Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ১৬

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ১৬

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ১৬
সুরভী আক্তার

হকচকিয়ে পেছন ফিরলো বালা । শ্যামা কে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরো বেশি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো ।
শ্যামা এগিয়ে গেল ওর কাছে । ওর ঠিক পাশেই মেঝেতে বসলো । কপালে হাত ছোঁয়ালো । জ্বর নেই এখন আর । শ্যামা আলতো হেসে বলল…

” তোমার গানের গলা তো অনেক মিষ্টি ‌। একদম তোমার মতোই ।
লাজুক হাসলো বালা ।‌ এই বার সত্যি সত্যি মন‌ থেকে হাসলো বোধহয় । মাথা নামিয়ে বললো…
” ছোট বেলায় গান শিখেছিলাম । তাই একটু আধটু গাইতে পারি ।
” জ্বর কমেছে তোমার । নিচে যাবে না ? শুনলাম ক’দিন থেকে নাকি নিচে যাও নি । জানো , আজ আমি রান্না করেছি । আজ নিচে চলো…
বালা মাথা দোলালো । অর্থাৎ সে যাবে । শ্যামা ওর কোলের দিকে তাকালো । ওর কোলে গলু গুটিসুটি হয়ে বসে আছে । শ্যামার নজর বুঝে বালা ও তাকালো গলুর দিকে । মিহি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল….
” এটা তোমার তাই না ?
” হুম…
” খুব সুন্দর । এটা আমি নেই ?
আবদার করলো বোধহয় । শ্যামা একবার গলু’র গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে বললো….
” আচ্ছা ।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ছোট বাচ্চাদের মতো করে হাসলো বালা । শ্যামা নিগুড় চোখে চেয়ে দেখলো ওর হাসি । এই মেয়ে টাকে দেখলে শুধু দেখতেই ইচ্ছে করে । চোখ আটকে যায় বারবার । চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ে । ভীষণ আপন লাগে , অথচ ওর সাথে পরিচয় হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টাও হয় নি এখনো । মেয়েটার মাঝে অদ্ভুত এক মায়া আছে ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নিচে উপস্থিত হয় সবাই । লতিফ জোয়ার্দার খাবার টেবিলের ঠিক মাঝের সিংহাসন স্বরূপ আসনে বসে আছেন । জুনাইদ আছে তার পাশে । আতিয়া বেগমও আছেন । লতিফা চোয়াল শক্ত করে বসে আছে । তাকে কেউ জোর করে নি । তবুও নিজ ইচ্ছায় বসেছেন তিনি । সবসময় বাড়ির পুরুষ’রা খাওয়ার পর তারা খেতে বসেন । তবে আজ ভিন্ন । বাড়ির নতুন বৌ প্রথম বার রান্না করেছে । তাই একসাথে বসেছে সবাই ।

খানিক বাদ সংগ্রাম আসলো তার আম্মাকে নিয়ে । হাত ধরে নিয়ে এসেছে সালেহা কে । সালেহার চোখ মুখ খিচে আছে রাগে । সংগ্রাম তাকে নিয়ে বসলো খাবার টেবিলে । এক পলক তাকালো শ্যামার দিকে । শ্যামা আগে থেকেই ভীত নয়নে তাকিয়ে ছিল । সংগ্রাম আলতো হেসে চোখের ইশারায় শান্তনা দিলো ওকে । পরমুহূর্তে চোখ পড়লো বালার দিকে । সংগ্রামের ঠিক সামনের চেয়ারে বসে আছে বালা । ওর চোখ দুটো স্থির সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম ভালো করে লক্ষ্য করলো ওকে । তিন দিন ধরে চোখের সামনে পড়ে নি বালা । কাল কে রাতে দেখেছিল , তবে সেভাবে লক্ষ্য করে নি । মেয়েটা কেমন শুকিয়ে গেছে । চেহারা স্যাকস্যাকে দেখাচ্ছে । চোখের নিচেও কালি পড়েছে । বালার করুন স্থির দৃষ্টি দেখে সংগ্রাম হাসার চেষ্টা করলো । সংগ্রামের ঠোঁটে হাসি দেখে বালা ও হাসলো ।
আতিয়া বেগম ইশারা করতেই শবনমের পাশ থেকে শ্যামা খাবার বেড়ে দিলো সবার পাতে । সবাই একসাথে খাওয়া শুরু করলো । শ্যামার বুক কাঁপছে । জানিনা কে কি বলবে ।
সবাই খাবার মুখে তোলার পরমুহূর্তেই তাকালো শ্যামার দিকে । সবার সোজাসুজি দৃষ্টিতে থতমত খেলো শ্যামা ।
সালেহা এক লোকমা মুখে তুলেই শ্যামার দিকে ক্ষিপ্ত চোখে চেয়ে গটগট পা ফেলে ত্যাগ করলেন বসার ঘর । লতিফ জোয়ার্দার দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে । অতঃপর শ্যামার দিকে চেয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে বললেন….

