সায়রে গর্জন পর্ব ৫৩
নীতি জাহিদ
বালুঘড়ির বালুকনার মতো গড়িয়ে পড়েছে সময়ে
কাঁ/টা। সময়ের সাথে স্রোতের পাল্লা দিয়ে চলা যেন প্রকৃতির এক অপার মহিমা। সপ্তাহ পেরিয়ে এলো বলে। প্যাকিং চলছে সুলতানা মঞ্জিলে। সমুদ্র অভিযানের, পরবর্তীতে কোনো এক দ্বীপের হদিসে যাচ্ছে শাহাদ-দিয়া জুটি। যে দ্বীপের নাম খুব কম মানুষের জানা, যার পাড়ি দিতে ভ্রমনপিপাসুদের শত দিনের আকাঙ্ক্ষা তার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হবে আগামীকাল ভোরে। ট্রাভেল ব্যাগে সব গুছানো শেষ। লিভিং রুমের সোফাতে বসে আছে শাহাদ পরিবার। আবিরকে বর্ণনা দিচ্ছে গ্যালাপাগোসের। জানিয়েছে আরেকটু বড় হলে আবিরকে নিয়ে যাবে। আবির মনোযোগ দিয়ে শুনছে বড় মামার গল্প। এই সেই প্রশ্নের ঝুলি নিয়ে বসেছে মামার কাছে।
আবির প্রশ্ন করলো,
– মামা আপনি তো চলে আসবেন, আবার তো অনেক পরে যাবেন। তাহলে আমি সাগর দেখবো কিভাবে? আমাকে কখন সাগরে নিয়ে যাবেন?
বোনের ছেলেটাকে কাছে টেনে বললো,
– তোমাকে সমুদ্রে নিয়ে যাবো মামা। এখন তো মা যাবেনা তাই তোমাকে নিতে পারছিনা।
শেফালীকে গুটি কয়েকবার প্রশ্ন করেছিলো যাবে কিনা, উত্তরে প্রতিবার জানিয়েছে এখন যাবেনা। মা ছাড়া আবিরকে নেয়াটাও বোকামী। আবির ছোট না হলে সাথে করেই নিয়ে যেতো। পরিকল্পনা মোতাবেক সব ঠিক থাকলে আবিরসহ পাড়ি দিবে ভবিষ্যতে।
রাতের খাবার শেষ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে শাহাদ দম্পতি। কামরাতে টুকটাক শেহজার কাপড় গুছাচ্ছে দিয়া। শাহাদ মেয়েকে নিয়ে খেলতে খেলতে প্রশ্ন করলো,
– ফারাহ্ তুমি কি পেঙ্গুইন ভয় পাও?
ঘাড় ঘুরিয়ে স্বামীর দিকে চেয়ে বললো,
– দেখিনি তো কখনো। নিশ্চিত ভয় পাবো। এমন প্রশ্ন কেনো করেছেন?
– না এমনি। গ্যালাপাগোসে পেঙ্গুইন থাকতে পারে তাই।
– দ্বীপ যেহেতু থাকতেই পারে। কিন্তু ওগুলো তো সমুদ্রে থাকবে, থোড়াই আমার কাছে আসবে?
শাহাদ ঠোঁট টিপে হেসে বলে,
– তা ঠিক। ভয় পাওয়ার মত কিছু নেই। এমনি জিজ্ঞেস করলাম দূর থেকে ভয় পাবে কিনা আবার তাই।
– ওহ।
পুনরায় দিয়া গোছগাছ শুরু করেছে। এদিকে শাহাদ আপন মনে হাসছে। এমন একটি জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে যার সম্পর্কে প্রেয়সীর ধারণা টুকু নেই। কি যে হবে এই মেয়ের!
