Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ২০

সায়রে গর্জন পর্ব ২০

সায়রে গর্জন পর্ব ২০
নীতি জাহিদ

পিনপতন নিরবতা ডাইনিং টেবিলে। সকলে একসাথে সকালের নাস্তা করতে বসেছে। তাহি শেফালীকে ড্রেসিং করে দিয়েছে। বাসার সবাই জেনেছে শেফালীর আচার ব্যবহারের জন্যই শাহাদ শাসন করেছে। লিমনের মা রত্না বেশ কিছুবছর যাবৎ অসুস্থ। ওর নানুর সাথেই থাকে। শাহাদ কিছুক্ষন উনার খোঁজ নিয়ে ভালো ডাক্তার দেখানোর জন্য বললো। আফিয়া খালা নাস্তা সাজিয়ে শাহাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– শাহাদ বাবা, রুমের চাবিটা দিতেন, আমি নাস্তা দিয়ে আসি।
শাহাদ টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে আফিয়ার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে জোর আওয়াজে বললো,
– খাবারের কভার সরাও, কি খাবার দিয়েছো দেখি?
আফিয়া শুকনো ঢোক গিলে সুলতানা কবির আর দিয়ার দিকে তাকালো।

– এদিকে তাকাও।
পুনরায় ধমক খেয়ে কভার উঠাতেই দেখতে পেলো খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা সাথে জুস। শেফালী রুটি, আলু ভাজি পছন্দ করে না। শাহাদ খাবার ডিশ থেকে খিচুড়ি নামিয়ে সেখানে রুটি আর আলুভাজি দিলো,সাথে জুসের গ্লাস নামিয়ে এক গ্লাস পানি দিয়ে বললো,
– জেলের কয়েদী যা খায়, ও তার চেয়ে কিছুটা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাবে। আমার কথার এদিক সেদিক হলে ওর খাবার বন্ধ করে দিব। খাবার দিয়ে চাবি ফিরিয়ে দাও আমাকে। যাও।
তাহি,লিমন তাকিয়ে আছে একে অন্যের দিকে। শাহীনের কোলে ছিলো শেহজা। রুম থেকে ভাইঝিকে নিয়ে দুষ্টুমি করতে করতে বের হয়েছে। বাবাকে দেখে খুশিতে চিৎকার দিয়ে উঠলো। ধ্যান ভাঙলো সকলের।শাহাদকে দেখেই হাত বাড়িয়ে দিলো কোলে নেয়ার জন্য। মুখে উচ্চারণ করলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– বাবা…
শাহাদ দু হাত মেলে দিতেই ঝাঁপিয়ে আসে। শাহাদ মৃদু হেসে বলে উঠলো,
– এই মেয়ে বুঝে কিভাবে আমার উপস্থিতি?
গুটিসুটি মেরে বাবার বুকের সাথে লেপ্টে আছে। মায়ের কার্বন কপি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে মন কেমন করে উঠলো। আনমনেই সকলের সামনে বলে উঠলো,
– আমি না থাকলে কি বাবাকে ভুলে যাবে আম্মা!
দিয়া দাঁড়িয়ে গেলো সকলের সামনে। বিনা বাক্য ব্যয়ে রুমে চলে গেলো। সকলের সামনে এমন কথা বলা ঠিক হয়নি বুঝতে পেরে শাহাদ উঠে দাঁড়ায়। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,

