সায়রে গর্জন পর্ব ৪১
নীতি জাহিদ
ক্লান্তি নিয়েই ঘুমাতে আসে দিয়া। ছোট্ট শেহজা বাবাকে ডাকতে ডাকতেই ভুলে যায় বাবা ডাক। তমার কোলে,কল্পনার কোলেই ঘুমিয়ে পড়ে। মাথা ব্যাথায় অস্থির হয়ে পড়ে দিয়া। অতিচিন্তাই একমাত্র কারণ এই ব্যাথার।
ঘুমানোকে আপাতত একমাত্র সমাধান মনে করছে। সব ভুলে থাকতে চায় আপাতত। মজুমদার বাড়ি যেন প্রাণ ফিরে পেলো দিয়ার আগমনে। মঈন লাগিয়ে দিয়েছে হুলস্থুল কারবার। সেই সাথে তমা রান্নার এলাহি আয়োজন। মজুমদার বাড়ির রাজকন্যার পদধূলিতে মুখরিত আজ মহল।
গুটগুটে অন্ধকার কামরায় নিজেকে পেয়ে ছটফট করছে মোহনা। গোঙ্গানোর আওয়াজ। তখনি দরজা খুলে রুমে ঢুকলো ‘সিক্স স্পাইডার’ এর তিন সদস্য এবং সাথে একজন নারী সদস্য। এদের হাঁটার গতি দেখলেই বুঝা যায় বাতাসের সাথে তাল মেলানোর চেষ্টা। মোহনা এদের চেনে না। নারী সদস্য পাভেলের নির্দেশে মুখ খুলে দিলো। তানভীর প্রশ্ন করলো,
– লিমনকে মা*রতে চেয়েছিলেন কেনো?
মোহনা হেসে বললো,
– বলবো না।
ইয়াজ প্রশ্ন করলো,
– লিমনকে মা*রতে চাওয়ার কারণ কি?
এবারো মোহনা বিচ্ছিরি হাসি দিয়ে বললো,
– বলবো না বলবোনা।
মোহনার সামনে বরাবর একটা চেয়ার এনে দিলো তানভীর, পাভেল আয়েশী ভঙ্গিতে বসে বললো,
– মিসেস মোহনা, ইউ আর ঠু স্মার্ট উই নো। প্লিজ কো-অপারেট। লিমনকে কেন মা*রতে চেয়েছেন? এতে আপনারই ভালো।
গত দুবারের চেয়ে উঁচু আওয়াজে চেঁচিয়ে বললো,
– বলবোনা শা*লা কি করবি? বা** ও ছিড়তে পারবি না। উলটা নিজের কথা ভাব। তোর শিফা পাখি…
পাভেল এক লা*থিতে চেয়ার ফেলে দিয়ে মোহনার চুলের মুঠি ধরে কষে এক থাপ্পড় দিয়ে বলে,
– হা*রা***জা/দী তোকে আমি এখানেই গেঁড়ে ফেলে। তোর বা*ল তোর হাতে ছি*ড়াবো। ব**মা*শ। শান্ত ছিলাম ভদ্র ছিলাম ভালো লাগেনি। তোর মতো বে*** র বাঁচারই অধিকার নেই।
তানভীর, ইয়াজ ভয় পেয়ে গিয়েছে পাভেলের রূপ দেখে। জোর করে পাভেলকে টেনে নিয়ে আসলো। পাভেল নিজেকে শান্ত করার চেষ্টায় আছে। তখনই ইয়াজের ফোন বেজে উঠলো, ফোনের নির্দেশনা পেয়ে পুনরায় বেঁধে বের হয়ে গেলো।