সকালেই উড়জাহাজ যোগে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছেছে। সেখান থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর। শিপে উঠতেই নতুন পরিবেশের মুখোমুখি হলো দিয়া। এ যেন ফুলেল অভ্যর্থনা চারিপাশে। বিয়ের সানাই হয়তো এভাবে বাজেনি তবে পূর্ণ আয়োজন ও শুভেচ্ছায় ভাসিয়ে নিলো নেভির প্রতিটি সদস্য এই দম্পতিকে। নেভির সাবেক লে. কমান্ডারের জন্য এভাবে আয়োজন করবে দিয়ার ধারণা ছিলোনা। স্যালুটে অভ্যর্থনায় বরন করে নিয়েছে শাহাদ ইমরোজকে। কিছুক্ষন হলো শিপের কেবিনে এসেছে। দিয়াকে রেস্ট করতে দিয়ে শাহাদ মেয়েকে নিয়ে বের হয়েছে। সকলের আদরের মধ্যমনি হয়ে আছে শেহজা। সময় পেরিয়ে গেলো টেরই পেলো না দিয়া। সাগরের মাঝখানে এসে কেবিনের ভেতর বুঝতেই পারছেনা দিন কি রাত! টানা অনেকক্ষন ঘুমে থাকার কারণে শরীর ম্যাজম্যাজ করছে। সমুদ্রে নেটওয়ার্ক নেই বলতে গেলে। কেবিনের ইন্টারকম ব্যবহার করতে বলেছে শাহাদ। ইন্টারকমে ফোন দিতেই ও পাশ থেকে অন্যকেউ রিসিভ করলো, দিয়া জানিয়ে দিলো শাহাদকে প্রয়োজন।
ওয়াশরুমে থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হতেই কেবিনের দরজায় কড়া নাড়লো শাহাদ। একেকটা শিপ পুরো একটা ছোট কলোনীর মত, যার মাঝে বেশ কিছু এপার্টমেন্ট, বাড়ি থাকতে পারে। দিয়ার কেবিন ও ভীষণ লাক্সারিয়াস। শাহাদ মেয়েকে নিয়ে ঢুকে বেডে বসে বললো,
– নাস্তা এখনো নেয়া হয়নি কেনো? বেশ আগে পাঠিয়েছি।
– ফ্রেশ হয়ে মাত্র বের হলাম। মাথা ব্যাথা কমছেনা।
– তাহলে রেস্ট নাও আর কিছুক্ষন। মেডিসিন নেয়ার প্রয়োজন নেই। রেসিস্টেন্স হয়ে যাবে। মেয়েকে খাইয়ে দাও। আমার গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ পড়েছে।ওটা সেরে এসে তোমাদের আকাশের তারা দেখাবো। ছানাটার চোখে ঘুম মনে হয়। কেমন করছে চোখ দুটো তাকিয়ে দেখো?
– ঠিক আছে আমি দেখছি। আপনি কাজ সেরে আসুন। এরপর বের হবো।
শাহাদ সম্মতি দিয়ে বেরিয়ে এলো। ভেতরে স্ত্রী কন্যাকে রেখে এলো। ত্রস্ত পায়ে হেঁটে চলেছে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করতে। শিপের প্রতিটি মানুষ জানে আজকের সভা ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপনীয়, যতটা হলে আজ তাদের শিপে জয়েন করেছে ভাইস এডমিরাল মানিক মোজাম্মেল স্বয়ং। সচরাচর কোনো র্যাঙ্ক বা বড় একাডেমিক অনুষ্ঠানে তিনি আসেন। অথচ আমেরিকা যাওয়ার শিপে তার কাজ কি! আদৌ জানেনা বাকি সদস্যরা।
বিশেষ সজ্জিত কামরায় এসে উপস্থিত শাহাদ। দুজন অফিসার স্যালুট জানালো। মুচকি হেসে ভেতরে প্রবেশ করলো। চেয়ারে বসে আছে মানিক মোজাম্মেল। স্যালুট জানালো শাহাদ। লে. কমান্ডারকে দেখে কিঞ্চিত হেসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পাশে বসিয়ে সবার খোঁজ জানতে চাইলেন। স্ত্রী- কন্যাকে দেখা করাবে জানালো শাহাদ। উষ্ণ আলাপচারিতার মাঝে মানিক সাহেব প্রশ্ন করলেন,
– তোমার নামে বিশেষ লেটার এসেছে লে. কমান্ডার। এখন রিসিভ করবে?
