Home সুইটহার্ট সুইটহার্ট পর্ব ১০

সুইটহার্ট পর্ব ১০

সুইটহার্ট পর্ব ১০
মোনালিসা মেহরোজ

রেস্টুরেন্টের এক কোণার টেবিলে গুটিসুটি মেরে বসে আছে মেহরিন। মুখখানা এমনভাবে ঝুলে আছে যেন তাকে জোর করে কেউ আদালতের কাঠগড়ায় এনে বসিয়েছে। তার ডান পাশের চেয়ারটায় নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বসে আছে অভ্র তালুকদার। অন্যদিকে ঠিক সামনের চেয়ারটায় গা এলিয়ে, দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে দাম্ভিক ভঙ্গিতে বসে আছে আদ্রিয়ান চৌধুরী। তিনজনের মাঝখানে রাখা কফি, জুস আর কিছু স্ন্যাকস। কিন্তু খাবারগুলোয় কারও মন নেই।

বিশেষ করে মেহরিনের। রেস্টুরেন্টে ঢুকে প্রথমেই যখন পাশাপাশি বসে থাকা অভ্র আর আদ্রিয়ানকে দেখেছিল, তখন তো প্রায় হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় হয়েছিল তার। মাথায় প্রথম যে চিন্তাটা এসেছিল—তা হলো এখানে নিশ্চয়ই কোন গড়বড় আছে। তারপর এক সেকেন্ডও দেরি করেনি সে। চুপচাপ যেই ঘুরে পালাতে যাবে, ঠিক তখনই অভ্র তাকে দেখে ফেলেছিল। পিছন থেকে ডেকে উঠেছিলো পুরুষটি। আর সেই ডাকেই থেমে গিয়েছিল মেহরিন। মনে মনে হাজারটা অজুহাত বানিয়েছিল, দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলো। কিন্তু কোনোটাই আর কাজে লাগেনি। বরং অভ্র উঠে এসে এমন স্বাভাবিকভাবে তাকে ভেতরে নিয়ে এসেছিল যে পালানোর আর সুযোগই পায়নি। ফলাফলস্বরূপ এখন সে দুই দিকের দুই “জাউড়া” মানুষের মাঝখানে বসে প্রাণপণে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছে।

মাথা নিচু করে আঙুল দিয়ে জুসের গ্লাস ঘুরাতে ঘুরাতে মনে মনে বিড়বিড় করলো মেহরিন—
—হে আল্লাহ… আমি এমন কি পাপ করেছিলাম যে এমন পরিস্থিতিতে পরতে হলো আজ?
অন্যদিকে পুরো সময়টাতে একবারও কোনো কথা বলেনি আদ্রিয়ান। চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে সে। এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে দোলাচ্ছে ইচ্ছেমতো। আঙুলের ফাঁকে কফির কাপ ধরা। চোখে সেই চিরচেনা নির্লিপ্ততা। যেন আশপাশে কী হচ্ছে, তাতে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। অন্যদিকে পুরুষটির এই নীরবতাই মেহরিনকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। সে কয়েকবার আড়চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকালো। লোকটার আদলে আসলে আছে টা-কি তা বুঝতে চেষ্টা করলো। তবে পারলো না।

বরং আদ্রিয়ানের সামনে পরে রীতিমতো হাঁসফাঁস করছে সে। মনে পরছে ভার্সিটির কথা। আর যখনি সেই ঘটনা তার মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে তখনি বুকটা অভিমানে ভার হয়ে আসছে। মাথা নুইয়ে নিচ্ছে আচানক। আদ্রিয়ান তখন তার সাথে যেই ব্যবহারটা করেছে তারপর আর তার দিকে তাকানোর মানেই হয়না। আর না-তো মেহরিন তাকালো। বরং নিজের অভিমানী মনটা শক্ত করে বসে রইলো ঠাঁই।
তবুও অকারণেই শুকনো ঢোক গিলে ফেললো মেহরিন৷ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইলো। পুরো টেবিলজুড়ে নেমে এলো অস্বস্তিকর নীরবতা। ওয়েটার এসে জুস রেখে চলে গেলো। তবুও কেউ একটা কথাও বললো না। মেহরিন স্ট্রটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। অভ্র কফির কাপে আঙুল ঠুকছে। আর আদ্রিয়ান বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রায় এক মিনিট পরে অভ্র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে নীরবতা ভাঙলো।

