Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ১৯

সে খলনায়ক পর্ব ১৯

সে খলনায়ক পর্ব ১৯
ফারহানা সানিয়াত

সময় এখন বেলা দুপুর গড়িয়ে বিকেল, মাথার উপর সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। দামিয়ান হাতে বন্দুক হাতে নিয়ে জঙ্গলে ধীর পায়ে হাঁটছে,তার দৃষ্টি আশেপাশে ,এই সময়টা পাখি গাছগাছালিতে দেখা যায় তবে আজ যেন একটাও চোখে পরছে না। বিরক্তিতে দামিয়ানের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়, সে হাঁটার মাঝে সামনে ওপরের দিকে বন্দুক তাক করে,, আজকাল পাখিরা ও বুঝি তার থেকে পালাচ্ছে সে তাদের কাছে এতটাই ভয়ংকর,, ক্রুর হাসে দামিয়ান,
তবে এটা ভালো তাকে ভয় পেলেই তো সে শিকার
করতে আগ্রহী হবে কথাটা ভেবে দামিয়ান সামনের দিকে তাক করা বন্দুক পাশে দিকে ঘুরিয়ে বাঁকা হাসে,,

দোলনায় দড়ির সাথে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে প্রাণপ্রিয়া,, তার খোলা আঁকাবাঁকা চুলগুলো হালকা হাওয়ায় উড়ছে, পশ্চিম দিকে সূর্যের আলোয় তার স্নিগ্ধ মুখখানা জ্বল জ্বল করছে। দামিয়ান বন্দুক হাতে ঘাড় কাত করে দেখে,,,
এই মেয়েকে সে এখানে আশা করে নি হাঠৎ ই তার চোখে পড়েছে, দামিয়ান ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে আসে যেন প্রাণপ্রিয়ার উপস্থিতি তার কাছে বেশ ভালো লেগেছে,,
তবে! তবে! হঠাৎ বন্দুকের বিকট শব্দ, যা শুনে প্রাণপ্রিয়া চোখ সাথে সাথে খুলে বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়।

__ অনেকদিন পর দেখা হল মিস প্রাণপ্রিয়া,
খুব নরম হালকা কন্ঠ দামিয়ানের,,
প্রাণপ্রিয়ার ভিতরটা ধক করে ওঠে সে তড়িৎ গতিতে পাশে ঘুরে তাকায়,,দামিয়ান বাঁকা হেসে বন্দুক সরিয়ে মাটিতে খাড়া ভাবে রেখে হাতের ভর দেয়,
প্রাণপ্রিয়া চোখ গোল গোল করে দামিয়ান কে দেখে শেষ মেষ এই লোকের সামনে তার পড়তেই হলো!! কিন্তু কেন! নাহ তার দ্রুত চলে যাওয়া উচিত ভেবে ই ঢোক গিলে দৃষ্টি নত করে পিছে ঘুরে সোজা হাঁটা ধরে,,
দামিয়ানের বাঁকা হাসি চাওড়া হয় সে প্রাণপ্রিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আবার বন্দুক হাতে নিয়ে শুট করে,
প্রাণপ্রিয়া দ্রুত গতিতে পায়ের কদম ফেলার মাঝে উপর থেকে একটা রক্তাক্ত পাখি তার সামনে পড়তে ই থেমে যায়,

__ আর এক কদম পা বাড়ালে এই পাখি জায়গায় তুমি হবে, কিছুটা রুক্ষ কণ্ঠ দামিয়ানের,,
প্রাণপ্রিয়া নিচে পড়া পাখিটার দিকে তাকায়,, ছোট্ট একটা পাখি মৃত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে যার শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট কামড়ে ধরে মেয়েটা লোকটির এমন শখ কে সে ঘৃণা করে কতটা হৃদয়হীন ব্যক্তি ,
__ দুঃখিত কিন্তু আমার যেতে হবে , পাখিটির দিকে তাকিয়ে প্রাণপ্রিয়া কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলে ফের হাঁটা ধরে,
দামিয়ানের চোখে মুখে রাগ ফুটে উঠে, এই আশ্রিতা তার কথা শুনলো না এত বড় সাহস! সে রাগে হাতের বন্দুক শক্ত করে ধরে প্রাণপ্রিয়ার পায়ের পাশ দিয়ে শুট করা শুরু করে,,
প্রাণপ্রিয়া দামিয়ানকে এভাবে শুট করতে দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে মাটিতে বসে দু হাত দিয়ে মাথা চেপে বলে ওঠে,,
__ দয়া করে থামুন! দয়া করে!
দামিয়ান থেমে যায় সে হাসে, কিছু টা শব্দ করেই হাসে যেন প্রাণপ্রিয়াকে ভয় দেখিয়ে বেশ মজা পেল,
প্রাণপ্রিয়া এত দিনের মধ্যে আজ প্রথম ভয়ের সাথে রাগান্বিত চোখে ঘুরে দামিয়ান দিকে তাকায়,,দামিয়ান হাসির মাঝে প্রাণপ্রিয়ার রাগান্বিত মুখ দেখে চোখ সরু করে আবার বন্দুক তাক করতেই প্রাণপ্রিয়া কান্নারত চোখে মাথা নত করে কাঁপা কাঁপা হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে।
দামিয়ান বন্দুক সরিয়ে ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি নিয়ে প্রাণপ্রিয়ার কাছে এগিয়ে যায়,,