লিমনের বুকের কাছটায় সেলাই বেশি পড়েছে। এক মুহুর্তের জন্য ছেড়ে যায় নি। জানানো হয়নি লিমনের মাকে। এখন অবধি জ্ঞান ফিরেনি এই ছেলের। দুই দুইটা রাত কেটে গেলো। এই লিমনকে তো চায় নি। দুষ্টু লিমনকে চোখে চোখে রাখতো। কখন আবার ভুল করে ফেলে। এত বড় যৌথ পরিবার খুব কম মানুষ ই মেইনটেইন করে। অথচ দাদাজান সব গুছিয়ে রেখেছিলেন। অবাধ্য চাচা রেদোয়ানকে গুছিয়ে রেখেছিলেন যতদিন জীবিত ছিলেন। দুটো সকাল, বিকেল, দুপুর গড়িয়ে রাত। বাসায় জানিয়েছে কাজে ব্যস্ত। লিমনের বাসায় জানে শাহাদের কাজে ঢাকার বাইরে আছে লিমন। এত বড় ঘটনা লুকানো চাট্টিখানি কথা নয়। রত্নাকে শাহাদ সুলতানা মঞ্জিলে এনে রেখেছে। শেফালী,শিফা চাচীকে ব্যস্ত রাখে শাহাদের কথায়। ওরাও জানেনা প্রকৃত কারণ।
দুদিন থেকেই খোঁজ নেয়া সম্ভব হয়নি শাহাদ পত্নী ও কন্যার। ফোন বের করে কল দিবে ঠিক তখনই দেখলো লিমন নড়ে উঠেছে। ফোনটা পুনরায় পকেটে রেখে লিমনের পাশে এসে বসলো। হাত বাড়িয়ে ধরলো লিমনের একটা হাত। রক্তাক্ত কা*টা ঠোঁট দুটোতে একটাই শব্দ উচ্চারণ করলো,
– ভা ই জা ন।
এত শব্দ থাকতে কেনোই বা এই ছেলে ভাইজান উচ্চারণ করলো। মনে এত প্রবল বিশ্বাস পেলো কি করে! চোখ খুলে নি অথচ বিশ্বাসের জোরে তাকেই ডাকলো। লিমনের সুস্থ হাতটা আলতো করে ধরলো। লিমন হাতে কারো ছোঁয়া পেয়ে চোখ খোলার চেষ্টা করলো। খুলতেই দেখলো যা চেয়েছিলো তাই। হালকা হাসলো। পুনরায় ধীরে বলার চেষ্টা করলো,
– ভা ই জা ন, ওরা একা না জেঠু ম নি…
শাহাদ থামিয়ে দিয়ে বললো,
– আমি সব জানি। আর বলতে হবে না। তুই সুস্থ হয়ে যা। এরপর দুজন মিলে ওদের শাস্তি দিব কেমন। ঘুমা এখন।
লিমনের চোখে ভয় দেখলো শাহাদ। লিমন আবার বললো,
– ভা ই জা ন, ওরা ভাবী মা কে
থামলো লিমন। শাহাদের চোখে বিস্ময়। দিয়ার কথা আসলো কেনো? শাহাদ লিমনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আস্তে বল। ভাবীমা কে কী?
– খুঁজছে।
– কেনো?
– প্রতিশোধ আপ না র উপর। মনি আপাকে কে বি য়ে…
শাহাদ মুচকি হাসলো। আর কত! নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে। সামান্য হেসে বললো,
– আল্লাহ ভরসা। তুই সুস্থ হ। আমি দেখছি।
তাহি রুমে ঢুকতেই দুজন চুপ। আরেকজন নার্স এসেছে। লিমনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– কেমন আছো?
