানুষই, জ্বিন বা ভূত নয়।

দিয়া হাসি দিলো। নওরীনের এই ব্যাপারটা বড্ড ভালো লাগলো।কি সুন্দর বুঝিয়ে দিলো।দিয়ার দিকে তাকাতে দেখে এই মেয়ে তো পুরা ইরানী। সুতি আকাশী রঙা জামিদানীতে পুরো অপ্সরী লাগছে।শাহাদ ইমরোজের যোগ্য সহধর্মিণী। এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ খুব সুন্দর। শাহাদকে যদি জ্বিন বলে এই মেয়ে সাক্ষাৎ পরী। খাবারের ডিশ টেবিলে রেখে দিয়া শেহজাকে কোলো নিলো। শাহাদ তখনো শাহীনকে গিলছে চোখ দিয়ে। শাহীন অসহায়ের মত বসে আছে। নওরীন সাহস করে এবার মুখ খুললো,

– ভাইজান আমি একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে আছি। আর পড়াশোনা শেষ করেছি তবে এখন থিসিস করছি পাশাপাশি।
এতক্ষণে ঠিকঠাক উত্তর দিলো। এরপর বেশ কিছুক্ষন আলোচনার পর শাহাদ জানালো খুব শীঘ্রই নওরীনকে বাড়ির বউ করতে চায়।নওরীনকে প্রথম প্রশ্ন করলো বিয়ে নিয়ে,
– নওরীন তোমার বড় ভাইয়ের দায়িত্বটা যদি আমি পালন করি আপত্তি থাকবে?
নওরীন এক রাশ চমকানো অভিব্যক্তি নিয়ে তাকালো। চোখে মুখে খুশি নিয়ে বললো,
– না ভাইজান।
– তুমি খুশি?
– জ্বি ভাইজান।
শাহাদ মাথা নেড়ে বললো,
– গুড। তবে দেরি কেন আর। তিনদিন বিয়ে। বাকি সাতদিন ট্যুর। আমার পক্ষে থেকে গিফট থাকবে বোনের জন্য।
শাহীন হাসি দিয়ে কানের কাছে বলে,

– নিরা বলেছিলাম, এটাই আমার ভাইজান।
বড়রা সব নিয়ে আলোচনা করছে। এর মাঝে শাহীনকে বললো,
– আগামী শুক্রবার বিয়ের ডেট রাখো।ডেস্টিনেশন ম্যারেজের ব্যবস্থা করবো গাজীপুর রিসোর্টে। শপিং শুরু করে দাও। কি লাগবে জানিও। বিয়ে তো একবারই জীবনে। ওর পছন্দে সব নাও। আব্বু আপনি বাকি ফরমালিটিস করে নেন।
সকলেই সম্মতি জানালো। আরো একটা উৎসব হতে যাচ্ছে রায়হান সাহেবের পরিবারে।হৈ হৈ রব।

সুলতানা কবির সকলকে টেবিলে খেতে ডাকলো।শাহাদ মাথা নেড়ে বললো,
– খেতে চলো সবাই।
খাবার টেবিলে বসেই মেয়েকে কোলে নিলো। শেহজাকে একটু করে খাওয়াচ্ছে নিজেও খাচ্ছে। আফিয়া খালাকে ডেকে বললো,
– খাবার দিয়েছো অপরাধীকে?
সেদিনের পর থেকে শাহাদ আর নাম ধরে ডাকেনা শেফালীর। যেন মন থেকে মুছে ফেলতে চাইছে বোনটাকে। আফিয়া খালা মাথা নেড়ে বুঝালো দিয়েছে। গরুর কলিজা ভুনা করেছে সুলতানা কবির। শাহাদ কোলেস্টেরলের জন্য এড়িয়ে চলে। হঠাৎ লক্ষ্য করলো দিয়া কলিজা ভুনা দিয়েই খাচ্ছে। তার প্লেটে বেশি খাবার নেই। কলিজা ভুনা,টমেটো চাটনি, আর একটা শামি কাবাব। নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখে ক্যাশিউ নাট সালাদ, তিতা করলা এবং চিকেন।
দিয়াকে সকলের সামনে প্রশ্ন করলো,

