সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩১
Raiha Zubair Ripti
ট্রেনটা ধীরে ধীরে শহরের কংক্রিটের দালান পেছনে ফেলে এগিয়ে চলল উত্তর-পূর্ব বাংলার দিকে। জানালার বাইরে দৃশ্যগুলোও বদলে যেতে শুরু করল। রাতের অন্ধকারে ট্রেনটা ধীরে ধীরে এসে থামল মোহনগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে। রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। ছোট্ট স্টেশনটা দিনের ব্যস্ততা ঝেড়ে অনেক আগেই নিশ্চুপ হয়ে গেছে। প্ল্যাটফর্মে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ। স্টেশনের পুরোনো বাতিগুলো মলিন আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
শফিক সাহেব পথ চিনিয়ে সামনে এগোলেন স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে। সিকান্দার মুনতাহার এক হাত চেপে ধরলো। মুনতাহার কোলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে সেই ছোট্ট বিড়ালটা। তাকে সে ফেলে আসে নি। নিয়ে এসেছে সাথে করে। স্টেশন ছেড়ে তারা ঢুকে পড়ল গ্রামের রাস্তায়।
স্টেশন চত্বর পেরিয়ে কাঁচা রাস্তার ওপর পা রাখতেই সিকান্দার অজান্তেই চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। অন্ধকারে যতটুকু দেখতে পেলো তা হলো সরু কাঁচা রাস্তা। দুই পাশে বিশাল বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঝে মাঝে তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও বাঁশঝাড়, কোথাও সুপারি আর নারকেল গাছের সারি। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, কোথাও রাতজাগা কুকুরের ক্ষীণ ঘেউ-ঘেউ শব্দ।
মুনতাহা হাঁটতে হাঁটতে চারদিকে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সিকান্দারের বাহু খামচে ধরে বলল,
“দেখেন!”
সিকান্দার সামনে তাকিয়েই থমকে দাঁড়াল। পশ্চিম দিকের বিশাল বাঁশঝাড় থেকে একসঙ্গে উড়ে আসছে অসংখ্য জোনাকি। একটা-দুটো নয়। হাজার হাজার জোনাকি দল বেঁধে এগিয়ে এসে চারিদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আকাশের তারাগুলো বুঝি ভুল করে নেমে এসেছে জমিনে। অন্ধকারে পথ হারিয়ে না ফেলে, অচেনা পাঁচজন পথিকের পথ দেখাতেই বুঝি আল্লাহ তাঁর ক্ষুদ্রতম সৃষ্টি জোনাকিদের পাঠিয়ে দিয়েছেন। মুনতাহা মুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। সিকান্দারের ঠোঁট থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এলো,
“সুবহানাল্লাহ…”
স্রষ্টার সৃষ্টির কোনো তুলনা হয় না। সিকান্দার এই প্রথম এত জোনাকি দেখলো এক সাথে। শিফা, শফিক সাহেবও চমকে তাকিয়ে আছে।
তীব্র দাবদাহের পর আজ সন্ধ্যা থেকে মোহনগঞ্জের আবহাওয়া কিছুটা শীতল হয়েছে। দীর্ঘদিনের গুমোট গরম ভাব ভেদ করে এক ঝলক শীতল বাতাস বয়ে গেল পুরো গ্রাম জুড়ে। ঠিক তখনই রাস্তার একটু ভেতরের একটি উঠোন থেকে বিস্মিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
” আব্বা ও আব্বা ! এইদিকে আয়েন তো! দেহেন তো এইডা আমি কী দেখতাছি!”
