Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৪২

সায়রে গর্জন পর্ব ৪২

সায়রে গর্জন পর্ব ৪২
নীতি জাহিদ

ভোরের আলো ফুটেছে। শেহজাকে খাইয়ে নামাজ পড়ে কিছুক্ষন ঘুমানোর জন্য খাটে গা এলিয়ে দিলো। সারা রাত চিন্তায় কে*টেছে। দরজা টা খোলা রেখেছে। কিছুটা আতঙ্ক মনের মাঝে বিরাজ করছে। পেটের উপর ভারী কিছুর উপস্থিতি বুঝে অতি সত্তর চোখ খুলে পেটের দিকে তাকায়। একটা বড় পুরুষালী হাত থেকে দেখে হতচকিত হয়ে চিৎকার দিতে ভুলে গিয়েছে। স্পন্দন এতটাই বেড়ে গিয়েছে মনে হচ্ছ এই বুঝি প্রাণভোমরা বেরিয়ে এলো। তোষকের নিচ থেকে ধা*রালো, সুক্ষ্ম ছাঁচ কা*টা ছু/রিটা বের করে ঘাড় ঘুরিয়ে উপস্থিত মানবের বুকে বসাতে যাবে এমন সময় ধপ করে চোখ খুলে ফেললো সামনের মানব।

পুরোপুরি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো মেয়েটা। ডান হাত চেপে ধরেছে মানুষটা। নিজেকে রক্ষা করলো উপস্থিত আক্রমণ থেকে এই মানব। থতমত খেয়ে মারাত্মক ভয় পেয়ে গেলো রমনী। সেই হ্যাজেল আই, অমসৃণ হাত। এক্ষুনি একটা অনর্থ হয়ে যেত। এই সুবিশাল দাদা সাহেবের গড়ে দেয়া খাটের একপাশে শেহজা ঘুমাচ্ছে অন্যপাশে ছোট্ট ছানার বাবা তার মাকে আগলে ধরে ঘুমুচ্ছিলো। অথচ মা বাবার উপর আক্রমণ করতে গিয়ে ধ*রা পড়ে যাবে এমন ঘটনা ভীষণ আশ্চর্যজনক । কি বি*ধ্বং*স অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যেত! শাহাদ পত্নীর অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা বিফলে গেলো। গড়িয়ে পড়া অশ্রু শাহাদের গালে পড়ছে টুপ টুপ করে। হেচকা টানে অর্ধাঙ্গীকে নিচে এনে উপরে উঠে গেলো শাহাদ ইমরোজ। ধীরে হাত থেকে ছু*রিটা সাবধানে সরিয়ে খাটের পাশের সাইড টেবিলে রেখে কপালে কপাল মিশিয়ে জোরে শ্বাস টানছে। রমনীর অক্ষিদ্বয় অস্তমিত। কি করতে যাচ্ছিলো!

– শান্ত হও শাহাদ বধূ।
স্বরটা কানে আসতেই ভেতর থেকে জোর বেগে কান্না পাচ্ছে। দমিয়ে রাখা কান্না চোখ বেয়ে পড়ছে বিগলিত অশ্রু সাজে। অন্যদিকে সর্দিতে নাক প্যাচ প্যাচ করছে। শাহাদ মুচকি হেসে খাটের বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে বউয়ের নাক চেপে ধরলো। শেহজার জন্য মাথার কাছে সবসময় টিস্যু রাখতে হয়৷ এভাবে নাক চেপে ধরাতে চোখ খুলে ললনা। বুঝতে চেষ্টা করে কি করছে লোকটা। আশ্চর্য! এমন অদ্ভুত কাজ কেউ করেছে কখনো? একটা টিস্যু ফেলে পুনরায় আরেকটা টিস্যু দিয়ে শাহাদ দিয়ার নাক মুছে বলে,
– যাচ্ছিলো তো প্রাণটা। সাদা থানে কেমন দেখাতো আমার হুরপরীকে?
আবার কেঁদে উঠলে শাহাদ বুকে চেপে ধরে। ধীরে বলে,
– আস্তে সোনা, মেয়ে উঠবে। ঠিক আছি তো আমি।
প্রায় মিনিট দশেক অতিক্রম হওয়ার পর বললো,