– তোমরা খাও আমি আসছি। আফিয়া খালা তোমার ছোট আম্মার নাস্তাটা রুমে নিয়ে এসো।আমার জন্য কড়া এক কাপ চা দিও সুগ্যার ফ্রি।
মেয়েকে কোলে নিয়ে রুমে চলে এলো শাহাদ। সুলতানা কবির,রায়হান সাহেবের বিষন্নতা, শাহাদের এমন কথা বাকি সকলকে ভাবিয়ে তুলে। লিমন, তাহিকে ফিসফিস করে বলে,
– ডাক্তার তাহি,কেসটা কি? ভাবীমার আচরণে বড় ভাইজান সেন্টি খেলো কেনো? আমি জীবনে প্রথম এই লোককে সেন্টি খেতে দেখলাম।
তাহি কটমট করে তাকিয়ে বললো,
– বেয়াদপ,ভাইজানকে নিয়ে এসব কথা বলো কি করে? ছোট ছোটর মত থাকতে পারো না।
– ঠিক বয়সে বিয়ে করলে এক বাচ্চার বাপ হতাম। হুহ।
– কিহ!!
– কিছুনা।
ঠোঁট বাকিয়ে বিরবির করতে করতে খেতে লাগলো। বড্ড বিরক্ত এই সিনিয়র মেয়েটার উপর।সারাক্ষন তাচ্ছিল্য করতে ব্যস্ত থাকে। এমন শাস্তি দিব ভবিষ্যতে দেইখো মেয়ে। আপন মনেই এসব বলতে থাকলো লিমন।

‘ খাঁড়ার ওপর মরার ঘাঁ’ এমনিতেই জীবন তেজপাতা এর মাঝে নতুন বিপদ হানা দিয়েছে। গতরাত থেকে ঘুম আসছেনা। সকালে নাস্তা না খেয়ে অফিসে এসে চুপচাপ বসে আছে। এই অফিসটা শাহাদ করেছে। এখানে বসে কার কি প্রয়োজন সব দেখে। বিশেষ করে অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত দের জন্য শাহাদের একটি ফাউন্ডেশন আছে। সেই ফাউন্ডেশন নিয়েই কাজ। হামজা,তুহিন দুবার জিজ্ঞেস করে গিয়েছে কি সমস্যা। ঘড়িতে বাজে সকাল সাড়ে আটটা। এত তাড়াতাড়ি কেউ অফিস আসে? নিজেও এসেছে সাথে ওদেরও ফোন দিয়ে বসের কথা বলে আনিয়েছে। রুমের মধ্যে ছটফট করছে। তুহিন কাঠের বেঞ্চিতে বসেই ঘুম। হামজা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,

– পাভেল ভাই,হইছে টা কি আপনার। বেতরঙ্গি মাছের মতন এমন ছটফট করতাছেন ক্যান? চুপচাপ বসেন একজায়গায়। মনটারে স্থির বানান।
এবার পাভেল বেঞ্চিতে বসে বিড় বিড় করতে করতে জোরেই বলে উঠলো,
– শা/লা*র জীবনটা! প্রেম করলেও ঝামেলা,না করলেও ঝামেলা। ভালোই তো ছিলাম, প্রেম পিরিতি আসে নাই জীবনে। আমি প্রেমের সাথে না জড়ালেও প্রেম কুতকুত খেলতাছে আমার সাথে জড়ানোর লাইগা।
প্রেমের কথা শুনে তুহিন চিৎকার দিয়ে বলে,

– আব্বে কোন হা/লায় রে প্রেম করতাচে, সামনে আইনা দে। ওরে কুটি কুটি কইরা হালামু। হা*লার কাম টা দেখছুস নি! প্রেম কইরলে যে পস্তাইবে এই কতা কি হা’লায় জানে না।
পাভেল পা থেকে স্পঞ্জের স্যান্ডেল জোড়া খুলেনি। মাঝে মাঝে ফ্লোরে হাঁটার জন্য অফিসের সকলের আলাদা স্যান্ডেল আছে।এক পায়ের স্যান্ডেল খুলে ছুঁড়ে মারলো তুহিনের গায়ে। আধ ঘুমন্ত তুহিন আবার চেঁচিয়ে বললো,
– আব্বে পাথ্থর মারচ ক্যান হা*লা! ভাইজান আইয়া লক কইয়া দিমু সব।
পাভেল হামজাকে বললো,
– এই মালটা বেশি গিলছে কাল। বস জানলে অফিসের তিলতলা থেইকা লা*ত্থি মাইরা বুড়িগঙ্গার যে লেনে কমোড আছে ওই ট্যাংকিতে চুবাবে। ব্যাটা খা/ই/স্টা কোন হানকার। সরা এটারে।