– না স্যার।
– পেপার রেডি করা হয়েছে?
– সব তৈরি আছে। সময় অনুযায়ী সাবমিট হবে।
– তোমার ফিরতে তো বেশ কিছুদিন লাগবে তাই না?
– জ্বি স্যার।
দেশ পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মাঝে বিষদ আলোচনা নিয়ে বসেছে দুজন। সাউন্ডপ্রুফ কামরার আলোচনা বাইরে যাবেনা। মানিক মোজাম্মেলের শিপে আসা নিয়ে ফিসফিস আলোচনা হচ্ছিলো অফিসারদের মাঝে। দু দুজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা শিপে তাই সকলে ভীত সন্ত্রস্ত। একজন নেভি প্রধান, তো অন্য জন নেভির প্রাক্তন ইউনিট প্রধান। সামান্য ভুল করলেই দুজনের একজনও বরদাস্ত করেনা।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। স্ত্রী- কন্যাকে নিয়ে শিপের ছাদে। আকাশের তারা দেখছে তিনজন। শেহজা ছটফট করছে। শাহাদ বুঝতে পারছে মেয়ের মনের অবস্থা। একটু বেড়ে উঠার পর এমন সুবিশাল সমুদ্র কখনো দেখেনি তাই হয়তো উত্তেজিত। মেয়েকে কোলে নিয়ে হেঁটে দিয়াকে বললো,
– ফারাহ্ মেয়ে তো এখনই ছটফট করছে পরে কি করবে?
– আপনার মেয়ে না?
শাহাদ খানিকটা হতবাক। তার মেয়ে বলে কি অপমান করলো! চেহারা মলিন হলো। প্রশ্ন করা চাহনীতে তাকালো স্বীয় স্ত্রীর পানে। দিয়া অধর প্রসারিত করে জবাব দিলো,
– রক্তের টান বুঝেন? সমুদ্র দেখলে আপনি ঝাঁপিয়ে পড়েন, সমুদ্রকে নিজের বাড়ি বলেন আর এই মেয়ে কি করে শান্ত থাকবে? শান্ত থাকা যায়! অশান্ত সাগরমাতাকে দেখে বুঝান দেখি আমায়?
স্বস্তির শ্বাস শাহাদের। যাক, স্ত্রী অপমান তো করেনি। মৃদু হাসি ঠোঁটের কোনে। শেহজাকে তারা দেখাতে দেখাতে দিয়াকে বললো,
– আমরা কেনো সমুদ্রে পথে যাচ্ছি জানো ফারাহ্?
দিয়া দুপাশে মাথা নাড়লো।
শাহাদ স্বাভাবিক গলায় বললো,
– তোমাদের তারা দেখাতে। ভূপৃষ্ঠে আমরা মাটি এবং পানি উভয় উপাদানই পাই। মাটির মোটামুটি সঠিক ব্যবহার হলেও পানি দূষিত এরপরও পানির অভাব হয়না। বেঁচে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি আলো। দিনের আলোতে সূর্য আমাদের সাহায্য করে রাতের জন্য আমরা ব্যবহার করি কৃত্রিম আলো। টমাস আলভা এডিসন সর্বপ্রথম ১৮৮০ সালে বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেন। আমরা কবিতায় পড়েছি একবার না পারিলে দেখো শতবার, সেদিক থেকে এডিসন একবার না পারিলে দেখিবে সহস্রবার পণ নিয়ে নেমেছিলো গবেষণায় এবং সে সফল। নয়শত নিরানব্বই বার ব্যর্থ হওয়ার পর হাজার বারে সফলতা কেড়ে নিলো। এখন প্রশ্ন হলো, ১৮৮০ সালের আগে মানুষ কি করতো? আলো কি ছিলোনা? উত্তর হলো, অবশ্যই ছিলো। তখন মানুষ রাতের আকাশে তারা দেখতো, চাঁদের ফকফকা জোৎস্না ছিলো, কুপি ছিলো,হারিকেন ছিলো। তাহলে এখন আমরা রাতের আকাশে তারা এত স্বল্প কেনো দেখি? তুমি উত্তর দাও তো?