– বিশ্বাস করো তোমাদের ছাড়া ঘুমানো অসম্ভব। একটু তোমার বুকে ঘুমিয়ে চলে যাব। স্রেফ দুটো ঘন্টা। বড্ড প্রয়োজন ঘুমটা। এন্ড ইটস এনাফ ফর মি।
নিশ্চুপ দিয়া। শাহাদ বিনা বাক্য ব্যয়ে দিয়ার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে। দিয়া এখনো আতঙ্ক কা*টাতে পারছেনা। নিজের হাতে কত বড় পাপ করতে যাচ্ছিলো! আচমকা নাকের গোড়ায় ব্যাথা অনুভব করে শাহাদের দিকে চাইলো। শাহাদ নাকের গোড়ায় চুমু দিয়ে বললো,
– স্যরি বউ, আস্তে কা*মড় দিয়েছি। অন্যমনস্ক ছিলে তাই। চুলে বিলি কে*টে দাও না। একটু ঘুমিয়ে চলে যাব। অনেক কাজ বাকি।
দিয়া চুলে বিলি কা*টতে কা*টতে ভাবে মানুষটার ভেতরটা এখনো বাচ্চাদের মতো। সবার যত্ন করতে করতে নিজের যত্ন করাই ভুলে বসেছে। অথচ কেমন বাচ্চামি করছে এখন একটু আদর পেতে। অল্পতেই ঘুমিয়ে পড়লো মানুষটা। এলো কখন? রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে দরজা বন্ধ। নিজেও নিশ্চিন্তে চোখ বুজলো।

ঘড়িতে সাড়ে দশটা। শাহাদের ঘুম এখনো ভাঙেনি। দু ঘন্টা বলে চারঘন্টা একই জায়গায়। দিয়ার শরীর অবশ প্রায়। এত বড় ষন্ডাগন্ডা একটা মানুষ এই পাখির মত দিয়ার বুকে শুয়ে শরীরে ভর দিয়ে আছে। আচমকা দিয়া শেহজার দিকে চোখ যেতেই দেখে মেয়েটা উঠে হামাগুড়ি দিয়ে বাবার কাছে এলো। পিঠে আলতো থাবা দিচ্ছে, আদো আদো বুলি,
– বা বা। বাবা।
মেয়ের ডাক কানে বাজতেই শাহাদ ইমরোজের ঘুম ছুটে গেলো। মিষ্টি হেসে মেয়েকে এক হাতে আগলে নিয়ে জড়িয়ে ধরল। দিয়ার জান যায় যায় অবস্থা। বাপ- মেয়ের সব ভর তার শরীরে। অনেক কষ্টে বললো,
– কষ্ট হচ্ছে আমার…
চোখ ছোট করে শাহাদ সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে গড়িয়ে নেমে পড়লো বালিশে। শেহজাকে বুকের উপর বসিয়ে অভিযোগ করে বললো,

– দেখছো আম্মা,কিভাবে কথা বলে? এই টুকু তোমার মা।
আঙুলের একটু খানি মেয়েকে দেখিয়ে পুনরায় বলে,
– একদম এইটুকুন তোমার মা,আমাকে ধমক দেয় কিভাবে? যাবোনা আর তোমার ওই পঁচা মায়ের বুকে আমরা বাপ মেয়ে কেমন? চলো জঙ্গলে যেয়ে তুমি আমি বাস করবো। গাছের উপর একটা দোতলা বাড়ি বানাবো।
দিয়া ভেবে পায়না, কি সাংঘাতিক! জঙ্গলে যাবে মানে?
মাথা চুলকে শাহাদ আবার বলে,
– উঁহু… না না দোতলা বানানো কঠিন হবে জঙ্গলে। এক তলাই এনাফ। এক তলা বানিয়ে তুমি আমি থাকবো। মাঝে মাঝে জঙ্গলের নদী থেকে মাছ ধরবো, ফলমূল তুলব কেমন। চাইলে আমরা হরিণ ও খেতে পারবো। এরপর বাবা মেয়ের সুখের পরিবার। ঠিক আছে বাবা?
মেয়েটা কি বুঝলো আল্লাহ জানে, বাবার কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে,