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া আবদুল কুদ্দুস মিয়া চোখ কচলাতে কচলাতে উঠোনের বাইরে এলেন ছেলের ডাক শুনে। এক পলক তাকিয়েই তাঁর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
” ইরি আল্লাহ! এত জোনাকি! কই থে আইলো? ”
তাঁর গলার শব্দ শুনে পাশের বাড়ি থেকে আরও দু-চারজন বেরিয়ে এল। একজন হাতে হারিকেন, আরেকজন কাঁধে গামছা। কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, কেউ উঠোন থেকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েরা অব্দি চলে এসেছে রাস্তায়। এক যুবক এসে বলল,
“সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত গরমে ঘরেই থাকা যাইতেছিল না। হঠাৎ কই থেইকা এত ঠান্ডা বাতাস আইলো? আর এত জোনাকি! কোনো দিন দেখি নাই। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরার সময় দু একটা দেখছিলাম। এহন তো দেহি যত রাইত বাড়তাছে, ততই বাড়তাছে। পুরা গেরামডা দেহো, কেমন আলোয় ভইরা গেছে! পৃথিবীর সব জোনাকি আমাগো গেরামে আইয়া পড়ছে নাকি। ”
এক বৃদ্ধা আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে বললেন,
“আল্লাহ খায়ের করুক। মনে অয়, আকাশের কুনো খবর আছে। মনে অয় বৃষ্টি নামবো আইজ কাইলের মধ্যে।
কথা বলতে বলতেই তাদের চোখ পড়ল কাঁচা রাস্তার দিকে। জোনাকির আলোর ফাঁকে পাঁচটা ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে গ্রামের ভেতরে এগিয়ে আসছে। একজন গলা উঁচু করে ডাক দিল,
“ওই… কারা যায় এই রাইতে?”
শফিক সাহেব থেমে গেলেন। তারা ইতিমধ্যে দেখতে পেয়েছে গ্রামের প্রায় সকল মানুষ বাহিরে চলে এসেছে। এত শান্তি বাতাস। তাদের শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে। সিকান্দার মনে মনে ভাবছে এই গ্রামের মানুষজন কত শান্তিতে থাকো। আহ্ কি সুন্দর অপরূপ দৃশ্য! এমন দৃশ্য পৃথিবীতে বিরল। শফিক সাহেব জবাব দিলেন,
“আমি শফিক।”
লোকগুলো একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
“শফিক? কোন শফিক?”
শফিক সাহেব একটু এগিয়ে এসে বললেন,
“আমি… রহিমুদ্দিন মিয়ার বোন জামাই। ।”
কথাটা শুনতেই একজন কপালে হাত ঠুকে উঠল।
“আরে আরে! হায় আল্লাহ! চিনতেই পারি নাই! তা এই রাইতে আইছেন ক্যান? খবরও দেন নাই! খবর দিলে গরুর গাড়ি লইয়া স্টেশন যাইতাম! আহেন, আহেন… কতদিন পর আইলেন!”
“ না না, কাল সকালে আসবো নি। ”
“ আইচ্ছা তোয় কাইল আইসেন। ”
শফিক সাহেব হাঁটা ধরলেন। তারা সিকান্দার কে খেয়াল করে নি৷ তারা জোনাকি দেখতে ব্যস্ত। আজ যেন কারও ঘরে ফেরার তাড়া নেই। এমন দৃশ্য জীবনে ক’বারই-বা দেখা যায়! কেউ উঠোনে পাটি বিছিয়ে বসে পড়েছে, কেউ খাটিয়া টেনে এনেছে, কেউ বা শিশুদের কোলে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এতদিনের গুমোট গরমে দমবন্ধ হয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে আজ অনেকদিন পর এক চিলতে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছে। শীতল বাতাস যেন তাদের ক্লান্ত শরীর-মন জুড়িয়ে দিচ্ছে।
আরও প্রায় দশ মিনিটের পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছে গেলেন রহিমুদ্দিন মিয়ার ভিটায়। এটা ছিল এক স্বচ্ছল গেরস্ত বাড়ি। খেয়ে দেয়ে বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছে সকলে। বাঁশের তৈরি বড় ফটক ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিশাল খোলা উঠোন। যদিও দীর্ঘ খরার কারণে মাটিতে ফাটল ধরেছে জায়গায় জায়গায়। উঠোনের এক পাশে গোয়ালঘর, সেখানে বাঁধা কয়েকটি দেশি গাভী আর বলদ জাবর কাটছে। খড়ের বড় বড় গাদা সুন্দর করে সাজানো যা গত সপ্তাহে কিনে এনেছে । আরেক পাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া রান্নাঘর, তার পাশে মাটির চুলা। উঠোনের কোণে একটি পুরোনো কুয়ো, কিন্তু পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। দড়ি ফেলে পানি তুলতে এখন বেশ কষ্টই হয়।
মূল বসতঘরটি উঁচু মাটির ভিটার ওপর নির্মিত। টিনের চারচালা ছাদ, সামনে লম্বা বারান্দা। বারান্দায় কাঠের বেঞ্চ, দুটো পিঁড়ি আর একটি পুরোনো হাতলওয়ালা চেয়ার রাখা। টিনের চালের নিচে ঝুলছে একটি হ্যারিকেন, যার হলদে আলোয় পুরো বারান্দা মৃদু আলোকিত।
উঠোনে দাঁড়িয়ে শিফা গলা উঁচু করে ডাক দিলেন,
“মামা! ও মামা! ঘুমাইয়া পড়ছেন নাকি?”