” অনেক সুস্বাদু রেধেছো আম্মা । খুব ভালো হয়েছে ।
একে একে প্রশংসা করলেন সবাই । বালা ও বাদ গেল না প্রশংসা করতে । জুনাইদের মুখে এই প্রথম কথা ফুটলো । সেও প্রশংসা করলো । এই প্রথম শ্যামা শুনলো জুনাইদের কথা । সবাই বেশ রসিয়ে প্রশংসা করলো ।
সবার খাওয়ার পাট চুকিয়ে তার পর খাওয়া হলো শ্যামা আর শবনমের ।
আজ আর সংগ্রাম বের হয় নি বাড়ি থেকে । সারাদিন ঘরেই ছিল ।
শ্যামা অবশ্য ছিল না ওর সাথে । শ্যামা সারা দিন বালার সাথে সময় কাটিয়েছে আজ । বালা মেয়েটা বড্ড ছেলে মানুষ । সব কথাই বলে ফেলে । কোন কথা চেপে রাখতে পারে না । এর মধ্যেই শ্যামার সাথে বেশ ভালোই মিশে গেছে ও ।

সন্ধ্যার আজান হতেই ঘরে আসে শ্যামা । উদ্দেশ্য নামাজ পড়া । সেই দুপুরে ঘর থেকে বেরিয়েছে আর ঘরে আসা হয় নি । শ্যামা গুটি গুটি পা ফেলে দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে । প্রথমেই নজর যায় খাটের উপর উবু হয়ে শুয়ে থাকা ছোট জমিদারের দিকে । গায়ে একটা ফতুয়া, কোমর পর্যন্ত চাদর টেনে ঘুমিয়েছেন । শ্যামা আপনা আপনি মুচকি হাসলো ‌একটু । সংগ্রাম ঘুমোলে কেমন শিশু সুলভ লাগে ওকে দেখলে ।
শ্যামা কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে ওযু করে নামাজ পড়ে নিলো । ওর নামাজের মাঝেই ঘুম ছুটে গেছে সংগ্রামের । চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসলো সে । শ্যামা কে নামাজ পড়তে দেখে বারান্দা দিয়ে বাইরে তাকালো । অন্ধকার নেমেছে । ঘুমানোর ফলে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে খেয়ালই ছিল না । সে এক মূহুর্ত অপেক্ষা না করে শাল জড়িয়ে তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরিয়ে গেল ।

নামাজ শেষে বারান্দায় আরাম কেদারায় বসেছে শ্যামা । বারান্দায় লাইট আছে একটা । সেটার আলোতে বসে আছে । খানিক বাদ সংগ্রাম আসলো । ঘর থেকেই গলা বাড়িয়ে শ্যামা কে দেখলো বারান্দায় বসে থাকতে । না ডেকে গলা খাঁকারি দিলো ।
চকিতে পিছনে চাইলো শ্যামা । সংগ্রাম খাটের একপাশে পা ঝুলিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে আছে ।
শ্যামা উঠলো বসা থেকে । পা টিপে টিপে ঘরে আসলো । খাটের এক পাশে সিটিয়ে দাঁড়ালো । চোরা চোখে পর্যবেক্ষণ করলো সংগ্রাম কে । সংগ্রামের কোনো হেলদোল নেই । চোখ মুখ কুঁচকে রেখেছে । শ্যামা গলা ভিজিয়ে নরম কন্ঠে প্রশ্ন করলো….

” কি হয়েছে ?
তৎক্ষণাৎ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করলো সংগ্রাম । ক্রমশ তীক্ষ্ণ হলো তার চাহনি । কাঠখোট্টা স্বরে উত্তর করলো…
” কিছু না ! সারাদিন কোথায় ছিলে ? একবার ও ঘরে আসার প্রয়োজন বোধ হয় নি ? এখন কেনো আসতে গেলে ? যেখানে ছিলে সেখানে যাও !
শ্যামাও সোজাসাপ্টা উত্তর করলো…
” সময় কাটছিল না । তাই বালার কাছে ছিলাম !
” আরে বাহ্.. কি বেগম আমার ! যাকে সময় দেওয়ার জন্য আমি সমস্ত কাজ ফেলে সারা দিন ঘরে বসে থাকলাম । সে কি না সময় কাটানোর জন্য অন্য কারোর কাছে সারাটা দিন পার করলো । পাত্তাই দিল না আমায় ।
কথাটা শুনে অবাক হলেও হাসি পেলো শ্যামার । ফিক করে হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে । সংগ্রাম চোখ সরু করে তাকালো । দ্বিগুণ গম্ভীর হয়ে বললো..

” হাসছো কেনো ?
ভ্যাবাচ্যাকা খেলো শ্যামা । হাসি লুকিয়ে আমতা আমতা করে বলল….
” কোই হাসলাম ?
আর কিছু বলল না সংগ্রাম । চোখ মুখ শক্ত করে বসে রইল ।
সাত গ্রামের জমিদার লতিফ জোয়ার্দারের একমাত্র পুত্র সংগ্রাম জোয়ার্দারের বিয়ে হয়েছে ক’দিন হলো । পুরো জমিদার গন্ডিতে রোল পড়েছিল তার বিয়ে নিয়ে । জমিদারের ছেলে একটা সাধারণ জেলের মেয়েকে বিয়ে করেছে । এই নিয়ে উৎকণ্ঠা জন্মেছে সবার মাঝে । কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতা হয় নি বিয়েতে । পুরো এলাকার লোকজন তাদের ভবিষ্যৎ জমিদার গিন্নি কে দেখার জন্য আগ্রহী ।