– এমন করেন ক্যান ভাই, জানেন তো তুহিন ভাই ছ্যাঁকা খাইয়া ব্যাকা হইয়া গেছে। প্রেমের কথা শুনলেই হ্যে ছ্যাঁত ছ্যাঁত করে।
– চুপ থাক চামচিকা। আমার জন্য এক কাপ চা আনা।
পকেটে কম্পনের আওয়াজ অনুভব হওয়াতে সেল ফোন বের করে দেখে সেই রাতের নাম্বার থেকে মেসেজ। পাভেল ভ্রু কুঞ্চিত করে ঠোঁটে বিরক্তিকর শব্দ করলো। মেসেজ দেখেই পুনরায় রা*গ উঠলো। এত বুঝানোর পরও সেই ভুল। পাভেল ফিরতি ফোন দিলো।রিসিভ হতেই প্রথমে ধমক,
– একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছেনা, কয়টা বাজে ঘড়িতে দেখেছো? আমার জানটা কবজ করার ব্যবস্থা না করলে হয়না!
অপর পাশ শব্দহীন। শব্দেরা আজ হরতাল করছে। পাভেল উঠে দাঁড়ায়। শাহাদ এখনো আসেনি। ওর অফিস চেম্বারে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। পার্টির অন্য লোকজন আসা শুরু করেছে। পুনরায় কানের সাথে ফোন লাগিয়ে বলে উঠলো,

– কেনো করছো এসব বলোতো? প্রথম যেদিন বললে সেদিন আমি কিছু বলিনি। এখন প্রায় এসব বলো। আমি অনেক বিরক্ত প্লিজ এসব বলোনা। কেনো বুঝতে পারছোনা, আমি তোমার এসব পছন্দ করছিনা।আমার অন্য কাউকে পছন্দ আছে। দয়া করে ফোন দিবেনা।
অপর পাশ থেকে প্রতিউত্তর এলো,
– একবারো কি বলেছি আমায় পছন্দ করুন। তবে কেনো এমন আচরণ। করতে হবে না পছন্দ। মনোযোগ দিয়ে শুধু শুনবেন আমি যখন ফোন দিব। আপনার কথা শোনার জন্যই ফোন দিই।
পাভেল শব্দহীন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ন’টা বাজার মাত্র পাঁচ মিনিট। এক্ষুনি শাহাদ ঢুকবে। রুমের দরজা লাগানোর অপরাধে হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন ও হতে হবে। কিন্তু এই কেসটার ও একটা সমাধান চাই। কাটকাট গলায় ধমক দিয়ে বললো,
– না আর ফোন দেবে না। আমি কিন্তু অন্য ব্যবস্থা নেব ফোন দিলে। আমার জানের মায়া থাকলে এসব বাদ দিয়ে পড়াশোনা করো।নতুবা আমি নিরুদ্দেশ হয়ে যাব।
কলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

শাহাদ শেহজাকে একটু করে নাস্তা খাইয়ে দিচ্ছে আর মিটমিটিয়ে হাসছে। দিয়া গাল ফুলিয়ে বসে আছে অন্য পাশে। শেহজা বাধ্য সন্তানের ন্যায় খেয়ে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ালে শেহজার হাতের ডক্টর’স টয় দিয়ে বিভিন্ন এক্ট করে দেখাচ্ছে। মেয়েকে খাওয়ানো শেষ করে খাটের মাঝে খেলনা দিয়ে বসিয়ে দিলো। এরপর পকেট থেকে ফোন বের করে নাম্বার ডায়াল করে কল করলো ওপাশ থেকে স্বর এলো,
– আসসালামু আলাইকুম বস।
– হুম ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমার আসতে কিছুক্ষন লেট হবে। সামলে নাও।
– ওকে বস।
ফোন টেবিলের উপর রেখে দিয়ার কাছ ঘেঁষে বসলো। খিচুড়িতে ভালো করে বেগুন আর ডিম মাখিয়ে মুখের সামনে তুলে ধরে বলে,
– খেয়ে নিন শাহাদ গিন্নী , কথা দিলাম নেক্সট মান্থ যাবো সিঙ্গাপুর। শেহজার আর আপনার ভিসা অলরেডি প্রসেসিংয়ে আছে।
দিয়া কথা না বলে পিঠ দিয়ে বসলো। শাহাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,