লিমন ইচ্ছে করেই চোখ বন্ধ করলো। তাহি স্পষ্ট বুঝলো তাহিকে উপেক্ষা করছে এই ছেলে। লিমনের শারীরিক অবস্থা দেখে যে কারো মনে মায়া জাগবে। ভাইজানের সামনে বেশি কিছু আর জিজ্ঞেস করেনি। এর মাঝে লিমনের ডাক্তার চলে এসেছেন। শাহাদের সাথে করমর্দন করে লিমনকে দেখে চলে গেলেন। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করা হলো হাসপাতালে। তবে সকলের অগোচরে। শাহাদের খুব চিন্তা হয়, কয়টা অন্যায় এভাবে দমন করা যাবে? এই জীবনটাই অসহ্য কর। রাশেদের অমীমাংসিত কেইস থেকে যে অন্যায় শুরু হয়েছে তার কোনো ইতি ঘটছেনা। একদিকে লিমন অন্য দিকে স্ত্রী-সন্তান। হামজা, তুহিনকে ফোন দিয়ে হাসপাতালে থাকতে বললো। নিরাপত্তার জন্য ছদ্মবেশে লোকজন তো আছেই। বেরিয়ে এলো হাসপাতাল থেকে। উদ্দেশ্য এখন নতুন চাচী। তার গজানো পাখনা যে কর্তন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
দুদিন হলো কোনো খোঁজ নেই। ফোন দিতেও কার্পন্য। খুব তো বড় বড় কথা বলেছিলো। মেয়ের খবর ও একবার নিলো না। দিয়া সারা ঘর মেয়েকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। মেয়ে এই বাড়ি আসার পর থেকে কাঁদছে কম। যখনই কাঁদে চাচাজান বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আনে। এখানে চাচাজান আছেন বলেই মনে সাহস আছে। কল্পনা এসে যোগ দিলো তাদের মাঝে। অনেক বছর পর নাচের ঘর খুললো দিয়া। কাজের লোকদের দিয়ে ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিলো। এই ঘরেই পড়ে আছে সেই দিয়া, যার মনে ছিলো অদম্য সাহস, নিজেকে ভালো রাখার, আনন্দে রাখার দক্ষতা। অথচ সময় মানুষ ঝিমিয়ে দেয়। দিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। আজ স্বামী সন্তান সব নিয়ে থাকলে ও ভেতরের দিয়া ঘুমন্ত।
এ বাড়ির দেখাশোনা করে রাখি। মেয়েটা খুব চটপটে। ছুটে এলো দিয়া আপার ফোন নিয়ে। দিয়া ফোন রিসিভ করলো। সালাম দিয়ে চুপ করে আছে। গম্ভীর স্বরটা ভেসে এলো,
– শেহজা কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ।
– কি করছে?
– আছে কোলে। ঘুমিয়ে গিয়েছে।
– খেয়েছে?
– জ্বি।
দু পাশ শান্ত। দিয়া শেহজাকে কোলে নিয়ে স্ব কামরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শাহাদ প্রশ্ন খুঁজতে ব্যস্ত। নিরাশ হয়ে শুধালো,
– পড়াশোনা কেমন যাচ্ছে?
– চেষ্টা করছি।
– খেয়েছো?
– জ্বি।
– ওকে ঘুমিয়ে পড়ো।
– ঠিক আছে।
– আল্লাহ হাফেজ
– জ্বি আল্লাহ হাফেজ।
ফোন কে*টে যাওয়ার পর ফোনটা বুকে চেপে ধরলো। প্রয়োজন ও বলা চলেনা এই কথোপকথনকে। কথা বাড়াতে ইচ্ছে করেনি দিয়ার। দুদিন পর এসেছে খবর নিতে! কোথায় ছিলো দুদিন? ভাবতেই পুনরায় ফোন বেজে উঠলো। দিয়া যেন এই কলের আশায় ছিলো। রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে ভেসে এলো স্বর,
– ফারাহ্
– জ্বি।
– একবার কেমন আছি জিজ্ঞেস করলে না? খেলাম কিনা তাও জিজ্ঞেস করলে না? কিভাবে আছি জানতে চাইলে না? এতটা নিষ্ঠুরতম আচরণ কি উচিত?
দিয়া নিশ্চুপ। দীর্ঘশ্বাস ও পাশ থেকে। নিজ থেকেই বললো,
– তুমি জানতে না চাইলেও বলছি শুনো। গত দুদিন আমি এক ফোঁটা ঘুমাই নি। হাসপাতাল আর পুলিশ স্টেশন । আজ বাসায় এলাম কিছুক্ষণ আগে। লিমনের এক্সিডেন্ট হয়েছে। বাসায় কেউ জানেনা। চাচী আম্মুকে বাসায় এনে রেখেছি। সারাদিন ভালোই ছিলাম ব্যস্ততায়। রুমে ঢোকার পর আমার সব অন্ধকার লাগছে।
লিমনের এক্সিডেন্ট হয়েছে শুনেই মাথা এলোমেলো লাগছে। দিয়া নিজেকে সামলে বললো,
– লিমন ভাইয়া কেমন আছে?