দিয়া ঠোঁট উলটে বলে,
– আপনার মত এত গবেষণা করি নাকি তারা দেখার সময়। দেখার দরকার দেখেছি।
– করতে হবে ফারাহ্। এটা গবেষণা নয়। জানতে হবে। না হলে অদেখাকে দেখার,অজানাকে জানার মজা পাবেনা তো। আচ্ছা শোনো তবে, আমরা কেনো স্থলভাগের আকাশে এখন তারা কম দেখি? অথচ সমুদ্র পৃষ্টের আকাশটা দেখো কত সুন্দর জ্বলজ্বল করছে? এর কারণ হলো আমরা আলো দূষণ থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছি। স্থলভাগের আলোর ছিটেফোঁটা ও নেই জলভাগে। স্থলভাগের কৃত্রিম আলোর জন্য রাতের আকাশে তারাদের অনুজ্জ্বল দেখা যায় তাই আমরা তারা কম দেখি। মাঝে মাঝে রাতের তারাদের স্টার প্যাটার্ন দেখা যায়। বিভিন্ন আকৃতি তৈরি করে তারারা একত্রিত হয়ে। সেই স্টার প্যাটার্নকে বলে কনস্টিলেশন। এরা একধনের ইমাজিনারি শেপ তৈরি করে আকাশে। আরো মজার ব্যাপার কি জানো? তাদের প্যাটার্নের আবার নাম ও আছে এই ধরো ওরিয়ন, প্যাগাসাস,লিও সহ আরো অনেক। কোনোটি দেখতে শিকারীর মতো,কোনোটি দেখতে ঘোড়ার মতো যেমন তোমার কোহিনূর, আবার কোনোটি সিংহের মতো। সুন্দর না?
শাহাদ কথা থামিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালো। দিয়া হাঁ করে তাকিয়ে আছে,মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে মেয়ে ও বাবার দিকে তাকিয়ে। বিব্রত বোধ করে বললো,
– ভুল কিছু বললাম?
দিয়া মুখ বন্ধ করে বলে,
– মাস্টার মশাই এইজন্য আপনাকে শিফা ভয় পায়। নাহয় ওই দস্যি মেয়ে কাউকে ভয় পায় না, আপনাকে কেনো পায়? সেদিন জিজ্ঞেস করলাম তুমি তোমার ভাইজানকে দেখলে ছুটে পড়ার টেবিলে কেনো আসো? উত্তরে জানালো, ভাইজানের প্রশ্নের বান থেকে বাঁচার জন্য। পড়ার টেবিলে দেখলে প্রশ্ন করবেনা।
শাহাদ কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললো,
– স্যরি, বুঝতে পারিনি।
হেঁটে মেয়েকে কোলে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো। সমুদ্রের গর্জন জোরালোভাবে কানে আসছে। মাঝে মাঝে শিপ নড়ে উঠে। রাতের দিকে নাকি সমুদ্র উত্তাল থাকে। স্রোত গুলো আঁচড়ে পড়ছে। এ যেন সর্বনাশা সমুদ্রের মোহনীয় রূপ। শাহাদের মন খারাপের আভাস।
দিয়ার কথা শুনেই আচমকা মন খারাপ হলো মানুষটার। তবে প্রতিটি কথা দিয়া মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। এত সুন্দর করে গুছিয়ে বলেছে শুনতেই ভালো লাগছিলো। কিন্তু সব ভুলে গিয়েছে। এত তথ্য একসাথে মনে রাখা তো যায়না। স্বামীর সামনে এসে কোমড় পেঁচিয়ে ধরলো। আহ্লাদী গলায় বললো,
– ওগো আমার শ্যামসুন্দর, রাগ করেছেন বুঝি? রাগ করলে আপনার রুপসী বধূর যে কষ্ট হয় তা কি বুঝেন না?