– এখন আবার কি করলাম! ওহ আচ্ছা, ঠিক আছে আর এসব বলবোনা। শেহজা আম্মা শুনো আব্বা আরো কয়েক যুগ বাঁচবো ইনশাআল্লাহ। পরে একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবো হায়! হায়! দুনিয়াতে আবার ডায়নোসর যুগ ফিরে এসেছে,সাথে যুক্ত হয়েছে এলিয়েন। কিন্তু শাহাদ ইমরোজ ও তার পরিবার বেঁচে আছে। এরপর আমরা ডায়নোসরের হাড়গোড় দেখতে আর চিড়িয়াখানায় যাবোনা তখন তো রাস্তায় কত ডায়নোসর হাঁটাচলা করবে, এলিয়েন ও আসতে পারে। আচ্ছা কেমন হবে বলোতো যদি আমরা পিকনিকে যাই ওদের সাথে, কারণ তখন তো আমরা ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো মানব পরিবার থাকবেনা। আচ্ছা ফারাহ আমাদের বাসায় ডায়নোসরদের দাওয়াত দিলে তুমি সব রান্না একসাথে করতে পারবে। ওরা তো অনেক খায়।ততদিনে তো আমি আরো বুড়ো হবে,তুমিও হবে বুড়ি তাইনা! আর ডায়নোসর, এলিয়েন হবে আমাদের বন্ধু,প্রতিবেশী।

– হ্যাঁ অবশ্যই পারবো সব রান্না করতে,ইনফ্যাক্ট রান্নারই কি দরকার। ওই ডায়নোসর আর এলিয়েন আমাকে,আপনাকে তরকারি বানিয়ে খেয়ে নিবে।
– দূর্দান্ত আইডিয়া!!!
দিয়া চক্ষু ছানাবড়া। কি বলে এসব উদ্ভ্রান্ত কথাবার্তা। মাথা ঠিক আছে। দিয়ার এমন ভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে শাহাদ হো হো করে হেসে উঠলো। বাবার হাসি দেখে হামাগুড়ি দিয়ে শেহজা এগিয়ে এসে বাবার কাঁধ ধরে উঠে দাঁড়ায়। মুখে হাত দিয়ে বাবাকে নকল করে খিলখিল করে হাসছে। শাহাদ মেয়েকে আগলে নিয়ে মেয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হাসছে।ওদের হাসি দেখে দিয়াও হেসে দিলো।না হেসে এমন পরিস্থিতিতে থাকা যায় নাকি! শাহাদ খিচুড়ির লোকমা বাড়িয়ে দিতেই খেয়ে নিলো দিয়া। শাহাদের হাতে কখনো কিছু খাওয়া হয়নি। এই প্রথম এত যত্ন করে রাগ ভাঙাতে এসেছে মানুষটা। দিয়া ভাবছে যদি কোনো দূর্ঘটনা ঘটে দিয়া তো কিছুতেই এই শোক আর কা/টাতে পারবেনা।এই সাহস এবার নেই। বাবাজান,আম্মিজান চলে যাবার পর দাদাসাহেব ছিলেন, দাদাসাহেবের পর কমান্ডার সাহেব। এখানেই কেনো দিয়ার কষ্টের অন্ত হলো না! অন্য ধ্যানে মশগুল থাকা সহধর্মিণীকে বললেন,