—আচ্ছা, পরিচয় করিয়ে দিই।
মেহরিন মাথা তুললো তার কথায়। অভ্র মৃদু হেসে ফের বললো—-
—মেহরিন! উনি আমার ফুপাতো ভাই। মিস্টার আদ্রিয়ান চৌধুরী।
মেহরিনের বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেলো। এতোক্ষণে বুঝতে পারলো আসল ঘটনা।সে ইতস্তত করে আদ্রিয়ানের দিকে তাকালো। আদ্রিয়ানও এবার সামান্য মুখ তুললো। শান্ত অথচ স্থির তীক্ষ্ণ তার দৃষ্টি। মেহরিনের মনে হলো, আদ্রিয়ানের এই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কেবল তার কায়ায় নয়, বরং তার ভেতরের প্রতিটি মাংস-পেশি ভেদ করে ভেতরটা ছুঁইয়ে যাচ্ছে। অথচ আদ্রিয়ান এমনভাবে তার পানে তাকালো যেনো সে সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ। মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে ভদ্রভাবে বললো—
—হ্যালো! মিস।
মেহরিনের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেলো। হ্যালো?এটা আবার কেমন রিঅ্যাকশন? গতকালই তো…না না, সেই কথা মনে করতেই লজ্জা আর ভয় মিশে পুরো শরীর কেঁপে উঠলো মেহরিনের। তাই আর মাথা তুলে তাকানোর সাহস পেলো না। বরং কাঁপতে থাকা হৃদয়টা শক্ত করে মাথা নুইয়ে’ই রইলো৷ বুঝে উঠতে পারলো না তার এখন কি করা উচিত। আদ্রিয়ান কেনো তাকে না চেনার ভান করে আছে তাও বুঝে উঠতে পারলো না রমণী। অভ্র মৃদু হেঁসে আবার বললো—

—আর আদ্রিয়ান, এ হচ্ছে মেহরিন। চিনিস নিশ্চয়ই! তোর ভার্সিটির’ই তো! তোর স্টুডেন্টও হয়।
একটু থেমে দুষ্টু হেসে যোগ করলো—
—সাথে আমার হবু স্ত্রী’ও হয়।
মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেলো মেহরিনের কাছে। তার নিশ্বাস গলায় আটকে এলো অভ্রের কথায়। অন্যদিকে আদ্রিয়ান ধীর হস্তে কফির কাপটা হাতে তুললো। এক চুমুক খেলো তা। তারপর সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত স্বরে বললো—
—স্টুডেন্ট? হতে পারে। অনেকেই তো আমার স্টুডেন্ট, তাদের সকলের দিকে তাকানোর সময় আছে না-কি আমার যে মুখ মনে রাখবো? সকলকে চেনার তো আর আলাদা করে সময় নেই। তবুও যারা ফাস্ট গার্ল তাদের একটু-আধটু চিনি। সকলকে নয়।
অভ্র শুধুমাত্র ‘ওহ’ বলে কফিতে চুমুক দিলো। অন্যদিকে মেহরিন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। আদ্রিয়ান কি বলছে এগুলো? সে তাকে চেনে না? অপমানও করলো সাথে! মেহরিন শুধুই অচেনা এক ছাত্রী? তার সাথে আদ্রিয়ানের কোন কিছু নেই? কোন ঝামেলা নেই কোন রাগ নেই? তাহলে আজ সকালে ওসব কি ছিলো?
মেহরিনের মাথা ঘুরে উঠলো। আদ্রিয়ান নামক রহস্যময় পুরুষটিকে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। এই মুহূর্তে তার ঠিক কি বলা উচিত তাও বুঝতে পারলো না। অথচ তার মনে হচ্ছিল আদ্রিয়ান এখনই হয়তো বলে উঠবে’ তোর হবু স্ত্রী আমার পেয়ারি সুইটহার্ট’
অথবা আমরা আগে থেকেই পরিচিত এমন কিছু বলবে। কিন্তু লোকটা একদম চুপ। যেন সত্যিই জীবনে প্রথমবার দেখছে তাকে। অভ্র হাসতে হাসতে বললো—

