Home সীমান্তরেখা সীমান্তরেখা পর্ব ৩৫

সীমান্তরেখা পর্ব ৩৫

সীমান্তরেখা পর্ব ৩৫
ঝিলিক মল্লিক

মেজবাহ’র কথায় আকসা হতবাক হওয়ারও সময় পায় না৷ এরইমধ্যে কুঁড়েঘরের বাইরে দূরে কোথাও প্রকৃতির ভয়াবহ গর্জন উঠলো। আকাশ কাঁপিয়ে কানে তালা লাগানোর মতো বজ্রপাত হতেই আকসা আতঙ্কিত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মেজবাহকে জড়িয়ে ধরলো। মেজবাহ’র এসবে ভয় লাগা তো দূর, সামান্য চোখের পাতাও কাঁপে না৷ দরজায় যেই কড়া নাড়ার শব্দ হচ্ছিল, সেটা হঠাৎ বৃষ্টির ঝনঝন শব্দের মাঝে মিলিয়ে গেল৷ আর সে শব্দ শোনা গেল না।
এমন কত-শত রাত জঙ্গলে, ঝিলের ধারে, পাহাড়ের কিনারে কাটিয়েছে। চোখের সামনে বজ্রপাতে গাছ পুড়ে যেতে দেখেছে, সাক্ষীও হয়েছে কয়েকবার। একারণে ওর পিঠে শেকড়ের মতো একটা অদ্ভুত ৃ রয়েছে।
যেটা একমাত্র আকসা ব্যতীত আজ অবধি আর কেউ দেখেনি। আকসাকে শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে খড়ের গাদায় গা এলিয়ে বসে রইলো মেজবাহ।

বাইরে ঝুম বৃষ্টি। কিয়ৎক্ষণ পরপর অদূরে আঁকাশ ফেটে চৌচির হয়। টিনের চালায় বৃষ্টির ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দ, আঁকাশে বজ্রাঘাতের কর্কশ, ভয়ঙ্কর আওয়াজ, অন্ধকার অচেনা একটি কুঁড়ে আর জানালা হতে ভেসে আসা বন-জঙ্গলের সোঁদা মাটির গন্ধ — সব মিলিয়ে পরিবেশটা অদ্ভুত রোমাঞ্চকর। এখানে বসে এসব নিয়ে ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। অবশ্য বলা বাহুল্য, আকসার ইতিমধ্যে ভয়-আতঙ্ক আর শীতে গায়ে কাঁটা দিতে শুরু করেছে। হাতের লোম খাড়া হয়ে গেছে। মেজবাহ’র চোখে পরতেই ও নিজের গায়ের সাদা শার্টটা খুলে আকসার গায়ে পেছন থেকে ভালোভাবে জড়িয়ে দিলো৷ মেজবাহ’র পরনে আপাতত একটা স্যান্ডো-গেঞ্জি। আকসা ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, “আমাকে দিলেন কেন? শীত করছে না?”
“উহুঁ। আমার শীত লাগে না।”
“কেন? আপনি কি ভাল্লুক?”
এমন পরিস্থিতির মাঝেও আকসার এহেন কথায় মেজবাহ হেঁসে বললো, “ভাল্লুক নয়৷ তবে অন্য কোনো পশু হবো হয়তো৷ তুমি যেভাবে আমাকে ভয় পাও!”

“বাঘ নাহয় শেয়াল হবেন!”
“শেয়াল?”
“হ্যাঁ।”
“শেয়াল কেন?”
“কারণ আমি মুরগি।”
মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলে চটজলদি মুখে হাত চেপে ধরে আকসা। একি বলে ফেললো!
মেজবাহ ওর চোখে চোখ রাখলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এই দৃষ্টির ভাষা বোঝার ক্ষমতা আকসার নেই৷ ওর বোধের বাইরে। মেজবাহ ঠোঁট বাকিয়ে হেঁসে বলে, “হ্যাঁ। তুমি মুরগি, আর আমি শেয়াল। শেয়াল কী করে জানো?”
“কী করে?”
আকসা মেজবাহ’র সম্বিতহীনের ন্যায় প্রশ্ন করে। মেজবাহ মুখ কিঞ্চিৎ এগোলো৷ ঠোঁট চেপে রাখলো মিনিটখানেকের মতো। আকসার মুখমণ্ডল অনবরত পর্যবেক্ষণ করলো৷ এরপর কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে হালকা ফু দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, “মুরগিকে খেয়ে ফেলে!”
আকসার হার্টবিট বেড়ে গেল। মেজবাহ কথা থামিয়ে পুনরায় বললো, “তাহলে শেয়াল কে?”