কোনো সাড়া না পেয়ে আবার ডাকলো,
“মামি! ও মামি! দরজাডা খুলেন তো!”
ভেতর থেকে প্রথমে কারও কাশির শব্দ ভেসে এলো। তারপর কাঠের দরজার খিল খোলার আওয়াজ। সারাদিন কাজকর্ম করে সন্ধ্যায় আগেভাগে খেয়ে তারা বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বাড়ির কর্তারা বাড়ি নেই৷ আছে কেবল বাড়ি বউ আর বাচ্চা ছেলে মেয়েরা। হ্যারিকেন হাতে একে একে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন বাড়ির গিন্নি মমতাজ বেগম ও তার ছেলের বউ সুমি। ঘুমঘুম চোখে প্রথমে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেও পরমুহূর্তেই মুখে আনন্দের হাসি ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পরক্ষণেই শফিক সাহেবের পাশে দু’জন অচেনা মানুষ দেখে শিফার কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো,
“ কেডা ওরা? ”
এরিমধ্যে সুমির চোখ গিয়েছে বাহিরে। ঠান্ডা বাতাস আর জোনাকি দেখে তার চোখ কপালে। হায় আল্লাহ কত জোনাকি! আবার বাতাসও! শিফা এক পলক তাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ আব্বার বন্ধুর ছেলে আর ছেলের বউ৷ ঐ যে বলেছিলাম না একজন আব্বার চিকিৎসার সব টাকা দিছিলো? ”
“ হ। ”
“ উনিই সেই লোক। ”
শিফার মামি মমতাজ বেগমের মুখের ভঙ্গিমা পরিবর্তন হলো। তিনি এগিয়ে এসে সিকান্দার আর মুনাতহার উদ্দেশ্যে বললেন,
“ তুমিই সেই লোক! আহো বাবা আহো। তোমার কথা শুনছি অনেক। ”
সকলকে নিয়ে ভেতরে যাওয়া হলো। তাদের আতিথিয়েতা দেখে সিকান্দার মুগ্ধ হলো। এগারো টার পর বাড়ির কর্তারা বাড়ি ফিরলো। অপরিচিত কারো সাথেও এত অমায়িক ব্যবহার করা যায়! শিফার মামা বাড়ির সবাই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। তারা বুঝলেন মুনতাহা পর্দা করে। সেজন্য ছোট মেয়ের রুমে তার খাবার দিলেন৷ রুমের বড্ড সংকট হয়ে পরলো৷ সিকান্দার আর মুনতাহার এক রুমে থাকার মতো রুম নেই। সেজন্য শিফা আর মুনতাহা মমতাজ বেগমের ছোট মেয়ে মারিয়ার রুমে থাকলো। আর সিকান্দার শফিক সাহেব ও রহিমুদ্দিন মিয়ার সাথে বারান্দায় ফেলানো চৌকিতে শুয়ে পড়লো। মশারি টানানো হয়েছে। উঠান পুরোটা এখনো জোনাকির আলোয় আলোকিত। বাহিরে এখনো গ্রামের লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজ। রহিমুদ্দিন শুয়ে শুয়ে সেই জোনাকির দিকে তাকিয়ে রইলো। নিজের গ্রামটাই আজ নিজের কাছে তার অচেনা লাগছে। আল্লাহ রহম করে এবার বৃষ্টি টা দিলে হয়।
সকালে খুব ভোরে আজানের ডাকে ঘুম ভাঙলো সিকান্দারের। ওজু করার জন্য বাড়ির উঠানে দাঁড়াতেই তার নজরে আসলো বাড়ির চারদিকে আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল, সুপারি আর লিচুগাছের সারি। তবে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় পাতাগুলো ধুলায় মলিন হয়ে শুঁকিয়ে আছে। যা রাতে আঁধারে বোঝা গিয়েছিল না। পুকুরের পানি অনেকটাই নেমে গেছে, পাড়ের কাদামাটি শুকিয়ে ফেটে চৌচির। সে কুয়া থেকে রশি দিয়ে পানি উঠিয়ে ওজু করে শফিক সাহেব ও রহিমুদ্দিন