সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৩
তানিয়া হুসাইন
রাত ঘনিয়ে এসেছে।
ইশায়া চুপচাপ শুয়ে ছিলো রুমের কোণে, দেয়ালের দিকে মুখ করে। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ে।
___ইশায়ার কোন হেলদোল নেই কে এলো আর কে গেলো।
__দরজা খুলে একঝাঁক মেয়ে ঢুকে পড়ে।
সবার পরনে হালকা নীল ইউনিফর্ম, মুখে রোবোটিক অভিব্যক্তি।
__ইশায়া ভীত, হতভম্ব। হঠাৎ এতগুলো অচেনা মুখ দেখে তার বুক কাঁপতে থাকে।
সে জানেনা তার সাথে কি হবে,
কিন্তু তার মন আশঙ্কা করছে,
তাকে হয়তো বেঁচে দেওয়া হবে।
___কারন এরকম কিছুই সে নিকোর মুখে শুনেছিলো,
____একজন এগিয়ে এসে হালকাভাবে বলে ওঠে,
চলুন ম্যাম, আপনাকে তৈরি করতে হবে। বস আজ এখানে থাকবেন।
___ইশায়া এক পা পিছিয়ে যায়।
বুঝে যায় সে কি হবে তার সাথে আজ,
কিছু বলতে পারে না সে অপারগ,
সাফাকে হারিয়েছে আর কাউকে হারাতে পারবেনা।
বাবা-মা ভাইয়ারা নাহয় ভালো থাকুক,আমার জীবন টাই নষ্ট হোক,
তবুও ওরা ভালো থাকুক।
চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে ইশায়ার ঠোঁট পর্যন্ত।
___সবার সামনে এগিয়ে আসে এক শান্ত মুখের মহিলা মারিয়া এলেনা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, চোখে একধরনের সহানুভূতি, কিন্তু ঠোঁটে গ্লানিভরা বাস্তবতা।
___তিনি ধীরে ধীরে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে বলেন,
আপনি যতটা ভাবছেন, পরিস্থিতি তার থেকেও খারাপ হতে পারে। ভীর একজন মাফিয়া। ওর মর্জির বিরুদ্ধে কেউ যায় না।
এখানে যা হয় সব কিছু ওর মর্জি মত হয় ,
ওর কথা কেউ অমান্য করলে তাকে শেষ করতে সে এক সেকেন্ড ও নেয় না।
আপনি যদি তার সাথে তাল মিলিয়ে চলেন, তাহলে অন্তত আপনি বাঁচবেন,আপনার পরিবার বাঁচবে।
আপনার পরিবার একটা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবে।
___আর আপনি কিছু উল্টাপাল্টা করলে ও আপনাকে মারবে তো মারবেই,
সাথে আপনার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে ফেলবে।
___তাই আমি এটাই বলবো নিজের আর নিজের পরিবারের ভালো চাইলে বসের কথার অমান্য করবেন না।
আর একটা কথা ভীরের কোন কাজে বাধা দিবেন না।
এটা সে পছন্দ করেনা,
ওর কোন কাজে তিল পরিমাণ বাধা পড়লে ধ্বংসযজ্ঞ বাধিয়ে দিবে সে।
ইশায়ার গলা শুকিয়ে আসে, চোখ দিয়ে অঝোর পানি গড়িয়ে পড়ছে।
কিন্তু গলার স্বর আটকে আছে ভয়ে আর আতঙ্কে।
মেয়েরা তাকে ধীরে ধীরে টেনে নেয় রুমের ভেতরকার বিশাল বাথরুমে।
মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গোলাপ ফুলের পাপড়ি।
শুধু লাল না, তার মাঝে সাদা আর হালকা গোলাপিও। চারদিকে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বলছে, এক অদ্ভুত ঘোরের পরিবেশ।
কিন্তু ইশায়ার এগুলোতে কোন ধ্যান নেই,
সে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো ও না কিছু।
যেনো সে একটা কাঠপুতুল,
তাকে যেভাবে চালানো হচ্ছে সে চলছে।
লম্বা গরম পানির শাওয়ারে দাঁড় করানো হয় ইশায়াকে।
একজন শ্যাম্পু করে ঘন কালো চুলগুলোতে, একজন বডি স্ক্রাব করে, আরেকজন নরম তোয়ালে দিয়ে মুছে দেয়।
ওরা যেন ওকে সাজাচ্ছে—not for beauty, but for sacrifice.