অদ্ভুত সম্বোধনে শাহাদ হেসেই ফেললো। এই হাসি যেন সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট হাসি। মানুষটা পুরো বদন একসাথে হাসছে। চোখ জোড়া বড় হয়ে গেলো। অধর কোণে হাসি সরছেই না। শেহজাও হাসছে বাবার হাসি দেখে। হাসতেই হাসতেই শাহাদ বললো,
– এই প্রথম কেউ এমন সাহিত্যিক সম্বোধন করলো। বেশ সুন্দর না না অত্যাধিক সৌন্দর্য্যবোধক শব্দ। আমি আপ্লুত, পুলকিত,আনন্দিত।
– আমিও প্রফুল্লিত,উৎফুল্ল, প্রসন্ন আপনাকে আনন্দ দিতে পেরে।
– কে যেন একটু আগে বললো, আমি শুধু পড়াই, এখন যে তিনি নিজেই সব সাহিত্য রস ঢেলে কথা বলছে তার বেলায়?
– আপনার সাথে পাল্লা দেয়ার চেষ্টা।
– কতদূর পারলেন?
দিয়া দূরত্ব হাতের ইঙ্গিত দিয়ে বুঝিয়ে বললো,
– দিল্লী আভি ভি বহত দূর…
হেসে উঠলো মানুষটা। বউটা ভীষণ আদুরে। মাঝে মাঝে এমন সব দুষ্টুমিতে মেতে উঠে মন খারাপের সময় টুকু হয় না। তবে এবার গুরুত্ব নিয়ে বললো,
– তবে দুঃখিত রূপসী বধূ, ঘুরতে এনে পড়ানো শুরু করেছি। ব্যাপারটা বিচ্ছিরি।
– না আমি এঞ্জয় করেছি তো। আচ্ছা শুনুন। আমরা কি আকাশে এখন সিংহ দেখবো?
শাহাদ প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে একপেশে হাসি দিয়ে বললো,
– অভিনয় করতে হবেনা আর। সিংহ দেখা লাগবেনা। সিংহ কি বসে আছে, যে কখন ফারাহ্ তাকে চাইবে আর সে প্রজ্জ্বলিত হবে? তারা দেখবে নাকি ভেতরে যাবে?
দিয়া হাই তুলে বলে,
– সত্যি বলি?
– হুম।
– খিদে পেয়েছে।
– চলো খাবে।
রাতের খাবার শেষ করেছে বাবা মেয়ে। মেয়েকে খাওয়ানো শেষ করে দুজন খেতে বসেছিলো। শাহাদের খাবার শেষ দিয়া তখনো খেয়েই যাচ্ছে। এত ধীরে খাচ্ছে শাহাদ ভ্রু কুঁচকে পড়ার মাঝে মাঝে খাওয়া দেখছে। হাতে একটা বই নিয়ে বসলো। সমুদ্রের গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। সাগর উত্তাল। থেমে থেমে নড়ে উঠছে। মাঝে মাঝে আলোকছটা দিচ্ছে। শেহজা ঘুমিয়েছে। দিয়া ঘাবড়ে গিয়ে বললো,
– কমান্ডার সাহেব ঝড় উঠবে?
শাহাদ হাতের বই সরিয়ে বলে,
– তাড়াতাড়ি খাও, দেরি করে খেলে উঠবে।
কি বুঝে মেয়েটা গপাগপ খাবার গিলে ফেললো। ওর খাওয়ার স্পিড দেখে শাহাদ তাজ্জব বনে গেলো। মনে মনে ভাবলো, কি বাজে একটা হুমকি দিলাম,যার কোনো ভিত্তি নেই। অথচ এই মেয়ে তা বিশ্বাস করে কেমন খাবার গিলছে। এরই মাঝে দিয়া খাবার শেষ করে শাহাদের পাশে এসে বসলো। শাহাদ দিয়ার মতি গতি বুঝার চেষ্টা করছে। দিয়া এদিকে সেদিক ফিরে কেমন করে বললো,
– খেয়েছি তো? এমন করছে কেনো তাহলে আকাশ?