—বিয়ে নিয়ে বাসার সবাই খুব এক্সাইটেড।
আদ্রিয়ান এবার শান্ত দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড মেহরিনের দিকে তাকালো। তারপর আবার কাপ নামিয়ে রেখে শান্ত গলায় অভ্রকে বললো—
—গুড।
আদ্রিয়ানের এহেন ব্যবহারে অজানা কারণেই মেহরিনের বুক কেঁপে উঠলো। সে বুঝতেই পারছে না ব্যাপারটা কি। স্যার কি সত্যিই কিছু বলেনি অভ্রকে? নাকি তার সাথে পরে হিসাব করবে? ভাবতে ভাবতেই মেহরিনের হাত’পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। স্ট্র ধরে থাকা আঙুল কাঁপতে শুরু করলো তার। অভ্র সেটা খেয়াল করে বাঁকা হাসলে মাত্র।
—মেহু! ঠিক আছো?
—জি… জি…
—এত নার্ভাস লাগছে কেন?
—না… মানে…
মেহরিন তোতলাতে লাগলো। উত্তর দেওয়ার আগেই আদ্রিয়ান শান্ত কণ্ঠে বলে উঠলো—

—প্রথমবার পরিবারের নতুন কারও সঙ্গে দেখা হলে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করে। অবাক হওয়ার কিছু নেই।
কথাটা শুনে অভ্র মাথা নাড়লো। চোখের কোণ হেঁসে উঠলো তার। আদ্রিয়ান তা পরখ করে ঠোঁট বাঁকালো। অতঃপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কফির কাপে চুমক দিলো৷ অতি ধীর গলায় অভ্রর বলা কিছুক্ষণ আগের সেই ডাক’টা রিপিট করলো মৃদু—মেহু,
মেহরিন অবাক হয়ে তাকালো আদ্রিয়ানের দিকে।এই মানুষটা কি সত্যিই গতকালের সেই মানুষ কি-না তা বুঝে উঠতে পারলো না সে। অবিশ্বাস্য গলায় বিড়বিড় করে আওড়ালো—
—আজকে কি আদ্রিয়ান চৌধুরীর নতুন ভার্সন ডাউনলোড হয়েছে? পুরোনা বাদ?
মেহরিন নিজের মাথায় নিজেই চ*ড় মারলো। অতঃপর বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে দু’জনেই মাঝে বসে মাথা নত করে রইলো। অন্যদিকে অভ্রের দৃষ্টি স্থির হলো আদ্রিয়ানের হেলদোল বিহীন আঁখিপল্লবে। যা সে দেখতে চাইছিলো তা যেনো ধরা দিচ্ছিলো না তার চোখে। কেনো জানি অস্বস্তি হলো তার। হাতের মুঠোই শক্ত হয়ে এলো বিরক্তিতে। যা নজর এড়ালো না আদ্রিয়ান চৌধুরী নামক চতুর শৃগালের ন্যায় পুরুষের। অধর জোড়ায় চমৎকার এক হাসি খেলে গেলো সকলের আড়ালে। কফিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে আচমকা তাকালো মেহরিনের দিকে।

অন্যদিকে রেস্টুরেন্ট থেকে একটু দূরে পার্কের বেঞ্চে বসে আছে শিফা আর শাওন। দু’জনের মাঝখানে এক প্যাকেট চানাচুর। শাওন এক মুঠো মুখে পুড়ে বললো—
—শিফা, তোর কি মনে হয়?
শিফাও চানাচুর চিবুতে চিবুতে বললো—
—আমার মনে হয় ওরা এখন খুব ভদ্রভাবে কথা বলছে। মেহরিনও নিজের প্রেস্টিজ বাঁচাতে অভ্র দুলাভাইয়ের সামনে নিজেকে সেরা হিসেবে তুলে ধরছে।
—আর আমার মনে হয় এরমধ্যেও মেহু কোনো না কোনো আজাইরা কথা বলে ফেলেছে।
—ওটা তো নিশ্চিত।
—আর যদি অভ্রের কোন কথায় তাকে “জাউড়া” বলে দেয়?
শিফা থেমে গেলো। দু’জন কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর একসাথে বলে উঠলো—

—ইন্না লিল্লাহ!
পরক্ষণেই দু’জন আবার চানাচুর খেতে খেতে গল্পে মেতে উঠলো। শিফা চানাচুর চিবুতে চিবুতে শাওনকে ডেকে বললো—-
—তুই কি কোনদিনও প্রেম করেছিলিস?
শাওন মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বললো। শিফা চোখজোড়া সরু করে আওড়ালো—-
—সত্যি?
—হুম।
—এখনো করিস?
মুখখানা পেঁচার মতো বানিয়ে না বললো শাওন।
—নাহ্, ব্রেকআপ করেছি।
—কেনো?
—মেহুকে পটাবো বলে।
—কিহ্!
শিফার হাত থেকে চানাচুর পরে গেলো। শাওন তা দেখে হেলদোল বিহীন আবারো বললো—-
—এছাড়াও আরো একটা কারণ ছিলো।
শিফা নিজেকে সামলে নিলো। হালকা কেঁশে সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলে—-
—কি?
—ওই মেয়েটা’ই আর এই সম্পর্কে থাকতে চায়নি।
ভ্রু গোঁটালো শিফা।
—কেনো?
শাওন পিছনে হেলান দিয়ে বিরস মুখে চেয়ে বললো—-

