Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৫৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৪
নীতি জাহিদ

সকালের নাস্তায় ছিলো বিন,ব্রেড টোস্ট, ম্যাংগো জুস, লেমন মিন্ট, চিকেন সসেজ এবং মাশরুম সালাদ। দিয়া নাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে। নিজের প্লেট টা হাতে নিয়ে মুখটা বিবর্ণ করে মেয়ের মুখে খাবার দিলো। শাহাদ নাস্তা করতে করতে সহধর্মিণীকে বললো,
– খিচুড়ি খেতে চাইলে বলতে হয়, মনে মনে রেখে দিলে কি শিপের কুক বুঝে যাবে যে তাদের ম্যাডাম ফারহানা মেহতাবের মন পিঞ্জরে খিচুড়ি আর মাংস উঁকি দিচ্ছে?
শেহজা নতুন খাবারের টেস্ট পেয়ে টুকটুক করে খাচ্ছে। শাহাদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

– বাবা খাবার মজা?
মেয়ে মাথা নাড়িয়ে দু হাতে তালি দিয়ে বলে,
– বাবা খাবা মদা। মদা আ আ।
শাহাদ হেসে বলে,
– আমার ছানাটাও মজা পেয়েছে। চুপ করে খেয়ে নাও। লাঞ্চে বাঙালী খাবার রাখতে বলবো। হ্যাপি?
দিয়া মন খারাপ করে বললো,
– কাল থেকে এসব খাচ্ছি, আধ সেদ্ধ শাক পাতা,বিন, ওটস কেক, লাল চালের ভাত, কম মশলাদার মাংস। এগুলা কিভাবে খায় সবাই?
– তোমাকে বুঝতে হবে, এরা কেউ বিয়ের দাওয়াত খেতে আসেনি বা শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে যায়নি যে পেট পুড়ে মজা করে খাবে। প্রত্যেকের ক্যালরি,ফিটনেস নিয়ে ভাবতে হয় কুককে। অসুস্থ হলে মাঝ সমুদ্রে কি করবে? হ্যাঁ অবশ্যই ডক্টর আছে, মেডিকেল সিস্টেম আছে। কিন্তু এরপরো তো সাবধানে থাকতে হবে।

– বুঝেছি থাক আর বুঝাতে হবেনা।
দিয়া আপন মনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেয়ে যাচ্ছে।
শাহাদ এগিয়ে এসে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে বললো,
– দুজন চুপ করে বসো। খাইয়ে দিচ্ছি। যেভাবে খাওয়া হচ্ছে পুরোটা দিন লেগে যাবে।
খাওয়াতে খাওয়াতে বললো,
– খাবার শেষে ছানাকে রেডি করে রেখো। আমরা প্রোগ্রামে যাবো।
দিয়া চমকে বলে,
– কি? সাগরে প্রোগ্রাম?
– অবশ্যই। আমাদের সাথে আরো একটি শিপ ঘন্টা খানেকের মাঝে যুক্ত হবে।
ব্যাপারটা সুন্দর। দিয়ার কাছে এই ব্যাপারগুলো খুব ইউনিক মনে হচ্ছে। কত সৌন্দর্য্য দেখা বাকি। এর মাঝে মা মেয়েকে খাইয়ে শাহাদ বললো,
– শেহজাকে রেডি করো আমি আসছি কিছুক্ষনের মাঝে।