__ আমাকে ভয় পাও প্রাণপ্রিয়া এটা তোমার মুখে মানায়।
প্রাণপ্রিয়া চোখ তুলে তাকায়, দামিয়ান হাঁটু ভেঙে তার সামনে বসতেই সে দ্রুত সরে যায়,
__ কেকনো আপনি আমার সাথে ,,, বাকি কথা বলার আগে দামিয়ান বলে ওঠে,,
__ কারন তোমার অস্তিত্ব আমাকে বিরক্ত করে। খুবই বিরক্তকর একটা মেয়ে তুমি।
__ ততাহলে আমাকে যেতে দিন, কান্নারত কন্ঠ প্রাণপ্রিয়ার।
দামিয়ান পূর্ণ দৃষ্টিতে প্রাণপ্রিয়াকে দেখে, তুমি একজন আশ্রমের আশ্রিতা ছাড়া কিছুই না,আমি চাই আমার জীবনে সব কিছু নিজের জায়গায় থাকুক,কোনো অপ্রয়োজনীয় কিছু প্রয়োজনী না পড়ুক, কিন্তু তুমি বিরক্তকর মেয়ে ,তোমার একদম উচিত হয় নি আমার সামনে আসা,,
প্রানপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে,সে এমন কি করেছে তাকে এভাবে বলছে সে তো সামনে পড়তে চায় নি, কথা গুলো মনে মনে ভেবে প্রাণপ্রিয়া দৃষ্টি নত করে চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে।
দামিয়ানের দৃষ্টি তীব্র হয় সে প্রাণপ্রিয়ার চোখের জল দেখে যা তার ফর্সা নরম গাল বেয়ে পড়ছে এটা তৃপ্তিদায়ক ছিল সে বাঁকা হেসে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়,, চলো আজ তোমাকে শিকার করা যাক Because you look like a little bird.

প্রাণপ্রিয় জলে ভরা দৃষ্টিতে দামিয়ান কে দেখে, দামিয়ান আবার তার দিকে বন্দুক তাক করে, প্রাণপ্রিয়ার মনে আসে সে কিশোরী থাকতে ঠিক এভাবেই তার দিকে বন্দুক তাক করেছিল সে ভয় পেয়েছিল এবং এই লোককে ভয়ংকর মনে হয়েছিল হ্যাঁ সে আসলেই ভয়ঙ্কর ,হৃদয়হীন, নির্দয় ।সে এতটুকু বুঝতে পারছে এই লোকটা সহ্য করতে পারে না তাকে সে তার কাছে অত্যাধিক বিরক্তিকর কিন্তু কেনো!!
দামিয়ান দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে এই মেয়েকে এভাবে দেখে তার ভালো লাগছে কারন সে কান্না করছে,সে জানতো না কোনো মেয়ে কান্না করলে এতটা ভালো লাগে,It suit your face pranpriya I’m interested in watching it again and again, বলে‌ দামিয়ান বন্দুক তার দিক থেকে সরায়,
__ কেকনো এমন ব্যবহার করছেন কি করেছি আমি? দামিয়ানের দিকে দৃষ্টি রেখে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে প্রাণপ্রিয়া,
দামিয়ান হালকা হাসে এর উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না তুমি শুধু তোমার জায়গায় থাকো যতটুকু তোমার থাকা প্রয়োজন যেমন শুধু বিনোদন হিসাবে।

আবরার ম্যানশনে বসার ঘরে মিসেস রাইমা আর সারা বসে আছে, আজ দুদিন হবে সারা এই বাসায়, দুজনের মধ্যে পরশু পার্টি নিয়ে কথা চলছে,তাদের সামনে‌ টেবিলে রাখা পার্টির কিছু ইনভিটেশন কার্ড। হুমায়ুনের কথামতো এনগেজমেন্টের আগে এনগেজমেন্ট অ্যানান্স করার জন্য বিশাল বড় পার্টির আয়োজন হয়েছে যেখানে আত্মীয়-স্বজন ব্যবসায়িক যত পার্টনার সবাই আসবে।
__ শপিং কবে যাচ্ছ সারা, সময় তো বেশি নেই, রাইমা বলেন।
__ সারা মুখে হাসি নিয়ে টেবিলের উপর থেকে একটা কার্ড হাতে নেয়,,কাল যাবো আন্টি ড্রেস এখনো আসেনি,
রাইমা মাথা নাড়ান , ও আচ্ছা,
সারা কার্ডের দিকে তাকিয়ে কার্ডের চারপাশে আঙুল বুলায়,, আন্টি আমি কি আমার একটা বন্ধুকে ইনভাইট করতে পারি পার্টিতে?
রাইমা হাসেন, অবশ্যই পারো এটা জিজ্ঞেস করছ কেন,
সারা চোখ তুলে রাইমার দিকে তাকায়,, একচুয়ালি আন্টি আমার বন্ধু মানে আমি আশ্রমের প্রাণপ্রিয়ার কথা বলেছি।
সারার কথা শুনে রাইমা অনেকটা অবাক হন তবে মুহূর্তে মুখে স্বচ্ছ হাসি নিয়ে সারা গালে হাত দিয়ে বলেন,,