মাধবপুরেও তোলপাড় হয়েছে এই নিয়ে । মোখলেছের আর কোনো ভাবান্তর দেখা যায় নি ।
আজ দুপুর হতেই ভীর জমেছে জমিদার বাড়ির বাইরে । পুরো এলাকার কম বেশি সব মানুষই জড়ো হয়েছে সংগ্রাম জোয়ার্দার এর বেগম কে একপলক দেখার জন্য । হই-হট্টগোল শুরু হয়েছে বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে । মহিলা পুরুষ উভয়েই উপস্থিত সেখানে । লতিফ জোয়ার্দার সদর দরজা বরাবর তার আসনে পায়ে পা তুলে বসে আছেন । একজন পাশে দাঁড়িয়ে বাতাস করছে তাকে । পাশে আছে আরো অনেকে ।
শ্যামা কে নতুন শাড়ি গহনায় সাজিয়ে অন্দরে বসিয়ে রাখা হয়েছে । আতিয়া বেগম আর শবনম আছে ওর সাথে ।
সংগ্রাম জোয়ার্দার শক্ত কন্ঠে বলে দিয়েছেন – মহিলা ব্যাতীত কোন পুরুষের সামনে তার বেগমকে প্রদর্শন করবেন না তিনি ।

তার আদেশ ও পালন করা হয়েছে যথাযথ । পুরুষ ব্যাতীত একে একে গ্রামের সব মহিলারা এক নজরে দেখেছেন শ্যামা কে । অনেকে নাক সিঁটকেছেন শ্যামার গায়ের রংয়ের জন্য । তবে মুখে প্রকাশ করেন নি ।
বিকেল হতেই ভীর কমে জমিদার চত্ত্বর থেকে । শ্যামা অন্দর থেকে চোখ উঁচিয়ে একবার উঁকি দেয় বাইরে । ওদের গ্রাম থেকেও অনেকে এসেছিল । শ্যামা সবাইকে না চিনলেও হাতে গোনা কয়েকজন কে চিনেছে । অনেকে নিজে থেকেই সেঁধে পরিচয় দিয়েছে শ্যামা কে ।

এতো গুলো অপরিচিত মুখের মাঝে শ্যামা ওর সেই চিরচেনা পরিচিত মুখটাকে উৎসুক হয়ে খুঁজেছে বারংবার । কিন্তু পায় নি । আসে নি ফুলি । শ্যামা মনমরা হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ । খানিক বাদ নিস্তেজ হয়ে ঘরে ফিরলো । অন্ধকার নামছে চারদিকে । মাগরিবের নামাজ শেষে বারান্দায় বসলো শ্যামা । মনটা ছটফট করলেও শান্ত হয়ে বসে আছে । কতদিন হলো আম্মা কে দেখা হয় না । আম্মার পরশ পাওয়া হয় না । আম্মার গলা শোনা হয় না আজ কতদিন । ফুলির সাথেও আর দেখা হয় নি । সারাদিন এই চার দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না । শ্যামা মনে মনে ভাবলো সংগ্রাম কে আর একবার বলবে আম্মার কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা । আম্মার কাছে না নিয়ে গেলেও যেন ফুলি কে একবার এনে দেয় ওর কাছে ।
বুক ভার হয়ে আসছে শ্যামার । চোখ বুজলো ক্লান্তিতে । এভাবে কাটলো আরো কিছুটা সময় ।
সংগ্রাম ঘরে ঢুকে দেখল ঘরে নেই শ্যামা । বারান্দায় উঁকি দিতেই নজরে আসলো শ্যামার গোটানো শরীরটা । চোখ বুজে বসে আছে ও । সংগ্রাম কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে এগিয়ে গেল । শান্ত স্বরে ডাকলো…

” বেগম…
তৎক্ষণাৎ চোখ খুললো শ্যামা । সামনে স্বয়ং সংগ্রাম কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নড়ে চড়ে উঠলো । বসা থেকে উঠলো সহসা । সংগ্রাম মলিন হেসে বললো….
” চলো..
” কোথায় ?
” গেলেই দেখতে পাবে ।
বলেই শ্যামার হাত ধরলো সে ।
এই প্রথম জমিদার বাড়ি থেকে সদর দরজার বাইরে পা রাখলো শ্যামা । অন্দরে কেউ ছিল না । ওদের বাইরে আসা নজরে পড়ে নি কারোর । সংগ্রাম শ্যামার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় । শ্যামাও এগিয়ে যাচ্ছে চারপাশে নজর ঘোরাতে ঘোরাতে । আলো জ্বলছে চারপাশে । চলতে চলতেই বাগান টা ভালোভাবে দেখে নিলো শ্যামা । বাগানের পাশে সারিবদ্ধ অনেক গুলো দালান কোঠা । গরুর ঘর হয়তো । প্রধান ফটকের কাছে কয়েক জন পাহারাদার । শ্যামা কে নিয়ে ওদের সামনে যাওয়ার আগে সংগ্রাম একটু থেমে শ্যামার মাথায় ভালো করে শাড়ির আঁচল টেনে দিল । গায়ের শাল জড়িয়ে দিলো আরো ভালো করে ।