আলোচনায় বসেছে সিক্স স্পাইডার। সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ বলে সবাই ভিডিও বার্তায় সংযোগ স্থাপন করেছে। ইয়াজের মাথায় কিছু দূর্লভ অদ্ভুত ভাবনা ঘুরছে। সবাই অনেক দিন পর আলোচনায় বসাতে নিজেরা কথা বলছে। নোমান ইয়াজকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– ইয়াজ চুপ করে কি ফন্দি আঁটছিস?
ইয়াজ সম্বিত ফিরে বললো,
– ভাই একটা খটকা লাগছে। আমার মনের ভুল নাকি ব্যাপারটা রহস্যময় বুঝে উঠতে পারছিনা।
সকলের পূর্ণ মনোযোগ ইয়াজের দিকে। শাহীন প্রশ্ন ছুঁড়লো,
– কি খটকা?
ইয়াজ উত্তর দিলো,
– বস আকাশপথ ছেড়ে পানিপথে নেমেছে কেনো? নতুন যুদ্ধ ঘোষণা করবে নাকি?
শাহীন বিরক্ত হয়ে বললো,
– এবার থাম। একটু স্বাভাবিক হ। সব বিষয়ে গোয়েন্দা গিরি স্বভাব এখনো আছে। ভাবীমা আর শেহজাকে নিয়ে একটু স্মৃতি ধরে রাখার প্রচেষ্টায় পানিপথে। আর কিছুই না।
ইয়াজ হালকা হেসে বলে,
– তবে সেই শিপে ভাইস এডমিরাল মানিক মোজাম্মেল কেনো?
চমকে উঠলো সকলে। আমেরিকা যাওয়ার শিপে মানিক মোজাম্মেল স্যারের কি কাজ? শাহীন,পাভেল চিন্তায় পড়ে গেলো এদিকে নোমান প্রশ্ন করে যাচ্ছে। অন্য দিকে লিমন ঘটনার আগপিছ বুঝতে পারছেনা। হঠাৎ তানভীর বলে উঠলো,

– আমি খোঁজ নিয়ে কি দেখবো?
ইয়াজ মাথা নাড়িয়ে জানালো,
– দরকার নেই। কিছু একটা চলছে যা আমাদের চিন্তার বাইরে। আপাতত চুপ থাকাই ভালো। ঘাটাতে গেলে এবার আর থাপ্পড় মিশন নয়, স্টিলের এগ মিশন চালাবে জায়গামত।
নোমান,পাভেল এবং শাহীন অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। আর বাকি তিনজনের মুখ চুপসে আছে। ইয়াজ মলিন মুখে বলে উঠলো,
– নেন, আরো বেশি করে মজা নেন। আমরা নাদান বাচ্চা বলে সব আমাদের উপর দিয়েই যায়।
তৎক্ষনাৎ নোমান প্রতিবাদ করে বললো,
– তুই নাদান? আমি ভাইজানের হাতে রক্তাক্ত হয়েছি। এরচেয়ে বড় কথা যতই সিক্স স্পাইডারে থাকিনা কেনো ভাইজান আমাকে আগের মত পছন্দ করেন না। গলার কাঁটা ভাবে। উগড়ে ফেলতে পারলেই বাঁচে। মায়া আছে বলে এখনো আছি। একবার ভাইজানের অপছন্দের তালিকায় ঢুকলে ফিরে আসা সম্ভব না।
পাভেল মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,

– এই একটা ভয় সারাক্ষন মনের মাঝে কাজ করে। মানুষটা যতই আগলে রাখুক, মন থেকে যদি কাউকে অপছন্দ করে তার সাথে সব ধরনের আন্তরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। টিমে আছে বলে নোমানকে সহ্য করে অথবা সুরাইয়ার জন্য। নতুবা কবেই মে/রে ফেলতো।
নোমান ক্ষীণ হেসে বলে,
– অপরাধটাই যে অমন। ভাবীমার চরিত্রে দাগ আমার জন্য লেগেছে। দুনিয়াতে শ্বাস নিতে পারি সেই অনেক। ভাইজান আমাকে দু চোখ দিয়ে সরাসরি যেন না দেখতে পারে তাই এখানে পাঠিয়েছে। নতুবা তোরা কাছে থাকিস, আমাকে কি দেশে আসতে বলতে পারতোনা? আমি চাইলাম আর উনি পাঠিয়ে দিলেন? মোটেই না। উনি নিজেও চান না। প্রয়োজন ছাড়া দেখাও কর‍তে চায়না। ফোনেই কাজ সেরে নিতে হয়। সবই বুঝি কিন্তু মানুষটার স্নেহের জন্য মন ছটফট করে।
– বাদ দে। যা হওয়ার হয়েছে। ভাইজানকে ঘুরে আসতে দে। এরপর দেখি কি হয়।
নিজেদের মাঝে আলোচনা চলছে। প্রশ্নবোধক চিহ্নটির সঠিক ভাবে প্রয়োগ করছে সিক্স স্পাইডার। ইন্টিলিজেন্স টিম হলে এই এক ঝামেলা সাদামাটা কাজকে ও গভীর ভাবে দেখা শুরু হয়ে যায়।