– বাবা বাবা।
– এইতো সায় দিয়েছে আমার আদর,মিনি মিনি কুচি মুচি বারবি সিন্ড্রেলা জান বাচ্চা। উম্মাহ।
দিয়া চোখ বড় করে সব দেখে যাচ্ছে। মাথাটা মনে হয় গিয়েছে এই লোকের। কিসব আবোল তাবোল বকছে! উঠে গেলো শোয়া থেকে। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে কি করে এলো? তবে এখন না পরে। পা বাড়ালো বাইরে যাবার উদ্দেশ্যে। চলে যাবে এমন সময় গান ধরলো শাহাদ,
– সুন্দরী চলেছে একা পথে,সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে।
ইয়া আল্লাহ! কি সব বখাটে গান। কে বলবে এই লোক সেই ক্যাটকেটে শাহাদ ইমরোজ, এক্স লে. কামান্ডার। এমন চরিত্র গত কয়েক বছর ও দেখেনি। কিছুটা রেগে বললো,

– বখাটেপনা করছেন কেনো?
শাহাদ অবাক হওয়ার ভাণ করে বলে,
– আমি তো বখাটেই। গুন্ডা বলে সবাই জানোনা?
– কিহ!
– নাহলে ভোরে এসে এক আবেদনময়ী ললনার ব্যক্তিগত কামরায় ঢুকে তার উষ্ণ, মোলায়েম, কামুকতা পূর্ণ উদরে হাত রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর সাহস করতাম না।
– কমান্ডার সাহেব?
– জ্বি ম্যাডাম
– কথার এমন ছি রি কেনো? আমি আপনার বিবাহিতা স্ত্রী। অপরিচিত নারী নই।
– এক্সেক্টলি বেগম শাহাদ। এটাই বুঝাতে চাইলাম। আপনি মানেন তা? যদি মানেন তবে এমন দুচ্ছাই ব্যবহার কেনো এই অবলার প্রতি। একটু খানি আদরই তো চেয়েছিলাম। চলেই তো যাবো এখন। যান নাস্তার ব্যবস্থা করুন। আমাদের বাবা মেয়েকে খাইয়ে দিন।

– আপনার মাথায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।
– আমারো তাই মনে হয়। তবে শান্তি পাই এই ভেবে যে সমস্যাটা আমার একান্ত নারীটার জন্যই। কথা বাড়াবেন না। গো ফাস্ট। ডু হারি।
আবার মেয়েকে নিয়ে খেলা শুরু করে দিয়েছে। মেয়েকে কাতুকুতু দিয়ে হাসাচ্ছে। দিয়া স্তব্ধ হয়ে দেখছে এই কোন শাহাদ। মাঝে মাঝে ওর নিজেকে পাগল লাগে। অপরিচিত পুরুষ স্বামী হলো, ভালোবাসা দেয়া স্বামী টা ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিলো, অসুস্থতা কা*টিয়ে আসা মানুষটা ভালোবেসে বুকে আগলে নিলো, এখনের আচরণ সম্পূর্ণ নতুন। দুষ্টু বাচ্চামিতে মেতে উঠা প্রেমিক পুরুষ ।
মানুষটার আকস্মিক কথাগুলো দিয়ার ভাবনাচ্ছেদ ঘটায়,

– আমি খুব সুন্দর, জানি আমি; আমার হ্যাজেল আইয়ের প্রেমে অন্ধ নারী জাতি, শরীর থেকে মন মাতানো পারফিউমের ফ্র্যাগরেন্সে আমাকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে তাও বুঝি? হয়তো এলোমেলো চুমু খেতে ইচ্ছে করছে আপনার। থাক লজ্জ্বা পেতে হবেনা। দূর থেকে এভাবে না দেখে বললেই তো পারেন, শাহাদ আই নিড ইউ। ব্যস এতটুকুই এনাফ। বলতে দেরি শাহাদ ঝাঁপিয়ে পড়তে সেকেন্ড সময় নিবে না। আচ্ছা আচ্ছা বুঝতে পেরেছি- আকালমান্দ কি লিয়ে ইশারাই কাফি হ্যেয়। নো প্রবলেম আসছি…
বলেই খাট থেকে নেমে যাবে এমন সময় দিয়া দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। পাগলটা আবার নতুন কি পাগলামী করবে আল্লাহই জানে। দরজা থেকে বের হয়েই দিয়া হাসির শব্দ শুনতে পেলো ভেতরে। নিশ্চিত ভেতরে মেয়ের সাথে তাকে নিয়ে তামাশা করছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো তার।