তার পর ফটক পেরিয়ে বাইরে আসলো ওকে নিয়ে । শ্যামা অদ্ভুতের ন্যায় পা মেলাচ্ছে সংগ্রামের সাথে । কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানা নেই । জমিদার বাড়ির পিছনের দিক দিয়ে ধরলা নদী বয়ে গেছে । বিশাল ঘাট আছে সেখানে । সংগ্রাম শ্যামা কে নিয়ে থামলো সেই ঘাটে । বাড়ির ছাদ থেকে আলো ভেসে আসছে । এখানেও ঘাটের পাশে হারিকেন আছে কয়েকটা । আগে থেকেই এসব ব্যবস্থা করে রাখা ছিল । জোনাকিরা আলো দিচ্ছে উড়ে উড়ে । চাঁদ ও আলো দিচ্ছে ক্ষীন তেজে । শ্যামা অবাক নয়নে চেয়ে আছে নদীর পানে । ঠিক কতদিন পর সেই শীতল হাওয়া বইলো শ্যামার মনে । নদীর স্রোতেরা যেন চিরচেনা ঘ্রাণ পৌঁছে দিলো শ্যামার নাকে ।
সংগ্রামের ঘরটা ঠিক ঘাটের বিপরীতে । বারান্দায় দাঁড়ালেও নদী দেখার কোনো সুযোগ নেই । তবে বারান্দায় দাঁড়ালে শীতল একটা হাওয়া ছুঁয়ে যায় অন্তরে ।

সংগ্রাম শ্যামার হাত ছেড়ে দিয়েছে । শ্যামা ঘাটের উপর থেকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি নিচে নামলো নিরস পায়ে । ঠান্ডা শীতল হাওয়া বইছে, কলকল করে ঢেউ বইছে নদীতে । রাতের নিস্তব্ধতায় সেই ঢেউয়ের শব্দ কানে পৌঁছাচ্ছে জোরালো ভাবে । শ্যামা খানিক বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে চোখ বন্ধ করলো আবেশে । দুহাত মেলে দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো নিজের ভেতর । নিমিষেই ভার হৃদয় শীতলতায় কেঁপে উঠলো । প্রশান্তি নেমে আসলো কোমল হৃদয়ে । শ্যামা কয়েক দফা শ্বাস টানলো পরপর । নির্জন রাতে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে ঝোপে । আশেপাশে আর কোনো শব্দ নেই । শ্যামা চোখ খুললো ঝট করে । আশেপাশের থমথমে পরিস্থিতিতে গাঁ শিউরে উঠলো কেমন
‌। তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরলো শ্যামা । সংগ্রাম উপরের সিঁড়িতে বসে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শ্যামার পানে । শ্যামা তড়িঘড়ি করে উঠলো উপরে । পল্লব ঝাপটে আশপাশ টা দেখে অকস্মাৎ বসলো সংগ্রামের পাশে । অনেকটা কাছাকাছি বসলো অনায়াসে । মৃদু হাসলো সংগ্রাম । দুরত্ব ঘুচে আরো কাছে বসলো সে । নমনীয় স্বরে বলল…

” ভয় পেলে নাকি ?
শ্যামা নিরিহ চোখে চাইলো । সংগ্রাম আবারো জিজ্ঞেস করল….
” এখন কেমন লাগছে ? তোমার সেই প্রিয় নদীর সন্নিকটে এসে ভালো লাগছে নিশ্চয়ই ? খুব মনে পড়ছিল এই নদীর কথা তাই না ?
মাথা নোয়ালো শ্যামা । দু’জনেই নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলো বেশ অনেকটা মুহূর্ত । নিস্তব্ধতা ভেঙে শ্যামা শীতল ডাকলো…
” ছোট জমিদার সাহেব,,,
” বলুন সাহেবা…
শিহরিত হয়ে উঠল শ্যামা । সংগ্রাম চেয়ে আছে চাঁদের আলোয় জ্বল জ্বল করা নদীর পানে । নদীর চকচকে পানিতে প্রতিবিম্ব ভেসেছে চাঁদের । শ্যামা জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে প্রশ্ন করলো…

” একটা কথা জিজ্ঞেস করি ?
” একটা কেনো ? যত খুশি জিজ্ঞেস করুন । অধিকার আছে আপনার !
ক্ষীয় কাল চুপ থাকলো শ্যামা । খানিক ইতস্তত হয়ে শান্ত কন্ঠে বললো…
” বালা অনেক সুন্দর,, তাই না ?
” জানি না,
সোজাসাপ্টা উত্তর সংগ্রামের । শ্যামা কপাল কুঁচকে বললো…
” কেনো,, দেখেন নি ?
” গত ঊনিশ বছর ধরেই দেখে আসছি । সেটা শুধু বোনের চোখে । ও কেমন সুন্দর সেটা জানা নেই আমার ।
শ্যামা ঢোক গিললো এবার । কাঁপা গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লো….
” বালা আপনাকে ভালোবাসে,, তাই না ?
” হুম….
এবারো সোজাসাপ্টা উত্তর সংগ্রামের । গলা কাপলো শ্যামার ।