—আমি সন্দেহ করেছিলাম তাকে। তাই ব্রেকআপ করেছে।
শিফা বিরক্তিকর শ্বাস ফেললো। বললো না কিছুই। হাত ঘড়ির দিকে নজর বুলিয়ে স্থির থাকতেই শাওন ফের বললো—-
—আসলে ভুলটা আমারি। আমি’ই ওর ফোনে চাচাতো ভাইয়ের সাথে ওর একটা ছবি দেখে ভুল বুঝেছিলাম৷ প্রচুর কথা শুনিয়েছিলাম। আর তাই কষ্ট পেয়ে ব্রেকআপ করে নিয়েছে সে। ভাইয়ের সাথে সামান্য একটা পিক তোলা নিয়ে এতোটা রিয়্যাক্ট করা উচিত হয়নি আমার।
শিফা চুপচাপ শাওনের কথা শুনছিলো। শাওন আরো আফসোস করতে লাগলো ব্যাপারটা নিয়ে। এরমধ্যেই শিফার জানতে ইচ্ছে হলো ছবিটা নিয়ে। জিজ্ঞেস করলো—-
—আচ্ছা! ছবিটা কিরকম ছিলো যে তুই সরাসরি ওই মেয়েটার সাথে ঝামেলা বাঁধিয়ে ফেললি? সেটা নিয়ে আবার ব্রেকআপ পর্যন্ত গড়ালো।

শাওন সোজা হয়ে বসলো শিফার পানে। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললো—-
—আরে, তেমন কিছু না। ওরা ভাই-বোন ছিলো। আমারি বুঝতে ভুল হয়েছিলো।
শাওন থামলো। শিফার কপাল এখনো গোঁটানো। শাওন অন্যদিকে তাকিয়ে ভ্রু যুগল কুঁচকে নিলো খানিক। মাথা চুলকে সরু করলো চোখজোড়া। বললো—–
—তবে একটা জিনিস আমি বুঝতে পারিনি এখনো।
শিফা চানাচুর মুখে পুড়তে পুড়তে জিজ্ঞেস করলো—-
—কি?
—ওরা দু’জন নেংটা হয়ে কি করছিলো? আর ওমন নেংটা ছবি’ই বা তুলতে গেলো কেনো? আশ্চর্য!
শাওনের কথা শ্রবণ হতেই আচমকা কেঁশে উঠলো শিফা। মুখে নেওয়া চানাচুরগুলো সেই সাথে ছিটকে বেড়িয়ে এলো মুখ হতে। চোখজোড়া অসম্ভব বড়বড় হয়ে গেলো৷ হাঁপাতে লাগলো নিজেকে সামলাতে না পেরে। সে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকালো শাওনের দিকে। শাওন তখনো না বোঝার ভঙ্গিতে মাথা চুলকে যাচ্ছে আর চানাচুর খাচ্ছে।

রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে দাম্ভিক ভঙ্গিতে বেড়িয়ে এলো আদ্রিয়ান চৌধুরী। হাতে ঝুলছে গাড়ির চাবি। বড়বড় পা ফেলে সে এসে দাঁড়ালো পার্কিং লটে, যেখানে তার গাড়ি দাঁড় করানো। পিছন পিছন কপালে ভাজ ফেলে মেহরিন নিজেও এসে হাজির৷ অভ্র তখনো রেস্টুরেন্টের ভেতর বিল পরিশোধ করতে ব্যাস্ত। দু’জনকে বেড়িয়ে আসতে বলে সেটাই দিচ্ছে আপাতত।
মেহরিন ধীর পায়ে আদ্রিয়ানের দিকে এগিয়ে এলো। অভ্র বলেছিলো এখানেই থাকতে। আদ্রিয়ানকে বিদায় দিয়ে সে নিজে মেহরিনকে বাসায় ড্রপ করবে। মেহরিন পায়ে পায়ে এসে থামে আদ্রিয়ানের সামনে। তা দেখে সানগ্লাসের আড়ালে ঢাকা চোখজোড়া হেঁসে উঠলো আদ্রিয়ানের। ঠোঁট বাঁকালো যুবকটি।
—স্যার!

