Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৫

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৫

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৫
তানিয়া হুসাইন

ভীর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা ছুটে যায় মনিটর রুমে, যেখানে সিসিটিভি ফুটেজ রেকর্ড হয়। দম আটকে আসা রাগ নিয়ে ভীর স্ক্রিনের দিকে তাকায়।
প্রথমে বের করা হয় তার প্রাসাদে ফেরার আগের ফুটেজ,
ইশায়া কিভাবে নিঃশব্দে রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। চাদর দিয়ে মুখ পেঁচিয়ে, গার্ডদের ব্যস্ততার ফাঁক গলে লুকিয়ে লুকিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একেকটা ফুটেজে ইশায়ার ভীত সন্ত্রস্ত চোখ, কাপা কাপা দেহ স্পষ্ট ফুটে উঠছে।
ফুটেজে শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ইশায়া যখন গেট এর কাছাকাছি চল আসে তখনই ভীরের গাড়ির বহর সেখানেই থামে!ভীর রাগে চোখ বন্ধ করে নেয়,ইশায়া তখন তার কাছে ছিলো,তার চোখের সামনে থেকে সে উধাও হয়ে গেলো আর সে টের ও পায় নি, নিজের উপর-ই রাগ উঠছে ভীরের।

কিভাবে সে একবার ও খেয়াল করলো না।
যুদ্ধ তখন একটু ও আন্দাজ করতে পারতো তাহলে এখন ও আমার কাছে থাকতো,এই কাছে না থাকার জন্য এই যন্ত্রণাটা তার হতো না। ভীর বার বার নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
ভীর আবারো স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে,
ভীর আর তার গার্ডরা ভেতরে ভেতরে ঢোকার পর পর-ই ইশায়া বেরিয়ে যায়,
ওই মুহূর্তের পর আর কোনো ভিডিও ক্লিপে ইশায়ার ছবি নেই।
ফুটেজ দেখা শেষ হতে না হতেই ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, চোখ লাল হয়ে যায় রাগে। সে দাঁতে দাঁত চেপে হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে,
রাগে ভীরের শরীর কাপছে সে এক সেকেন্ড ও দেরি না করে দাপিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপরের সবকিছু ছুড়ে ফেলে, ফুটেজ দেখার মনিটর, কিবোর্ড, রিমোট যা হাতের কাছে আসে সব চুরমার করে দেয়। একটার পর একটা জিনিস দেয়ালে ছুঁড়ে মারে। কাঁচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে।
রাগের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে ভীর গর্জে ওঠে,

— এত সাহস! এত বড় সাহস ওর হলো কিভাবে? আমার সাথে ছলনা! ভীরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা!এই সাহসের দাম কড়ায় কড়ায় শোধ করতে হবে।আমার খারাপ দিক টা এখনো দেখোনি তুমি মিসেস ভীর আলভারেয।এইবার তুমি দেখবে আমি ঠিক কতটা ভয়ংকর।
রাগে হিস হিস করছে ভীর,
ভীর আলভারেয ছেড়ে দিবে না তোকে।
তোর এই স্পর্ধার ফল কি হয় তুই দেখবি।
বলতে বলতে ভীর আবারও ভাঙচুর করতে থাকে,।দেয়ালে ঘুষি মারে সজোড়ে, দরজায় লাথি মারে, যেন নিজের রাগ নিজেই সামলাতে পারছে না।
নিকো দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ভীরের হাত চেপে ধরে।
নিকো গম্ভীর গলায় বলে,