– ট্রিটমেন্ট চলছে।
– ফারাহ্
– জ্বি
– ভিডিও কল দিই?
নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে দু বাড়ির দুই কামরায়। একজন সম্মতি দেয়ার, অন্যজন পাওয়ার অপেক্ষায়। দিয়া স্পষ্ট বুঝতে পারছে শাহাদের চিন্তার পরিধি। কিছুক্ষন অপেক্ষা করে শাহাদ নিজ থেকেই বললো,
– ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে। রাখছি।
নিজ থেকে লাইন বিচ্ছিন্ন করে ভিডিও কল করলো দিয়া। সাথে সাথে রিসিভ হয়ে গেলো। বিধ্বস্ত শাহাদকে দেখে ভেতরটা আঁৎকে উঠলো। মুখের ভাবটা স্বাভাবিক রেখে বললো,
– এভাবে শুয়ে পড়েছেন কেনো বাইরের পোশাক না পালটে?
– শক্তি নেই।
– মেয়েটাকে একবার দেখাও।
– ঘুমাচ্ছে।
– মেয়ের মুখের কাছে ফোনটা নাও। আমি দেখি।
দিয়া মেয়ের মুখের সামনে ফোন নিতেই শাহাদ ফোনে আলতো চুমু খেলো। দিয়াকে বললো,
– ঠিক আছে ঘুমিয়ে পড়ো। সুস্থ থেকো।
– খাবেন না?
কপালের কাছে হাত দিয়ে চোখ ঢেকে কথা বলছে। এত স্ট্রেস নেয়াতো ঠিক নয়। হাত না সরিয়ে উত্তর দিলো,
– এনার্জি নেই। রাখছি।
টুট টুট করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। না খেয়েই ঘুমিয়ে যাবে। এত আশা করে কেনো লোকটা? দিয়ার মাঝে মাঝে মনে হয় বুকের উপর মস্ত বড় পাহাড়। সবাই বলে মানুষটা ভুলে ভরা। সে তো জানে, মানুষটা মানুষই বটে, কোনো সুপার ন্যাচরাল বিং নয়। অবান্তর চাওয়া পাওয়া নেই তার। দিয়াও ঘাটাবেনা এসব। পরীক্ষা দেয়া জরুরি।
চট করে শোয়া থেকে উঠে আলমারির চতুর্থ তাকে হাত দিয়ে সব ধরনের ফাইল নামিয়ে নেয়। ঘাটাঘাটির এক পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে মন কিছুটা ভালো হয়ে গেলো। এইতো রেদোয়ানের দ্বিতীয় বিয়ের কাগজপত্রের কপি। সাথে সব ইনফরমেশন। ঘুমানো তো এখন হারাম হয়ে গিয়েছে। গায়ে টি-শার্ট চাপিয়ে মাথায় ক্যাপ পরে ঠোঁটের কোনায় কুটিল হাসি দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।
পড়ার টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়ে দিয়া। রুমে বাতি জ্বলছে। হঠাৎ বাইরে ধুপ করে কিছু একটা পড়ার আওয়াজ পেলো। কান সজাগ উঠে পড়লো। জানালা খুলে আশপাশ টা দেখলো কিছু দেখা যায় কিনা। দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ পেয়ে সাবধানে খুলেই দেখে চাচা।
– চাচা জান, ঘুমান নি?
– না মা, আপনি আর আমার নাতনী ঠিক আছেন?
– হ্যাঁ কেনো?
– একটা ছিঁচকে চোর এসেছিলো। তাড়িয়েছে জমির আর কাদের মিলে। রুমে ঢুকেছিলো?
– না না। কিছু একটা ধুপ করে পড়ার শব্দ কানে বাজলো।
– আচ্ছা ঘুমান, চোর নেই। কোনো সমস্যা হলে ফোন দিয়ে জানাবেন।
বেরিয়ে গেলো মঈন৷ দিয়া দরজা আটকে দিলো। পকেট থেকে ফোন বের করে কানে দিলো মঈন।
– হ্যালো জামাই।
– জ্বি চাচাজান, ঠিক আছে ওরা?