– তুমি কলিজা ভুনা পছন্দ করো?
দিয়া এহেন প্রশ্নে খাওয়া থামিয়ে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,
– অনেক। আম্মিজানের পরে দাদীজানের হাতের রান্না টা করতাম এখন আম্মুর হাতেরটা।
শাহাদ মৃদু হেসে বলে,
– চিংড়ি ও পছন্দ করো?
দিয়া হতবাক হয়ে বলে,
– হ্যাঁ অনেক। কিন্তু কেনো?
– কিছুনা, শেহজাকে চিকেন খাওয়াতে চাইলাম সে বার বার নাকোচ করছে। আঙুল দিয়ে তোমার প্লেটের টা দেখাচ্ছে। চিংড়ি এবং কলিজা মুখেই দিতেই খাওয়া শুরু করলো। পুরো তোমার কপি।
দিয়া মাথা নেড়ে বলে,
– আমার কপি না তো।আমি শিখিয়েছি খাওয়া তবে আপনার কপি প্রমান দেখবেন?
শাহীন, শিফা উৎসাহ নিয়ে বললো,
– দেখবো দেখবো।
দিয়া বলে উঠলো,

– এখন যা দেখাবো তা ও জেনেটিকেলি ওর বাবা থেকে পেয়েছে।
টেবিলের সবচেয়ে অদ্ভুত খাবার টা শাহাদের প্লেট থেকে তুলে শেহজার মুখে দিলো। যা শাহাদের জন্য করা। তিতা করলা ভাজি। শাহাদের পছন্দের একটা আইটেম। এই মানুষটা বড্ড অদ্ভুত ফ্রাইড রাইস দিয়ে তিতা করলা ভাজি খায়। শেহজার মুখে দিলো শেহজা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবে খেলো। এরপর দিয়া মুখের সামনে থেকে তিতা করলা সরিয়ে চিংড়ি ধরলো।মেয়েটা রেগে গিয়ে থাবা মারলো মায়ের দিকে।চিৎকার দিয়ে উঠলো। দিয়া পুনরায় তিতা করলা মুখে দিতেই আবার খাচ্ছে। দিয়া হেসে বলে,
– এখন এই করলাই খাবে।আর কিচ্ছু ধরবেনা,না কলিজা না চিংড়ি।
শাহাদ সহ পুরো পরিবার বিস্মিত। সুলতানা কবির বিস্মিত হয়ে বলে,
– বৌমা এই জিনিস আগে দেখিনি কেনো।
দিয়া হাসিমুখে বলে,

– আম্মু ও আটমাস থেকেই পছন্দ করে তিতা করলা। একদিন টেবিলে ছিলো এই ভাজি আইটেম।না বুঝে বার বার খেতে চাইছিলো দেখে ভাবলাম জিহবায় লাগিয়ে দি হয়তো তিতা বুঝে আর খাবেনা।কিন্তু এই মেয়ে ওই জিনিসই খেলো।পরে ভাত দিয়ে মাখিয়ে খাওয়ালাম।এরপর থেকে খাওয়াতে আসলেই এই খাবার খুঁজে।এভাবে কয়েকদিন খাওয়ানোর পর বুঝলাম র*ক্তের টান।
মেয়েকে বুকের সাথে চেপে ধরলো। শাহাদ নির্বাক হয়ে বাবার দিকে তাকালো। এ যেনো বাবাদের নিরব অপ্রকাশিত কষ্ট। দুই বাবাই আতঙ্কে আছে। এক বাবা সন্তানে অভ্যস্ত,অন্য সন্তান বাবাতে অভ্যস্ত। রায়হান সাহেব চোখের পানি মুছছেন সকলের আঁড়ালে। গমগমে গলায় শাহাদ বললো,

সায়রে গর্জন পর্ব ২০

– ঠিক করোনি ফারাহ।এতটা অভ্যস্ত করোনা মেয়েকে তার বাবার অভ্যাসে। সামলাতে পারবেনা পরে। অলরেডি শেহজা বুঝে গিয়েছে ওর বাবাই ওর সব।ইদানীং আমি লক্ষ্য করছি ও তোমার কাছে কম থাকছে। ওকে তোমাতে অভস্ত্য করো। যদি তাতে এমনো করতে হয় মেয়ের ভালোর জন্য, তবে দূরে রাখো আমার থেকে।

সায়রে গর্জন পর্ব ২২