মঈনের সাথে কথা বলছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। শাহাদের এ স্বাভাবিকতা মঈনকে ভাবাচ্ছে। গত রাতে বাইক চালিয়ে উড়ে এসেছে, যখন শুনেছে বাড়িতে সন্দেহজনক গুপ্তচর ধরা পড়েছে। এভাবে এসে পড়বে মঈন ভাবতে পারেনি। স্ত্রী সন্তানের প্রতি তৎপরতা দেখে মঈন মন থেকে দোয়া দিচ্ছে, আজ ভাই বেঁচে থাকলে মেয়ের সুখে থাকার চিত্র দেখলে খুব খুশি হতেন। তাকিয়ে দেখছে কিভাবে এত যত্ন করে একজন বাবা মেয়েকে কোলে নিয়ে রুটি খাচ্ছে। বাবারা যেমনই হোক, যত দায়িত্বই থাকুক সন্তানের মায়া পৃথিবীর সব কিছুর কাছে তুচ্ছ। শেহজা হাত বাড়াচ্ছে বাবার টা খাবে। মধুতে চুবিয়ে হালকা মেয়েকে দিচ্ছে মেয়ে তা খাবেনা। মেয়ের জন্য করা সুজির পায়েস ও মুখ দিতেই ভুশ করে ফেলে দিচ্ছে। মাংসের ঝোল চুবানো রুটি তো এই মেয়ে খেতে পারবেনা,তবুও আগ্রহ! শাহাদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

– আম্মা, এভাবে সব ফেলছেন কেনো? এটা আপনি খেতে পারবেন না।
দিয়া আড়াল থেকে দেখছে। পর্দা সরিয়ে খাবার ঘরে ঢুকে শাহাদের মাংসের বাটিতে একটু খানি রুটি চুবিয়ে শেহজার মুখে ঢুকিয়ে দিলো। শাহাদ হন্তদন্ত করে শেহজাকে সরানোর আগেই কাজটা হয়ে গেলো। যেই না মুখে রুটি দিলো, মেয়েটা ঝালে চোখ মুখ কুচকে ফেললো। ক্রোধান্বিত চক্ষে দিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো শাহাদ,
– এমন কেনো করলে?
সাথে সাথে মেয়েটা চিৎকার দিয়ে উঠলো। পানি খাওয়াতে ব্যস্ত সবাই। মধু লাগিয়ে দিচ্ছে। শাহাদ কোলে নিয়ে হাঁটছে। মঈনও একটু রাগ করলো। কল্পনা,তমা ছুটে এলো। তমা শাহাদের কোল থেকে নাত্নীকে নিয়ে দিয়াকে বকা শুরু করলো,

– এটা কি করলি মেয়ে, আমার বোনটারে কাঁদায় দিলি। পাজি মেয়ে। আহারে বাচ্চাটা। এভাবে ঝাল লাগালি। তুই কেমন মা?
শাহাদ দিয়ার দিকে তাকিয়ে তমার দিকে লক্ষ্য করলো। তমা তখন থেকে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। শেহজার কান্না থামছেই না। শাহাদ কোলে নিলো পুনরায় মেয়েকে। নিজের রাগটা বাচ্চাটার উপরই উঠিয়ে নিলো এই মেয়ে। খাবার নষ্ট করা অত্যন্ত অপছন্দের কাজ। বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে মেয়েটা হেচকি তুলছে। খাবার শেষ করে মেয়েকে নিয়ে রুমের দিকে যাওয়ার আগে দিয়াকে ডেকে নিলো। মঈন তমাকে চোখ দিয়ে আশ্বাস দিলো, শাহাদ সব গুছিয়ে নিবে। দিয়া পিছু পিছু এলো। রাখি আরেক প্লেট খাবার রেখে গেলো রুমে দিয়ার জন্য, শাহাদের নির্দেশ। খাটের উপর মেয়েকে বসিয়ে দিলো খেলনা দিয়ে। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বজ্রনজর ছুড়লো।
দু কাঁধ ধরে জোরে ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