শাহাদ বোকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
– কিহ? তুমি আমার কথা বিশ্বাস করলে?
দিয়া আচানক গাল ফুলিয়ে মৃদু চিৎকার দিয়ে বলে,
– আপনি মাইন্ড গেম খেলেছেন কেনো? আমি তো ভয়ে আপনার অযৌক্তিক কথাকে ও সত্য মেনে গিলে ফেললাম।
এর মাঝে সমুদ্রের গর্জন দ্বিগুন হলো। দিয়ার মুখ খানা এমন হলো যে কেঁদেই দিবে। শাহাদ হেসে বললো,
– ম্যাডাম একটু জানালাটা খুলুন। বাতাসটা প্রচন্ড ঠান্ডা আর শিহরণ জাগানো।
চেঁচিয়ে উঠলো দিয়া,
– পাগলে কামড়েছে আমাকে। বাইরে কি অবস্থা। আপনাকে কে বলেছে আমাদের মাঝ সমুদ্রে এনে মজা করতে। কি হবে আমার মেয়েটার। শিপটা এমন নড়ছে কেনো?
শাহাদ শান্ত। প্রথমবার বলেই দিয়ার মনে এত ভয়। এ তো সমুদ্রের সাধারণ নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। পূর্ণ মনোযোগ দিলো বইতে। দিয়া কম্ফর্টার মুড়িয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো। শাহাদ নিশ্চুপ। ঝড় ক্ষীণ হয়েছে। খানিক বাদে কম্ফর্টার উঠিয়ে শাহাদকে দেখতে চেষ্টা করলো। ফলস্বরূপ লজ্জা পেলো, শাহাদ ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। কম্ফর্টার সরিয়ে বললো,
– হাসছেন কেনো?
– কাঁদার মতো কিছু কি হয়েছে?
ঠোঁট বাঁকিয়ে দিয়া বললো,
– কাঁদতে হবেনা। আচ্ছা কি পড়ছেন?
– The Rime of the Ancient Mariner.
দিয়া উঠে বসলো। জানার আগ্রহ নিয়ে বললো,
– সেই আলবাট্রস কাহিনী না?
শাহাদ মাথা ঝাকালো। পুনরায় দিয়া প্রশ্ন করলো,
– আগে পড়েননি?
– হুম। বেশ কয়েকবার। ভালো লাগে। এই বই থেকে অনেক কিছু শিখেছি জীবনে। তুমি পড়েছো?
– না শুনেছি। আচ্ছা আলবাট্রস কি সত্যি শুভ ভাগ্যের প্রতীক?
– জানিনা তো। তবে বইয়ের কাহিনী অনুযায়ী তো তাই বুঝায়। কোলরিজ তো আমাদের তাই বুঝিয়েছে।
– আপনাকে কেনো সবাই আলবাট্রস ডাকে?
– তুমি কি করে জানলে?
– ছোট ভাইয়া বলেছিলো। এছাড়া আজ শিপেও শুনেছি। অনেকে আপনাকে আলবাট্রস বলেছে।
শাহাদ হেসে বলে,
-The Rime of the Ancient Mariner এ যেই কাজটা আলবাট্রস করেছে, এমন কিছু কাজ আমি দশ বছর আগে করেছি বলে তাদের ধারণা তাই হয়তো ডাকে।
– কি করেছেন?
– তেমন কিছুনা কয়েক জন নাবিক এবং ক্রু ফেঁসে গিয়েছিলো সমুদ্রে। ঠিকঠাক দিক নির্দেশনা দিয়ে তাদের উদ্ধার করেছি। এগুলো সবাই করে। আমার বেলায় একটু অতিরঞ্জিত প্রশংসা করে ফেলেছে সবাই। এতটুকুই। এনিওয়ে ঘুমাও, কথা কম বলে। বিশ্রাম প্রয়োজন।
কথা না বাড়িয়ে দিয়া চুপ চাপ মেয়ের দিকে ফিরলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে মানুষটা আবার বই নিয়ে বসেছে। মনে দুষ্টুমি খেললো। জানালা টা আস্তে করে খুলে দিলো। শিরশিরে বাতাস ঢুকছে। শাহাদ আড়চোখে দেখছে স্ত্রী কর্মকান্ড। খাট থেকে নেমে সরাসরি ধুপ করে শাহাদের কোলে এসে বসলো। হঠাৎ এমন কাজে শাহাদ আঁৎকে উঠলো। একপাশে বই রেখে ভ্রু কুচকে বললো,
– কি?