শিপের বরন্য,বর্নাঢ্য যাত্রার অন্তিমকাল আজ। কিছুক্ষনের মাঝেই শীপ ইকুয়েডর সীপোর্টে ভিড়বে। এই কটা দিনে একবারের জন্য বিরক্তির আভাস যেমন ছিলোনা, তেমনি করে ছিলোনা কোনো কষ্ট। সেদিন সন্ধ্যায় জাহাজ পার্টি থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত কেবিনে এসে শাহাদকে খুশি মনে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো,
– শেহজার বাবা, আমি আমার জীবনের সুন্দরতম সময় গুলো কাটাচ্ছি বোধ করি। আমি ভীষণ খুশি। আপনি না থাকলে কি যে হতো আমার!
শাহাদ আহ্লাদিত বউকে আগলে ধরে বললো,

– আমি না থাকলে আপনার মতো বিদেশীনির কিছুই হতনা তবে এই শ্যাম সুন্দরের কপাল পুড়তো বোধ করি।
খিলখিল করে হেসে উঠেছিলো শাহাদপ্রিয়া।
– তুমি কি তৈরি? নেমে যাবো আমরা এখন।
স্বামীর বাক্যে ধ্যান ছুটে গেলো দিয়ার। দিয়া গায়ে সুন্দর করে ওড়না জড়িয়ে মাথা নেড়ে সায় দিতেই জাহাজের স্টাফরা এসে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলো। শাহাদ সামনে হাঁটছে শেহজাকে কোলে নিয়ে। দিয়া পিছু নিলো। শেহজা বাবার কোলে এটা ওটা দেখাচ্ছে। উত্তেজিত কন্যার সকল প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে বাবা। শিপ থেকে নামতেই দেখা পেলো বন্ধুদের। রোকসানা এবং মল্লিকা এসে দিয়াকে জড়িয়ে ধরলো। শাহাদের বন্ধুদের পরিবার এসেছে। যে যার মত ঘুরবে। তবে মল্লিকার স্বামী এবং রোকসানার ছেলে জয়েন করবে তাদের সাথে। পোর্ট থেকে সোজা হোটেলে উঠবে তারা। গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত বন্ধুরা। শেহজাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে শাহাদ। মনিরুজ্জামান হাত বাড়াতেই শেহজা বলে উঠলো,

– দাবো না।
শাহাদ বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললো,
– মেয়ে আমার নাখরা তুলে, একটু স্বাভাবিক হোক তারপর যাবে।
রোকসানা হেসে বলে,
– তোর এই মেয়ে বড় হলে সবাইকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে দেখিস।
শাহাদ হেসে বললো,
– এর আগেই বিয়ে দিয়ে দিবো। যেন সব নাখরা হাসবেন্ডের উপর যায়।
দিয়া মিটমিট হাসছে। মল্লিকা দিয়ার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলো,
– হাসছো কেনো?
দিয়া মুখে হাত দিয়ে ফিসফিস করে বলে,
– যেভাবে উনি বললেন, আমি যদি তাই করি। নিজের মেয়ের বেলায় সব জায়েজ দেখলেন আপা।
রোকসানা আঁড়ি পেতে এদের দুজনের কথা শুনে বললো,
– শাহাদ, তুই নিজের মেয়ের বেলায় সব জায়েজ করলি কেনো? দিয়া ভাবী কি নাখরা তোলে?
হালকা ঘাড় উঁচিয়ে ঠোঁট উলটে এক পেশীহাসি দিয়ে বললো,
– আমি কি ধরে রেখেছি?
– ওরেহ বাবাহ!

বন্ধুরা হাসতে হাসতে মজা নিচ্ছে। বয়সের এই সময়টাকে বেশ সুন্দর ভাবে উপভোগ করছে তারা। হাসতে হাসতেই এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে। দুটো গাড়ি। মল্লিকা জোর করে দিয়াকে নিজেদের গাড়িতে তুলে শাহাদকে পাঠিয়ে দিলো মনিরুজ্জামানের গাড়িতে। দিয়া প্রথমে আনবান করলেও রোকসানা এবং মল্লিকার কথার জালে পড়ে রাজি হয়ে বসে পড়েছে।