” আ…আর আপনি ?
” হুম বাসি , সেটাও শুধু বোন হিসেবে ।
” আমি কি আপনাদের মাঝে আসলাম ?
সংগ্রাম সহসা তাকালো শ্যামার দিকে । চোখ ছলছল করছে শ্যামার । সংগ্রাম ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে আবদ্ধ করলো । স্বাভাবিক ভাবেই বললো….
” নাহ , তোমার আসার কথা ছিল তাই এসেছো ।
” আমি তো আপনার যোগ্য নোই, ছেড়ে দিন আমায় ! আমি অনেক দুর চলে যাবো আপনাদের জীবন থেকে ।
” তুমিই আমার যোগ্য, তাই ছাড়বো না কখনো । ছাড়া পাওয়ার চিন্তা এই জনমে কল্পনাতেও এনো না ।
” বালা কে ছেড়ে আমাকে গ্রহণ করলে হারবেন আপনি !
” না জিতবো । তবে তোমার ভাষায় যদি হার হয় তাহলে এই হার মাথা পেতে নিতেও রাজি আমি ।
” পরে আফসোস করবেন কিন্তু ।
” আফসোসের কোনো সুযোগ নেই !
” কেনো এমন করছেন আপনি !
” তোমার জন্য !

ভালোবাসায় বিশ্বাস করো ? যদি ঐ ভালবাসা নামক কাল্পনিক বাস্তব অনুভূতির সংঙ্গায়িত একটা শব্দ কে বিশ্বাস করে থাকো, তাহলে শুনে রাখো এই সংগ্রাম জোয়ার্দার ভালোবাসে তোমায় । সংগ্রাম জোয়ার্দার ভালোবেসে এমন করছে ।
বিস্ময় ঘিরে ধরলো শ্যামা কে । হতভম্ব হলো সে । কি বলছে এই লোকটা ? আদৌও কি এসব সত্যি ? নাকি কোন ভ্রম ? শ্যামা বিস্ময় আর কন্ঠে অবিশ্বাস্য নিয়ে প্রশ্ন করলো….
” আমাকেও ভালোবাসা যায় ? কোই এতদিন তো কেউ ভালোবাসলো না আমায় !
” তোমায় ভালোবাসা শুধু আমার অধিকার ! এই অধিকার আর কাকে দিতে চাইছো ?
শ্যামা নিশ্চুপ । বাক্ হারিয়ে ফেললো সে । চোখ টলমল করছে । পানি গড়াবে এক্ষুনি । সংগ্রাম ওর হাত দুটো নিজের গালে রাখলো । খোঁচা খোঁচা দাড়ি বিধলো শ্যামার তালুতে । হাত সরাতে চাইলো শ্যামা, সংগ্রাম সরাতে দিলো না । চুমু খেলো শ্যামার দুহাতের পিঠে । এক চিলতে হেসে বললো….

” তোমাকে আমি প্রথম কবে দেখেছিলাম জানো ?
শ্যামা জড়ানো গলায় উত্তর করলো…
” সেই দিন জঙ্গলে !
” উঁহুম…
তার ও আগে ।
তুমি যখন নিশ্চল হয়ে আনমনে ঘাটে বসে থাকতে তখন প্রথম বার আমার নজরে পড়ো তুমি । তোমাকে জঙ্গলে দেখার আরো অনেক দিন আগেই তোমাকে দেখেছিলাম । দুর থেকে । প্রথম দেখায় কিছু মনে হয় নি , এভাবে পরপর বেশ অনেক কদিন দেখলাম তোমাকে সেই একই ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে ঘাটে বসে থাকতে । মাথা ঘামাই নি । তার পর আর একদিন দেখলাম নদীর মাঝে নৌকায়,, গলুই তে বসে আছো । সেদিন ঐ ট্রলারে আমিও ছিলাম । সেবার অনেকটা কাছ থেকে দেখেছিলাম তোমায় । তবে ঠিক ভাবে দেখতে পাই নি তবুও । তার পর আবার দেখলাম সেইদিন জঙ্গলে । ভীতু একটা মেয়ে তুমি । জানো সেই দিন তোমায় দেখে আমার হাসি পেয়েছিল ভীষণ । সেইদিন আমার স্বীকারকে মুক্ত করেছিলে ঠিকি, কিন্তু নিজের অজান্তেই তুমি নিজেই আমার স্বীকারে পরিনত হয়ে গেছিলে । আর সংগ্রাম জোয়ার্দার কিন্তু তার স্বীকার কে ছাড়ে না ।

জানো, বারবার তোমায় দেখার ফলে কিছু তো একটা হয়েছিল আমার । তারপর আর কি, খোঁজ চালালাম । জানলাম তোমার বিষয়ে । যেদিন তোমাদের বাড়িতে গিয়ে ছিলাম সেদিন বাড়িতে এসেই দাদি জান কে বলেছিলাম বিয়ে করলে তোমাকেই করবো । সংগ্রাম জোয়ার্দার প্রথম কোনো নারীর উপর নজর দিয়েছে , তাকে ছাড়া যায় কিভাবে ? তাইতো আর ছাড়লাম না, নিজের করে নিয়ে নিলাম !!
শ্যামার চোখে ঝর্না নেমেছে । পানি গড়িয়ে পড়ছে অনাড়গল । মাথার ঘোমটা পরে গেছে মৃদু হাওয়ায় । খোঁপা থেকে ছুটে আসা ছোট ছোট চুল গুলো উড়ছে হাওয়ায় তাল মিলিয়ে । ঠোঁট জোড়া কাঁপছে । শ্যামার মুখ থেকে আপনা আপনি বুলি ফুটলো…