“আপনি।”
“আর মুরগিটা কে?”
“আ. .আমি!”
আকসা বশীভূতের ন্যায় জবাব দিয়ে থমকে যায়। ওর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ক্রমান্বয়ে দ্রুত হলো। মেজবাহ ফিচেল হেঁসে বললো, “এই সামান্য কথাতেই এত অস্থির হলে হবে? কাজে তো এখনো কিছুই করে দেখায়নি!”
মেজবাহ’র বুকে মুখ লুকিয়ে বসে আকসা। একেবারে পাখির ছানার মতো আড়াল হয়ে গেল ওর বুকে। আরাম পেয়ে এক রতিও নড়লো না সেখান থেকে। এই ঠান্ডা-শীতল পরিবেশে মেজবাহ’র চওড়া বুকে দারুণ ওম পাচ্ছে। হঠাৎ আকসা নরম সুরে বললো, “মেজবাহ, আপনার কি মনে হয় না আমাদের একটু সময় নেওয়া উচিত?”
“আই থিংক সো। ইন ফ্যাক্ট, আইভ অলরেডি বিন থিংকিং অ্যাবাউট ইট — মেবি উই শুড টেক সাম টাইম অ্যাপার্ট। লেট দেয়ার বি আ লিটল ডিস্ট্যান্স বিটুইন আস ফর আ হোয়াইল। সামটাইমস, ডিস্ট্যান্স অলসো হেল্পস ক্রিয়েট বেটার আন্ডারস্ট্যান্ডিং।”
আকসা বুক থেকে মাথা তুলে বলে, “ক্যান উই ডু দিস?”
“অফ কোর্স, পারবো। মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনো আকসা।”
আকসা মাথা নাড়িয়ে বলে, “শুনছি, বলুন আপনি।”

মেজবাহ বলতে শুরু করে, “আমরা এই সম্পর্কটাকে আরেকটা সুযোগ দেবো। নিজেদেরকে একে-অপরকে বোঝার সুযোগ দেবো। দূরত্ব মেটানোর চেষ্টা করবো। তবে, একটা কথা আছে। দূরত্ব মেটানোর আগে দূরত্ব সৃষ্টি করা জরুরি৷ দূরত্ব সৃষ্টি না করলে আমরা আমাদের নিজেদের ফিলিংস বুঝতে পারবো না। অ্যান্ড আই হ্যাভ নো হেজিটেশন ইন সেইং দ্যাট আই স্টিল হ্যাভেন্ট বিন এবল টু ফিগার আউট হোয়াট মাই ফিলিংস ফর ইউ রিয়েলি আর। তোমার ফিলিংসের বিষয়ে জানি না৷ আর সেটা এখন, এই মুহূর্তে শুনতেও চাইছি না৷ সময় কোরে একদিন শুনবো৷ আপাতত নাহয় আমরা একটু দূরে দূরে থাকি৷ নিজেদের ফিলিংস বোঝার চেষ্টা করি। তুমি কী বলো?”
মেজবাহ মূলত আকসার সম্মতি চাইছে। আকসা পরিপূর্ণ সম্মতি জানিয়েই বললো, “আমিও চাইছি— এমনটা হোক। আপনি কথাগুলো খুব একটা খারাপ বলেননি।”
শেষোক্ত কথাটা শুনে মেজবাহ মুখ উঁচিয়ে অত্যন্ত দাম্ভিকতার সহিত বললো, “খুব একটা খারাপ না, আমি কথা ভালোই বলি।”
আকসা আলতো করে মেজবাহ’র বুকে একটা ঘুষি মেরে মৃদু হেঁসে বললো, “যত যা-ই হয়ে যাক, ব্যাটার দাম্ভিকতা আর যাবে না!”
মেজবাহ হাসলো ক্ষণিক। বৃষ্টি কিছুটা কমতেই পোশাক-আশাক ঝেড়ে উঠে গেল আকসাকে নিয়ে। বাইরে বের হওয়ার আগে আকসার হাত এতোটাই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, যাতে ঝড়-বৃষ্টি বাদলা যা-ই হোক; ছুটে না যায়।