দিয়া গলা জড়িয়ে বললো,
– আমি আপনার কোলে বসি, আপনি পড়ুন জ্বালাবোনা।
আস্ত বউ কোলে উঠে বসেছে। পড়ায় কি আর মন থাকবে। দিয়াকে মৃদু ধমক দিয়ে বললো,
– ঘুমাতে যাও।
দিয়া উপেক্ষা করে বললো,
– পরিবেশটা দেখেছেন, কি সুন্দর। ইশ কি শিরশিরে ঠান্ডা। আমার তো ভালো লাগছে। একটু খানি কোলে উঠেছি এমন করছেন কেনো?
– আমাকে ভালো থাকতে দিলে কি ক্ষতি হতো তোমার! এই যে কোলে উঠে বসে আছো বুঝতে পারছো আমার অনুভূতি? তাই বললাম ঘুমাতে যাও।
দিয়া উঠে গিয়ে বললো,
– হুহ যাচ্ছি। সারাক্ষন বাইরে আর বই। বিকেলেও ঘুমিয়েছি। সারাদিন রাত ঘুম আর ঘুম।
ডান হাতের কবজিতে টান লাগলো দিয়ার। এক টানে কোলে বসিয়ে নিলো শাহাদ। কোমড় পেঁচিয়ে ধরে বললো,
– ভেবেছিলাম জাহাজে ছেড়ে দিব। নিজের ভালো বুঝলেনা। অনুভূতি জাগিয়ে, যাচ্ছো কোথায়? এই মোক্ষম সুযোগ এত সহজে হাতছাড়া করবে না শাহাদ ইমরোজ। ছানাটা ঘুমে।
শাহাদের টেবিলের পাশে প্লেটে বিভিন্ন রকম ফল রাখা। প্লেটের উপর ঢাকনাটা উলটে একটা আঙুর নিয়ে দিয়ার মুখে পুরে দিলো। দুষ্টুমি হাসি দিয়ে বললো,
– মিষ্টি?
দিয়া স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
– হ্যাঁ।
প্লেটে হাত দিয়ে কমলা নিয়ে দিয়াকে মুখে পুরে দিয়ে বললো,
– কেমন?
কমলা টক। দিয়া চোখ মুখ কুচকে বললো,
– মজা না টক।
দিয়ার মনোযোগ শাহাদের মুখে। শাহাদের ঠোঁটের কোণে হাসি। শেষ আরেকটা ফল নিয়ে দিয়ার মুখের সামনে আনতেই দিয়া আগের বারের মত হা করলো। এবার শাহাদ হাত ঘুরিয়ে নিজের মুখে পুরে দিয়ে বললো,
সায়রে গর্জন পর্ব ৫২
– দি ইজ মাইন সুইটহার্ট।
দিয়া প্লেটের দিকে পূর্ণ নজর দিলো কি ফল দেখার জন্য! ফল দেখেই গালের দু পাশে গোলাপি আভা ফুটে উঠলো । ঠোঁটের উপর আপনা আপনি হাত চলে গেলো। লজ্জ্বায় উঠে যেতে চাইলো, কোমড়ের বেষ্টনী আরো দৃঢ় হলো। ফলের বীজটা বসা অবস্থায় মুখ থেকে ছুড়ে বিনে ফেললো। হেসে নিজেই বললো,
– একজেক্ট পয়েন্ট।
একটানে প্রেয়সীকে কাছে টেনে বললো,
– ইট’স টাইম টু টেস্ট মাই ফেভরিট ওয়ান, ডিয়ার লেডিলর্ড অফ মাই হার্ট।