— ডোন্ট ওয়ারি, ব্রো। আমি লোক পাঠিয়ে দিয়েছি।তুমি চিন্তা করো না ও বেশি দূরে যেতে পারবে না। ও এই শহরের কিছুই চেনে না।
আমি ওকে তোমার সামনে এনে দাঁড় করাবো তুমি চিন্তা করো না।
কিন্তু একটাই ভয়ের বিষয় ওদের টার্গেট হলো ইশায়া, আর আজকে ওর জন্যই অ্যাটাক হয়েছে।
যদি শত্রুপক্ষের লোকেরা আমাদের আগে ওকে ধরে ফেলে, তখন…
নিকোর কথায় ভীরের চোখে শঙ্কা আর আগুন একসাথে জ্বলতে থাকে। ভীর জানে শত্রুপক্ষের হাতে পড়া মানেই শুধু ওর হার নয় ওর জীবনের একমাত্র আরাধ্যকে চিরতরে হারানো।
ভীরের মনের মধ্যে ছুটে আসা ভয় এক মূহূর্তের জন্যও থামছে না।
— যদি ও অন্য কারো নজরে পড়ে, যদি কেউ ওর দিকে হাত বাড়ায়, আমি ওদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলবো,কাওকে ছাড়বোনা কিন্তু যদি ওর কিছু হয়ে যায়? তখন তখন আমি কি করবো?
পুরো পৃথিবী থেকে আমি তাকে আড়াল করে রেখেছি, আমার সীমান্তের মাঝে ছিলে আমার বন্দিনী হয়ে সব থেকে সুরক্ষিত জায়গায়,

কিন্তু এখন, এখন কি হবে।
শুধু যে শত্রু পক্ষের ভয় তা তো না, অন্য কারো নজরে আসলে তখন।
ভীর মাথায় হাত চেপে ধরে,তার মাথা কাজ করছেনা তার।
আমার থেকে দূরে যেতে চেয়ে তুমি নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনলে মাইন লিটল হার্ট।
তোর জন্য যদি তোর কোন ক্ষতি হয় তাহলে আমি তোকে ছাড়বো না,
আমি নিঃশেষ করে ছাড়বো সবকিছু।
ভীর একদম স্থির হয়ে যায়, শ্বাস আটকে আসে তার রাগ আর ভয়ের মিশ্রণে।
নিকো ভীরের পিঠে হাত রাখে, গভীর ভরসার সুরে বলে,

— চিন্তা কোরো না, ব্রো। আমি যা করার করবো।
ডিয়েগো ম্যাটিয়াস বেরিয়ে গেছে।
ও বেশি দূর যেতে পারবেনা।
আমি ওকে ঠিক-ই খুঁজে বের করবো। ও আমাদের হাতের নাগালেই আছে।
ভীরের চোখের গভীরতা যেন আরও অন্ধকার হয়ে ওঠে। তার ঠোঁটের কোণে জেদ আর প্রতিশোধের তীব্রতা।
ভীর নরম অথচ হাড়কাঁপানো গলায় বলে,
— ওকে খুঁজে এনে দে, যেভাবেই হোক,প্রয়োজন হলে পুরো গুয়াতেমালা শহর ছারখার করে দে, তবু ওকে আমার কাছে আনতে হবে ওকে চাই আমি!
ওকে এনে দে নিক।
ওকে এনে দে।
__আমি এনে দিবো ব্রো,যে করেই হোক।যেভাবেই হোক।
প্রয়োজনে সবকিছু ধ্বংস করে হলেও ওকে তোমার পায়ের কাছে এনে ফেলবো।
আর নিকো যখন যেটা বলে তখন সেটা করেই।

জঙ্গলের কাঁটা, পাথর, সবকিছু পেরিয়ে বিধ্বস্ত শরীরে হাঁপাতে হাঁপাতে লোকালয়ে পৌঁছায় ইশায়া। রক্তাক্ত পা,মুখে ও কাটা ওয়ালা গাছ লেগে কেটে গেছে একপাশ, ছেঁড়া কাপড় , শরীরে ক্ষত, কিন্তু তবুও সে থামে না। তার ভেতরটা তখন কেবল একটা কথাই বলছে বেঁচে থাকতে হবে।
ভীরের হাত থেকে বাঁচতে হবে।
দূরে একটুখানি আলোর দেখা পায় ইশায়া পুরনো মরচে ধরা এক দোতলা ঘর। জানালায় কুয়াশা জমে আছে। দেয়ালে ধূসর ছোপ ছোপ দাগ। ইশায়া ভীত, ক্লান্ত, কিন্তু আশায় বুক বেঁধে সেই ঘরের দিকে এগিয়ে যায় টলমল পায়ে। দরজায় কাঁপা কাঁপা হাতে টোকা দেয়।
কড় কড় করে দরজা খুলে কেউ,
একজন বয়স্কা নারী বের হন। মুখে কালো ছাপ, চোখেমুখে একরাশ বিস্ময়।