কে ডাকলেন নামাজের জন্য। তারা উঠলেন। তিনজন মিলে রওনা দিলেন মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য। চলতি পথে সিকান্দার গতকাল রাত যতটা না মুগ্ধ হয়েছিল গ্রাম কে দেখে। এখন তার চেয়ে বেশই অবাক হচ্ছে গ্রামেই এই অবস্থা দেখে। রাতের সেই জোনাকিভরা অপার্থিব সৌন্দর্যের সঙ্গে ভোরের এই নির্মম বাস্তবতার কোনো মিলই নেই। সব কাঠফাটা রোদের মতো চকচক করছে। যে মাঠগুলো গতরাতে অন্ধকারে শান্ত আর অপরূপ মনে হয়েছিল, সেগুলো এখন যেন মৃত্যুপথযাত্রী। মাইলের পর মাইল ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়ে আছে। কোথাও একটুকরো সবুজ চোখে পড়ে না।
ধান ক্ষেত শুকিয়ে মরুভূমি। গাছপালাও মরতে বসেছে। ডিপ টিউবওয়েল চালিয়ে জমিতে পানি তোলার শেষ চেষ্টা করছে কৃষকেরা। কিন্তু মাটির বুক যেন আর পানি গ্রহণ করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। যেন শুকিয়ে যাওয়া পৃথিবী নিজের যন্ত্রণার মুখ খুলে দেখিয়ে দিচ্ছে। ধানের চারাগুলো হলদে হয়ে নুয়ে পড়েছে। রাস্তার ধারে যে খালটি একসময় বর্ষাকালে টইটম্বুর থাকত, সেটাও এখন প্রায় মৃত। মাথায় গামছা বেঁধে কয়েকজন কৃষক ভোর থেকেই জমিতে নেমে পড়েছে। তাদের মুখে ক্লান্তি, চোখেমুখে দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ছাপ। কোথাও পানির কোনো চিহ্ন নেই। চারদিকে তাকিয়ে সিকান্দারের বুকটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।
প্রকৃতি যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। পুরো গ্রামটাকে দেখে মনে হচ্ছে, বহুদিন ধরে বৃষ্টির একফোঁটা স্পর্শও পায়নি এই জনপদ। দীর্ঘ মাসের তৃষ্ণা সহ্য করতে না পেরে প্রকৃতিই ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে।
“ এই অবস্থা কতদিন ধরে চাচা? ”
রহিমুদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
” সাত আট মাসের উপর হইবো বৃষ্টি নাই বাবা। পুকুর-ডোবা শুকাইয়া গেছে গা। জমিতেও আর আগের মতো পানি ধরে না। ফসল ফলে না। কি যে এক দূরাবস্থা। গেরামের অনেকেই গরু-ছাগল বিক্রি কইরা দিছে। খাওয়াইবো কী? মাঠে ফসলই হয় না। ওগো ঘাস আর কেমনে হইবো।”
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“সরকারি কর্মকর্তাদের জানাননি? উপজেলা প্রশাসন, কৃষি অফিস কেউ কি আসেনি?”
রহিমুদ্দিন তিক্ত হেসে মাথা নেড়ে বললেন,
“জানাইছি বাবা। ইউনিয়ন থেইকা শুরু কইরা উপজেলা পর্যন্ত খবর গেছে। কৃষি অফিসের লোকও আইছিল। জমি দেইখা ছবি তুলছে, কাগজে লিখছে, আশ্বাস দিয়া গেছে। কইছে সাহায্য অইবো, ব্যবস্থা অইবো। কিন্তু ওই আশ্বাস আর কাগজের লেখাই শেষ। আমরা তো আর কুনো ব্যবস্থা দেখলাম না।”
একটু থেমে আবার বললেন, “কিছু গভীর নলকূপ বসাইছে সরকার। কিন্তু এই বিশাল এলাকার জন্য ওইডা কিচ্ছু না। যাদের জমি নলকূপের কাছে, তারা কোনোমতে ফসল বাঁচাইতাছে। আর যাদের দূরে, তারা আল্লাহর রহমতের আশায় বইসা আছে। আকাশের দিকে তাকানো ছাড়া আর কুনো উপায় নাই।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সিকান্দার আকাশের দিকে একবার তাকালো। ফজরের আগের সেই আকাশ এখন নির্মেঘ। মেঘের ক্ষীণ রেখাটুকুও নেই।