– হ্যাঁ ঠিক আছে। রুম পর্যন্ত যেতে পারেনি।
– ঠিক আছে, আপনার ভরসায় ওদের পাঠিয়েছি চাচাজান।
– ফি আমানিল্লাহ। চিন্তা করবেন না জামাই। আমি যতক্ষন আছি আমার মেয়ে নাতনীর কিছু হতে দিবোনা।
কথা বলতে বলতে নিচে গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় মঈন। ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গাট্টাগোট্টা লোকগুলোকে উদ্দেশ্য করে জানান দে যেন আর দ্বিতীয় ভুল না হয়। ছদ্মবেশে কেউ যেনো বাড়িতে প্রবেশ না করে। কল্পনা বেরিয়ে এলো বাবাকে দেখে। বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– বাবা নিরাপত্তা জোরদার করুন। দিয়ার যেন কোনো অসুবিধা না হয়। কিছু হলে দুলাভাইকে মুখ দেখাতে পারবেন না।
– ভেতরটা আপনি দেখেন আম্মা। আপনার আম্মাজান যেনো বুঝতে না পারে। এমনিতে বুকে সমস্যা টা বেড়েছে। দূর্বল হয়ে পড়বে।
– চিন্তা করবেন না আব্বা। ভেতরে আমি এবং রাখি আছি।
মঈন হাসি দিলো মেয়ের সাহস দেখে। এই বাড়ির মেয়ে গুলো সব কিছুতেই পারদর্শী। দেখলে মনে হয় কিছুই জানেনা। আত্মসম্মান এবং পরিবার রক্ষার্থে সব সময় প্রস্তুত। কল্পনা অন্দরে ঢুকে দেখলো রাখি নিচে বসে কি বানাচ্ছে। এগিয়ে এসে প্রশ্ন শুধালো,
– কি করছিস?
রাখি মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
– আপু এই তিনটা দা* ধার দিলাম। আসলেই কোপ। আর এখানে ব্লেড, অজ্ঞান করার ওষুধ।
– কে দিলো এসব তোকে? দুলাভাই ?
রাখি হাসে। আজকে অনেক বছর এই বাড়িতে কাজ করছে। শাহাদের আদেশেই এই বাড়িতে কাজ শুরু করেছিলো। এরপর মা মা*রা যাওয়ায় আর বাড়ির মায়া ছাড়িনি তাই যায় ও নি। কল্পনার কথা শুনে হেসে বললো,
– স্যার আমাকে সব শিখিয়ে দিয়েছে আপু। প্রথমে বুঝিনাই অফিসের সামান্য বুয়ার মেয়েকে কেনো এত ট্রেইনিং দিয়ে মার* কাট* শেখাচ্ছে। আবার নিজ থেকে বেতন দিয়ে আমার পড়াশোনার দায়ভার নিলো। এখানে আসার পর দিয়া আপুকে দেখেই বুঝেছিলাম হীরা সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে উনি আমার পড়ার দায়িত্ব, খাওয়ানোর দায়িত্ব নিলেন। আমি কি করে তার হীরার গায়ে আঁচড় লাগতে দিবো। আমাদের ভরসায় আবারো পাঠিয়েছে।
কল্পনা হাসে। রাখির মাথায় গাট্টা মে*রে বলে,
– দুলাভাই একেক টা যোদ্ধা বানিয়েছে সবাইকে। অথচ নিজে থেকেছে আড়ালে।
রাখি দাঁত দেখিয়ে খিলখিল করে হাসে। শাহাদ ইমরোজ সব জায়গায় সৈন্য নিয়োগ করে রেখেছে।
শাহীন ভিডিও কল দিয়েছে। ভাইজানের স্টাডিরুমে পাঠিয়েছে বোনকে। শিফা একা যেতে ভয় পায় দেখে শেফালীকে নিয়ে গেলো। এই রুমের একটা কর্ণার শাহীনকে দিয়েছে শাহাদ। শাহীনের নির্দেশ অনুযায়ী সেই ডাইরি খুঁজে বের করে একটা কোড বললো। এর মাঝে শেফালী বললো,
– ভাইয়া, বড় ভাইজানের এই রুমে কি আমি পড়ার মত বই পাবো?