___মহিলাটি তার ভাষায় কিছু একটা বলে,
ইশায়া ওনার কথা বুঝে না। তবুও কান্নাভেজা কণ্ঠে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে,
প্লিজ সেভ মি! দয়া করে আমাকে একটু আশ্রয় দিন, একটু লুকিয়ে রাখুন। আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে কেউ, আমি নিজের প্রাণ বাঁচিয়া পালিয়ে এসেছি।
ওদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করুন।
___ইশায়ার ইংরেজি বাংলা সংমিশ্রণে বলা কথাগুলো মহিলা পুরোপুরি না বুঝলেও একটু বুঝে,
মহিলাটি অনেক দেশের ভাষা জানার দরুন ইশায়ার কথা কিছু কিছু বুঝতে পারেন।
আর ইশায়ার অবস্থা থেকে তিনি কিছু একটা আচ করতে পারেন যেও কোন বিপদে আছে,
ইশায়ার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটি আতঙ্কে নিঃশেষ।
তিনি চারদিকে তাকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন, যেন কেউ দেখে না ফেলে।
ইশায়াকে একটা খালি খাটে বসান।
ইশায়া তখনো কাপছে ভয়ে।
মহিলাটি তাকে পানি এনে দেয়, মাথায় ভেজা কাপড় চেপে ধরেন।
মেক্সিকান মাফিয়া আর এখানকার মাফিয়ার সংঘর্ষ সম্পর্কে জানেন তিনি,
ওইখানে ঝামেলার ফলে হয়তো কিছু হয়েছে এটাই ভাবছেন মহিলাটি।

__ভয় পেয়ো না, এখন তুমি নিরাপদ।
এখান থেকে কেউ তোমাকে নিয়ে যেতে পারবেনা।
তোমার বাড়ি কোথায় বলো আমি তোমাকে পৌঁছে দেবো।
এখানে তুমি কিভাবে এলে।
তোমার বাড়ি কি এই জায়গায়।
তুমি কি কোন খারাপ লোকের চক্করে পড়েছো।
___ইশায়া কিছু বলে না,
সে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।
তবে ভীর এর কথা সে বলবে না,কারন ভীরের কথা যদি বলে তাহলে ওকে কেউ আশ্রয় দিবেনা সবাই ভয় পেয়ে ওকে আরো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিবে নয়তো ভীরের কাছে যদি খবর পৌঁছে দেয় এই ভয়ে ইশায়া কিছু বলে না।
মহিলাটি বুঝতে পারে ইশায়ার ভয়,
তাই সে আর কিছু না বলে,
রান্নাঘর থেকে ইশায়ার জন্য কিছু খাবার এলে দেন,
সারাদিন থেকে কিছু না খাওয়ায় খুব খিদে ছিল তার,এর মাঝেই এসবের কারনে সে খুব ক্লান্ত, শরীরটা আর তার চলছে না সে আর কিছু না বলে খাবারটুকু খেয়ে নেয়,

__মহিলাটা ওকে একটা ড্রেস দেয়, পুরনো হলেও পরিস্কার, গায়ে রক্তভেজা জামা ছিল ইশায়া সেটা খুলে এটা পরে নেয়।
আন্টি আমি শুধু একটু ঘুমোতে চাই,
মহিলা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
ঘুমিয়ে পড় , এখন তুমি আমার কাছে আছো ভয় পেয়ো না।
তোমার বাবা-মা এখানের কোথায় থাকে বলো আমি পৌছে দিবো।
___তীব্র ক্লান্তিতে, গাঢ় নির্ভরতায় ডুবে ঘুমিয়ে পড়ে ইশায়া।
ইশায়াকে চুপ থাকতে দেখে তিনি আর কিছু বলেন না।
পরে জেনে নিবেন এই ভেবে।
মেয়েটার মুখ দেখে খুব মায়া হয় তার।
কিন্তু তার হাতে কানের গলায় দামী দামী জুয়েলারি দেখে মহিলাটি বুঝে ও হয়তো কোন বড়লোক ঘরের মেয়ে।
এখানে এই ঝামেলার মাঝে হয়তো কারোর নজরে পড়েছে।