– ওগো আমার বেগম শাহাদ, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? আপনার সোয়ামী কাজে বের হবে। আপনার ফরমায়েশ রাতে এসে খাটবো।আপাতত খেয়ে ছুটি দিন। এই বান্দা অফিসে দেরী না করে যাওয়ার রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে আজ। আজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট আছে।
মুখটা কেমন বাচ্চাদের মত ফুলিয়ে কথাটা বললো শাহাদ। শাহাদের আজকের আচরণে পরিবর্তন দেখে দিয়ার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছে সেই সাথে ভালো লাগা কাজ করছে অফুরন্ত। হেসে শাহাদকে বলে উঠলো,
– ওগো সোয়ামি আপনি তো বউকে খাইয়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়ে বউ পাগলের তকমা লাগিয়েছেন।তার বেলায়।
সবটুকু খিচুড়ি দিয়াকে খাইয়ে দিয়ে শেষ লোকমা নিজের মুখে নিলো। খেয়ে হাসি মুখে বললো,
– এই কাজ বহু আগেই করতাম যদি জীবনে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি না হতাম।
সরাসরি ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে নিলো শাহাদ। শাহাদ শেষ লোকমা মুখে নেয়ার কারণ বুঝলো না দিয়া। শেহজার দিকে তাকিয়ে দেখে আপন মনে খেলছে। দিয়া দাঁড়িয়ে পড়ে। শাহাদ রুমে ঢুকে টিস্যুতে হাত মুছে বললো,

– ওকে সোনা বের হচ্ছি নিজের প্রতি, মেয়ের প্রতি খেয়াল রেখো। আর খবরদার সকালে যে ভুলটা
বউ- শাশুড়ী মিলে করেছো সেটা আর করবেনা।
শেফালীর নাস্তার আয়োজন শাহাদের অনুমতি ব্যতীত করাতে শাহাদের রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মাথা নাড়িয়ে দিয়া সম্মতি জানালো।মনের মাঝে উঁকি দেয়া সেই প্রশ্ন করলো,
– শেষ লোকমা আপনি খেলেন কেনো?
কাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে যেভাবে লোকে উচ্ছ্বাসিত হয়,শাহাদ এমন প্রশ্নে একপেশে হাসি দিয়ে বললো,
– তোমার প্লেটের খাবার না খাওয়ার লোভ ছাড়তে পারিনি।
দিয়ার দু অধর আলগা হয়ে গেলো। হেসে উত্তর দিলো,
– ওরে আমার কন্যার বাপ…
শাহাদ লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকে দিয়ার কাছে এসে কপালে অধর ছুঁয়ে দিলো। এরপর মেয়ের কপালে অধর ছুঁয়ে দুজনকে সাবধান বার্তা শোনাতে শোনাতে শেহজাকে কোলে নিয়ে লিভিং রুমে আসলো সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো তখন ঘড়িতে ন’টা চল্লিশ। পাক্কা চল্লিশ মিনিট লেট হয়েছে কাটখোট্টা ডিসিপ্লিনড শাহাদের।

গাড়িতেই বসেই আজ ড্রাইভারকে বললো,
– একটা ভালো গান দাও রিফ্রেশিং।
”এক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর সাথে
সকাল-বিকেল বেলা
কত পুরোনো-নতুন পরিচিত গান
গাইতাম খুলে গলা
কত এলোমলো পথ হেটেছি দু’জন
হাত ছিলো না তো হাতে
ছিল যে যার জীবনে দু’টো মন
ছিল জড়াজড়ি একসাথে
কত ঝগড়া-বিবাদ, সুখের স্মৃতিতে
ভরে আছে শৈশব
তোকে স্মৃতিতে স্মৃতিতে এখনও তো
ভালোবাসছি অসম্ভব
কেন বাড়লে বয়স ছোট্ট বেলার
বন্ধু হারিয়ে যায়
কেন বাড়লে বয়স ছোট্ট বেলার
বন্ধু হারিয়ে যায়
কেন হারাচ্ছে সব, বাড়াচ্ছে ভীড়
হারানোর তালিকায়”
মনে পড়ে রাশেদের কথা। শায়ানের এই গান অসম্ভব পছন্দের ছিলো।প্রায় শাহাদের পিছু নিয়ে বলতো,