অল্পক্ষণ হাঁটার পর তারা গ্রামের ছোট্ট মসজিদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। মসজিদে এসে সিকান্দার সত্যিই বিস্মিত হলেন। যতটা সাধারণ একটি গ্রামের মসজিদ কল্পনা করেছিলেন, বাস্তবে তার অবস্থাও যেন তার চেয়ে অনেক বেশি করুণ। মসজিদের সামনের উঠোনজুড়ে শুকনো পাতা ছড়িয়ে আছে। একপাশে কেটে রাখা কয়েকটি গাছের গুঁড়ি আর ডালপালা এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা। দেখে মনে হচ্ছে, অনেকদিন ধরে এগুলো সরানোরও কেউ নেই। মসজিদঘরটি আয়তনেও খুবই ছোট। একসঙ্গে পঞ্চাশজন মানুষও হয়তো কষ্ট করে দাঁড়াতে পারবে না। চারপাশের বাঁশের বেড়ার কয়েকটি অংশ ভেঙে পড়েছে। কোথাও কোথাও ফাঁক হয়ে গেছে। মেঝে এখনো কাঁচা মাটির। দীর্ঘদিন ব্যবহার আর ধুলাবালিতে সেটিও রুক্ষ হয়ে গেছে। টিনের চালেও বয়সের ছাপ স্পষ্ট। ঝং ধরে গেছে। বৃষ্টি হলেই ভেতরটা ভিজে যাবে। আল্লাহর ঘর কে কেউ এভাবে অবহেলায় রাখে?
কিন্তু মসজিদের জীর্ণ অবস্থা সিকান্দারকে যতটা বিস্মিত করল, তার চেয়েও বেশি নাড়া দিল আরেকটি দৃশ্য। আজ ফজরের জামাতে উপস্থিত হয়েছে মাত্র ছয়-সাতজন মুসল্লি ইমাম সাহেবসহ। সে একবার মসজিদের ভেতরে তাকালো আবার বাইরে গ্রামের দিকে।
এত বড় একটি গ্রাম। কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক এর বেশি মানুষের বসবাস। অথচ মহান আল্লাহর ঘরে, তাঁর ডাকে সাড়া দিতে এসেছে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন! এই দৃশ্য দেখে সিকান্দারের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভারী অনুভূতি জমে উঠল। এর চেয়ে তো ঢাকা শহরের মানুষজনই অধিক নামাজি। আজান শোনা মাত্রই মসজিদে আসে। মসজিদ প্রাঙ্গণ ভরে যায় মুসল্লি দের দিয়ে। সেখানে এই গ্রামের এই অবস্থা!
মসজিদের এই নিস্তব্ধতা গ্রামের খরার চেয়েও ভয়ংকর একটি শূন্যতার কথা বলে দিচ্ছিল। এই গ্রামের শুকিয়ে গেছে শুধু জমিন নয়, মানুষের অন্তরও।
সিকান্দার জিজ্ঞেস করলো,
“ গ্রামের লোকেরা নামাজ পড়ে না চাচা? ”
বাড়ির পথে হাঁটা দিতে দিতে রহিমুদ্দিন জবাব দিলেন,
“ মন চাইলে পড়ে,আবার মন না চাইলে পড়ে না। আমাগোর গেরামের মানুষ কেমন জানো? নামাজ কালাম না পইড়াই চ্যালচ্যেলাইয়া জান্নাতে যাইবার চায়। এই গেরামে বৃষ্টি নামানোর লাইগা কত কবিরাজ আর মাজারে যে গেছে তার হিসাব নাই। মাঠের মাঝানে দু হাত তুইল্লা আল্লাহ আল্লাহ কইরা চিক্কুর দিবার পারে কিন্তু ওজু কইরা নামাজে আইয়া মুনাজাতে ডাকবার পারে না। এগুলা ফকির কবিরাজ এডির উপর বেশি নির্ভরশীল। আরো এক পুরোহিত আর এক ভণ্ড পীর আছে পাশের গেরামে। এমন ভাব করে না জানি ওডিই ওগো মালিক। ”
সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। রহিমুদ্দিনের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল সে। তারপর ধীর স্বরে বলল,
“আপনি কিছু বলেন নি?”