শাহীন কিছুটা ভেবে বললো,
– পেতে পারিস কিন্তু ভাইজানকে না জানিয়ে ধরিস না। কোথায় কি আছে বলা যায়না। প্রয়োজনীয় কাগজ থাকতে পারে।
দুই ভাইবোন কথা বলছে। এর মাঝে শিফা রুমের কর্ণারে পর্দা সরিয়ে চকচক করা কাচের দরজা মত জিনিসটা দেখতে চাইলো। পর্দা সরাতেই একটা কাচের ডোর দেখলো। আগে তো কখনো ওভাবে খেয়াল করেনি। শেফালীকে ডাকলো,
– আপা দেখো?
ডাকতে ডাকতেই নব ঘুরালো ডোরের। আচমকা খুলে গেলো দরজা আর কর্ণারের প্রতিটি বাতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে উঠলো। শেফালী, শিফা আঁৎকে উঠলো। শিফা কাঁপতে কাঁপতে শেফালীকে আগলে ধরে বললো,
– আপা বাঁচাও। এগুলা কি?
শাহীন চেঁচাচ্ছে ও পাশ থেকে,
– কি ধরেছিস তোরা?
শেফালী ব্যাক ক্যামেরা ঘুরাতেই শাহীন হতচকিত হয়েও নিজেকে সামলে বললো,
– সর এখান থেকে,ভাইজান দেখলে তুলে আঁছাড় দিবে। এটা সমুদ্রের একটা প্রজেক্টের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো। দেখিসনা পুরোনো হয়েছে।
শিফা জিজ্ঞেস করলো,
– এত ভয়ংকর! ভাইয়া আগে দেখিনি কেনো?
– স্টাডি রুমে ঢুকার পারমিশন আছে তোদের? আর এই ডোর লক থাকতো। আজ হয়তো ভাইজান কোনো কাজে খুলেছিলো। খবরদার বের হ। ভাইজান আমার উপর রাগ করবে। দরজা লাগিয়ে দেয় আগের মত।
শেফালী কম্পনরত গলায় বললো,
– ভাইয়া কেমন যেন ওয়ালের ব্যাকগ্রাউন্ডটা মনে হচ্ছে প্রতিটা অক্টোপাস জীবন্ত। চোখের মাঝে লাইট জ্বলছে ওদের। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
– ধুর পাগলী। বের হয়ে যা বোন। ভাইজান জানলে আমাকে শেষ করে দিবে।
ওরা দুজন বেরিয়ে যাওয়ার পরই কল কেটে শাহীন ভাইজানকে কল করার চেষ্টা করছে। এ যেন মারাত্মক অপরাধ। সব দেখবে ক্যামেরায়। দুই বলদকে পাঠানোই ভুল হয়েছে। দোয়া দরুদ পড়ছে। বোনদের সাবধান করেছে এই কথা যেন বাইরে না বলে। একবার কথা বের হলে তিল তাল হয়ে যাবে। শাহাদ কল রিসিভ করেনি। কিন্তু ফোনে মেসেজ এলো,
সায়রে গর্জন পর্ব ৪০
– শাহীন ব্যস্ত আছি। কাজটা ঠিক হয়নি।
ব্যস এটুকুই শেষ। হানিমুনে পাঠিয়েছিলো শাহীনকে এসব থেকে দূরে থাকতে ওখানে গিয়ে ও গোয়েন্দা গিরি বন্ধ না করার কি শাস্তি হবে ভেবেই শাহীনের ঘাম ছুটে গিয়েছে । রুলস ব্রেক করা শাহাদ পছন্দ করেনা আর আজ তাই হলো। শনি ঘুরছে মাথায়। এই বিপদ থেকে রক্ষার জন্য সেজদায় দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো।