– বন্ধু তুই এমন কাটখোট্টা ক্যান! এত কম হাসিস ক্যান! তুই জানোস দুনিয়া কত্ত সুন্দর। হাসবি,মজা করবি কাছের মানুষ গুলারে বুকে টাইনা নিবি দেখবি কলিজাটা কেমন স্বস্তি পায়।
– আমার কলিজায় এত মানুষের জায়গা নাই। তুই নে তোর মন চাইলে।
রাশেদ মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে,
– বুঝবি একসময়,হয়তো আমি থাকবোনা। তখন ঠিকই বলবি রাশেদ তুই ঠিক ছিলি।
শাহাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিরবে চোখ বুজে হেলান দেয় গাড়ির সিটে। বিড়বিড়িয়ে বলে,
– রাশেদ তুই ঠিক ছিলি। বন্ধু, একসময় খুব চাইতাম একবার স্বপ্নে এসে বলে যা কে ছিলো তোর এভাবে অকালে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে। আজ বলবো আসিস না তুই স্বপ্নে। আমি নিজেই অপরাধীকে খুঁজে সেরা শাস্তিটাই দিব। তুই এলে আমার মনে ভয় ঢুকে যাবে,মানুষ নাকি মৃত মানুষ স্বপ্নে দেখে নিজের মৃত্যুর আগে। বাঁচার তৃষ্ণা বেড়েছে বিশ্বাস কর। ছোট্ট শেহজা আমার জান। ওকে ছাড়া আমি ভাবতে পারিনা আমার অস্তিত্ব। আর তার মা আমার কাছে দ্বিতীয় সেরা নারী। যার কন্ঠে থাকে স্বামীর সম্মানে রচিত বাক্য, সংসার বাঁচানোর অদম্য সাহস।
গাড়ির হর্নে ধ্যান ভেঙে যায়। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে দেখে সে বার বার হর্ন দিচ্ছে। ধমক দিয়ে বললো,

– কি সমস্যা আকবর?
– স্যার সামনে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে।
শাহাদ ভাবছে এখন নামলে যদি বিপদ বাড়ে। আজ নেই কোনো নিরাপত্তা। যদিও সে ভয় পাচ্ছেনা তবুও যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। এদেশের ক্ষেপাটে, পাগলাটে হুজুগে বাঙালি গুজবে বিশ্বাসী। কিছু ভেবে বলে,
– আমার অফিসে দেরি হচ্ছে। তুমি ঘটনা কি দেখে গাড়ি নিয়ে চলে আসো। আমি রিকশা করে যাচ্ছি।
– স্যার, আপনার সমস্যা হবে তো।
– সমস্যা নেই তুমি সাবধানে এসো। প্রয়োজন হলে জানিয়ে দিও।
শাহাদ বেরিয়ে গেলো গাড়ির দরজা খুলে। মুখে মাস্ক,চোখে সানগ্লাস। পরনে সাদা পাঞ্জাবির হাতা গুটানো।একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়লো। এই রাস্তা থেকে হেড অফিস বিশ মিনিট। আজ যেভাবে হোক যেতে হবে। জরুরি তলব। আপন গতিতে চলছে রিকশা। রিকশাওয়ালা রাজ্যের আলোচনা করছে। সরকার, দেশ তুলে এবং নিজের ঘরের মহিলা মানুষ তুলে ও গালা-গালি দিচ্ছে। শাহাদ বিরক্তিতে পাশ ফিরে ঘাড় ঘোরাতেই ভ্রু কুঁচকে এলো। ঘটনা আঁচ করতে পেরে ললাটে চিন্তার রেখা প্রকাশ পেলো। অফিসের সামনে আসতেই রিকশাওয়ালা বললো,