রহিমুদ্দিন মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললেন,
“কইছি তো বাবা। কতবার কইছি। কইছি, আল্লাহর ঘর ফালাইয়া রাইখা মানুষরে ডাকলে লাভ কী? আগে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আইসো, আল্লাহর কাছে কান্দো। কিন্তু আমার কথা কেডা শোনে? উলটা কয়, আমি নাকি বেশি বুঝি। এই গেরামে দুই ভাগ মানুষ। এক ভাগ আছে, আল্লাহরে ভয় করে, নামাজ-কালাম পড়ে। আরেক ভাগ আছে, বিপদ আইলেই কবিরাজ, তাবিজ, ঝাড়ফুঁক, মাজার এইডার পিছনে দৌড়ায়। আল্লাহরে ডাকার আগে মানুষের দুয়ারে যায়।”
সিকান্দারের চোখে গম্ভীরতা নেমে এলো।
“আপনি একটু আগে এক ভণ্ড পীরের কথা বললেন।”
“হ, পাশের গেরামে থাকে। নাম শুনলেই মানুষ ভিড় করে। দূর-দূরান্ত থেইকাও লোক আসে। কেউ অসুখ লইয়া, কেউ সন্তান হইবো বইলা, কেউ বৃষ্টির আশায়, কেউ আবার ভাগ্য খুলবো বইলা। হাত ভইরা টাকা দিয়া যায়। গরু দেয়, ছাগল দেয়, চাল-ডাল দেয়। মনে অয়, আল্লাহ না, ওই পীরই বুঝি সবকিছুর মালিক! শুনছি, এই খরার মইধ্যে ওইডা আবার নতুন বাণী দিছে। কইছে, গেরামের ওপর নাকি অশুভ ছায়া পড়ছে। সেই ছায়া কাটাইতে নাকি বিশেষ আমল লাগবো। আর সেই আমল করাইতে টাকা-পয়সাও লাগবো!”
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“মানুষ বিশ্বাস করছে?”
রহিমুদ্দিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“বিশ্বাসই তো করছে বাবা। খরায় মানুষ যখন দিশেহারা হয়, তখন সত্য-মিথ্যা বিচার করার শক্তিও কইমা যায়। শেষ সম্বলডাও নিয়া ওই পীরের দুয়ারে যায়। ভাবে, যদি একটা উপায় হয়!”
কথা বলতে বলতে তারা বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। পথিমধ্যে রহিমুদ্দিন ক্ষেতের দিকে চলে গেছে তাদের বাড়ি চলে যেতে। এখন সিকান্দার আর শফিক সাহেব হাঁটছেন পাশাপাশি। রহিমুদ্দিনের বোন জামাই হিসবে তাকে গ্রামের অনেকেই চিনে। তাই যাদের সাথে দেখা হচ্ছে তারাই চলতি পথে হেঁটে জিজ্ঞেস করছে কবে এসেছে? শফিক সাহেব জবাব দিলেন। একজন শফিক সাহেবের সাথে অপরিচিত এক ছেলেকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“ তোমার পাশের ছেলেটা কে শফিক? আগে তো দেখি নি। কে হয়? মেয়ে বিয়ে দিয়েছো নাকি? মেয়ের জামাই? ”
শফিক সাহেব হাসলেন। সিকান্দারের কাধে স্নেহভরা হাত টা রেখে বললেন,
“ শিফার বিয়ে দিলে তোমরা খবর পেতে না? ও আমার মেয়ের জামাই না৷ ও আমার বড় ছেলে। ওর নাম সিকান্দার শাহ্। ”
তাড়া ছিলো বলে লোকটা আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। চলে গেলো। তারা বাড়ি আসলো৷ বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। সবাই কাজে গেছে। রান্না শেষে খাবার দিয়ে আসবে চকে। বাড়ির পেছন দিকে রান্নাঘর। সকল নারীগণ রান্না ঘরের সামনেই। মুনতাহাও আছে। সকালের খাবারে মোটা লাল সিদ্ধ চালের গরম ভাত। সঙ্গে মসুর ডাল, আর আলু ভর্তা। মুনতাহা আর সিকান্দারের এই চালের ভাত খেতে কি যে কষ্ট হয়। তারা চিকন মিনিকেট চালের ভাত খেয়ে অভ্যস্ত।
পুকুরে মাছও নেই যে জাল ফেলে মাছ ধরে নিয়ে আসবে। বাজারে তরিতরকারির মাছের যা আকাশ ছোঁয়া দাম! এত এত মানুষের মাছ কিনতে গেলে এক ওয়াক্তই হবে না খাওয়া ভালো মতো। সেজন্য দুপুরে একটা দেশি মোরগ জবাই দিবে।
সিকান্দারের ফজরের নামাজ শেষে কফি খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। সেই অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছে। মুনতাহা এগিয়ে আসতেই সিকান্দার জিজ্ঞেস করলো,
“ নামাজ পড়েছেন? ”