__ তোমার মত মেয়ে হয় না সারা, ভাইজান একদম ঠিক মেয়েকে দামিয়ানের জন্য পারফেক্ট মনে করেছেন। তুমি সত্যিই অসাধারণ মেয়ে একটা আশ্রমের মেয়েকে নিজের বন্ধু বলছো তাকে পার্টিতে ইনভাইট করতে চাইছো,
সারা মুচকি হাসে, আসলে আন্টি মেয়েটাকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি খুব মিষ্টি একটা মেয়ে,
রাইমা সারার গাল থেকে হাত সরান, তুমি অবশ্যই তাকে ইনভাইট করবে তোমার বন্ধু হিসাবে তাকে প্রতিটা গেস্টের মত ই স্পেশাল ভাবে ট্রিট করা হবে।
সারা অনেকটা খুশি হয়,, থ্যাঙ্ক ইউ আন্টি থ্যাংক ইউ সো মাচ, আচ্ছা তাহলে আমি এখন উঠি বলেই সারা হাতের কার্ডটা নিয়ে বসা থেকে উঠে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরে তবে হাঁটার মাঝে তার মুখের হাসিটা আস্তে আস্তে চলে যায়।

আশ্রমে সদর দরজার কাছে‌ মন খারাপ করে বসে আছে প্রাণপ্রিয়া, দৃষ্টি তার সামনের অন্ধকার উঠানে, উঠানের ঝলমলে লাইট আজ নষ্ট হয়ে গেছে তাই উঠানের বেশিরভাগ অংশ অন্ধকার। প্রাণপ্রিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে ভাবে দামিয়ানের কথাগুলো তার ব্যবহার, কতটা নির্দয় ব্যক্তি সে ,একটা মানুষ তার কাছে বিনোদন হিসাবে মনে হয়! তার কাছে আমার কান্না ,ভয় ভালো লাগে! সে এটা তাকে বুঝিয়েছে!
প্রাণ প্রিয়ার মনে আসে সুফিয়া বলেছিল বড় সাহেবের মত দামিয়ান ও দয়ালু, তাহলে তার সাথে শুধু শুধু কেনো এমন করল! তার একদম পছন্দ না ওই লোককে হ্যাঁ পছন্দ না এরকম নির্দয় নিষ্ঠুর ব্যক্তির উপর তার ঘৃণা সে আর ভয় পাবে না কারন সে চায় আমি ভয় পাই,,

__ এখানে বসে আছো কেনো প্রিয়া? পেছন থেকে রহমান প্রাণপ্রিয়ার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞাস করে ওঠেন,
প্রাণপ্রিয়া ভাবনা থেকে বের হয়ে অন্ধকার উঠানের দিকে তাকিয়ে বিরস কন্ঠে বলে,, এমনি আঙ্কেল ঘরে ভালো লাগছিল না।
রহমান ভেতর থেকে আসা হালকা আলোয় প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে তার মাথায় হাত বুলান এরপর নিজেও পাশে বসেন,,
__ মন খারাপ নাকি?
প্রাণপ্রিয়া দুদিকে মাথা নাড়ায় মানে না,
রহমান স্বচ্ছ হাসেন তার হাত আবার প্রাণপ্রিয়ার মাথায় রেখে বলেন,

সে খলনায়ক পর্ব ১৮

__ তোমাকে চুপচাপ মানায় না সব সময় হাসি খুশি মেয়ে হয়ে থাকবে যেমনটা সব সময় থাকো আমি এটা দোয়া করি।
প্রাণপ্রিয়া আঙ্কেলের দিকে তাকায়, রহমানের মুখে হাসি সে হা করে শ্বাস ফেলেন,
__ ছোট প্রাণপ্রিয়া ‌দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেছো , আমি এটাও দোয়া করি তুমি আরো বড় হও আর নিজের বুঝ বুঝতে শেখো, মানুষ চিনতে শেখো, দুনিয়া চিনতে শেখো কারন তোমাকে নিয়ে আমার অনেক চিন্তা হয় ।

সে খলনায়ক পর্ব ২০