ইশায়া যেই জঙ্গলের পথ দিয়ে গিয়েছিলো সেটা পুরোটা চিরুনি তল্লাশি করে ও তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ভীরের গার্ড রা পুরো জঙ্গল চষে ফেলেছে,কিন্তু কেউ ফলাফল শূন্য।
ডিয়েগো অন্যদিকে লোক পাঠিয়েছে।
ভীর শুনছে একের পর এক না না না শব্দ,
পাইনি শব্দটাই তাকে শেষ করে দিচ্ছে ভেতর থেকে।
ভীর যথাসম্ভব নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
কারণ এখন তার উদ্দেশ্যে ভিন্ন আর যা তাকে মাথা ঠান্ডা করে নিতে হবে,
___ভীর গম্ভীর গলায় বলে,
গুয়াতেমালার প্রতিটি প্রধান রাস্তা, অলিগলি, এমনকি পাহাড়ি ছোট ছোট ট্রেইল সব ব্লক করে দাও।
ভীরের গলার স্বর এতটাই জমাট আর হিমশীতল যে পাশে থাকা সান্তিয়াগো পর্যন্ত শিউরে ওঠে।
এখান থেকে এক চুলও যেনো কেউ বের হতে না পারে।
গুয়াতেমালার সব এয়ারপোর্ট, প্রাইভেট জেটের হ্যাঙ্গার, হেলিপ্যাড, ট্রেন স্টেশন একটাও বাদ যাবে না! সব জায়গা ঘিরে ফেলো!

___নিকো দ্রুত ফোনে লোকেশন পাঠায় প্রতিটি রুটের গ্যাং মেম্বারদের।
সান্তিয়াগো দ্রুত ম্যাপ খুলে একের পর এক চেক পয়েন্টগুলো মার্ক করতে থাকে।
প্রতিটি বড় বর্ডার পয়েন্ট,বেলিজ বর্ডার ক্রসিং,
সবকিছু তালাবদ্ধ করতে শুরু করেছে ভীরের গার্ডরা।
ভীরের নির্দেশে পুরো শহরের জঙ্গল আর আশেপাশের বনভূমি ঘিরে ফেলে শত শত গার্ড।
ভীর দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— জঙ্গল তো জঙ্গল, আশেপাশের প্রতিটা বাড়ি, হোটেল, গেস্টহাউস, এমনকি পরিত্যক্ত ঘরও তল্লাশি করো,কোন ফাক যেনো না থাকে।
সান্তিয়াগো বলে,
বস, আমরা সব দিকেই মানুষ নামিয়ে দিয়েছি।
____শোনো!
সবাইকে এটা বলবে, জানিয়ে দিবে প্রত্যেককে এই মেয়েকে যে পাবে, যেই আমার কাছে ওর খবর দেবে, তাকে এক কোটি কুয়াতজাল (গুয়াতেমালার মুদ্রা) পুরস্কার দেওয়া হবে।
___ফোনে একের পর এক নির্দেশ ছড়িয়ে পড়ছে গুয়াতেমালার প্রতিটি শহরে, যে এই মেয়েকে পাবে বা তার খবর এনে দিতে পারবে, তার জন্য এক কোটি কুয়াতজাল রিওয়ার্ড!
ভীরের শব্দ সারা শহরে বজ্রের মতো কাঁপন ধরিয়ে দেয়। গ্যাংস্টাররা ছুটে যাচ্ছে সমস্ত গলিপথে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে গার্ড বসানো হচ্ছে, ড্রোন উড়ছে জঙ্গলের উপর দিয়ে, প্রত্যেক মোবাইল চেকপোস্ট তৈরি হচ্ছে বর্ডার রোডে।

ডিয়েগো রেডিওতে নির্দেশ পাঠাচ্ছে,
প্রতিটা লোকালয়, প্রতিটা পাহাড়ি রাস্তা, গ্যাংওয়ে, হাইওয়ে, গোপন রাস্তাগুলো চেক করো।
ওর গায়ে একটা আঁচও লাগলে,বস তোমাদের লাশের হিসেব করবে না।
ফুটেজ দেখেই ডিয়েগো বেরিয়ে পড়েছে।
সে এই ভয় পাচ্ছে বস কি করবে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৪

____কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভীর একেবারে শান্ত হয়ে যায়।
ভীরের এই ঠান্ডা ভাব টা কারোর-ই সহ্য হচ্ছেনা।
এটা আবার কোন নতুন ঝড় তুলে সেটার -ই ভয় পাচ্ছে সবাই।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৬