Home সুইটহার্ট সুইটহার্ট সারপ্রাইজ পর্ব ১

সুইটহার্ট সারপ্রাইজ পর্ব ১

সুইটহার্ট সারপ্রাইজ পর্ব ১
মোনালিসা মেহরোজ

পরেরদিন’ই বেশ ধুমধাম করে আদ্রিয়ান ও মেহরিনকে তালুকদার বাড়ি থেকে চৌধুরী বাড়ি আনা হয়। যেমন হয় বরপক্ষ বিয়ে করে কনেকে নিজের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আয়োজনে। এতে ভিষন ক্ষিপ্ত অভ্র। একেই বউ নিয়ে ভেগেছে তার, দ্বিতীয়য়ত তার রূমেই বাসর করলো। তারওপর আবার তালুকদার বাড়ি থেকেই মেহরিনকে বিদায় দেওয়ার পালা সম্পুর্ন করেছেন মনোয়ার শেখ ও তার স্ত্রী। মানে এসব কি মগের মুল্লুক? অভ্র বুঝতে পারেনা। তার ভাগ্য এমন কেনো?

আদ্রিয়ান আবার যাওয়ার আগে সন্ধ্যায় রিসিপশন পার্টিতে তাকেসহ পুরো তালুকদার পরিবারকে দাওয়াত করে গেছে। সবকিছু একদম কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিঁটের মতো অনুভব হচ্ছিল অভ্রের কাছে। নাজমা তালুকদার অবশ্য দমে গেছেন। মুখ বুঁজে সবকিছু মেনে নিচ্ছেন।
ঘন্টা দু’য়েক হবে আদ্রিয়ান তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ‘কে নিয়ে নিজের বাড়ি ফিরেছে। সাথে তার দু’ই বান্দা শিফা-শাওনও হাজির। শেখ পরিবার রাতে আসবে রিসিপশন পার্টিতে। পুরো চৌধুরী বাড়ি ইতিমধ্যেই আলোই আলোই সেজে উঠেছে। চারিদিকে ঝলমল করছে ফেরারি লাইট, লাল-সাদা গোলাপসহ মেহরিনের পছন্দের বিভিন্ন ফুলের বাহার। আশিক চৌধুরী ভোর বেলায় রিসোর্ট থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন বাড়ির উদ্দেশ্য। আর বাড়ি ফিরেই সকল আয়োজনে ব্যাস্ত হয়ে পরেছেন তিনি। সাথে আছেন রায়হান তালুকদার। বাড়িতে অতিথি আসা শুরু করেছে ইতিমধ্যেই।

মেহরিন সদ্য গোসল সেরে এসে বসলো বিছানায়। এটা দিয়ে তার দু’বার হবে গোসল করা। তালুকদার বাড়িতে একবার করে ফেলেছে। আর এতোখানি পথ জার্নি করে আসার সময় শরীরটা বেশ খারাপ হয়ে পরেছে। বমিও করেছিলো পথিমধ্যে। তাই নিজেকে পুরোপুরি ফ্রেশ করতে গোসল সেরে এসে বসলো বিছানায়। এটা আদ্রিয়ানের ঘর নয়। প্রথমদিন এবাড়ি এসে যেই ঘরে ছিলো এটা সেই ঘর। সাহেলা চৌধুরী অর্থাৎ তার শাশুড়ী আপাতত তাকে এ ঘরেই থাকতে বলেছেন। মেহরিনও মাথা নাড়িয়ে ভদ্র বাচ্চার ন্যায় আদেশ পালন করছে।
গোসল সেরে শুভ্র রঙা একখানা এমব্রয়টারির থ্রি-পিস পরেছে মেহরিন। পাতলা ওড়না একপাশে ঝুলানো। দু’হাতের তালুতে এখনো ঝলমল করছে গাঢ় মেহেদির রঙ। চোখমুখে অন্যরকম এক উজ্জ্বলতায় ভরে আছে। মেহরিনের চুল হতে টপটপ করে পানি ঝরছে। তোয়ালে দিয়ে লম্বা চুলগুলো কেবল মুছতেই যাবে, এরমধ্যেই শিফা-শাওন হুরমুর করে প্রবেশ করলো তার ঘরে। রমণীর ভ্রু কুঁচকে গেলো। তোয়ালে নামিয়ে জিনিস করলো—-
—কি হলো? এমন করছিস কেনো?
—আর বলিস না। বিপদ হয়েছে।
—মানে?

ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়লো মেহরিন। শিফা চোখমুখ খিঁচে তার পাশে বসলো। শাওনকে দেখিয়ে বললো—-
—ওর না-কি খিদে পেয়েছে। তাই আমি বললাম বেশ তো, চল আন্টিকে গিয়ে বলি। তো সে না-কি বলতে পারবে না লজ্জায়। তাই চুরি করে খেতে গিয়েছিলো রান্নাঘরে। সেখানে গিয়ে দেখি একটা বেশ বড়সড় বাটিতে পায়েস তোলা। ওই হারাম*জাদা আবার সেখান থেকে সবটুকু পায়েস চুরি করে খেয়েছে। পরে আন্টি গিয়ে দেখে সেখানে পায়েস নেই। কাজের লোকেদের জিজ্ঞেস করলে বলতে পারছেন না। তাই মন খারাপ করে আন্টি বসে আছেন। আমি মিছেমিছি সান্তনা দিতে গিয়ে শুনি পায়েসগুলো আমাদের জন্যই আলাদা করে তুলে রেখেছিলেন তিনি। বাকিদের খাওয়ানো শেষ। এখন আমাদের দিতে গেলে নতুন করে তৈরি করতে হবে। আর এতো কাজের মধ্যে তা বেশ মুশকিল। তার চিন্তায় হতাশ হয়ে পরেছেন আন্টি।

শিফা থামলো। অন্যদিকে তার কথায় মেহরিনের মাথায় বাজ পরলো একপ্রকার। রমণী কটমট করে তাকালো শাওনের পানে। শিফাও চোখ গরম করে তাকিয়ে। শাওন বেচারা মুখ লুকাতে ব্যাস্ত। প্রথমদিন’ই বোনের শশুরবাড়ি পায়েস চুরি করে খেয়েছে। এটা বাহিরে জানাজানি হলে নির্ঘাত মানসম্মান নিয়ে টানাটানি উঠে যাবে।
শাওন মলিন মুখে এসে বসলো মেহরিনের পাশে।
—সরি ইয়ার। খিদে সহ্য করতে না পেরে এমন কাজ করে ফেলেছি। আর হবে না, মাফ কর।
তপ্ত শ্বাস ফেলে মেহরিন। খুঁজে পায়না বলার মতো কিছু।
—ফ্রেশ হয়েছিস?
শিফা মাথা দুলিয়ে না বললো বান্ধবীর কথায়। মেহরিন এবার বিরক্ত হলো। এসেছে কতক্ষণ, আর এখনো হাতমুখ ধোঁয় নি!
—যা, ফ্রেশ হয়ে আয়।

শিফা মাথা দুলিয়ে পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো। আর শাওন গেলো অন্যঘরে। আসার আগে তালুকদার বাড়ি থেকে সকালের নাস্তা করে এলেও বেচারার খিদে মেটেনি। তাই খিদে মেটাতেই গিয়েছিলো রান্নাঘরে খাবারের উদ্দেশ্য। সামনে লোভনীয় পায়েস পেয়ে কোনরূপ ভাবনা-চিন্তা না করে তা খেয়ে ফেলে। যার ফলে এখন নিজেই অনুতপ্ত শাওন। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে নিজের ঘরে প্রবেশ করে।
মেহরিন শাওনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে মৃদু হাসে। সে নিজেও এমন। অথচ আজ কি ভদ্রলোক সেজেছে! বাহ্। মেহরিন নিজেকে নিজে বাহবা দিয়ে গুটিগুটি পায়ে এসে থামে খোলা বারান্দায়। তৎক্ষনাৎ দমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় তার সুশ্রী বরণ। মেহরিন চোখ বুঁজে নেয় আবেশে। গত কয়েকদিনের সকল আশঙ্কা, ভয় কেটে গেছে। এখন মনটা বেশ ফুরফুরে তার। কোকিল স্বরে গান গাইতে ইচ্ছে করছে। প্রাণ খুলে বাঁচতে ইচ্ছে হচ্ছে।