মেহরিনের ডাকে গাড়িতে হেলান দিয়ে দু’হাত ভাজ করে নেয় আদ্রিয়ান। সূর্যের কড়া তাপ তখন তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। মেহরিনের কপাল কুঁচকে গেছে সেই তাপে। কপালের কোণে বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে কেমন। চুলের কিছু অংশও লেপ্টে আছে সেই ঘামের মাঝে। আদ্রিয়ান খুব সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো তা। এরমধ্যেই শোনা গেলো মেহরিনের উত্তেজিত কন্ঠস্বর—-
—স্যার! আপনি আমায় না চেনার ভান করলেন কেনো?
আদ্রিয়ান দৃষ্টি ঘোরালো৷ মেহরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাজ ফেলালো কপালে।
—তুমি কি আমায় মিথ্যাবাদী প্রমান করার চেষ্টা করছো?
আচানক ভরকে গেলো মেহরিন। আদ্রিয়ান যে তার কথার ভিন্ন মানে বের করবে তা সে ভাবতেও পারেনি। আমতা আমতা করে বললো—-

—না স্যার। আ…আপনি আমায় ভুল বুঝছেন। আমি তো….।
—ওহ! এবার আমি কম’ও বুঝি তাহলে?
মেহরিন নিজের উপরেই বিরক্ত হলো বড্ড। আদ্রিয়ান যে ইচ্ছে করে এহেন হেঁয়ালি করছে তা সে বুঝতে পারছে। তবে এর কারণ সুস্পষ্ট নয় তার কাছে৷ তৎক্ষনাৎ মেহরিনের মনে পরলো কালকের ঘটনা। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আচমকা জিজ্ঞেস করে বসলো—–
—আচ্ছা স্যার! কাল আমাকে ওভাবে অন্ধকার ক্লাসরুমে কেনো টেনে নিয়ে গেছিলেন? আর ওমন অদ্ভুত ব্যবহার’ই বা কেনো..করেছিলেন?
শেষের কথাগুলো বলতে বলতে কন্ঠটা মিইয়ে গেলো মেহরিনের। হাত কচলাতে কচলাতে মাথা নুইয়ে ঠোঁটজোড়া কামড়ে ধরলো নিজ দন্ত দিয়ে। মেহরিনের এহেন আচরণে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো সামনের পুরুষটি। মেহরিনের বুকের ভেতরটা তখন কাঁপছে থরথর করে। হাত’পা ঠান্ডা হয়ে আসছে অজানা কারনে। অদ্ভুত অনুভূতি গ্রাস করতে লাগলো রমণীর নরম কায়া।

অন্যদিকে ধীর পদক্ষেপে মেহরিনের সামনে এগিয়ে এলো আদ্রিয়ান। তার পারফিউম এর কড়া ঘ্রানে দম বন্ধ হয়ে এলো মেহরিনের। আদ্রিয়ান আচমকা হেলে পরলো রমণীর কানের কাছে। তৎক্ষনাৎ মেয়েটা চোখমুখ খিঁচে পরণের কাপড় খামচে ধরলো। থরথর করে কাঁপতে লাগলো তার ওষ্ঠদ্বয়।
আদ্রিয়ান তা লক্ষ করে শুকনো ঢোক গিললো। ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মেহরিনের কাঁপতে থাকা কায়ার পানে তাকালো। কানের কাছে এগিয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো—-
—ইউ আর সো ইনোসেন্ট, সুইটহার্ট।
মেহরিন শুকনো ঢোক গিললো আদ্রিয়ানের গভীর কন্ঠে৷ আদ্রিয়ান তা লক্ষ করে মেহরিনের এলোমেলো চুলগুলো আলগোছে কানের পিছনে গুঁজে দিলো। আদ্রিয়ানে হাতের উষ্ণ ছোঁয়া মেহরিনের ত্বক স্পর্শ করে যেতেই সর্বাঙ্গে শীতল স্রোত বয়ে গেলো রমনীর।
—একজন পরিপূর্ণ পুরুষ একজন পরিপূর্ণ নারীকে কেনো আলাদা করে সকলের আড়ালে নিয়ে যায় তা কি তুমি জানো না? কেনো নিজ হাতের গাঢ় স্পর্শ আঁকে সেই নারীর দেহের ভাঁজে তা সত্যিই তোমার অজানা, সুইটহার্ট? ইউ নো না! আমি আদ্রিয়ান চৌধুরী, খুব একটা শুদ্ধ পুরুষ নয়। অন্তত তোমার সামনে তো আমি বড্ড অশুদ্ধ। এটা কেউ না জানলেও তোমার তো জানা উচিত ছিলো, সুইটহার্ট। অথচ তুমিও বুঝলে না! সো স্যাড।