গাড়ি চলছে পৃথিবী বিখ্যাত ইনকা সভ্যতার দেশ ইকুয়েডরের রাস্তায়। ইকুয়েডর নিয়ে যত বলা যায় বোধ হয় কম হয়ে যাবে। দক্ষিন আমেরিকা দেশ পেরু ও কলম্বিয়ার মাঝে অবস্থিত ইকুয়েডর। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানে সেরাদের মধ্যে অন্যতম এই দেশ। যার তুলনা শুধুই সে নিজে। সবগুনে গুনান্বিত এই দেশ, যেমন প্রাচুর্যতায় ভরা, তেমনি সভ্যতা, তেমনি নিদর্শন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, ঐতিহাসিক সম্পদ ও বৈচিত্রপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রথাতে সমৃদ্ধ দেশ। পর্যটকদের জন্য স্বপ্নের দেশ এটি। সর্বপ্রথম ইনকা সভ্যতার জনগোষ্ঠী এখানে বসবাস গড়ে তুলে। সেই সময় স্পেনীয় শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। আদৌ ভাষাগত পরিবর্তন আসেনি এখানে। এখানকার মানুষজন কথা বলে স্পেনিশ ভাষায়। আয়তনে বাংলাদেশের দ্বিগুণ প্রায় দু লাখ তিরাশি হাজার বর্গকিলোমিটার অন্যদিকে জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি ষাট লাখ মাত্র। রাজধানী কিটো প্রাচীন শহরের মধ্যে অন্যতম। বিষুবরেখার সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত। এই বিষুবরেখার অপর নাম ইকুয়েটর। এই কাল্পনিক রেখার অবস্থান ইকুয়েডরের উপর। তাই তো দেশের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হয়েছে ইকুয়েটর।
সভ্যতায় ঘেরা,সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ এই দেশের রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জানার আকাঙ্ক্ষা। শাহাদ মেয়েকে বুকে নিয়ে গাড়িতে। রকিব পিঞ্চ কেটে বললো,

– তুই এমন চুপ করে আছিস কেনো?
শাহাদ বিরক্ত নিয়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে পুনরায় জানালার দিকে তাকায়। মনিরুজ্জামান ফিসফিস করে রকিবকে বলে,
– কি হয়েছে ওর?
– আমি কি করে বলবো।
শাহাদ পিছন ফিরে কিছুক্ষন পর পর কি যেন দেখছে। মুখের রঙে পরিবর্তন এনে বিবর্ণ করে রেখেছে। যেন মেঘের আবছায়া বুঝি মুখেই পড়লো। কেমন ছটফট করছে। চোখ বুঝে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। মনির প্রশ্ন করলো,
– তোর কি ঘুম আসছে?
– না।
– তাহলে নিরব কেনো। দেখ আমাদের সাথে আদিত্য দাদা এসেছেন। উনি কি ভাবছেন?
আদিত্য হেসে বললো,

– সমস্যা নেই ভাই। হয়তো উনার শরীর খারাপ লাগছে।
শেহজা বাবার বুকে ঘুমিয়েছে। নতুবা এতক্ষনে তুলকালাম করতো গাড়িতে। শাহাদ চোখ খুলে জিজ্ঞেস করলো,
– হোটেলে যেতে কতক্ষন লাগবে?
ড্রাইভারকে স্পেনিশ ভাষায় প্রশ্ন করলো আদিত্য। ভ্রমণ পিপাসু মানুষ মল্লিকার স্বামী। অনেক ভাষাই তার জানা। আদিত্য জানালো,
– ভাই আরো দু ঘন্টা।
আকস্মিক ভাবে শাহাদ গর্জে উঠে বললো,
– অসম্ভব! গাড়ি থামান দাদা।
চমকে উঠলো সকলে। গর্জন শুনে আদিত্য ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললো। শাহাদ মাঝ রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে গেলো। বাকিরাও নেমে পড়লো। একসাথে সকলের জ্ঞাতিগুষ্টি উদ্ধার করে বললো,
– সবগুলা ব্যাডা মানুষ এই গাড়িতে উঠছিস কেনো? ওদের গাড়ি কোথায়? আমি ওই গাড়িতে উঠবো।
সকলে তাজ্জব বনে গেলো, মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এতক্ষন ওর ছটফটানোর কারণ তবে এই। রকিব উত্তর দিলো,