মেহরিন আকাশের পানে তাকায়। লম্বা শ্বাস টানে। ফের নিচে তাকায়। দোতলা থেকে বাগানের অপরূপ দৃশ্য উপভোগে মশগুল হয়ে পরে। রমণীর ঠোঁটের কোণায় জ্বলজ্বল করছে একটুকরো প্রাপ্তির হাসি। তন্মধ্যে মেহরিন অনুভব করলো তার মাথার চুলে কেউ হাত দিয়েছে। তোয়ালে দিয়ে তার লম্বা কেশরাশি হতে পানি নিবারণ করছে।
চমকিত হয় রমণী। আচমকা এরূপ ছোঁয়ায় বেশ অবাক হয়। তড়িৎ পেছনে ফিরে তাকাতেই এক জোড়া উজ্জ্বল চোখের সাথে তার দৃষ্টি মিলিত হয়। মেহরিন থমকায়। আদ্রিয়ান তার পিছনে দাঁড়িয়ে। তার মুখের দিকে তাকাতেও মেহরিনের ঘাড় উঁচু করতে হয়। বলিষ্ঠ দেহের আদ্রিয়ানের সামনে রমণীকে যে বড্ড ক্ষীণ দেখায়!
মেহরিন অপলক পুরুষটির পানে তাকিয়ে রইলো। স্ত্রীর অটল চাহুনিতে আদ্রিয়ান মৃদু হাসলো। কোন কথা না বলে স্ত্রীর বাহু ধরে আলগোছে আগের মতো ঘুড়ে দাঁড় করিয়ে দিলো। মেহরিন পুতুলের ন্যায় ঘুরে গেলো। আদ্রিয়ান অতি যত্নে মুছে দিতে থাকলো মেহরিনের চুল। তেয়ালে দিতে অতি নরম হাতে মনোযোগ সহকারে পুরুষটি এ’কাজ করছে। দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে মশগুল সে।
মেহরিন চোখ বুঁজে নেয়। আদ্রিয়ান তার চুল মুছিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় সুধায়—

—তা মিসেস চৌধুরী! ভেজা চুলে কি করছেন? চুল শুকান নি কেনো? হেয়ার ড্রায়ার তো ঘরেই আছে!
—হয়তো আপনি এভাবে মুছিয়ে দিবেন বলেই মুছিনি।
আনমনে কথাখানা বলে শূন্যে তাকায় মেহরিন।
আদ্রিয়ানের হাত থেমে যায়। অপলক দৃষ্টিতে তাকায় মেহরিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে শূন্যের পানে। কিঞ্চিৎ হাসি ফোটে তার অধর জোড়ায়। পরক্ষণেই ফের নিজের কাজ চালিয়ে যায়।
—বেশ ভালোই ফ্ল্যার্ট করা শিখে গেছেন দেখছি, ওয়াইফি।
মেহরিন ঠোঁট কামড়ে হাসে। উত্তর করে—-
—প্রফেসর আদ্রিয়ান চৌধুরী স্টুডেন্ট বলে কথা।
আদ্রিয়ানের ঠোঁট জোড়া আগের তুলনায় আরো প্রশস্ত হয়ে আসে। মেয়েটাকে আজ অন্যরকম লাগছে। নতুন কোন মিষ্টি অনুভূতির জোড়ার খেলে যাচ্ছে হৃদয়ে। পুরুষটি তোয়ালে মেলে দিলো বারান্দার রেলিংয়ে। ফিরে আসে আচমকা দু’হাতে পেঁচিয়ে অতন্ত্য নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলো স্ত্রী’র লতানো কোমড়। মেহরিন কেঁপে ওঠে তার ছোঁয়ায়। আদ্রিয়ানের তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়া তখন তার গলার চামড়া ভেদ করে হৃদয় পোড়াচ্ছে। মেহরিন শুকনো ঢোক গিলে পরণের কাপড় খিঁচে রয়।
আদ্রিয়ান মেহরিনের কাঁপুনি লক্ষ করে ঠোঁট কামড়ে হাসে। মুখ গুঁজে দেয় স্ত্রী’র গলায় ভাজে। লম্বা শ্বাস টেনে রমণীর শরীরের নেশালো ঘ্রাণ পুড়ে নেয় নিজের মধ্যে। হাস্কি টোনে আওড়ায়—-