মুনতাহা উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানালো। সিকান্দার গ্রামের দূর্দশার কথা মুনতাহা কে জানালো। সব শুনে মুনতাহার মনে হলো হয়তো তাদের আসা উচিৎ হয় নি। এমনিই তারা এক সমস্যার ভেতরে আছে। এখন তারাও এসে জুটলো। সিকান্দার আর শফিক সাহেব সকালের খাবার খাওয়ার পর বাড়ির মেয়েরাও খেয়ে নিলো। আর বাকি দের জন্য খাবার বলে নিয়ে প্লেট দিয়ে ঢেকে গামছায় বেঁধে চকে নিয়ে গেলো মমতাজ বেগমের ছোট ছেলে মাহিন।
দুপুর গড়িয়ে যখন রোদের তেজ কিছুটা কমতে শুরু করেছে, তখন একে একে বাড়ির পুরুষেরা মাঠ আর হাটের কাজ সেরে ফিরে এল। উঠোনজুড়ে মুহূর্তেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলো। কেউ গোয়ালঘরে ঢুকল, কেউ কুয়ো থেকে পানি তুলে হাত-মুখ ধুচ্ছে, কেউ আবার বারান্দায় বসে গামছা দিয়ে ঘাম মুছছে।
মুনতাহা বরাবরের মতোই নিজের পর্দার ব্যাপারে সতর্ক। সে পুরো সময়টাতেই মারিয়ার ঘরেই অবস্থান করল। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হলো না। মমতাজ বেগম আর শিফাই তার জন্য খাবার-পানির ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলেন।
এদিকে অল্প সময়ের মধ্যেই রহিমুদ্দিনের বড় দুই ছেলে, বড় ছেলে রশিদ আর মেঝ ছেলে জামাল, সিকান্দারের সঙ্গে বেশ আপন হয়ে গেল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। একবার আপন মনে করলে মন খুলেই কথা বলে।
কথার ফাঁকে ফাঁকে তারা সিকান্দারের জীবনের নানা ঘটনা জানতে পারল। নিজের মুখে নয়, বরং শফিক সাহেবের কাছ থেকেই তারা শুনল কীভাবে আপন বাবা ছেলের সম্পদ কেড়ে নিয়েছে, ছেলেকে অবহেলা করেছেন, কীভাবে অন্যায়ের ওপর অন্যায় করেছেন, আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে সিকান্দার নিজেই সব ছেড়ে চলে এসেছে। সব শুনে রশিদের মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে ক্ষোভভরা কণ্ঠে বলল,
“আল্লাহ এমন বাপ কাওরে না দিক। দুনিয়াতে বাপ পোলার ছায়া অয়, আর তোমার বাপ তো উলটা তোমার জীবনটাই শেষ কইরা দিতে চাইছে। আমি হইলে বোধহয় রাগ সামলাইতে পারতাম না। মানুষ নিজের শেষ সম্বল, নিজের সন্তানের হকও কাইড়া নেয় কেমনে!”
জামালও মাথা নেড়ে বলল,
“এত অন্যায় সহ্য করছো কেমনে ভাই? আল্লাহর কসম, আমি হইলে মনে অয় মাইরাই ফেলতাম। তুমি মিয়া কিছুই করলা না? আমার নিজেরই তো প্রতিশুধের আগুন জ্বলতাছে? তোমার এমনটা হয় নাই? ”
সাথে সাথে রহিমুদ্দিন সাহেব ছেলের পানে তাকালেন। জামাল মেকি হাসি দিয়ে বলল,
“ আমনে ওমনে তাকান ক্যান? আমনে তো ওমন না। আমনেরে কই নাইকা আমি। আমি হের বাপেরে কইছি। হের বাপে জাউরা।
সিকান্দার কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। এখানেই সিকান্দার আর তাদের মধ্যে তফাৎ। ঠোঁটে শান্ত একটুখানি হাসি ফুটিয়ে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
“ আমি মির্জা বাড়ি ছেড়ে চলে আসা মানেই তখন থেকেই মির্জা বাড়ির পতনের কাউন্টডাউন শুরু হওয়া। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমার হাত লাগাতে হবে না,মুখও লাগাতে হবে না,অযথা বুদ্ধি খাটিয়ে আমার মূল্যবান সময় ও নষ্ট করতে হবে না। আমার এক অনুপস্থিতিই যথেষ্ট মির্জা বাড়িকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তাই ওসব প্রতিশোধের আগুন জ্বলে না আমার ভেতর। ”
“ তুমি এতো জোর পাও কোন হান থে? ”
“ রবের ফয়সালার উপর সব ছেড়ে দিলে এমনিতেই আলাদা একটা জোর চলে আসে জামাল। ”
রশিদ ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে বলল,
“আল্লাহর ওপর এমন ভরসা সবার থাকে না ভাই।”
সিকান্দার শান্ত হাসল।
“ভরসা যদি সৃষ্টিকর্তার ওপর না থাকে, তাহলে তার সৃষ্টি করা মানুষের ওপর রেখে কী লাভ?”