মেহরিনের কান দিয়ে উষ্ণ ধোঁয়া বের হতে লাগলো আদ্রিয়ানের লাগামহীন গভীর কথাগুলোতে। তীব্র লজ্জা-অদ্ভুত অনুভূতি আর মৃদু রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগলো তার নারী কায়া। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। এই বুঝি শরীরটা ছেড়ে দিবে! এই বুঝি সেন্স হারিয়ে ঢলে পরবে।
মেহরিন প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে থমকে দাঁড়িয়ে রইলো। আদ্রিয়ান নেশাক্ত দৃষ্টিতে খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখলো মেহরিনের কম্পন। তার প্রতিটি সুক্ষ্ম প্রতিক্রিয়া আদ্রিয়ানের হৃদয়ে তখন তোলপাড় সৃষ্টি করছিলো। তার শক্তপোক্ত হৃদয়ও কম্পিত হচ্ছিলো সেই তালে।
—কি হচ্ছে এখানে?
হুট করেই অভ্রের তীক্ষ্ণ স্বর শ্রবণ হতেই হুশ ফিরে মেহরিনের। ছিটকে দূরে সরে যায় আদ্রিয়ানের থেকে। দু’হাত তখন সংঘর্ষ সৃষ্টি করে আদ্রিয়ানের বলিষ্ঠ বুকে। মেহরিন দ্রুত শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা চালালো।
অন্যদিকে আদ্রিয়ান তখনো আগের মতো ঠাঁই দাঁড়িয়ে। তার মাঝে কোন আতঙ্ক নেই, নেই কোন তারাহুরো। বরং অভ্রকে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো যুবক। পকেটে হাত গুঁজে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ধীর পদক্ষেপ এসে দাঁড়ালো অভ্রের সম্মুখে। অতঃপর বাঁকা নজরে পরখ করলো মেহরিনের কম্পতি দেহ। অন্যদিকে অভ্র মেহরিনের দিকে একপলক তাকিয়ে আদ্রিয়ানকে ফের সুধালো—

—আমি জিজ্ঞেস করলাম কি হচ্ছিলো এখানে?
—প্রেমালাপ
আচমকা অভ্রের কানের কাছে এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো আদ্রিয়ান। অভ্রের কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। শক্ত হয়ে এলো মুঠোয়। দাঁতে দাঁত চাপলো যুবকটি। অন্যদিকে আদ্রিয়ান আর দাঁড়ালো না। বরং অভ্রের পানে তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে গটগট পায়ে নিজ গাড়িতে চড়ে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে স্থান ত্যাগ করার আগে স্বশব্দে আওড়ালো—-
—হ্যাপি জার্নি, ব্রো। গুড বাই।
এক সেকেন্ড থেমে ফের বললো—-

—তোর জন্মের দশ মিনিট পর পৃথিবীতে ল্যান্ড করতে পারি। বাট ট্রাস্ট মি অভ্র তালুকদার, তোর থেকে দশ’হাজার ধাপ এগিয়ে খেলার ক্ষমতা আমি রাখি৷
অভ্র চোয়াল শক্ত করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো৷ চোখের মনি তখন তীব্র রাগে অস্থির হয়ে উঠেছে। ঘাড় কাত হয়ে রগ ফুলে ফেঁপে উঠছে তার। শিরা-উপশিরায় তখন তরতর করে ছড়িয়ে পরছে তীব্র আক্রোশ। অন্যদিকে মেহরিন ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো আদ্রিয়ানের যাওয়া। দৃষ্টি ঘুরিয়ে যখন অভ্রের পানে চাইলো, তখন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল তার কায়া। অভ্রের জলন্ত চাহুনি তখনো স্থির আদ্রিয়ানের যাওয়ার পানে৷ সে দু’ধাপ এগিয়ে এসে কাপটা গলায় জিজ্ঞেস করলো—-

সুইটহার্ট পর্ব ৯

—কিসের খেলার কথা হচ্ছিল? ওনি কি খেলার কথা বললেন?
অভ্র দাঁতে দাঁত চেপে বললো—
—ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ।

সুইটহার্ট পর্ব ১১