—তা, প্রফেসর আদ্রিয়ান চৌধুরীর স্টুডেন্ট আর কি কি জানে?
মেহরিন ঠোঁট কামড়ে মাথা নুইয়ে নেয়। আদ্রিয়ান উত্তর না পেয়ে আলতো করে কামড় বসায় মেহরিনের গলায় পাতলা চামড়ায়। মেহরিন চোখমুখ খিঁচে নেয়। ব্যথায় মৃদু কুঁকিয়ে ওঠে।
—ক….কি করছেন?
—ক্লাস করাচ্ছি।
ভ্রু কুঁচকে যায় মেহরিনের।আদ্রিয়ান ফের কামড় বসায় স্ত্রী’র পাতলা চামড়ায়। নাক ঘষতে লাগে সেথায়। এ পর্যায়ে মেহরিনের দম কেমন বন্ধ হয়ে আসে। আদ্রিয়ানকে দূরে সরাতে চায় হাতের সাহায্যে। তবে পুরুষটি নড়লো না এক বিন্দুও। বরং মেহরিনের বাঁধা পেয়ে যেনো আরো উগ্র হয়ে উঠলো। আচমকা মেয়েটার সরু কবজি এক হাতে চেপে সরাসরি নিজের দিকে ফেরালে। মেহরিন চমকে উঠলো। আদ্রিয়ান স্ত্রী’র চোখের পানে তাকালো ঘোলাটে দৃষ্টিতে। তর্জনী তুলে থুতনি আর একটু উঁচু করে মেলে ধরলো নিজের সামনে। ভরাট দৃষ্টিতে তাকালো মেহরিনের তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠদ্বয়ের পানে।

আদ্রিয়ানের গলা শুকিয়ে আসে। শুকনো ঢোক গিলে যুবক। পুরুষটির উতপ্ত নিশ্বাস আগুনের মতো রমণীর চোখেমুখে আছড়ে পরছে। নারী কায়া থরথর করে কাঁপছে কেমন। আদ্রিয়ান আর একটু এগুলো। বৃদ্ধা আঙুল তুলে স্পর্শ করলো তার ঠোঁটজোড়া। মুহূর্তেই চির ধরলো তার পুরুষত্বে। তীব্র উত্তেজনায় কাহিল হয়ে পরতে থাকলো পুরুষটি।
আদ্রিয়ান নিজের ঠোঁট বাড়ায় মেহরিনের পানে। মেহরিন তার পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে পেরে চোখ বন্ধ করে কাপড় খিঁচে রয়। আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় মেহরিনের ঠোঁটের দিকে। তবে তা স্পর্শ করার আগ মুহূর্তে আচমকা তাদের কানে ভেসে আসে অনাকাঙ্ক্ষিত এক আওয়াজ। ঘর হতে হুট করে কিছু পরে যাওয়ার শব্দে মেহরিন তড়িৎ চোখ মেলে তাকায়। নড়েচড়ে উঠতেই আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়। তবে তার বিরক্তিকে পাত্তা না দিয়ে মেহরিন উঁকি দিলো দরজার পানে। আর উঁকি দিতেই তার চোখজোড়া বড়বড় হয়ে আসে। বারান্দার দরজার কাছে রাখা ফুলদানি পর আছে। আর শিফা তার থেকে একটু দূরে পিছিয়ে যাচ্ছে বড়বড় আঁখিপল্লব ঝাপটে। মেহরিন ঝটকা খায়। শিফা এ ঘরে ছিলো সে তো ভুলেই গেছে। মেহরিনের দৃশ্য অনুসরণ করে আদ্রিয়ানও তাকালো উৎসুক নয়নে। তৎক্ষনাৎ শিফা চোখে হাত চেপে ধরলো। ভো দৌড় দিতে দিতে আওড়ালো—–

—আমি দেখিনি। আমি কিচ্ছু দেখিনি। স্যার যে তোকে কিস করতে যাচ্ছিলো আমি সেটাও দেখিনি। সত্যি….!
শিফা ঘর ছেড়ে এক দৌড়ে বেড়িয়ে গেছে। মেহরিন সেখানেই হা হয়ে দাঁড়িয়ে। লজ্জা পাবে না চমকাবে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। অন্যদিকে আদ্রিয়ান বিরক্তিকর শ্বাস ফেললো। কাজের সময় হুট করেই এসব গজব কোথা থেকে আসে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। মেহরিনকে পাশ কাটিয়ে বড় বড় পা ফেলে যেতে যেতে বিড়বিড় করে আওড়ালো—-

—আল্লাহর গজব সব আমার রোমান্সের মধ্যেই পরে। কাল বাসর রাতে বউ ওভাবে নাকানিচুবানি খাওয়ালো। আজ যেই একটু শান্ত থাকলো, আমিও বেশ ভালো মোড নিয়ে যেই একটু কিস করতে গেলাম সেই গজব পরলো! বালের রোমান্স।
হতভম্ব মেহরিন। শিফার পর আদ্রিয়ানের কথাগুলো শুনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার ফ্যাল ফ্যালে দৃষ্টি আবদ্ধ দরজার পানে আঁটকে রইলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here