ঠিকই তো! সৃষ্টি কর্তার উপর আমাদের ভরসা নেই অথচ সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টির উপর কি অগাধ বিশ্বাস আমাদের তাই না? উদাহরণ মোহনগঞ্জের গ্রামবাসী!
সেলিম মির্জার অফিসের অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। সিকান্দার চলে যাওয়ার পর থেকেই যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। একের পর এক লোকসানের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। যে প্রতিষ্ঠানটাকে তিনি এতদিন অপ্রতিরোধ্য বলে মনে করতেন, সেটাই এখন টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অফিসের বহু পুরোনো ও দক্ষ কর্মচারীরা একে একে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। নতুন যারা এসেছে, তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট। কাজের মান আগের মতো নেই। ছোট ছোট ভুলও এখন বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উৎপাদন থেকে শুরু করে শিপমেন্ট—প্রতিটি ধাপেই দেখা দিচ্ছে নানা জটিলতা।
সবচেয়ে বড় সমস্যাটা দেখা দিয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের নিয়ে। কয়েকটি চালান নির্ধারিত সময়ের পরে পৌঁছেছে, কিছু পণ্যের মান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। একের পর এক ই-মেইল আর ভিডিও মিটিংয়ে তারা অসন্তোষ প্রকাশ করছে। কেউ কেউ সরাসরি বলেই দিচ্ছে,
“Where is Mr. Sikandar? We want to discuss this matter with him.”
আরেকজন বলেছে,
“Since he left, everything has changed. We are not getting the same quality and professionalism.”
কথাগুলো সেলিম মির্জার কানে বিষের মতো বিঁধছিল। গত কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের বড় বড় চুক্তি, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা, সংকট মোকাবিলা সবকিছুর দায়িত্ব প্রায় একাই সামলেছিল সিকান্দার। কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই সে সমাধান বের করে ফেলত। বিদেশি বায়ারদের সঙ্গে তার ছিল অসাধারণ বোঝাপড়া। কঠিন পরিস্থিতিকেও সে এমন দক্ষতার সঙ্গে সামলে নিত যে, শেষ পর্যন্ত সবাই সন্তুষ্ট থাকত।
একজন সিকান্দার চলে গেলে তার জায়গায় আরও দশজন পাওয়া যাবে। কিন্তু সিকান্দার শাহ্ এর মতো কাউকে পাওয়া যাবে না। এজন্যই সে ছেলেকে হাতের মুঠোয় রাখতে চাইতো।
নিজের কেবিনে বসে ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে থাকা লোকসানের হিসাবগুলো দেখছিলেন তিনি। প্রতিটি ফাইলে যেন নতুন একটি ক্ষতির খবর লেখা। কয়েকটি বড় অর্ডার ইতোমধ্যে বাতিল হয়েছে। আরও কয়েকজন বিদেশি ক্রেতা নতুন চুক্তি স্থগিত রেখেছে। কপালের রগ ফুলে উঠল সেলিম মির্জার। রাগে তিনি টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা ছুড়ে মারলেন।
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩০
“অযোগ্য! একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারে না!”
চিৎকার শুনে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীরা চমকে উঠল। কেউ ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না। সেলিম মির্জা চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে ফোন করে বললেন,
“ সিকান্দার এখন কোথায়? আমি কেনো ওর লোকেশন ট্র্যাক করতে পারছি না? কোথায় গেলো ও? ২৪ ঘন্টার মধ্যে ওর খবর এনে দাও। ওর জীবন আমি নরক করে ছাড়বো। ওর কতবড় দুঃসাহস, আমাকে ছেড়ে চলে যায়। ”