– ছার, আপনে কইলেই হইতো নেভি অফিসে আইবেন। তাহলে কি আমি সরকার তুইলা গাইল পাড়তাম। খালি কইলেন ডাইনে যান,বামে যান। আপনে তো অফিসার মানুষ কিছু মনে কইরেন না।
শাহাদ মুখের মাস্ক খুলে বলে,
– আপনার সরকার কেনো পুরো বাংলাদেশ নিয়ে মত প্রকাশের অধিকার আছে। কিন্তু ঘরের বউয়ের বদনাম রাস্তায় লোকের কাছে করার জন্য আপনাকে তুলে আঁছাড় মারতে মন চেয়েছে। আমার হাতে সময় কম বলে বেঁচে গিয়েছেন।
রিকশাওয়ালা আমতা আমতা করে বলে,
– সাব, মাফ কইরা দেন। এ আমার কি ভাগ্য।
শাহাদের পা জড়িয়ে ধরবে এর মধ্যে শাহাদ পিছিয়ে একজন অফিসারকে বলে,
– এটাকে দূরে সরাও। বেহুদা পুরুষ।
হনহন করে হেঁটে গেলো।

কাজ শেষ করে নিজের অফিসের দিকে চলে গেলো।
শাহীন, পাভেল,হামজা বসে আছে। শাহাদকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। অন্যরা মুখ খোলার আগেই শাহাদ বলে উঠলো,
– শাহীন ধন্যবাদ আমার আগে এসেছো। চেয়েছিলাম অন্য কাজ দিতে কিন্তু পথিমধ্যে এক অদ্ভুত জিনিস দেখলাম।
– কি ভাইজান?
– ক্যাপ্টেন আলতাফের সাথে মনি কি করে?
– ক্যাপ্টেন আলতাফ বলতে আপনি কি অহনার ভাইকে বুঝাচ্ছেন?
– হ্যাঁ।
সকলে একে অন্যের চোখে তাকিয়ে দেখে প্রশ্নসূচক দৃষ্টি। শাহাদ ভাবুক চোখে তড়াক করে তাকিয়ে বলে,
– ইয়া আল্লাহ।রহম করো। মনির কাছে রাশেদের পোস্ট মর্টেম রিপোর্টের কপি আছে। পাভেলের বাচ্চা তোকে আমি বলেছিলাম আলতাফকে খুঁজে বের কর। ও এক নাম্বার কালপ্রিট। এই রিপোর্ট হাতে পেলে রাশেদকে ও রেপিস্ট বানিয়েই ছাড়বে। অমীমাংশিত কেইস সলভ করে ফেলবে। আমার এতদিনের পরিশ্রম পন্ড হবে। আমি তোদের খু/ন করে ফে*লবো।

সায়রে গর্জন পর্ব ১৯

পুরো অফিস রুম কেঁপে উঠে শাহাদের হুংকারে। নতুন জাল বিছাবে মনি। এই রিপোর্টের প্রকৃত কপি শাহাদের কাছে ছিলো।কিছুদিন আগে মনি চেয়ে নিয়েছে। শাহাদ মনির চালটা ধরতেই পারলোনা। হায়রে দুনিয়া কাছের মানুষগুলা এতোটা ঠ/কবাজ! বেঈমান! কি করে হয়ে গেলো। নিজের বোনটাই যেখানে ভাইকে ফাসায় সেখানে মনি তো পরের মেয়ে। নিরবতা পছন্দ হয়নি কারো। পুনরায় গর্জন উঠবে।এবার সকলে দেখতে পাবে শাহাদের অবিনাশী রূপ। সতর্ক সংকেত কাউকে সতর্ক করেনি,কেউ অবলম্বন করেনি ঝড়ের আগের পূর্ব সাবধান বাণী। র*ক্ত জলোচ্ছ্বাস বইয়ে আনবে। প্রলয়ঙ্কারী তুফান এর ঘনগর্জন জানিয়ে দিচ্ছে আভাস বার্তা।

সায়রে গর্জন পর্ব ২১