– কি সমস্যা তোমার এমন করছো কেনো? আমার আসাটাই কি এমন আচরণের কারণ?
দিয়া চেঁচিয়ে উঠলো,
– কেনো আসবেন আপনি? একদম কাছে আসবেন না আমার আর আমার মেয়ে। আলগা পিরিত দেখান।
শাহাদ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো?
– আলগা পিরিত? এ্যই মেয়ে কিসের আলগা পিরিত। আমি আমার মেয়েকে নিজের প্রান ভাবি এটা আলগা পিরিত? সহধর্মিণীকে নিজের অর্ধেক ভাবি এটা আলগা পিরিত? কোন সাহসে তুমি আমার ভালোবাসাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করো?
– একশ বার করবো। হাজার বার করবো। যে মানুষটা আমাকে কষ্ট দেয় তাকে আমি নিজের মেনে নিতে পারিনা।
– আগের কষ্টের জন্য পা জড়িয়ে ধরে মাফ চেয়েছি। স্বামী হিসেবে নত হয়েছি আর কি করবো?
– আপনি কেনো জেনেও আমাকে বলেন নি, আম্মিজান, বাবাজানের হ/ত্যাকারী আপনার চাচা?
চমকে উঠলো শাহাদ। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। এই সংবাদ জানা মোটেও উচিত হয়নি এই মেয়ের। দিয়া ক্ষেপে শাহাদকে দু হাতে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো পুনরায় চেঁচালো,

– দেখিয়ে দিলেন তো আসল রূপ। প্রশ্নটা যখন চাচাকে নিয়ে তখন উত্তর নেই। আপনারা সবাই এক গোয়ালের গরু…
– এক চ*ড় দিব বেয়াদপ। যা নয় তা বলে যাচ্ছো। আদর করে কি মাথায় তুলে ফেলেছি? যা জানো না তা নিয়ে কথা বলবেনা। তোমার জন্য আদর আসেনি।
রাগে গজ গজ করতে করতে বের হয়ে গেলো বাড়ি থেকে। বাড়ির সবাই উৎকন্ঠিত শাহাদকে এভাবে বের হতে দেখে। কেউ প্রশ্ন করেনি ভীতিতে।

শাহাদের নির্দেশে আজ পাভেল এবং তানভীর সুলতানা মঞ্জিলে পা দিয়েছে। শিফা কোচিং থেকে এসে পাভেলকে দেখে মহা খুশি। পাভেল সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সুলতানা কবির এবং রায়হান সাহেবের সাথে কথা বলছে। সুলতানা কবির রাগ করেছেন পাভেলের উপর। এভাবে না জানিয়ে চিলেকোঠা ছেড়ে দেয়াটা উনার পছন্দ হয়নি। কখনোই শাহীন, শাহাদের মত ছেলে ব্যতীত অন্য কিছু ভাবেন নি। আজ তাই খাবার টেবিলে সকলের সামনেই বললেন,
– জানি তো কাজে এসেছো। যাওয়ার পর থেকে এই বাড়িতে একটা মা আছে ভুলেই গেছো।
পাভেল মৃদু হেসে বললো,
– ও খালামনি, এমন রাগ করবেন না। আসলে কাজটা এত জরুরি যে আমাকে ফ্ল্যাটে শিফট করতে হয়েছে বসের আদেশে।
– তোমাদের ওই বস তোমাদের জীবনটা ঝালাপালা করে দিলো। একটুকু শান্তি পায়না ছেলেগুলো। আজকে তুমি একটু কিছু বলবে বাবুর বাবা। বাবুকে বলবে আমার কষ্ট হয়। এতটা বছর ছেলেটা আমার আঁচলের ছায়ায় ছিলো অথচ এখন হুট করে চলে গেলো। কি খায় না খায়।
পাভেল নিরব। এই খালামনিটা আগলে রেখেছে আজ প্রায় অনেক বছর। রক্তের সম্পর্কের কিছুই না। অথচ মা মারা যাওয়ার পর সুরাইয়াকে নিয়ে এতিম খানায় থাকতে হয়েছিলো। বাবার দ্বিতীয় বিয়ে ছিলো এর কারণ। শাহীন,নোমান বন্ধু হলো। এই বাড়িতে আসা যাওয়া হলো, ভাইজানের শাসনে বড় হলো এরপর বসের ভূমিকায় সকল রকমের দায়িত্ব কাঁধে নেয়া মানুষটার হুকুম অগ্রাহ্য করতে পারেনি পাভেল। অন্যমনস্ক পাভেলকে শিফা ডেকে বললো,