– ওই গাড়িতে রাহিল আছে, আর রোকসানা আছে। এত চিন্তা কেনো করছিস?
– রাহিল বাচ্চা। রোকসানা আকাশে উড়োজাহাজ উড়ানোর জন্য সম্পূর্ণা। অপরিচিত একটি দেশে মোটেও সিকিউর নয়। আর আদিত্য দাদা আপনি কিভাবে বউটিকে ছাড়া বসলেন বলুন তো। এই দুই হতচ্ছাড়াদের তো একজনের বউ রেখে চলে গেছে অন্যজনের বিয়েই হয়নি। এরা নাহয় পরিবারচ্যুত। আপনি কেনো ভাবলেন না।
আদিত্য লজ্জা পেয়ে গেলো। জিহবায় কামড় দিয়ে বললো,
– রাহিল ওই গাড়িতে থাকাতে ব্যাপারটা গুরুত্ব দি নি ভাই।
– আমি নিজেই তো অপরিচিত দেশে ভয় পাচ্ছি সেখানে রাহিল তো চব্বিশ পঁচিশের ছেলে।
ওই যে সাদা গাড়িটি দেখা যাচ্ছে। আসছে ছুটে। শাহাদের মনে হলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ভয় পেয়েছে। ইকুয়েডরে কিশোর গ্যাং ওয়ারের কথা ইদানীং বেড়েছে। এরা নিজেরাই ঝামেলা করে আবার আক্রমণ করতে পারে পর্যটকদের উপর। সাদা গাড়ি ওদের দেখে থেমে গেলো। মনিরুজ্জামান হাসতে হাসতে বলে,

– বন্ধু বয়স তো বেশি হয়নাই। বিয়ে করা দরকার। একটা মাইয়া খুঁজে দে। এতদিন বুঝি নাই বিয়ের জ্বালা। আজকে একটা বউ নেই বলে অপমান করলি।
শাহাদ বিড়বিড় করে গালি ছুঁড়লো। সাদা গাড়ি সামনে এসে দাঁড়ায়। সকলে নেমে পড়লো। দিয়াকে নামতে দেখে শাহাদ এগিয়ে গিয়ে একপাশে বুকে আগলে নিলো। সবার মুখে একই প্রশ্ন,
– কি হয়েছে?
শাহাদ এক কথায় উত্তর দিলো,
– কিছুই না। নতুন দেশ তোরা সবাই একা ছিলি তাই আমরা অপেক্ষা করছিলাম। তোদের গাড়িতে আদিত্য দাদা এবং মনির যাক। আমার সাথে রকিব থাকলেই হবে।
রোকসানা দিয়ার হাত ধরে বলে,
– হাত ছাড় ভাবীর। আমার সাথে বসবে।
শাহাদ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
– আমার বউ আমার সাথে বসবে।
– দিবোনা।
– তুই কে দেয়ার? ফারাহ্ গাড়িতে বসো।

বাকিরা এদের ঝগড়া দেখে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে। শাহাদের ক্রোধের সীমা বেড়েই চলেছে। বড় বড় চোখ করে দিয়ার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে কেনো এই সময় কিছু বলছে না। দিয়ার হাত ছেড়ে রাগ করে গাড়িতে গিয়ে বসে। দিয়া রোকসানার সামনে গিয়ে বললো,
– আপু অপারেশনের পর তো এত দীর্ঘ যাত্রা করেনি। মনের মধ্যে হয়তো ভয় কাজ করছে। আমাকে আর শেহজা একা ছাড়তে চায় না। এমন না যে আপনাদের পছন্দ করেনা, তবে আমাদের দুজনের ব্যাপারে বেশিই পসেসিভ। হয়তো এখন আমাকে পাশে চাচ্ছে। আমি না থাকলে পুরোটা রাস্তা ছটফট করবে।
রোকসানা অধর প্রসারিত করে বললো,