” কখনো ছাড়বেন না তো আমায় ?
সংগ্রাম মৃদু হাসলো । শ্যামার হাত দুটো আরো শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরলো ‌। একহাতে শ্যামার চোখ মুছিয়ে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকালো । গালে হাত রেখে অত্যন্ত মোলায়েম কন্ঠে বলল….
” এই যে ধরলাম , এই দেহে প্রাণ থাকতে কক্ষনো ছাড়বো না । ইহজন্মেও না আর পরজন্মেও না । বিশ্বাস রাখতে পারো আমার উপর ।
” কিন্তু আমি তো বালা আর ভাবির (শবনমের) মতো সুন্দর নোই ! যদি কখনো….
তৎক্ষণাৎ ওর ঠোঁটের মাঝে আঙুল চেপে কথা আটকে দিলো সংগ্রাম….
” শশশশ… কে বলে তুমি সুন্দর নও ? আমার চোখে দেখা সর্বকালের সেরা সুন্দরী তুমি । জাগতিক সকল কিছুর উর্ধ্বে আমার শ্যামা সুন্দরীর সৌন্দর্য । যে পুরুষ আমার শ্যামা সুন্দরীর সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হবে না,সে পুরুষের পৌরুষত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ আছে আমার । আর এমনিতেও আমার শ্যামা সুন্দরীর সৌন্দর্য শুধু আমার চোখে পড়ার জন্য । অন্যদের অধিকার নেই তার সৌন্দর্য উপভোগ করার ।
শ্যামা ফুঁপিয়ে উঠলো । ভেজা কন্ঠে কাঁপা গলায় বললো…

” আমি কালো । সারা জীবন শুনে এসেছি এই কথাটা ।
” তোমার গায়ের রংটাই তোমার আসল সৌন্দর্য, যা আকৃষ্ট করেছে আমাকে । কোটির মাঝে এক ও অনন্য তুমি । যা শুধু আর শুধুই আমার । আমার চোখ যদি তোমার উপর থাকে তাহলে এই চোখ নিয়ে চিন্তা করো না বেগম, এটা শুধু একান্ত তোমার উপরই সীমাবদ্ধ থাকবে । আর অন্যদের জন্য এই চোখ অন্ধ হয়ে যাবে । অন্যদের মতো গায়ের রং বিচার করে যদি তোমায় দেখতাম তাহলে সেটা বেছে নেওয়া হতো । অবশ্য তোমায় এক প্রকার বেছেই নিয়েছি আমি । সংগ্রাম জোয়ার্দার নিজের সহধর্মিণী হিসেবে বেছে নিয়েছে তোমায় ।
শ্যামা ফুঁপিয়ে কাঁদছে খানিক পরপর । সংগ্রামের কথা গুলো স্বপ্নের মতো লাগছে ওর কাছে । সংগ্রামের নরম চাহনি বিঁধছে ওর কোমল হৃদয়ে । ক্রন্দনরত কন্ঠে কেঁপে কেঁপে সে বললো….

” বৃথা স্বপ্ন দেখাবেন না আমায় ! যদি এসব অযথা হয় তাহলে বাঁচবো না আমি । আপনি জানেন আমার এই সংক্ষিপ্ত জীবনে অপ্রাপ্তির তালিকা অনেক বড় হলেও প্রাপ্তির খাতাটা শূন্য । এই শূন্য খাতাটা শূন্যই থাক । তবুও কোনো অসম্পূর্ণ স্বপ্ন দেখতে চাই না আমি ।
শ্যামার কথাটা শেষ হতেই সংগ্রাম একটু এগিয়ে আলতো অধর ছোঁয়ালো শ্যামার অধরে । কেঁপে উঠলো শ্যামা । শক্ত পাথরের ন্যায় জমে স্থির হয়ে গেল মূহুর্তেই । অক্ষিপট ভিজে জবজবে হয়ে গেছে । বন্ধ চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে কর্নিশ বেয়ে ।
সংগ্রাম সময় নিয়ে সরে আসলো । শ্যামা এখনো চোখ বন্ধ করেই রেখেছে । সংগ্রাম ওর চোখের নোনা জল টুকু শুষে নিয়ে বলল…

” অপ্রাপ্তির শূন্য খাতাটা পূর্ণ করার দায়িত্ব আমার । এটা আমার একান্তই কর্তব্য, আর এই অধিকার টুকু যথাযথ ভাবে পালন করতে চাই আমি বেগম । আমার ভালোবাসায় পূর্ণ হবেন আপনি । আপনার প্রাপ্তির খাতায় অন্যকিছু না থাকলেও আমার ভালোবাসার কথা যেন লাল কালিতে লেখা থাকে সারাজীবন । আপনার পূর্ণতার প্রথম থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি আমার ভালোবাসা লেখা থাকবে লাল কালির পূর্ণতা হিসেবে জ্বলজ্বল করে ।