ইশায়াকে একটা গাউন দেওয়া হয়।
না চাইতেও দেখে সে,
এরকম পোশাক সে কখনো পরেনি।
কিন্তু আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
___ একটি গাঢ় নীল স্যাটিন গাউন,স্লিট করা,যা শরীরের বাঁকগুলো স্পষ্ট করে। কাঁধ পুরো খোলা, আর বুকের খাঁজে হালকা জরি।
___তারপর সবাই বসে ইশায়াকে সাজানোর জন্য।
চুল খোলা, সামান্য কার্ল করে দেয়, ঠোঁটে হালকা গ্লসি পিঙ্ক লিপস্টিক, চোখে কালো কাজল।
___আয়নায় তাকিয়ে ইশায়া নিজেকে চিনতে পারে না।
এতো খোলামেলা পোশাকে তার অস্বস্তি লাগছে,
সে এক বন্দী রাজকন্যা,
যাকে সাজানো হচ্ছে রাজা নামক শিকারির জন্য।
মারিয়া এলেনা ইশায়ার প্রশংসা করে।
মারিয়া বোঝায় সবকিছু ইশায়াকে ভীর এলে কি কি করতে হবে।
কি করলে ভীর সন্তুষ্ট হবে, সব কিছু শিখিয়ে দেয়।
__ইশায়া চুপচাপ শোনে সবকিছু।
হঠাৎ করেই বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায় দুজন সশস্ত্র পুরুষ, তারপর সরে গিয়ে পথ করে দেয় এক জনের জন্য।
ধীরে ধীরে প্রবেশ করে ভীর,
—রাজভীর আলভারেয।
কালো শার্টের উপরের বোতাম খোলা, সোনালী চেইনের হালকা ঝিলিক, চোখে অদ্ভুত আগুন।
তার একেকটা পা ফেলার সাথে সাথে মনে হয় যেন মাটি কাঁপছে। পুরো রুমে একটা অদৃশ্য চাপা ভয় ছড়িয়ে পড়ে।
___সবার মাথা নিচু। ভীরের আগমন দেখে একে একে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
শেষমেশ রুমে শুধু দুজন,
ভীর এবং ইশায়া।
ইশায়া কাঁপতে থাকে, জড়োসড়ো হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে।
বুকের ভেতর তোলপাড় হচ্ছে।
সে কান্না আটকায় যতটা পারে।
বাবা, মা, আবির ভাইয়া, জান্নাত ভাবি, আদ্রিয়ান, সাফা… সবাই ঘুরে ফিরে যায় মাথায়।
সাফার হাসি…
আদ্রিয়ানের ঝগড়া
আবির ভাইয়ার কথা,
মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ…
বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলা, আমার মেয়েটা খুব সাহসী।
কান্না আসে। কিন্তু সে জানে, ভাঙা চলবে না। কারণ এটা শুধু তার যুদ্ধ নয়, তার পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই।
প্রাসাদের সেই নির্জন, রাজকীয় কামরার দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় “ঠাস” শব্দ করে,
আর তার সাথে বন্ধ হয়ে যায় ইশায়ার নিঃশ্বাস,
সে জানে, এই মুহূর্ত থেকে সে আর কিছুই নিজের মতো করতে পারবে না।
তার জীবন শেষ।
____ভীর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার বিশাল, সোনালী কারুকাজ করা ডিভানে রাজার মতো বসে পড়ে।
এক পা তুলে অন্য পায়ের ওপর রেখে, সে স্থির চোখে তাকায় ইশায়া রহমান-এর দিকে।
___আজ তার চোখে ইশায়া এক অপরূপ সৌন্দর্য ঘেরা রমণী,
খোলা চুল, পাতলা অথচ স্যাটিন ড্রেস, গ্লসি হাইলাইটার, আর ভেজা চোখ—সব মিলিয়ে এক লাস্যময়ী নারী।
এক নজরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধীরে ধীরে পরখ করে ভীর আলভারেয।
___তার চোখ লালচে হয়ে উঠছে, শরীরের তাপমাত্রা বাড়ছে…
এই মেয়েটার জন্যই সব ওলট-পালট হয়ে গেছে তার ভেতরে।