– আরেকটু ভাত দি?
পাভেল খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে উঠে যাবে তখনই শিফার এমন প্রস্তাব। উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– না আমার খাওয়া শেষ।
তানভীর সহ বেরিয়ে গেলো কাজ শেষ করে। প্রচন্ডভাবে মন খারাপ নিয়ে মেয়েটা নিজেই খেলো না। আড়ালে সব খেয়াল রাখলো একজন। তানভীর পুরো সময়টা স্তব্ধ ছিলো। বাইকে চেপে বসলো পাভেলের পেছনে। একটাই কথা বললো,
– পাভেল ভাই, শাহাদ স্যার ডেঞ্জারাস।
পাভেল বাইক স্টার্ট দিয়ে বললো,
– প্রতিটি মানুষ ই ডেঞ্জারাস। কারোটা বেরিয়ে আসে কারো টা লুকানো থাকে। স্যারের রূপ টা ভয়াবহ। তবে সেটা বিলুপ্ত। রাশেদ স্যারকে কথা দিয়েছিলো তাই ছেড়ে দিয়েছে এসব।
– রাশেদ স্যার জানতো?

– হুম সব। অক্টোপাসের আন্ডারেই ‘সিক্স স্পাইডার’ কাজ করতো। আমি, শাহীন এবং নোমান ‘সিক্স স্পাইডার’ এর সর্ব কনিষ্ট সদস্য ছিলাম। হারিয়ে ফেলেছি আমাদের চিফদের। মেজর মাহফুজ আলম, কমান্ডার দূর্জয় শফিক এবং লে. কমান্ডার রাশেদ আবেদীন। তিনজনই আগে পরে হারিয়ে যায়। যেদিন মাহফুজ স্যার মা/রা যায় সেদিন ও অক্টোপাস প্রতিজ্ঞা করেছিলো এই খুনের প্রতিশোধ নেয়া হবে। কিন্তু দূর্নীতির জন্য পারেনি, আমাদের পুরো সেক্টর করাপ্টেড। এরপর হা/রালাম দূর্জয় স্যারকে। শেষ বার হামলা হয় শাহাদ স্যারের উপর। সেবারই রাশেদ স্যার থামিয়ে দেয় অক্টোপাস সহ পুরো টিমকে।
– কে করেছিলো এসব।
কিছুটা থেমে নিশ্চুপ হয়ে রইলো পাভেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

– এক্স প্রাইম মিনিষ্টার নিজেই। ফরিদ রেজার উপর স্যারের এত ক্ষোভের একটাই কারণ ফরিদ রেজা জানতো অনেক সিক্রেট। সেই আঘাত হে*নেছিলো অফিসারদের উপর। শাহাদ স্যারকে যেদিন ফাঁসাতে চেয়েছিলো সেদিন রাশেদ স্যার ফেঁসে যায়। পরিস্থিতি নিজেদের মত সাজিয়ে কেড়ে নেয় রাশেদ স্যারের মত মানুষটাকে। বাধ্য করে তাকে এমনভাবে জীবন শেষ করতে।
তানভীর মুচকি হেসে বলে,
– সব ছারখার করে দিলো এই শ/য়তান।
– আরো অনেক কাহিনী সে নাহয় পরে বলব। আপাতত এই শান্তি যে অক্টোপাসের সিক্রেট মিটিয়ে দিয়েছি।
– ফরিদ রেজা যদি ফাঁস করে।
হো হো করে হেসে উঠলো পাভেল। হাসি থামিয়ে বলে,

সায়রে গর্জন পর্ব ৪১

– ও তো পাগল এখন। জেলে বসে নিজের এইডস এর টেস্ট করায় নাকি সপ্তাহে তিনদিন। সে নাকি জানে তার অন্য রোগ হয়েছে। এইডস বলে ভয় লাগাচ্ছে সবাই। আরেকটা কথা সে নিজেই জানেনা অক্টোপাস কে? কিছু সিক্রেট জানতো। আর এসব বললে কোন পাগল বিশ্বাস করবে? বস এতো বোকা নয়। যা ভুল করার প্রথমে করেছিলো পরে সাবধান হয়ে যায়। চিফদের মে*রেছে কারণ অনেক রাষ্ট্রীয় তথ্য চিফদের কাছে ছিলো। এখনো সেসব তথ্য বসের কাছে আছে। তবে সময় মত রিভিল করবে হয়তো। এখন অক্টোপাসের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অনেক আগেই মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে।
বাইক স্টার্ট হলো। শাহাদের রুম থেকে নিশ্চিহ্ন হলো অক্টোপাস। এই ব্যাপারে সব রকমের কৌতুহলের ইতি এখানে টানা হলো।

সায়রে গর্জন পর্ব ৪৩