– এত সহজে শাহাদ বউ বউ করার পাবলিক না। আজ বুঝলাম। যান ভাবী।
মল্লিকা মাথার উপর হাত বুলিয়ে দিতেই দিয়া চোখের পলক ঝাপটে হাসি দিলো। গাড়িতে উঠে বসতেই দেখে সিটে মাথা এলিয়ে দিয়েছে শাহাদ। চোখ বন্ধ। রকিব সামনে বসে ড্রাইভারের সাথে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে। সবাই বুঝতে পেরেছে শাহাদ নিজের মতো স্পেস চাচ্ছে, পাশে বসেই শাহাদের এক হাত নিজের কোলে রাখলো। পুরুষালি চওড়া কাঁধে মাথা রাখতেই মানুষটার ঠোঁটের কোনে ঝলমলে উঠলো হাসি। একহাতে আগলে ধরে বুকে টেনে নিলো। মাথা ঝুঁকে মাথার অগ্রভাগে ঠোঁট ছোঁয়ালো। শরীর জুড়ে মেয়েলী মন মাতানো গন্ধ যেন শাহাদের ভেতর টা জুড়ে শীতলতা বইয়ে দিয়ে গেলো। দেশেই বউ নিয়ে সারাক্ষন চিন্তায় থাকে এই দেশে তো এই সুন্দরী নিরাপদ নয়। শ্বেত সুন্দরীদের সাথে যেমন এরা অভ্যস্ত, ঠিক তেমন আফ্রিকান সুন্দরীরা এদের সই। তবে এই হাইব্রিড বাঙালী-ইরানী রুপসীকে দেখলে পুরুষের চোখ ঝলসে যাওয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। এখন মনে হচ্ছে আসাটা ভুল হয়েছে। পুরোটা ট্যুর দুশ্চিন্তায় কা/টাতে হবে।
হোটেলে এসেই বিশ্রামের জন্য স্ব স্ব কামরায় চলে গেলো সকলে। আজ আর যাত্রা সম্ভব না শাহাদের। কটা দিনের টানা জার্নি মাথা ধরেছে। কাল সকালেই যাত্রা আরম্ভ করবে সেই জগৎ বিখ্যাত গ্যালাপাগোসের উদ্দেশ্যে।

ইকুয়েডর থেকে প্রায় ৬০০ মাইল দূরে এই গ্যালাপাগোস। সরাসরি গ্যালাপাগোস যাওয়ার জন্য কোনো স্থলপথ,আকাশপথ কিংবা জলপথ নেই। যেভাবে,যেই উপায়ে যাওয়া যাক না কেনো প্রথমে সকলকে আসতে হবে ইকুয়েডর। ইকুয়েডর পরবর্তী যাত্রা হলো গ্যালাপাগোস। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে এই দ্বীপগুচ্ছের মায়ায় পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষ ছুটে আসে। জীবন্ত জাদুঘর হিসেবে আখ্যা দেয়া হয় এই গ্যালাপাগোসকে। ইকুয়েডর থেমে সেখান থেকে রাজধানী কিটোতে যেতে হয়। ইকুয়েডর থেকে গ্যালাপাগোস যাওয়ার পথ দুটি। একটি হলো কিটো বিমানবন্দর থেকে উড়ান পথ অথবা ক্রান্তীয় বানিজ্যিক রাজধানী গুয়াকিল থেকে বিমানপথ। ইকুয়েডর সমুদ্রবন্দর থেকে গ্যালাপাগোস পরিষেবা দেয়ার জন্য কোনো নদীপথ ব্যবস্থা, ক্রুজ বা জাহাজ নেই। সুতরাং পথ খোলা শুধু বিমান পথ।

কিটোর ‘মারিসকাল সুক্রে’ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং গুয়াকিলের জোসে জোয়াকিন ডি ওলমেডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট গ্রহন করে বিশ্বের অন্যদেশ। সুতরাং যে যেভাবেই যেতে চাক না কেনো এই দুটি ফ্লাইট ব্যতীত অন্য কোনো ফ্লাইট ইকুয়েডর গ্রহন করেনা।
যেহেতু হোটেল থেকে কিটোর দুরত্ব কম সুতরাং শাহাদ এবং তাদের টিমের গন্তব্য কিটো এয়ারপোর্ট। ভোরেই যেতে হবে নতুবা ফ্লাইট মিস। খুব ভোরে ঘুম ছেড়েছে সকলের। ইকুয়েডর থেকে গ্যালাপাগোসের উদ্দেশ্যে দুটি ফ্লাইট ছাড়ে। বাল্ট্রা এবং সান ক্রিস্টোবাল দ্বীপপুঞ্জের গালাপাগোসে দুটি প্রধান বিমানবন্দর রয়েছে। ফ্লাইট বুক করা শেষ। রওয়ানা হবে কিছুক্ষনের মাঝেই সেই স্বপ্নরাজ্যে।