ওরা রাজশাহী ফিরে এসেছে দেড় দিন হলো৷ ফিরেছেন সেদিনের পরদিন সকালেই৷ ফেরার কথা ছিল ট্রিপের হিসেবে আর একদিন পরে। কিন্তু সেই দুর্ঘটনার জন্য ওরা আর সেখানে সময় অতিবাহিত করেনি। এরমধ্যে একটা ব্যাপার ঘটেছে, পুলিশকে ইনফর্ম করার পর তারা জঙ্গলে খুঁজে সেই ছেলে তিনটেকে বের করে কাস্টাডিতে নিয়ে গেছে৷ এখন ওদের বিরুদ্ধে মামলার প্রসেস চলছে৷ এবিষয়ে মেজবাহ যত যা কিছু করা লাগে, সব করছে। আকসা অবশ্য সবকিছু বিস্তারিত জানে না। মেজবাহ’র কাছে জিজ্ঞাসা করেছিল। তবে মেজবাহ ওকে খোলাসা করে সেভাবে কিছু বলেনি৷ যতবারই আকসা জিজ্ঞাসা করেছে, ততবার মেজবাহ বলেছে— “তোমার জেনে লাভ নেই।”
বারবার একই জবাব পেয়ে আকসা এখন জিজ্ঞাসা করা ছেড়েছে।
আজ মেজবাহ’র চট্টগ্রামে ফেরার দিন। ছুটির তুলনায় দুইদিন দেরি করে ফিরছে ক্যান্টনমেন্টে। দুপুরবেলা দীর্ঘ ঘন্টাখানেক ঘরের দরজা আঁটকে আকসার সাথে কথা বলেছে মেজবাহ। কি কথা যে হয়েছে ওদের মধ্যে, সেটা ঘরের বাইরের কেউ জানে না। পরিবারের সবাই অপেক্ষা করছিল, মেজবাহকে বিদায় জানানোর জন্য।

বেলা সাড়ে তিনটা৷ মেজবাহ বের হওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে৷ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের কলারের এলোমেলো অংশ ঠিক করে নিলো ও। আকসা বিছানার ওপরে বসা। ওড়না ঠিক করে নিয়ে খোলা চুল খোঁপা করতে করতে দেখছে মেজবাহকে। বাইরে থেকে দরজায় টোকা পরলো। রিমু ডাকছে।
“ভাইয়া দ্রুত এসো৷ চাচি ডাকছে তোমাকে।”
মেজবাহ দ্রুত চুলটা সেট করে পিছু ফিরে তাকিয়ে একবার আকসাকে দেখে নিল। চোখাচোখি হলো দু’জনের৷ তবে কোনো কথা হলো না। মেজবাহ দরজার নব খুলে বেরিয়ে গেল। আকসাও বিছানা ছেড়ে উঠে মেজবাহ’র পিছু পিছু গেল।

“হ্যাঁ মামনি, সব ঠিকমতো নিয়েছি।”
মেজবাহ আশ্বস্ত করার পরেও ইশা বেগম মানলেন না৷ লাগেজ খুলে চেকও করলেন। দেখলেন, ছেলে তার মিনারেল পানির বোতল নেয়নি। খুব বকাঝকা করে পিঠের ব্যাডিংয়ে মিনারেল পানির বোতল দু’টো ভরে দিলেন তিনি৷ মেজবাহ মা’কে জড়িয়ে ধরলো৷ ইশা বেগম প্রতিবারের মতো কান্না শুরু করলেন৷ মায়ের গাল দু’হাতে আলতো করে ধরে বলে, “আবার আসব তো মামনি। এভাবে কান্নার কী আছে?”
ইশা বেগম তবু কান্না থামালেন না। মেজবাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে সবার সাথে মোলাকাত করে বাইরের পথে পা বাড়ালো৷ কেচি গেইট পর্যন্ত সবাই গেল। মেজবাহ পিছু ফিরে তাকায়নি একবারও। দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
“মেজবাহ।”

সীমান্তরেখা পর্ব ৩৪

হঠাৎ পেছন থেকে ডাক পরলো। মেজবাহ ধীরে ধীরে ঘাড় ফেরালো৷ আকসা দাঁড়িয়ে আছে৷ ওড়নার কোণা চেপে ধরে রেখেছে। সূক্ষ্ম দৃষ্টি গেল মেজবাহ’র। আকসা মুখে বিষন্ন হাসি ফুটিয়ে বললো, “বিদায় না জানিয়েই চলে যাচ্ছেন?”
মেজবাহ মৃদু হেঁসে বললো, “বিদায় জানাতেই হবে?”
আকসা কোনো জবাব দিলো না৷ বোবার ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো। মেজবাহ ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বললো, “সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছি না৷ বিদায় বরং না-ই জানালাম।”
আকসার ঠোঁটের কোণে একইরকম বিষন্ন হাসি ফুটলো। মেজবাহ মৃদু স্বরে বললো, “চোখে-মুখে বিষন্নতা কেন? আবার তো বছরখানেক পরে দেখা হচ্ছে। ভালো থেকো৷ আর সবাইকে ভালো রেখো। আসি, মিসেস ইফতেখার।”

সীমান্তরেখা পর্ব ৩৬