আজ সে তার রাজত্বে, এই মুহূর্তে এই মেয়েকে নিজের বলে ক্লেইম করতে যাচ্ছে।
ইশায়া কাঁপা কাঁপা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
তার হৃদপিণ্ড যেন পাঁজর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে।
মারিয়া এলেনার বলা কথা বারবার মনে পড়ছে,
__তুমি যদি ওর মর্জি মতো চলো, তাহলে অন্তত বাঁচবে… বাঁচবে তোমার প্রিয়জনেরা।
___নিজের কথা না ভাবলেও নিজের পরিবারের কথা অন্তত ভাবো।
নিজেকে সামলে নেয় ইশায়া।
তাকে করতে হবে,
__এক গ্লাসে হুই*স্কি ঢেলে, নিজেকে ধীরে ধীরে ভীরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় ইশায়া।
___ভীর তাকিয়ে আছে তার প্রত্যেকটি মুভমেন্টে দেখছে।
ভীরের মুখেভঙ্গি আজ অদ্ভুত ধরনের শান্ত।
এই নরম অথচ তীক্ষ্ণ সৌন্দর্য, ভীরকে আরও উন্মাদ করে তুলছে।
____ইশায়া গ্লাসটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলে, ভীর হাসে না,না তার মুখোভঙ্গি বদলায়।
শুধু চোখে দিয়ে গিলে ফেলে তাকে, তারপর গ্লাসটা নিয়ে নেয়।
___তারপর ইশায়া ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
ভীরের কালো চামড়ার বুট জুতোয় হাত রাখে।
কাঁপতে থাকা হাতে ফিতা খুলছে সে।
ভীর গ্লাসে চুমুক দেয়,
তাকে ধোঁয়ার মতো ঢেকে রাখে ইশায়ার কাপা কাপা আঙুলের স্পর্শ।
__ভীর অনুভব কর,
এই হাতই একদিন তার বিরুদ্ধে উঠেছিল, আর আজ সেই হাত তার পদতলে নত।
___এই মেয়েটার জন্য আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিলো,
আর আজ,আজ সে আমার শয্যায়, আমার নিয়ন্ত্রণে।
আমি যেটায় চোখ রাখি, ওটা আমার হয়,
তুইও হবি,শুধু তোর শরীর না, আত্মা পর্যন্ত আমার দখলে চলে যাবে।
___ভীর ধীরে ইশায়ার হাতের কব্জি চেপে ধরে।
___ইশার আত্মা কেপে ওঠে ভীরের স্পর্শে।
___ইশায়াকে কিছু বুঝতে না দিয়েই এক ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে নিজের বুকে টেনে আনে ভীর।
___ইশায়ার শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে, হৃৎস্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে যায়।
চোখ বন্ধ হয়ে যায় ভয়ে।
তার হাত গিয়ে পড়ে ভীরের কাঁধে।
____ভীর তাকায় সেই হাতের দিকে, এই স্পর্শকে সে অনুভব করে আত্মতৃপ্তি নিয়ে।
ভীর ধীরে ধীরে ইশায়ার মুখ দেখে।
কাপা কাপা ঠোঁট , টলমলে চোখ,
ঘাড় থেকে বেয়ে নামা তার লম্বা চুল,
মসৃণ ত্বক,হালকা সুগন্ধ
আর সেই খোলা ড্রেসে উঁকি দেওয়া মেয়েলি অবয়ব।
___ভীরের দৃষ্টি ইশায়ার পুরো মুখ জুড়ে বিচরণ করছে,
নিভু নিভু চোখ,
কাপতে থাকা ঠোঁট ।
ভীরের দৃষ্টি নিচে নামে, আবার উঠে আসে ঠোঁটে।
____ভীর হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করে ইশায়ার ঠোঁটের ঠিক উপরে থাকা ছোট্ট কালো তিলটা।
— তুই জানিস এই তিলটাই আমাকে প্রথম আকর্ষিত করেছিলো… আর তারপর তুই আমার… পুরোটাই আমার দখলে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ১২
ইশায়ার চোখ দিয়ে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু সে বাধা দেয় না…
কারণ তার হৃদয়ে বাজছে সেই একটা শব্দ
—বাঁচতে হলে মেনে নিতে হবে।