ভোর ভোর নামাজ শেষে আর ঘুমায় নি শ্যামা । সংগ্রাম ঘুমিয়ে আছে কম্বল মুড়ি দিয়ে । শ্যামা বসে আছে ওর মাথার কাছে । পিঠের কাছে বালিশ দিয়ে হেলান দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সংগ্রামের পানে । সংগ্রাম ঘুমে বিভোর । ওর পাকানো গোঁফ দিয়ে ঢেকে আছে অধরদ্বয় । গোঁফের পাশে কালো আচিলটা চকচক করছে । শ্যামা চেয়ে থেকেই মুচকি হাসলো । হাত বাড়িয়ে চুল গুলোতে আলতো হাত বুলিয়ে নেমে পড়লো খাট থেকে । দরজা খুলে বালার ঘরের দিকে পা বাড়ালো ।

বালার ঘরের দরজা হালকা চাপানো ছিল ‌ । আলতো হাতে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল সেটা । শ্যামা অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ করলো ঘরে । খাটের উপর বালা কে না দেখে কপাল কুঁচকে আসলো । পুরো ঘরে নজর ঘোরালো একবার । ঘরে কোথাও নেই বালা ‌। শ্যামা বারান্দায় দেখলো, সেখানেও নেই । একটু এগিয়ে পিছন ফিরলো, নজর গেলো খাটের উল্টো পাশে । মেঝেতে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা । আঁতকে উঠলো শ্যামা । দৌড়ে গেল একপ্রকার । এই ঠান্ডায় ঠান্ডা মেঝেতে শুয়ে আছে মেয়েটা । শ্যামা হুড়মুড়িয়ে বসে দুহাতে বালা কে ঝাঁকালো….
” বালা,, এভাবে মাটিতে শুয়ে আছো কেনো ? ওঠো !!
ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠলো বালা । পিটপিট করে চোখ খুলে সামনে শ্যামা কে দেখে মুচকি হাসলো । উঠে বসলো তৎক্ষণাৎ । মুখটা কেমন কালো দেখাচ্ছে । সবসময় চোখে কাজল পড়ে বালা । কাজল লেপ্টে আছে চোখে মুখে । গাল বেয়ে পানি গড়িয়েছে অঝোর ধারায় সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে । চোখের পাপড়ি এখনো ভেজা । চুল গুলো এলোমেলো । শ্যামা হকচকিয়ে গেল বালার এমন অবস্থা দেখে । শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে ওর । শ্যামা ঢোক গিললো । অধর ভিজিয়ে বললো…

” এভাবে শুয়ে ছিলে কেনো ? এমনিতেই তোমার জ্বর ঠিক হয় নি এখনো ! যদি কিছু হয়ে যেতো ?
” তাহলে মরে যেতাম ! কি‌ বলতো… মরলেই ভালো, তাহলে প্রতিদিনের এই নরক তুল্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো ।
বলেই পাগলের মতো শব্দ করে হাসলো বালা । শ্যামা ওকে তুলে খাটে বসালো । চাদর মুড়িয়ে দিলো গায়ে । বালা প্রত্যেক বারের মতো অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শ্যামার দিকে । শ্যামার চোখ দুটোও ছলছল করছে । বালা নিস্তেজ স্বরে বলে উঠলো…
” কাল কোথায় ছিলে ? একবার ঘরে গেছিলাম পেলাম না ।
” ঐ… মানে.. একটু…
শ্যামা আমতা আমতা করার মাঝেই বালা বললো…
” সংগ্রাম জোয়ার্দার ঘুরতে নিয়ে গেছিলো তোমায় তাই না ?
শ্যামা চোখ সরিয়ে খাট থেকে নামতে নামতে কথা ঘোরালো….
” ঠান্ডা লেগেছে তোমার, যদি জ্বর আসে ? এক্ষুনি একটা ঔষধ খেয়ে নাও, তাহলে আর জ্বর আসবে না ।
” মানুষ ভোলার ঔষধ থাকলে সেটাও দিও তো আমায় । সেটার বেশি প্রয়োজন…
শ্যামা থমকে দাঁড়ালো । চোখ বন্ধ করে নিলো তৎক্ষণাৎ । বালা ভাঙ্গা গলায় আবারো বললো…
” আচ্ছা শ্যামা…

আমরা ক্যান তাদের কে ভালোবাসি, যারা আমাদের কখনোই হবার নয় । যারা নফসে থাকে না তাদের প্রতি আমাদের এতো টান কেনো হয় বলোতো ? মন যাকে চায় , ভাগ্য কেনো তাকে দুরে সরিয়ে দেয় ?
শ্যামা খাটে বসলো ধপ করে । বালা শিশু সুলভ নজরে চেয়ে আছে উত্তরের জন্য । শ্যামা বিষন্ন কন্ঠে বলল…
” আমি যদি চলে যাই তাহলে তুমি খুশি হবে, তাই না বালা ?
” না না.. খবরদার না । তুমি কেনো চলে যাবে ? বিশ্বাস করো তোমার উপর কোন অভিযোগ নেই আমার । একটা আশ্চর্যকর বিষয় কি জানো..? তোমাকে দেখলে আমার হিংসে হওয়ার কথা । কিন্তু বিশ্বাস করো আমার তিল পরিমাণ ও হিংসে আসে না তোমাকে দেখলে । বরং অদ্ভুত ভাবে কেমন যেন ভালো লাগে ।