গ্যালাপাগোস যেতে দু ঘন্টা সময় লাগবে। ইকুয়েডর থেকে কিটো, এরপর কিটো থেকে গুয়াকিল, তাই একটু সময় বেশি লাগবে। বাংলাদেশের লোকাল বাস গুলোর মতো পথে পথে যাত্রী তোলার প্রবনতা না থাকলে কিটো থেকে এই ফ্লাইট গুয়াকিল গিয়ে যাত্রী তুলতে বেশ সময় লাগায়। সেখানে প্রায় চল্লিশ মিনিট বিরতি নেয়। তাই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি সকলেরই নেয়া শেষ। আরেকটি ব্যাপার ফ্লাইট বুকিংয়ের পাশাপাশি গ্যালাপাগোস এয়ারপোর্টে থেকে ক্রুজ বুকিং করাটা গুরুত্বপূর্ণ। এয়ারপোর্ট থেকে যার যার নির্দিষ্ট ক্রুজ এসে অতিথিদের নিয়ে যাবে। গ্যালাপাগোসে পৌঁছানো মাত্রই সময় ও কঠোর সময় ও নিয়মের মধ্যে চলে আসতে হবে সকলকে।
এয়ারক্রাফটে উঠে সকলে নিজেদের আসন গ্রহন করলো। শেহজা এরোপ্লেন দেখে খুশিতে লাফাচ্ছে। দিয়ার শরীর ভালো ঠেকছেনা। বার বার ঘুম আসছে। শাহাদ দিয়াকে বললো,

– ঘুমিয়ে পড়ো। ছানার খাবার টা সামনেই রাখো। আমি দেখছি ওকে। ঘুম থেকে উঠেই দেখবে আমরা গ্যালাপাগোস এয়ারপোর্টে।
মাথা নেড়ে চোখ বুঝলো দিয়া। শাহাদের হাতে হাত রেখে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো। অন্যদিকে শাহাদ মেয়েকে পাশে বসিয়ে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে। ট্যাবের মাঝে গ্যালাপাগোসের ভিডিও ছেড়ে দিয়েছে। আর প্রতিটি প্রানীকে দেখিয়ে খেলছে মেয়ের সাথে। মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে এই জার্নিতে। অথচ এই মেয়ে এখনো বিন্দাস। শাহাদ হেসে মেয়েকে আস্তে বললো,
– আম্মা তুমি কি ঘুমাবেনা? তোমার মা তো ঘুমে অতল সমুদ্রে হা রিয়েছে।
মেয়ে বাবার কথা বুঝেছে হয়তো। ঘুমাবে না টুকু বুঝে বললো,
– তেজা খেলা, মো মাছ। এতা মাছ।
– জ্বি আম্মা শেহজা খেলা করছে জানি, হ্যাঁ মোবাইলে মাছ দেখেন আপনি। আমার রক্ত যে আপনার শরীরে তার ডিএনএ করানোর প্রয়োজনই নেই।

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৩

– কমান্ডার সাহেব, জার্নি ছানার পছন্দের মানলাম, আপনার রক্তেরই টান। ছানা যে মিষ্টি করে চুপটি করে আছে সেটা আমার স্বভাব। আমার ও সুনাম করুন।
– একটা কথাও মাটিতে পড়তে দেবে না তাই না ফারাহ্?
– ওই যে আপনার স্ত্রী বলে কথা।
হালকা হাসলো শাহাদ। বউটা না ঘুমিয়ে চুপি চুপি কথা শুনছিলো বাবা- কন্যার। মেয়েকে ভিডিও দেখাতে ব্যস্ত। বাম হাত তুলে স্ত্রীর মাথার ঘোমটা সরিয়ে আলতো করে চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
– টাইট স্লিপ স্ট্রবেরি।
চোখ বুজেই হেসে দিলো দিয়া। ভাবছে বার্মিজ গ্রেইপ উচ্চারন করলেই বোধ হয় সাহেবের রোমান্স পায় তাই এই মুহুর্তে অনুভুতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুরোনো নাম স্ট্রবেরি ডেকেছে।

সায়রে গর্জন পর্ব ৫৫