আরে আমি তো পাগল… যে স্থান আমার নয় সেই স্থানে নিজেকে বসিয়ে হাজারো স্বপ্ন দেখেছি সবসময় । স্বপ্ন ভাঙ্গলে কষ্ট তো হবেই । এই টুকু আমার প্রাপ্য । এক পাক্ষিক কোন কিছুই সম্ভব নয় । তিনি আমাকে আশকারা দেন নি কখনো, আমি বেশি বেশি আশাবাদী ছিলাম । তিনি তো তোমাকে পেয়ে চলে গেল, কিন্তু আমি ? আমি তো হারালাম । তাকে হারায় নি কিন্তু ! মানুষ সেটাই হারায় যেটা তার নিজের , তিনি তো আমার ছিলেন না কখনো ! আমি তো হারালাম আমার অবাস্তব স্বপ্ন গুলো, যেগুলো আর কখনো দেখতে পারবো না । স্বপ্ন দেখতে কিন্তু ভালোই লাগে, পূরন হওয়া না হওয়া সেটা তো ভাগ্যের ব্যাপার । আমার তো কপাল পোড়া, খুব ভাগ্য নিয়ে জন্মাতে হয় স্বপ্ন পুরনের জন্য । সখের মানুষের সাথে থাকার জন্য । আমার তো দূর্ভাগ্য, সেই ভালো ভাগ্য আমার নেই , যেটা তোমার আছে । তাই তো আমি চেয়েও হারালাম, আর তুমি না চাইতেও পেয়ে গেলে । এমন কিছু কিছু জিনিস থাকে, যেগুলো হারাতে না চাইলেও হারিয়ে যায়, কারন ধরে রাখার ক্ষমতা থাকে না ।

একনাগাড়ে কথা গুলো বলে বিছানায় নিস্তেজ হয়ে গাঁ এলিয়ে দিলো বালা । চোখ বুজলো সাথে সাথে । নিজেকে মুড়িয়ে গুটিয়ে নিলো । শ্যামা সারাজীবন কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু বালার যে কষ্ট সেটা পায় নি কখনো । কিন্তু কি করার আছে শ্যামার ? আর যে কিছু করার নেই ! শ্যামা বালার গায়ে চাদর টেনে দিলো । বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে ।
আলো ফুটেছে ভোরের । শ্যামা হেঁশেলে গিয়ে দেখলো চা বসিয়েছে গৃহকর্মীরা । কেউ কেউ রান্নার যোগান দিচ্ছে । বাড়ির কেউ এখনো নিচে নামে নি । শ্যামা কে দেখে মাথা নিচু করে একপাশে দাঁড়িয়ে পড়লো সবাই । কুর্নিশ জানালো শ্যামা কে । শ্যামার পছন্দ হলো না এটা । এখানে সবাই বয়সে বড় । সে নরম কন্ঠে বলল….
” আমাকে দেখে এভাবে সম্মান প্রদর্শনের কোন প্রয়োজন নেই । আমি তো আপনাদের ছোট ।মাথা তুলুন আপনারা ।
মাথা তুললো সবাই । একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে আবারো মাথা নামিয়ে একজন বলে উঠল…
” আপনার কি কোন কিছু প্রয়োজন ছোট জমিদার গিন্নি ? বলুন আমরা দিচ্ছি !
” আমার নাম ধরে ডাকবেন আপনারা । বললাম তো আমি আপনাদের ছোট । আমাকে এভাবে অতিরিক্ত অভিবাদন জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই ।

আবারো একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো সবাই । ঢোক গিললো তারা । মনে হলো শ্যামার কথাটা পছন্দ হয়েছে, কিন্তু প্রকাশ করলো না সেটা । শ্যামা সবার সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে চা বানালো সবার জন্য । অতিরিক্ত ঠান্ডা পড়েছে আজ , তাই এখনো নিচে নামে নি কেউ । শ্যামা এক কাপ চা নিয়ে ঘরে চলে গেল ।
সংগ্রাম এখনো ঘুমিয়ে । শ্যামা চায়ের কাপ পাশে রেখে খাটের উপর পা তুলে বসলো । বেশ কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থাকলো সংগ্রামের ঘুমন্ত মুখশ্রীর পানে । সংগ্রাম গাঁ মুড়িয়ে উঠতেই তড়িঘড়ি করে চোখ সরালো শ্যামা ।
সংগ্রাম উঠে বসতেই খাট থেকে নেমে ওর দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিলো সে । কপাল কুঁচকে শ্যামার দিকে তাকালো সংগ্রাম । ফিচেল হাসলো পরমুহূর্তে । চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শ্যামা । সংগ্রাম গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ১৫

” এদিকে এসো….
তৎক্ষণাৎ চোখ তুললো শ্যামা । সংগ্রামের শক্ত চোখ মুখ পানে তাকিয়ে এগিয়ে গেল সহসা । সংগ্রাম ওর হাত ধরে টেনে বসালো ঠিক ওর পাশেই । একটু ঝুঁকে বললো…
” ভালো লাগলো তোমার দায়িত্ব বোধ দেখে । তুমিও তোমার অভ্যাস বদলাও আর আমিও আমার অভ্যাস বদলাই ।
বলেই শ্যামার কপালে চুমু খেলো টপাটপ । শ্যামা নির্বোধের ন্যায় চেয়ে আছে। সংগ্রাম ভ্রু যুগল উঁচু করে বলল…
” আজ থেকে চা নয়‌, এটা দিয়েই শুরু হবে আমার সকাল । অভ্যাস করে নাও বেগম…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ১৭